বরাদ্দ টাকায় কি এমন ঘর সম্ভব?

বরাদ্দ টাকায় কি এমন ঘর সম্ভব?

বগুড়ায় ধসে পড়ছে সরকারের দেয়া উপহারের ঘর। ছবি: নিউজবাংলা

স্থপতিবিদেরা বলছেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পে উপহারের বাড়ির যে নকশা, সে অনুযায়ী বাজেট কম ধরা হয়েছে। সব জায়গায় এ বাজেটে মানসম্পন্ন নির্মাণকাজ সম্ভব নয়। আবার পূর্ত প্রকৌশলীরা বলছেন, বাজেট ঠিক আছে। সমস্যা নির্মাণকাজের মানে।   

মুজিববর্ষে উপহার হিসেবে দেয়া ঘরের যে বাজেট, তাতে এই নকশায় তা নির্মাণ সম্ভব নয় বলে মনে করছেন নির্মাণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীরা। তারা বলছেন, এভাবে বানানো ঘরকে টেকসই ঘর বলা যাবে না। এমন নকশাতে একটি ঘর বানাতে প্রয়োজন আরও অর্থ ও সমন্বয়।

আবার অনেকে বলছেন, নির্মাণেও গাফিলতি হয়েছে।

মুজিববর্ষ ও স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে গত ২৩ জানুয়ারি ৬৬ হাজার গৃহহীন পরিবারকে ঘর হস্তান্তর করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ‘মুজিববর্ষে কেউ গৃহহীন থাকবে না’ স্লোগান সামনে রেখে গৃহহীন পরিবারগুলোকে বিনা মূল্যে ঘর করে দিয়েছে সরকার।

২০ জুন দ্বিতীয় দফায় আরও ৫৩ হাজার ৩৪০ ভূমিহীন-গৃহহীন পরিবারকে ঘর উপহার দেয়া হয়।

উপহারের ঘরের প্রতিটিতে রয়েছে দুটি করে শয়নকক্ষ, একটি রান্নাঘর, একটি টয়লেট ও একটি লম্বা বারান্দা। ঘরের নকশা পছন্দ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই।

প্রতিটি বাড়ির নির্মাণে খরচ হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে এ প্রকল্পে খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৩৬ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।

তবে সাম্প্রতিক সময়ে বর্ষার কারণে কয়েকটি এলাকায় এ উপহারের ঘর ভেঙে গিয়েছে। কোথাও কোথাও ঘরের নিচের মাটি সরে গিয়েছে। ঘরের নির্মাণকর্মের মান নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে।

বরাদ্দ টাকায় কি এমন ঘর সম্ভব?
বগুড়ার শেরপুরে ক্ষতিগ্রস্ত উপহারের ঘর। ছবি: নিউজবাংলা

বাড়ি নির্মাণে ত্রুটির বিষয়টি সামনে এলে নড়েচড়ে বসেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। এরই মধ্যে দায়িত্বে অবহেলার জন্য ৫ সরকারি কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে চলছে তদন্তও। গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের কর্মকর্তারা মাঠে নামেন।

প্রকল্পের প্রধান মাহবুব হোসেন বলেছেন, অবহেলা ও অনিয়মের কারণে ধসে পড়ার ঘটনা ঘটেনি। মেরামত করলেই ঘরগুলো থাকার উপযোগী হবে।

তবে দেশের স্থপতিবিদদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেন, এত কম বাজেটে বাংলাদেশের সব স্থানে একই মডেলের ঘর তোলা সম্ভব নয়। কারণ সব জায়গার মাটি একরকম নয়। ঘরের যে নকশা দেয়া হয়েছে, তা টেকসই ও সম্পূর্ণ করতে দরকার আরও বাজেট।

স্থপতি ইকবাল হাবিব নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে তিনটি বিষয় কাজ করছে। প্রথমত, বাংলাদেশে ভূমিরূপ হচ্ছে পাঁচ রকমের। হবিগঞ্জের ভূমিরূপ আপনি কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে পাবেন না। আবার ঢাকার ভূমিরূপ দিনাজপুরে পাওয়া যাবে না। সেখানে পাথুরে ভূমি।’

স্থপতি ইকবাল হাবিব আরও বলেন, ‘যে জমিতে ঘর বানানো হয়েছে, সেগুলো সব খাস জমি। যেগুলোর সয়েল কন্ডিশন ভালো থাকার কথা না। তার মানে এটাকে আপনি একটা ইউনিফর্ম মডেল বলতে পারবেন না। সারা দেশে যদি আপনি একই মডেল করেন, তবে সেটা সম্ভব না। টেকসই হতে পারে না।’

এটি স্থাপত্য ও প্রকৌশল বিদ্যার প্রতিফলন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এটা আপনি খেয়ালখুশিমতো তৈরি করলে হবে না। যদিও সরকার বলছে তারা কারিগরি ম্যানুয়াল তৈরি করেছিল।’

তিনি বলেন, ‘আমাকেও আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক তার নির্বাচনি এলাকা সিংড়ার জন্য বরাদ্দ ঘরের ছবি পাঠিয়ে আমাকে বলেছিলেন, সেটি ঠিক করে দিতে। আমি এক দিন পরে তাকে ফোন করে বলি, এটা তো এই বাজেটে হবেই না। এটার যে কাঠামো, তার জন্য বেজ নেই। ভূমির সাথে যে পতিত হওয়া, সেটা সম্ভব না। স্ট্রাকচার দেখেই আমি বুঝেছি এটা আলগা।’

ইকবাল হাবিব আরও বলেন, ‘আমি পরিষ্কার ভাষায় তাকে জানিয়েছিলাম, এই নকশাতে ঘর করতে হলে সাড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৪ লাখ টাকা লাগবে।’

ইকবাল হাবিবের মতে, যথোপযুক্ত আর্থিক ও কারিগরি বিশ্লেষণের অভাব, প্রকল্প বাস্তবায়নে তাড়াহুড়ো এবং সরকারের কোনো কোনো স্তরে তোষামোদ ও লোকরঞ্জনের জন্য অনেক কম খরচ দেখিয়ে প্রকল্পকে বাস্তবায়নযোগ্য বানানোর অপচেষ্টা করা হয়েছে।

বরাদ্দ টাকায় কি এমন ঘর সম্ভব?

অল্প বৃষ্টিতেই মাটি সরে ভেঙে পড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। ছবি: নিউজবাংলা

তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ মনে করেন, এ বাজেটে এ রকম বাড়ি তৈরি অসম্ভব নয়।

প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দকৃত ঘর দুই শতক জায়গার ওপর তৈরি হয়েছে। ঘরের আয়তন ৩৯৪ বর্গফুট। খরচ ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতি বর্গফুটে খরচ ধরা হয়েছে ৪৩৪ টাকা করে।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বাড়ি ৩৯৪ বর্গফুটের হলে এটা হয়ে যাওয়ার কথা। এখানে জায়গার দাম প্রযোজ্য না। কারণ এটি খাস জমিতে হয়েছে। তার মানে এটি হয়ে যাওয়ার কথা এই টাকায়।’

তিনি ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, ‘এখানে তো দামি কোনো ফিটিংস দেয়া হবে না। নরমাল ফিটিংস দেয়া হবে।’

সে ক্ষেত্রে কিছু ভবন ধসে পড়া বা ভেঙে পড়ার কারণ কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা নির্মাণকাজের মানের জন্যে হতে পারে। এখানে ঘরের জন্য ছোট ছোট কলাম আছে, যেগুলোর কংক্রিট ঠিকমতো দেয়া হয়নি। রড ঠিকমতো দেয়া হয়নি। তিন-চারটা গ্রেড বিম আছে। সেটাও ঠিকমতো করা হয়নি।’

তিনি বলেন, ‘ছবি দেখে মনে হয়েছে, এই তিনটা জিনিস ফেইল করেছে। গ্রেড বিমটা বসে যাওয়ায় দেয়ালে ফাটল চলে এসেছে। নির্মাণকাজের মান খারাপ হওয়ার জন্যই এটা হয়েছে। এখানে ডিজাইনে কোনো সমস্যা নেই।

‘‌যারা ডিজাইন করেছেন, তারা হিসাব করেই দেবেন। একটা ডিজাইনে তো অনেকগুলো হবে। তাই এখানে না বুঝে দেয়ার কথা না। যারা বাস্তবায়ন করেছেন, সেখানে যদি মান ঠিক না হয়, তবে ধসে পড়বে।’

মাটির সমস্যাও থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। বলেন, ‘কোথাও কোথাও মাটি খুব খারাপ হয়ে যেতে পারে। ডিজাইনটা হয়তো সাইট স্পেসিফিক হয়নি। যে জায়গার মাটি খারাপ, সেখানে দেবে যেতে পারে। আর একদিকে দেবে গেলে বিম, কলাম, দেয়াল সবকিছুতে ফাটল দেখা দেবে।’

বরাদ্দ টাকায় কি এমন ঘর সম্ভব?
দেশের বিভিন্ন জায়গায় উপহারের ঘরে দেখা গেছে ফাটল। ছবি: সংগৃহীত

এই বিষয়ে জানার জন্য আশ্রয়ণ প্রকল্প-২-এর প্রকল্প পরিচালক মাহাবুব হেসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি। তাকে একাধিকবার ফোন করা হয় ও খুদেবার্তা পাঠানো হয়।

উপহারের ঘর নির্মাণে অনিয়ম খতিয়ে দেখতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে যে পাঁচটি অনুসন্ধান দল করে দেয়া হয়েছে, তার একটির নেতৃত্বে আছেন এই ঘর নির্মাণ প্রকল্পের প্রকল্প কর্মকর্তা।

প্রথম দিন মুন্সিগঞ্জের পর দ্বিতীয় দিন তার নেতৃত্বাধীন দলটি যায় বগুড়ায়। সেখানে সদর, শেরপুর ও শাহজাহানপুরে যাওয়ার কথা আগে জানানো হলেও দলটি যায় কেবল শেরপুরের খানপুর ও সীমাবাড়িতে।

এর মধ্যে খানপুর পরিদর্শন করে মাহবুব হোসেন বলেন, ‘এসব ঘর অবহেলা ও অনিয়মের কারণে ভেঙে পড়েনি। ভূমিধসের কারণে পাকঘর ও টয়লেট ধসে পড়েছে। এগুলো টেকসই করতে আরসিসি পিলার দিয়েও রক্ষা করা যায়নি।’

আরও পড়ুন:
উপহারের ৮ ঘর ফিরিয়ে আবার গৃহহীন
ঘর ভেঙে ভাইরাল হওয়া সেই কিশোরীর পাল্টা অভিযোগ
তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রে শ্রমিক-নিরাপত্তাকর্মী সংঘর্ষে আহত ৩
উপহারের নির্মাণাধীন ঘর ভাঙচুরের অভিযোগ 
ধসে পড়ছে দেখেও প্রতিনিধি দলের মূল্যায়ন, ‘অনিয়ম হয়নি’

শেয়ার করুন

মন্তব্য