× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ পৌর নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য

বাংলাদেশ
Chandrima and New Super Market are the property of Dhaka College?
hear-news
player
print-icon

চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেট কি ঢাকা কলেজের সম্পত্তি?

চন্দ্রিমা-ও-নিউ-সুপার-মার্কেট-কি-ঢাকা-কলেজের-সম্পত্তি? চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ও নিউ সুপার মার্কেটের জায়গাকে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করছেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। ছবি: নিউজবাংলা
প্রায় চার দশক ধরে ওই জায়গার মালিকানা সিটি করপোরেশনের। তারাই মার্কেট নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের বরাদ্দ দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা সব নিয়ম মেনে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন।

রাজধানীর নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে প্রায় দুই দিনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ১০ দফা দাবি তুলেছেন ঢাকা কলেজের শিক্ষার্থীরা। এর মধ্যে শিক্ষার্থীদের ‘যৌক্তিক’ দাবিগুলো মেনে নেয়ার বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।

১০ নম্বরে নিউ মার্কেটসংলগ্ন চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ও নিউ সুপার মার্কেটের জায়গাকে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করে তা ঢাকা কলেজের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিও রয়েছে।

তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধান বলছে, প্রায় চার দশক ধরে ওই জায়গার মালিকানা সিটি করপোরেশনের। তারাই মার্কেট নির্মাণ করে ব্যবসায়ীদের বরাদ্দ দিয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত করেছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা সব নিয়ম মেনে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে দোকান বরাদ্দ নিয়েছেন। ওই জায়গা ঢাকা কলেজের কাছে হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই।

চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেট কি ঢাকা কলেজের সম্পত্তি?
ঢাকা কলেজের প্রধান ফটক

তবে ঢাকা কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও দক্ষিণ ছাত্রাবাসের প্রভোস্ট মোহাম্মাদ আনোয়ার মাহমুদের দাবি, চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেটের জায়গার প্রকৃত মালিকানা ঢাকা কলেজের।

ঢাকা কলেজের ইতিহাসের উল্লেখ রয়েছে কলেজটির ওয়েবসাইটে। এতে দেখা যায় প্রতিষ্ঠার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে ঢাকার বিভিন্ন জায়গায় কলেজের ক্যাম্পাস স্থানান্তর হয়েছে।

১৮৪১ সালের ২০ নভেম্বর প্রতিষ্ঠিত হয় ‘ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজ’ তথা ঢাকা কলেজ। কলকাতার বিশপ রেভারেন্ড ড্যানিয়েল কলেজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ১৮৪৬ সালে ভবনের নির্মাণকাজ শেষে ওই বছরের ২৫ মে ছাত্ররা শিক্ষাজীবন শুরু করেন।

বঙ্গভঙ্গের পর রমনা এলাকা কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা নতুন ঢাকায় ১৯০৮ সালে ঢাকা কলেজ স্থানান্তরিত হয়। কার্জন হল ও সংশ্লিষ্ট কয়েকটি ভবনে পরিচালিত হতো শিক্ষা কার্যক্রম। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা কলেজের নতুন ক্যাম্পাস পুরোনো হাইকোর্ট ভবনে সরিয়ে নেয়া হয়। তবে ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে আহত সৈনিকদের পুনর্বাসনের জন্য হাইকোর্টের কলেজ ভবনটি ছেড়ে দিতে হয়। ফলে ঢাকা কলেজ সরিয়ে নেয়া হয় লক্ষ্মীবাজারের ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমান সরকারি কবি নজরুল কলেজ)।

১৯৫৫ সালে বর্তমান ক্যাম্পাসে নতুন অবকাঠামোয় শুরু হয় ঢাকা কলেজের কার্যক্রম।

প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ঢাকা কলেজের জমির পরিমাণ ১৮.৫৭ একর। এর সামনের দিকে রয়েছে বাগান, লন টেনিস ও বাস্কেটবল খেলার মাঠ। পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে আটটি ছাত্রাবাস ও মসজিদ। কলেজের মূল ভবনের পেছনে এবং ছাত্রাবাসের সামনে রয়েছে দুটি বিশাল খেলার মাঠ ও একটি পুকুর। পূর্ব-দক্ষিণ প্রান্তে শহীদ মিনার, আইসিটি ভবন, উদ্ভিদবিদ্যা ভবন, অধ্যক্ষের বাসভবন ও শিক্ষকদের জন্য একটি আবাসিক ভবনের অবস্থান। এ ছাড়া শহীদ মিনারের পাশেই নির্মিত হয়েছে একটি ১০ তলা অ্যাকাডেমিক ভবন।

ওয়েবসাইটের বিবরণে চন্দ্রিমা মার্কেট ও নিউ সুপার মার্কেটের জায়গাকে নিজেদের সম্পত্তি দাবি করেনি ঢাকা কলেজ। তবে কলেজের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মাদ আনোয়ার মাহমুদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকা কলেজ সৃষ্টি থেকেই এই জায়গা (চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেট) কলেজেরই ছিল। সবই ছিল কলেজ ক্যাম্পাসের জায়গা।

‘এরশাদের আমলে সিটি করপোরেশনের মেয়র মাহমুদুল হাসান এই জায়গা (চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেট) ঢাকা কলেজের কাছ থেকে ১০০ বছরের লিজ নিয়ে মার্কেট বানিয়ে ফেলেন। পরে সেই মার্কেটের দোকান ব্যবসায়ীদের কাছে বরাদ্দ দেয়া হয়।’

চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেট কি ঢাকা কলেজের সম্পত্তি?
রাজধানীর নিউ মার্কেট সংলগ্ন চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট

মোহাম্মাদ আনোয়ার মাহমুদ বলেন, ‘আমরা শিক্ষকরা আরও আগেই এই জমি পেতে উদ্যোগ নিয়েছিলাম। বিশেষ করে নেহাল আহম্মেদ স্যার যখন ঢাকা কলেজের প্রিন্সিপাল ছিলেন, তখন আমরা স্যারের নেতৃত্বে বেশ কয়েকবার এই জমি ফিরে পেতে উদ্যোগ নিই। তবে এটা আসলে একটা জটিল প্রক্রিয়া।

‘এটা পেতে হলে আমাদের আইনগতভাবে যেতে হবে। তাছাড়া এটা সম্ভব না। কারণ এটা সিটি করপোরেশন আমাদের কাছ থেকে নিয়ে মার্কেট বানিয়ে দোকান বরাদ্দ দিয়ে দিয়েছে। এখন এটা নিতে গেলে দোকানমালিকেরা কোর্টে যাবেন। ওখানে ৪০০ দোকান থাকলে ৪০০ জনই কোর্টে যাবে। এটা একটা দীর্ঘ আইনগত প্রক্রিয়া।’

চন্দ্রিমা মার্কেট ও নিউ সুপার মার্কেটের জমি অতীতে ঢাকা কলেজের আওতাধীন থাকার কোনো নথি অবশ্য দেখাতে পারেননি মোহাম্মাদ আনোয়ার মাহমুদ। তবে তিনি বলেন, ‘এসব নথি রয়েছে ভূমি অফিসে। সেখানে গেলেই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া যাবে।’

ঢাকা কলেজের এই প্রবীণ শিক্ষক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সংঘর্ষের ঘটনা মীমাংসার জন্য গতকালও (বুধবার) যখন আমরা সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সঙ্গে বৈঠকে বসি, তখনও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের তখন বলা হয়েছে, এটা পেতে হলে আমাদের আইনগতভাবেই এগোতে হবে। দোকান মালিকেরাও এটি অস্বীকার করেননি। তারা বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে আমাদের কথা বলতে বলেছেন।’

নিউজবাংলা ঢাকা জেলা ভূমি অফিসের নথি যাচাই করতে পারেনি। তবে চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেটের জায়গা ঢাকা কলেজের কাছে স্থানান্তরের দাবির কোনো যুক্তি দেখছে না ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. রাসেল সাবরিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঢাকা নিউ মার্কেটের যতগুলো ব্লক আছে সবই ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের। একই সঙ্গে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট ও নিউ সুপার মার্কেটের জমির মালিকানাও সিটি করপোরেশনের।’

শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তারা দাবি কীভাবে করলেন সে বিষয়ে কিছু বলতে পারব না। শুধু বলতে পারি ওসব সম্পত্তি সিটি করপোরেশনের । এটা নিয়ে সন্দেহ থাকলে যে কেউ আইনের আশ্রয় নিতে পারেন।’

চন্দ্রিমা ও নিউ সুপার মার্কেট কি ঢাকা কলেজের সম্পত্তি?
রাজধানীর নিউ মার্কেট সংলগ্ন নিউ সুপার মার্কেট

দুটি মার্কেটের জায়গা ঢাকা কলেজকে ছেড়ে দেয়ার দাবির আইনি কোনো ভিত্তি নেই বলে দোকানমালিকেরাও মনে করছেন।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমরা ভাড়া বা খাজনা দিই সিটি করপোরেশনকে। এরশাদ সাহেব যখন রাষ্ট্রপতি ছিলেন, তখন সিটি মেয়র ছিলেন মাহমুদুল হাসান। সে সময় মাহমুদুল হাসান সরকারের কাছ থেকে জমি লিজ নিয়ে মার্কেট করে আমাদের কাছে দোকান বিক্রি করেছেন।

‘নিউ মার্কেটের যাবতীয় সব বিষয় বা আর্থিক ব্যাপারগুলো মালিকানা সূত্রে এখন দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আমাদের কাছ থেকে বুঝে নেয়।’

শিক্ষার্থীদের দাবির বিষয়ে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘ওরা বললে তো লাভ নেই, সিটি করপোরেশনের সঙ্গে যোগাযোগ করুক। আরও যদি চায় কলেজ কর্তৃপক্ষ হাইকোর্টে যাক। তখন আইনের মাধ্যমে যা হওয়ার তাই হবে।’

দুটি মার্কেটের জমি ফিরিয়ে দেয়ার দাবির বিষয়ে কলেজ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কোনো আলোচনা হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘না না। কথা বলার সময় পাইনি। তাছাড়া এ বিষয়ে কথা বলারও কিছু নেই। সম্পত্তি তো আমরা লিগ্যালভাবে সিটি করপোরেশন থেকে টাকা দিয়ে কিনে নিয়েছি।’

অন্যদিকে নিউ সুপার মার্কেট ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি শহীদ উল্ল্যাহ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৯৮৩-৮৪ সালে এরশাদ সরকারের নির্দেশে ভূমি মন্ত্রণালয় ওই জমিটা অধিগ্রহণ করে সিটি করপোরেশনকে হ্যান্ডওভার করে। তারপর সিটি করপোরেশন মার্কেট করে ব্যবসায়ীদের কাছে বরাদ্দ দেয়। ১৯৮৪ সালে জমি অধিগ্রহণের পর নিউ সুপার মার্কেটটা তৈরি করা হয়। আর চন্দ্রিমা সুপার মার্কেট তৈরি হয়েছে আরও পরে।’

এ দুটি মার্কেটের জায়গা ঢাকা কলেজের কাছে হস্তান্তরের কোনো সুযোগ নেই বলে তিনিও দাবি করেন।

আরও পড়ুন:
মোরসালিনের দুই সন্তানকে কে দেখবে?
সাংবাদিকদের ওপর হামলাকারীদের বিচার দাবি
মোরসালিনের মৃত্যুও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে
নিউ মার্কেটের ব্যবসায়ীদের পক্ষে সংঘর্ষে জড়ান নাহিদ
সংঘর্ষের ঘটনায় ৩ মামলা, ব্যবসায়ী-শিক্ষার্থীসহ আসামি ১১০০

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বাংলাদেশ
Easy to manage train tickets by manipulating tenders

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে সহজ। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। টিকিট ব্যবস্থাপনা খরচ কম দেখাতে তারা রেলের নিজস্ব আয়কে নিজেদের দরপ্রস্তাবে যুক্ত করেছে। এরপর সেই আয় সহজের মোট ব্যয় প্রস্তাবের সঙ্গে বিয়োগ করে টিকিটপ্রতি রেলের কাছ থেকে তাদের পাওনা মূল্য বা সার্ভিস চার্জ কম দেখানো হয়েছে।

তিন মেয়াদে টানা দেড় দশক বাংলাদেশ রেলওয়ের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিল কম্পিউটার নেটওয়ার্ক সিস্টেম (সিএনএস)। তবে টিকিট বিক্রিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অব্যবস্থাপনার অভিযোগ ছিল এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে।

প্রায় দুই বছর আগে রেলের আহ্বান করা দরপত্রে সিএনএসের পরিবর্তে টিকিট ব্যবস্থাপনার জন্য যোগ্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে নির্বাচিত হয় সহজ লিমিটেড জেভি। এরপর গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রেলভবনে আনুষ্ঠানিক সহজ ও রেলের চুক্তি হয়। আগামী পাঁচ বছরের জন্য ট্রেনের টিকিট বিক্রি করবে সহজ।

তবে দরপত্রের মাধ্যমে সহজকে বেছে নেয়ার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, দরপত্রে বড় ধরনের কারসাজি করেছে প্রতিষ্ঠানটি। টিকিট ব্যবস্থাপনা খরচ কম দেখাতে তারা রেলের নিজস্ব আয়কে নিজেদের দরপ্রস্তাবে যুক্ত করেছে। এরপর সেই আয় সহজের মোট ব্যয় প্রস্তাবের সঙ্গে বিয়োগ করে টিকিটপ্রতি রেলের কাছ থেকে তাদের পাওনা মূল্য বা সার্ভিস চার্জ কম দেখানো হয়েছে।

সহজের কারসাজির বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায় ধরা পড়লেও বিষয়টি অজ্ঞাত কারণে ধামাচাপা পড়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে রেলের ঊর্ধ্বতন কেউ মুখ খুলতে রাজি হননি। বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনও নিউজবাংলার জিজ্ঞাসায় সাড়া দেননি।

সহজের আগের প্রতিষ্ঠান সিএনএস প্রতিটি টিকিট ইস্যু বাবদ রেলের কাছ থেকে ২ টাকা ৯৯ পয়সা সার্ভিস চার্জ নিত। চলতি বছরের চুক্তি অনুযায়ী প্রতিটি টিকিট ইস্যুর জন্য মাত্র ২৫ পয়সা চার্জ নেয়ার প্রস্তাব দিয়ে কাজটি পায় সহজ।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
রেলওয়েতে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব ফরম (বাঁয়ে), সহজ এই ফরমে একটি সারি বাড়িয়ে ৮.০২ পর্যন্ত করেছে

তবে নিউজবাংলার হাতে আসা সহজ লিমিটেড জেভির আর্থিক দরপ্রস্তাবে ব্যাপক কারসাজির প্রমাণ মিলেছে।

রেলওয়েতে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব ফরম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ফরমটিতে ৮.০১ পর্যন্ত সারি রয়েছে। তবে সহজের জমা দেয়া আর্থিক প্রস্তাবে একটি সারি বাড়িয়ে ৮.০২ পর্যন্ত করা হয়। রেলওয়ের দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির একাধিক কর্মকর্তার সইসহ সহজের আর্থিক প্রস্তাবের একটি অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

রেলওয়েতে জমা দেয়া আর্থিক দরপ্রস্তাবে সহজ লিমিটেড জেভি তাদের মোট ব্যয় দেখিয়েছে ৩০ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ১২৯ টাকা। যার সঙ্গে ২০ কোটি টিকিট ভাগ করলে প্রতিটি টিকিটের সার্ভিস চার্জ দাঁড়ায় ১ টাকা ৫১ পয়সা।

ওই দরপত্রে সহজসহ মোট ১৩টি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়। অতীতে টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সিএনএসও অংশ নিয়েছিল সেখানে। সিএনএস যে ব্যয় প্রস্তাব দেয় তাতে টিকিটের সার্ভিস চার্জ ছিল ১ টাকা ২২ পয়সা।

তবে সহজ রেলওয়ের দরপত্রের আর্থিক প্রস্তাবে অতিরিক্ত একটি সারি তৈরি করে কারসাজির মাধ্যমে টিকিট প্রতি সার্ভিস চার্জ ১ টাকা ৫১ পয়সার পরিবর্তে মাত্র ২৫ পয়সা দেখিয়েছে।

ফরমের অতিরিক্ত ওই সারিতে বিভিন্ন বিজ্ঞাপন থেকে রেল কর্তৃপক্ষের সম্ভাব্য আয় ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকাকে নিজেদের আয় হিসেবে দেখায় সহজ। এরপর তা দরপ্রস্তাবের মোট দর থেকে বাদ দেয়া হয়।

এর ফলে মোট ব্যয় প্রস্তাব ৩০ কোটি ২৫ লাখ ১৫ হাজার ১২৯ টাকার পরিবর্তে নেমে আসে ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৩৩ হাজার ১২৯ টাকায়। আর এর সঙ্গে ২০ কোটি টিকিট ভাগ করে প্রতিটি টিকিটের সার্ভিস চার্জ দেখানো হয় মাত্র ২৫ পয়সা।

টিকিটসহ বিভিন্ন স্টেশনে নানান প্রতিষ্ঠানের দেয়া বিজ্ঞাপন থেকে পাওয়া অর্থ রেলের নিজস্ব আয় হিসেবে বিবেচিত। তবে দরপ্রস্তাবে এই আয় নিয়মবহির্ভূতভাবে নিজেদের হিসেবে দেখিয়েছে সহজ।

দরপ্রস্তাবে অনিয়মের বিষয়টি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের নিরীক্ষায় ধরা পড়লেও সহজের কাজ পাওয়ায় তা বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের সিপিটিইউ-এর প্রতিবেদন

এ ব্যাপারে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিইউ) তৈরি করা একটি প্রতিবেদনের অনুলিপি পেয়েছে নিউজবাংলা।

২০২১ সালের জানুয়ারিতে তৈরি করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সহজ লিমিটেড জিভি পারস্পরিক যোগসাজশের মাধ্যমে আর্থিক প্রস্তাবের ৮ নং মেইন হেডে একটি অতিরিক্ত লাইন সংযোজন করে বিজ্ঞাপন থেকে ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকা আয় দেখিয়ে তা নিয়মবহির্ভূতভাবে তাদের মূল উদ্ধৃত দর থেকে বিয়োগ করেছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘সহজ লিমিটেড জেভি ছাড়া অন্য কোনো দরদাতাই তাদের আর্থিক প্রস্তাবে এ ধরনের কোনো প্রস্তাব দাখিল করেনি। যা থেকে প্রতীয়মান হয় রেলওয়ের মূল্যায়ন কমিটি ও সহজ লিমিটেড জেভি নিজেরা আর্থিকভাবে লাভবান হওয়ার জন্য পারস্পরিক যোগসাজশে এ ধরনের শর্তযুক্ত প্রস্তাব পেশ করে।’

এতে আরও বলা হয়, ‘বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী এ ধরনের বিজ্ঞাপন খাতে ৫ বছরে ২৫ কোটি ৩১ লাখ ৮২ হাজার টাকার চেয়ে আরও বহুগুণ (বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী প্রায় ৫০০ কোটি টাকা) বেশি আয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। যা একান্তভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ের তথা বাংলাদেশ সরকারের নিজস্ব আয়। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার জন্যই পারস্পরিক যোগসাজশে সহজ লিমিটেড জেভি এ ধরনের প্রস্তাব দাখিল করেছে এবং দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি বেআইনিভাবে তা অনুমোদন করেছে।’

সহজের দরপত্রে অনিয়মের বিষয়টি রেলের তখনকার অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানও চিহ্নিত করেছিলেন। এ ব্যাপারে তিনি ২০২০ সালে একটি প্রতিবেদনও দেন। তবে সেটি আমলে নেয়া হয়নি। সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথিতে পরে অবশ্য মিয়াজাহানও সই করেন।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানের প্রতিবেদন

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে মিয়াজাহান নিউজবাংলাকে বলেন, ‘টেন্ডার ডকুমেন্ট ওখানে যেভাবে আছে সেভাবেই আছে। তারপর আমরা চলে আসছি আড়াই বছর হলো। এখন আড়াই বছর আগের ঘটনা আপনি নিয়ে আইসা প্রশ্ন করলে আমি কি সেগুলো বলতে পারব? এ বিষয়ে আর কথা বলতে চাই না।’

দরপত্র দাখিলের যোগ্যতাই ছিল না সহজের

বাংলাদেশ রেলওয়ে ইন্টিগ্রেটেড টিকিটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস) দরপত্রের ৭.১(এ). (১).(৩) এর শর্ত অনুযায়ী, দরদাতা প্রতিষ্ঠানের বছরে ৫০ লাখ টিকিট ইস্যু করার অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।

এ ছাড়া দরপত্র দলিলের আইটিটি ৭.১(এ) এর টেন্ডার এলিজিবিলিটির শর্ত সমূহের ১(৩) অনুচ্ছেদে বলা আছে, কোনো একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন থেকে একটি সিস্টেমের মাধ্যমে কমপক্ষে ৫০ লাখ টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। কোনোভাবেই একাধিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের খণ্ডিত অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করে অভিজ্ঞতার সার্টিফিকেট প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।

তবে এই শর্ত পূরণ করেনি সহজ। ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পাওয়ার আগে বিভিন্ন বাস কোম্পানির টিকিট বিপণনে যুক্ত ছিল প্রতিষ্ঠানটি। তবে তাদের বিক্রি করা বাসের টিকিটের সংখ্যা ৫০ লাখ অতিক্রম করেনি।

রেলের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক মো. মিয়াজাহানের প্রতিবেদনেও বিষয়টির উল্লেখ আছে। এতে বলা হয়, সহজ লিমিটেড বাসের প্রতি টিকিট বাবদ গড়ে ৩০ টাকা করে কমিশন নিয়ে থাকলেও প্রতিষ্ঠানটির সিস্টেম থেকে ২০১৯ সালে ৯ লাখ ৭০ হাজার, ২০১৮ সালে ৭ লাখ ৬১ হাজার, ২০১৭ সালে ৭ লাখ ১০ হাজার, ২০১৬ সালে ৪ লাখ ৩৯ হাজার ও ২০১৫ সালে ১ লাখ ২০ হাজার টিকিট ছাড় হয়েছে। অর্থাৎ কোনো একক বছরে ৫০ লাখ তো নয়ই, পাঁচ বছরে সহজ সব মিলিয়ে মোট ৩০ লাখ বাসের টিকিট বিক্রি করেছে ।

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথি

মিয়াজাহান প্রতিবেদনে বলেন, ‘সহজ বাংলাদেশ রেলওয়ের চাহিত বিগত পাঁচ বছরের কোনো বছরেই সিস্টেম হতে ইস্যুকৃত টিকিটের সংখ্যা ৫০ লাখ অতিক্রম করতে পারে নাই, এমনকি সংখ্যাটি ৫০ লাখের কাছাকাছিও না। সহজের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আগের অভিজ্ঞতার টিকিটপ্রতি কমিশনের সঠিক হিসাব করলে সিস্টেম হতে ইস্যুকৃত টিকিটের সংখ্যা আরও কম হবে। এ ক্ষেত্রে সহজের দাখিলকৃত দরপত্র প্রস্তাবে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন না করে ছলচাতুরীর আশ্রয় নেয়া হয়েছে। যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’

মিয়াজাহানের কাছে বিষয়টি তুলে ধরে নিউজবাংলার প্রশ্ন ছিল, এই প্রতিবেদন দেয়ার পরও আপনি কেন সহজের দরপ্রস্তাব অনুমোদনের নথিতে সই করেছেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘এটা শুধু আমি দেই নাই, আরও অনেকের সই আছে।’

বিষয়টি নিয়ে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের বক্তব্য জানার চেষ্টা করেও তার সাড়া পায়নি নিউজবাংলা। একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু হোয়াটসঅ্যাপে লিখে পাঠানোর পর তিনি ‘সিন করলেও’ কোনো জবাব দেননি।

বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালক ধীরেন্দ্র নাথ মজুমদারের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ‘কথা বলার সময় নেই’ জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এরপর একাধিকবার কল করা হরেও তিনি ফোন ধরেননি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে সহজের এমডি মালিহা এম কাদিরের ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ধরেননি। তবে খুদেবার্তা পাঠানো হলে তার জনসংযোগ কর্মকর্তা ফারহাত আহমেদ নিউজবাংলার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।

ফারহাত আহমেদ ই-মেইলে প্রশ্ন পাঠাতে বললে ১১ মে সেগুলো পাঠানো হয়। এর আট দিন পর বুধবার তিনটি প্রশ্নের জবাব দেন মালিহা।

তিনি দাবি করেন, দরপ্রস্তাব দাখিলের যোগ্যতা সহজের নেই- এমন অভিযোগ ভিত্তিহীন। তিনি বলেন, ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির লিড পার্টনার সহজ লিমিটেডের তৈরি করা একটি সফটওয়্যার তথা একটি অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এক বছরে মাত্র চারটি অপারেটরের মাধ্যমেই ৭৫ লাখের বেশি টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতা রাখে। এ ছাড়া সহজ লিমিটেড-এর আছে ১০০+ বাস অপারেটর। যদিও অ্যাডমিনিস্ট্রেশনসংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা টেন্ডার বা উন্মুক্ত দরপত্রে উল্লেখ নেই। তবে সব দিক মিলিয়ে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি টিকিট ইস্যুর অভিজ্ঞতার বিবেচনায় বাংলাদেশ রেলওয়ের দরপত্র অনুযায়ী টেন্ডার এলিজিবেল।’

দরপত্রে ‘কারসাজি করে’ ট্রেনের টিকিট ব্যবস্থাপনায় সহজ
যেভাবে সহজের টিকিটপ্রতি সার্ভিস চার্জ ২৫ পয়সা

দরপত্র ফরমে অতিরিক্ত সারি যোগ করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী ৮.০১ পর্যন্ত রোতে জেভির রেভিনিউয়ের বর্ণনা দিয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের আর্থিক দরপত্র প্রস্তাবে এও উল্লেখ আছে টেন্ডারারকে অবশ্যই তার রেভনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ উল্লেখ করতে হবে।

‘অতিরিক্ত ৮.০২ রোতে রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এভিনিউয়ের বিস্তারিত ব্যাখ্যা এবং বর্ণনা যোগ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশ রেলওয়ের টেন্ডার নির্দেশনাতেই আছে। সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি কোনোভাবেই আর্থিক দরপত্রের প্রস্তাব থেকে বিচ্যুত হয়ে নিজেদের মতো করে রো কিংবা অপ্রাসঙ্গিক কোনো তথ্য তৈরি করেনি বা যোগ করেনি।’

রেলের বিজ্ঞাপন আয়কে নিজেদের হিসেবে দেখিয়ে টিকিটের সার্ভিস চার্জ কম দেখানোর অভিযোগও অস্বীকার করেন মালিহা।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে আর্থিক দরপত্র প্রস্তাব অনুযায়ী টেন্ডারারকে অবশ্যই তার রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ উল্লেখ করতে হবে। টেন্ডার ফরমে সুনির্দিষ্টভাবে বলা আছে যে রেভিনিউয়ের বিভিন্ন এবং বিস্তারিত এভিনিউ সুষ্ঠুভাবে টেবিল বা রো আকারে উল্লেখ করতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে আয়কৃত মূল্যের বিস্তারিত তথ্য দরপত্রে বিস্তারিতভাবে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি উল্লেখ করেছে।

‘দরপত্রের আর্টিকেল জি.৯ সেকশনের (আরইভি) টেন্ডারারকে অনুমতি দেয় তার প্রস্তাবিত রেভিনিউর বিভিন্ন এভিনিউয়ের বিস্তারিত তথ্য দেয়া এবং একই সঙ্গে কীভাবে বাংলাদেশ রেলওয়ে এ থেকে সার্ভিস প্রদান করতে পারবে। সেই সঙ্গে আর্টিকেল জি.৯ সেকশনের আরইভি-০২ টেন্ডারারকে অনুমতি দেয় নিজের মূল্য কমিয়ে নেবার। এগুলো পর্যালোচনা করলেই কীভাবে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি প্রতি টিকিটের টাকা ২৫ পয়সা করেছে তা মূল্যায়ন করা যাবে।’

আরও পড়ুন:
টিটিই শফিকুলের বিরুদ্ধে তদন্ত: প্রতিবেদন জমা দেয়নি কমিটি
রেললাইনে পড়েছিল অজ্ঞাত যুবকের মরদেহ
প্রতি বগিতে বিনা টিকিটের ১০ যাত্রী
কাজে ফিরেই ৯ হাজার টাকা জরিমানা টিটিই শফিকুলের
বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ার ‘সুযোগ দেন’ রেলকর্মীরাই

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Leaving 13 feet road Sobhanbagh Mosque is on 10th floor

১৩ ফুট রাস্তা ছেড়ে ১০ তলা হচ্ছে সোবহানবাগ মসজিদ

১৩ ফুট রাস্তা ছেড়ে ১০ তলা হচ্ছে সোবহানবাগ মসজিদ সোবহানবাগ জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের পুরাতন তিনতলা ভবনটি ভেঙে নতুন ১০ তলাবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করে দিচ্ছে সরকার। ছবি: নিউজবাংলা
রাস্তার জন্য ১৩ ফুট জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এর বদলে পুরাতন তিনতলা মসজিদটি ভেঙে নতুন ১০ তলাবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করে দিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে পুরাতন ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে।

রাজধানীর মিরপুর সড়ক ধরে যারা নিয়মিত চলাচল করেন, তারা পরিচিত সোবহানবাগ জামে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের সঙ্গে। মসজিদের একটি অংশ রাস্তার ওপরে হওয়ায় এখানে মিরপুর রোড সংকুচিত হয়ে গেছে।

বহু বছরের এ চিত্র এবার বদলে যাচ্ছে। রাস্তার জন্য ১৩ ফুট জায়গা ছেড়ে দিচ্ছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এর বদলে পুরাতন তিনতলা মসজিদটি ভেঙে নতুন ১০ তলাবিশিষ্ট মসজিদ নির্মাণ করে দিচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে পুরাতন ভবনটি ভেঙে নতুন ভবনের কাজ শুরু করেছে গণপূর্ত অধিদপ্তর।

প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধে এবং জনস্বার্থ বিবেচনায় মসজিদ কর্তৃপক্ষ এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানা গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন করে নির্মাণের জন্য সোবহানবাগ মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের পুরাতন ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। আগের মসজিদের আয়তনের সমপরিমাণ জায়গা নিয়ে বেষ্টনী দেয়া আছে পুরো প্রকল্প এলাকা। এর ভেতরে চলছে নতুন ভবন নির্মাণের কর্মযজ্ঞ।

১৩ ফুট রাস্তা ছেড়ে ১০ তলা হচ্ছে সোবহানবাগ মসজিদ

সোবহানবাগ মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের নতুন অস্থায়ী তিনতলা ভবন। ছবি: নিউজবাংলা

প্রকল্প এলাকার ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে পাইলিংয়ের জন্য বড় বড় যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। নিজেদের কাজে ব্যস্ত শ্রমিকরা।

এখানে কথা হয় প্রকল্পের প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিনের সঙ্গে। তিনি জানান, একটি অস্থায়ী ভবন করে মসজিদ ও মাদ্রাসার কার্যক্রম স্থানান্তর করা হয়েছে গত বছরের শেষের দিকে। এরপর পুরাতন ভবনটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এখন সবেমাত্র ১০ তলা ভবনের পাইলিংয়ের কাজ শুরু হচ্ছে। পুরো ভবন নির্মাণে দুই বছরের মতো সময় লাগবে।

প্রকল্প এলাকা থেকে মূল সড়কের জন্য ১৩ ফুট জায়গা ছেড়ে দেয়া হচ্ছে বলে জানান মো. মহিউদ্দিন। তিনি বলেন, ‘১৩ ফুট জায়গা ছেড়ে নতুন মসজিদ করা হচ্ছে। আমরা কাজের সুবিধার্থে এখনই ১৩ ফুট জায়গা ছাড়িনি। কাজ কিছুটা গুছিয়ে তারপর রাস্তার জায়গা ছেড়ে দেয়া হবে।’

প্রকৌশলী মো. মহিউদ্দিন আরো জানান, নকশা অনুযায়ী ১০ তলা এই মসজিদে থাকবে অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। এতে জেনারেটর, লিফট, আধুনিক সাউন্ড সিস্টেম, সোলার প্যানেল সিস্টেম, অগ্নিনির্বাপণব্যবস্থা, এয়ারকুলার, ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরাসহ আরো অনেক ব্যবস্থাপনা থাকবে। পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা।

১৯৩৭ সালে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর সোবহানবাগ মসজিদ ও পাশে পারিবারিক কবরস্থান প্রতিষ্ঠা করেন মাওলানা মোহাম্মদ আবদুস সোবহান। ১৯৪০ সালের ১ ফেব্রুয়ারি মারা গেলে আবদুস সোবহানকে এই কবরস্থানেই দাফন করা হয়। তিনতলা এই মসজিদে এক সঙ্গে ৬০০ থেকে ৭০০ মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারতেন। এখন নতুন ভবন হলে সেখানে অন্তত ৪ হাজার মুসল্লি একসঙ্গে নামাজ পড়তে পারবেন।

প্রকল্পের ঠিক পাশেই মসজিদের অস্থায়ী ভবন করে দিয়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তর। তিনতলা একটি ভবনে চলছে মসজিদ ও মাদ্রাসার কার্যক্রম। এখানে প্রায় ৭০ জন মাদ্রাসা ছাত্রের থাকা-খাওয়া-পড়াশোনার পাশাপাশি সাধারণ মুসল্লিরা নামাজ আদায় করেন।

সোবহানবাগ মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্সের তত্ত্বাবধায়ক মো. আলাউদ্দীন নিউজবাংলাকে জানান, ২০১৬ সালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে মসজিদ কমিটিকে একটি চিঠি দেয়া হয়। সেখানে বলা হয়, সরকার মসজিদটিকে আরও বড় করতে চায়। তবে রাস্তার জন্য কিছুটা জায়গা ছাড়ার অনুরোধ করা হয় চিঠিতে। তখন মসজিদ কমিটির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের এ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

মো. আলাউদ্দীন আরো বলেন, ‘মসজিদটি ৮৩ বছর আগে নির্মিত। তখন তো মিরপুর সড়ক এত চওড়া ছিল না। আর মানুষের সংখ্যাও কম ছিল। তখন মসজিদটি তিনতলা পর্যন্ত করা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে জনসংখ্যা বেড়েছে। মুসল্লিদেরও চাপ বেড়েছে। একসময় বাড়তি চাপের কারণে রাস্তায় দাঁড়িয়েই মানুষ নামাজ পড়া শুরু করে, এতে যান চলাচলে সমস্যা দেখা দেয়।

'অন্যদিকে মসজিদের ভিত্তি পুরাতন ও দুর্বল থাকায় এটি আর ওপরের দিকে বাড়ানো সম্ভবও হচ্ছিল না। সব কিছু বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবে মসজিদ কমিটি রাজি হয়। কারণ মসজিদ তো মানুষের জন্যই, আবার রাস্তাও মানুষের জন্য। তাহলে মানুষে মানুষে অসুবিধা তৈরির দরকার কী?’

মন্তব্য

বাংলাদেশ
What happened to the newborn baby in the toilet pipe

সদ্যোজাত শিশু টয়লেটের পাইপে কী করে গেল

সদ্যোজাত শিশু টয়লেটের পাইপে কী করে গেল বরিশাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের এই পাইপ ভেঙে উদ্ধার করা হয় শিশুটিকে। ছবি: নিউজবাংলা
প্রসূতি ওয়ার্ডের ওই টয়লেটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কমোড নেই, প্যান বসানো আছে। প্যানের পাইপের মুখের ব্যাস ৬ ইঞ্চি। এই পাইপ সোজা নেমে গেছে দোতলায় শিশু ওয়ার্ডে। শিশু ওয়ার্ডের ছাদের সঙ্গে লাগানো পাইপের ভেতর থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুটিকে।

শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রসূতি ওয়ার্ডের টয়লেটের পাইপ ভেঙে শনিবার সদ্যোজাত সন্তানকে উদ্ধার করেছেন তার বাবা।

বলা হচ্ছে, প্রসবের অপেক্ষায় থাকা এক নারী টয়লেটে গেলে সেখানেই সন্তান ভূমিষ্ঠ হয়। এরপর সেই সন্তান টয়লেটের পাইপ দিয়ে বেশ কিছুটা সামনে গিয়ে আটকে যায়। সেই পাইপ ভেঙেই জীবন্ত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় শিশুটিকে।

টয়লেটে ভূমিষ্ঠ হওয়া কোনো শিশু কী করে পাইপের ভেতরে গেল এবং তাকে কী করে জীবন্ত উদ্ধার করা সম্ভব হলো তা অনুসন্ধান করেছে নিউজবাংলা।

শিশুর বাবা নেয়ামত উল্লাহ সোমবার নিউজবাংলাকে জানান, তাদের বাড়ি পিরোজপুর জেলার স্বরূপকাঠির গণমান শেখপাড়া বাজার এলাকায়। তিনি পেশায় জেলে ও তার স্ত্রী শিল্পী বেগম গৃহিণী। তাদের আগে একটি চার বছরের মেয়ে আছে। স্ত্রীর দ্বিতীয় সন্তান প্রসবের প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলে শ‌নিবার সকাল ৮টার দিকে তাকে বরিশাল মেডিক্যালে ভর্তি করা হয়।

নেয়ামত বলেন, ‘দুপুরে ডাক্তার সিজার করার কথা কইলে আমি ওষুধ কিনতে যাই। ২টার কিছু পর আইসা দেখি টয়‌লে‌টের সাম‌নে ভিড়। তারপর কয়েকজন কইল আমার স্ত্রী পায়খানা করতে গিয়া টয়লেটেই বাচ্চা জন্ম দিছে। সেই বাচ্চা টয়লেটের মধ্যে পইড়া গেছে।

‘ভিতরে ঢুইকা দেখি রক্তে মাখা। সবাই কইতে আছিল বাচ্চা মারা গেছে। আমি প্যানের পাইপের মধ্যে হাত ঢুকাইয়া কিছু পাই না। এরপর কান্নার শব্দ পাইয়া পাগলের মতো দুই তলার শিশু ওয়ার্ডে যাই। সেইখানের ছাদের নিচের পাইপ ভাইঙ্গা আমার মাইয়াটারে বাইর কইরা ডাক্তারের কাছে নেই।’

সদ্যোজাত শিশু টয়লেটের পাইপে কী করে গেল
দোতালায় শিশু ওয়ার্ডের ছাদে টয়লেটের পাইপ

ঘটনার সময় বরিশাল মেডিক্যালের তৃতীয় তলার প্রসূতি ওয়ার্ডে থাকা কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা।

প্রসূতি ওয়ার্ডের পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাপিয়া বানু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সন্ধ্যা ৬টায় ওই রোগীর সিজার করার কথা ছিল। বিকেল ৪টার সময় উনি বলছেন, ওনার বাথরুম লাগছে। তারপর বাথরুমে গেছেন। পাঁচ মিনিটমতো ভেতরে ছিলেন। বের হইয়া বলেন, টয়লেটের পানির সঙ্গে ওনার বাইচ্চা ভাইসা গেছে।

‘তারপর আমাদের ডাকছে। আমরা দৌড়াইয়া যাইয়া হাত দিছি। আমি অনেক দূর পর্যন্ত ডান হাত ঢুকাইছি। ডান কান পাইতা কান্নার শব্দ পাইছি।’

এই ওয়ার্ডের অফিস সহায়ক জেসমিন আক্তার বলেন, ‘আমরা একজনের কাছে শুনি বাথরুমে বাচ্চা পইড়া গেছে। যাইয়া দেখি রোগী বেডে শোয়া। আমাদের এক খালা আছে, ওই খালা প্যানের ভেতরে অনেকখানি হাত ঢুকাই দেছে। প্রায় পুরা হাতই। তাও বাচ্চা পাওয়া যাইতেছে না, খালি কান্না করতাছে।

‘এরপর আমি ওয়ার্ড মাস্টারের কাছে ফোন দিছি। তিনি স্যানিটারি মিস্ত্রিরে ফোন দেছেন। সে ২০ মিনিটে গাড়ি রিজার্ভ কইরা আইসা পড়ছে। সেও কান্না শুনছে। যে বরাবর কান্না শুনছে সেই বরাবর পাইপ ভাঙছে। তয় বাচ্চাটার বাবাই মূলত ওরে বাইর করছে।’

সদ্যোজাত শিশু টয়লেটের পাইপে কী করে গেল

শিশুটিকে উদ্ধারের সময় উপস্থিত ছিলেন হাসপাতালের স্বেচ্ছাসেবক আব্দুল জলিল।

তিনি বলেন, ‘আমরা শুইনা দৌড়াইয়া তিন তলায় গেছি। হাত দিয়া বাচ্চা পাওয়া যাইতেছে না কিন্তু কান্নার আওয়াজ পাওয়া যাইতেছে। এরপর আমরা দোতলায় আসি। হাতুড় আর ছেনি দিয়া পাইপের মাঝখানে ভাঙছে। মাঝখানে পাওয়া যাইল না। এরপর দক্ষিণ সাইডে পাইপ ভাইঙ্গা দেখি বাচ্চার পা।

‘তখন বাচ্চার বাবাও লাফ দিয়া টেবিলের ওপর উঠছে। লগে লগে পাইপ ভাইঙ্গা আমরা বাচ্চাটারে উদ্ধার করছি।’

সদ্যোজাত শিশু টয়লেটের পাইপে কী করে গেল
মেপে দেখা যায়, প্যানের পাইপের মুখের ব্যাস ছয় ইঞ্চি

প্রসূতি ওয়ার্ডের ওই টয়লেটে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো কমোড নেই, প্যান বসানো আছে। প্যানের পাইপের মুখের ব্যাস ছয় ইঞ্চি। আর সদ্যোজাত শিশুর বাম থেকে ডান কাঁধ পর্যন্ত চওড়া প্রায় সাড়ে চার ইঞ্চি।

টয়লেটের পাইপটি তিন তলা থেকে সোজা নেমে গেছে দোতলায় শিশু ওয়ার্ডে। শিশু ওয়ার্ডের ছাদের নিচ দিয়ে পাইপটি পুবদিকের দেয়ালের দিকে গিয়ে ৯০ ডিগ্রি কোণে বাঁক নিয়েছে। এরপর সেটি উত্তর দিকে খানিকটা এগিয়ে বামে আবার বেঁকে আরেক পাশের দেয়াল বরাবর চলে গেছে। উত্তর দিকের পাইপে পাঁচ ফুটের বেশি দূরত্বে শিশুটিকে পাওয়া যায়।

সদ্যোজাত শিশু টয়লেটের পাইপে কী করে গেল
তিন তলায় প্রসূতি ওয়ার্ডের টয়লেটের পাইপ সোজা নেমে এসেছে দোতালায় শিশু ওয়ার্ডে

একটি সদ্যোজাত শিশু ৬ ইঞ্চি ব্যাসের পাইপের ভেতর পড়তে পারে কি না সে বিষয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী সাপিয়া বলেন, ‘অনেক ছোট হলে বাচ্চা পড়তে পারে। ওই বাচ্চাটির ওজন মাত্র দেড় কেজি। দেড় কেজি বইলাই পইড়া গেছে। গায়ে কোনো গোশত নাই। শুকনা একদম। ওই জন্যই বাচ্চাটা পড়ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বাথরুমের ট্যাপ ছাড়া ছিল। পাইপটাও মোটা। পানির লগে (শিশুটি) নাইমা গেছে।’

এর আগেও টয়লেটে বাচ্চা প্রসবের ঘটনা ঘটেছে বলে জানান সাপিয়া। তবে তা হাসপাতালের মেঝেতে বা দরজায়। প্যানে পড়ে যাওয়ার ঘটনা ২২ বছরের কর্মজীবনে এই প্রথম দেখলেন তিনি।

স্বেচ্ছাসেবক আব্দুল জলিল জানান, পাইপের যেখান থেকে উদ্ধার করা হয় সেই অংশে কোনো পানি জমে ছিল না।

তিনি বলেন, ‘বাচ্চা শুইয়া রইছে। হের পরও পাইপের ওপরে ফাঁকা রইছে। বাচ্চা শুইয়া পাও লাড়াইতেছিল তাও ফাঁকা রইছে।’

উদ্ধারের পর শিশুটির নাভির সঙ্গে প্রায় দুই ইঞ্চির মতো আমব্লিক্যাল কর্ড (নাভি রজ্জু) যুক্ত ছিল। দ্রুত তাকে পরিচ্ছন্ন করে অক্সিজেন দেয়া হয়।

সদ্যোজাত শিশু টয়লেটের পাইপে কী করে গেল
স্ত্রীর সঙ্গে শিশুটির বাবা

বরিশাল মেডিক্যালের শিশু বিভা‌গের প্রধান মু‌জিবুর রহমান বলেন, ‘বাচ্চাটি অপরিণত। নির্দিষ্ট সময়ের আগেই প্রসব হয়েছে। স্বাভাবিক বাচ্চার ওজন প্রায় আড়াই কেজি হয়। এই বাচ্চার ওজন ১ কেজি ৩০০ গ্রাম। শিশুদের বিশেষ সেবা ইউনিটে (স্ক্যানু) তার চিকিৎসা চলছে। এমনিতে তার সব ঠিকঠাক আছে। কোনো সমস্যা দেখা যাচ্ছে না।’

পাইপে প্রায় দুই ঘণ্টা আবদ্ধ সদ্যোজাত শিশুর জীবিত থাকার বিষয়ে হাসপাতালের পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘নবজাতকটি হয়তো কোনোভাবে অক্সিজেন পেয়েছে। সে কারণে বেঁচে ছিল।’

আরও পড়ুন:
মায়ের ইনজেকশন নবজাতককে দেয়ার অভিযোগ
টয়‌লে‌টের পাইপ ভে‌ঙে সদ্যোজাত শিশু উদ্ধার
হাসপাতালে ‘অক্সিজেন না পেয়ে’ নবজাতকের মৃত্যু
খড়ের গাদায় ফেলে যাওয়া নবজাতক পেল বাবা-মা
জন্মের পর নিখোঁজ, ৫ দিনেও মেলেনি খোঁজ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The rich got 15 out of 16 houses

১৮ ঘরের ১৫টি পেলেন সম্পদশালীরা, থাকেন না কেউ

১৮ ঘরের ১৫টি পেলেন সম্পদশালীরা, থাকেন না কেউ
হলদিয়াপালং ইউপি চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৮টি ঘরের মাত্র তিনটিতে প্রকৃত মালিকরা রয়েছেন। ঘরগুলো দেয়ার সময় অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছিল। তাই প্রকৃত ভূমিহীনরা এগুলো পাননি।’

কক্সবাজারের একটি ইউনিয়নে গৃহহীন হিসেবে যে ১৮ জনকে ঘর দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে কেবল তিনজন সেই ঘরে থাকছেন। বাকি ঘরগুলো কেউ বিক্রি করে দিয়েছেন, কেউ দিয়েছেন ভাড়া, কেউ উপহার হিসেবে দিয়েছেন স্বজনদের।

পরে খোঁজ নিয়ে এটাও জানা গেছে, যে ১৫ জন ঘর বরাদ্দ পেয়েও সেখানে থাকছেন না, তারা আসলে গৃহহীনই ছিলেন না। তাদের কয়েকজন বেশ সম্পদশালী। একজন আবার সৌদি প্রবাসী, যার তিনতলা ভবন নির্মাণ চলছে। কারও কারও বাড়ির পাশাপাশি জমিজমা আছে।

তারা সবাই ইউনিয়নটির সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলমের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখে চলতেন। স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন যাচাই-বাছাই ছাড়াই এদের গৃহহীন হিসেবে ধরে নিয়ে ঘর দিয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে যোগাযোগ করা হলে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বলছেন, তিনি এসব বরাদ্দ বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছেন।

উপহারের এসব ঘরের মালিকানা স্থানান্তরযোগ্য না হলেও ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় তা বিক্রির তথ্য মিলেছে।

মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় ২০২১ সালের ২০ জুন দ্বিতীয় পর্যায়ে কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলার ১৪৫টি অসহায় ‘ভূমিহীন ও গৃহহীন’ পরিবারকে জমি ও ঘর উপহার দেয় সরকার। এর মধ্যে ১৮টি ঘর দেয়া হয় উখিয়ার হলদিয়াপালং ইউনিয়নে। ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হলুদবনিয়া এলাকায় খাসজমিতে ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়।

হলদিয়াপালং ইউনিয়নের যে ১৮টি ঘর করা হয়েছে, তার মধ্যে কেবল তিনটিতে বরাদ্দপ্রাপ্তদের থাকতে দেখা গেছে। মোহাম্মদ আলী, মনোয়ারা বেগম ও এরশাদ উল্লাহ থাকছেন নিজেদের ঘরে।


তারা কেউ গৃহহীন নন

নূর মোহাম্মদ নামে একজনকে বরাদ্দ দেয়া ঘরটি তিনি তার ভাগনি রহিমা বেগমকে বিয়ের উপহার দিয়েছেন বলে নিউজবাংলার কাছে দাবি করেন রহিমার স্বামী মো. রাশেদ।

১৮ ঘরের ১৫টি পেলেন সম্পদশালীরা, থাকেন না কেউ

নূর মোহাম্মদ গৃহহীন নন। তিনি চাষাবাদ করেন, আবার ব্যবসাও আছে।

শামসুল আলম নামে একজন বরাদ্দ পেয়ে ঘরটি বিক্রি করে দিয়েছেন ৩০ হাজার টাকায়। সেটি কিনেছেন আব্দুল আমিন নামে একজন। তিনি সেই ঘর ভাড়া দিয়েছেন আমিনা বেগম নামে এক নারীর কাছে।

হলদিয়াপালং ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডে নিজস্ব ঘরবাড়ি, জমিজমা রয়েছে, সেটি নিউজবাংলার কাছে স্বীকারও করেছেন শামসুল। তার পরও উপহারের ঘর নেয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তিন ভাই এক বসতঘরে থাকি। একটু গাদাগাদি হয়। তার জন্য বাড়িটা নিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের এক বোন থাকেন, আমিনা।

আব্দুল আমিন নামে একজনের কাছে ঘরটি বিক্রি করেছেন কি না জানতে চাইলে তিনি ‘ভুল কথা’ বলে ফোন কেটে দেন।

ঘর বরাদ্দ পেয়ে সাহাব মিয়া নামে একজন সেটি ভাড়া দিয়েছেন স্থানীয় ইটভাটার এক কর্মীর কাছে।

সাহাব মিয়ারও নিজস্ব ঘরবাড়ি রয়েছে। তার জমিও আছে।

জাহাঙ্গীর আলম নামে আরেক বরাদ্দপ্রাপ্ত ঘরটি মো. শামশু নামে একজনের কাছে বিক্রি করেছেন ৫০ হাজার টাকায়।

একই ইউনিয়নের রুমখা তেলীপাড়ায় নিজস্ব ঘরবাড়ি আছে জাহাঙ্গীরের। তার কাছ থেকে বাড়ি কেনার পর কয়েকবার এলেও পরে আর দেখা যায়নি শামশুকেও। তাকে ভালো করে কেউ চেনেনও না।

ঘর বিক্রি করে দেয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সাবেক চেয়ারম্যানের বাড়ির পাশে আমার দুই গণ্ডা জমি আছে। যেখানে আমি বসবাস করি। আমার ছেলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। এত দূরে কী করে থাকব?’

গৃহহীন না হয়ে কেন ঘর নিলেন- এমন প্রশ্নে জাহাঙ্গীর বলেন, ‘চেয়ারম্যান বলেছিল আমার জমিতে ঘর দেবে। এত দূরে দেবে জানতাম না।’

শামশুর কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা নেয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘সে গরিব, তার ঘরবাড়ি নেই। সে জন্য থাকতে দিছিলাম।’

এই প্রকল্পে হামিদুল হক নামে এক প্রবাসীকেও ঘর দেয়া হয়। তিনি ঘরটি কোনোদিন ব্যবহার করেননি। তিনিও সেটি বিক্রির চেষ্টা করছেন।

হামিদুল সৌদি আরবে থাকেন। তার স্ত্রী লায়লা বেগম ও সন্তানরা ইউনিয়নের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের হলুদবনিয়া এলাকায় থাকেন। তাদের তিনতলা একটি ভবনের নির্মাণকাজ চলছে।

এই আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রথম ঘরটি দেয়া হয় মো. ইছাকে। উদ্বোধনের পর থেকেই সেটি আড্ডার জন্য ব্যবহার হয়ে আসছে। ইছা গাড়িচালক। তিনি বিতর্কিত ধর্মীয় বক্তা আমির হামজার গাড়ি চালান।

১৮ ঘরের ১৫টি পেলেন সম্পদশালীরা, থাকেন না কেউ

ইছারও নিজস্ব ঘরবাড়ি আছে ওই ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে।


নেপথ্যে সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলম

সম্পদ থাকার পরও তাদের নামে গরিবের ঘর বরাদ্দের পেছনে মূল ভূমিকায় ছিলেন হলদিয়াপালং ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান শাহ আলম। তিনি গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে হেরে গেছেন।

বিনা মূল্যের ঘর না পাওয়ার কথা থাকলেও যারা পেয়েছেন, তারা সবাই শাহ আলমের সমর্থক।

তবে শাহ আলম এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘বর্তমান চেয়ারম্যানের যোগসাজশে মিথ্যাচার করা হচ্ছে। ইউএনও এর সঙ্গে জড়িত।’

তবে যাদের ঘর বরাদ্দ দিয়েছেন তারা তো গৃহহীন নন- এমন প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান সাবেক চেয়ারম্যান।

যে সময় ঘরগুলো বরাদ্দ দেয়া হয়, সে সময় উখিয়া উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন নিজামউদ্দিন আহমেদ, যিনি উপকারভোগীদের তালিকা চূড়ান্ত করেছেন।

তিনি বর্তমানে নোয়াখালী সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত। সম্পদশালীদেরকে গৃহহীনদের ঘর দেয়ার বিষয়ে এক প্রশ্নে নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের তালিকার ভিত্তিতেই ঘরবাড়িগুলো গৃহহীনদের দেয়া হয়েছে।’

তাহলে আপনাদের দায়িত্ব কী- জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। একসঙ্গে অনেক ঘর দেয়ার কারণে ভুল হতে পারে।

‘যদি এমন কেউ (সম্পদশালী) থেকে থাকে, তাহলে সরকারের যে বিধিমালা, তাতেই উল্লেখ আছে, ঘরগুলো তাদের কাছ থেকে নিয়ে প্রকৃত গৃহহীনদের কাছে হাস্তান্তর করা হবে।’


গৃহহীনরা
আক্ষেপে

স্থানীয় ইউপি সদস্য সরওয়ার কামাল বাদশা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘মুজিববর্ষের ঘর যারা উপহার পেয়েছেন তাদের প্রায় সবার নিজস্ব ঘরবাড়ি রয়েছে। তাই প্রধানমন্ত্রীর উপহারের এসব ঘরে তারা থাকেন না।’

১৮ ঘরের ১৫টি পেলেন সম্পদশালীরা, থাকেন না কেউ

নুরুল আলম নামে এক রিকশাচালক জানিয়েছেন, তার ঘরবাড়ি নেই। তিনি স্ত্রীকে নিয়ে ২ নম্বর ওয়ার্ডে একজনের সেচের মোটর ঘরে আশ্রয় নিয়েছেন।

তিনি বলেন, কদিন পর বর্ষা শুরু হলে কোথায় থাকবেন জানেন না। অথচ মুজিববর্ষের ঘরগুলো দেয়া হয়েছে, যাদের ঘরবাড়ি আছে তাদের।


যা বলছে উপজেলা প্রশাসন

উপহারের ঘর বিক্রি, উপহার বা ভাড়া দেয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া কথা জানিয়েছেন উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ইমরান হোসেন সজিব। এসব ঘর বরাদ্দ দেয়ার সময় তিনি দায়িত্বে ছিলেন না জানিয়ে নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ শোনার পর পরই আমি পরিদর্শন করেছি। প্রাথমিকভাবে এসব ঘরে তিনটি পরিবারকে পেয়েছি। বাকিদের যেহেতু পাওয়া যায়নি, তাদের বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত নিতে ওপর মহলে বলা হয়েছে।’

হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমরুল কায়েস চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘১৮টি ঘরের মাত্র তিনটিতে প্রকৃত মালিকরা রয়েছেন। ঘরগুলো প্রদানের সময় অনিয়ম ও দুর্নীতি করা হয়েছিল। তাই প্রকৃত ভূমিহীনরা এগুলো পাননি।’

তিনি জানান, যেসব ঘর খালি পড়ে আছে বা ভাড়া দেয়া হয়েছে, তাদের বরাদ্দ বাতিল করতে গত ফেব্রুয়ারিতে তিনি কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।

বিষয়টি নিয়ে ক্ষুব্ধ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের হলদিয়াপালং ইউনিয়ন সভাপতি মোহাম্মদ ইসলামও। নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘মুজিববর্ষের ঘর উপহার দেয়ার সময় প্রকৃত ভূমিহীনদের দেয়া হয়নি। সেই সময়ের হলদিয়াপালং ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহ আলম নিজের অনুসারীদের এসব ঘর দিয়েছেন। হলদিয়াপালংয়ের প্রকৃত ভূমিহীনরা এখনও ভূমিহীন রয়ে গেছেন।’

আরও পড়ুন:
গৃহহীনদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার এক অনন্য নজির
প্রধানমন্ত্রীর ‘ঈদ উপহার’ পেলেন ৩৩ হাজার গৃহহীন
‘প্রধানমন্ত্রীর ঘর পাব, অনেক খুশি লাগতাছে’
আশ্রয়ণের ঘর নির্মাণে বিজিবির ‘বাধা’
টাকা নিয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়ি বরাদ্দের অভিযোগ

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The railway minister did not recognize his nephew who boarded the train without a ticket

বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া ভাগনেকে ‘চিনছেন না’ রেলমন্ত্রী

বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া ভাগনেকে ‘চিনছেন না’ রেলমন্ত্রী রেলমন্ত্রীর (ডানে) আত্মীয় পরিচয়ে বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ করা তিন যাত্রীকে জরিমানা করে বরখাস্ত হয়েছেন এক টিটিই। ছবি কোলাজ: নিউজবাংলা
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলোচিত তিন যাত্রীই রেলমন্ত্রীর দূর সম্পর্কের আত্মীয়। মন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করেই তারা বৃহস্পতিবার রাতে ঈশ্বরদী থেকে আন্তনগর সুন্দরবন এক্সপ্রেসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে উঠেছিলেন।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের আত্মীয় পরিচয়ে বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ করার অপরাধে তিন যাত্রীকে জরিমানা করেছিলেন ট্রাভেলিং টিকিট এক্সামিনার (টিটিই)। বৃহস্পতিবার রাতের এ ঘটনার পর ওই টিটিই- শফিকুল ইসলামকে বরখাস্ত করার খবর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

মন্ত্রী অবশ্য সংবাদমাধ্যমের কাছে দাবি করেছেন, ট্রেনের ওই তিন যাত্রীর সঙ্গে তার আত্মীয়তার কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের তিনি চেনেনও না। সাধারণ যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের কারণেই বরখাস্ত হয়েছেন টিটিই।

তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আলোচিত তিন যাত্রীই রেলমন্ত্রীর দূর সম্পর্কের আত্মীয়। মন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করেই তারা বৃহস্পতিবার রাতে ঈশ্বরদী থেকে আন্তনগর সুন্দরবন এক্সপ্রেসের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কেবিনে উঠেছিলেন।

ট্রেনে নিয়মিত চেকিংয়ের সময় কর্তব্যরত টিটিই শফিকুল ইসলাম তাদের টিকিট দেখতে চান। শফিকুলের অভিযোগ, টিকিট নেই জানিয়ে তারা নিজেদের রেলমন্ত্রীর আত্মীয় বলে পরিচয় দেন।

এ অবস্থায় বিষয়টি পাকশী বিভাগীয় রেলের সহকারী বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (এসিও) মো. নুরুল আলমের সঙ্গে কথা বলে রেলমন্ত্রীর আত্মীয়দের সর্বনিম্ন ভাড়া দিয়ে টিকিট কাটার পরামর্শ দেন টিটিই। তিনি ওই তিন যাত্রীকে এসি টিকিটের পরিবর্তে মোট ১ হাজার ৫০ টাকা নিয়ে জরিমানাসহ সুলভ শ্রেণির নন-এসি কোচে সাধারণ আসনের টিকিট করে দেন। এ সময় ট্রেনে কর্তব্যরত অ্যাটেনডেন্টসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রেল কর্মকর্তা জানান, ওই তিন যাত্রী তাৎক্ষণিকভাবে লিখিত কোনো অভিযোগ না দিলেও ঢাকায় পৌঁছে তারা রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে টিটিই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে অসদাচরণের অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগ পেয়ে পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ে বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) নাসির উদ্দিন সংশ্লিষ্ট টিটিইকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন।

আলোচিত তিন যাত্রীর নাম ও পরিচয় জানতে পেরেছে নিউজবাংলা। তারা হলেন ইমরুল কায়েস প্রান্ত, ওমর এবং হাসান। এদের মধ্যে ইমরুল কায়েস টিটিই শফিকুলের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ করেন। সেই অভিযোগের একটি অনুলিপিও পেয়েছে নিউজবাংলা।

বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া ভাগনেকে ‘চিনছেন না’ রেলমন্ত্রী
টিটিই শফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ইমরুল কায়েস প্রান্তর লিখিত অভিযোগ

লিখিত সেই অভিযোগে প্রান্ত স্বীকার করেন, তিনি ও তার ছোট দুই মামা বিনা টিকিটে সুন্দরবন এক্সপ্রেসে চড়েছিলেন। কাউন্টার থেকে টিকিট না পাওয়ার কারণেই তারা এভাবে ট্রেনে চড়েন।

অভিযোগে প্রান্তর দাবি, ট্রেন ছাড়ার আধা ঘণ্টার মধ্যে টিটিই এসে টিকিট চান। তখন টিটিই শফিকুল তাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকা করে ১ হাজার ৫০০ টাকা আদায় করেন। প্রান্তরা টিকিট দাবি করলে শফিকুল তাদের উচ্চস্বরে গালিগালাজ করেন।

শফিকুল ইসলাম ‘মাদকাসক্তের মতো আচরণ করছিলেন’ অভিযোগ করে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ করা হয় লিখিত অভিযোগপত্রে।

তবে নিউজবাংলার অনুসন্ধানে প্রান্তর রেলমন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করে ট্রেনে ভ্রমণের প্রমাণ পাওয়া গেছে।

রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের শ্বশুড়বাড়ি পাবনার ঈশ্বরদীতে। সেখান থেকেই বৃহস্পতিবার প্রান্ত ও তার দুই মামা ঢাকার উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিনি রাজধানীর বাড্ডার একটি টেক্সটাইল কোম্পানিতে চাকরি করেন।

প্রান্তর মা ইয়াসমিন আক্তার নিপা নিউজবাংলাকে জানান, রেলমন্ত্রীর স্ত্রী শাম্মী আকতার মনি তার ফুপাতো বোন। সে হিসাবে প্রান্ত রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের ভাগনে। আর বৃহস্পতিবার প্রান্তর সঙ্গে রেলযাত্রায় অংশ নেন মন্ত্রীর ছোট মামাশ্বশুর জাহাঙ্গীর আলমের দুই ছেলে হাসান ও ওমর।

ঈশ্বরদীর নুর মহল্লার কর্মকারপাড়ায় জাহাঙ্গীর আলমের বাড়িতে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ছিলেন রেলমন্ত্রীর স্ত্রী শাম্মি আকতার। পাবনায় এলে তিনি এই বাড়িতে ওঠেন। ওই বাড়ির আরেকটি অংশে থাকে প্রান্তর পরিবার।

প্রান্তর মা ইয়াসমিন আক্তার নিপা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘রেলমন্ত্রীর ওয়াইফ আমার বোন হয়। আমরা ফুপাতো বোন। আমার এখানেই তো সে ঈদ করে গেল।’

প্রান্তসহ তিনজনের ট্রেনে চড়ার আগে মন্ত্রীর স্ত্রী ট্রেনের লোকজনকে বিষয়টি অবহিত করেছিলেন বলে নিউজবাংলাকে জানান নিপা। তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয়ের ওয়াইফ গার্ডকে ফোন দিয়ে বলছে, আমার বাচ্চারা গেল, ঠিকঠাকভাবে নামায়ে দিয়েন। এখন তো কেবিন খালি যাচ্ছিল। তাই উনি (গার্ড) কেবিনে নিয়ে ওদের বসায় দিছে, যে রেলের রিলেটিভ, একটু আরামেই যাক।’

মন্ত্রীর স্ত্রী কাকে বলে দিয়েছেন জানতে চাইলে নিপা বলেন, ‘পরিচিত গার্ড ছিল উনাকে বলছে। তো গার্ড কেবিনে বসায় দিছে। ওই মুহূর্তে টিটিই গিয়ে বলছে, রেলের রিলেটিভ হও আর যাই হও, বাপের তো গাড়ি না। উল্টাপাল্টা কথা বলেছে। তখন আমার ছেলে আমাকে ফোন দিছে। আমি তখন ঘুমাচ্ছিলাম, আর উনি (রেলমন্ত্রীর স্ত্রী) পাশেই ঘুমাচ্ছিল। আমি তখন উনাকে বললাম, শাম্মি তাড়াতাড়ি দেখ তো…।

‘তখন উনি ফোন করে রাগ হয়ে গেছে। আমি বললাম, আমার কথার উপর দিয়ে টিটিই এমন বিহেভ করবে কেন?’

নিপা দাবি করছেন তার ছেলেসহ তিন আত্মীয় টিকিট কেটেই ট্রেনে চড়েছিলেন। তবে প্রান্তর লিখিত অভিযোগে দেখা গেছে, তারা কেউ সেদিন টিকিট কাটেননি।

বিষয়টি নিয়ে প্রান্তর সঙ্গেও কথা বলেছে নিউজবাংলা। তিনি বলেন, ‘আমি অফিসের জরুরি কাজের জন্য ঢাকায় ফিরতে সেদিন রাত ২টায় বের হই। স্টেশনে টিকিট কাটতে যাই। তখন সেখান থেকে বলে টিকিট নেই। আমার সঙ্গে ছিল দুই ছোট মামা হাসান ও ওমর।

বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া ভাগনেকে ‘চিনছেন না’ রেলমন্ত্রী
ঈশ্বরদীর এই বাড়িতে থাকে প্রান্তর পরিবার

প্রান্ত দাবি করেন, তারা ট্রেনে উঠে মাঝামাঝি নন-এসি একটি বগিতে বসেন। কিছুক্ষণ ট্রেন উল্লাহপাড়ার কাছাকাছি পৌঁছালে টিটিই আসেন।

প্রান্ত বলেন, ‘ঈদের সময় ট্রেনে অনেক ভিড়। টিটিই বলেন কোথায় যাবেন? আমি বলি ঢাকায় যাব। টিটিই বলেন টিকিট করছেন? তখন আমি বলি, সিট পাইনি আর স্টেশনে টিকিট নিতে গিয়ে দেখি ট্রেন ঢুকে গেছে। তাই তাড়াহুড়া করে ট্রেনে উঠে গেছি। টিকিট নেয়া হয়নি। এ কথা বলার পর উনি (টিটিই) বলেন, আপনারা জরিমানাসহ ৫০০ টাকা করে দেন প্রতিজন।’

টিটিইকে মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় দিয়েছিলেন জানতে চাইলে প্রাপ্ত বলেন, ‘না… না। আমি কখনও কোথাও রেফারেন্স দিয়ে চলাচল করি না।’

তাহলে টিটিই কীভাবে মন্ত্রীর সঙ্গে তাদের আত্মীয়তার পরিচয় জানলেন, এমন প্রশ্নে প্রান্ত বলেন, ‘আত্মীয় হওয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে কীভাবে কী হয়ে গেল বুঝতে পারিনি। এ ধরনের কোনো কথাই আসেনি।’

মন্ত্রীর স্ত্রী ট্রেনের গার্ডকে তাদের যাত্রার কথা জানিয়েছিলেন- প্রান্তর মায়ের এমন তথ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে প্রান্ত পরিষ্কার কোনো জবাব দিতে পারেননি। শুরুতে টিকিট না কেটে ট্রেনে চড়ার তথ্য স্বীকার করলেও পরে তিনি দাবি করেন, স্ট্যান্ডিং টিকিট কেটেছিলেন।

প্রান্ত বা তার মায়ের বক্তব্য সম্পর্কে রেলমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। শনিবার একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

তবে রেলমন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সময় নিউজ। এতে মন্ত্রী বলেন, ‘বিনা টিকিটে ট্রেনে ভ্রমণ করা যাত্রীরা আমার আত্মীয় নয়; ওদের সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে কেউ হয়তো সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। ঘটনার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।’

ঘটনাটি শনিবার সকালে প্রথম শুনেছেন দাবি করে মন্ত্রী জানান, তিনি রেলের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে শুনেছেন টিটিই শফিকুল ইসলাম বিনা টিকিটের যাত্রীদের সঙ্গে অত্যন্ত খারাপ আচরণ করেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, রেলের অফিশিয়াল কার্যক্রমের সঙ্গে মন্ত্রীর কোনো সংযোগ নেই। ঘটনার সঙ্গে মন্ত্রীর কোনো আত্মীয় জড়িত নন। ওই টিটিইর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার ব্যাপারে মন্ত্রী কিছুই জানতেন না।

শফিকুলকে বরখাস্তের বিষয়ে পাকশীর ডিসিওবক্তব্য

টিটিই শফিকুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্তের আদেশ দেন পাকশীর রেলওয়ের বিভাগীয় বাণিজ্য কর্মকর্তা (ডিসিও) নাসির উদ্দিন।

বিষয়টি নিয়ে তিনি একটি লিখিত বিবৃতি দিয়েছেন। এতে তিনি বলেন, ‘গত ৫ তারিখ রাতে কিছু যাত্রী ঈশ্বরদী স্টেশনের কাউন্টারে আসেন। কিন্তু কাউন্টারে কোনো টিকিট পাননি। তাদেরকে ঢাকা যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে সুন্দরবন এক্সপ্রেস ট্রেনের যেখানে জায়গা পান সেখানেই উঠে পড়েন।

‘টিটিই শফিক ট্রেনে উঠে যাত্রীদের কাছ থেকে খুলনা থেকে ঢাকা পর্যন্ত তিন হাজার টাকা করে ভাড়া দাবি করেন। তখন যাত্রীরা জানান, তারা ঈশ্বরদী থেকে টিকিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে ট্রেনে উঠেছেন। তারা ঈশ্বরদী থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৩০০ টাকা করে ভাড়া নেয়ার জন্য টিটিকে অনুরোধ করেন। কিন্তু টিটিই জবাবে বলেন, ট্রেন কি তোর বাপের? তখন যাত্রী বলেন, 'ট্রেন কি তোর বাপের মানে কী? বিপদে পইড়া ট্রেনে উঠেছি। আপনি ভাড়াটা নেন।'

বিবৃতিতে বলা হয়- ‘তখন টিটিই বলেন দ্বিগুণ জরিমানাসহ খুলনা থেকে ভাড়া দিতেই হবে। তখন যাত্রীরা বলেন, এত টাকা আমাদের কাছে নেই। ঈশ্বরদী থেকে ঢাকা পর্যন্ত ৩০০ টাকা করে রাখেন। তখন টিটিই সাহেব বলেন, টাকা না দিলে লাত্থি দিয়ে ট্রেন থেকে ফেলে দিব। তারপর আরও অকথ্য ভাষায় গালাগাল করতে থাকেন।’

যাত্রীরা ‘টিটিইর মুখ থেকে এ ধরনের বকা শুনে চরম মর্মাহত হন’ উল্লেখ করে বিবৃতিতে বলা হয়, টিটিই অন্যান্য যাত্রীর সঙ্গে ওই ধরনের আচরণ করেন। তিনি নেশাগ্রস্ত ছিলেন বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।

‘উল্লেখ্য, যাত্রীদের সঙ্গে অসদাচরণের জন্য তিন মাস আগে টিটিই শফিককে পাকশী দপ্তরে বুক অফ করা হয়। তারপর তিনি যাত্রীদের সঙ্গে এমন আচরণ করবেন না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর তাকে কর্মস্থলে ফেরত পাঠানো হয়।’

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ‘শফিক আইন বিষয়ে এলএলএম করেন। তিনি তার সহকর্মীদের জানান, তার সব বন্ধু জজ হিসেবে কর্মরত আছেন। কিন্তু তিনি ভালো একটি চাকরি পাননি বলে মানসিকভাবে খুব হীনম্মন্যতায় ভোগেন। কর্মস্থলে সহকর্মীদের সঙ্গে অকারণেই চিৎকার-চেঁচামেচি করেন। তার নিয়ন্ত্রণকারী (এসআরআই) সাধারণ ডিগ্রি পাস বলে তাকে তাচ্ছিল্য করতেন।

‘মূলত তিনি তার মানসিক হীনম্মন্যতায় ভুগছেন। এ জন্যই তিনি যাত্রীসাধারণের সঙ্গে বেশির ভাগ সময়ই অযাচিতভাবে খারাপ আচরণ করেন।’

বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়া ভাগনেকে ‘চিনছেন না’ রেলমন্ত্রী

সদস্যের তদন্ত কমিটি

পুরো বিষয়টি তদন্তে রেলের তিন সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে। এ কমিটি রোববার কাজ শুরু করবে বলে নিউজবাংলাকে জানিয়েছেন রেলওয়ের পশ্চিমের মহাব্যবস্থাপক অসীম কুমার তালুকদার।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘটনাটি দুঃখজনক। আমি শুনে আশ্চর্য হয়েছি। এ ঘটনায় সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা, সহকারী প্রকৌশলী ও সহকারী কমান্ড্যান্টকে সদস্য করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। আগামীকালের (রোববার) মধ্যেই আমরা এ ঘটনার শেষ করতে চাচ্ছি।’

মন্ত্রীর আত্মীয়দের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘মন্ত্রী মহোদয় তো তার নিজ এলাকায় ছিলেন। তার আত্মীয় হওয়ার কথা না, আবার হতেও পারে। এ বিষয়ে আমি কনফার্ম না। যদি হয় তদন্তে সব বের হয়ে আসবে।’

মন্ত্রীর আত্মীয়রা অভিযুক্ত হলে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দোষীরা মন্ত্রী মহোদয়ের আত্মীয় হলে আমরা কী ব্যবস্থা নিতে পারি? আমরা তাদের কি বিচার করতে পারি? তবে মন্ত্রী মহোদয়কে জানাব, যে ঘটনায় ওনারাই দোষী।’

আরও পড়ুন:
রেলকর্মী, পুলিশের ওপর ‘টিকিট কালোবাজারি’ চক্রের হামলা
সেলফি তুলতে গিয়ে ট্রেনের ধাক্কায় শিশু নিহত
জুনের মধ্যে পঞ্চগড় হবে গৃহহীন মুক্ত জেলা: রেলমন্ত্রী
ঝিঁঝিডাকা নীরবতা
ঘুরতে গেলে লাগে পরিকল্পনা

মন্তব্য

বাংলাদেশ
The tendency of women to take drugs is increasing in well off families

মাদকে ঝোঁক বাড়ছে নারীর, বেশি ঝুঁকি সচ্ছল পরিবারে

মাদকে ঝোঁক বাড়ছে নারীর, বেশি ঝুঁকি সচ্ছল পরিবারে সচ্ছল পরিবারের অনেক নারীর মাদকের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বাড়ছে। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত
ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশন (নারী) মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর মমতাজ খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, আমাদের এখানে যারা আসছেন তাদের বড় অংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের স্টুডেন্ট। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছেন গৃহবধূ।’

দেশে নারীদের মধ্যে মাদকের দিকে ঝোঁকার প্রবণতা বাড়ছে। কয়েকটি মাদক নিরাময় কেন্দ্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আর্থিক নিরাপত্তা ভোগ করা পেশাজীবী নারীদের অনেকেই ঝুঁকছেন মাদকের দিকে। আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে মাদকসেবী কিশোরীর সংখ্যা। গৃহবধূরাও হচ্ছেন মাদকাসক্ত।

ঢাকা আহছানিয়া মিশন (নারী) মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে ২০১৮ সাল থেকে গত বছর পর্যন্ত চিকিৎসা নিয়েছেন ৩৪০ জন নারী মাদকসেবী। তাদের মধ্যে শিক্ষার্থী ১২৫ জন, গৃহিণী ১৫১ জন, চিকিৎসক তিনজন, সাইকোথেরাপিস্ট একজন, বেসরকারি চাকরিজীবী ১৭ জন, শিক্ষক তিনজন, মডেল পাঁচজন, যৌনকর্মী চারজন, বেকার ১৬ জন, ব্যবসায়ী ১০ জন, ডিজে একজন এবং এয়ারহোস্টেস তিনজন।

ঢাকা আহছানিয়া মিশন (নারী) মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর মমতাজ খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ’আমাদের এখানে যারা আসছেন তাদের বড় অংশ ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের স্টুডেন্ট। এ ছাড়া উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় আছেন গৃহবধূ। আমরা চিকিৎসা পেশায় জড়িতদেরও পাচ্ছি। সেই সঙ্গে আছেন মডেল, অভিনেত্রী, এয়ার হোস্টেস।’

নারীদের মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর মধ্যে চিকিৎসা পেশায় জড়িতদের অবস্থা সবচেয়ে নাজুক বলে জানান মমতাজ খাতুন। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসা নিতে আসা ডাক্তাররা ড্রাগ নিতে নিতে অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে তাদের ট্রিটমেন্ট দেয়ার মতো অবস্থা থাকে না। তাদের শরীরের সব জায়গায় ইনজেকশনের ছিদ্র। ফলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রক্ত নেয়ার উপায়ও থাকে না।’

তিনি বলেন, ‘গত তিন বছরে আমরা চারজন ডাক্তার পেয়েছি। তার মধ্যে তিনজন মাল্টি ড্রাগ ইউজার। প্যাথেডিন, আইস, ইয়াবা, গাঁজা সব ধরনের ড্রাগ নিতেন তারা। এই তিনজন তিন মাস চিকিৎসা নিয়েছেন। আর একজন শুধু প্যাথেডিন ইউজার। তিনি খুব ভালো ফ্যামেলির এবং নামকরা একটি হাসপাতালের মালিকের মেয়ে। মেয়েটি নিজেও একজন ভালো মেডিসিন স্পেশালিস্ট।’

শুধু আহছানিয়া মিশন (নারী) মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নয়, সারা দেশের ৩৬১টি বেসরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে চিকিৎসা গ্রহণকারী নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা বাড়ছে। বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রে মোট শয্যা রয়েছে ৪ হাজার ৭২৬টি। এসব কেন্দ্রে সচ্ছল পরিবারের রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি।

মাদক নিরাময় কেন্দ্র থেকে সম্প্রতি চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফেরা এক নারী চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসকদের মধ্যে ড্রাগ গ্রহণের প্রবণতা বেড়েছে। অনেকেই বিষয়টি ম্যানেজ করে চলেন। আমিও প্রথমে সেভাবে চলছিলাম। তবে একটা সময়ে সেটা আর সম্ভব হয়নি। এরপর চিকিৎসা নিয়ে আমি এখন অনেকটা ভালো।’

তিনি বলেন, ‘ডাক্তারদের তো ড্রাগ সম্পর্কে আইডিয়াটা অনেক বেশি। ওরা জানে কোন মাত্রায় কতদিন নিলে আমি ঠিক থাকতে পারব। আবার কোন মাত্রায় কতদিন বিরত রাখতে পারব। ডাক্তাররা অনেকে প্যাথেডিন নেয়, প্যাথেডিনের পর ন্যালবান ইনজেকশন নেয়, এরপর ন্যালবানের বিকল্প কী আছে সেটাও তারা জানে।’

প্যাথেডিন আর ন্যালবান একই গ্রুপের ড্রাগ। কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট রায়হানুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘প্যাথেডিন মূলত সিনথেটিক ব্যথানাশক। কারখানায় উৎপাদন হচ্ছে বলে এটা সিনথেটিক। এটা সিজারিয়ান বা যেকোনো ধরনের অপারেশনের ক্ষেত্রে ব্যথানাশক হিসেবে চিকিৎসকেরা ব্যবহার করেন। মরফিন, হেরোইন, ফেনসিডিল, প্যাথেডিন, বিটুইনাফিন, ন্যালবান, ওমাসন এ সবই একই গোত্রের।

‘তবে এগুলোর মধ্যে একটু সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। কিছু সরাসরি গাছ থেকে হয়। কতগুলো গাছ থেকে আসার পর কারখানায় প্রসেস হয়। আবার কোনোটা কারখানায় উৎপাদন হয়, যেমন প্যাথেডিন। এগুলোর কার্যকারিতা কমবেশি একই ধরনের।’

নিউজবাংলার সঙ্গে কথা বলা ওই নারী চিকিৎসক মাদকে আসক্ত হয়ে নিরাময় কেন্দ্রে যাওয়া আরেক চিকিৎসকের বিষয়েও তথ্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘ওই ফিমেল ডক্টর আমার পরিচিত। মাদক নিয়ে যখন তার আলটিমেট পজিশন হলো, তখন পরিবারকে বলল আমার চিকিৎসা দাও। বাসায় থাকলে সে হয়তো সুইসাইড করত বা এমন কোনো শারীরিক সমস্যায় পড়ত যেখান থেকে সে আর হয়তো সাসটেইন করতে পারত না। এমন আলটিমেট পর্যায়েই সবাই চিকিৎসা নিতে আসে।’

আহছানিয়া মিশন (নারী) মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার উম্মে জান্নাত নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ডাক্তারদের মধ্যে পর্যায়ক্রমে নানা ধরনের ড্রাগ নিতে নিতে অনেকের অবস্থা খুব খারাপ হয়ে যায়। কেউ কেউ শরীরে এত বেশি ছিদ্র করে ফেলেন যে শারীরিক চেকআপের জন্য আমরা রক্ত নেয়ার ভেইন খুঁজে পাই না। মানে তাদের চিকিৎসা দেয়ার মতো অবস্থাও থাকে না। অনেক সময় ইনজেকশন পুশ করার জায়গা খুঁজে পাওয়া যায় না।’

রাজধানীর একাধিক মাদক নিরাময় কেন্দ্র ঘুরে বেশ কয়েকজন নারী এয়ার হোস্টেসের মাদকাসক্তির তথ্যও পাওয়া গেছে।

চিকিৎসা নিয়ে ছয় মাস আগে বাসায় ফিরেছেন এমন একজন এয়ার হোস্টেসের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। তিনি বলেন, ‘অনেক সময় কেবিন ক্রুরা কমপিটিশনে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে থাকতে ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়েন। দেখা যাচ্ছে কারও শরীর খুব বেশি স্লিম, এ ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় হতে হয়তো একটু মোটা হওয়া দরকার। এই পরিবর্তন আনতে খাওয়া-দাওয়ার পরিমাণ বাড়িয়েও অনেক সময় কাজ হয় না। তখন কেউ কেউ ড্রাগের সাহায্য নেন।

‘আবার লং ফ্লাইটে অনেক বেশি ডিউটি থাকে বলে নিজেকে ফিট রাখতে কেউ কেউ ড্রাগ নেন। প্রথম দিকে নিজেকে খুব উৎফুল্ল মনে হয়। তবে এক দিন, দুই দিন, পাঁচ দিন, দশ দিন নিতে নিতে ড্রাগের প্রতি আসক্তি জন্মে যায়। ড্রাগ বলতে আইস নেয়া হয় বেশি। ইয়াবাও চলে কোনো কোনো সময়।’

তিনি বলেন, ‘ড্রাগ নেয়া শুরুর সময়ে মনে করা হয় এতে ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে বা মানসিক ক্ষেত্রে উপকার হবে। তবে একপর্যায়ে সহজে আর ফিরে আসা যায় না।’

মাদকাসক্তির কারণে গত এক বছরে তিনজন মডেল চিকিৎসা নিয়েছেন আহছানিয়া মিশন (নারী) মাদক নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে।

তাদের মধ্যে একজন উঠতি মডেলের সঙ্গে কথা বলেছে নিউজবাংলা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমি ইয়াবা নিতাম। একটা পর্যায়ে আর ঘুম আসত না। সবকিছু অসহ্য লাগত। তখন বাধ্য হয়ে ঘুমের ওষুধ খেতে হতো। এই ঘুমের ওষুধের ডোজও দিনে দিনে বাড়াতে হয়েছে।

‘একটা পর্যায়ে পরিবারকে সব খুলে বলি। তারা আমাকে রিহ্যাবে নিয়ে যায়।’

সাইকোসোশ্যাল কাউন্সিলর মমতাজ খাতুন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এমফেটামিন মানে ইয়াবা আসক্তদের বিশেষ পদ্ধতিতে চিকিৎসা দিতে হয়। ইয়াবার কারণে যে শারীরিক সমস্যাগুলো হয় সেটার বিপরীত মেডিসিন খেতে দেয়া হয়।’

মাদক নিরাময় কেন্দ্রে চিকিৎসা নেয়া ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের এক শিক্ষার্থী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি পরিবারকে বলে দিয়েছিলাম যে স্টাডির চাপ আর বন্ধুদের প্ররোচনায় ড্রাগ নেয়া শুরু করেছি। এখন ছাড়তে চাচ্ছি। তখন আমাকে পরিবার রিহ্যাবে নিয়ে যায়।’

আহছানিয়া মিশন (নারী) মাদক নিরাময় ও পুর্নবাসন কেন্দ্রের সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার উম্মে জান্নাত নিউজবাংলাকে বলেন, ‘শিক্ষিতরা মাদক নিয়ে অনেক কনফিডেন্ট থাকেন। তারা ভেবেই নেন যে এটা ভালোভাবে ম্যানেজ করা যাবে। আমরা ডাক্তারদের মধ্যে প্যাথেডিন নেয়ার প্রবণতা বেশি পেয়েছি। আর অন্যদের মধ্যে আইস, ইয়াবাসহ মেজর ড্রাগগুলো নেয়ার প্রবণতা দেখা গেছে। আমাদের এখানে যেসব রোগী আসেন তাদের বেশির ভাগই ইয়াবা, গাঁজা আর ঘুমের ওষুধে আসক্ত।’

দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসায় জোর

কেন্দ্রীয় মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্রের রেসিডেন্ট সাইকিয়াট্রিস্ট রায়হানুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘সব পেশার লোকজনের মধ্যে কমবেশি মাদকসেবী আছেন। এটা জেনারালাইজড করা যাবে না। তবে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা দরকার।’

মাদকাসক্তির দূর করার চিকিৎসার ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, ‘নিরাময় শব্দটি আমরা বাদ দেয়ার প্রস্তাব করেছি। ১৯৯০ সালের আইনে আছে নিরাময় লিখতে হবে। তবে এটা তো নিরাময়যোগ্য না, চিকিৎসাযোগ্য।

‘আবার চিকিৎসাযোগ্য হলেও অনেকে যতটুকু ট্রিটমেন্ট নেয়া দরকার ততটুকু নেন না। যখন খুব ভালনারেবল পর্যায়ে যান তখন চিকিৎসা নিতে আসেন। তারপর আর খোঁজ থাকে না।’

দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার ওপর জোর দিয়ে রায়হানুল ইসলাম বলেন, ‘একবার ওষুধ খেলে কি ডায়াবেটিস বা হাইপারটেনশন ভালো হয়? হয় না। সে রকম এক মেয়াদে তিন মাস ভর্তি থেকে ট্রিটমেন্ট নিয়ে কোনো মাদকসেবী রোগী ভালো হন না। মুক্ত অবস্থায় যদি কেউ ১২ মাস মাদকের বাইরে থাকতে পারেন, তাহলে বলা যাবে মাদকের রোগী ভালো হয়েছেন। তবে বেশির ভাগ ভালো হয় না। ৬০-৮০ ভাগ পুরোপুরি রিকভার হয় না। এটা পুরো বিশ্বব্যাপী ডেটা, শুধু বাংলাদেশের জন্য না।’

পারিবারিক বন্ধন জোরদারের পরামর্শ

নারীদের মধ্যেও মাদকাসক্তির প্রবণতা বাড়ার পেছনে আধুনিক সময় দুর্বল পারিবারিক বন্ধনকে দায়ী করছেন বিশেষজ্ঞরা।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. মাহফুজা খানম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরিবারের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী একে অপরকে মডেল ভাবতে পারেন না। সন্তান তার প্যারেন্টকে মডেল ভাবার অবকাশ পায় না। কারণ এখনকার অনেক বাবা-মাই তাদের সন্তানদের সময় দিতে পারেন না। এসব পরিবারের মা-বাবার কাছে টাকা ইনকাম করাটা নেশায় পরিণত হয়। আর বাচ্চারা পরিস্থিতির কারণে জড়ায় ড্রাগের নেশায়।

‘শুধু তা-ই নয়, পরিবারের অন্য যেকোনো সদস্যই একে অপরের মডেল হিসেবে নিতে পারে না। এরা মডেল হিসেবে নিচ্ছে বাইরের কাউকে। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে মাদকে জড়াচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘এ প্রবণতা এখন পুরুষের তুলনায় নারীদের বেশি। তারা আবার শিক্ষিত নারী, আর্থিকভাবে সচ্ছল নারী। কারণ ড্রাগ কেনার জন্য পর্যাপ্ত সোর্স তাদের আছে। ধীরে ধীরে তাদের সংখ্যা ভয়ানকভাবে বাড়ছে।’

ড. মাহফুজা খানম বলেন, ‘আগে একটা সময় ছিল নারীর পক্ষে টাকা জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। এখন সময় পাল্টেছে। নারীরা স্বাবলম্বী হয়েছেন অনেক বেশি। তাছাড়া পারিবারিকভাবে অনেকে প্রতিষ্ঠিত থাকায় মেয়েরা চাইলেই আর্থিক ব্যাপারে সুবিধা পাচ্ছে। তবে তারা মানসিক সহযোগিতা-সহমর্মিতা পাচ্ছে না। হতাশা বাড়ছে। এই হতাশা থেকে অনেকে মাদকে জড়াচ্ছে।

‘শো আপ করার টেনডেন্সি আমাদের এখন বেশি। দরদ, শেয়ার বা বোঝাপড়ার টেনডেন্সি কম। নেগেটিভ ইগোটা বেশি হওয়ায় মাদকে জড়ানোর ঝুঁকি বাড়ছে।’

আরও পড়ুন:
‘মাদক নিয়ে বিরোধে’ ছুরিকাঘাতে হত্যা
নারী ডেটে ডাকলে যৌনতার সম্ভাবনা বেশি
ময়মনসিংহ থেকে রোনালডোর দেশে যাচ্ছেন তিন নারী ফুটবলার
মাসিক নিয়ে ভ্রান্তি ও অধিকারহীনতার শৃঙ্খলে নারী
নারীর সুরক্ষায় পশ্চিমবঙ্গ পুলিশে ‘জয়ীর দল’

মন্তব্য

বাংলাদেশ
Salinity Adolescents are stopping menstruation by taking pills

লবণাক্ততা: পিল খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখছে কিশোরীরা

লবণাক্ততা: পিল খেয়ে ঋতুস্রাব বন্ধ রাখছে কিশোরীরা প্রতীকী ছবি
ঋতুস্রাব চলাকালে লোনা ও নোংরা পানির ব্যবহার কমাতে জন্মনিয়ন্ত্রণকরণ পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ করছে দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূলের কিশোরীরা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিকিৎকের পরামর্শ ছাড়া মাসের পর মাস এ ধরনের পিল খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলগুলোতে পানির জন্য হাহাকার লেগেই আছে। গ্রীষ্মকালে তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। অতিরিক্ত লোনা পানির ব্যবহারে জরায়ু সংক্রান্ত অসুখে আক্রান্ত হচ্ছে নারীরা। এমন অবস্থায় ঋতুস্রাব চলাকালে লোনা ও নোংরা পানির ব্যবহার কমাতে জন্মনিয়ন্ত্রণকরণ পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ করছে উপকূলের কিশোরীরা। উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এর সত্যতা মিলেছে।

তবে বিষয়টি কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে মত দিয়েছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কিশোরীদের এভাবে পিল ব্যবহার তাদের মস্তিষ্কেও ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।

সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের ১৫ বছরের এক কিশোরী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রতিবেদককে জানায়, ৫ মাস ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণকরণ পিল খেয়ে নিজের মাসিক বন্ধ করে রেখেছে সে। বিষয়টি পরিবারের অগোচরে।

ওই কিশোরী বলে, ‘পিরিয়ডকালীন আমি সব সময় পুরোনো কাপড় ব্যবহার করি। সেগুলো ডোবার লোনা এবং অনেক নোংরা পানিতে ধুইতে হয়। এসব থেকে বাঁচতেই পাশের বাড়ির এক ভাবির কাছ থেকে সুখী বড়ি (সরকারিভাবে বিতরণ করা জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল) খেয়ে পিরিয়ড বন্ধ রাখি।

‘লোনা পানি ব্যবহার করায় আমার মাকে দীর্ঘদিন ধরে জরায়ু রোগে ভুগতে দেখেছি। আমি এই রোগে ভুগতে চাই না। এটা খুব কষ্টের। তাই পিরিয়ড বন্ধ রাখতে ভালোই লাগে।’

ওই কিশোরীর পরামর্শে তার আরও দুই বান্ধবীও একইভাবে পিল খেয়ে পিরিয়ড বন্ধ রাখে বলে জানায় সে।

গাবুরার নয় নম্বর সোরা গ্রামের দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নিউজবাংলাকে বলে, ‘প্যাড কেনা আমাদের জন্য সহজ না। এদিকে যে পুকুরে সবাই গোসল করে সেখানে মাসিকের (ঋতু) কাপড় ধোয়া যায় না। ধুতে হয় বাড়ির পাশের ডোবায় বা ঘেরের পানিতে। এই পানি অনেক লোনা আর নোংরা।

‘কয়েক মাস আগে শ্যামনগরে একটি কর্মশালায় গিয়ে জানতে পারি এই পানিতে ধোয়া কাপড় পিরিয়ডের সময় ব্যবহার করলে ক্ষতি হতে পারে। সেখানে কয়েকজন মেয়ে বলেছিল তারা পরীক্ষার সময় পিল খেয়ে মাসিক বন্ধ করে।

‘আমিও বাড়িতে এসে মায়ের বড়ি (পিল) চুরি করে খেয়ে দেখি। এভাবে কয়েক মাসই পিরিয়ড বন্ধ রেখেছি। এতে করে মাসের ওই সময়ে লোনা পানির ব্যবহার কিছুটা হলেও কম করতে হয়।’

অবস্টেট্রিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকোলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশ (ওজিএসবি) এর মহাসচিব ডা. ফারহানা দেওয়ান জানান, এভাবে চিকিৎসকের পরামর্শ না নিয়ে নিয়মিত পিল খাওয়া কিশোরীদের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলবে।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের গাইনি ও অবস্টেট্রিক বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ডা. ফারহানা বলেন, ‘কিশোরী মেয়েরা যদি প্রেসক্রিপশন ছাড়া পিল খায়, অবশ্যই সেটা ঠিক নয়। আমরা যখন ওরাল পিল কাউকে দিই, তখন তার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় রাখি। পিলের জন্য সে যোগ্য কি না পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়ে তারপর তা (পিল) খাওয়ার পরামর্শ দিই।

‘এখন কেউ যদি শুধু পিরিয়ড বন্ধ করার জন্য পিল খায় সেটা ঠিক নয়। কারণ ওষুধের বিভিন্ন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও রয়েছে।

‘পিল খেয়ে এক মাস পিরিয়ড বন্ধ করা যেতে পারে। তবে দিনের পর দিন পিরিয়ড বন্ধ রাখলে তার ব্রেইনে যেখান থেকে স্টিমুলাস আসে, সেখানে নেগেটিভ ইফেক্ট হবে। একটা সময়ে তার নিয়মিত পিরিয়ড হবে না। যা তাকে বন্ধ্যাত্ব পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারে।’

স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, একটি পিলের পাতায় ২১টি সাদা এবং সাতটি লাল ট্যাবলেট থাকে। একটানা ২১টি সাদা ট্যাবলেট খেতে বলা হয়। এরপর সাত দিন গ্যাপ দিতে হয়। ওই সাত দিনে সাধারণত মেয়েদের পিরিয়ড হয়। এ সময় লাল ট্যাবলেটগুলো খাওয়া যায়। কিন্তু কেউ যদি ওই সাত দিন লাল ট্যাবলেট না খেয়ে আবার সাদা ট্যাবলেট শুরু করে তাহলে তার পিরিয়ড বন্ধ থাকবে।

এসব এলাকায় পিলের বিতরণ কিছুটা বেড়েছে বলে জানান স্বাস্থ্যকর্মীরা। তবে সেটা কিশোরীদের পিল খাওয়ার কারণে কি না সে বিষয়ে স্পষ্ট করে বলতে চাননি তারা।

কৈখালী ইউনিয়নের পরিবার কল্যাণ সহকারী মনিরা জামিলা নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এসব এলাকায় জন্মনিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবে বড়ি (পিল) সবচেয়ে জনপ্রিয়। সাধারণত বিবাহিত মেয়েদেরই বড়ি সরবারহ করি। তবে অনেক সময় বোন, ভাবি, মা, চাচিদের জন্য কিশোরী মেয়েরা এই বড়ি সংগ্রহ করতে আসে।’

২০১৪ সালে বাংলাদেশ সরকার এবং আইসিডিডিআরবির চালানো ন্যাশনাল হাইজিন বেসলাইন সমীক্ষার প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে, বাংলাদেশে ৮০ শতাংশেরও বেশি নারী এবং কিশোরী তাদের মাসিকের সময় পুরোনো কাপড়ের টুকরা ব্যবহার করেন।

ওই সার্ভেতে বলা হয়, দেশের ৪০ শতাংশ মেয়ে মাসিক ঋতুচক্রের সময় তিন দিন স্কুলে যায় না। এই ৪০ শতাংশের তিন ভাগের এক ভাগ মেয়ে জানিয়েছে, স্কুলে না যাওয়ার কারণে তাদের লেখাপড়া ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

২০১৯ সালে প্রকাশিত অন্য একটি গবেষণায় বলা হয়, দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় এলাকার নারী ও কিশোরীরা মাসিকের সময় ব্যবহৃত কাপড় লবণ পানিতে ধুয়ে আবারও সেটি ব্যবহার করেন। এভাবে বারবার লোনা পানিতে মাসিকের কাপড় ধোয়া এবং সেই কাপড়ের ঘন ঘন ব্যবহার মেয়েদেরকে স্বাস্থ্যগত হুমকির মধ্যে ফেলে। এগুলো কখনও কখনও চর্মরোগ এবং অন্যান্য যৌন সমস্যার জন্যও দায়ী।

তিনটি বাংলাদেশি সংস্থা এ সমীক্ষাটি চালিয়েছে।

অভিভাবকরা বলছেন, প্রতিদিনের মৌলিক চাহিদা মেটাতেই যেখানে হিমশিম, সেখানে মাসে মাসে মেয়েদের জন্য ১০০-১৫০ টাকার স্যানিটারি প্যাড কেনা বেশ কষ্টসাধ্য।

কয়রার উত্তর বেদকাশী ইউনিয়নের হাজতখালী গ্রামের লক্ষ্মী রাণী মণ্ডল নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরিবার নিয়ে বেড়িবাঁধের ওপর ঘর বেঁধে থাকি। এখানে তিন বেলা খাবার জোগাড় করাই যেখানে কষ্টসাধ্য, সেখানে মেয়ের জন্য প্যাড কেনার কথা কল্পনাও করতে পারি না।’

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রান্তিক এসব কিশোরীকে এই স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় কিশোরীদের পাশাপাশি অভিভাবকদেরকেও সচেতন করতে হবে। স্যানিটারি প্যাড সহলজলভ্য করতে হবে। প্রয়োজনে প্রান্তিক মেয়েদের জন্য সরকারিভাবে প্যাড বিতরণের পক্ষে মত দেন অনেকে।

আরও পড়ুন:
মেনস্ট্রুয়াল কাপ নিয়ে ট্যাবু ভাঙতে আলোচনা

মন্তব্য

উপরে