ডলির স্কুল কি বাঁচবে?

করোনায় বন্ধ হয়ে গেছে রাজধানীর আদাবরের গ্রীন লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। ছবি: নিউজবাংলা

ডলির স্কুল কি বাঁচবে?

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা শুরু করতেই হতাশার সুরে ডলি বলেন, ‘সমাজের লাজলজ্জা ভুলে নিরুপায় হয়ে এই দোকান দিয়েছি। করোনার মধ্যে স্কুল চালাতে ৩০ লাখ টাকা ঋণ করেছি। প্রতি মাসে এক লাখ টাকা করে ঋণ বাড়ছে। মাথার উপর এই দেনা নিয়েই বেঁচে আছি। টাকার অভাবে ছেলেকে আর ভার্সিটিতে পড়াতে পারছি না। মেয়েরও লেখাপড়া বন্ধ। সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছি না।’

‘এই খেলনার দোকান থেকে যা আয় করি সেটা দিয়ে কোনো রকমে পেট চালাই। কিন্তু স্কুলের ভাড়া দিতে পারি না। প্রতি মাসে স্কুলের ভবন ভাড়া বাকি রাখি। কিন্তু বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল, গ্যাস বিল দিতে হয়। ধারদেনা করে এত দিন চালিয়ে এসেছি, এখন আর পারছি না। আর কিছু দিন দেখব, তারপর সব ছেড়ে চলে যাওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’

কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আদাবরের গ্রীন লিফ ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রধান শিক্ষক নুর আক্তার ডলি, যে প্রতিষ্ঠান গত ১১ বছরের পরিশ্রম দিয়ে প্রতিষ্ঠা করেছেন তিনি ও তার স্বামী।

করোনার কারণে গত বছরের মার্চ মাসে স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার একপর্যায়ে জীবন চালাতে সেই স্কুলের গেটের মুখেই বাচ্চাদের প্লাস্টিকের খেলনার দোকান সাজিয়ে বসেছেন নুর আক্তার ডলি। করোনার আগে যে ফটক মুখর থাকত ছাত্র-ছাত্রীর পদচারণে।

গত রোববার দুপুর ১২টায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, দোকানে কোনো ক্রেতা নেই। বিক্রেতার চেয়ারে অনেকটা বিমর্ষ হয়ে বসে আছেন গ্রীন লিফ ইন্টারন্যাশলান স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক নুর আক্তার ডলি।

সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে কথা শুরু করতেই হতাশার সুরে ডলি বলেন, ‘সমাজের লাজলজ্জা ভুলে নিরুপায় হয়ে এই দোকান দিয়েছি। করোনার মধ্যে স্কুল চালাতে ৩০ লাখ টাকা ঋণ করেছি। প্রতি মাসে এক লাখ টাকা করে ঋণ বাড়ছে। মাথার উপর এই দেনা নিয়েই বেঁচে আছি। টাকার অভাবে ছেলেকে আর ভার্সিটিতে পড়াতে পারছি না। মেয়েরও লেখাপড়া বন্ধ। সামনে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখতে পারছি না।’

আদাবর এলাকার বায়তুল আমান হাউজিংয়ে ২০০৯ সালে এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন নুর আক্তার ডলি ও তার স্বামী। করোনার আগে চারশর বেশি ছাত্র-ছাত্রী আর ২৬ জন শিক্ষক ও চারজন কর্মচারী নিয়ে বেশ ভালোই চলছিল প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু করোনাঝড়ে ১৪ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে তাদের স্বপ্নের এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

নিউজবাংলাকে নুর আক্তার ডলি জানান, স্কুল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বেতন দিতে না পারায় বেশ কয়েকজন শিক্ষক ঢাকা ছেড়ে গ্রামের বাড়ি চলে গেছেন। কেউ কেউ টিউশনি করে সংসার চালাচ্ছেন। স্কুলভবনে সপরিবারে বসবাস করছেন তিনজন শিক্ষক। তিনি নিজে পরিবার নিয়ে থাকছেন স্কুলসংলগ্ন একটি ভবনের ফ্ল্যাটে।

তিনি জানান, স্কুল বন্ধ থাকলেও জীবন তো আর থেমে থাকে না। তাই জীবন চালাতে এখন নিজের স্কুলের গেটের মুখেই বাচ্চাদের খেলনার দোকান সাজিয়ে বসেছেন।

ডলির স্কুল কি বাঁচবে?
স্কুলের গেটেই খেলনার দোকান দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক নুর আক্তার ডলি

ডলি বলেন, ‘আমার এক ছেলে এক মেয়ে। বড় ছেলে বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অফ ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজিতে টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ৩য় সেমিস্টারে পড়ত।

‘টাকার অভাবে ফি দিতে পারি না, তাই তার পড়ালেখা এখন বন্ধ। মেয়েটা ছোট। ও আমার স্কুলেই পড়ত। স্কুল বন্ধ থাকায় তার পড়ালেখাও এখন বন্ধ। জীবনকে খুব কাছ থেকে দেখছি। এমন পরিস্থিতিতে পড়ব সেটা আগে কখনো ভাবিনি। তবে আমার নিকট আত্মীয়রা একটু সাহায্য করছে বলে এখনো দুবেলা খেয়ে বেঁচে আছি।’

তিনি জানান, ভবনটির মাসিক ভাড়া ৭৫ হাজার টাকা। আর বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস বিল বাবদ মাসে আসে আরও ২৫ হাজার টাকা।

‘প্রতি মাসে আমাদের খরচ এক লাখ টাকা। বাড়িওয়ালা কিছুদিন হলো ভবন ভাড়া বাকি রাখতে রাজি হয়েছেন। স্কুল খুললে শোধ করে দেব। সব মিলিয়ে গত ১৪ মাসে আমাদের দেনা ৩০ লাখ টাকা। যেটা আত্মীয়স্বজনসহ অন্যান্য জায়গা থেকে ধার করেছি। আর প্রতি মাসেই ভবন ভাড়া ও অন্যান্য খরচ বাবদ এক লাখ টাকার দেনা যোগ হচ্ছে’, বলেন তিনি।

এই প্রধান শিক্ষক আরও বলেন, ‘বেতন দিতে পারি না, তাই এখানকার কিছু শিক্ষক গ্রামে চলে গেছেন। আর কিছু শিক্ষক আছেন। যারা আছেন তারাও তাদের বাড়িভাড়া দিতে পারেন না। তাই কয়েকজন শিক্ষক ও তাদের পরিবারসহ স্কুলের কয়েকটি কক্ষের আসবাব সরিয়ে তাদের থাকার ব্যবস্থা করেছি।’

ডলি বলেন, ‘এখন যদি সরকার আমাদের স্কুল খুলে দেয় তাহলে বাঁচার একটু আশা থাকবে। না হলে সব শেষ হয়ে যাবে। আমরা তো কোনো প্রণোদনাও পাচ্ছি না।

‘কিছুদিন আগে শিক্ষা অফিস থেকে একজন এসেছিলেন। যখন জানলেন এটা এমপিওভুক্ত বা সরকারের তালিকাভুক্ত কোনো স্কুল না, তখন জানালেন আমরা সরকারের কোনো সাহায্য পাব না।’

খেলনার দোকান কেমন চলছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নারে ভাই, বেচাবিক্রি নাই। মানুষ এখন বেঁচে থাকার জন্য খাবার কেনে, খেলনা কেনে না। যেটুকু বিক্রি হয় সেটা দিয়ে কোনো রকমে পেট চলে। এভাবে আর কয়েক মাস চলতে পারব। তারপর সব ছেড়ে দিয়ে চলে যাব ভাবছি।’

নুর আক্তার ডলির মতো অবস্থা এখন আরও অনেক শিক্ষকের। তাদের দিন কাটছে চরম অনিশ্চয়তায়।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যান্ড কলেজ ঐক্য পরিষদের তথ্যমতে, সারা দেশে প্রায় ৬০ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুলে এক কোটি ছাত্র-ছাত্রী রয়েছে। তাদের পড়াশোনা করাতেন ১০ লাখ শিক্ষক; যার মধ্যে ২০ শতাংশ স্থায়ীভাবে পেশা বদল করে অন্য পেশায় চলে গেছেন। আর বাকি ৮০ শতাংশের অনেকে এখন সাময়িকভাবে অন্য পেশা গ্রহণ করে কোনো রকমে দিন পার করছেন।

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

কাঠের আসবাবে চলছে সংসার

কাঠের আসবাবে চলছে সংসার

পিরোজপুরে এক দশকে বেড়েছে কাঠের আসবাবপত্রের চাহিদা। ছবি: নিউজবাংলা

চমৎকার এসব কাঠের আসবাব তৈরি করে যেমন বেকারত্ব দূর হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে কর্মসংস্থান। তবে আসবাবপত্রের দোকানমালিকরা বলছেন, চাহিদা থাকলেও ঠিকমতো মুনাফা করতে পারছেন না তারা।

পিরোজপুরে এক দশকে বেড়েছে কাঠের আসবাবপত্রের চাহিদা। এই শিল্পে কাজ করে সংসার চলছে জেলার শত শত মানুষের।

জেলার বিভিন্ন জায়গায় নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে কাঠের খাট, শো-কেস, ওয়্যারড্রব, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল, চেয়ার-টেবিলসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র।

চমৎকার এসব কাঠের আসবাব তৈরি করে যেমন বেকারত্ব দূর হচ্ছে, তেমনি বাড়ছে কর্মসংস্থান। তবে আসবাবপত্রের দোকানমালিকরা বলছেন, চাহিদা থাকলেও ঠিকমতো মুনাফা করতে পারছেন না তারা।

শহর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে উকিলপাড়া বা কাঁচাবাজার। এখানে দেখা মেলে সারি সারি সেগুন কাঠের আসবাব আলমারি, সোফা, আলনা, ড্রেসিং টেবিল, ডাইনিং টেবিল-চেয়ারে সাজানো দোকানগুলোর।

দোকানের পেছনেই রয়েছে আসবাস তৈরির কারখানা। বছর জুড়েই চলে আসবাব তৈরির কাজ। কারখানাগুলোতে দিনভর চলে হাতুড়ি কিংবা করাত দিয়ে কাঠ কাটার শব্দ।

পদ্মা ফার্নিচারের স্বত্বাধিকারী প্রিন্স দেউড়ী বলেন, ‘আমাদের এই বাজারে সেগুন কাঠের ফার্নিচারের চাহিদা বেশি। শতভাগ সেগুন কাঠের ফার্নিচার তৈরি হয় আমার কারখানায়।’

কাঠের আসবাবে চলছে সংসার

তিনি জানান, সেগুন কাঠের জোগান আসে সুন্দরবন ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে। জোত পারমিট ও বন বিভাগের নিলাম ডাকের মাধ্যমে কাঠ সংগ্রহ করা হয়। এছাড়াও জেলার সবচেয়ে বড় গাছ কেনাবেচার হাট স্বরুপকাঠি থেকেও বিভিন্ন জাতের গাছ সংগ্রহ করা হয়। এরপর তৈরি করা হয় ক্রেতাদের পছন্দের মতো আসবাব।

প্রিন্স দেউড়ী জানান, স্থানীয় ক্রেতাদের চেয়ে বেশি ক্রেতা ঢাকা কিংবা দেশের বিভিন্ন জেলার মানুষ। আসবাব তৈরির পর বিভিন্ন পরিবহনে ক্রেতার ঠিকানায় পাঠিয়ে দেয়া হয়।

শুধু শহরে নয়, এভাবে কাঠের তৈরি শত শত কারখানা গড়ে উঠেছে পুরো জেলায়। তবে উপজেলা পর্যায়ের আসবাবের দোকান ও জেলা শহরের আসবাবের দোকানের মধ্যে মূল পার্থক্য হলো দামের।

কাঠের আসবাবে চলছে সংসার

জেলা শহরে প্রতি ঘনফুট সেগুন কাঠের দাম পড়ে মানভেদে ১৫০০-৩৫০০ টাকা। আর উপজেলা পর্যায়ে ১২০০-২৬০০ টাকায় একই মানের সেগুন কাঠ পাওয়া যায়। এ কারণে ক্রেতারা গ্রামপর্যায়ের দোকান থেকে বেশি আসবাব সংগ্রহ করেন।

কাঠমিস্ত্রি প্রিন্স দেউড়ী আরও জানান, কাঠ ও রঙের দাম বেশি হওয়ায় আসবাবপত্র বিক্রি করে ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না তারা। শহরে বিভিন্ন স্থান থেকে নিম্নমানের আসবাবও বাজারে আসায় দাম দিয়ে কিনছেন না ক্রেতারা। তাই তাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘স্বল্প সুদে সরকারি সহায়তা পেলে এই শিল্প বাঁচতে পারে।’

কাঠশিল্পের সংগঠন শ্রমিক ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, জেলায় ছোট-বড় কমপক্ষে ৪৩২টি কাঠের আসবাব তৈরির কারখানা গড়ে উঠেছে। এসব আসবাবপত্রে দারুণ কাজ ও নকশা থাকায় দ্রুত বাড়ছে আসবাবপত্রের কদর।

কাঠের আসবাবে চলছে সংসার

কাঠ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে গঠন হয়েছে পিরোজপুর কাঠশিল্প শ্রমিক ইউনিয়ন।

সংগঠনটির সভাপতি আশিষ দাস বলেন, ‘কাঠ শ্রমিকদের অধিকার আদায়ে আমরা সব সময় কাছ করছি। সরকারের কাছে আমাদের শ্রমিক ইউনিয়নের দাবি বাইরের নিম্নমানের আসবাব যেন কেউ বিক্রি করতে না পারে। তাহলে আমরা বাঁচবো, শ্রমিক বাঁচবে।’

জেলা প্রশাসক আবু আলী মো. সাজ্জাদ হোসেন বলেন, ‘জেলায় কাঠশিল্পের দোকানগুলোর তালিকা করা হচ্ছে। স্বল্প সুদে শ্রমিকদের ব্যাংক ও এনজিওগুলো আর্থিক সহযোগিতা করবে এমন নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।’

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন

ব্যান্ড কাকতাল: জেলখানায় জন্ম যার

ব্যান্ড কাকতাল: জেলখানায় জন্ম যার

একই সঙ্গে মজার এবং নির্মম বিষয় হলো, ব্যান্ডটির কোনো লাইনআপ নেই। কারণ, ব্যান্ড-সদস্যদের অনেকেই কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যান বা অন্য কোনো কারাগারে চলে যান। আবার অনেকেই নতুন করে যুক্ত হন ব্যান্ডে। এভাবেই লাইনআপ ছাড়া চলছে ব্যান্ডটি।

ডিসেম্বর, ২০১৮…

ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার কর্তৃপক্ষ কয়েদিদের জন্য কয়েকটি বাদ্যযন্ত্র নিয়ে আসে। যার মধ্যে ছিল একটি অ্যাকোয়েস্টিক গিটার, এক জোড়া তবলা, একটি হারমোনিয়াম, একটি বাঁশি এবং একটি টাম্বুরিন। উদ্দেশ্য, কয়েদিদের সৃজনশীল কাজে যুক্ত করা। কেউ নিশ্চিত ছিলেন না, এর ফল কী হতে যাচ্ছে।

তিন বছর পর…

একটি অ্যাকোয়েস্টিক গিটারের জায়গায় এখন চারটি অ্যাকোয়েস্টিক গিটার। আর হারমোনিয়াম তিনটি, বাঁশি পাঁচটি। এসেছে একটি বৈদ্যুতিক কি-বোর্ড ও একটি ড্রাম প্যাড। রেকর্ডিংয়ের জন্য এখন একটি মাইকও আছে। আছে একটি এমিপ্লিফায়ার ও এক জোড়া স্পিকার।

ব্যান্ডের জন্ম…

সবাইকে অবাক করে দিয়ে একটি অসাধারণ ফল বেরিয়ে এসেছে এই উদ্যোগ থেকে। জন্ম নিয়েছে একটি ব্যান্ড। তার নাম ‘কাকতাল’। ব্যান্ডের সদস্যরা সবাই কারাবন্দি এবং এদের কেউই পেশাদার ছিলেন না। ফেলে আসা জীবনের কিছু অংশে তারা সংগীতে আগ্রহী ছিলেন।

ব্যান্ডটির এখন ইউটিউব চ্যানেল আছে। সেখানে গানও রয়েছে অনেকগুলো। সব কটি গানের কথা ও সুর করেছে কাকতাল ব্যান্ডের সদস্যরা।

ব্যান্ড সদস্য…

গোলাপ শাহীন (ভোকাল), আরমান (ভোকাল/গিটার), তরঙ্গ জোসেফ কস্তা (গিটার), প্রান্ত (ভোকাল/কী-বোর্ড), কাজল (ভোকাল/গিটার), মামুন (হারমনিয়াম), নাসির (তবলা), দেলোয়ার (বাঁশি/কি-বোর্ড), তারিফ (বাঁশি), জীবন (ভোকাল), পারভেজ (ড্রাম প্যাড/ভোকাল), জয়দেব (ভোকাল/ড্রাম প্যাড), সাদি (গিটার), রুমাত (গিটার/ভোকাল), আসিফ (গিটার/ভোকাল)।
ব্যান্ড কাকতাল: জেলখানায় জন্ম যার

এরা ছাড়াও অনেকেই তাদের সৃজনশীলতা এবং মেধা দিয়ে এই ব্যান্ডকে সমৃদ্ধ করেছেন। তবে ‘কাকতাল’ প্রতিষ্ঠায় যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন আসিফ ইকবাল। তিনিও কারাবন্দি।

একই সঙ্গে মজার এবং নির্মম বিষয় হলো, ব্যান্ডটির কোনো লাইনআপ নেই। কারণ, ব্যান্ড-সদস্যদের অনেকেই কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে যান বা অন্য কোনো কারাগারে চলে যান। আবার অনেকেই নতুন করে যুক্ত হন ব্যান্ডে। এভাবেই লাইনআপ ছাড়া চলছে ব্যান্ডটি।

ইউটিউবে ‘ঢাকা সেন্ট্রাল জেল, কেরানীগঞ্জ’ নামের ইউটিউব চ্যানেলে চর্কি নামের একটি গান রয়েছে। সেই গানের ডিটেইলে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

বিষয়টি যাচাই করতে নিউজবাংলা কথা বলে সংগীতশিল্পী পিন্টু ঘোষের সঙ্গে। তিনি চলতি বছরের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন।

নিউজবাংলাকে পিন্টু ঘোষ বলেন, ‘হ্যাঁ। সেখানে একটি ব্যান্ড রয়েছে, যার নাম কাকতাল। ব্যান্ডের সবাই কারাবন্দি। তাদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। আমি মুগ্ধ তাদের সঙ্গে কথা বলে। সবচেয়ে যে জিনিসটি ভালো লেগেছে সেটা হলো, জীবন নিয়ে তাদের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি।’

পিন্টু ঘোষ আরও বলেন, ‘কারাগারে অনেক মেধাবীও আছেন কিন্তু। তাদের লেখা গান বা সুর শুনলে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই। এটা বন্দিরাও বলে যে, ভালো চিন্তা করলে ভালো কিছু করা যায়। তাদের ইচ্ছা, কারগার থেকে বের হয়ে কাজ করবেন, পরিশ্রম করে জীবন সাজাবেন।’

পিন্টু ঘোষ জানান, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানের জন্য সে-ই একদিনই কারাগারে গিয়েছিলেন তিনি। অনুষ্ঠানের পর কিছু কথা হয়েছে কারাবন্দিদের সঙ্গে। আয়োজন দেখে ভালো লেগেছে তার।

বিষয়টি জানতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার (ভারপ্রাপ্ত) সুভাষ কুমার ঘোষের সঙ্গেও কথা বলে নিউজবাংলা।

সুভাষ কুমার ঘোষ নিউজবাংলাকে ব্যান্ডের বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য না দিতে পারলেও কেন্দ্রীয় কারাগারে সৃজনশীল ও সাংস্কৃতিক কাজের বেশ কিছু তথ্য দেন।

সুভাষ কুমার বলেন, ‘আমি এখানে ৯ মাস হলো জয়েন করেছি। তার আগে থেকেই কারাগারে সাংস্কৃতিক কাজ হয়ে আসছিল। যারা সংগীতের যে জায়গায় ভালো, তারা সেই কাজটি করে। কারাগারে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বাইরের শিল্পীদের পাশাপাশি কয়েদিদেরও গানসহ অন্যান্য মননশীল কাজে যুক্ত করার সুযোগ দেয়া হয়।’

সুভাষ কুমার ঘোষ আরও বলেন, ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে মননচর্চা কেন্দ্র বলে একটি জায়গা রয়েছে। যারা সৃজনশীল কাজে আগ্রহী, তারা সেখানে গিয়ে তাদের সেই কাজগুলোর বিকাশ করতে পারে।’

সুভাষ কুমার জানান, দেশের অন্যান্য কারাগারের তুলনায় ঢাকায়ই এই কাজগুলো বেশি হয়। কারণ, এখানে কাজের পরিধি বেশি, জায়গাও বড়, কয়েদির সংখ্যাও বেশি।

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন

স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার অবনতিতে ধুঁকছে ঢাকা

স্বাস্থ্য, সংস্কৃতি ও শিক্ষার অবনতিতে ধুঁকছে ঢাকা

ইআইইউ বলছে, ঢাকায় স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ এবং শিক্ষা মানের অবনতি হয়েছে। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা

ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) দুটি বছরের তালিকার তুলনা করলে দেখা যায়, স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো ছাড়া প্রতিটি মানদণ্ডেই ঢাকার পরিবেশের অবনতি ঘটেছে। অবনতি ঘটা মানদণ্ডগুলো হলো, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ এবং শিক্ষা। এর ফলে সামগ্রিকভাবে ‘বসবাসযোগ্য শহর’ এর তালিকায় ঢাকার অবস্থান এবার ১৩৭।

বিশ্বে বসবাসযোগ্য ১৪০টি শহরের যে তালিকা প্রকাশ করেছে ইকনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (ইআইইউ), সেটি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে দুই বছরের ব্যবধানে ঢাকায় স্থিতিশীলতা এবং অবকাঠামোগত সেবা অপরিবর্তিত আছে। বাকি সব মানদণ্ডেই অবনতি ঘটেছে এই শহরের।

অবনতি ঘটা মানদণ্ডগুলো হলো, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ এবং শিক্ষা। এর ফলে সামগ্রিকভাবে ‘বসবাসযোগ্য শহর’ এর তালিকায় ঢাকার অবস্থান এবার ১৩৭।

ঢাকার নিচে রয়েছে পাপুয়া নিউগিনির পোর্ট মোর্সবি, নাইজেরিয়ার লাগোস ও সবশেষে সিরিয়ার দামেস্ক।

ইআইইউর বুধবার প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, বসবাসযোগ্য শহরের তালিকায় শীর্ষ অবস্থানে আছে নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর অকল্যান্ড। এর পরের অবস্থানে জাপানের ওসাকা। তৃতীয় অবস্থানে আছে অস্ট্রেলিয়ার অ্যাডিলেড।

কয়েকটি মানদণ্ডের ভিত্তিতে 'দ্য গ্লোবাল লিভাবিলিটি ইনডেক্স ২০২১' প্রকাশ করেছে ইআইইউ। এগুলো হলো স্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা, সংস্কৃতি ও পরিবেশ, শিক্ষা এবং অবকাঠামো।

সূচকে এবার ১৩৭ নম্বরে থাকা ঢাকার মোট পয়েন্ট ৩৩.৫। মানদণ্ডগুলোর মধ্যে স্থিতিশীলতায় ঢাকা পেয়েছে ৫৫ পয়েন্ট। অন্যদিকে স্বাস্থ্যে ১৬.৭, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৩০.৮, শিক্ষায় ৩৩.৩ ও অবকাঠামোতে ২৬.৮ পয়েন্ট পেয়েছে বাংলাদেশের রাজধানী।

২০১৯ সালে এ তালিকার ১৩৮ নম্বরে ছিল ঢাকা, তার আগের বছর বাংলাদেশের রাজধানী তালিকার ১৩৯ নম্বরে। করোনাভাইরাস মহামারির কারণে গত বছর কোনো তালিকা প্রকাশ করেনি ইআইইউ।

২০১৯ সালের তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেবার ঢাকার সামগ্রিক পয়েন্ট ছিল ৩৯.২। মানদণ্ডগুলোর মধ্যে স্থিতিশীলতায় ঢাকা পেয়েছিল ৫৫ পয়েন্ট। অন্যদিকে স্বাস্থ্যে ২৯.২, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৪০.৫, শিক্ষায় ৪১.৭ ও অবকাঠামোতে ছিল ২৬.৮ পয়েন্ট। দুটি বছরের তুলনা করলে দেখা যায় স্থিতিশীলতা ও অবকাঠামো ছাড়া প্রতিটি মানদণ্ডেই ঢাকার পরিবেশের অবনতি ঘটেছে।

এবারের তালিকায় বাসযোগ্য শহরের শীর্ষে থাকা অকল্যান্ডের পয়েন্ট ৯৬। শহরটি স্থিতিশীলতায় ৯৫, স্বাস্থ্যসেবায় ৯৫.৮, সংস্কৃতি ও পরিবেশে ৯৭.৯, শিক্ষায় ১০০ ও অবকাঠামোতে ৯২.৯ পয়েন্ট পেয়েছে।

ইআইইউ বলছে, করোনাভাইরাস মহামারিতে স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা দিতে শহরগুলো কতটা সক্ষম ছিল, সেটি জরিপে এবার অনেক বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

তালিকার শীর্ষে থাকা নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড শহর কোভিড ১৯ এর ধাক্কা অল্প সময়ের মধ্যেই সামলে নিয়েছে এবং এই শহরের জীবনযাত্রা প্রায় স্বাভাবিক।

করোনা মোকাবিলায় নিউজিল্যান্ডের কৌশলের প্রশংসা করে ইআইইউ বলছে, করোনা মাহামারির শুরুতেই সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া এবং আক্রান্তের সংখ্যা কমতে থাকায় দেশটি প্রেক্ষাগৃহ, রেস্তোঁরা এবং অন্যান্য সাংস্কৃতিক আকর্ষণ উন্মুক্ত রাখতে সক্ষম হয়।

অকল্যান্ডে শিক্ষার্থীরা শতভাগ স্কুলে যেতে পারায় শহরটি শিক্ষা সূচকে ১০০ স্কোর পেয়েছে। এর ফলে অকল্যান্ড তার আগের ষষ্ঠ অবস্থান থেকে তালিকার প্রথমে উঠে গেছে। একই কারণে নিউজিল্যান্ডের রাজধানী ওয়েলিংটনও আগের ১৫তম অবস্থান থেকে চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে।

আর জোরাল স্থিতিশীল পরিবেশের কারণে জাপানি শহর ওসাকা ও টোকিও যথাক্রমে দ্বিতীয় এবং চতুর্থ স্থান পেয়েছে।

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন

লাচ্ছির নাম ‘এলাহীর শরবত’

লাচ্ছির নাম ‘এলাহীর শরবত’

এলাহী তালুকদারের লাচ্ছির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে মাদারীপুরজুড়ে। ছবি: নিউজবাংলা

গরুর দুধ, পেঁপে, কলা, দই, চিনি আর বরফ দিয়ে লাচ্ছি বানান মাদারীপুরের এলাহী তালুকদার। ক্রেতাদের কাছে দাম রাখেন ৩০ টাকা। লাচ্ছি বিক্রি করেই মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয় এলাহীর। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে আগের দোকানের পাশেই নতুন আরেকটি দোকান করেছেন তিনি।

অভাব-অনটনের কারণে ৩০ বছর আগে ভিটেমাটি ছেড়ে শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ থেকে মাদারীপুরে শিবচরে আসেন এলাহী তালুকদার। জীবিকার তাগিদে ফেরি করে আচার বিক্রি শুরু করেন তিনি।

১৩ বছর আচার বিক্রির পর ২০০৪ সালে শিবচর বাজারের সিনেমা হল এলাকায় একটি শরবতের দোকান দেন এলাহী। সেখানে এক ধরনের বিশেষ লাচ্ছি বানান তিনি। ‘এলাহীর শরবত’ নামে পরিচিত এই লাচ্ছিটির সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে মাদারীপুরজুড়ে।

গরুর দুধ, পেঁপে, কলা, দই, চিনি আর বরফ দিয়ে লাচ্ছি বানান এলাহী তালুকদার। ক্রেতাদের কাছে দাম রাখেন ৩০ টাকা। লাচ্ছি বিক্রি করেই মাসে প্রায় ৫০ হাজার টাকা আয় হয় এলাহীর। ক্রেতাদের চাহিদা মেটাতে আগের দোকানের পাশেই নতুন আরেকটি দোকান করেছেন তিনি।
লাচ্ছির নাম ‘এলাহীর শরবত’

প্রতিদিন সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত উপজেলার মাদবরের চর, বন্দরখোলা, সন্যাসীর চর, চান্দের চর এবং শেখপুর বাজার থেকে দুধ, কলা, পেঁপে, বেল, দেশি হাঁস-মুরগির ডিম সংগ্রহ করেন এলাহী তালুকদার।

বিকেল ৪টা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত দোকানে বসে ব্লান্ডারের সাহায্যে শরবত তৈরি করেন। শুধু শরবতই নয়, তার দুই দোকানে সিদ্ধ ডিম, পাউরুটি, দই চিড়াও বিক্রি হয়।

ব্যবসার চাপ বাড়ায় দুই দোকানে অতিরিক্ত চার কর্মচারীকে নিয়োগ দিয়েছেন তিনি। আগামীতে ব্যবসা আরও বাড়িয়ে সেখানে তিনি ফালুদা বিক্রি করবেন বলেও জানান এলাহী।

বিয়ে, জন্মদিন, নানা সামাজিক অনুষ্ঠানসহ রাষ্ট্রীয় নানা অনুষ্ঠানেও ডাক পড়তে শুরু করেছে এলাহীর শরবতের। তার তৈরি দইও এরই মধ্যে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছে শিবচরসহ শরীয়তপুরের জাজিরা, মাদারীপুর সদর ও ফরিদপুর জেলার ভাঙ্গা উপজেলার মানুষের কাছে।

এলাহী তালুকদারের দোকানে শরবত খেতে আসা মাদারীপুর সদরের কলাগাছীয়ার মনোজ তালুকদার বলেন, ‘প্রতিদিনই আমি এলাহী ভাইয়ের দোকানে আসি। কোনোদিন শরবত খাই আবার কোনো দিন দই চিড়া। এখানে গ্রামের খাঁটি জিনিস পাওয়া যায়। তাই রেগুলার আসি।’

৩০ বছর আগের সেই অভাব আর নেই এলাহী তালুকদারের। শিবচর পৌরসভার ডিসি রোড এলাকায় ছয় শতাংশ জমি কিনে গড়েছেন নতুন বসতি।

এলাহী বড় মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন। বড় ছেলে তার সঙ্গেই ব্যবসায়। ছোট ছেলে স্থানীয় একটি কলেজে ডিগ্রি (পাস) কোর্সে পড়ছেন।

এলাহী তালুকদার বলেন, ‘একসময় অনেক কষ্ট করছি। দাঁড়ায়া দাঁড়ায়া আচার বিক্রি করতাম।

‘কষ্ট করছি। তাই আজ ভালো আছি।’

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন

দেনায় ডুবছে বিমান

দেনায় ডুবছে বিমান

বেবিচক ও পদ্মা অয়েলের কাছে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বকেয়া ৬ হাজার কোটির বেশি। দীর্ঘদিন বকেয়া ফেলে রাখায় মাশুল বেড়ে টাকার অঙ্কও বেড়েছে। 

করোনাভাইরাসে এমনিতেই বিপর্যস্ত রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। তার ওপর চেপে বসেছে দেনার বোঝা।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) বিভিন্ন ফি ও পদ্মা অয়েলের কাছ থেকে জ্বালানি কেনা বাবদ প্রতিষ্ঠানটির বকেয়া ছাড়িয়েছে ৬ হাজার কোটি টাকা।

বেবিচক ও পদ্মা অয়েল বলছে, সম্প্রতি বিমান বকেয়া পরিশোধের উদ্যোগ নিলেও তা নিতান্তই কম।

বেবিচকের চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত এক হিসাবে দেখা যায়, দেশি এয়ারলাইনসগুলোর কাছে বিভিন্ন ফি বাবদ প্রতিষ্ঠানটির পাওনা ৫ হাজার ১৮৯ কোটি ৯৫ লাখ ৭৭ হাজার ৬৭৬ টাকা। এর মধ্যে বিমানের কাছেই প্রতিষ্ঠানটি পাবে ৪ হাজার ৩১৫ কোটি ১১ লাখ ৩১ হাজার ৭১৫ টাকা। অবশিষ্ট টাকা পাওনা আছে পাঁচ বেসরকারি এয়ারলাইনসের কাছে। এর মধ্যে তিনটির দীর্ঘদিন ধরে কোনো কার্যক্রম নেই।

চালু থাকা দুই বেসরকারি এয়ারলাইনস নভো এয়ার এবং ইউএস-বাংলার কাছে বেবিচকের পাওনা ২০ কোটি ১০ লাখ ৩৩ হাজার ২৪৭ টাকা। আর বন্ধ থাকা রিজেন্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার এবং জিএমজি এয়ারের কাছে বেবিচক পাবে ৮৫৪ কোটি ৭৪ লাখ তিন হাজার ৭১৪ টাকা।

সাধারণত দেশের বিভিন্ন বিমানবন্দর ও আকাশে উড্ডয়নের সময় রাডার ও নেভিগেশন সেবা, বিমানবন্দর ব্যবহার, বিমানবন্দরে পার্কিং ও হ্যাঙ্গার, উড়োজাহাজের নিরাপত্তা বিধানসহ এয়ারলাইনসগুলোকে বিভিন্ন সেবা দিয়ে থাকে বেবিচক। এ ধরনের অ্যারোনটিক্যাল ও নন-অ্যারোনটিক্যাল সেবার জন্য নির্দিষ্ট হারে মাশুল দিয়ে থাকে এয়ারলাইনসগুলো।

নির্দিষ্ট সময়ে মাশুল দিতে ব্যর্থ হলে এয়ারলাইনসকে দিতে হয় ৭২ শতাংশ সারচার্জ। বেবিচকের টাকা দীর্ঘদিন পরিশোধ না করায় চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়েছে বিমানের সারচার্জ।

মূল বকেয়া ৯২০ কোটি ১৬ লাখ ৮৮ হাজার ২৬৬ টাকা। চক্রবৃদ্ধি হারে এ টাকায় সারচার্জ এসেছে ৩ হাজার ১২৮ কোটি ২৪ লাখ ৭ হাজার ৫৮৪ টাকা।

বেবিচক চেয়ারম্যান এম মফিদুর রহমান নিউজবাংলাকে জানান, বিমান বকেয়া শোধের উদ্যোগ নিলেও সেটা নিতান্তই কম।

তিনি বলেন, ‘যে এয়ারলাইনসগুলো ফ্লাইটে আছে (যেমন: বিমান, তারপরে ইউএস-বাংলা এবং নভো এয়ার) অবশ্য টাকা দিয়ে যাচ্ছে ভালো। বিমানও দিচ্ছে। কিন্তু তাদের দেয়ার পরিমাণটা অনেক কম। আমরা তাদের কাছে যে পরিমাণ টাকা পাব, তার চেয়ে অনেক কম তারা দিচ্ছে।’

এদিকে এয়ারলাইনসের জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান পদ্মা অয়েলের কাছেও বিপুল পরিমাণে টাকা বাকি পড়েছে বিমানের।

পদ্মা অয়েল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিমানের কাছে এভিয়েশন ফুয়েল বা জেট ফুয়েলের দাম বাবদ প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা পাবে তারা।

পদ্মা অয়েলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদুর রহমান নিউজবাংলাকে জানান, সম্প্রতি কিস্তিতে পাওনা শোধ করা শুরু করেছে বিমান। তিনি বলেন, ‘বিমানের প্রায় ২ হাজার ১০০ কোটি টাকার মতো বাকি আছে। পাওনা দিতে তারাও চেষ্টা করছে। আপনারা তো জানেন তাদের অবস্থা। ফ্লাইট বন্ধ, আয় কমে গেছে।

‘তারপরেও তারা নতুনভাবে যেটা নিচ্ছে, সেগুলো তারা নিয়ম মেনেই পরিশোধ করছে। আর বকেয়া টাকা তারা কিস্তিতে শোধ করছে। তারা চেষ্টা করছে শোধ করার। তবে বিমান ছাড়া অন্য কোনো এয়ারলাইনসের কাছে কোনো বাকি নেই। অন্যরা সময়মতোই টাকা শোধ করেছে।’

করোনাভাইরাস সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ শুরুর পর থেকেই একের পর এক সংকুচিত হয়ে এসেছে বিমানের আকাশ। এর ফলে বহরে থাকা উড়োজাহাজগুলোর সক্ষমতার দুই-তৃতীয়াংশই ব্যবহার করতে পারছে না প্রতিষ্ঠানটি।

তার ওপর প্রতিনিয়তই উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও লিজের টাকা শোধ করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাদের। ফ্লাইট না চালিয়েও গুনতে হচ্ছে এয়ারপোর্ট পার্কিং ফিসহ সরকারের অন্যান্য মাশুল।

বিমানের বহরে বর্তমানে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে নিজস্ব ১৫টি আর ভাড়ায় আনা হয়েছে ছয়টি।

নিজস্ব উড়োজাহাজের মধ্যে আছে ছয়টি বোয়িং সেভেন এইট সেভেন ড্রিমলাইনার, চারটি ট্রিপল সেভেন, দুটি সেভেন থ্রি সেভেন ও তিনটি ড্যাশ এইট মডেলের উড়োজাহাজ। ভাড়ায় আনা উড়োজাহাজগুলোর মধ্যে চারটি সেভেন থ্রি সেভেন ও দুটি ড্যাশ এইট।

সংস্থার কর্তৃপক্ষ জানায়, করোনার আগে উড়োজাহাজের দৈনিক গড় ব্যবহার ছিল প্রায় ৯ ঘণ্টা। এখন তা দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬৯ ঘণ্টায়। আন-অডিটেড হিসাবে গত বছরের এপ্রিল থেকে এ বছরের এপ্রিল পর্যন্ত বিমানের লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭৯ কোটি টাকা।

পাওনা পরিশোধের বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আবু সালেহ মোস্তফা কামাল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পদ্মা অয়েলের কাছে যে বকেয়া আছে, সেটাকে আমরা আমাদের আয় থেকে প্রতি মাসে কিছু কিছু করে অ্যাডজাস্ট করে দিচ্ছি। এখন নতুন করে আমরা যে জ্বালানি তাদের কাছ থেকে নিচ্ছি, সেগুলো কিন্তু আমরা বাকি রাখছি না।’

তিনি বলেন, ‘বেবিচকের বিষয়টি হচ্ছে তাদের সাথে কিছু লিজ এগ্রিমেন্ট আছে; কিছু রেন্ট এগ্রিমেন্ট আছে। এগুলো অনেকদিন ধরেই আছে। এখন লিজ এবং রেন্টের বিষয়টি নিয়ে কখনো কখনো সমন্বয়ের সমস্যা দেখা দিয়েছে। লিজ হলে এক রকম আর রেন্ট হলে রেটটা আরেক রকমভাবে নির্ধারিত হয়।

‘সেটা আমরা এক রকম করতে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি দিয়েছি। সেটার জবাব আসলে তখন আমরা অ্যাডজাস্ট করব।’

মোস্তফা কামাল বলেন, ‘এককথায় বলতে গেলে সবগুলো এগ্রিমেন্টই লিজ। কিন্তু তারা কোথাও কোথাও রেট হিসেবে দেখিয়েছে। সে হিসেবে টাকা দবি করেছে। আমরা এটা একটা ইউনিক ফর্মে আনতে চাচ্ছি।

‘সেটা কয়েক জায়গায় অ্যাড্রেস করা হচ্ছে। এটা এক রকম হয়ে গেলে আমরা লিজ মানি হলে লিজ মানি দেব, রেন্ট হলে রেন্ট দেব। পুরো বিষয়টির একটি প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।’

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন

যাত্রী কম না, ভাড়া বেশি

যাত্রী কম না, ভাড়া বেশি

জেলায় জেলায় বাসগুলোতে ৬০ শতাংশ ভাড়া আদায় করার পরেও যাত্রী তোলা হচ্ছে বেশি। ছবি: নিউজবাংলা

‘যাত্রী তো ঠিকই তোলা হয়। তাহলে শুধু শুধু বাড়তি ভাড়া নেয়ার দরকার কী? তার চেয়ে আগের ভাড়াই হোক।’

লকডাউনেও বাস চলার অনুমতি মিলেছে যাত্রী কম তোলার শর্তে। বাসমালিকদের যেন ক্ষতি না হয়, সে জন্য বাড়ানো হয়েছে ভাড়া।

শুরুতে প্রতি দুই আসনে একজন যাত্রীর বিষয়টি মেনে চলা হলেও পরে সেটি আর থাকেনি। আগের মতোই দুই আসনে যাত্রী তোলার পরও বাড়তি ভাড়া দিতে বাধ্য করছেন চালক-শ্রমিকরা।

উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের পাঁচটি জেলায় একই চিত্র দেখা গেছে।

করোনাকালে স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় প্রতি দুই আসনে একজন করে যাত্রী তুলে ৬০ শতাংশ বেশি ভাড়া আদায়ের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।

তবে জেলায় জেলায় যে চিত্র দেখা গেছে, সেটি হলো ৬০ শতাংশ ভাড়া আদায় করার পরও যাত্রী তোলা হচ্ছে বেশি।

এ নিয়ে ঝগড়া-বিবাদ করে ক্লান্ত যাত্রীরা প্রশ্ন তুলছেন, যদি স্বাভাবিক সময়ের মতোই বেশি যাত্রী তোলা হয়, তাহলে অতিরিক্ত ভাড়া কেন নেয়া হবে।

তবে লং রুটে (যেমন: ঢাকা-রংপুর বা ঢাকা-ময়মনসিংহ) প্রতি দুই আসনে একজন যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।

‘পোষায় না’

বরিশালের নথুল্লাবাদের প্রভাতী পরিবহনের টিকিট বিক্রেতা ইদ্রিস মিয়া বলছিলেন, যাত্রী কম নিলে তাদের পোষায় না।

তিনি বলেন, ‘ইচ্ছা হইলেই মোরা ওই স্বাস্থ্যবিধি মানি। দুই সিটে একজন কইরা নিই। তয় হেতে তো আর সব সময় মোগো পোষায় না। কারণ হইছে অনেক দিন বন্ধ আছিল বাস। ওই ক্ষতি তো পোষাণ লাগবে। তাই না? নাইলে মোরা বা চলমু কেমনে আর মহাজনগো বা দিমু কী?’

যাত্রী কম না, ভাড়া বেশি

সবসময় এভাবে বাসে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা হয় না দাবি করে তিনি বলেন, ‘যহন টাহায় শর্ট পরে তহনই উঠাই খালি।'

কিন্তু এটাকে আইনবিরুদ্ধ মন্তব্য করলে তিনি বলেন, ‘সবকিছুর দামও তো বাড়ছে। এত নিয়ম-কানুন মাইনা মোগো চলতে কষ্ট অয়।’

একই কথা বলেন রুপাতলী মিনি বাস টার্মিনাল থেকে চলাচলকারী বাস আব্দুল্লাহ পরিবহনের চালক সায়েদুল্লাহ।

তিনি বলেন, ‘গাদাগাদি করে উঠাই না। মাঝেমধ্যে অর্ধেক যাত্রী, আবার কোনো সময় যে কয়টা সিট সেই কয়জন যাত্রী নিয়া গাড়ি চালাই।’

বরিশাল কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল নথুল্লাবাদে গিয়ে টার্মিনাল ছেড়ে চলতি পথে বাস থামিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী বহন করতে দেখা গেছে।

বরিশাল জেলা বাস মালিক গ্রুপের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক কিশোর কুমার দে বলেন, ‘আমাদের যে বাসগুলো রয়েছে সেগুলোকে কঠোর নির্দেশনা দেয়া রয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে যারা বাস চালাবে না তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করব।’

তবে এই কঠোর ব্যবস্থা আসলে কখনও নেয়া হয় না।

ঝালকাঠি জেলা বাস ও মিনিবাস মালিক সমিতির সভাপতি সরদার মো. শাহ আলমের দাবি, তারা আইন মেনে চলছেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা যেহেতু বাসযাত্রীদের কাছ থেকে দুটি আসনের ভাড়া নিচ্ছি, সেহেতু ওই দুটি আসনই ওই যাত্রীর। ঝালকাঠিতে সরকারি নিয়ম মেনেই আমরা বাস চালাচ্ছি।’

তবে সমিতির সাধারণ সম্পাদক মিলন মাহমুদ বাচ্চুর বক্তব্যেই উঠে আসে আসল চিত্র। তবে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠার জন্য তিনি দায় দিলেন যাত্রীদেরই।

তিনি বলেন, ‘অনেক সময় যাত্রীরা আলাদা বসতে চায় না। সে ক্ষেত্রে বাসের স্টাফদের কিছু করার থাকে না।’

ঝালকাঠি থেকে বরিশালগামী যাত্রী ইসরাইল হাওলাদার বলেন, বাসস্ট্যান্ডে প্রতি দুই আসনে একজন যাত্রী নিয়ে ছাড়া হলেও পথে পথে যাত্রী তোলায় আসনগুলো আর ফাঁকা থাকে না।

যাত্রী কম না, ভাড়া বেশি

বরগুনা বাস মালিক সমিতির সভাপতি সগীর হোসেনের দাবি, যাত্রীরা বাড়তি ভাড়া দিতে চায় না। তারা আগের মতোই চলছেন।

তিনি বলেন, ‘আসলে আমাদের টিকে থাকাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বেশি ভাড়া চাইলে যাত্রীরা বাসে ওঠে না; তারা বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করে। এ কারণে আগের ভাড়াতেই আমরা যাত্রী পরিবহন করি।’

পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সাহাবুদ্দিন সাবু বলেন, ‘বেশি ভাড়া চাইলে যাত্রী ওডে না। কী হরমু, টিক্যা তো থাকতে তো অইবে।’

বরগুনা জেলা প্রশাসক হাবিবুর রহমান দাবি করেছেন, বাসগুলো স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলছে কি না, নিয়মিত তদারকি করছে জেলা প্রশাসন। ট্রাফিক পুলিশ বিভাগকে নির্দেশনা দেয়া আছে, বেশি যাত্রী নিলেই ভ্রাম্যমাণ আদালতে তাদের শাস্তি হবে।

বাকবিতণ্ডা নিয়মিত

ভোলায় অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিকদের নিয়মিত ঝগড়া হচ্ছে।

বাস মালিক সমিতির দাবি, আসন নেই জানার পরেও যাত্রীরাই জোর করে উঠছেন।

ভোলা ইলিশা রুট দিয়ে প্রতিদিন হাজার হাজার যাত্রী ঢাকা-চট্টগাম রুটে যাতায়াত করে থাকে। সকালে সিট্রাক বা লঞ্চ ধরার জন্য চরফ্যাশনের লেতড়া, আইচা থেকে যেসব বাস আসে তার সবগুলোতেই থাকে অতিরিক্ত যাত্রী।

যাত্রী আরমান হোসেন বলেন, ‘আমি চরফ্যাশনের দক্ষিণ আইচা থেকে রওনা দিছি। সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় টিকিট কাটার পরও পথে পথে যাত্রী তুলছে।’

যাত্রী কম না, ভাড়া বেশি

স্বাভাবিক সময়ে চরফ্যাশন থেকে ভোলায় লোকাল বাসের ভাড়া ছিল ১০০ টাকা। সেটি বাড়িয়ে করা হয়েছে ১৫০ টাকা। সরাসরি বাসের ভাড়া ছিল ১৩৫ টাকা। এখন নেয়া হচ্ছে ২১০ টাকা।

চরফ্যাশন থেকে আসা যাত্রী কাওসার হোসেন বলেন, ‘যাত্রী তো ঠিকই তোলা হয়। তাহলে শুধু শুধু ভাড়তি ভাড়া নেয়ার দরকার কী? তার চেয়ে আগের ভাড়াই হোক।’

আরেক যাত্রী অহনা বলেন, ‘আমাকে প্রায়ই বোরহানউদ্দিনে যেতে হয় বাসে করে। স্বাস্থ্যবিধি মানা হয় না কিছু। আবার ভাড়া ৩০ টাকার জায়গায় নেয়া হচ্ছে ৬০ টাকা।’

ভোলা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আবুল কালামের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো যাত্রীরা অনেক ক্ষেত্রে জোর করে বাসে উঠছেন।’

দূরপাল্লায় যাত্রী কম, লোকালে ভিড়

এই চিত্র দেখা গেছে ময়মনসিংহে।

ময়মনসিংহ পাটগুদাম বাস টার্মিনাল ও মাসকান্দা কেন্দ্রীয় আন্তজেলা বাস টার্মিনাল ঘুরে এমন চিত্র দেখা যায়।

বেশ কয়েকজন যাত্রী, বাসচালক, হেলপার, কনডাক্টর ও টিকিট মাস্টারের স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করার বিষয়টি একবাক্যে স্বীকারও করেছেন।

ঢাকা-নেত্রকোণা রুটে চলা বিশ্বাস পরিবহনের একটি বাস যাত্রীতে কানায় কানায় ভরা দেখা যায়। বেশির ভাগ যাত্রী, চালক ও তার দুই সহকারীর মুখে ছিল না মাস্ক।

চালকের সহকারী আল আমিন বলেন, ‘সোহাগ উস্তাদ (চালক) কইছিল মাস্ক পইরা যাত্রী তুলবার। কিন্তু যাত্রীর চাপে মাস্ক লাগানোর কথা ভুইল্যা গেছিলাম।’

যাত্রী কম না, ভাড়া বেশি

ঢাকা-ঈশ্বরগঞ্জ-আঠারোবাড়ি ভায়া ময়মনসিংহের নাবিলা পরিবহনেও দেখা যায় একই অবস্থা। দৌড়াদৌড়ি করে বাসে আসন পেতে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে যাত্রীরা। তারা গাদাগাদি করে বসেছিলেন।

কিশোরগঞ্জ এমকে সুপার কাউন্টারের টিকিটমাস্টার রিয়াদ বলেন, ‘৬০ শতাংশ ভাড়া দিয়ে চলাচলের নির্দেশ থাকলেও লোকাল বাসের কোনো যাত্রী তা দিচ্ছে না। এ কারণে গাড়ির কোনো সিট ফাঁকাও থাকছে না।’

নগরীর মাসকান্দা কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র।

সেখানে কাউন্টারের সামনে রাখা হয়েছে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা। গাড়িতে রাখা হয়েছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার। ভেতরে প্রতি দুটি শয্যায় একজন করে যাত্রী মাস্ক পরে বসে আছেন।

এনা কাউন্টারের ম্যানেজার ফারুক জানান, তাদের বাসে ৪০টি আসন থাকলেও যাত্রী তোলা হচ্ছে ২০ জন। তবে পরিবার নিয়ে বসলে দুই সিটেই বসতে দেওয়া হচ্ছে। যদি কোনো যাত্রী একা আসে তাহলে তাকে দুটি আসন দিয়ে ৭০০ টাকা নেয়া হচ্ছে। এমনিতে ভাড়া কম ছিল।

ময়মনসিংহ জেলা মোটর মালিক সমিতির মহাসচিব মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘আপনার কথা শতভাগ যুক্তিসঙ্গত। ইতোমধ্যে আমরা লক্ষ্য করেছি আমাদের বাস সংশ্লিষ্ট অনেকে স্বাস্থ্যবিধি মানছে না।

‘এ জন্য গত শুক্রবার আমরা জরুরি আলোচনা করেছি। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়েছে বাসে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করা হবে।’

বেশির ওপর বেশি আদায়

ময়মনসিংহের মতো রংপুরেও লোকাল রুটে অতিরিক্ত যাত্রী আর ঢাকার রুটে প্রতি দুই আসনে একজন যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।

তবে রংপুর-ঢাকা রুটে সরকারি নির্ধারিত হারের চেয়েও বেশি টাকা আদায় করতে দেখা গেছে।

ঢাকা কোচ স্ট্যান্ডের হানিফ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার আব্দুল্লাহ বলেন, ‘আমরা সরকার নির্ধারিত ভাড়া নিচ্ছি। যাত্রী বেশি নেয়া হচ্ছে না। সড়কে আমাদের চেকিং আছে।

‘আগে এক সিট (রংপুর থেকে ঢাকা) টিকেটের দাম ছিল ৫০০ টাকা। এখন দুই সিট বিক্রি হচ্ছে ৯০০ টাকা। আমরা তাই করছি।’

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৫০০ টাকার ভাড়া ৬০ শতাংশ বেশি নিলে হয় ৮০০ টাকা।

এসআর ট্রাভেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বাসের কাউন্টার ম্যানেজার রতন মিয়া জানান, আগে (রংপুর থেকে ঢাকাগামী) একটি আসন বিক্রি হতো দেড় হাজার টাকা। এখন সেটি বিক্রি হচ্ছে তিন হাজার টাকায়।

অর্থাৎ এই কোম্পানি আদায় করছে দ্বিগুণ টাকা।

লোকালে বেশি টাকা আদায় করেও অতিরিক্ত যাত্রী তোলার পেছনে পরিবহন শ্রমিকরা নিজেদের দায় অস্বীকার করেছেন।

রংপুর মেডিক্যাল মোড়, কেন্দ্রীয় টার্মিনাল, মডার্ন মোড়, কামারপাড়া কোচ স্ট্যান্ড, শাপলা স্ট্যান্ড, কুড়িগ্রাম স্ট্যান্ড ও সাতমাথা বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে প্রতিটি বাসেই অতিরিক্ত যাত্রী তুলতে দেখা গেছে।

রংপুরের মেডিক্যাল মোড়ে ঠাকুরগাঁওগামী (মেইল) মিথিলা এন্টারপ্রাইজ বাসে যাত্রী ছিল প্রতি আসনেই।

শাহনেওয়াজ মো. শাওন নামে এক যাত্রী বলেন, ‘দুই জন বসিয়েও বাড়া বেশি নিচ্ছে।’

তাজ রহমান নামে আরেক যাত্রী বলেন, ‘আগে ভাড়া ছিল ১১০ টাকা। এখন প্রতি সিটে বসেও ভাড়া নেয়া হচ্ছে ১৫০ টাকা।’

দিনাজপুরগামী বদর বাসের চালক নুরুজ্জমান দাবি করেন, যাত্রীরা মানতে চায় না। তারাই পাশাপাশি সিটে বসে যাচ্ছে।

তার দাবি, যারা দুই আসনে দুইজন বসছে তাদের ভাড়া কম নেয়া হচ্ছে। আর যারা দুই আসন নিয়ে একা যাচ্ছেন, তাদের কাছ থেকেই কেবল বেশি ভাড়া নেয়া হচ্ছে।

যদিও যাত্রী রেজাউল করিম বলেন, ‘এটা সত্য না। ভাড়া বেশিই নেয়া হচ্ছে।’

রংপুর থেকে বদরগঞ্জগামী বাসচালক জগদীশ বলেন, ‘যাত্রীরা মানে না, তাই আমরা সবাইকে তুলেছি। ভাড়া আগের মতই নিচ্ছি আমরা।’

অন্যান্য জেলার মতো এখানেও প্রশাসনের বক্তব্য গতানুগতিক।

জেলা প্রশাসক আসিব আহসান বলেন, ‘গণপরিবহনে যেন ভাড়া বেশি নেয়া না হয় এবং সরকারের নির্দেশনা মানা হয়, সে জন্য আমরা কাজ করছি। নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছি। তবু ব্যক্তিগতভাবে প্রত্যেককে সচেতন হতে হবে।’

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন

৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই সিলেট হতে পারে ধ্বংসস্তূপ

৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই সিলেট হতে পারে ধ্বংসস্তূপ

সিলেট একসময় অসম (আসাম) প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। পুরো প্রদেশই ছিল ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে। তখন সেখানে বিশেষ প্যাটার্নের ভবন নির্মাণ করা হতো। নব্বইয়ের দশকের আগ পর্যন্ত সিলেটে তৈরি হতো ‘আসাম প্যাটার্নের’ এমন বাড়ি। তবে এখন কোনো বিবেচনা ছাড়াই গড়ে উঠছে বহুতল ভবন।

আশির দশক পর্যন্ত সিলেটে মিথ প্রচলিত ছিল, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর দরগাহের মিনারের চেয়ে উঁচু ভবন সিলেট শহরে নির্মাণ করা হলে তার প্রতি অসম্মান প্রদর্শন হবে এবং ভবনটি ভেঙে পড়বে।

হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারটি সিলেট নগরের একেবারে মাঝখানে অবস্থিত। এর মিনারটি প্রায় পাঁচতলা ভবনের সমান। প্রচলিত ওই ধারণার জন্য আশির দশক পর্যন্ত সিলেটে পাঁচতলা থেকে উঁচু ভবন নির্মাণ করা হতো না।

সে সময়ে সিলেটের বেশির ভাগ বাসাবাড়িই ছিল একতলা, টিনশেডের।

সিলেটের নাগরিকদের বহুতল ভবন নির্মাণ না করার একটা বৈজ্ঞানিক ভিত্তিও ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে এটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। ভূমিকম্পের একেবারে উৎপত্তিস্থলেই সিলেটের অবস্থান। ফলে সিলেটে বহুতল ভবন নির্মাণ ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।

এ কারণে এ অঞ্চলের একতলা বাড়িগুলোর নাম দেয়া হয়েছিল ‘আসাম প্যাটার্ন’।

সিলেট একসময় অসম (আসাম) প্রদেশের অন্তর্গত ছিল। পুরো প্রদেশই ভূমিকম্প ঝুঁকির আওতায়। সে কারণে নির্মাণ করা হতো এই বিশেষ প্যাটার্নের ভবন।

তবে নব্বইয়ের দশকে বদলে যেতে লাগে সিলেটের চিত্র। একে একে গড়ে উঠতে থাকে আকাশছোঁয়া ভবন। একতলা বাড়ি ভেঙে নির্মিত হয় বিশাল অ্যাপার্টমেন্ট, দিঘি দখল করে সুউচ্চ বিপণিবিতান, ডোবা-হাওর দখল করে উঠতে থাকে হাউজিং প্রকল্প।

অপরিকল্পিতভাবে, কোনো নিয়মনীতি, নিরাপত্তার তোয়াক্কা না করেই গড়ে উঠেছে এসব ভবন। নগর কর্তৃপক্ষের উদাসীনতায় গড়ে ওঠা এসব ভবন সিলেটকে করে তুলেছে আরও ঝুঁকিপূর্ণ।


৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই সিলেট হতে পারে ধ্বংসস্তূপ


বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) তিন বছর আগের এক জরিপে দেখা গেছে, সিলেটে এক লাখ বহুতল ভবন রয়েছে। এসব ভবনের ৭৫ শতাংশ ছয়তলা বা তার চেয়ে বেশি। তবে সিলেট সিটি করপোরেশনের হিসাবে হোল্ডিংই আছে ৭০ হাজার।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটে রিখটার স্কেলে ৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলে এ অঞ্চলের প্রায় ৮০ ভাগ স্থাপনা ধসে পড়তে পারে। এতে প্রাণ হারাবে প্রায় ১২ লাখ মানুষ এবং ক্ষতি হবে ১৭ হাজার কোটি টাকার।

সোমবার সন্ধ্যা ছয়টা দিকে সিলেটে দুই দফা ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এই ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল সিলেটের দক্ষিণ সুরমা এলাকায়। এর আগে গত ২৯ মে সকাল ১০টা থেকে বেলা ২টার মধ্যে অন্তত পাঁচটি ভূকম্পে কেপে ওঠে সিলেট। পরদিন ভোরে আবার ভূমিকম্প হয়। যার সবগুলোর কেন্দ্রস্থল জৈন্তাপুর এলাকায়।

স্বল্প সময়ের মধ্যে কয়েক দফা ছোট ভূমিকম্প হওয়ায় সিলেটজুড়ে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। আতঙ্ক থাকলেও সিলেটে নেই ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি কমানো ও উদ্ধারকাজ চালানোর মতো কোনো প্রস্তুতি ও সচেতনতা।

সক্রিয় ভূকম্পন এলাকা

ফরাসি ইঞ্জিনিয়ারিং কনসোর্টিয়াম ১৯৯৮-এর জরিপ অনুযায়ী ‘সিলেট অঞ্চল’ সক্রিয় ভূকম্পন এলাকা হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে।

৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই সিলেট হতে পারে ধ্বংসস্তূপ

১৮৩৩, ১৮৮৫, ১৮৯৭, ১৯০৫, ১৯৩০, ১৯৩৪, ১৯৪৭ ও ১৯৫০ সালের বড় ভূকম্পনের মধ্যে দুটিরই উৎপত্তিস্থল ছিল (এপি সেন্টার) সিলেটের জৈন্তার ভূগর্ভে। একই উৎপত্তিস্থল থেকে ঘটে যাওয়া ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে সিলেট অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সেটি ভূকম্পনের ইতিহাসে ‘দ্য গ্রেট আসাম আর্থকোয়েক’ নামে পরিচিত। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮ মাত্রার বেশি।

এই ভূমিকম্পের কারণে ব্রহ্মপুত্র নদের গতিপথ পরিবর্তনসহ সিলেট ও অসম অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য ভৌগোলিক পরিবর্তন ঘটে।

১৯৫০ সালে অসমে বড় ধরনের ভূমিকম্পের কারণে সিলেট অঞ্চলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়ছিল। এই ভূমিকম্পটি ‘আসাম-তিব্বত আর্থকোয়েক’ নামে ইতিহাসে পরিচিত রয়েছে। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৮.৬।

৭ মাত্রার ভূমিকম্প হলেই বিপুল ক্ষতির শঙ্কা

বছর দশেক আগে বাংলাদেশ, জাপান ও শ্রীলঙ্কার একটি বিশেষজ্ঞ দল সিলেট নগরীর ছয় হাজার ভবনের ওপর জরিপ চালিয়ে একটি গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে। এই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, রিখটার স্কেলে ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হলে সিলেটের শতকরা ৭০ থেকে ৮০ ভাগ ভবন ধসে পড়বে। এতে ক্ষতি হবে ৮ হাজার কোটি টাকার। প্রাণহানি হবে ৭ থেকে ৮ লাখ মানুষের।

গবেষকদের মতে, সিলেটের বেশির ভাগ বাণিজ্যিক ভবনই অপরিকল্পিত এবং মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ। রিখটার স্কেলে ৭ বা তার চেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হলে সেগুলো ধসে পড়বে। পাল্টে যেতে পারে সিলেটের মানচিত্রও। ক্ষতিগ্রস্ত হবে সিলেটের গ্যাস এবং তেলক্ষেত্রগুলো। কেবল গ্যাস ফিল্ডেই ক্ষতি হবে ৯ হাজার কোটি টাকার। পরিবেশ বিপর্যয়ও নেমে আসবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত বাসাবাড়ি নির্মাণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে নগরীর শাহজালাল উপশহর, আখালিয়া, বাগবাড়ি, মদিনা মাকের্ট এলাকা।

গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বহু বেসরকারি হাসপাতাল রয়েছে, যেগুলো ভূমিকম্পের সময় ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। তাতে প্রাণহানিও বাড়বে। কারণ, তখন ভূমিকম্পে আহত ব্যক্তিদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে না।

শ্রীলঙ্কার অধ্যাপক আরঙ্গা পোলা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হুমায়ূন আখতার, অধ্যাপক ড. আপ্তাব আহমেদ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাকসুদ কামাল, ড. জাহাঙ্গীর আলমসহ জাপান থেকে আসা আরও দুজন বিশেষজ্ঞ এই গবেষণা প্রতিবেদনটি তৈরি করেন।

গবেষক দলের সদস্য ড. জহির বিন আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভূমিকম্পের দিক থেকে সিলেট মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও তাৎক্ষণিক ক্ষতি-হ্রাস ও উদ্ধারকাজ চালানোর জন্য সিলেটে আধুনিক কোনো যন্ত্রপাতি নেই। ভূমিকম্পের ঝুঁকি মাথায় রেখে সংশ্লিষ্টদের এখনই প্রস্তুতি নেয়া উচিত।’

৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই সিলেট হতে পারে ধ্বংসস্তূপ

নেই প্রস্তুতি

সিলেটে নগরায়ণের ক্ষেত্রে ভূমিকম্প-ঝুঁকি মাথায় রেখে একটি মহাপরিকল্পনা (মাস্টারপ্ল্যান) প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে সেটি কার্যকর হয়নি। ফলে বহুতল ভবন নির্মাণ, নগর সম্প্রসারণ হচ্ছে অনেকটা খেয়ালখুশিমতো। হাওর, বিল, খাল-নালা, জলাভূমি ভরাট করে, পাহাড়-টিলা কেটে হাউজিং প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বহুতল ভবন নির্মিত হচ্ছে। এতে ভূমিকম্পপ্রবণ সিলেটে ক্ষতির আশঙ্কা আরও বাড়ছে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জহির বিন আলম বলেন, যে টেকনোটিক প্লেটে সিলেট অঞ্চল অবস্থিত, তা ক্রমেই উত্তর-পূর্ব দিকে সরে যাচ্ছে। প্রতি ১০০ বছরে তা এক মিটার সরছে। এ কারণে সিলেট অঞ্চলের ভূমিকম্পের ঝুঁকি দিনদিন আরও বাড়ছে।

এরপরও এর জন্য কর্তৃপক্ষের কোনো প্রস্তুতি দৃশ্যমান নয়। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে সভা-সেমিনার, কর্মশালা, ভূমিকম্পের মহড়া প্রদর্শনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নুর আজিজুর রহমান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘২০১৬ সালে সবশেষ সিলেটের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর ব্যাপারে জরিপ চালানো হয়েছিল। এতে ৩২টি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সেগুলো তখন ভেঙে ফেলার উদ্যোগও নেয়া হয়। তবে বিভিন্ন জটিলতায় সে কাজ এগোয়নি।’

সিটি করপোরেশনের অনুমোদন ছাড়াই নগরীতে গড়ে উঠছে অনেক বহুতল ভবন। এতে বাড়ছে ভূমিকম্পে ক্ষতির ঝুঁকি।

আজিজুর জানান, ২৯ মের ভূমিকম্পের পর ওই ভবনগুলোর মধ্যে সাতটি বাণিজ্যিক ভবন বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সিলেটে প্রায় ৭০ হাজার হোল্ডিং আছে। এর মধ্যে সাততলার ওপরে ভবন আছে অন্তত চার শটি। তবে সিটি করপোরেশনের হিসাবের বাইরে আরও অনেক বহুতল ভবন আছে।

‘নগরের বহুতল ভবনগুলো ভূমিকম্পসহনীয় কি না, তা পরীক্ষা করে দেখতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন। আমরা দ্রুতই সে উদ্যোগ নেব। সব ঝুঁকিপূর্ণ ভবন আমাদের পক্ষে ভেঙে ফেলা সম্ভব নয়। তবে যে ভবনগুলো ভূমিকম্পসহনীয় নয় সেগুলোর সামনে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড টানিয়ে দেব।’

৭ মাত্রার ভূমিকম্পেই সিলেট হতে পারে ধ্বংসস্তূপ

বিশেষজ্ঞদের মতে, সিলেটে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নগরীর সব ভবনকে ভূমিকম্প প্রতিরোধক করা। এ জন্য নতুন ভবন নির্মাণের আগে মাটি পরীক্ষা করতে হবে। মাটির ধরনের ওপর নির্ভর করে ভবনকে একতলা বা বহুতল করতে হবে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জহির বলেন, সিলেটের ৭৪ দশমিক ৪ শতাংশ ভবনই ভূমিকম্পের কথা চিন্তা না করে তৈরি করা হয়েছে। এগুলো ভূমিকম্প প্রতিরোধকভাবে নির্মাণ করা হয়নি। ফলে ৭ মাত্রার ভূমকম্প হলেই ৮০ শতাংশ বহুতল ভবন ভেঙে পড়তে পারে।

তিনি বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো ভেঙে না ফেলে রেকটিফাইটিং করা যেতে পারে। সাপোর্টিং পাওয়ার দিয়ে ভূমিকম্প প্রতিরোধক হিসেবে ভবনগুলোকে গড়ে তোলা যেতে পারে। এই মূহূর্তে সবার আগে প্রয়োজন ভূমিকম্প সেন্টার নির্মাণ। সিলেটে শিগগিরই একটি ভূমিকম্প সেন্টার নির্মাণ করতে হবে।’

তিনি আরও জানান, জলাশয় ভরাট করে বহুতল ভবন নির্মাণ করা যাবে না। বিল্ডিং কোড লঙ্ঘন করে কোনো অবস্থাতেই ভবন নির্মাণ করা যাবে না।

দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা নেই ফায়ার ব্রিগেডেরও

সিলেটে মাঝারি মানের ভূমিকম্প হলেও তার ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার সক্ষমতা নেই ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সেরও। সিলেট বিভাগের ৩৮ উপজেলার মধ্যে মাত্র ১৪টিতে ফায়ার স্টেশন রয়েছে। সেগুলোতে আবার তেমন কোনো যন্ত্রপাতি নেই।

ফায়ার সার্ভিস সিলেটের সহকারী পরিচালক আনিসুর রহমান বলেন, ‘সিলেটের অনেক বহুতল ভবনই নির্মাণ করা হয়েছে অনুমোদনহীনভাবে। অলিগলির রাস্তাও সরু। ফলে আমাদের গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না। এ ব্যাপারে নগর কর্তৃপক্ষকে উদ্যোগী হতে হবে।

‘দুর্যোগ মোকাবিলায় আমাদের যন্ত্রপাতিরও ঘাটতি রয়েছে। এ ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ ছাড়া ভূমিকম্প হলে উদ্ধার তৎপরতার জন্য স্বেচ্ছাসেবক তৈরি করার কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে। স্বেচ্ছাসেবকদের প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে ধারাবাহিকভাবে।’

আরও পড়ুন:
বন্ধ হচ্ছে কিন্ডারগার্টেন, শিশুরা ভর্তি হবে কোথায়
করোনা: শিক্ষক থেকে মুদি দোকানি, মসলা বিক্রেতা
কিন্ডারগার্টেন খোলার দাবি নিয়ে হাইকোর্টে যাবেন শিক্ষকরা

শেয়ার করুন