× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বাংলাদেশ
Democracy stage will go to the movement simultaneously with BNP?
hear-news
player
google_news print-icon

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যাবে গণতন্ত্র মঞ্চ?

বিএনপির-সঙ্গে-যুগপৎ-আন্দোলনে-যাবে-গণতন্ত্র-মঞ্চ?
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক অনুষ্ঠানে ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’ জোটের আত্মপ্রকাশ ঘটে। জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব এতে সভাপতিত্ব করেন। ছবি: নিউজবাংলা
সাতটি ছোট ছোট দল নিয়ে গড়া নতুন রাজনৈতিক জোট গণতন্ত্র মঞ্চ বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলন করতে চায়। তাদের মধ্যে এ নিয়ে ঐকমত্য হবে কি না, তা তাদের শর্ত মানার ব্যাপারে বিএনপির আগ্রহের ওপর নির্ভর করছে বলে জোটের নেতারা বলেছেন।

বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার আগে বেশ কিছু শর্ত দিয়েছে সরকারবিরোধী ছোট ছোট দল নিয়ে গড়া জোট গণতন্ত্র মঞ্চ। এখন জোটের নেতারা বলছেন, এসব শর্ত পূরণ হওয়ার পরই কেবল এক কাতারে আন্দোলন শুরু করবেন তারা।

জোটের এ শর্তগুলো বিএনপি মানবে বলেই শরিকরা মনে করছে। জোট নেতারা বলছেন, তাদের শর্ত মানার বিষয়ে বিএনপির মনোভাব নেতিবাচক হলে যুগপৎ আন্দোলন না হলেও সরকারবিরোধী হিসেবে তারা আন্দোলন চালিয়ে যাবেন।

গত ৮ আগস্ট ঢাকার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে আত্মপ্রকাশ করে গণতন্ত্র মঞ্চ। সাতটি ছোট দল ও সংগঠন মিলে করা এই জোটে আছে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জেএসডি), নাগরিক ঐক্য, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, গণ অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন।

আত্মপ্রকাশ করেই সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন গড়ার ঘোষণা দেয় এ জোট। জোটের প্রথম কর্মসূচিতে গত ১১ আগস্ট সরকারের বিরুদ্ধে ‘তীব্র আন্দোলনের’ ঘোষণাও দেন জোটের নেতারা। পরে অবশ্য বিএনপির সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনে যাওয়ার ঘোষণা দেয় জোটের কয়েকটি শরিক দল।

গণতন্ত্র মঞ্চের নেতারা বলছেন, বিএনপি সংবিধান সংশোধন করবে- এ বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পরই তারা দলটির সঙ্গে আন্দোলনে যাবেন। কারণ অতীতে অনেক আন্দোলনের পর যখন সরকার গঠন হয়েছে, তখন দেখা গেছে বড় দলগুলো এগুলো আসলে ভুলে গেছে। চলতি নভেম্বর মাসের ১৮-২০ তারিখের মধ্যে বিএনপির সঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের সংলাপ হবে বলে জানিয়েছেন জোটের নেতারা।

এ বিষয়ে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক ও জোটের অন্যতম নেতা সাইফুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে জোটের একটি আনুষ্ঠানিক বৈঠক হবে। জোটের বৈঠকে সেই বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনা করব।’

জোটের নেতারা বলছেন, নির্দলীয় অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচন একটি অভিন্ন শর্ত, যা বিএনপিও সমর্থন করে। এর বাইরে বিএনপির সঙ্গে সংলাপে জোটের পক্ষ থেকে যুগপৎ আন্দোলনের আগে তাদের আরও বেশ কিছু শর্ত আছে, যা মেনে নেয়া হলে তারা বিএনপির সঙ্গে এক কাতারে আন্দোলনে যাবে।

জোটের নেতারা বলছেন, বিএনপির সামনে যেসব দাবি তুলে ধরা হবে, সেগুলো হলো দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের পরিবর্তন, ২ বারের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির পদে ভারসাম্য আনা, প্রত্যক্ষ ভোটের পাশাপাশি সংখ্যানুপাতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়েও সংসদে প্রতিনিধিত্ব ও কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে বিকেন্দ্রীকরণ। এগুলো নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আলাপ করবে জোট।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে জোটের এক নেতা বলেন, ‘আমরা জেনেছি, বিএনপির রূপরেখায় আমাদের দেওয়া শর্তগুলোর বেশ কয়েকটি অনুপস্থিত। যেমন- এখন পর্যন্ত সংবিধানের ৭০ ধারা নিয়ে বিএনপির স্পষ্ট কোনো কথা নেই। এ কারণে এসব বিষয় নিয়ে আমরা সরাসরি তাদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপ করব।’

এ বিষয়ে জোটের আরেক নেতা বলেন, ‘আমাদের ইতিহাসে তো অনেক প্রতারণা আছে। সরকারে গেলে অনেক সময় কথাবার্তা পরিবর্তন হয়ে যায়। আমরা আসলে ওই নিশ্চয়তার বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। সংবিধান সংস্কার করবে এ বিষয়টিতে নিশ্চিত হওয়ার পরই আমরা বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে যাব।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই নেতা আরও বলেন, ‘বিএনপি জাতীয় সরকার গঠন করার যে প্রস্তাব করেছে, এখানে রাষ্ট্রের সংস্কার তারা করতে পারবে না। কারণ ওই সরকার সেটা করতে পারবে না। আর তাদের এই সরস্কার তেমন স্থায়ী হয় না। এ জন্যই আমরা এমন সংস্কারের কথা বলছি, সেটা কলমের খোঁচায় বিএনপি পাল্টে ফেলতে পারবে না। আমরা সংবিধানসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার চাই।’

বিএনপি জোট এই দাবি মানবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এটা উনাদের মানতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘গণতন্ত্র মঞ্চ এর মধ্যে একটি বিষয়ে একমত হয়েছে যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সংবিধানে জনগণের স্থায়ী ক্ষমতায়ন নিয়ে কাজ করবে। তাহলেই আমরা তাদের সঙ্গে আন্দোলন করব। এ বিষয়টি আমরা নিশ্চিত করতে চাই।’

জোটের নেতা ও গণ অধিকার পরিষদের সদস্যসচিব নুরুল হক নুর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শুধু একজনকে সরিয়ে আরেকজনকে ক্ষমতায় আনার জন্য আমরা রাজনীতি করতে চাই না। আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় পরিবর্তনের কিছু অঙ্গীকার আছে, যা রূপরেখা আকারে বিএনপিকে জোটের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে বিএনপি কী ভাবছে, তা জানার পরই আমরা যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেব।’

গণতন্ত্র মঞ্চের জোট নেতারা বলছেন, তাদের শর্তের বিষয়ে বিএনপি অনেকটাই সাড়া দিয়েছে। জোটের দাবিগুলো পুরোপুরি না হলেও অনেকটাই মানা হবে বলে এই মুহূর্তে জোট নেতারা মনে করছেন। কারণ সরকারবিরোধী তীব্র আন্দোলন বিএনপি গড়ে তুলতে না পারলে সরকারের পতন সম্ভব হবে না। এ কারণে হলেও বিএনপি তাদের কিছু শর্ত মানবে।

জোট নেতারা বলছেন, বিএনপি এককভাবে গত ১৩ বছরেও ক্ষমতায় যেতে পারেনি। এ বিষয়টি বুঝতে পেরেই তারা যুগপৎ আন্দোলনের জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে। এখন গণতন্ত্র মঞ্চ বিএনপিকে জনগণের জন্য কিছু করতে শর্ত দিয়ে রাখবে, যা পূরণ হতেই হবে।

জোট নেতা নুরুল হক নুর বলেন, ‘বিএনপির সঙ্গে বিভিন্ন শর্ত দিয়ে রাখা হয়েছে। আলাপ-আলোচনা চলছে। হয়তো আগামী দিনে একটি জায়গায় বিষয়টি সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে।’

তবে বিএনপির সঙ্গে একমত না হতে পেরে যুগপৎ আন্দোলনের বিষয়টি পিছিয়ে গেছে বলে মানতে নারাজ তিনি। নুর বলেন, ‘একটা কথা আছে, যে জিনিস যত তাড়াতাড়ি পাওয়া যায়, সে জিনিস তত তাড়াড়াড়ি হারিয়েও যায়। আমরা একটি বোঝাপড়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছি।’

জোট নেতারা মনে করেন, বিএনপির সঙ্গে জোটগতভাবে ছাড়াও অনেক দল নিজেরাও যোগাযোগ রাখছে। সে ক্ষেত্রে কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে আন্দোলনে যাওয়ার বিষয়ে তীব্র ইচ্ছা পোষণ করছে। তবে এমন মনোভাব জোটের সব দলের মধ্যে নেই। আর বিএনপি জাতীয় সরকার নিয়ে যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা নিয়ে গণতন্ত্র মঞ্চের ভিন্নমত রয়েছে। জোটের বেশির ভাগ দল মনে করে, জাতীয় সরকার নির্বাচনের পরে নয়, আগে দরকার।

জোট নেতারা মনে করেন, গণতন্ত্র মঞ্চ জোট হলেও সবার আলাদা রাজনৈতিক মনোভাব রয়েছে। এ কারণে কয়েকটি দল বিএনপির সঙ্গে যেতে বেশি উদগ্রীব। এ ছাড়াও কারও ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়াও থাকতে পারে।

এ বিষয়ে নুরুল হক নুর বলেন, ‘আমাদের মধ্যে টুকটাক মতপার্থক্য থাকতে পারে, তবে অধিকাংশ বিষয়ে গণতন্ত্র মঞ্চ একমত হয়েছে। আমরা সরকার ও শাসনব্যবস্থা বদলের রাজনীতির বিষয়ে জোটগতভাবে একমত।’

বিএনপির তাদের শর্ত না মানলে তারা কী করবেন, জানতে চাইলে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখনই নেতিবাচক চিন্তা করতে চাই না। আমরা আশা করি, আমাদের মধ্যে বোঝাপড়া হবে। হয়তো আমাদের সব বিষয়ে তারা একমত হবেন না, আমরাও তাদের সব বিষয়ে অ্যাগ্রি নাও করতে পারি।’

তিনি বলেন, ‘বিএনপি শর্ত না মানলে আমরা সরকারবিরোধী হিসেবে আন্দোলন চালিয়ে যাব। কারণ বিরোধী দলগুলোর মধ্যে তো কিছু বড় দাগে বোঝাপড়া আছে।’
বিএনপি ইতোমধ্যে তাদের রূপরেখায় এ বিষয়গুলো এনেছে বলে দাবি করেছেন জোটের শরিক ভাসানী অনুসারী পরিষদের নেতা রফিকুল ইসলাম বাবলু।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিএনপিও একটি রূপকল্প সাজাচ্ছে। আমার ধারণা সংবিধানের সংস্কারের বিষয়ে আমাদের যে শর্ত, সে বিষয়ে বিএনপি একমত হবে।'

আরও পড়ুন:
হাঁক দিয়ে পিছুটান গণতন্ত্র মঞ্চের
কমিশন গঠন করে মতবিনিময় করবে গণতন্ত্র মঞ্চ
জনগণের ‘মুক্তির কাফেলা’ গণতন্ত্র মঞ্চের আত্মপ্রকাশ

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Why are domestic airlines lagging behind?

পিছিয়ে কেন দেশি এয়ারলাইনস

পিছিয়ে কেন দেশি এয়ারলাইনস বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি উড়োজাহাজ। ফাইল ছবি
দেশে আকাশপথের বাজার এখন বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর একচেটিয়া দখলে। রাষ্ট্রীয় বিমান সংস্থার বাইরে দুটি মাত্র দেশি এয়ারলাইনস এখন সক্রিয়। অন্যদিকে এখানে ৩০টিরও বেশি বিদেশি এয়ারলাইনস সক্রিয়।

বর্তমান বিশ্বে এক দেশ থেকে আরেক দেশ ভ্রমণে সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নিরাপদ মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয় আকাশপথকে। সরকারি হিসাবে ১ কোটিরও বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাস করছেন। দেশের সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে তাদের একটি বড় অংশই নিয়মিত আকাশপথে যাতায়াত করেন।

১৯৯৬ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গৃহীত এক সিদ্ধান্তে সদস্য দেশগুলোকে প্রতি বছরের ৭ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচল দিবস পালন করতে বলা হয়। সেই থেকে দিনটি বিশ্বব্যাপী আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল দিবস হিসেবে পালন হয়ে আসছে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস প্রতিষ্ঠা করা হয়। ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটিই ছিল দেশের একমাত্র বিমান পরিবহন সংস্থা। এরপর অবশ্য বিভিন্ন সময়ে ১১টি বেসরকারি এয়ারলাইনসকে যাত্রী পরিবহনের অনুমতি দিয়েছে সরকার, তবে এদের ৯টিই শেষ পর্যন্ত উড়ানে থাকতে পারেনি। একে একে আন্তর্জাতিক উড়ানে থাকার পরও বন্ধ হয়ে গেছে জিএমজি এয়ারলাইনস, ইউনাইটেড এয়ারওয়েজ ও রিজেন্ট এয়ার।

দেশে বর্তমানে বিমান ছাড়াও বেসরকারি এয়ারলাইনস ইউএস-বাংলা আন্তর্জাতিক ফ্লাইট পরিচালনা করছে। আরেক বেসরকারি এয়ারলাইনস নভো এয়ার অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের পাশাপাশি বিদেশে একটি ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

অন্যদিকে দেশে বর্তমানে ৩০টিরও বেশি-বিদেশি এয়ারলাইনস সক্রিয়। দেশের এভিয়েশন বাজারের ৮০ ভাগই নিয়ন্ত্রণ করে এসব এয়ারলাইনস। এর মধ্যে রয়েছে এমিরেটস, কাতার এয়ার, সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনস, ওমান এয়ার, এয়ার এশিয়া, মালয়েশিয়ান এয়ার, টার্কিশ এয়ার ইত্যাদি।

এর মধ্যে এমিরেটস, কাতার এয়ার, সিঙ্গাপুর এয়ারের শুরুটা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী প্রতিষ্ঠান বিমানের সাথেই। কিন্তু এই ৫০ বছরে এই সংস্থাগুলো তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে কয়েক গুণ, যার ধারেকাছেও নেই বিমান।

স্বাধীনতার সুদীর্ঘ ৫০ বছরেও দেশের এভিয়েশন বাজারের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেশি এয়ারলাইনসগুলোর ব্যর্থতায় প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা হাতছাড়া হচ্ছে বাংলাদেশের। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে এভিয়েশনবান্ধব নীতি গড়ে না ওঠায় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

বিমান পরিচালনা পর্ষদের সাবেক পরিচালক কাজী ওয়াহেদুল আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মার্কেট ডমিনেশনের মূল কাজটি করে থাকে ন্যাশনাল ক্যারিয়ার। আমাদের এখানে একসময় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ বাজার বিমান একাই নিয়ন্ত্রণ করত, কিন্তু এখন সেই বাজার কমতে কমতে বিশের নিচে নেমে এসেছে। এই সময় দেশে-বিদেশি এয়ারলাইনস বেড়েছে, তাদের ফ্লাইট সংখ্যাও বেড়েছে। বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো যেভাবে এগিয়েছে বিমান সেভাবে পারেনি।

‘প্রাইভেট এয়ারলাইনস যারা এসেছে, তাদের অনেকগুলোই আর ব্যবসায় থাকতে পারেনি। এখন যারা আছে ইউএস- বাংলা এবং নভো, তাদের কারও বয়সই ১০ বছর হয়নি। তাদের গ্রোথ হতে সময় লাগবে। তারা এখনও শুরুর স্টেজে আছে। দেশি এয়ারলাইনসকে এগিয়ে নিতে যে ধরনের নীতি সহযোগিতা সরকারের পক্ষ থেকে প্রয়োজন, যেমন ফুয়েলের দাম, ট্যাক্স স্ট্রাকচার, সারচার্জ সেগুলোও নেই। ফলে স্থানীয় এয়ারলাইনসগুলোও সুবিধা করতে পারছে না; নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়ে তারা যাচ্ছে। এখানে এভিয়েশন ফ্রেন্ডলি পলিসি না হওয়াটা একটি বড় কারণ। এগুলো পেরিয়ে দেশি এয়ারলাইনসগুলোর এগিয়ে যাওয়া কঠিন। সরকার সহযোগিতা না করলে এরা বেশি দূর যেতেও পারবে না।’

বর্তমানে বিশ্বের ৪০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এয়ার সার্ভিস অ্যাগ্রিমেন্ট বা ফ্লাইট চলাচল চুক্তি রয়েছে। অর্থাৎ এ দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ সরাসরি আকাশপথে যুক্ত হতে পারে, তবে সে সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না দেশি এয়ারলাইনসগুলো।

বাংলাদেশি এয়ারলাইনসগুলোর মধ্যে বিমান বর্তমানে ১৩টি, ইউএস-বাংলা ৯টি এবং নভোএয়ার একটি দেশে ফ্লাইট পরিচালনা করছে।

বিমানের বহরে বর্তমানে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে চারটি বোয়িং ট্রিপল সেভেন, ছয়টি বোয়িং সেভেন এইট সেভেন ড্রিমলাইনার, ছয়টি বোয়িং সেভেন থ্রি সেভেন এবং পাঁচটি ড্যাশ এইট মডেলের উড়োজাহাজ। অন্যদিকে ইউএস- বাংলার বহরে রয়েছে ১৭টি উড়োজাহাজ।

ইউএস-বাংলা এয়ালাইনসের জনসংযোগ বিভাগের মহাব্যবস্থাপক কামরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘গত ২০ বছর আগে আমাদের যতগুলো আন্তর্জাতিক গন্তব্য ছিল, আমরা এখনও সেগুলোকেই ছুঁতে পারিনি। এভিয়েশন খাতে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ আছে, কিন্তু এ ক্ষেত্রে সকলের সহযোগিতা প্রয়োজন। বিশেষ করে আমাদের যে অপারেটিং কস্ট, যেমন জেট ফুয়েলের দাম, বেবিচকের অ্যারোনটিক্যাল ও নন অ্যারোনটিক্যাল চার্জগুলো যদি লজিক্যাল অ্যামাউন্টে নির্ধারণ করা হয়, সে ক্ষেত্রে আমরাও এগিয়ে যেতে পারব বা বিদেশি এয়ারলাইনসগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতায় যেতে পারব।

‘এই খাতকে বাঁচিয়ে রাখলে আমাদের জাতীয় আয়ে যেমন ইতিবাচক প্রভাব পড়বে, তেমনি বিদেশি এয়ারলাইনসগুলো যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ে যাচ্ছে, সেটিও আমরা সাশ্রয় করতে পারব। এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা লাগবে।’

আরও পড়ুন:
উত্তরার পথে ৩ দিন সাবধান
শাহজালাল বিমানবন্দরে মশা নিধনে ব্যবস্থা নিতে হাইকোর্টের নির্দেশ
বিমানের ভিভিআইপি ফ্লাইট বিতর্কে যা বললেন প্রতিমন্ত্রী
ঢাকা-নারিতা ফ্লাইট মার্চের আগে নয়
টেক্সাসে মাঝ আকাশে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন ২ বিমানের সংঘর্ষ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
This time the Chhatra League is coming out of the centrality of DU?

এবার কি ঢাবিকেন্দ্রিকতা থেকে বের হচ্ছে ছাত্রলীগ?

এবার কি ঢাবিকেন্দ্রিকতা থেকে বের হচ্ছে ছাত্রলীগ? ছাত্রলীগের ৩০তম জাতীয় সম্মেলনে উপস্থিত নেতা-কর্মীদের একাংশ। ছবি: পিয়াস বিশ্বাস/নিউজবাংলা
গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, প্রতিবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্ব, তবে এবার শীর্ষ দুই পদে কে আসছেন আর তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে কেউ আসছেন কি না, তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে দেখা গেছে আগ্রহ।

ছাত্রলীগের ৩০তম সম্মেলন হয়ে গেলেও নতুন কমিটি পেতে অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক দিন। বরাবরের মতো এবারও সংগঠনটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক পদে কে আসছেন এ নিয়েই জোর আলোচনা চলছে।

এ দুই পদে আগ্রহী প্রার্থীরা তদবির-লবিং করছেন। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, প্রতিবারই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উঠে আসে সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্ব, তবে এবার শীর্ষ দুই পদে কে আসছেন আর তাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে কেউ আসছেন কি না, তা নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে দেখা গেছে আগ্রহ।

নেতা-কর্মীরা বলছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য থেকে কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করার কারণে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই অকেজো পড়ে আছে। শীর্ষ নেতারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই সব ধরনের কর্মকাণ্ড করেন। দিবসভিত্তিক কর্মসূচি পালন করতেই তারা কার্যালয়ে যান।

জানতে চাইলে ছাত্রলীগের দেখভালের দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের চার নেতার একজন এবং দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম বলেন, ‘ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতৃত্বে আসার একমাত্র পথ যোগ্যতা। এই যোগ্যতা হলো দলে অবদান, ত্যাগ, শ্রম, দায়বদ্ধতা, সাংগঠনিক দক্ষতা এবং পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য।

‘অতীতে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনেকেই দায়িত্ব পেয়েছেন। এবারও যদি যোগ্যতম প্রার্থী হন, তাহলে তিনি কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেটা গুরুত্বপূর্ণ না হয়ে তার যোগ্যতাই বিবেচ্য হবে।’

কমিটি বিশ্লেষণে দেখা যায়, অভিভাবক সংগঠন আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে একজন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন। তিনি নজরুল ইসলাম বাবু। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে নির্বাচিত আওয়ামী লীগ দলীয় জাতীয় সংসদ সদস্য।

এর পরের তিন কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক সবাই ঢাকা বিশ্বদ্যিালয় থেকে। তারা হলেন মাহমুদ হাসান রিপন-মাহফুজুল হায়দার চৌধুরী রোটন (২০০৬-২০১১), এইচ এম বদিউজ্জামান সোহাগ-সিদ্দিকী নাজমুল আলম (২০১১-২০১৫), সাইফুর রহমান সোহাগ-এস এম জাকির হোসাইন (২০১৫-২০১৮), রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভন-গোলাম রাব্বানী (২০১৮-২০১৯) এবং আল নাহিয়ান খান জয়-লেখক ভট্টাচার্য (২০১৯-২০২২)।

যে কমিটিতে বাবু সাধারণ সম্পাদক ছিলেন, তার মেয়াদ ছিল ২০০২-২০০৬। এর বাইরেও সংগঠনটির শীর্ষ দুই পদে আরও দুই-একজন বিভিন্ন সময়ে নেতৃত্বে এসেছিলেন। যেমন ১৯৮৩-৮৫ মেয়াদে সভাপতি ছিলেন আবদুল মান্নান, যিনি ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। ১৯৯৪-১৯৯৮ মেয়াদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র এ কে এম এনামুল হক শামীম ছিলেন সভাপতি, যিনি বর্তমানে পানিসম্পদ উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৮১-৮৩ মেয়াদে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, যিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে পড়তেন। তার আগে ১৯৭৩-৭৪ মেয়াদে তিনি সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন। আরেক সভাপতি মাইনুদ্দিন হাসান চৌধুরীও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসে দায়িত্ব পেয়েছিলেন।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, ছাত্রলীগ দেখভালের দায়িত্বে নিয়োজিত আওয়ামী লীগের চার নেতা সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হকসহ ছাত্রলীগের সাবেক নেতারা মিলে অনেককেই প্রার্থী হিসেবে দাঁড় করাতে চাচ্ছেন, তবে তারা সবাই বলছেন, কমিটি চূড়ান্ত করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে।

আওয়ামী লীগের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, স্বাচিপ এবং মহিলা লীগের ধারাবাহিকতায় ছাত্রলীগেও পরিচ্ছন্ন এবং বিতর্কমুক্তদের দায়িত্ব দেয়া হবে। গত বেশ কিছু দিন ধরে শীর্ষ পদে নতুনত্ব খোঁজ করা হচ্ছে।

এবারের কমিটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে কেউ আসছে, এমন আলোচনা আছে। আর এর সূত্র ধরেই ঢাবির বাইরের অনেকে প্রার্থী হতে আবেদন করেছেন।

তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জাকিউল ইসলাম ফুয়াদ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহসভাপতি ও কেন্দ্রীয় সহসম্পাদক হামজা রহমান অন্তর, ছাত্রলীগের তথ্য ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক এবং বুয়েট ছাত্রলীগের সভাপতি খন্দকার জামিউস সানী, চুয়েট ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের পাঠাগারবিষয়ক সম্পাদক সৈয়দ ইমাম বাকের এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ফয়সাল আহমেদ।

আরও পড়ুন:
ছাত্রলীগের কর্মীদের মুখে নতুন নেতৃত্ব নিয়ে জল্পনা
ছাত্রলীগের সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী
নানা সাজে ছাত্রলীগের সম্মেলনে নেতা-কর্মীরা
ছাত্রলীগের নতুন নেতৃত্বে আসছেন কারা
ছাত্রলীগের সম্মেলন আজ, বয়স নিয়ে চিন্তায় পদপ্রত্যাশীরা

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Language and the sound of silence

ভাষা আর নৈঃশব্দ্যের শব্দ

ভাষা আর নৈঃশব্দ্যের শব্দ
আমরা কিন্তু সব শব্দ শুনি না। যেসব শব্দ আমাদের কানে আসে অর্থাৎ যা আমরা শুনতে পাই, তা নিশ্চয় কোথাও ধ্বনিত হয়। কোনো একটি আঘাত বা স্পন্দন থেকে উদ্ভব বলে এদের নাম ‘আহত শব্দ’। অন্যদিকে যে শব্দ আমরা শুনি না, কোনো দৃশ্যমান আঘাত থেকে যার উদ্ভব হয়নি, হয়েছে অন্তরস্থ প্রজ্ঞা থেকে, যা সাধনা করে শুনতে হয়, সেই সব শব্দের নাম ‘অনাহত শব্দ’। কোনো এক বায়ুহীন অন্তরীক্ষে পৌঁছাতে পারলেই কেবল তা শুনতে পাওয়া যায়।

শব্দের কী শক্তি! একটা মাত্র শব্দ মানুষকে সুখী করে দিতে পারে। পারে দুঃখ দিতেও। প্রেমিকা যখন ‘উম্মম’ বলে সাড়া দেয়, প্রেমিকের আকাশে জ্বলে ওঠে আলো, পুবে-পশ্চিমে। আবার যখন নৈঃশব্দের আড়ালে সে নিজেকে লুকায়, প্রেমিকের গগন থেকে মধ্যাহ্নেই ডুবে যায় সূর্য।

শব্দের কত জাদু! এই যেমন ‘দ্রাক্ষা’র সঙ্গে বাগান মেলে না। দ্রাক্ষার সঙ্গে কুঞ্জ মিলে হয়ে ওঠে ‘দ্রাক্ষাকুঞ্জ’। আবার দ্রাক্ষা না হয়ে যদি কেবল আঙুর হয়, তাহলে হতে হয় ‘আঙুরবাগান’। ‘গলিত’ শুনলেই কেমন গা গুলিয়ে ওঠে, কিন্তু কেউ ‘বিগলিত’ হলে মন খুশি হয়।

এই যে ব্রহ্মাণ্ড, যাকে নিখিল ভুবন বা প্লানেট আর্থ যা-ই বলি, এখানে প্রথম এসেছিল শব্দ, তারপর আলো। ‘কুন’ শব্দ দিয়ে জন্ম হলো দুনিয়া। কুন মানে ‘হও’, ফা ইয়াকুন মানে ‘হলো’ …be and it is.

পদার্থবিদ্যার আদিতেও সেই শব্দ, the big bang, অতঃপর বিপুল নিনাদে বহুধা বিভাজিত হলো জগতের তাবৎ উপকরণ। উপনিষদ বলছে শব্দই ব্রহ্ম, ‘অহম ব্রহ্মাস্মি’ অর্থাৎ ‘আমিই ব্রহ্ম’ … I am the supreme being.

উপনিষদের এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে যেন মিলে যায় মনসুর হাল্লাজের ‘আইন্যাল হক’! ওদিকে ‘ওঁ’ ধ্বনিতে হলো পরম শিবের প্রথম প্রকাশ; আদি ধ্বনি ‘ওঙ্কার’ সব ধ্বনির মূল, আদি মন্ত্রবীজ- সেও এক মানসিক তরঙ্গ।

আমরা কিন্তু সব শব্দ শুনি না। যেসব শব্দ আমাদের কানে আসে অর্থাৎ যা আমরা শুনতে পাই, তা নিশ্চয় কোথাও ধ্বনিত হয়। নিশ্চয় কোনো একটা আঘাত বা স্পন্দন থেকে তার উদ্ভব হয়। আঘাত থেকে উদ্ভব বলে এদের নাম ‘আহত শব্দ’।

অন্যদিকে যে শব্দ আমরা শুনি না, কোনো দৃশ্যমান আঘাত থেকে যার উদ্ভব হয়নি, হয়েছে অন্তরস্থ প্রজ্ঞা থেকে, রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘হৃদয় দিয়ে হৃদি অনুভব’এর মতো, যা সাধনা করে শুনতে হয়, সেই সব শব্দের নাম ‘অনাহত শব্দ’। কোনো এক বায়ুহীন অন্তরীক্ষে পৌঁছাতে পারলেই কেবল তা শুনতে পাওয়া যায়।

কেবল তান্ত্রিক সাধনা নয়; সত্যিকার প্রেমে পড়লেও অনাহত শব্দ শোনা যায়। যে প্রেমে কোনো আবরণ নেই, যে মগ্ন মুহূর্তে জীব বা জগতের আর কিছু টের পাওয়া যায় না, তখন অনাহত শব্দেরা অন্তরে রসক্রীড়া করে। যেমন প্রেমিকার অন্তর যখন বলে ‘কই তুমি?’ প্রেমিক তা স্পষ্ট শুনতে পায়।

আবার সে যখন ডাকে না মোটেই, সেই সাউন্ড অব সাইলেন্সও প্রেমিকের কানে বিষাদ বেদনা বাজায় (কৌশিক গাঙ্গুলির ‘শব্দ’ সিনেমায় এর সামান্য ইঙ্গিত আছে)।

কোনো বিশেষ সাংস্কৃতিক বা সামাজিক কারণে কিছু কিছু শব্দের প্রতি কারও অহেতুক অনুরাগ বা বিরাগ থাকতে পারে। ব্যক্তি ও সমাজ ভেদে একই শব্দের ভিন্ন ভিন্ন অর্থ থাকতে পারে। শব্দটা শোনা, দেখা, পড়া বা ভাবামাত্রই মনে একটা নিজস্ব অর্থ বা দৃশ্য ভেসে ওঠে। আমরা সহ্য করতে পারি না। ওই নিরীহ শব্দটাই তখন যেন প্রবল প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। এমন প্রথাবদ্ধ শব্দপ্রেম বা শব্দঘৃণা অহরহ দেখা যায়।

আমাদের মনে আছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ঘটনাটি। একজন ভর্তিচ্ছু ছাত্রের টি-শার্টে ‘Fuck the System’ লেখা দেখে একজন শিক্ষক কেমন রেগে গিয়ে ছাত্রটিকে শার্ট খুলে উল্টো করে পরতে বাধ্য করেছিলেন এবং নিজের ফেসবুকে লিখেছিলেন, ‘এই নির্মল ক্যাম্পাসে এই ধরনের অসভ্যতা কখনও মেনে নেয়া যায় না।’

‘ফাক’ শব্দটা দেখার পর এখানে শিক্ষকটির মনে যা ভেসে উঠেছে তা তার বিবেচনায় নিশ্চয় অশ্লীল, তিনি মনে করেছেন সামান্য এই শব্দটি হয়তো তার বা তার প্রতিষ্ঠানের কৌলিন্য হরণে সক্ষম, তিনি শব্দটি ঢেকে দিয়েছেন।

অথচ ‘ফাক’ শব্দের এমন অর্থও হতে পারে যা কেবল দুটি প্রত্যঙ্গ সংশ্লিষ্ট নয়, যা ‘মানি না’, বা ‘বদলাতে চাই’ বা ‘বস্তাপচা’ ইত্যাদি নানা অর্থ বহন করতে পারে। যেমন কবি এলেন গিন্সবার্গ লিখেছিলেন, ‘America when will we end the human war? Go fuck yourself with your atom bomb’. তিনি নিশ্চয় এটম বম্ব কোথাও ‘ঢোকানো’ বোঝাননি।

‘সতী’ শব্দটি বাঙালির নিজস্ব। এটা নারীর একটা বিশেষ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের ধারণাকে ইঙ্গিত করে। মজার ব্যাপার, বাংলা ভাষায় এই শব্দের বিপরীতার্থক পুরুষলিঙ্গবাচক কোনো শব্দ নেই।

কেউ হয়তো বলবেন ‘সৎ’, কিন্তু তখন প্রশ্ন করাই চলে, নারী কি সৎ হতে পারেন না? যে অর্থে নারী ‘সতী’ সেই অর্থে পুরুষের জন্যে কোনো শব্দ নেই। যে অর্থে নারী ‘অসতী’ সে অর্থে একজন পুরুষ কী?

‘বেশ্যা’ বলতে আমরা শাব্দিকভাবে ‘অর্থের বা অন্যবিধ প্রাপ্তির বিনিময়ে যৌনসংগমে সম্মত’ নারী বুঝলেও সাংস্কৃতিক বা ঐতিহাসিকভাবে যা বুঝি তার সঙ্গে অপমান, ঘৃণা, তাচ্ছিল্য জড়িয়ে আছে।

তাই শব্দ ব্যবহারে বিদ্বজ্জনেরা সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। কারণ শব্দ কেবল বাক্যস্থ পদ নয়, একটি বার্তা, একটি শক্তি এবং কখনও শব্দ একটি অটোসাজেশনও।

শব্দের একাধিক অর্থ, ব্যাপ্তি ও ব্যঞ্জনা থাকে। শাব্দিক অর্থের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক অর্থ বা প্রেক্ষাপটও শব্দের সঙ্গে যুক্ত থাকে। ভিন্ন ইতিহাস ও সংস্কৃতির দুজন মানুষ একই শব্দের দুই রকম অর্থ বুঝতে পারেন। আবার কোনো কোনো শব্দ একেবারেই একটি ভাষাভাষী গোষ্ঠীর নিজস্ব ধারণা ছাড়া আর কিছু বহন করে না- যেমন অভিমান, যেমন ভাত, যেমন নদী।

ভাতের সঙ্গে বাঙালির আত্মার সম্পর্ক। যে ‘স্বামী’কে দেবতা বলা হতো, সেই স্বামীকে ‘ভাতার’ও বলা হতো। ভাত দিত, তাই সে ভাতার। ‘ভাত দেয়ার মুরোদ নেই, কিল মারার গোঁসাই’ বলে মুখ ঝামটা দিয়েছেন নারীরা। অভিমান করে কেউ কেউ এখনও স্বামীদের বলেন, ‘তোমার ভাত আর খাবো না।’ মানে তোমাকে ছেড়ে চলে যাব।

এক ফসলি জমি ছিল। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে ছিল প্রচণ্ড অভাব। দিনের পর দিন ভাত থাকত না। ভাতের হাঁড়িতে কেবল কাঁঠাল সেদ্ধ খেতে দেখেছি। ভিখারিদের ভাত চাওয়ার সাহস ছিল না। ক্ষীণ কণ্ঠে ‘একটু ফ্যান দ্যাও গো’ বলে দুয়ারে দাঁড়াত। বিভূতিভূষণের ‘পথের পাঁচালি’ বা হুমায়ূন আহমেদের ‘মধ্যাহ্ন’তে এই ভাত-ফ্যান-দুঃখ-বেদনার গল্প আছে। সত্যি গল্প।

সেই দেশে কৃষিতে অনেক উন্নতি হয়েছে। কৃষিবিদরা ইরি, বিরি ধান আবিষ্কার করেছেন আর কৃষক মাটির গায়ে হাত বুলিয়ে বুলিয়ে সেই ধান চাষ করেছেন। এবং সেই ভরসায় এ দেশের রাজনৈতিক নেতারা কম দামে ভাত খাওয়াবেন বলে ভোট নিয়েছেন।

তাই ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিকভাবে, আমাদের কাছে বলগ ওঠা ভাতের হাঁড়ির গুড়গুড় শব্দ মালহারের চেয়েও মধুর, ভাপ ওঠা গরম ভাতের গন্ধ শ্যানেল পারফিউমের চেয়েও সুগন্ধি।

থালাভরা শিউলিফুল ভাতের সঙ্গে সামান্য তরকারি আর একটু নিশ্চিন্তে ঘুমাবার ব্যবস্থা করে দিলেই যে বাঙালিকে অনায়াসে শাসন করা যায়। তাই বাঙালির কাছে ‘ভাত’ একটা মাটিগন্ধি হৃদয়ঘটিত ব্যাপার, ‘রাইস’ এর সঙ্গে এর বিন্দুমাত্র মিল নেই। অভিমান, নদী ইত্যাদি আমাদের এমন অনেক নিজস্ব শব্দেরও নিজস্ব অর্থ আছে যা অন্য কারও সঙ্গে মিলবে না।

ভাষাকে উন্নত করা যায়। ভাষায় প্রতিদিন যোগ-বিয়োগ ঘটে। নতুন শব্দ যুক্ত হয়, পুরোনো শব্দ হারিয়ে যায়। যেমন ‘মহকুমা’ হারিয়ে গেছে।

এই নিরন্তর পরিবর্তনের যাত্রাপথে আমাদের দায়িত্ব হলো, কারও জন্য অবমাননাকর ও বৈষম্যসৃষ্টিকারী শব্দ (যেমন বেশ্যা, মহিলা, মুচি, মেথর ইত্যাদি) পরিহার করা। আর যে শব্দের সঙ্গে আমাদের নিজস্ব ইতিহাস আর মায়ার বাঁধন আছে, তা বেশি ব্যবহার করা। তবে এ-ও সত্যি সময়ের পরিবর্তনে প্রয়োগের স্থান সংকুচিত হয়ে এলে আমাদের ইচ্ছা থাকলেও এ ধরনের অনেক শব্দ হারিয়ে যাবে।

লেখক: মানবাধিকারকর্মী

আরও পড়ুন:
আমেরিকার গৃহহীনরা কেন বারবার জেলে যেতে চান
ভাষা শেখার বই পেল ত্রিপুরা পল্লীর শিশুরা
রুশ আর বাংলা ভাষার ‘নতুন হাট’
রক্তভেজা ১৯ মে: বাংলা ভাষার জন্য আত্মদান
মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার দায় সবার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Death of Tarek Mishuk Dr Haque is respectful despite the anger of fellow passengers

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীর ও চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাসের চালক জামির হোসেন। ছবি: সংগৃহীত
অধ্যাপক সামছুল হকের গবেষণাকে ‘বিজ্ঞানের দোহাই দেয়া মনগড়া’ আখ্যায়িত করে বিবৃতি দিয়েছেন ক্যাথরিন মাসুদ, নাহিদ মাসুদ, দিলারা বেগম জলি, ঢালী আল মামুন, মনিস রফিক, মো. সাইদুল ইসলাম সাঈদ ও মঞ্জুলী কাজী। এর পরিপ্রেক্ষিতে ড. সামছুল হক বলছেন, তিনি মাইক্রোবাসে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরদের সহযাত্রী-স্বজনদের ক্ষোভের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তবে তার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ‘বিজ্ঞানের রূঢ় বাস্তবতা’।

মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় খ্যাতিমান চিত্রপরিচালক তারেক মাসুদ এবং শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরীর ছেলে এটিএন নিউজের সাবেক প্রধান নির্বাহী মিশুক মুনীর নিহত হওয়ার মামলায় বিচারিক আদালতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান বাসচালক জামির হোসেন।

বিচারিক আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল নিষ্পত্তির আগেই কারাবন্দি অবস্থায় ২০২০ সালের ১ আগস্ট মারা যান জামির। কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে থাকার সময়ে ঈদের দিন তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন, পরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত বলে জানান।

দুর্ঘটনার জন্য বিচারিক আদালতে জামির দোষী সাব্যস্ত হলেও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. সামছুল হকের অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে, বাসচালক জামির ছিলেন ‘নির্দোষ’। তিনি মনে করছেন, জামির হোসেন নয়, ওই দুর্ঘটনার মূল দায় ছিল তারেক মাসুদদের বহনকারী মাইক্রোবাসের চালক মোস্তাফিজুর রহমানের। দুর্ঘটনায় মোস্তাফিজও মারা যান।

তবে অধ্যাপক সামছুল হকের গবেষণাকে ‘বিজ্ঞানের দোহাই দেয়া মনগড়া’ আখ্যায়িত করে তা প্রত্যাখ্যান করে বিবৃতি দিয়েছেন ক্যাথরিন মাসুদ, নাহিদ মাসুদ, দিলারা বেগম জলি, ঢালী আল মামুন, মনিস রফিক, মো. সাইদুল ইসলাম সাঈদ ও মঞ্জুলী কাজী।

তাদের অভিযোগ, অধ্যাপক হক বাস মালিক-শ্রমিক নেতাদের মতো ‘স্বার্থান্বেষী মহলের মদতপুষ্ট হয়ে’ এমন কাজ করেছেন।

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
তারেক মাসুদ (বাঁয়ে) ও মিশুক মুনীর

এই বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে ড. সামছুল হক বলছেন, তিনি মাইক্রোবাসে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরদের সহযাত্রী-স্বজনদের ক্ষোভের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, তবে তার অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ‘বিজ্ঞানের রূঢ় বাস্তবতা’।

যা আছে বিবৃতিতে

নাহিদ মাসুদ শুক্রবার সবার পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে বিবৃতিটি পাঠান।

এতে বলা হয়, ‘মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক অধ্যাপক সামছুল হক যে অপপ্রচার চালাচ্ছেন আমরা ওই দুর্ঘটনায় আহত এবং নিহত চলচ্চিত্র কর্মীদের স্বজন ক্ষুব্ধ, আশ্চর্য ও মর্মাহত।

“দুর্ঘটনার এক দশক পরে, এ ব্যাপারে মাননীয় আদালতে একটি মামলার রায় নিষ্পত্তি হওয়ার পর এবং একটি মামলা এখনও বিচারাধীন থাকা অবস্থায় এই শিক্ষক ও তার সহযোগী গোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে তার ভাষায় একটি ‘বিজ্ঞানসম্মত’ ব্যাখ্যা দিয়ে বলছেন– বাসের চালক নয়, একটি ভ্যানচালক ও চলচ্চিত্র কর্মীদের গাড়ির চালক ভুল দিকে ছিল বলে সংঘর্ষ হয়েছে।”

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘দুই বছর আগেও তিনি এই নিয়ে আলোচনা সভা করেছেন ও অনলাইন মিডিয়াতে তার মতবাদ প্রকাশ করেছেন। আমরা তখন কোনো জবাব দিইনি, কারণ যা সত্য তা অনেক আগেই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সম্প্রতি তিনি একই মতবাদ আবার শুধু নিজে প্রচার নয়, উচ্চপর্যায়ের সরকারি ও সরকারি দলের কর্তা ব্যক্তিদের মাঝে প্রচারণা ও উসকানি ছড়াচ্ছেন।

‘কর্তা ব্যক্তিদের একজন এমন মন্তব্য করেছেন যা শুধু আমাদের কেন, আইনের শাসনব্যবস্থার প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন। আমরা মনে করি, এহেন একজন ব্যক্তিবিশেষের মতবাদকে সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং বাস মালিক শ্রমিক নেতাদের মতো স্বার্থান্বেষী মহলের মদদপুষ্ট।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
তারেক মাসুদ ও ক্যাথরিন মাসুদ

ঘটনাস্থলের যেসব ছবি, ভিডিও এবং অডিও দিয়ে অধ্যাপক হক তার মতবাদ জোরালো করেছেন তা দুর্ঘটনার দিন থেকে জনগণের কাছে উন্মুক্ত ছিল বলেও উল্লেখ করা হয় বিবৃতিতে।

এতে বলা হয়, ‘দুর্ঘটনাস্থলে কোনো সিসিটিভি ছিল না, কাজেই ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী এবং গাড়ির জীবিত যাত্রীরা প্রকৃত ঘটনার সবচেয়ে সুনির্দিষ্ট বর্ণনা দিতে পারবেন। অধ্যাপক হকের তথাকথিত বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ, তার প্রাপ্ত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি ধারণামাত্র। তার কাছে যদি তথ্য থেকেও থাকে তবে তা বড়জোর আংশিক, কারণ তিনি গাড়ির জীবিত কোনো যাত্রীর সঙ্গে কথা বলেননি।

‘মামলা চলাকালীন আদালতে সাক্ষ্য দেয়ার কথাও ভাবেননি আর মামলার বিবাদী পক্ষও তাকে সাক্ষী তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেনি। অন্যদিকে জীবিত সাক্ষীরা আদালতে জবানবন্দিতে আমরা যা দেখেছি তাই বলেছি– মাইক্রোবাস বাঁ লেনেই ছিল। ওই ভয়ানক মুহূর্তটি আমরা কখনও ভুলব না।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
মানিকগঞ্জে সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর প্রশস্ত করা হয়েছে রাস্তার বাঁক, বসানো হয়েছে ডিভাইডার

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘আমাদের আশঙ্কা বাস মালিক-শ্রমিক নেতাদের স্বার্থ রক্ষার্থে এই অপপ্রচার করা হচ্ছে। আমরা আহ্বান জানাব, এ ধরনের অপপ্রচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সবাইকে আর অপমানিত করা হবে না।

‘এই সড়ক দুর্ঘটনার মীমাংসিত ও চলমান মামলাগুলোকে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় একটি যুগান্তকারী মাইলফলক, তাকে অযথা প্রশ্নবিদ্ধ করলে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত যাত্রী ও চালকদের পরিবার ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করার বিশ্বাস হারিয়ে ফেলবে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কিছু হতে পারে না।’

বিজ্ঞান রূঢ়, কিন্তু বিজ্ঞান দিয়েই বিশ্লেষণ করেছি: ড. সামছুল হক

এই বিবৃতির পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওনারা যেহেতু ভিকটিমের ফ্যামিলি, আমি তাদের শ্রদ্ধা জানাই। প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিকভাবেই তারা তাদের মতো করে দেবেন। তবে আমরা যারা গবেষণা করি তারা কোনো পক্ষে-বিপক্ষে নয়, বরং বিজ্ঞানের মাধ্যমে সত্যটাকে অনুধাবনের জন্য করি।’

তিনি জানান, নিজের গবেষণাটি তিনি আইনমন্ত্রী আনিসুল হককে ও মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী সারা হোসেনকে অনেক আগেই দেখিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘আইনমন্ত্রী নিজেও বলেছেন, সড়কের দুর্ঘটনা রিপোর্টগুলো আমাদের প্রচলিত পদ্ধতিতে দেয়া উচিত নয়।’

গবেষণাটি করার পেছনে দুটি লক্ষ্য রয়েছে অধ্যাপক সামছুল হকের। প্রথমটি হলো, বিচারিক আদালতে এ ধরনের মামলার বিচারের ক্ষেত্রে যেন একটি বিশেষ কারিগরি কমিটি গঠন করা যায়। অন্যটি হলো, এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা যেন আর না ঘটে।

তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পেছনে গাড়ির ত্রুটি দায়ী থাকতে পারে, অপারেশনে ত্রুটি থাকতে পারে, এনফোর্সমেন্ট ত্রুটি থাকতে পারে এগুলো বেশ জটিল। বাইরের দেশে ইনস্যুরেন্স ক্লেইম দিতে হয়ে এবং তদন্ত প্রক্রিয়া শেষ করার জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক একটি আলাদা তদন্ত হয়। তবে বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা বা তদন্তের কোনো সুযোগ রাখা হয়নি।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের অধ্যাপক ড. সামছুল হক

ড. হক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই মেসেজটা দেয়াই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য, যাতে করে আমরা এ ধরনের বিচারগুলো বিশেষ দৃষ্টিতে দেখি এবং এ ধরনের ঘটনার যাতে পুনরাবৃত্তি না হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমার পূর্ণাঙ্গ রিপোর্টে দুর্ঘটনাটির প্রথম দায় দিয়েছি সড়ক বিভাগকে। আমার কমিউনিটি, আমার শিক্ষার্থীরা এতে রাগ করবেন কি না, আমি সেটা বিবেচনায় নিইনি। তথ্য-উপাত্ত নির্দেশ করছিল, ওই রাস্তার যথেষ্ট ত্রুটি ছিল। এর দায় তারা এড়াতে পারে না।

‘সেই সঙ্গে বিআরটিএ দায় এড়াতে পারে না। গাড়িটি দুই বছর ধরে ফিটনেসবিহীন, রুট পারমিটবিহীন চলছিল। পুলিশও এর দায় এড়াতে পারে না।’

তিনি বলেন, ‘তারপর আমি এসেছি বিচার-বিশ্লেষণে। এতে দেখেছি যেভাবে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করে বাসচালকের দায় নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই প্রক্রিয়াটি বিশুদ্ধ ছিল না। আমার দৃষ্টিতে এখানে একটা নিরপেক্ষ বিচার হয়নি। আমি সেই বার্তাটি দিতে চেয়েছি। আমি যদি ভিকটিম পরিবারের হতাম, হয়তো আমিও এতে ক্ষুব্ধ হতাম।’

ড. সামছুল হকের মতে, বিজ্ঞান হলো এমন একটা বিষয় যা সব সময় সত্যকে তুলে ধরে।

তিনি বলেন, ‘আমি তাদের (বিবৃতি দানকারীদের) অনুভূতিকে শ্রদ্ধা জানাই। সেখানে তথাকথিত বা এ ধরনের অন্য কিছু তারা বলে থাকলেও, আমি মনে করি এটা অনুভূতির একটি বহিঃপ্রকাশ। তবে বিজ্ঞান রূঢ়। এই বিজ্ঞানের সাহায্যে আমি ঘটনাটিকে বিশ্লেষণ করেছি।

‘আমার মোদ্দা কথা হলো, কোথাও আগুন ধরার ঘটনা পরে বিচারিক আদালতে গড়ালে, সেখানে কিন্তু বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট বা ইলেকট্রিক ম্যালফাংশনের বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে একটা বিশেষজ্ঞ টিম থাকে। এটা হলো টেকনিক্যাল ব্যাপার। পুরো পৃথিবীতে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে যে তদন্তটি হয় সেটি সবচেয়ে জটিল।’

মাইক্রোবাস আরোহীদের সঙ্গে কথা না বলা, সিসিটিভি ফুটেজ না থাকার যে বিষয়গুলো বিবৃতিতে এসেছে তা নিয়েও কথা বলেন ড. সামছুল হক।

তিনি বলেন, ‘বিশ্লেষণ যদি পুরোটা দেখা হয়, তাহলে দেখা যাবে কী পরিমাণ তথ্য-উপাত্ত সেখানে রয়েছে। তারা বললেন, এই দুর্ঘটনার ছবি সবার কাছে আছে। কিন্তু ‍তারা যদি এটার বিশ্লেষণটা দেখতেন, আমার ধারণা তারা এভাবে কথা বলতেন না।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
ড. সামছুল হকের অনুসন্ধানের ভিত্তিতে নির্মিত ডক্যুফিল্ম ‘সোশ্যাল ক্রসফায়ার’-এর একটি দৃশ্য

অনুভূতি বা প্রতিক্রিয়া এবং বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানকে আলাদা রাখতে চান অধ্যাপক হক। তিনি বলেন, ‘ছবি-তথ্য সবার কাছে আছে, কিন্তু একজনও রিড করতে পারেননি। দুর্ঘটনা বড় গাড়ি ও ছোট গাড়ির মধ্যে হলে কে কাকে ঠেলে সরিয়ে দেয়? প্রথমটি হলো সংঘর্ষ ঘটার অবস্থান, অপরটি সর্বশেষ অবস্থান। সর্বশেষ অবস্থানটা কিন্তু দুর্ঘটনার স্থান নয়।

‘ওনারা সত্যিকার অর্থে আমার প্রেজেন্টশনটা দেখলে হয়তো এটা বলতেন না। তখন তারা বিষয়টি জানতেন, তখন এমন কথা বলতে গেলে দ্বিধা হতো।’

সবার জন্য তার গবেষণাটি উন্মুক্ত জানিয়ে সামছুল হক বলেন, ‘আমি ওপেন মাইন্ডেড। যে কেউ যদি ব্যাখ্যা চায়, আমি আছি। দ্বিমত থাকতে পারে, কিন্তু আমি প্রচুর সময় দিয়ে বিশ্লেষণটি করেছি। যাতে বিজ্ঞানকে আমার মতো করে ব্যাখ্যা না করি।

‘দ্রুত ও বেপরোয়া গতির গতানুগতিক ধারণার বাইরেও যে বিজ্ঞান আছে, এর বাইরেও যে অন্য কোনো পক্ষের দায় থাকতে পারে, এই সিদ্ধান্তে আসতে গেলে উদারদৃষ্টি থাকতে হয়। উদার দৃষ্টি তৈরি হয় বিশ্লেষণগুলো দেখার পর। আমার কাজটি ছিল সেই বিশ্লেষণ তুলে ধরা। কেউ যদি স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে ব্যাখ্যা চায় আমি দিতে প্রস্তুত। কারণ জ্ঞান সমাজের জন্য, দেশের জন্য, উন্নয়নের জন্য।’

কী আছে ড. সামছুল হকের অনুসন্ধানে

মর্মান্তিক ওই সড়ক দুর্ঘটনাটি নিয়ে নিউজবাংলাকে এর আগে নিজের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছিলেন অধ্যাপক সামছুল হক। সে সময় তিনি বলেন, ‘তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরের মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক একটি ঘটনা। ওই দুর্ঘটনার পর পরই আমি এর কারণ গভীরভাবে খতিয়ে দেখতে শুরু করি। অনুসন্ধানের একদম শুরুতে কয়েকজন ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক আমাকে ব্যাপক সহযোগিতা করেছিলেন।

‘তারা প্রথম দিনে ঘটনাস্থলের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ছবি আমাকে পাঠিয়েছিলেন। কিছু ছবি তোলা হয়েছিল উঁচু গাছ থেকে, যেগুলো আমার কাছে ছিল সারকামসটেন্সিয়াল এভিডেন্সের মতো। সেসব ছবি দেখে আমি বুঝেছিলাম, এখানে অনেক কিছু বলার মতো বিষয় লুকিয়ে আছে।’

তিনি বলেন, ‘সাংবাদিকদের কাছ থেকে আরও বেশ কিছু কনটেন্ট পেয়েছিলাম। এর মধ্যে একটি ভিডিও ছিল, যেখানে বাসের উইন্ডশিল্ডের কাছে বসা একজন নারীর কথা ছিল। তার সাবলীল বিবরণ থেকে আমি বুঝতে পেরেছিলাম, দুর্ঘটনাস্থল থেকে অনেক নতুন কিছু পাওয়ার আছে।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে রাখা সেই মাইক্রোবাসটির সামনে ক্যাথরিন মাসুদ

ড. সামছুল হক নিজেও পরদিন দুর্ঘটনাস্থলে যান। বিভিন্ন আলামত নিবিড় পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি কথা বলেন স্থানীয় লোকজন ও তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘একে একে বিভিন্ন বিষয় আমার কাছে স্পষ্ট হচ্ছিল, সেই সঙ্গে সাধারণ বিবরণের মধ্যে গোঁজামিলগুলোও ধরা পড়ছিল। তখনও আমি দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটি ভালোভাবে দেখতে পারিনি। ওটা একদম চ্যাপ্টা হয়ে গিয়েছিল। মাইক্রোবাসে কে কার পাশে বসেছিলেন, সেটা তখনও আমি জানতাম না।’

তিনি বলেন, ‘অনুসন্ধানের পাশাপাশি তদন্ত কমিটির রিপোর্টের অপেক্ষা করছিলাম। তিন সদস্যের এ কমিটির সঙ্গে আমার একজন সাবেক ছাত্রও যুক্ত ছিলেন। তিনি আমাকে অনেক সহযোগিতা করেছেন। একই সঙ্গে আমার কাছে যেসব তথ্য-প্রমাণ ছিল, সেগুলো একসূত্রে গাঁথার চেষ্টা করছিলাম। তবে এর মধ্যে খণ্ড খণ্ড বেশ কিছু মিসিং লিংক ছিল।

‘এর মধ্যেই ডেইলি স্টারে তারেক মাসুদের সহকারী মনিস রফিকের একটি সাক্ষাৎকার ছাপা হয়। মনিস ছিলেন মাইক্রোবাসচালকের ঠিক পাশের আসনে; দুর্ঘটনায় তিনিও সামান্য আহত হন। মনিসের বক্তব্য থেকে এমন কিছু বিষয় পাই, যেটি আমার প্রাথমিক অনুসন্ধানকে একটি কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসতে সাহায্য করে।’

ড. সামছুল হক বলেন, ‘সাধারণভাবে যেকোনো দুর্ঘটনা ঘটার আগে গাড়ির হার্ড ব্রেক কষার কথা। হার্ড ব্রেক অ্যাপ্লাই করলে রাস্তায় একটি স্কিড মার্ক পাওয়া যায়। আর সেই স্কিড মার্ক পেলে গাড়ির আসল অবস্থান চিহ্নিত করা যায়। অথচ আমি রাস্তায় কোনো স্কিড মার্ক পাইনি।

‘আমরা যারা দুর্ঘটনা বিষয়ে কাজ করি, তাদের কাছে বিষয়টি গোলমেলে। আমি তখন ভাবার চেষ্টা করছিলাম, বৃষ্টির কারণেই রাস্তায় হয়তো স্কিড মার্ক নেই। তবে সেটা মিলছিল না। স্কিড মার্ক এমন একটি বিষয় যার কোনো না কোনো চিহ্ন থাকবেই। কারণ এ সময় চাকার প্রচণ্ড ঘর্ষণে রাস্তার পাথরকুচি উঠে যায়।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
মানিকগঞ্জ থেকে ঢাকায় ফেরার পথে তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরদের দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাস

তিনি বলেন, ‘তাহলে কেন এ ধরনের চিহ্ন নেই- সেটি নিয়ে ঘুরপাক খাচ্ছিলাম। অবশেষে সেই প্রশ্নের জবাব পাওয়া গেল মনিস রফিকের সাক্ষাৎকারে। তিনি বলেছিলেন, সেদিন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছিল। মাইক্রোবাসের পেছন দিকে যাত্রীরা মুখোমুখি বসে তুমুল আড্ডায় মেতেছিলেন। তার কথার প্রতিটি বিষয় আমার সামনে একেকটি চিত্র তৈরি করছিল। মাইক্রোবাসে মুখোমুখি কী করে বসা যায়! তার মানে সেটির আসনে পরিবর্তন আনা হয়েছিল। মনিস আরও বলেন, হঠাৎ একটি বাস দৈত্যের মতো তাদের মাইক্রোবাসে আঘাত করে।’

এই ‘হঠাৎ’ শব্দটি অনেক প্রশ্নের জবাব পাইয়ে দেয় ড. শামছুল হককে। তিনি বলেন, ‘হঠাৎ হলেই তো গাড়ির স্কিড মার্ক পাওয়া যায় না! কিছু দূর আগে থেকে দেখতে পেলেও হার্ড ব্রেক কষা সম্ভব, কিন্তু কী এমন পরিস্থিতি সেখানে তৈরি হয়েছিল যে কারণে বাসটিকে তারা হঠাৎ দেখতে পেলেন!’

এরপর আবার দুর্ঘটনাস্থলে যান ড. সামছুল হক। এ সময় স্থানীয় একজনের বক্তব্য পাওয়া যায়। এ ছাড়া পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজনের বক্তব্য ছাপা হয়।

এসব থেকে পরিষ্কার হয়, দুর্ঘটনার ঠিক কিছু আগে একটি বড় বাস রাস্তার বাঁকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি অটোরিকশাকে ওভারটেক করে। ওই বাসটির পিছু পিছু একই দিকে যাচ্ছিল তারেক মাসুদদের মাইক্রোবাস। ওই বাসটির পিছু নিয়ে তারেক মাসুদদের মাইক্রোবাসটি অটোরিকশাকে একইভাবে ওভারটেক করতে বাঁকের মুখে নিজের ডান লেনে চলে গিয়েছিল। এ সময়েই বাঁকের বিপরীত দিক থেকে আসা জামির হোসেনের বাসের সঙ্গে মাইক্রোবাসটির সংঘর্ষ হয়।

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
ড. সামছুল হকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দুর্ঘটনার ঠিক আগমুহূর্তে মাইক্রোবাস ও বাসের অবস্থান

ড. সামছুল হক বলেন, ‘অটোরিকশাকে ওভারটেক করা বাসটির চালক কিন্তু বাঁকের অন্য প্রান্তে বিপরীত দিক থেকে আসা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাসটিকে দেখতে পেয়েছিলেন। এর পরও তিনি ক্যালকুলেটেড (হিসাব করা) ঝুঁকি নিয়ে অটোরিকশাকে ওভারটেক করে আবার নির্ধারিত বাঁ লেনে বাসটিকে ফিরিয়ে নিয়ে যান। মহাসড়কে চলাচলকারী বাস-ট্রাক সাধারণত এ ধরনের হিসাবি ঝুঁকি নিতে অভ্যস্ত।

‘তারেক মাসুদদের মাইক্রোবাসটিও সামনের বাসটিকে অনুসরণ করে ডান লেনে চলে যায়। তবে একজন শহুরে চালকের জন্য কাজটি ছিল মারাত্মক ভুল। সামনের বাসের মতো তিনি আর মাইক্রোবাসকে আবার বাঁ লেনে নিতে পারেননি। আর এই ভুলের কারণেই বিপরীত দিক থেকে আসা চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাসটির সঙ্গে মাইক্রোবাসের সংঘর্ষ হয়।’

বিপরীত দিকের বাসের চালক জামির বাঁকের মুখে নিজের সঠিক বাঁ লেনেই ছিলেন বলে মনে করছেন ড. সামছুল হক।

তিনি বলেন, ‘উল্টো দিকে আকস্মিকভাবে ভুল লেনে চলে আসা মাইক্রোবাসের বিষয়ে চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাসচালক জামির হোসেনের কোনো প্রস্তুতি ছিল না। কারণ বাঁকের উল্টো দিক থেকে তিনি মাইক্রোবাসটিকে দেখতেই পাননি। আর এ জন্যই সেই হঠাৎ দুর্ঘটনা, যেখানে বাসচালক ব্রেক কষারও সময় পাননি।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
মাইক্রোবাসের সঙ্গে যেভাবে বাসের সংঘর্ষ

দুর্ঘটনার পর মাইক্রোবাসটিকে বিধ্বস্ত অবস্থায় রাস্তায় এর বাঁ দিকের লেনে পাওয়া যায়। ফলে মামলার রায়ে বিচারিক আদালতের বিচারক বিষয়টির উল্লেখ করে বলেন, ‘অবস্থাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে মাইক্রোবাসটি তার সঠিক লেনেই ছিল।’

তবে ড. সামছুল হক বলেন, এখানে বোঝার ভুল আছে। বিষয়টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা ড. সামছুল হক নিউজবাংলাকে বলেন, “সাংবাদিক বন্ধুদের কাছ থেকে আমি দুর্ঘটনাকবলিত মাইক্রোবাসটির টার্মিনাল পজিশনের বেশ কিছু ছবি পেয়েছিলাম। একটি দুর্ঘটনাকে বিশ্লেষণের জন্য ‘টার্মিনাল পজিশন’ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটা হলো দুর্ঘটনার পর মাইক্রোবাসটির চূড়ান্ত অবস্থান।”

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
মাইক্রোবাসে যাত্রীদের অবস্থান এবং যেভাবে আঘাত

তিনি বলেন, “এখানে লক্ষ করার বিষয় হলো, একটি বাসের সঙ্গে সংঘর্ষের পর কোনো মাইক্রোবাস যদি তার ‘সঠিক’ লেনে থাকে (যদিও সে অবস্থানটিও ছিল রাস্তার মাঝ বরাবর), তাহলে ধরে নিতে হবে দুর্ঘটনার আগের চিত্র ছিল অন্যরকম। কারণ একটি বাসের যে ভর ও গতি, তাতে সংঘর্ষের পর মূল অবস্থান থেকে মাইক্রোবাসটির বেশ কিছুটা দূরে সরে যাওয়ার কথা। মাইক্রোবাসের জীবিত আরোহীদের বক্তব্যেও সেটি জানা গেছে। ফলে দুর্ঘটনার পর মাইক্রোবাসটিকে রাস্তার মাঝ বরাবর পাওয়ার অর্থ হলো, প্রকৃতপক্ষে সেটি রং সাইডে ছিল। ধাক্কা খাওয়ার পর এর টার্মিনাল পজিশনটি পাওয়া গিয়েছিল মধ্যরাস্তায়।

“আর দুর্ঘটনার আগে মাইক্রোবাসটি সত্যিই নিজের বাঁ লেনে থাকলে ধাক্কা খাওয়ার পর সেটির রাস্তার কিনারায় বা রাস্তার পাশে চলে যাওয়ার কথা ছিল। এটাই হলো বিজ্ঞান। অথচ বিচারপ্রক্রিয়ায় এই বিজ্ঞানকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি।”

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
দুর্ঘটনার পর মাইক্রোবাস ও বাসটির অবস্থান

তিনি বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর মাইক্রোবাসের অবস্থা দেখে পরিষ্কার বোঝা গেছে, বাসের সঙ্গে এর আংশিক মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়েছিল। ডিভাইডারবিহীন একটি সড়কে এ ধরনের আংশিক মুখোমুখি সংঘর্ষ হতে হলে দুটি যানের যেকোনো একটিকে রং সাইডে থাকতে হয়। এ ক্ষেত্রে মাইক্রোবাস ও বাসের অবস্থান এবং সংঘর্ষে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত অংশ দেখে পরিষ্কার বোঝা যায়, মাইক্রোবাসটিই ওভারটেক করতে গিয়ে রং সাইডে ছিল। দুর্ঘটনার পর সরকারের গঠিত তদন্ত কমিটি ও মানিকগঞ্জ জেলা পুলিশের প্রতিবেদনেও বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। তবে মামলার বিচারের ক্ষেত্রে সেটি বিবেচনায় নেয়া হয়নি।’

দুর্ঘটনার জন্য সে সময় রাস্তার ‘অবৈজ্ঞানিক’ বাঁককেও দায়ী করছেন ড. সামছুল হক।

তিনি বলেন, ‘১১ ফুট প্রশস্ত ওই রাস্তায় কোনো বাঁক থাকলে রাস্তার বক্রতার ধরন অনুসারে অংশটি অন্তত ১৩ ফুট চওড়া হওয়ার কথা ছিল। তবে বাস্তবে তা ছিল না। একই সঙ্গে বাঁকটিতে গাছপালা থাকায় দৃষ্টিসীমা ছিল একদম কম।

‘ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে যেসব ব্ল্যাকস্পট ছিল, এই বাঁকটি তার একটি। মানিকগঞ্জের জোকায় তখন প্রতিবছর তিনটির বেশি করে দুর্ঘটনা ঘটছিল। এখন সেখানে ডিভাইডার করা হয়েছে, রাস্তা চওড়া হয়েছে, ফলে এখন আর দুর্ঘটনা হচ্ছে না।’

সারা দেশকে নাড়া দেয়া ২০১১ সালের ওই সড়ক দুর্ঘটনায় তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর ছাড়াও তাদের মাইক্রোবাসচালক মোস্তাফিজুর রহমান, প্রডাকশন সহকারী মোতাহার হোসেন ওয়াসিম ও জামাল হোসেন মারা যান। তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ, শিল্পী ঢালী আল-মামুনসহ আহত হন পাঁচজন।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মর্মান্তিক দুর্ঘটনার কয়েক দিন পরই জামির হোসেন মেহেরপুর গাংনীর চৌগাছা থেকে গ্রেপ্তার হন। তবে কয়েক মাস পরই জামিনে মুক্তি পান তিনি। এরপর ২০১৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়ার দিন থেকে মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি কারাগারে ছিলেন।

রায় ঘোষণা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিচারক দণ্ড ঘোষণার সময় আদালতের কাঠগড়ায় ‘নির্লিপ্ত’ দেখা যাচ্ছিল জামিরকে। রায়ের পর পুলিশ তাকে হাতকড়া পরিয়ে কারাগারে পাঠায়।

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
রায় ঘোষণার পর পুলিশ হেফাজতে বাসচালক জামির হোসেন

বিচারক আদেশে বলেন, ‘জামির হোসেনের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০৪ ও ৪২৭ ধারার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। তাকে ৩০৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও তিন মাস বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেয়া হলো। আর দণ্ডবিধির ৪২৭ ধারার অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে দুই বছরের সশ্রম কারাদণ্ড ও ২ হাজার টাকা জরিমানা এবং অনাদায়ে আরও এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো।’

আসামির উভয় দণ্ড একসঙ্গে চলবে বলেও আদেশ দেন বিচারক।

আরও পড়ুন: সেই বাসচালক জামিরের মৃত্যুর ২ বছরেও ঘূর্ণিজাল, জীবন সংশয়ে স্ত্রী

বিচার চলার সময় ৩২ জনের সাক্ষ্য নেয়া হয়। এর মধ্যে ছিলেন প্রত্যক্ষদর্শী ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কর্মকর্তা। আসামির পক্ষে দুজন সাফাই সাক্ষ্য দেন।

বিচারক রায়ে বলেন, ‘এজাহার, অভিযোগপত্র, খসড়া মানচিত্র, বিআরটিএর চিঠি, জব্দ করা ভুয়া ও মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স, নিশ্চিত মৃত্যু থেকে বেঁচে যাওয়া প্রত্যক্ষদর্শীর অভিন্ন ও অকাট্য সাক্ষ্যের ভিত্তিতে বলা যায়, আসামি বাসটিকে বৃষ্টি ও বাঁকের মধ্যে অবহেলার সঙ্গে বেপরোয়া গতিতে চালিয়ে একটি মিনিবাসকে ওভারটেক করে মাইক্রোবাসটিকে নির্মমভাবে আঘাত করেন। ফলে তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচটি তরতাজা প্রাণ ঝরে যায়। আসামির বেপরোয়া আচরণ ও অবহেলার কারণেই পাঁচজনের মৃত্যু হয়।’

আসামির পক্ষে আদালতে সাফাই সাক্ষ্য দেন চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্সের বাসটির যাত্রী শাহনেওয়াজ রয়েল ও অধ্যাপক নাসরিন আশরাফী।

তবে বিচারক রায়ে বলেন, ‘তাদের কেউই ওই বাসের যাত্রী হওয়ার প্রমাণ হিসেবে বাসের টিকিট আনেননি। এ দুজন সারা জীবনে এবং ঘটনার পর থেকে অসংখ্যবার বাসে ওঠার কথা। একটি নির্দিষ্ট দিনে কোন বাসে উঠেছিলেন তা মনে রাখা দুঃসাধ্য। তারা যদি ঘটনার পর কোনো ম্যাজিস্ট্রেট কিংবা তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে সাক্ষ্য দিতেন, তাহলে অনেকটাই বিশ্বাসযোগ্য হতো।

‘এ ছাড়া শাহনেওয়াজ সাক্ষ্য দেয়ার সময় বলেছেন, দুর্ঘটনাস্থলে কোনো বাঁক নেই। আর তিনি ছিলেন বাসের বাঁ দিকে চার আসন পেছনে। ফলে ডান দিকের বিষয় দেখা সম্ভবপর নয়। আর নাসরিন আশরাফীও বলেছেন, সেখানে বাঁক ছিল না। তার চশমার পাওয়ার ৩.৫০। ক্ষীণ দৃষ্টিশক্তির একজন বয়স্ক মহিলার পক্ষে দীর্ঘদিনের আগের বৃষ্টির মধ্যে সংঘটিত কোনো ঘটনার সঠিক বিবরণ দেয়া আদৌ সম্ভবপর নয়।’

তারেক-মিশুকের ‍মৃত্যু: সহযাত্রীদের ক্ষোভেও শ্রদ্ধাশীল ড. হক
বাসচালক জামির হোসেন

দুর্ঘটনার দুই বছর পর ২০১৩ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি নিহতদের পরিবারের সদস্যরা মানিকগঞ্জে মোটরযান অর্ডিন্যান্সের ১২৮ ধারায় বাসমালিক, চালক ও ইনস্যুরেন্স কোম্পানির কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ চেয়ে দুটি মামলা করেন।

পরে সংবিধানের ১১০ অনুচ্ছেদ অনুসারে জনস্বার্থে হাইকোর্টে বদলির নির্দেশনা চেয়ে আবেদন করলে ক্ষতিপূরণের মামলা দুটি হাইকোর্টে চলে আসে।

দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর তারেক মাসুদের পরিবারকে ৪ কোটি ৬১ লাখ ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বাসমালিক, চালক ও সংশ্লিষ্ট ইনস্যুরেন্স কোম্পানিকে নির্দেশ দেয় বিচারপতি জিনাত আরা ও বিচারপতি কাজী ইজারুল হক আকন্দের হাইকোর্ট বেঞ্চ। রায়ের কপি পাওয়ার তিন মাসের মধ্যে টাকা পরিশোধ করতে বলা হয়।

ক্ষতিপূরণের অর্থের মধ্যে বাসের (চুয়াডাঙ্গা ডিলাক্স) তিন মালিকের ৪ কোটি ৩০ লাখ ৮৫ হাজার ৪৫২ টাকা, বাসচালক জামির হোসেনের ৩০ লাখ টাকা এবং রিলায়েন্স ইনস্যুরেন্স কোম্পানির ৮০ হাজার টাকা দেয়ার কথা। এ টাকা ক্যাথরিন মাসুদ, তারেক মাসুদের ছেলে নিষাদ মাসুদ ও বৃদ্ধ মা নুরুন নাহার পাবেন বলে রায়ে বলা হয়।

হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে বাস মালিকপক্ষ, সেটি এখন আপিলে চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়। অন্যদিকে মিশুক মুনীরের পরিবারের ক্ষতিপূরণ চেয়ে করা মামলাটি হাইকোর্টে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে।

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Even during the crisis fruit import has increased 3 and a half times

সংকটকালেও ফল আমদানি বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ

সংকটকালেও ফল আমদানি বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ ফ্রেশ ফ্রুটস ক্যাটাগরিতে রয়েছে আপেল, কমলা, নাশপাতি, আঙুর, মাল্টা, মান্দারিন, আনার, ড্রাই চেরি, ড্রাগন ও স্ট্রবেরিসহ ৫২ রকমের ফল। ছবি: নিউজবাংলা
সব ধরনের ফল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। বন্ধ করে দেয়া হয় ব্যাংকের ঋণসুবিধা। কিন্তু সুস্বাদু ও পুষ্টিকর আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টাসহ কোনো ফলের আমদানিই কমেনি। বরং প্রতি মাসে আগের মাসের তুলনায় তা বেড়ে চলেছে।

দেশে ডলার সংকটের মধ্যে মে মাসে ফল আমদানিতে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করে সরকার। জুলাইতে বন্ধ করে দেয়া হয় পণ্য আমদানিতে ব্যাংকের ঋণসুবিধা। মনে করা হচ্ছিল, এসবের প্রভাবে দাম বেড়ে যাওয়ায় ফলের আমদানি কমে আসবে। কিন্তু ঘটেছে তার উল্টোটা। কমেনি, বরং আরও বেড়েছে ফলের আমদানি।

সুস্বাদু ও পুষ্টিকর আপেল, আঙুর, কমলা, মাল্টাসহ কোনো ফলের আমদানি কমেনি। প্রতি মাসে আগের মাসের তুলনায় তা বেড়ে চলেছে। চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরে প্রথম মাস জুলাইয়ের চেয়ে বিভিন্ন ধরনের ফল আমদানি ৬১ হাজার ৫৪০ মেট্রিক টন বেশি হয়েছে। শতকরা হিসাবে যা ২২০ শতাংশ বেশি।

জুলাইয়ে ফল আমদানি হয়েছিল ২৭ হাজার ৯৪৫ টন। নভেম্বরে তা প্রায় সাড়ে তিন গুণ বেড়ে ৮৯ হাজার ৪৮৪ টনে উঠেছে।

নভেম্বর মাস শেষ হওয়ার কয়েক দিন আগে তথ্য সংগ্রহ করায় পুরো মাসের আমদানির হিসাব পাওয়া যায়নি। পুরো মাসের হিসাব করলে ব্যবধানটা আরও বাড়বে।

সংকটকালেও ফল আমদানি বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ফ্রেশ ফ্রুটস’ ও ‘ড্রাই ফ্রুটস’- এই দুই ক্যাটাগরিতে দেশে সব ধরনের ফল আমদানি করা হয়। ছবি: নিউজবাংলা

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ‘ফ্রেশ ফ্রুটস’ ও ‘ড্রাই ফ্রুটস’- এই দুই ক্যাটাগরিতে দেশে সব ধরনের ফল আমদানি করা হয়। ড্রাই ফ্রুটস ক্যাটাগরিতে খেজুর, কিশমিশ ও বাদাম আমদানি করা হয়। ফ্রেশ ফ্রুটস ক্যাটাগরিতে রয়েছে আপেল, কমলা, নাশপাতি, আঙুর, মাল্টা, মান্দারিন, আনার, ড্রাই চেরি, ড্রাগন, স্ট্রবেরিসহ ৫২ রকমের ফল।

এসব ফল আমদানি হয় দক্ষিণ আফ্রিকা, চীন, নিউজিল্যান্ড, মিসর, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, ভারত, থাইল্যান্ড, তিউনিশিয়া, পোল্যান্ড ও ব্রাজিল থেকে।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইমপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক রাকিব হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের চাহিদার ৪০ শতাংশের মতো ফল দেশেই উৎপাদন হয়, বাকিটা আমদানি করতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমদানি করা এসব ফলের উৎপাদন দেশে নেই বললেই চলে। এ কারণে এসব ফলের প্রায় সবটাই আমদানি করে চাহিদা পূরণ করা হয়। সবচেয়ে বেশি আমদানি হয়ে থাকে আপেল, কমলা, আঙুর ও মাল্টা।’

চাহিদা মেটাতে প্রতি বছর দেশে বিপুল পরিমাণ ফল আমদানি করতে হয়। এর জন্য ব্যয় হয় বিপুল পরিমাণ বিদেশি মুদ্রা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ধাক্কায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিও বেশ চাপের মধ্যে পড়েছে। এই চাপ সামাল দিতে ব্যয় সংকোচনের জন্য নানা পদক্ষেপ নেয় সরকার। সেই পদক্ষেপের অংশ হিসেবে আমদানি ব্যয় কমাতে নেয়া হয় বিভিন্ন পদক্ষেপ। বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ যাতে আরও কমে না যায়, সে জন্য নেয়া হয় এ সব পদক্ষেপ।

সংকটকালেও ফল আমদানি বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ

জুলাইতে বন্ধ করে দেয়া হয় পণ্য আমদানিতে ব্যাংকের ঋণ সুবিধা। তবে সুস্বাদু ও পুষ্টিকর আপেল, আঙুর, কমলা ও মাল্টাসহ কোনো ফলের আমদানি কমেনি। ছবি: নিউজবাংলা

২৪ মে অপ্রয়োজনীয় ও বিলাসজাত পণ্যের পাশাপাশি সব ধরনের ফল আমদানি নিরুৎসাহিত করতে অতিরিক্ত ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক বা রেগুলেটরি ডিউটি (আরডি) আরোপ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)।

তার আগে নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্কহার ছিল মাত্র ৩ শতাংশ। এরপর সেটি দাঁড়ায় ২৩ শতাংশে। প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকেই তা কার্যকর করা হয়।

ফল আমদানিতে কাস্টমস ডিউটি (সিডি) ২৫ শতাংশ, ভ্যাট ১৫ শতাংশ, অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ এবং অ্যাডভান্স ট্রেড ভ্যাট ৪ শতাংশ নির্ধারিত ছিল।

ওই ঘোষণার পর থেকে এর সঙ্গে বাড়তি ২০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক পরিশোধ করতে হয় আমদানিকারকদের।

এত সব বিধিনিষেধের পরেও ধারাবাহিকভাবে ফল আমদানি বেড়েছে। জুলাই মাসে ফল আমদানি হয় ২৭ হাজার ৯৪৫ মেট্রিক টন। আগস্টে ৭ হাজার ৫৩৯ মেট্রিক টন বেড়ে ফল আমদানি হয় ৩৫ হাজার ৪৮৫ মেট্রিক টন।

আগস্টের তুলনায় ১০ হাজার ৩০৬ মেট্রিক টন আমদানি বৃদ্ধি পায় সেপ্টেম্বরে। আমদানি হয় ৪৫ হাজার ৭৯১ মেট্রিক টন ফল।

অক্টোবরে আমদানি দাঁড়ায় ৫৩ হাজার ৬৮১ মেট্রিক টনে, যা আগের মাসের তুলনায় ৭ হাজার ৮৯১ মেট্রিক টন বেশি।

নভেম্বরে আমদানি হয়েছে ৮৯ হাজার ৪৮৪ মেট্রিক টন, যা আগের মাসের তুলনায় ৩৫ হাজার ৮০৩ মেট্রিক টন, যা প্রায় ৬৭ শতাংশ বেশি।

এই তথ্যে দেখা যাচ্ছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ের চেয়ে সদ্য শেষ হওয়া নভেম্বর মাসে ২২০ শতাংশের বেশি ফল আমদানি হয়েছে। অর্থাৎ জুলাই মাসের চেয়ে নভেম্বরে ফল আমদানি বেড়েছে ৬১ হাজার ৫৩৪ টন।

তবে গত বছরের তুলনায় এই সময়ে ফল আমদানি কমেছে ১৭ শতাংশের বেশি। গত বছর জুলাই থেকে নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে ফল আমদানি হয় ৩ লাখ ৪ হাজার ৯১৭ দশমিক ২২ মেট্রিক টন।

সংকটকালেও ফল আমদানি বেড়েছে সাড়ে ৩ গুণ

ফ্রেশ ফ্রুটস ক্যাটাগরিতে আপেল, কমলা, নাশপাতি, আঙুর, মাল্টা, আনার, ড্রাই চেরি, ড্রাগন ও স্ট্রবেরিসহ ৫২ রকমের ফল আমদানি করা হয়। ছবি: নিউজবাংলা

বিপরীতে চলতি বছর আমদানি হয়েছে ২ লাখ ৫২ হাজার ৩৮৬ দশমিক ৯১ মেট্রিক টন, যা আগের বছরের তুলনায় ৫২ হাজার ৫৩০ দশমিক ৩১ মেট্রিক টন বা ১৭ দশমিক ২২ শতাংশ কম।

বাংলাদেশ ফ্রেশ ফ্রুটস ইম্পোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের দপ্তর সম্পাদক রাকিব হোসেন বলেন, ‘ডলারের দাম বেড়ে গেছে। অতিরিক্ত শুল্ক বসানো হয়েছে। আমদানি খরচ বেড়ে যাচ্ছে, ফলেও দাম বেশি পড়ছে।

বেশি দামে বিক্রি করতে গেলে মানুষ কিনছে না। তার ওপর ডলার সংকট থাকায় আমদানির এলসি খুলতেও সমস্যা হচ্ছে। তাহলে আমদানি কমবে না কেন? তাই ফল আমদানি কমেছে।’

আমদানির পরিসংখ্যান জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সারা দেশে আমাদের সংগঠনের সদস্য রয়েছে। যে যার প্রয়োজন মতো আমদানি করে। কত আমদানি হচ্ছে সেটার হিসাব আমাদের কাছে নেই, রাখাও সম্ভব নয়। সদস্যরা বিভিন্নভাবে আমদানি ও বিক্রি করে থাকে।’

ফল আমদানিতে কোনো নিষেধাজ্ঞা বা কড়াকড়ি ছিল না বলে জানান বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র জিএম আবুল কালাম আজাদ।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘ফলের ওপর বা কমার্শিয়াল এলসির ওপর নিষেধাজ্ঞা ছিল না বা নেই। এক্সটার্নাল সাইডে অসুবিধার কারণে ডলারের যে ডিমান্ড, সাপ্লাইয়ে সমস্যার কারণেই একটু সমস্যা হতে পারে। তবে কেউ যদি ওপেন করে বিধিনিষেধ নেই, কারণ এটা হলো খাদ্যদ্রব্য।’

তিনি বলেন, ‘আমদানি যে হচ্ছে, তা আশপাশের ছোটোখাটো দোকানে ফলের সমারোহ দেখলেই বোঝা যায়। আজকেও কমলা কিনলাম ২০০ টাকা কেজি। ভালো এবং অনেক বড় বড় কমলা। তার মানে যতটা চিন্তা করা হচ্ছে, অবস্থা ততটা খারাপ নয়। আমদানিতে খুব বেশি প্রভাব পড়েনি।’

অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও ফলের ক্রেতা কমেনি। মতিঝিলের খুচরা ফল বিক্রেতা সালমান ইসলাম বলেন, ‘ফলের সরবরাহও আছে, ক্রেতাও আছে। দাম বেশি। বিক্রি একটু কম। তাই বলে ক্রেতা নাই, এমন না।’

তিনি বলেন, ‘আগের বছর বাজারে যে পরিমাণ আমদানি হতো, তার চেয়ে কম হচ্ছে। এইটা পাইকারি বাজারে গেলেই বোঝা যায়। আগের যেখানে ১০ ট্রাক মাল নামতে দেখা যেত, সেখানে ৭ ট্রাক দেখা যায়।’

আমদানিকারক সংগঠনের নেতা রাকিব হোসেন বলেন, ‘ফল খাওয়া বিলাসিতা নয়। এটা মানুষের শরীরের জন্য প্রয়োজন। এ জন্য মানুষ এটাকে আর বাড়তি খরচ মনে করে না। এ জন্য ফলের চাহিদা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘শুল্কারোপ ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধিতে খরচ বেড়েছে ফল আমদানিতে, যার কারণে প্রতিটি ফলের দামই বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় বিক্রি কিছুটা কম, আমদানিও কম। তবে ক্রেতা এখনও আছে।’

আমদানি খরচ বৃদ্ধির প্রভাবে ফলের দাম বেড়েছে। খুচরা বাজারে ফল কেজিতে বেড়েছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত।

খুচরা বিক্রেতা ইলিয়াস হোসেন কিরণ বলেন, ‘ফুজি আপেল আগে বিক্রি করতাম ১৮০ টাকা কেজি, সেটা এখন ২৪০ থেকে ২৫০ টাকা। মাল্টা ছিল ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, সেটা এখন ২৫০০ টাকা। কমলার কেজি ছিল ১২০ টাকা, বর্তমানে সেটা ২০০ টাকা কেজি। এখন মৌসুম শুরু হয়েছে। ভারতীয় কমলা আসতে শুরু করেছে। দাম হয়তো একটু কমতে পারে।’

ক্রেতা জয়নাল আবেদিন বলেন, ‘ফলের দাম তো অনেক বেশি। আগের তুলনায় কম কিনি। পরিবারের সদস্যদের পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য না কিনে উপায় নেই।’

আরও পড়ুন:
দেরিতে আমদানি মূল্য পরিশোধের সুযোগ বাড়ল
বিশ্ববাজারে সারের পড়তি দামে স্বস্তি, আমদানি হচ্ছে ২ লাখ টন
আমদানি বিল যথাসময়ে পরিশোধ না করলে লাইসেন্স বাতিল
ব্যাংকগুলোকে আমদানি পণ্যের মূল্য যাচাইয়ের নির্দেশ
সরকারিভাবে পণ্য আনার আগেই ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Margin loans are a thorn in the neck of investors in dormant capital markets

ঘুমন্ত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর গলার কাঁটা মার্জিন ঋণ

ঘুমন্ত পুঁজিবাজারে বিনিয়োগকারীর গলার কাঁটা মার্জিন ঋণ ফ্লোর প্রাইস শেয়ারের দরপতন ঠেকাতে পারলেও মার্জিন ঋণধারীদের ক্ষতি ঠেকাতে পারছে না। ফাইল ছবি
এক্সাক্টলি বলতে পারছি না। তবে ৩৮ হাজার শেয়ার রয়েছে, এর একটা অংশ মার্জিনে কেনা। লাখ দেড়েক মার্জিনে ছিল। এর মধ্যে আমি কিছু শোধ করেছিলাম। তাতে সব মিলিয়ে শেয়ার প্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা করে লসে আছি। শেয়ার বিক্রি করতেও পারছি না। এ থেকে উত্তরণের কোনো উপায় আছে কিনা, আমার জানা নাই: মার্জিন ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়া বিনিয়োগকারী

১০ লাখ টাকা ঋণের বিপরীতে সম পরিমাণ টাকা ব্রোকারেজ হাউজ থেকে ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনেছিলেন আবুল কাসেম। তিন মাস ধরে বাড়ছে সুদ, কিন্তু ক্রেতা না পেয়ে শেয়ার বিক্রি করতে পারছেন না।

৩১ জুলাই থেকে পুঁজিবাজারে দ্বিতীয় দফায় যে ফ্লোর প্রাইস দেয়ার পর মাস দুয়েক পুঁজিবাজারে লেনদেন আর সূচকে ছিল চাঙাভাব। কিন্তু পুরো বাজারের ওপর পড়েনি এই চাঙাভাবের প্রভাব। ৩০ থেকে ৪০টি কোম্পানির শেয়ারদর অস্বাভাবিকহারে লাফ দিলেও সেপ্টেম্বরের শেষে একের পর এক কোম্পানি ফ্লোর প্রাইসে আসতে থাকে।

এক পর্যায়ে ফ্লোরে ফেরা কোম্পানির সংখ্যা ছাড়িয় যায় ৩০০টিতে। এর মধ্যে ৭০ থেকে ৮০টির কোনো ক্রেতা থাকে না। ২২০ থেকে ২৩০টি কোম্পানির লেনদেন এতই কম হয় যা ক্রেতা না থাকারই নামান্তর।

এমনও দেখা গেছে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া ২০টি কোম্পানির তালিকায় আছে, কিন্তু শেয়ার কিনতে অর্ডার বসাননি কেউ। ফ্লোর প্রাইসে মাঝেমধ্যে কেনা হয়েছে কিছু শেয়ার।

এই পরিস্থিতিতে ফ্লোর প্রাইস শেয়ারের দরপতন ঠেকাতে পারলেও মার্জিন ঋণধারীদের ক্ষতি ঠেকাতে পারছে না। এই ক্রেতাহীনতার সময় যত বাড়তে থাকবে, বিনিয়োগকারীর আর্থিক ক্ষতিও তত বাড়বে।

ফ্লোর প্রাইস আরোপের পর সূচক যখন বাড়ছিল তখন মার্জিন ঋণ নিয়ে শেয়ার কিনেছিলেন। সেগুলো বিক্রি করার আগেই শুরু হয় দরপতন, সেই সঙ্গে কমতে থাকে চাহিদা। ফলে সুদের চাপের পাশাপাশি দরপতনের ধাক্কা-দুই দিকেই ক্ষতি হচ্ছে তাদের।

বর্তমানে মূলধন ও মার্জিন ঋণের অনুপাত ১:১ বা প্রতি ১ টাকার বিপরীতে মার্জিন ঋণের পরিমাণ ১ টাকা। অর্থাৎ এক লাখ টাকার বিপরীতে আরও ১ লাখ টাকা ঋণ পাবেন একজন বিনিয়োগকারী।

ধরা যাক, দুজন বিনিয়োগকারীর মার্জিন ছাড়াই ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। আরেকজন ১ লাখ টাকার বিপরীতে সমপরিমাণ মার্জিন পেয়ে ২ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। কোনো একটি শেয়ার ১০০ টাকা দরে কেনা হলে দুজনের শেয়ারের পরিমাণ দাঁড়ায় যথাক্রমে ১০০০টি ও ২০০০টি।

যদি শেয়ারের কমে যায়, তাহলে মার্জিন ঋণধারীর ক্ষতি হয় দ্বিগুণ। যদি শেয়ারের দর ৮০ টাকায় নামে, তাহলে প্রথম বিনিয়োগকারীর লোকসান হবে ২০ হাজার টাকা। দ্বিতীয় বিনিয়োগকারীর লোকসান হবে ৪০ হাজার টাকা। কারণ, মার্জিন ঋণদাতা কোম্পানিকে পুরো টাকাই দিতে হবে। আর মাসে মাসে এখন বাড়তি টাকা যোগ হবে।

বর্তমানে বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজে মার্জিন ঋণের সুদের হার ১২ থেকে ১৪ শতাংশের মধ্যে। ১৩ শতাংশ সুদের হার ধরে হিসাব করলে মার্জিন ঋণধারী বিনিয়োগকারীকে বার্ষিক সুদ দিতে হবে ১৩ হাজার টাকা।

তাহলে প্রথম মাসে সুদ দিতে হবে ১ হাজার ৮৩ টাকা ৩৩ পয়সা। চক্রবৃদ্ধি হারে পরের ৫ মাসে সুদের পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ১ হাজার ৯৫ টাকা ৬৬ পয়সা, ১ হাজার ১০৬ টাকা ৯৩ পয়সা, ১ হাজার ১১৮ টাকা ৯২ পয়সা, ১ হাজার ১৩১ টাকা ০৪ পয়সা ও ১ হাজার ১৪৩ টাকা ২৯ পয়সা।

তাহলে মার্জিন ঋণের বিনিয়োগকারীকে ৬ মাসে সুদ দিতে হবে ৬ হাজার ৬৭৮ টাকা ৫৭ পয়সা। এতে তার বিনিয়োগ কমে যাবে সমপরিমাণ।

মার্জিন ঋণের লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হয় বলে মনে করেন ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ডিবিএ) সভাপতি রিচার্ড ডি রোজারিও।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এক লাখ টাকার লাভের চেয়ে দুই লাখ টাকার কিনলে লাভ বেশি। সবাই এই হিসাবই করেন। কিন্তু মার্জিন ঋণে বিনিয়োগ করে লাভের চেয়ে লোকসানই বেশি হয়, প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়।’

উদাহরণ টেনে ডিবিএ সভাপতি বলেন, ‘ধরুন কারও কাছে এক লাখ টাকা আছে। সমপরিমাণ ঋণ নিয়ে তিনি ১৩০ টাকা দরে ওরিয়ন ফার্মার শেয়ার কিনেছেন ১৫৩৮টি। বর্তমান দর ৮৩ টাকা। অর্থাৎ এই শেয়ারের বাজারদর নেমে এসেছে ১ লাখ ২৭ হাজার ৬৫৪ টাকায়। বিনিয়োগকারীর লোকসান ৭২ হাজার ৩৪৬ টাকা।

কিন্তু ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান তো এক টাকাও কম নেবে না। শেয়ার বিক্রির পর তারা পুরো টাকাই সমন্বয় করে নেবে। ফলে এই পুরো টাকাই কমবে মূলধন থেকে। তখন মূলধন ২৮ হাজারের নিচে নামবে। এর সঙ্গে যোগ হবে সুদ।

যদি ঋণ না নিয়ে সেই বিনিয়োগকারী ৭৬৯টি শেয়ার কিনতেন, তাহলে তার লোকসান হতো ৩৬ হাজার টাকার কিছু বেশি। এর সঙ্গে সুদের চাপও থাকত না। আবার যতদিন খুশি শেয়ার রেখে দিয়ে কম দামে কিনে কিছু সমন্বয়ও করতে পারতেন।

লোকসান জেনেও কেন ঋণ নেন বিনিয়োগকারীরা- এমন প্রশ্নের উত্তরে রিচার্ড ডি রোজারিও বলেন, ‘লোভ সংবরণ না করতে পেরে বিনিয়োগকারীরা এই ফাঁদে পা দেন।’

তিনি বলেন, ‘জুয়া খেলায় সর্বশান্ত হতে হয় জেনেও কি জুয়া খেলা ছেড়ে দেয়? এখানেও লাভের হিসাব করে কিন্তু লোকসানের কথা মাথায় রাখেন না।

‘আমাদের মার্কেটে ঋণ নিয়ে বিনিয়োগকারীর সংখ্যা অনেক। আমাদের হাউজ থেকে লোন দেই না বলে অনেক ক্লায়েন্ট চলে যায়।’

কেমন লোকসানে বিনিয়োগকারীরা

জনতা ব্যাংকের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘মার্জিন ঋণে বিনিয়োগ করে বিপদে পড়ে গেছি। শেয়ারদর কমে যাচ্ছে। এর ওপর আবার ইন্টারেস্ট বাড়ছে। সে ক্ষেত্রে ইক্যুইটির ওপর আঘাত আসছে।’

আরও বিস্তারিত জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘যেমন ওরিয়ন ফার্মা কেনা আছে ১৪৩ টাকায়। সেটা এখন প্রায় অর্ধেকে আছে। বিক্রি করতে পারছি না। আবারও সুদও বাড়ছে। এটা একটার কথা বললাম।’

খুলনার ব্যবসায়ী জি এম মাহির বলেন, ‘কয়েকটা ইন্স্যুরেন্স কেনা ছিল। ৫৪ টাকা ছিল এখন ৪০ টাকার নিচে।’

বর্তমানে কত লোকসানে আছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এক্সাক্টলি বলতে পারছি না। তবে ৩৮ হাজার শেয়ার রয়েছে, এর একটা অংশ মার্জিনে কেনা। লাখ দেড়েক মার্জিনে ছিল। এর মধ্যে আমি কিছু শোধ করেছিলাম। তাতে সব মিলিয়ে শেয়ার প্রতি ১০ থেকে ১৫ টাকা করে লসে আছি। শেয়ার বিক্রি করতেও পারছি না। এ থেকে উত্তরণের কোনো উপায় আছে কিনা, আমার জানা নাই।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক বিনিয়োগকারী বলেন, ‘আমার যে ইনভেস্টমেন্ট ছিল তা অর্ধেকে চলে এসেছে। লোন সম্পর্কে ভালো ধারণা ছিল না। হঠাৎ করে ব্রোকার থেকে আমাকে বলা হলো, মার্কেট ভালো আছে, লোন নিয়ে ব্যালেন্স করে ফেললে ভালো হবে। আমি জানি না যে মার্কেট এমন হবে। লোন নিয়ে শেয়ার কিনে এখন আমি ধরা।’

‘ধরুন আমি ৫০ টাকা লোন নিয়েছি। যদি তার সুদ ৫ টাকা হয়, সেটা আগেই কেটে নিয়ে ঋণের সঙ্গে যোগ হচ্ছে, অর্থাৎ ৫৫ টাকার ওপর ইন্টারেস্ট কাটছে। চক্রবৃদ্ধিহারে সুদ বাড়ছে আরকি।’

আরও পড়ুন:
ধৈর্যের পরীক্ষা নিয়েই যাচ্ছে পুঁজিবাজার
এবার ২০ মাসে সর্বনিম্ন লেনদেন
শমরিতা হাসপাতালের পরিশোধিত মূলধন ৩০ কোটি টাকা করতে চিঠি 
ভুল সিদ্ধান্তের দায় নিলেন না বিএসইসি কমিশনার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
That is why BNP does not want to hold a rally in Suhrawardy

যে কারণে সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে চায় না বিএনপি

যে কারণে সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে চায় না বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২০১৮ সালে বিএনপির সমাবেশ (বাঁয়ে), নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির সমাবেশ ও রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
বিএনপি তাদের বড় কর্মসূচিগুলো করার ক্ষেত্রে এর আগে বরাবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি চেয়ে এসেছে। অনুমতি না পেলে বিকল্প ভেন্যু হিসেবে নয়াপল্টনে তাদের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করেছে দলটি। কিন্তু এবার ভেন্যুর পছন্দ উল্টে গেল কেন?

ঢাকা মহানগর পুলিশ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি দিয়ে রাখলেও নয়াপল্টনেই সমাবেশের ব্যাপারে অনড় বিএনপি। ফলে ঢাকায় সমাবেশের ভেন্যু নিয়ে টানাপড়েন থেকেই গেছে।

বিএনপি দেশজুড়ে তাদের ধারাবাহিক গণসমাবেশের সমাপ্তি টানবে আগামী ১০ ডিসেম্বর রাজধানীতে গণসমাবেশ করে। প্রায় ১৫ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি এই সমাবেশ নিয়ে উদ্দীপ্ত।

সমাবেশের জন্য তাদের পছন্দ রাজধানীর ব্যস্ত সড়কদ্বীপ নয়াপল্টন, যেখানে তাদের দলীয় কার্যালয় অবস্থিত। সে জন্য অনুমতি চেয়ে ডিএমপির কাছে চিঠিও দিয়েছে দলটি। তবে ক্ষমতাসীন দল বলছে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করতে।

গত ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামে শুরু হওয়া বিএনপির বিভাগীয় সমাবেশের শেষ কর্মসূচি এই ১০ ডিসেম্বর। এই সমাবেশ থেকে দলটি ঘোষণা করবে আগামী দিনের আন্দোলন-সংগ্রামের রূপরেখা। তেমনটাই বলা হচ্ছে দলের পক্ষ থেকে।

কিন্তু সমাবেশের স্থান নিয়ে জটিলতার রেশ ধরে চলছে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি।

বিএনপি তাদের বড় কর্মসূচিগুলো করার বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর আগে বরাবর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুমতি চেয়ে এসেছে, যার ক্ষেত্রে সরকার অনুমতি দেয়নি। সে সময় বিএনপি বিকল্প ভেন্যু হিসেবে নয়াপল্টনে তাদের কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করেছে।

এবার ভেন্যুর পছন্দ উল্টে গেল কেন এবং বিশেষ করে নয়াপল্টনেই সমাবেশ করার ব্যাপারে বিএনপির অনড় অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

দলটির নীতিনির্ধারকরা ইতোমধ্যে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তারা নয়াপল্টনে সমাবেশ করবেন। এমনকি সরকার যাতে এ নিয়ে কোনো সংঘাত-উসকানির পথে না যায়, সেই আহ্বানও রেখেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, এরই মধ্যে বিএনপি থেকে একটি প্রতিনিধিদল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান পরিদর্শন করেন এবং সেখানকার নানা প্রতিকূলতা নিয়ে রিপোর্ট জমা দেন।

যে কারণে সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে চায় না বিএনপি
রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ২০১৮ সালে বিএনপির সমাবেশ। ফাইল ছবি

গত বৃহস্পতিবার রাতে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে কথা বলেছেন দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশের ব্যাপারে তাদের অনড় থাকার নির্দেশ দেন।

অনুমতি পাওয়া সত্ত্বেও সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে না চাওয়ার কারণ জানতে চাওয়া হয় বিএনপির একাধিক নীতিনির্ধারকের কাছে। তারা জানান, তারা মনে করছেন সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে দেয়াটা সরকারের একটি ‘চাল’। এর পেছনে অসৎ উদ্দেশ্য রয়েছে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বনায়ন ও অন্যান্য স্থাপনার কারণে জায়গা অনেক সংকুচিত হয়েছে, তা ছাড়া প্রবেশদ্বার এতটাই ছোট যে নেতা-কর্মীদের ঢোকা বা বের হওয়ায় অনেক বিশৃঙ্খলা হবে, যেখানে আমরা লাখো মানুষ নিয়ে এই সমাবেশ করছি।

‘তা ছাড়া এত বড় সমাবেশে নানা কাজ থাকে। মিনিমাম পাঁচ-ছয় দিন আগে থেকে মঞ্চ তৈরির কাজ করতে হয়। সে ক্ষেত্রে সেখানে ছাত্রলীগের কাউন্সিল ৬ ডিসেম্বর হলেও পরবর্তী তিন দিনে বিএনপির সমাবেশের জন্য সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা অসম্ভব।'

দলের একজন ভাইস চেয়ারম্যান নাম প্রকাশ না করার শর্তে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমাদের সন্দেহ হচ্ছে সরকারের গতিবিধি দেখে। সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশের অনুমতিই চাইলাম না, তাও যেচে অনুমতি দিয়ে দিল। আবার ছাত্রলীগের সম্মেলনের তারিখও পেছাল। এতে সন্দেহ আরও বেড়ে গেছে। এটা নিশ্চয় সরকারের একটি চাল। কোনো অসৎ উদ্দেশ্য তাদের আছে।

‘উদ্যান চার দেয়ালে ঢাকা। গেটটাও সংকীর্ণ। আমাদের ধারণা ওই দিন তারা একটা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করার ফাঁদ পাততেছে।’

সে ক্ষেত্রে নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনেই সমাবেশ কেন, জানতে চাইলে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা পল্টনেই সমাবেশ করব। সিদ্ধান্ত এটাই।’

এতে জনদুর্ভোগ হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ওই দিন শনিবার। ছুটির দিন।’

যে কারণে সোহরাওয়ার্দীতে সমাবেশ করতে চায় না বিএনপি
রাজধানীর নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির সমাবেশ। ফাইল ছবি

পল্টনেই সমাবেশে অনড় থাকা সরকারের প্রতি জেদের বহিঃপ্রকাশ কি না–এমন প্রশ্ন করা হলে গয়েশ্বর চন্দ্র রায় নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এখানে জেদাজেদির কিছু নেই। নয়াপল্টন আমাদের কার্যালয়। আমাদের ঘর। আগে-পরেও এখানে সমাবেশ হয়েছে, এখন সমস্যা কী? এই জেদের প্রশ্ন বরঞ্চ সরকারকে করুন। তাদের উদ্দেশ্য কী, জানতে চান।’

গয়েশ্বর চন্দ্রের সঙ্গে যোগ করে দলটির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পল্টন নেতা-কর্মীদের পরিচিত জায়গা। এখানে তারা রিল্যাক্সড মুডে পার্টিসিপেট করতে পারবে। এখানে কর্মসূচি করে তারা অভ্যস্ত। আশপাশের হোটেল আছে, খাবার-দাবার খেয়ে নিতে পারবে।

‘এখানে যেসব পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করেন, তারাও অভিজ্ঞ। কীভাবে কাকে ডিল করতে হবে, তারা জানেন। সব মিলিয়ে নয়াপল্টনেই করতে চাই।'

অন্যান্য বিভাগীয় গণসমাবেশের মতো এবারও কয়েক দিন আগে থেকে সারা দেশের সঙ্গে ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করে দেয়া হবে- এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘ঢাকার আবাসিক হোটেলগুলোতে বিএনপি নেতা-কর্মীরা রুম ভাড়া পাবেন না। তা ছাড়া হোটেলে থাকলে গ্রেপ্তারও হতে পারেন। তারা অলরেডি গ্রেপ্তার শুরু করেছে। এমন অবস্থার মধ্যে নেতা-কর্মীদের সমাবেশস্থলে এসেই থাকতে হতে পারে। নয়াপল্টন দলটির নেতা-কর্মীদের চেনা জায়গায়। সেখানে কেন্দ্রীয় কার্যালয় এবং ভাসানী ভবনে মহানগর কার্যালয়সহ আশপাশে নেতা-কর্মীরা থাকতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।’

তিনি বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মধ্যে। ক্যাম্পাসে ও আশপাশের এলাকায় সব সময় ছাত্রলীগের সরব উপস্থিতি থাকে। বিএনপি নেতা-কর্মীরা সেখানে নানাভাবে বাধা পেতে পারেন।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছিল পল্টনে মিটিং করেন, কোনো সমস্যা নেই।

তিনি আরও বলেন, ‘আগে পল্টন ময়দান ছিল, যেখানে বিএনপি জনসমাবেশ করত সব সময়। পাকিস্তান আমল থেকে ওখানে সমাবেশ করা হতো, সে মাঠটা আর এখন রাখা হয়নি, সেটা খেলার মাঠ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। তারপর রেসকোর্স ছিল, রেসকোর্সে এখন অনেক অট্টালিকা হয়েছে। ওখানে একটা কোনার মধ্যে মিটিং করলে কেমন হবে?’

মঙ্গলবার পুলিশের পক্ষ থেকে শর্তযুক্ত এই অনুমতির খবরের পরপরই নয়াপল্টনে সমাবেশ করার পক্ষে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দিয়েছেন বিএনপি নেতারা।

অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের হুঁশিয়ারি, ‘বাড়াবাড়ি’ করলে বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আরও পড়ুন:
‘বিএনপি বিশৃঙ্খলা করতে পারে’
‘খেলা হবে’র সমালোচনায় রাজনীতিবিদরা
স্বাধীনতার ডাক আসে বলে সোহরাওয়ার্দী বিএনপির অপছন্দ: তথ্যমন্ত্রী
বিএনপির আট সমাবেশের সমান জমায়েত পলোগ্রাউন্ডে: কাদের
যুবদল সভাপতি টুকুসহ ৭ জন রিমান্ডে

মন্তব্য

p
উপরে