হাটে ভারতীয় বোল্ডার এলো কোত্থেকে?

হাটে ভারতীয় বোল্ডার এলো কোত্থেকে?

রাজশাহীর সিটি হাটে উঠেছে বেশ কিছু ভারতীয় গরু। সীমান্তে বিজিবির কঠোর অবস্থানের মধ্যে হাটে এসব গরু এলো কীভাবে তা নিয়ে তৈরি হয়েছে প্রশ্ন। ছবি: নিউজবাংলা

দেশি খামারিদের গরুতে জমজমাট রাজশাহীর পশুর হাটে কিছু ভারতীয় গরু প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। বিজিবি বলছে, সীমান্তে নিশ্ছিদ্র কড়াকড়ি। চোরাপথে কোনো পশু ঢুকছে না। কোথা থেকে এলো এসব ভারতীয় গরু?

কোরবানি হাটের এখন শেষ সময়। রাজশাহীর পশুর হাটগুলো জমজমাট। এবার ভারতীয় গরুর ওপর নির্ভরতা ছেড়ে দেশি গরুতেই কোরবানির পশুর চাহিদা মেটাতে প্রস্তুত রাজশাহীর খামারিরা।

সেভাবেই চলছিল। মূলত দেশি গরুতেই জমেছিল রাজশাহীর পশুর হাটগুলো। কিন্তু শেষ সময়ে রাজশাহীর সিটি হাটে উঠেছে বেশ কিছু ভারতীয় গরু। প্রশ্ন উঠেছে, সীমান্তে এখন বিজিবির কঠোর অবস্থানের মধ্যে হাটে এসব ভারতীয় গরু এলো কোথা থেকে?

প্রাণিসম্পদ বিভাগ বলেছে, এগুলো আগের গরু। আর সীমান্তরক্ষী বাহিনী বলছে, ঈদের আগে রাজশাহী সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় কোনো গরু আসেনি। আসার কোনো সুযোগ নাই।

রোববার রাজশাহীর সব থেকে বড় হাট ‘সিটি হাটে’ গিয়ে বেশ কিছু ভারতীয় গরু দেখা যায়। এই জাতটিকে স্থানীয়ভাবে বোল্ডার গরু বলা হয়। বড় মাপের এসব গরু হাটে ওঠামাত্র বেশ নজর কেড়েছে।

দেশি গরুর খামারিদের চোখে পড়ার পর তারা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, খামারে গরু পালতে তারা বছরজুড়ে অনেক টাকা খরচ করেছেন। ঈদের সময় ভালো দামের আশা থাকে তাদের। শেষ মুহূর্তে হাটে যদি এভাবে ভারতীয় গরু আসে, তবে আমাদের লোকসান গুনতে হবে।

হাটে ভারতীয় বোল্ডার এলো কোত্থেকে?

সিটি হাটের কয়েকজন বিক্রেতা বলেন, আমাদের এখানে গত কয়েক দিন দেশি গরু দিয়েই চলছে। শেষ মুহূর্তে কোথা থেকে যেন কিছু ভারতীয় গরু এসেছে। এগুলোর দাম তুলনামূলক কম।

সাওদাগর অ্যাগ্রো খামারের মালিক আরাফাত রুবেল বলেন, ‘রাজশাহীর হাটে আমরা বেশ কিছু বোল্ডার গরু দেখছি। যতটুকু শুনছি, এগুলো আগে কিনে দেশে লালন-পালন করা হয়েছে। এগুলো সরাসরি ইন্ডিয়া থেকে আসা না। পাবনার খামারিরা এগুলো পালন করেন। এগুলো চট্টগ্রামের দিকে বেশি চাহিদা।’

তিনি মনে করেন, এগুলো দেশি খামারিদের তেমন ক্ষতি করতে পারবে না।

সিটি হাটের ইজারাদার আতিকুর রহমান কালু বলেন, ‘হাটে ভারতীয় গরু নামছে না। ভারতীয় গরু দুই বছর আগে কিনে রেখেছিল, সেই গরুগুলো আছে। এখানে ভারতীয় গরু নেই। খামারিদের গরু। তারা কোথা থেকে পেল, সেটি জানি না। এখানে বর্ডারের কোনো গরু নেই।’

রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইসমাইল হক বলেন, ‘হাটে ভারতীয় গরু আসছে কি না আমরা জানি না। আমরা বর্ডারের দায়িত্বে না, আমরা বরাবরই বলে আসছি।’

তিনি বলেন, ‘হতে পারে এগুলো খামারিরা বাড়িতে লালন-পালন করে তারপর বাজারে এনেছেন। এগুলো দুই-তিন মাস আগে এসে থাকলে এটি আমাদের গণনার মধ্যে আছে। আমাদের জেলায় চাহিদার থেকে ১ লাখ ১২ হাজার গরু বেশি ছিল। এখান থেকে বাইরের জেলায় গরু যায়।’

রাজশাহী বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘করোনার সময় আমরা সীমান্তে যেকোনো চোরাচালানের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছি। পশু আসার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় নেই। আমরা নিরবচ্ছিন্নভাবে সীমান্তে নিরাপত্তা টহল দিচ্ছি। যেকোনো চোরাচালান, সেটা পশু হোক বা অন্য যেকোনো রকম চোরাচালান হোক, তা প্রতিরোধে সর্বাত্মকভাবে সচেষ্ট আছি।’

হাটে ভারতীয় পশুর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা এগুলো নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু সিটি হাটে বিভিন্ন জায়গা থেকে গরু আসে। সেখানে শুধু রাজশাহীর গরু বিক্রি হচ্ছে, এমনটি নয়। সিটি হাটে যে গরুগুলো বিক্রির জন্য এসেছে, সেগুলো কোথা থেকে এলো, এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে আমাদের বর্ডার দিয়ে যাতে কোনো গরু না আসে, সেজন্য প্রয়োজনীয় সকল ব্যবস্থা নিয়েছি। এখন পর্যন্ত আমাদের কাছে এ রকম কোনো তথ্য নেই।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্তও নিশ্ছিদ্র

প্রতিবছর প্রয়োজন মেটাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে আনা হতো গরু-মহিষ। চোরাপথে এসব পশু আনতে গিয়ে সীমান্তে প্রাণহানির সংখ্যাও কম নয়। তবে এ বছর চিত্র ভিন্ন।

সীমান্তবর্তী সূত্রগুলো জানিয়েছে, এ বছর বিজিবি ও বিএসএফ দুই বাহিনীই সীমান্তে কড়াকড়ি অবস্থান রেখেছে। যেকোনো এক বাহিনী যদি ছাড় দিত, তাহলে কঠিন হলেও গরু আনতেন ব্যবসায়ীরা। তবে করোনাকাল হওয়ায় কড়াকড়ি বেশি থাকায়, দুই দেশেরই গরু চোরাচালানের সাথে জড়িতরা অনেকটা হাল ছেড়ে দিয়েছেন।

হাটে ভারতীয় বোল্ডার এলো কোত্থেকে?

চাঁপাইনবাবগঞ্জের বিভিন্ন হাটে দেশি গরু ও ছাগলই কোরবানির পশুর চাহিদা পূরণ করছে। দেশি পশুতে কোরবানির চাহিদা পূরণের সক্ষমতাকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ। অন্যদিকে দেশি খামারিরা তাদের লালন-পালন করা গরুর দামও ভালো পাচ্ছেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের মহারাজপুরের গরু ব্যবসায়ী ইসরাফিল হকের মতে, ভারতের গরু না আসায়, দেশীয় গরুর দাম তারা ভালো পাচ্ছেন। এতে আগামী বছর আবারও গরু লালন-পালনের আগ্রহ বাড়বে বলে জানান তিনি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মোস্তাফিজুর রহমান জানান, ‘ভারতের গরু পাঠানোতে কড়াকড়ি করায় আমাদের জন্য আশীর্বাদই হয়েছে। আমরা নিজেরা এখন সক্ষমতা অর্জন করেছি। এর ফলে দেশীয় অনেক উদ্যোক্তা এগিয়ে এসেছেন, অনেক খামার গড়ে উঠেছে। শুধু কোরবানির পশু নয়, সারা বছরের আমাদের মাংসের চাহিদাও এখন আমরা পূরণ করতে সক্ষম।’

তিনি জানান, চাঁপাইনবাবগঞ্জে চাহিদার চেয়ে বেশি কোরবানিযোগ্য গরু রয়েছে। এ বছর ১ লাখ ৩ হাজার ৭৭৮টি কোরবানির পশুর চাহিদার বিপরীতে কোরবানিযোগ্য পশু রয়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ১২৬টি।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ ৫৯ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্নেল আমীর হোসেন মোল্লা জানান, সীমান্তে বিজিবি সদস্যরা কড়া নজরদারি রেখেছেন, কোনোভাবেই যাতে ভারতীয় গরু আসতে না পারে। সেই সঙ্গে নিয়মিতই টাস্কফোর্সের অভিযান চালানো হচ্ছে।

আরও পড়ুন:
চোরাইপথে গরু আসার শঙ্কায় খামারিরা

শেয়ার করুন

মন্তব্য