× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বাংলাদেশ
Why did BRTA fail in implementing fares?
hear-news
player
print-icon

ভাড়া নির্ধারণ করে কার্যকরে কেন ব্যর্থ বিআরটিএ

ভাড়া-নির্ধারণ-করে-কার্যকরে-কেন-ব্যর্থ-বিআরটিএ
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর নতুন করে শনিবার বিআরটিএ যে বাস ভাড়া নির্ধারণ করেছে তাতে মহানগরীতে বাড়ানো হয়েছে কিলোমিটারে ৩৫ পয়সা। ফাইল ছবি
নির্ধারিত ভাড়া কখনোই কার্যকর করতে পারেন না কেন, এমন প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ‘ভাড়া বাড়ার পরই কিন্তু মনিটরিং শুরু হয়। গতবার ভাড়া বৃদ্ধির পর বিআরটিএ ম্যাজিস্ট্রেটরা ছিল।’

রাজধানীর ইস্কাটন থেকে মেরুল বাড্ডা পর্যন্ত দূরত্ব ৪ দশমিক ৩ কিলোমিটারের মতো। গত নভেম্বরে তেলের দাম বাড়ানোর পর সরকার ভাড়ার যে হার ঠিক করে দিয়েছে, তাতে এই পথের ভাড়া ১০ টাকার কম আসে। তবে সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা হিসেবে এটাই আদায় করার কথা। কিন্তু এই পথটুকুর জন্য স্বাধীন পরিবহন আদায় করে ২০ টাকা, অর্থাৎ দ্বিগুণ।

জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর নতুন করে শনিবার বিআরটিএ যে বাস ভাড়া নির্ধারণ করেছে তাতে মহানগরীতে বাড়ানো হয়েছে কিলোমিটারে ৩৫ পয়সা। ফলে এখন থেকে প্রতি কিলোমিটারে যাত্রীদের গুনতে হবে আড়াই টাকা।

সরকার এই রুটের জন্য নতুন করে এবার যে ভাড়া ঠিক করে দিয়েছে, তাতে কিলোমিটার হিসাবে এই দূরত্বে ভাড়া হয় ১০ টাকা ৭৫ পয়সা।

কিন্তু সমস্যা হলো নিশ্চিতভাবেই বলে দেয়া যায়, বাসগুলো এখন ২০ টাকার ওপর বাড়তি হিসাব করে আদায় করবে। এর কারণ আগেও তাই হয়েছে।

এই বাড়তি ভাড়া আদায়ে গত কয়েক বছরে রাজধানীতে বাস মালিকরা যে ওয়েবিল পদ্ধতি চালু করেছে, সেটি বন্ধ করতে পারেনি সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ।

গত নভেম্বরে বাস ভাড়া ২৬ শতাংশ বাড়ানোর পর বিআরটিএ জোরালোভাবে বলেছিল, তারা ওয়েবিল বন্ধ করে দিয়ে কিলোমিটার হিসেবে ভাড়া আদায় নিশ্চিত করবে। যারা কথা শুনবে না, তাদের রুট পারমিট বাতিলের হুমকিও দেয়া হয়। কিন্তু নিজের এই হুমকি ভুলে গিয়ে কদিন পরই বিআরটিএর অভিযান থেমে যায়।

ভাড়া নির্ধারণ করে কার্যকরে কেন ব্যর্থ বিআরটিএ
সারা দেশে প্রায় এক লাখ বাস চলে। ঢাকা মহানগরীতে চলে সর্বোচ্চ ৬ হাজার। এই ৬ হাজার গাড়িতে অনেক সময় কিছু কিছু অনিয়ম হয়। ফাইল ছবি

বিআরটিএর চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মাদ মজুমদার বলেন, ‘গতবার ভাড়া নির্ধারণ করার পর মালিক সমিতি, শ্রমিক ফেডারেশনের সদস্য বিআরটিএ পুলিশ যৌথ টিম কাজ করেছে, যা কয়েক মাস অব্যাহত ছিল। যারা অতিরিক্ত ভাড়া নিয়েছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছি।’

কতগুলো বাস জব্দ করা হয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এই মুহূর্তে বলতে পারব না।’

যে ভাড়া নির্ধারণ করেন তার অতিরিক্ত নেন বাস মালিকরা। নির্ধারিত ভাড়া কখনোই কার্যকর করতে পারেন না কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে সড়ক পরিবহন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ‘ভাড়া বাড়ার পরই কিন্তু মনিটরিং শুরু হয়। গতবার ভাড়া বৃদ্ধির পর বিআরটিএ ম্যাজিস্ট্রেটরা ছিল।’

ঢাকা শহরে অনেক বাস চলে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘চোখের আড়ালে যদি করে ফেলে আমাদের নজরে এলে শাস্তি পায় নাই- এমন দৃষ্টান্ত কিন্তু নেই। আগামীকাল থেকে শক্তভাবে মনিটর করা হবে৷ কোনো অনিয়ম পেলে তাৎক্ষণিক আইনানুগ ব্যবস্থা নেব। প্রত্যেক বাসে ভাড়ার তালিকা বড় করে চার্ট দেব। যদি কেউ না টানায় তাদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেব।’

বাড়তি ভাড়া রোধে বিআরটিএ ৭ জন ম্যাজিস্ট্রেট সব সময় রাস্তায় থাকে দাবি করে বিআরটিএ চেয়ারম্যান বলেন, ‘তারা সপ্তাহের ৬ দিন রাস্তায় থাকে। এরা মোবাইল কোর্ট করতেছে।’

আর যাত্রীরা বছরের পর বছর ধরে ওয়েবিলের নামে বাড়তি ভাড়া দিয়ে চলেছে। আগামী দিনে বন্ধ হবে- এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারছে না।

প্রতিটি ওয়েবিলই ২ কিলোমিটার বা এমন দূরত্বে বসানো হয়েছে। আর এই দূরত্বের জন্য সাধারণত ১০ টাকা করে ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। এই হিসাবে রাজধানীতে বেশির ভাগ বাসেরই ভাড়া কিলোমিটার হিসেবে ৫ টাকা পড়ছে। কোথাও কোথাও তা আরও বেশি পড়ে।

তবে সড়ক পরিবহন সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নুরী বলেন, ওয়েবিল অবৈধ। তাই এমন কিছু দেখলে তারা ব্যবস্থা নেবে।

তিনি বলেন, ‘ম্যাজিস্ট্রেটরা যদি এ ধরনের অনিয়ম দেখতে পায় তাদের আইনের আওতায় আনা হয়। জেলা প্রশাসনকে অনুরোধ করব, তাদের যে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আছে, তারা যাতে ভাড়া মনিটর করে, যাতে বাড়তি ভাড়া কেউ আদায় করতে না পারে।’

বাস মালিকদের সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ খান নিজের ঘোষণার উল্টো কথা বলেন পরে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘সারা দেশে প্রায় এক লাখ বাস চলে। মহানগরীতে চলে সর্বোচ্চ ৬ হাজার। এই ৬ হাজার গাড়িতে ঢাকা মহানগরীতে অনেক সময় কিছু কিছু অনিয়ম হয়। এ অনিয়ম রোধ করার জন্য আমরা মালিক শ্রমিকরা, ম্যাজিস্ট্রেটসহ দুই মাস ধরে কাজ করছি।

‘আমি নিজেও রাস্তায় ছিলাম আপনারা অনেকে দেখেছেন মহানগরীতে আমরা সব জায়গায় করতে পেরেছি তা না। কোথাও কোথাও আমরা করতে পারি নাই। মালিক সমিতি থেকে নির্দেশ দিলেই সেটা সবাই পালন করবে বাংলাদেশে এমন কোনো সেক্টর এখন পর্যন্ত হয় নাই। যারা মানে নাই, তাদের গাড়ি ডাম্পিং করা হয়েছে। সুতরাং আমরা কোনো অন্যায়কে সাপোর্ট করি না। কোনো অন্যায় হোক সেটা আমরা চাই না, আমাদের চেষ্টাও অব্যাহত আছে।’

ভাড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘ভাড়ার বিষয়টি তারা (বিআরটিএ) নির্ধারণ করেছে। এখানে সাড়ে ৪২ শতাংশ তেলের দাম বেড়েছে। আর ভাড়া বৃদ্ধি করেছে ২২ শতাংশ।’

ওয়েবিল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এই পরিবহন নেতা বলেন, ‘যারা এটা মানবে না তাদের বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত কাজ চলতেছে।’

অনিয়ম রোধে পরিবহন মালিক সমিতি শতভাগ সফল হয়নি জানিয়ে এনায়েত উল্যাহ বলেন, ‘ঢাকা ছাড়া সারা দেশে আমরা সাকসেস।’

এসি বাসের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না জানিয়ে তিনি বলেন, ‘একজনের দুই কোটি টাকা দামের বাস। একজনের এক কোটি টাকা দামের বাস। সে যে পরিমাণ সেবা দিচ্ছে, সেই পরিমাণ টাকা নিচ্ছে। এসির ভাড়া ট্র‍াকের ভাড়া সরকার নির্ধারণ করে না।’

বিআরটিএ দূরপাল্লার বাসে নতুন করে ভাড়া বাড়িয়েছে কিলোমিটারে ৪০ পয়সা বা ২২ শতাংশ। ফলে এখন দূরপাল্লায় যাত্রীদের কিলোমিটারে ভাড়া গুনতে হবে ২ টাকা ২০ পয়সা করে।

ফলে আন্তজেলা রুটেও চিত্রটা মোটামুটি একই রকমের। ঢাকা থেকে কিশোরগঞ্জ পর্যন্ত দুটি রুট একরামপুর ও গাইটাল থেকে কাপাসিয়া হয়ে ঢাকার মহাখালী টার্মিনালের দূরত্ব হয় ১১০ থেকে ১১২ কিলোমিটার। নরসিংদী হয়ে যেসব গাড়ি চলে, সেগুলোর দূরত্ব হয় ১২০ থেকে ১২৫ কিলোমিটার।

সরকার দূরপাল্লায় ভাড়া ঠিক করে দেয় ৫২ আসনের। কিন্তু এই রুটের বাসগুলোতে আসন ৪৫টির মতো। সেই হিসাবে ৭টি আসন কমলে ভাড়া আনুপাতিক হারে বাড়ানো যাবে।

এই হিসাবে কিলোমিটারপ্রতি ১ টাকা ৮০ পয়সার জায়গায় প্রায় ২০ শতাংশ বেশি হারে ভাড়া নেয়া যাবে ২ টাকা ১৬ পয়সা হারে।

এই হিসাবে কাপাসিয়া হয়ে ভাড়া হওয়ার কথা ২৪০ টাকার মধ্যে। কিন্তু আদায় হচ্ছে ২৭০ টাকা।

আগে থেকেই ৩০ টাকা বেশি আদায় করে চলা বাসমালিকদের আসলে নতুন ঘোষণা অনুযায়ী কোনো ভাড়া বাড়ানোর কথা না।

আরও পড়ুন:
সেপ্টেম্বরে আরও ৩ পথে নামছে নগর পরিবহনের ২০০ বাস
বাংলাদেশে তেল বিক্রি করতে চায় রাশিয়া: প্রতিমন্ত্রী
ঢাকায় ফেরার তাড়া, সুযোগ নিচ্ছেন চালকরা
সম্ভাবনায় ফিরছে নগর পরিবহন
তেল গ্যাসের দাম বেড়েছে নেপালেও

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
The health risk of used paper is not serious

ব্যবহৃত কাগজের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক, নেই ভ্রুক্ষেপ

ব্যবহৃত কাগজের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক, নেই ভ্রুক্ষেপ ফুটপাতে বসা ছোলা মুড়ির দোকানে ব্যবহৃত কাগজে খাবার দিচ্ছেন বিক্রেতা। ছবি: নিউজবাংলা
‘খবরের কাগজ/ছাপা কাগজ/লিখিত কাগজ এ ব্যবহৃত কালিতে ক্ষতিকর রং, পিগমেন্ট ও প্রিজারভেটিভস থাকে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ছাড়া পুরোনো কাগজে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবও থাকে। খবরের কাগজ, ছাপা কাগজ/লিখিত কাগজ এর ঠোঙায় বা উক্ত কাগজে মোড়ানো খাদ্য নিয়মিত খেলে, মানবদেহে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনি রোগসহ নানাবিধ রোগের সৃষ্টি হতে পারে।’

খোলা খাবার কেনাবেচার ক্ষেত্রে খুব স্বাভাবিক একটি চিত্র। তবে এ যে স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ ক্ষতিকর, সে বিষয়ে কারও যেন কোনো খেয়ালই নেই।
রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় ঝালমুড়ি বিক্রি করছে এক দোকানে। বেচাকেনা হচ্ছে দেদার। কোনো ক্রেতা মুড়ি নিচ্ছেন প্লেটে, কেউ বা কাগজের মোড়কে। সেই মোড়ক তৈরি হয়েছে মূলত বইয়ের পাতা ব্যবহার করে।

সেই বইয়ের কাগজে এমন সব রং ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়েছে, যা মানুষের পেটে গেলে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। আবার মানুষের হাত থেকেও জীবাণু সংক্রমিত হয়েছে, সেটি বই পড়ার সময় আবার মোড়ক বানানোর সময়ও। কিন্তু না ক্রেতা, না বিক্রেতা, কারও মধ্যেই বিষয়টি নিয়ে এতটুকু ভাবান্তর দেখা গেল না।

ঝালমুড়ি বিক্রেতা মাসুম মিয়া আসলে জানেনই না যে, এই কাগজ থেকে রোগ ছড়াতে পারে।

পাশেই খাজা বিক্রি করছিলেন এক নারী। তারও ধারণা ছিল না ব্যবহৃত কাগজে খাদ্য বিক্রির বিপদ সম্পর্কে। বিষয়টি বুঝিয়ে বললে তিনি বলেন, ‘এই কাগজে যে ক্ষতি অয় তা তো জানতামই না।’

এখন তো জানলেন, তাহলে কী করবেন- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এহন থেইকা প্লেটে দিমু।’

ওনার কাছ থেকেই খাজা কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন আনিস রহমান। তিনি বলেন, ‘জানি এগুলো ক্ষতিকর। বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় এভাবেই নেই। বাচ্চারা পছন্দ করে। তবে এরপর সতর্ক হব।’

ব্যবহৃত কাগজের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক, নেই ভ্রুক্ষেপ
ব্যবহৃত কাগজে খাবার দিচ্ছেন এক দোকানদার। ছবি: নিউজবাংলা

মোড়ে মোড়ে ঝালমুড়ি, ফুচকা, জিলাপি, পরোটা, পুরি, শিঙাড়া বা এই ধরনের খাবার পরিবেশন বা পরিবহনে যে মোড়কগুলো ব্যবহার করা হয়, তার সবই জনস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। এর মধ্যে পলিথিনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও ব্যবহৃত কাগজের মোড়ক নিয়ে কারও মধ্যে ভাবান্তর নেই।

পরোটা পরিবহনের ক্ষেত্রে বিক্রেতারা পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের পাশাপাশি প্রধানত খবরের কাগজ কেটে তা দিয়ে খাদ্যপণ্যটি মুড়িয়ে দেন। অনেক সময়ই দেখা যায় গরম পরোটায় কাগজের অক্ষর লেপ্টে গেছে।

এই বিষয়টি জানিয়ে যে কয়জন খাবার বিক্রেতার সঙ্গে নিউজবাংলা কথা বলেছে, তাদের সবাই প্রশ্ন তুলেছেন, যদি এভাবে খাবার দেয়া না যায়, তাহলে তারা আসলে কী করবেন।

তেজগাঁওয়েরই একটি খাবার হোটেলে কাগজে মুড়িয়ে মোগলাই পরোটা বিক্রি করছিলেন রায়হান। তিনিও বলেন, ‘এভাবেই বিক্রি করব। আর তো কিছু করার নাই।’

বিষয়টি নিয়ে সচেতনতা তৈরি করতে দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি সংস্থার ভূমিকাও একেবারেই দায়সারা গোছের। প্রায় এক দশক আগে করা আইনে এভাবে খাবার মোড়কজাত করাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ গণ্য করা হলেও এর প্রচারেও নেই দৃশ্যমান উদ্যোগ।

তবে সম্প্রতি পত্রিকায় একটি বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ভোক্তা এবং বিক্রেতাদের সাবধান করা হয়েছে। এই ব্যবহৃত কাগজের রং ও রাসায়নিক মানবস্বাস্থ্যের কী কী ক্ষতি করতে পারে, তাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই ধরনের বিজ্ঞপ্তি কয়জন মানুষের হাতে পৌঁছে তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

ব্যবহৃত কাগজের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক, নেই ভ্রুক্ষেপ
হোটেলে তৈরি হচ্ছে খাবার, পরিবেশন করা হচ্ছে ব্যবহৃত কাগজে। ছবি: নিউজবাংলা

কী ক্ষতি

পুরোনো কাগজ প্রধানত কেজি হিসেবে বিক্রি করা হয়। এরপর তা যায় মোড়ক তৈরির কারখানায়। সেখান থেকে তা আবার আসে বাজারে। এরপর কেজি বা শ হিসেবে তা কিনে নিয়ে আসা হয়। এই তৈরি ও পরিবহনের সময় এগুলোতে জীবাণুতে সংক্রমণ হতে পারে। এগুলো প্রিন্ট করার সময় যেসব রং ও রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর বিপত্তি তো আছেই।

শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক এনামুল করিম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যখন এই কাগজ প্রস্তুত হয়, এতে ক্লোরাইড, ডলোমাইড, হাইড্রোফ্লোরিস এসিড, ক্যালসিয়াম অক্সাইড, সোডিয়াম সালফেট থাকে। আবার এগুলোতে যখন ছাপার জন্য কালি ব্যবহার করা হয়, তাতে যে উপাদান যেমন ক্যাডমিয়াম, কপার, জিংক, রং, পিগমেন্ট ও প্রিজারভেটিভস থাকে, যা দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ ছাড়া পুরোনো কাগজে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবও থাকে।’

তিনি বলেন, 'গবেষণায় দেখা গেছে, এগুলো দীর্ঘদিন ব্যবহারে ধীরে ধীরে বিষক্রিয়া হতে পারে। আবার এই কাগজগুলো যেসব জায়গা থেকে আসে সেখানেও জমে থাকতে পারে ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু। তাই এগুলো পরিহার করা জরুরি।’

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘খবরের কাগজ/ছাপা কাগজ/লিখিত কাগজ এ ব্যবহৃত কালিতে ক্ষতিকর রং, পিগমেন্ট ও প্রিজারভেটিভস থাকে, যা মানবদেহের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ ছাড়া পুরোনো কাগজে রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীবও থাকে। খবরের কাগজ ছাপা কাগজ/লিখিত কাগজ এর ঠোঙায় বা উক্ত কাগজে মোড়ানো খাদ্য নিয়মিত খেলে, মানবদেহে ক্যানসার, হৃদরোগ ও কিডনিরোগসহ নানাবিধ রোগের সৃষ্টি হতে পারে।’

করণীয় কী

এই প্রশ্নটাই আসলে সবচেয়ে জটিল, যার সঠিক এবং সহজ কোনো জবাব পাওয়া কঠিন।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের বিজ্ঞপ্তিতে হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পথ খাবার ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টদের খাদ্য স্পর্শক প্রবিধানমালা, ২০১৯ অনুসরণ করে পরিষ্কার ও নিরাপদ ফুডগ্রেড পাত্র ব্যবহারের পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে সেই বিধিমালায় স্পষ্ট করে কোন কোন পাত্র ব্যবহার করা উচিত, তার বর্ণনা নেই। মোড়কজাত পণ্যের ক্ষেত্রে কী করতে হবে, সেটিও এমন ভাষায় বর্ণনা করা, যার পাঠোদ্ধার করা সাধারণের পক্ষে কঠিন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট এর সহযোগী অধ্যাপক ড. মোঃ খুরশিদুল জাহিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেসব কাগজ ব্যবহার হয়, তা নোংরা জায়গা থেকে আসে। এতে জীবাণু সংক্রমিত হয়ে থাকে।’

তাহলে বিক্রেতারা কী ব্যবহার করবে- এই প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ফ্রেশ (অব্যবহৃত) পেপার দিয়ে ব্যাগ তৈরি করা যায়, বা ফয়েল পেপার ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার বা রি ইউজেবল ফুড গ্রেডেড প্লাস্টিক ব্যবহার করা যেতে পারে।’

এসব খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে ছোট ম্যালামাইন বা সিরামিকের পাত্র ব্যবহারের পরামর্শও দিয়েছেন তিনি। সে ক্ষেত্রে পাত্রগুলো ব্যবহারের পরেই ধুয়ে ফেলার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি।

সাজা কঠোর

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সেই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ‘সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে, হোটেল-রেস্তোরাঁ ও পথ খাবার ব্যবসায়ীসহ অনেক খাদ্য ব্যবসায়ী খবরের কাগজ/ছাপা কাগজ/লিখিত কাগজ এর মাধ্যমে ঝালমুড়ি, ফুচকা, সমুচা, রোল, শিঙাড়া, পেঁয়াজি, জিলাপি, পরোটা ইত্যাদি পরিবেশন করছেন, যা নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জিসান মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এই আইন অমান্য করলে ৩৩ ধারা অনুযায়ী সর্বনিম্ন এক বছর, সর্বোচ্চ তিন বছর, ন্যূনতম তিন লাখ টাকা ও অনূর্ধ্ব ৬ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হতে পারে।’

দ্বিতীয়বার একই অপরাধ করলে সাজা তিন বছর, জরিমানা ১২ লাখ টাকা অথবা উভয় দণ্ডের কথা বলা হয়েছে আইনে।

ব্যবহৃত কাগজের স্বাস্থ্যঝুঁকি মারাত্মক, নেই ভ্রুক্ষেপ
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সেই বিজ্ঞপ্তি

আইন প্রয়োগের উদাহরণ নেই

আইনটি করা হয়েছে ২০১৩ সালে। এর প্রয়োগের দৃষ্টান্ত নেই।

নয় বছর পর নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেয়াটা সংস্থাটির অবহেলার প্রমাণ কি না, সে বিষয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

নিউজবাংলা কর্তৃপক্ষের তিন জন কর্মকর্তার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু কথা বলেননি কেউ।

প্রথমে যোগাযোগ করা হয় সদস্য (খাদ্য ভোগ ও ভোক্তা অধিকার) রেজাউল করিমের সঙ্গে। বিজ্ঞপ্তির বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে চাই বলতেই তিনি বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমি সম্পৃক্ত না। এটা অন্যজন দেখে।’

সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উছেন মে ও আইন ও নীতি শাখার সদস্য শাহনওয়াজ দিলরুবা খানকে ফোন দিলে তারা দুই জনই চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিয়েছেন।

তবে চেয়ারম্যান আব্দুল কাইউম সরকারের সঙ্গে কথা বলা সম্ভব হয়নি। তার ফোন নম্বরটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

আরও পড়ুন:
এশিয়ার সেরা স্ট্রিট ফুডের তালিকায় ‘ফুচকা’
চবিতে ‘সেরা খাদক’ নূর
মুড়ি নিয়ে কেউ কিছু জানে না
কালাই রুটির কদর বাড়ছে রাজধানীতে
পুরান ঢাকায় নিরামিষের এক স্বর্গরাজ্য

মন্তব্য

বাংলাদেশ
After Mahsa in Iran now the symbol of rebellion is Hadith Najafi

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি

একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাদিস নাজাফি তার খোলা চুল ঝুঁটি বেধে বিক্ষোভে যোগ দিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। ওই বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ছয়টি গুলিতে এক নারী প্রাণ হারান। নিহত নারীকে হাদিস দাবি করে পোস্ট করা ভিডিও চলমান প্রতিবাদের মাত্রাকে আরও তীব্র করেছে।

কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির মৃত্যুর ঘটনা কেন্দ্র করে কঠোর পোশাকবিধি নিয়ে ইরানি নারীদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে । ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে বিক্ষোভে উত্তাল ইরানে অন্তত অর্ধশত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন হাজারের বেশি।

নিরাপত্তা বাহিনীর সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে বিক্ষোভ দমনের চেষ্টা করলেও প্রতিবাদের ঢেউ দেশটির অন্তত ৮০টি শহরে এরইমধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে। নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে প্রতিদিনই প্রাণ দিচ্ছে মানুষ। নিহতদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি নারী-শিশুও রয়েছে।

মাহসাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভে নতুন করে আরও একটি নাম প্রতিবাদের প্রতীকে পরিণত হয়েছে। তিনি ২০ বছরের তরুণী হাদিস নাজাফি।

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি
মাহসা আমিনির (বাঁয়ে) পর এবার ইরানে নারীর পোশাকের স্বাধীনতা দাবির বিক্ষোভের প্রতীকে পরিণত হয়েছেন হাদিস নাজাফি

কারাজ শহরে ২১ সেপ্টেম্বর ওই বিক্ষোভের সময় নিরাপত্তা বাহিনীর ছোড়া ছয়টি গুলিতে প্রাণ হারান এক নারী। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ওই নারীর নাম হাদিস নাজাফি বলে দাবি করা হয়।

সাংবাদিক এবং নারী অধিকারকর্মী মাসিহ আলিনেজাদ রোববার একটি ভিডিও পোস্ট করেন। এতে দেখা যায় হাদিস তার খোলা চুল ঝুঁটি বেধে বিক্ষোভে যোগ দিতে এগিয়ে যাচ্ছেন। মাসিহ আলিনেজাদের দাবি ছিল, এর পরপরই নিরাপত্তা বাহিনীর ছয়টি গুলিতে তিনি প্রাণ হারান।

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি

ইরানের সাংবাদিক ফারজাদ সেফিকারানকে উদ্ধৃত করে আল আরাবিয়া জানায়, বিক্ষোভে নিহত নারীর মুখ, ঘাড় এবং বুকে গুলি লেগেছিল। স্থানীয় ঘায়েম হাসপাতালে নেয়ার পরপরই তার মৃত্যু হয়। আল আরাবিয়ার প্রতিবেদনেও নিহত নারীর নাম ‘হাদিস নাজাফি’ বলে উল্লেখ করা হয়।

তবে সোমবার বিবিসি ফার্সির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভে নিহত নারী হাদিস নাজাফি নন।

হাদিস একটি ভিডিওবার্তা দিয়েছেন বলেও টুইটে জানায় বিবিসি ফার্সি। বার্তায় হাদিস বলেন, ‘আমি বিক্ষোভে নিহত ওই নারী নই। তবে আমি নারীদের জন্য, মাহসাদের অধিকারের জন্য লড়াই চালিয়ে যাব।’

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি
রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে, আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছেন হিজাববিরোধীরা

ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় আজারবাইজান প্রদেশের হাদিস নাজাফির চুল বেঁধে বিক্ষোভে যোগ দেয়ার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। #MahsaAmini হ্যাশট্যাগের পাশাপাশি #HadisNajafi হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে ইরানের নারীদের পোশাকের স্বাধীনতার দাবিকে সমর্থন জানাচ্ছেন অসংখ্য মানুষ।

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি
বিক্ষোভে যোগ দেয়ার আগে খোলা চুল বেঁধে নিয়েছিলেন হাদিস নাজাফি (মাঝে)

বিক্ষোভে গুলিতে নিহত নারীকে রোববার দাফন করা হয়েছে। তার কবরের পাশে স্বজনদের আহাজারির একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে টুইটারে।

কুর্দি নারী মাহসা আমিনিকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর তেহরানের ‘নৈতিকতা পুলিশ’ গ্রেপ্তার করে। ইরানের দক্ষিণাঞ্চল থেকে তেহরানে ঘুরতে আসা মাহসাকে একটি মেট্রো স্টেশন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তিনি সঠিকভাবে হিজাব করেননি।

পুলিশ হেফাজতে থাকার সময়েই মাহসা অসুস্থ হয়ে পড়েন, এরপর তিনি কোমায় চলে যান। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ১৬ সেপ্টেম্বর তার মৃত্যু হয়। পুলিশ মাহসাকে হেফাজতে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করলেও পরিবারের অভিযোগ গ্রেপ্তারের পর তাকে পেটানো হয়।

মাহসার মৃত্যুর পর থেকেই উত্তাল ইরান। ফেসবুক ও টুইটারে #MahsaAmini এবং #Mahsa_Amini হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে চলছে প্রতিবাদ। দেশটির বিভিন্ন জায়গায় নারীর পোশাকের স্বাধীনতার পক্ষে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ চলছে নিরাপত্তা বাহিনীর।

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ সেপ্টেম্বর মারা যান মাহসা আমিনি

বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসেবে বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত অর্ধশত মানুষের মৃত্যু হয়েছে, তাদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক জন সদস্যও আছেন। তবে ইরান সরকারের দাবি, বিক্ষোভের ১১ দিনে পুলিশ সদস্যসহ প্রাণ গেছে ৪১ জনের।

সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিও বিক্ষোভকে আরও উসকে দিচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রায় বিচ্ছিন্ন রেখেছে দেশটির সরকার।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মধ্যপ্রাচ্য এবং উত্তর আফ্রিকার পরিচালক হেবা মোরায়েফ বলেন, ‘ইন্টারনেট বন্ধ করে অন্ধকারের মধ্যে মানুয়ের ওপর কর্তৃপক্ষের আগ্রাসন কতটা নির্মম ও ক্রমবর্ধমান- সেটি মৃতের উদ্বেগজনক সংখ্যা থেকেই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।‘

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি
ইরানের অন্তত ৮০ শহরে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ

ইরানে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবের পরই নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। দেশটির ধর্মীয় শাসকদের কাছে নারীদের জন্য এটি ‘অতিক্রম-অযোগ্য সীমারেখা’। বাধ্যতামূলক এই পোশাকবিধি মুসলিম নারীসহ ইরানের সব জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের নারীদের জন্য প্রযোজ্য।

হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে প্রয়োগের জন্য চলতি বছরের ৫ জুলাই ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি একটি আদেশ জারি করেন। এর মাধ্যমে ‘সঠিক নিয়মে’ পোশাকবিধি অনুসরণ না করা নারীদের সরকারি সব অফিস, ব্যাংক এবং গণপরিবহনে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

এ ঘটনায় গত জুলাইয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে #no2hijab হ্যাশট্যাগ দিয়ে শুরু হয় প্রতিবাদ। দেশটির নারী অধিকারকর্মীরা ১২ জুলাই সরকার ঘোষিত জাতীয় হিজাব ও সতীত্ব দিবসে প্রকাশ্যে তাদের বোরকা ও হিজাব সরানোর ভিডিও পোস্ট করেন।

ইরানে মাহসার পর এবার বিদ্রোহের প্রতীক হাদিস নাজাফি
তিন বছরের মধ্যে ইরানের সবচেয়ে বড় প্রতিবাদটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন নারীরা

সে সময় খোলা মাথায় কয়েক সেকেন্ডের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করেন ইরানি তরুণী মেলিকা কারাগোজলু। এ কারণে সম্প্রতি কারাগোজলুকে ৩ বছর ৮ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে ইরানের আদালত।

আরও পড়ুন:
মাহসা আমিনির ২৩তম জন্মদিনে কবরে ফুল আর কেক
উত্তাল ইরানের এক শহর নিরাপত্তা বাহিনীর হাতছাড়া
ইরানে পোশাকের স্বাধীনতার বিক্ষোভে মৃত্যু বেড়ে ৫০
ইরানের রাস্তায় এবার হিজাবপন্থিরা
ইরানে পোশাকের স্বাধীনতার বিক্ষোভে মৃত বেড়ে ২৬

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Extortion of crores of rupees a year from waste disposal

ভাগাড় থেকে বছরে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

ভাগাড় থেকে বছরে কোটি টাকার চাঁদাবাজি সাভারে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের চক্রবর্তী, শ্রীপুর, বাইপাইল, পলাশবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে মূলত বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট ময়লা দিন-রাত ছোট ছোট গাড়িতে করে এনে ফেলা হচ্ছে।
ছোট গাড়িতে করে ময়লাকর্মীরা বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহ করে সড়কের পাশে এসব ভাগাড়ে ফেলেন। এ জন্য তাদের গাড়িপ্রতি দিতে হয় চাঁদা। এসব ভাগাড় নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

মহাসড়ক কিংবা সড়কের যত্রতত্র ভাগাড়। উটকো গন্ধে নাজেহাল পথচারী। রাজধানী ঢাকার কাছে সাভারের বিভিন্ন সড়ক-মহাসড়কের পাশে ময়লার স্তূপের দুর্ভোগ এখানকার নাগরিকদের এখন অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। উটকো পচা গন্ধে নাভিশ্বাস উঠলেও অভিযোগ জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন তারা।

কেন বছরের পর বছর ধরে সড়কের পাশে ময়লা ফেলা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না– এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য।

সাভারে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের চক্রবর্তী, শ্রীপুর, বাইপাইল, পলাশবাড়ীসহ বেশ কয়েকটি স্থানে মূলত বাসাবাড়ির উচ্ছিষ্ট ময়লা দিন-রাত ছোট ছোট গাড়িতে করে এনে ফেলা হচ্ছে। মহল্লাভিত্তিক বাসাবাড়ি থেকে যারা ময়লা সংগ্রহ করেন, তারা বাসাপ্রতি ১০০ টাকা নিয়ে থাকেন। ছোট গাড়িতে করে তারা বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহ করে সড়কের পাশে এসব ভাগাড়ে ফেলেন। এ জন্য তাদের গাড়িপ্রতি গুনতে হয় চাঁদা। এসব ভাগাড় নিয়ন্ত্রণ করেন স্থানীয় প্রভাবশালীরা।

আশুলিয়ার বাইপাইল এলাকায় শাহরিয়ার গার্মেন্টস নামক একটি পোশাক কারখানার বিপরীতে নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের পাশে রয়েছে এ রকম একটি ভাগাড়। এখানে ময়লা ফেলতে গাড়িপ্রতি ৫০০ টাকা চাঁদা আদায় করে একটি চক্র। প্রতিদিন ৪০ থেকে ৪৫টি গাড়ি এখানে ময়লা ফেলে। সে হিসাবে মাসে এই একটি স্পট থেকে প্রায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার টাকা চলে যায় চাঁদাবাজদের পকেটে। বছরে সেই অঙ্কটা প্রায় ১ কোটি টাকা।

ভাগাড় থেকে বছরে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

এ ছাড়া চক্রবর্তী, শ্রীপুর ও পলাশবাড়ীতে ময়লার স্পটগুলো থেকেও চাঁদাবাজির কথা জানিয়েছেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ময়লা বহনে জড়িত একাধিক ব্যক্তি। আর হকার্স লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির সংশ্লিষ্টতার তথ্যও দিয়েছেন তারা।

বাসা থেকে ময়লা সংগ্রহকারী মো. বাবুল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পাবলিকের কাছ থাইকে আমরা আগে নিছি ৬০ ট্যাকা রুমপ্রতি। এখন সব জিনিসের দাম বাড়ার কারণে ১০০ ট্যাকা কইরা নেই। ওহানে মাল ফালাইলে হ্যাগো কিছু ট্যাকা দেয়া লাগে। তিন গাড়ি মাল ফালাইলে ৫০০ ট্যাকা কইরা গাড়িপ্রতি মোট ১৫০০ ট্যাকা দেয়া লাগে। ওরা গাড়িপ্রতি ৫০০ ট্যাকা নেয় জুয়েল আর ওবায়দুল।’

এখন ময়লা ফেলানো বন্ধ আছে কি না- এমন প্রশ্নে বলেন, ‘না না, বন্ধ নাই। কোনো ঝামেলা নাই। ভোর ৬টা থাইকা শুরু কইরে মনে করেন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত মাল পড়ে। যত গাড়ি আপনে পারেন। ৪০ থেকে ৪৫টি গাড়ির ময়লা পড়ে।’

অভিযুক্ত আশুলিয়া থানা ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি মো. ওবায়দুল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যদি ভাই আমারে দেহেন, আমারে পান, তহন আমারে ধইরা নিয়া যাইয়েন। আমার এলাকায় আমি ময়লা বহনের ব্যবসা করি। আমার একটা গাড়ি আছে। ওখানে বাধা দেয়ার পর আমার গাড়িগুলার ময়লা চক্রবর্তীতে পড়ে। আমি এটার মধ্যে জড়িত না ভাই। যারা নেয়, তাদের নামে নিউজ করেন। আমার কাছে আগে শরীফ নামের একজন নিত। আমি আগে মাসে ১১ হাজার ট্যাকা দিয়া ফালাইতাম। হকার্স লীগের ওই শরিফরে দিতাম। ঢাকা জেলা হকার্স লীগের আহ্বায়ক। ভাই, সত্য কথা, আমি আগে ফালাইতাম। এখন আর ফালাই না ভাই।’

তার বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন এমন প্রশ্নে বলেন, ‘জানি না। হয়তো যারা গাড়ির ময়লা ফালায়, আমার নাম দেয়। বিভিন্ন এলাকার আছে। আমার অবস্থান ভালো তো, হয়তো বা আমার নাম দিয়া বাঁইচা যায় আর কি। আমি আশুলিয়া থানা ছাত্রলীগের সাবেক কমিটির সহ-সভাপতি ছিলাম।’

ভাগাড় থেকে বছরে কোটি টাকার চাঁদাবাজি

মো. জুয়েল নামে আরেক অভিযুক্তের সঙ্গে একাধিকবার কথা বলার চেষ্টা করে তাকে পাওয়া যায়নি।

তবে ঢাকা জেলা হকার্স লীগের আহ্বায়ক শরিফুল ইসলাম সবুজ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি এটার সঙ্গে জড়িত না। আমি এটার বিপক্ষে। আমি ওখানে শাহরিয়ার গার্মেন্টসের সিকিউরিটি গার্ডকে বইলা রাখছি, একটা গাড়ি এখানে যদি ফেলতে দেখ, আমারে ফোন দিবা, আমি আসুম।’

সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ওবায়দুল আপনাকে টাকা দিয়ে এখানে ময়লা ফেলেছে- এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, ‘না না, ওবায়দুল নামের কাউকে চিনি না তো। যদি আমার নাম কেউ বলে থাকে, আমাকে ফোন দিবেন।’

মানিকগঞ্জ সড়ক ও জনপদ বিভাগের নয়ারহাট শাখার উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শাখার প্রকৌশলী আরাফাত সাকলায়েন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি পুরোটা পরিষ্কার করেছি। পরিষ্কার করে ময়লাগুলো ঠেলে দিয়ে একটা ব্যানার দিছি বড়। আমাকে এলাকার লোকজন ফোন দিছিল। পাশাপাশি আমি জিডির কাগজ পৌঁছাইছি পুলিশের কাছে। পুলিশ এখনও জিডি করে নাই। ওনারা নাকি এখন সরেজমিনে পরিদর্শন করে জিডি করেন। আমি লোক পাঠায় জিডিটা এনসিওর করাব।’

টাকার বিনিময়ে ওখানে ময়লা ফেলানো হচ্ছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘আমরা ওই জায়গায় একটি বড় ড্রেন করি। বাস যেন দাঁড়াতে পারে- এ রকম একটা কিছু করতে চাচ্ছি। যেহেতু জায়গাটা আমাদের হাত থেকে ছুটেই যাচ্ছে। ওরা বার বার ময়লা ফালাচ্ছে, এই করতেছে, সেই করতেছে। একটা পার্মানেন্ট সলুশন চাচ্ছি আর কি।’

আশুলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মোহাম্মদ জিয়াউল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অনেক দিন আগে ওই স্থানটি বেদখল হয়ে যাচ্ছে বলে আমাদের অবগত করা হয়েছিল। তবে জিডি বা অভিযোগ দায়ের হয়নি। নতুন করে ময়লার ভাগাড় থেকে চাঁদা উত্তোলনের বিষয়ে অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও পড়ুন:
সাংবাদিক পরিচয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগে পিটুনি
বরিশালের অ্যাম্বুলেন্স মালিকদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ
সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মারধর-চাঁদাবাজির অভিযোগ
মেয়রের মামলায় গ্রেপ্তার ছাত্রলীগের ২ নেতা
মাঝিরঘাটে চাঁদাবাজির মামলায় সেই শহীদ চেংগা গ্রেপ্তার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Banks have increased spending on sustainable and green financing

টেকসই ও সবুজ অর্থায়নে ব্যয় বাড়িয়েছে ব্যাংক

টেকসই ও সবুজ অর্থায়নে ব্যয় বাড়িয়েছে ব্যাংক টেকসই ও সবুজ অর্থায়নে ব্যয় বাড়িয়েছে ব্যাংক। প্রতীকী ছবি
কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বেড়েছে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন। আবার টেকসই অর্থায়নের আওতায় এমন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে, যেখানে ব্যবহার হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। এর ফলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পের সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন।

অনিয়ন্ত্রিত কার্বন নিঃসরণে বাড়ছে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি। বাড়ছে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, খরা, নদীভাঙন, জলাবদ্ধতা ও পানি বৃদ্ধি এবং মাটির লবণাক্ততা। ঝুঁকিগুলোকে শনাক্ত করে তা বন্ধে শুরু হয়েছে নানামুখী কার্যক্রম। এ ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছে বিভিন্ন ব্যাংক।

কার্বন নিঃসরণ কমাতে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বেড়েছে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন। আবার টেকসই অর্থায়নের আওতায় এমন প্রকল্প যুক্ত হচ্ছে, যেখানে ব্যবহার হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎ। এর ফলে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই শিল্পের সংখ্যাও বাড়ছে দিন দিন।

ঝুঁকি কমাতে এই দুই খাতে অর্থায়নের লক্ষ্য বেঁধে দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংক। ফলে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এসব খাতে অর্থায়নে নজর বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি এখন দেশের অনেক ব্যাংকের শাখা ও এটিএম বুথে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে।

ব্যাংকগুলোতে বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে গুরুত্ব পাচ্ছে প্রাকৃতিক আলোর ব্যবহার। কাগজের ব্যবহার কমাতেও উদ্যোগ নিয়েছে কোনো কোনো ব্যাংক। এ খাতে ব্যাংকগুলোর অর্থায়ন বাড়ছে।

চলতি বছরের জুন শেষে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে ৩১ হাজার ৬২২ কোটি ডলার। এর মধ্যে ব্যাংকগুলো অর্থায়ন করেছে ৩০ হাজার ৫৭৮ কোটি ডলার, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

একই সময়ে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ব্যাংকগুলো ২ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার অর্থায়ন করেছে, যা ব্যাংকগুলোর মোট মেয়াদি ঋণের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ।

কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশ ব্যাংক ২০৫০ সালের মধ্যে ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের ৫০ শতাংশ সবুজ অর্থায়নে পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে। তবে এ দুটি খাতে ঋণ বাড়াতে হলে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে সুদের হার কমাতে হবে।

টেকসই অর্থায়নে কত অর্থ

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাসটেইনেবল ফিন্যান্স পলিসি অনুযায়ী, ব্যাংকগুলো সাসটেইনেবল ফিন্যান্সের ১১টি ক্যাটাগরিতে মোট ৬৮টি পণ্যের বিপরীতে ঋণ দিতে পারে। এসব পণ্যের অধিকাংশই সবুজ অর্থায়নের অন্তর্ভুক্ত।

তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে ৩০ হাজার ৫৭৮ কোটি ডলার, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৮৮ শতাংশ।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়ন করেছে ১ হাজার ৪৩ কোটি ডলার, যা মোট ঋণের ১৫ দশমিক ৬৪ শতাংশ।

গত মার্চ পর্যন্ত দেশের ব্যাংকগুলো টেকসই প্রকল্পে অর্থায়ন করে ২৫ হাজার ২৯০ কোটি ডলার, যা মোট ঋণের ৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়ন করে ৮৫৯ কোটি ডলার, যা মোট ঋণের ১৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ।

ঋণ বিতরণের এই ঊর্ধ্বমুখী হার ইঙ্গিত দিচ্ছে, সবুজ অর্থায়নের জনপ্রিয়তা ক্রমেই বাড়ছে।

টেকসই প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে কৃষি, সিএমএসএমই, পরিবেশবান্ধব কারখানা, সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল প্রকল্পে অর্থায়ন। যদিও মোট ঋণের ২০ শতাংশ টেকসই প্রকল্পে হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ঋণের ৭৩ শতাংশ নিয়েছে পুরুষ আর ২৭ শতাংশ নারী।

সবুজ অর্থায়ন

একই সময়ে পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ব্যাংকগুলো ২ হাজার ৩৬০ কোটি ডলার অর্থায়ন করেছে, যা ব্যাংকগুলোর মোট মেয়াদি ঋণের ৩ দশমিক ৯৩ শতাংশ। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়ন করেছে ৩১০ কোটি ডলার, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর মেয়াদি ঋণের ৬ দশমিক ৭২ শতাংশ।

মার্চ পর্যন্ত পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে ব্যাংকগুলো ১ হাজার ৬৮৯ কোটি ডলার অর্থায়ন করে, যা ব্যাংকগুলোর মোট মেয়াদি ঋণের ৩ দশমিক ১০ শতাংশ। আর আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অর্থায়ন করে ৪০৯ কোটি ডলার, যা প্রতিষ্ঠানগুলোর মেয়াদি ঋণের ৮ দশমিক ৭৯ শতাংশ।

পরিবেশবান্ধব প্রকল্পের মধ্যে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন, বর্জ্য পরিশোধনাগার বা ইটিপি নির্মাণ, পরিবেশবান্ধব ইট উৎপাদন অন্যতম। এই খাতে মোট মেয়াদি ঋণের ৫ শতাংশ ঋণ দেয়ার শর্ত রয়েছে।

টেকসই ও সবুজ অর্থায়নে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করতে দুই বছর ধরে বিভিন্ন মানদণ্ডে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) টেকসই বা সাসটেইনেবল রেটিং বা মান প্রকাশ করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী শীর্ষ ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান

চলতি জুন শেষে টেকসই অর্থায়নে বিদেশি ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া তাদের লক্ষ্যমাত্রার ৮২ দশমিক ২৯ শতাংশ অর্জন করেছে। বার্ষিক লক্ষ্যমাত্রা পূরণের তালিকায় দ্বিতীয় ন্যাশনাল ব্যাংক ৬৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ।

এরপর আছে যথাক্রমে রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক ৫৩ দশমিক ৭২, কৃষি ব্যাংক ৫০ দশমিক ৬৭, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ৩১ দশমিক ৪৭, ট্রাস্ট ব্যাংক ২৮ দশমিক ৫৫, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ২৫ দশমিক ৮১, যমুনা ২৩ দশমিক ০৯, এনআরবি কমার্শিয়াল ২২ দশমিক ৪১, ব্র্যাক ২০ দশমিক ৬৮ এবং জনতা ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রার ২০ দশমিক ১১ শতাংশ বিতরণ করেছে।

ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর (এনবিএফআই) মধ্যে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড লক্ষ্যমাত্রার শতভাগ ঋণ বিতরণ করেছে। এ ছাড়া লংকান অ্যালায়েন্স ৮৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ, হজ ফাইন্যান্স ৫৭ শতাংশ, মেরিডিয়ান ফাইন্যান্স ৪৭ দশমিক ০৯ শতাংশ ও সিভিসি ফাইন্যান্স ৪৩ দশমিক ২১ শতাংশ ঋণ দিয়েছে।

আরও পড়ুন:
মহামারিতে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে জোয়ার

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Half of Habiganjs river has been lost

হারিয়ে গেছে হবিগঞ্জের অর্ধেক নদী

হারিয়ে গেছে হবিগঞ্জের অর্ধেক নদী হবিগঞ্জের একসময়ের এই খরস্রোতা নদী এখন মৃতপ্রায়। ছবি: নিউজবাংলা
অস্তিত্ব নেই নদীর সঙ্গে মিশে থাকা শত শত খালের। এসব নদী ও খাল দখল করে গড়ে উঠেছে বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। দীর্ঘ সময় ধরে খনন না করায় সমতল ভূমিতে পরিণত হওয়া নদীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

সত্তরের দশকে হবিগঞ্জে ৫০টির বেশি নদী ছিল। তবে এখন জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় আছে মাত্র ২২টি নদীর নাম। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে হবিগঞ্জ থেকে অর্ধেকেরও বেশি নদীর নামই মুছে গেছে।

অস্তিত্ব নেই নদীর সঙ্গে মিশে থাকা শত শত খালের। এসব নদী ও খাল দখল করে গড়ে উঠেছে বসতি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় স্থাপনা। দীর্ঘ সময় ধরে খনন না করায় সমতল ভূমিতে পরিণত হওয়া নদীর সংখ্যাও নেহায়েত কম নয়।

যে ২২টি নদী এখনও টিকে আছে সেগুলোও পরিণত হয়েছে খাল বা নালায়। সেই সঙ্গে নদী শাসনে মহা সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে কুশিয়ারা, কালনী, খোয়াই, ধলেশ্বরী, সুতাং, রত্মা এবং করাঙ্গীর মতো বড় নদীগুলোও।

হারিয়ে গেছে হবিগঞ্জের অর্ধেক নদী

পরিবেশকর্মীরা বলছেন, এসব নদী হারিয়ে যাওয়া এবং দখল-দূষণের জন্য সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দায়ী। এখনও যেসব নদী টিকে আছে এগুলো সংরক্ষণ করা না হলে কয়েক বছর পর সেগুলোও হারিয়ে যাবে। এতে চরম সংকটে পড়বে পরিবেশ, প্রকৃতি ও প্রাণীকুল।

নবীগঞ্জের একসময়ের খরস্রোতা শাখাবরাক নদী। এই নদী ঘিরেই গড়ে উঠেছিল নবীগঞ্জ শহর। এলাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের একমাত্র মাধ্যম ছিল নদীপথ। এই নদী দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করত শত শত নৌযান।

নদীতে মাছ শিকার করে জীবিকা নির্বাহ করতেন এই এলাকার বাসিন্দারা। গেল চার দশকে সেই নদীটি এখন মৃতপ্রায়। নদীর দুই পাশ দখল করে গড়ে উঠেছে শত শত বসতি আর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। ফলে মরা খালে পরিণত হয়েছে একসময়ের খরস্রোতা নদীটি।

নদীটি নিয়ে ছোটবেলার স্মৃতি মনে করে শহরের অনমনু গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী ধনাই মিয়া বলেন, ‘নদীটির দিকে চাইলে কষ্ট লাগে। একসময় এই নদীর কী যৌবন ছিল। নদীর দুই পাশে শত শত নৌকা বাঁধা থাকত। এসব নৌকা বিভিন্ন এলাকা থেকে কত মালামাল নিয়ে আসত নবীগঞ্জে। আর মাছের কথা কী বলি, ডুব দিয়ে খালি হাতে মাছ ধরে নিয়া আসা যাইত। এখন এই নদী লাফ দিয়ে পার হওয়া যায়।’

দখলের কবলে বিলীনের পথে বাহুবলের করাঙ্গী ও মাধবপুরের সোনাই, শিল্পবর্জ্য দূষণে মৃতপ্রায় সুতাং আর ব্যক্তিমালিকানায় চলে গেছে শুঁটকি নদী। চরম সংকটে রয়েছে রত্মা এবং হবিগঞ্জ শহরকে ঘিরে থাকা খোয়াইও।

লাখাই উপজেলার লুকড়া এলাকার বাসিন্দা মঈনুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের এখানে অনেক নদী ছিল। সেগুলোর অনেক নদীই এখন নেই। কয়েকটা নদী খালের মতো হয়ে গেছে। একসময় সেগুলোতে অনেক মাছ পাওয়া গেলেও এখন হাত-পাও ধোয়া যায় না।’

হারিয়ে গেছে হবিগঞ্জের অর্ধেক নদী

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী বা পরবর্তী সময়ে হবিগঞ্জে কতটি নদী ছিল সেই তথ্য তাদের কাছে নেই। তবে ২০২১ সালের করা একটি তালিকায় তাদের কাছে ২২টি নদী ও ৬৩টি খালের নাম রয়েছে। খালগুলোর চিন্তা বাদ দিয়ে আপাতত নদীগুলো বাঁচানোর উদ্যোগ নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ।

এর মধ্যে ১৬ কোটি টাকা ব্যয়ে রত্মা ও ধলেশ্বরীর ৮ কিলোমিটার ড্রেজিং কাজ চলমান রয়েছে। সেই সঙ্গে ৭৮ কোটি টাকা ব্যয়ে খনন চলছে বিজনা-গোপলা, করাঙ্গী, কাস্তি, সোনাই নদীর ১১৭ কিলোমিটার। যার ৫০ শতাংশ কাজ শেষ।

হবিগঞ্জ শহরের পুরাতন খোয়াই নদী রক্ষায় ৯১ লাখ টাকা ব্যয়ে নদীর পশ্চিমপাড়ে ওয়াকওয়ে নির্মাণের কাজ চলছে। আর শহর থেকে অন্তত ১২ ফুটের বেশি ওপরে উঠে যাওয়া নতুন খোয়া নদী ড্রেজিংসহ বিভিন্ন কাজের জন্য ১৪০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায়।

যে ৫টি নদীর খনন কাজ চলছে সেগুলো নিয়ে অভিযোগ রয়েছে স্থানীয়দের। স্থানীয়রা বলছেন, কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে খননের নামে নদীকে খালে রূপান্তরিত করার কাজ চলছে। এ ব্যাপারে নবীগঞ্জের বিজনা নদী খনন প্রকল্পের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেছেন স্থানীয় জনগণ। বাহুবলের করাঙ্গী নদীর খননে অনিয়মের অভিযোগ এনে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেও ব্যর্থ হয়ে এখন নীরব স্থানীয়রা।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) হবিগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল বলেন, ‘নদী হারিয়ে যাওয়া এবং দখল দূষণের জন্য সরকারের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দায়ী। তারা এসব নদী রক্ষণাবেক্ষণে ব্যর্থ হওয়ার কারণেই প্রতিনিয়ত নদী দখল হচ্ছে। এ ছাড়া যে সরকারই যখন ক্ষমতায় আসে, সেই সরকারের ক্ষমতাশীন নেতারা নদী দখল করেন।’

হারিয়ে গেছে হবিগঞ্জের অর্ধেক নদী

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন সময় আমরা শুনি নদী রক্ষায় বিভিন্ন প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। কিন্তু সেই প্রকল্প সম্পর্কে জনগণকে অবগত করা হয় না। কিছুদিন তোড়জোড় করে পুনরায় সেই প্রকল্প বন্ধ করে দেয়া হয়। পরিবেশ প্রকৃতি ও প্রাণীকুল রক্ষায় নদী বাঁচাতে এখনই উদ্যোগী হতে হবে। না হলে সামনের দিনগুলোতে আমাদের জীবনে ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসবে।’

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শামীম হাসনাইন মাহমুদ বলেন, ‘নদী রক্ষায় আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছি। ইতোমধ্যে নদীর ওপর গড়ে ওঠা ৯৪২টি স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়েছে। বাকিগুলো উচ্ছেদেও তালিকা তৈরি করে ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো হয়েছে। তবে হাইকোর্টে মামলা থাকায় ৩৩টি স্থাপনায় হাত দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।’

তিনি বলেন, ‘শুধু সাধারণ মানুষ নয়, যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান নদীদূষণ করছে, তাদের বিরুদ্ধেও সংশ্লিষ্ট আইনে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, ‘নদী দখল ও দূষণমুক্ত রাখতে কাজ করছে জেলা প্রশাসন, পানি উন্নয়ন বোর্ড ও পরিবেশ অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর। এমনকি দখলদারদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র্রপক্ষ হিসেবে আদালতেও লড়াই করছি আমরা।’

আরও পড়ুন:
২৩ সেপ্টেম্বর আসছে ‘নদী রক্স কনসার্ট’
যমুনার ভাঙনে মুছে যাচ্ছে কয়েকটি গ্রাম
ধরলার ভাঙনে বিলীনের পথে চর ফলিমারী গ্রাম

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Why did Iran explode like this after Mahsas death?

মাহসার মৃত্যুতে কেন এভাবে বিস্ফোরিত ইরান

মাহসার মৃত্যুতে কেন এভাবে বিস্ফোরিত ইরান ইরানজুড়ে বিক্ষুব্ধদের ঐক্যবদ্ধ করেছেন মাহসা আমিনি। ছবি: সংগৃহীত
ইরানের কট্টরপন্থি শাসকদের প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত অর্থনীতি, দুর্নীতি ও সামাজিক বিধিনিষেধ নিয়ে ব্যাপক হতাশা এই অস্থিরতার সঙ্গে মিশে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিক্ষোভের ফুটেজে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পেটাচ্ছেন।

ইরানে ‘সঠিকভাবে’ হিজাব না করার অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর কুর্দি তরুণী মাহসা আমিনির পুলিশি হেফাজতে মারা যাওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে তুমুল বিক্ষোভ।

রাজধানী তেহরানসহ অন্তত ৮০টি শহর এখন অগ্নিগর্ভ। পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে চলমান বিক্ষোভে ৫০ জনের বেশি মানুষ মারা গেছেন। আহত হয়েছেন হাজারের বেশি।

১৯৭৯ সালে দেশটিতে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকে নারীর পোশাক ইস্যুতে সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ এটি।

ইরানে ১৯৭৯ সালের ওই বিপ্লবের পরই নারীদের জন্য হিজাব বাধ্যতামূলক করা হয়। দেশটির ধর্মীয় শাসকদের কাছে নারীদের জন্য এটি ‘অতিক্রম-অযোগ্য সীমারেখা’। বাধ্যতামূলক এই পোশাকবিধি মুসলিম নারীসহ ইরানের সব জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মের নারীদের জন্য প্রযোজ্য।

মাহসার মৃত্যুতে কেন এভাবে বিস্ফোরিত ইরান
মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর বিক্ষোভে উত্তাল ইরান। ছবি: সংগৃহীত

নারীর জন্য কঠোর পোশাকবিধি দেখভালের দায়িত্বে আছে ইরানের ‘নৈতিকতা পুলিশ’ ইউনিট, ফারসি ভাষায় যার প্রাতিষ্ঠানিক নাম ‘গাস্ত-ই এরশাদ’। নিবর্তনমূলক ভূমিকার কারণে এই ইউনিট দীর্ঘদিন ধরেই অত্যন্ত অজনপ্রিয়। মাহসার মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ইরানে ‘নৈতিকতা পুলিশ’-এর বিরুদ্ধে ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে। পাশাপাশি দেশটির শাসকগোষ্ঠীর প্রতিও বিপুলসংখ্যক মানুষের অনাস্থার প্রকাশ ঘটেছে এবার।

বিক্ষোভের বেশ কয়েকটি কারণ বিশ্লেষণ করেছেন সংবাদ সংস্থা ব্লুমবার্গের প্রতিবেদক গোলনার মোতিভেলি। তার প্রতিবেদনটি ভাষান্তর করা হয়েছে নিউজবাংলার পাঠকদের জন্য।


১. বিক্ষোভের কারণ কী?

তাৎক্ষণিক কারণ ছিল ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনির পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু। ১৬ সেপ্টেম্বর এ খবর প্রকাশিত হয়। রাষ্ট্রীয় মিডিয়ার তথ্য অনুসারে, মাহসা কুর্দিস্তান প্রদেশ থেকে পরিবারের সঙ্গে তেহরানে ভ্রমণে এসেছিলেন।

গাস্ত-ই এরশাদ-এর একটি দল তাকে আটকের সময় দাবি করে, মাহসার পোশাক ‘সঠিক নয়’। সংস্কারপন্থি শার্গ সংবাদপত্রের বিবরণ অনুসারে, মাহসার ভাই এ সময় পুলিশের কাছে তার বোনকে সতর্ক করে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করেন। তবে পুলিশ তা কানে নেয়নি। মাহসাকে একটি মিনিভ্যানে জোর করে তুলে থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।

তার মৃত্যুর খবর প্রকাশের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় টিভি সিসিটিভি ফুটেজ প্রকাশ করেছে। এতে দেখা যায়, মাহসা একটি চেয়ারে বসা ও সেখান থেকে মেঝেতে পড়ে যাচ্ছেন। তেহরানের পুলিশ বাহিনী বলেছে, তিনি হার্ট অ্যাটাকে মারা গেছেন। তবে পরিবারের দাবি, মাহসার আগে কোনো শারীরিক বা স্বাস্থ্যগত সমস্যা ছিল না এবং কর্তৃপক্ষ তাকে মারধরের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করছে।

২. ক্ষোভ কতটা তীব্র?

ইরানের বিভিন্ন শহরে বড় ধরনের বিক্ষোভের খবর পাওয়া গেছে। তারকা, রাজনীতিক ও খেলোয়াড়রা সোশ্যাল মিডিয়াতে পুলিশের নিন্দার পাশাপাশি গাস্ত-ই এরশাদ-এর সমালোচনা করেছেন। তরুণীরা মাসহার প্রতি সংহতি জানাতে তাদের মাথার হিজাব খুলে ফেলেছেন ও পুড়িয়ে দিচ্ছেন।

ইরানের কট্টরপন্থি শাসকদের প্রতি ক্ষোভের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত অর্থনীতি, দুর্নীতি ও সামাজিক বিধিনিষেধ নিয়ে ব্যাপক হতাশা এই অস্থিরতার সঙ্গে মিশে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় বিক্ষোভের ফুটেজে দেখা গেছে, বিক্ষোভকারীরা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের পেটাচ্ছেন।

৩. বিক্ষোভকারীদের দাবি কী?

বিক্ষোভকারীরা ৯ বছর বয়স থেকে সব নারীর জন্য বাধ্যতামূলক হিজাবের আইনকে বদলাতে চান। এই পোশাকবিধি অনুযায়ী নারীদের জনসমক্ষে চুল সম্পূর্ণভাবে ঢেকে রাখতে হয় এবং লম্বা, ঢিলেঢালা পোশাক পরতে হয়।

এ আইন ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর কার্যকর হয়। ওই বছর নির্বাসিত ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনি পশ্চিমপন্থি শাহকে হটিয়ে ইরানের ক্ষমতায় বসেন। তবে তার সরকার দ্রুত দেশের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত ও বিপ্লবী নারী কর্মীদের মধ্যে অজনপ্রিয় হয়ে ওঠে।

মাহসার মৃত্যুতে কেন এভাবে বিস্ফোরিত ইরান
ইরানে নারীর পোশাকের স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভে অসংখ্য পুরুষও যোগ দিয়েছেন। ছবি: সংগৃহীত

বছরের পর বছর ধরে নারীরা ধীরে ধীরে অনুমোদনযোগ্য পোশাকের সীমানা বাড়িয়েছেন। খোলা ও লেগিনসের সঙ্গে ঢিলেঢালা শাল ও পোশাক বেশিরভাগ শহরে সাধারণ পোশাক হয়ে উঠেছে। মাহসাকে যখন আটক করা হয় তার পরনেও ছিল তেমন একটি পোশাক।

৪. হিজাব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ কি এই প্রথম?

১৯৭০ দশকের শেষে ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই পোশাকবিধির বিরোধিতা দেশটির কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত সুশীল সমাজের একটি বৈশিষ্ট্য ছিল। তবে ২০১৭ সালের শেষের দিকে তেহরানের পাবলিক ইলেকট্রিকাল কেবিনেট ও বেঞ্চে বেশ কয়েকজন নারী তাদের মাথার স্কার্ফ খুলে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার পর থেকে ভিন্নমত আরও জোরালো হয়।

তাদের সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশকে আগ্রাসীভাবে তাদের মাটিতেও ঠেসে ধরে রাখতেও দেখা গেছে। ওই বছরের আগস্টে সেপিদেহ রাশনো নামে এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাশনো এক ধার্মিক, চাদরে ঢাকা ব্যক্তির সঙ্গে তর্ক করছিলেন, যিনি এক তরুণীকে তার পোশাকের জন্য হয়রানি করছিলেন।

এ দৃশ্য জাতীয় টিলিভিশনে প্রচার হওয়ার পর রাশনোকে টিভিতে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করা হয়। রাশনোর চেহারা ছিল ফোলা ও তাকে মারধরের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল।

৫. কর্তৃপক্ষ কীভাবে জবাব দিয়েছে?

ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সহজাত প্রবৃত্তি হলো, অনুমোদনহীন জমায়েতকে বেআইনি দাবি করে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া। অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা বেড়ে গেলে দাঙ্গা পুলিশ সাধারণত লাঠি ব্যবহার করে বা শটগানের গুলি ও কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে।

সাদা পোশাকধারী, স্বেচ্ছাসেবী মিলিশিয়ারাও বিক্ষোভকারীদের আক্রমণ করে এবং পরে তাদের গ্রেপ্তারে সহায়তা করার জন্য প্রায়ই ছবি তুলে রাখে। তবে মাহসাকে নিয়ে বিক্ষোভের মাত্রা কিছুটা ভিন্ন।

ইরানি পার্লামেন্টের প্রধান (একজন কট্টরপন্থী ও সাবেক পুলিশ কমান্ডার, যিনি ১৯৯০ এর দশকের শেষ দিকে বিক্ষোভকারীদের মারধর করার জন্য অভিযুক্ত) গাস্ত-ই এরশাদ আইন সংস্কারের ঘোষণা দিয়েছেন। পাশাপাশি প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি মাহসার বাবা-মাকে তদন্তের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

মাহসার মৃত্যুতে কেন এভাবে বিস্ফোরিত ইরান
তেহরানের রাস্তায় বিক্ষোভের সময় হিজাব খুলে পুড়িয়ে দিচ্ছেন এক নারী। ছবি: সংগৃহীত

৬. আগের প্রতিবাদগুলো কী নিয়ে ছিল?

সরকারের জন্য সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং ছিল ২০০৯ সালের গ্রিন মুভমেন্ট। ওই বছর প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদের পুনর্নিবাচনে জালিয়াতির অভিযোগে ওই বিক্ষোভ হয়। রাজনৈতিক ইস্যুতে তেহরানে একের পর এক সমাবেশ ও মিছিল হতে থাকে এবং তাতে যোগ দেন লাখ লাখ মধ্যবিত্ত ইরানি।

এই বিক্ষোব দমনে বহু মানুষকে হত্যা করা হয় ও শতাধিক ব্যক্তি গ্রেপ্তার হন। ইন্টারনেট ব্যবহারে দেয়া হয় বিধিনিষেধ। তবে এরপরও বিক্ষোভ চলমান ছিল:

  • মে, ২০২২: দক্ষিণ-পশ্চিম ইরানে একটি ১০ ​​তলা ভবন ধসে পড়ার পর বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ভবনটির অনুমতি দিয়েছিলেন এক সরকারি কর্মকর্তা। এ ঘটনায় কমপক্ষে ৪০ জন নিহত হন।

    জানুয়ারি, ২০২০: ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী ভুল করে একটি যাত্রীবাহি বিমানকে গুলি করে ভূপাতিত করে। এতে বিমানের ১৭৬ আরোহী মারা যান। নিরাপত্তা সংস্থার অদক্ষতা ও রাষ্ট্রের দোষ লুকানোর প্রচেষ্টায় জনগণের মাঝে ক্ষোভের আগুন জ্বলে ওঠে।

  • নভেম্বর, ২০১৯: জ্বালানিতে ভর্তুকি দিতে থাকা সরকার হঠাৎ করেই পেট্রলের দাম বাড়িয়ে দেয়। ইরানিরা সে সময় আমেরিকান রাষ্ট্রপতি ডনাল্ড ট্রাম্পের দেয়া নিষেধাজ্ঞার অধীনে ছিল। বিক্ষোভকে নিরাপত্তা বাহিনী কঠোরভাবে দমন করে।

  • ২০১৭ সালের শেষদিক: অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতায় হতাশা প্রকাশ করতে বিক্ষোভ শুরু হয়। এটি শেষ পর্যন্ত গড়ায় সরকারবিরোধী আন্দোলনে।

  • তেল সমৃদ্ধ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় খুজেস্তান প্রদেশে আরবদের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে। তারা পারস্য ইরানে সংখ্যালঘু। খুজেস্তানে চলমান দুর্নীতি ও দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ নিয়মিত বিষয়। নিরাপত্তা বাহিনী সেগুলো ক্রমাগত দমন করছে।

৭. ইরানে বিরোধীদের অবস্থান কেমন?

ইরানে কোনো সংগঠিত বিরোধী দল নাই। মানুষ ব্যক্তিগতভাবে নেতৃত্বের সমালোচনা করে। তবে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত মিডিয়াতে তার প্রতিফলন ঘটে খুবই কম। ইরানে একমাত্র ইসলামি প্রজাতন্ত্রের মূল্যবোধকে সমর্থন করা রাজনৈতিক দলগুলোই কাজ করতে পারে।

ধর্মনিরপেক্ষ, কমিউনিস্ট ও ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্মের প্রচারক দল সেখানে নিষিদ্ধ। ইরানের রাজনীতিবিদদের মোটামুটিভাবে তিন ভাগে ভাগ করা যায়:

চরম রক্ষণশীল: যেমন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি, মধ্যপন্থি বা বাস্তববাদি রক্ষণশীল: যেমন সাবেক প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি বা আলি লারিজানি। আর রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামির মতো সংস্কারপন্থি।

সংস্কারপন্থিরা বিশ্বাস করেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি আরও উন্মুক্ত হওয়া উচিত। তবে চার বছর আগে যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালে করা পারমাণবিক চুক্তি বাতিল এবং ফের নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর থেকে তাদের জনপ্রিয়তা এবং প্রভাব কমেছে।

৯. বর্তমান ব্যবস্থার রক্ষাকবচ কী?

খামেনি ইরানের সামরিক বাহিনীর সবচেয়ে বড় এবং শক্তিশালী শাখা ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের সঙ্গে শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন। এটি তার অবস্থানকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে।

অর্থনীতি ও পররাষ্ট্র নীতিসহ রাষ্ট্রের সমস্ত বড় সিদ্ধান্তের পিছনে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব খামেনির। তিনি বেশ কয়েকটি বড় ধর্মীয় ফাউন্ডেশনের ডি ফ্যাক্টো প্রধান। এ ফাউন্ডেশনগুলো দেশের কিছু বৃহত্তম সংগঠন ও পেনশন তহবিল পরিচালনা করে।

সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক প্রভাবের এই একত্রীকরণ ইসলামিক প্রজাতন্ত্রকে রাজনীতিতে একটি শক্ত দখল বজায় রাখতে সাহায্য করছে। ইরানের সমস্ত প্রধান রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম থেকে বিচার বিভাগ- সবই সর্বোচ্চ নেতার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত বা রাজনৈতিকভাবে তার সঙ্গে সংযুক্ত।

গত বছরের রাইসির নির্বাচনের পর থেকে ইরানের রাষ্ট্র ও সরকারের সমস্ত কিছু কট্টরপন্থিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তারা ইসলামিক মতাদর্শকে কঠোরভাবে রক্ষা করছে।

আরও পড়ুন:
মাহসা আমিনির ২৩তম জন্মদিনে কবরে ফুল আর কেক
উত্তাল ইরানের এক শহর নিরাপত্তা বাহিনীর হাতছাড়া
ইরানে পোশাকের স্বাধীনতার বিক্ষোভে মৃত্যু বেড়ে ৫০

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Napier is a multi billion dollar business

নেপিয়ার ঘাসে শতকোটির ব্যবসা

নেপিয়ার ঘাসে শতকোটির ব্যবসা নেপিয়ার ঘাসের বাণিজ্যিক চাষাবাদ প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে বলছে উপজেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তর। ছবি: নিউজবাংলা
উপজেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলছে, নেপিয়ার ঘাসের বাণিজ্যিক চাষাবাদ প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে; যাকে আশ্রয় করে ২৯৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপজেলায় অন্তত ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। আর বছরে অর্থনৈতিক লেনদেন হয় অন্তত ১০০ কোটি টাকা।

এক সময়ের অনাবাদি কিংবা সড়কের পাশের পতিত জমিও এখন দেশীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সবই প্রয়োজনীয় হয়ে উঠছে আধুনিক বা বিজ্ঞানসম্মত চাষাবাদের কল্যাণে। এই বিষয়টি ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে বগুড়ার শেরপুরে।

উপজেলার প্রাণিসম্পদ দপ্তর বলছে, নেপিয়ার ঘাসের বাণিজ্যিক চাষাবাদ প্রতিনিয়ত বিকশিত হচ্ছে; যাকে আশ্রয় করে ২৯৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের উপজেলায় অন্তত ১০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। আর বছরে অর্থনৈতিক লেনদেন হয় অন্তত ১০০ কোটি টাকা।

তাদের একজন হলেন বগুড়ার শেরপুরের মহিপুর এলাকায় বাসিন্দা আপেল মাহমুদ। ৭ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে নেপিয়ার ঘাস চাষ করেছেন। প্রতি বিঘা ১৭ হাজার টাকা করে ইজারা নিয়ে কাঠমিস্ত্রী পেশা ছেড়ে এখন পুরোদমে খামারি হয়েছেন। ফ্রিজিয়ান জাতের পাঁচটি গরু পালনের পাশাপাশি ঘাস চাষকে আয়ের অন্যতম উৎস হিসেবে ব্যাখ্যা করলেন।

নিজের এলাকার মহিপুর বাজারে এক স্কুল মাঠে প্রতিদিন বেলা তিনটার দিকে ঘাসের হাট বসে; সেখানে বছরের প্রায় প্রতিদিন ঘাস বিক্রি করেন ৩৪ বছর বয়সী এই যুবক।

সম্প্রতি এই হাটে ঘাস বিক্রি করতে করতে আপেলের সঙ্গে আলাপ হয়। জানান, আট থেকে দশ বছর কাঠমিস্ত্রী হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এই কাজ করে সংসার চলে কিন্তু প্রশান্তি মেলে না। এক সময় এমন চিন্তা থেকেই পেশা বদল করেছেন। জমানো টাকা দিয়ে ২ বিঘা জমি ইজারা নিয়ে শুরু করলেন ঘাস চাষ। বছর শেষে প্রায় ২ লাখ টাকার ঘাস বিক্রি করেন এই জমি থেকেই।

লাভের দিক বিবেচনায় নিয়ে এরপর আপেল মাহমুদ ফ্রিজিয়ান জাতের পাঁচটি গরু পালন শুরু করেন। গত পাঁচ বছর ধরে এভাবেই তিনি ঘাস চাষ আর গরু পালন করছেন। ঘাস চাষের জমির পরিধি বেড়ে ৭ বিঘায় এসেছে। জীবনযাপনের জন্য প্রথমে ঘাস চাষ শুরু করলেও আপেল এখন এটিকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়েছেন; যেখানে খামারের গরুর জন্য ঘাস চাষও হচ্ছে, একই সঙ্গে অন্যদের গরুর প্রাকৃতিক খাদ্য সরবরাহ দেয়া সম্ভব হচ্ছে। আপেলের মতে, এক সঙ্গে গরু পালন আর ঘাস চাষের মধ্যে খামারিদের ব্যাপক সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে।

নেপিয়ার ঘাসে শতকোটির ব্যবসা

শুধু শেরপুর উপজেলায় গরু পালনের অন্তত ২ হাজার জন খামারি রয়েছেন। এখানে ২ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি গরু রয়েছে। শুধু উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের দেয়া এই তথ্য বলছে, প্রতিদিন এই উপজেলা থেকে অন্তত দেড় লাখ লিটার দুধ উৎপাদন হয়, যার বাজারমূল্য প্রায় ২ কোটি টাকা। খামারিরা এখন রেডি ফিডের চেয়ে ঘাস খাওয়ানোই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। উপজেলায় অন্তত ২ হাজার একর জমিতে এবার ঘাষ চাষের অন্যতম কারণ এটিও।

তবে ঘাষ চাষের তাৎপর্য নিয়ে বহুমুখী ব্যাখ্যা রয়েছে কৃষকদের কাছেই। মহিপুরের জামতলা গ্রামের চাষী মো. হেলাল হোসেন প্রতি বছরই ২ বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করেন।

চাষের কারণ জানতে চাইলে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘অন্য যেকোনো ফসলের চেয়ে ঘাস চাষ লাভজনক। এক বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করতে এখন ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা খরচ হয়। বিপরীতে ঘাস বিক্রি হয় ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকার। একই সঙ্গে ঘাস চাষে কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শঙ্কা নেই। ঝুঁকি নেই বললেই চলে। শ্রমিক খরচ কম। কম শ্রম দেয়া লাগে। চাহিদাও ভালো। সব দিক থেকেই অন্য ফসলের চেয়ে ঘাস চাষ লাভজনক।’

গাড়িদহ এলাকার আব্দুল হামিদ ১৮ বছর ধরে ৪ বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করছেন। তিনি জানান, আগের চেয়ে নেপিয়ার ঘাসের চাহিদা বেড়েছে বহুগুণে। পতিত ধরনের জমিতে অন্য কিছু চাষাবাদ করা যায় না বলে তিনি সেখানে ঘাস চাষ করেন। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় আগামীতে ঘাস চাষের পরিসর আরও বাড়ানোর লক্ষ্য তার।

শেরপুরের উলিপুরের বাসিন্দা আব্দুস সালাম ঘাসের ব্যবসা করেন। মহিপুর বাজারে কৃষকদের কাছ থেকে ঘাস কিনে খামারিদের কাছে বিক্রি করেন তিনি। এ ঘাস বিভিন্ন আকারের আটি বেঁধে বিক্রয় করা হয়। ১০ থেকে শুরু করে ৪০ টাকা দামের আটি বিক্রয় করেন ব্যবসায়ীরা।

এই ব্যবসায়ীর অবশ্য ফ্রিজিয়ান জাতের ৬টি গরু রয়েছে। জানান, শেরপুরে ঘাস ব্যবসাকে কেন্দ্র করে অনেক লম্বা একটি চেইন গড়ে উঠেছে। অন্তত ২০০ মানুষ সরাসরি এই ঘাস ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন।

চাহিদার প্রেক্ষাপটে জেলাজুড়ে ঘাস চাষও বাড়ছে। বগুড়া প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর বলছে, জেলাজুড়ে ঘাস চাষের চাহিদা বাড়ছে। ২০২১-২২ অর্থ বছরে জেলায় ৫৭৫ একর জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করা হয়েছে। এর আগের অর্থ বছরে ৪৪৮ একর জমিতে ঘাস চাষ করা হয়েছিল। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ১২৭ একর জমিতে ঘাস চাষ বেড়েছে।

নেপিয়ার ঘাসে শতকোটির ব্যবসা

শেরপুরের মহিপুরের আব্দুর রশিদ প্রতিদিন ১০টি গরুর জন্য ১ হাজার থেকে ১২ শ টাকার ঘাস কেনেন। ৩০০ থেকে ৪০০ কেজি ওজনের একটি গাভীকে দৈনিক ১৫ থেকে ২৫ কেজি কাঁচা ঘাস খাওয়াতে হয়।

এই খামারি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আগে গরুর ফিডের দাম কম ছিল। কিন্তু এখন বেড়েছে। ফিড খাওয়ালে খরচ বেশি হয়।’ এই কারণে ঘাস কিনে খাওয়ান তিনি। ঘাসের চাহিদা আরও বাড়বে বলে মনে করেন এই প্রবীণ খামারি।

এখন গরুর ফিডের কাঁচামালও আমদানি করতে হয়। বিশ্ববাজারে অস্থিরতার কারণে দাম বেড়েছে সব পণ্যের। তবে অন্য খাবারের চেয়ে গরু-মুরগীর ফিডের দাম অনেক বেড়েছে বলে জানান খামারিরা। ফলে স্বভাবতই ঘাসের দিকে আরও বেশি করে ঝুঁকছেন তারা।

গো-খাদ্যের দামের সংকটের কারণে ঘাস চাষের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে বলে বলে মনে করেন শেরপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. রায়হান। নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘাস হচ্ছে গো-খাদ্যের প্রাকৃতিক উপাদান। সুষম খাদ্যের সব উপাদান রয়েছে ঘাসের মধ্যে। গরু-মহিষের দুধ, মাংস উৎপাদনের উপকরণ তৈরিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা পালন করে প্রাকৃতিক ঘাস। বিভিন্ন গবেষণাতেও পাওয়া গেছে, দানাদার ফিডের চেয়ে ঘাস গো-খাদ্যের জন্য অত্যন্ত উপকারি।’

তিনি আরও বলেন, গরু-মহিষের প্রজননের জন্য যে হরমোন দায়ী তার নাম ইস্ট্রোজেন (Estrogen) । ঘাস এই হরমোন তৈরিতে সরাসরি ভূমিকা পালন করে। ফলে গরু বা মহিষকে ঘাস খাওয়ালে তার প্রজনন ক্ষমতাও বাড়ে। এই কারণে উপজেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর কৃষকদের ঘাস চাষে উদ্বুদ্ধ করছে। ঘাসের বীজ, প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের দক্ষতা বাড়ানো হয়েছে। এর ফল এখন আমরা পাচ্ছি।’

এই উপজেলা থেকে প্রতি বছরে অন্তত ১০০ কোটি টাকার ঘাস উৎপাদন হচ্ছে। এসব ঘাস এই উপজেলার চাহিদা পূরণ করে অন্য উপজেলার সংকটও মেটাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন প্রাণিসম্পদ এই কর্মকর্তা।

আরও পড়ুন:
বাংলাদেশি কোম্পানিতে বিদেশি বিনিয়োগ
ঘরে তৈরি খাবার নিয়ে উৎসব
নারী উদ্যোক্তাদের অনলাইন পণ্যমেলা
‘বিশেষ সুবিধা নয়, বাজেটে নারীর প্রতি বৈষম্যের অবসান চাই’
নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সোশ্যাল মিডিয়া প্রিপেইড কার্ড চালু

মন্তব্য

p
উপরে