পৌষে বিরল শিলাবৃষ্টি দেখল দেশ

player
পৌষে বিরল শিলাবৃষ্টি দেখল দেশ

বৃষ্টির সঙ্গে পড়া শিলা। ছবি: নিউজবাংলা

আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম বলেন, ‘ভূমি থেকে ওপরে উঠতে থাকলে তাপমাত্রা প্রতি কিলোমিটারে ৫-৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যেতে পারে। সাধারণত পাঁচ-ছয় কিলোমিটারের মধ্যে মাইনাস তাপমাত্রা শুরু হয়। এই অবস্থায় বায়ুতে থাকা পানি ওই শীতল বায়ুর সংস্পর্শে বরফ জমাট বাঁধতে শুরু করে। একপর্যায়ে বরফখণ্ডগুলো ওজনের কারণে বায়ুপ্রবাহ থেকে আলাদা হয়ে বৃষ্টির সঙ্গে নিচের দিকে পড়তে থাকে।’

পৌষের শেষ দিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও বগুড়ায় শিলাবৃষ্টিতে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে ফসলের। আবহাওয়াবিদরা বলছেন, দেশে সাধারণত বৈশাখ মাসে বৃষ্টির সঙ্গে শিলা পড়লেও পৌষের শীতে এ ঘটনা বিরল, তবে অস্বাভাবিক নয়।

আবহাওয়াবিদ শাহিনুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বিষয়টির ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

তিনি বলেন, ‘ঝড়ো আর সংকটপূর্ণ আবহাওয়ায় যখন শক্তিশালী বায়ুপ্রবাহ ওপরের দিকে উঠতে থাকে, তখন জলীয় বাষ্প তাপ হারিয়ে মেঘে রূপান্তরিত হয়। সেই মেঘ যখন পরিবেশগত কারণে আরও ওপরে ওঠে, তখন তৈরি হয় শিলা বা বরফখণ্ড। একে বলা হয় পরিচালন প্রক্রিয়া। এই ধাপে মেঘের অগ্রভাগ ১০-১৪ কিলোমিটার পর্যন্ত উঠতে পারে।

‘ভূমি থেকে ওপরে উঠতে থাকলে তাপমাত্রা প্রতি কিলোমিটারে ৫-৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস কমে যেতে পারে। সাধারণত পাঁচ-ছয় কিলোমিটারের মধ্যে মাইনাস তাপমাত্রা শুরু হয়। এই অবস্থায় বায়ুতে থাকা পানি ওই শীতল বায়ুর সংস্পর্শে বরফ জমাট বাঁধতে শুরু করে। একপর্যায়ে বরফখণ্ডগুলো ওজনের কারণে বায়ুপ্রবাহ থেকে আলাদা হয়ে বৃষ্টির সঙ্গে নিচের দিকে পড়তে থাকে। ওই দুই জেলার আবহাওয়ায় এমনটা ঘটে থাকতে পারে।’

চাঁপাইনবাবগঞ্জে বুধবার রাতে শিলাবৃষ্টি হয়। এতে সরিষা, পেঁয়াজ, মসুরসহ ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘সদর ও শিবগঞ্জ উপজেলায় শিলাবৃষ্টি হয়েছে। এতে বোরো বীজতলা ২৪ হেক্টর, আলু ৫ হেক্টর, গম ৫১ হেক্টর, সরিষা ৩৬৫ হেক্টর, ডালজাতীয় ফসল ১২ হেক্টর, পেঁয়াজ ১৫৮ হেক্টর, শাকসবজি ১৬৮ হেক্টর, স্ট্রবেরি এক হেক্টরসহ সব মিলিয়ে ৮২১ হেক্টর জমিতে ক্ষতি হয়েছে। আগামীতে ক্ষতিগ্রস্তরা প্রণোদনায় অগ্রাধিকার পাবেন।'

শিলাবৃষ্টি হয়েছে বগুড়ায়ও। সদর উপজেলার পাশাপশি শিবগঞ্জ, গাবতলী, সারিয়াকান্দি ও সোনাতলায় বুধবার রাতে বৃষ্টির সঙ্গে শিলা পড়েছে।

আবহাওয়া অফিসের সহকারী পর্যবেক্ষক আশিকুর রহমান জানান, দুই দফায় বৃষ্টি হয়েছে ১৬ মিলিমিটার। প্রথমে রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত ১৫ মিলিমিটার। পরে আবার রাত ৩টা থেকে ৩টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত এক মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। দুবারই বৃষ্টির সঙ্গে শিলা পড়েছে। এতে সরিষা ও আলু আবাদে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মানবদেহে শূকরের হৃৎপিণ্ডের নেপথ্যে যে মুসলিম

মানবদেহে শূকরের হৃৎপিণ্ডের নেপথ্যে যে মুসলিম

মানুষের শরীরে শূকরের হৃৎপিণ্ড স্থাপনের পথপ্রদর্শক হিসেবে বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছেন ডা. মুহাম্মদ মহিউদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

মানুষের শরীরে শূকরের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের ঘটনা ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে ডা. মহিউদ্দিনের জন্য মোটেও সহজে মেনে নেয়ার বিষয় ছিল না। ইসলামে শূকরের মাংস খাওয়াই শুধু নয়, এর সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতাও হারাম।

পাকিস্তানে সাগরতটের শহর করাচিতে ডা. মুহাম্মদ মহিউদ্দিন যখন বেড়ে উঠছিলেন, তখন ‘শূকর’ শব্দটি ঘিরে ছিল ধর্মীয় বিধিনিষেধ, বিশেষ করে নিজ বাড়িতে।

কখনও ভুল করে শব্দটি মুখে চলে এলে শাস্তির মুখোমুখি হওয়া ছিল অবধারিত। সেসব দিনের স্মৃতিচারণ করে ডা. মহিউদ্দিন বলেন, ‘এমন হলে আমার মা আমাকে কুলকুচিও করাতেন।’

তিনি জানান, তাদের বাড়িতে শূকর ছিল নিষিদ্ধ এক প্রাণী। তিনি প্রায়ই বাবা এবং ভাইদের সঙ্গে সিন্ধু প্রদেশের গ্রামাঞ্চলে বুনো শূকর হত্যায় অংশ নিয়েছেন।

কয়েক দশকের ব্যবধানে এই মহিউদ্দিনই মানুষের শরীরে শূকরের হৃৎপিণ্ড স্থাপনের পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ডের মেডিক্যাল সেন্টারে চলতি বছরের প্রথম সপ্তাহে যুগান্তকারী এই অস্ত্রোপচার হয়। মানুষের দেহে সম্পূর্ণ আলাদা প্রাণীর অঙ্গ প্রতিস্থাপন প্রক্রিয়াটির পরিচালক ছিলেন মহিউদ্দিন।

আরও পড়ুন: মানবদেহে শূকরের হৃৎপিণ্ড স্থাপন

আর যেখানে অস্ত্রোপচারটি হয়েছে সেই মেডিক্যাল সেন্টারের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপন প্রোগ্রামের পরিচালক ছিলেন বার্টলে পি গ্রিফিত।

মানবদেহে শূকরের হৃৎপিণ্ডের নেপথ্যে যে মুসলিম
ইউনিভার্সিটি অফ ম্যারিল্যান্ডের মেডিক্যাল সেন্টারে সম্প্রতি মানবদেহে শূকরের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের অস্ত্রোপচার হয়

মহিউদ্দিন আর গ্রিফিতের নেতৃত্বে চলা অস্ত্রোপচারটিতে জিনগত পরিবর্তন ঘটানো শূকরের হৃৎপিণ্ড সরবরাহ করেছে সুইডিশ বায়োটেক কোম্পানি রিভিভিকর। শূকরের এই হৃৎপিণ্ডটি ডেভিড বেনেট নামে ৫৭ বছর বয়সী এক ব্যক্তির শরীরে প্রতিস্থাপন করা হয়। বর্তমানে তিনি সুস্থ হয়ে উঠছেন।

মহিউদ্দিন বলেন, ‘অঙ্গসংকটের কারণে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ মানুষের মৃত্যু ঘটছে। এবার হিসাব করে দেখুন, বাকি দুনিয়ায় অঙ্গসংকটের কারণে আরও কত কত মানুষ মারা যাচ্ছে।’

তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কৌশল সফল হলে অঙ্গসংকটে থাকা পৃথিবীর প্রায় সব মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব হবে।

মানুষের জীবন বাঁচানোর এই যাত্রাটি মহিউদ্দিন শুরু করেন পাকিস্তানের ডো মেডিক্যাল কলেজে স্নাতক হওয়ার পর থেকেই। বক্ষ ও হৃৎপিণ্ড বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ১৯৯২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে পা রাখেন তিনি। পরে ইউনিভার্সিটি অফ পেনসিলভ্যানিয়ায় একটি ফেলোশিপ প্রোগ্রামে যুক্ত হন। সেখানেই একজন তাকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন গবেষণায় মনোযোগী হওয়ার পরামর্শ দেন।

সেই পরামর্শক বলেছিলেন, চিকিৎসক হিসেবে সারা জীবনে তুমি যে পরিমাণ মানুষকে সহযোগিতা করবে, অঙ্গ প্রতিস্থাপনবিদ্যায় সফল হলে তার চেয়ে আরও অনেক বেশি মানুষকে সাহায্য করার সুযোগ পাবে।

এরপর যা ঘটল, তা এক ইতিহাস। মহিউদ্দিন শিগগিরই এক প্রাণীর অঙ্গ অন্য প্রাণীতে প্রতিস্থাপনে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

তবে বিষয়টি নিয়ে প্রচুর দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগেছেন তিনি। কেবলই মনে হতো এ বিষয়টিকে কোনোভাবেই মানুষের চিকিৎসায় হাসপাতাল পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না।

মানবদেহে শূকরের হৃৎপিণ্ডের নেপথ্যে যে মুসলিম
শূকরের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের পর ডেভিড বেনেটের সঙ্গে ডা. মুহাম্মদ মহিউদ্দিন

সে যা-ই হোক, অবশেষে কোনো প্রাণীর হৃৎপিণ্ড মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন সম্ভব হয়েছে। আর অস্ত্রোপচারের ১৬ দিন পরও শূকরের হৃৎপিণ্ড নিয়ে দিব্যি সুস্থ আছেন বেনেট। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে, তার শরীর ওই হৃৎপিণ্ডটিকে সাদরে গ্রহণ করেছে।

তবে মানুষের শরীরে শূকরের হৃৎপিণ্ড প্রতিস্থাপনের ঘটনা ধর্মপ্রাণ মুসলিম হিসেবে ডা. মহিউদ্দিনের জন্য মোটেও সহজে মেনে নেয়ার বিষয় ছিল না। ইসলামে শূকরের মাংস খাওয়াই শুধু নয়, এর সঙ্গে কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতাও হারাম।

সবচেয়ে বড় ব্যাপার, মহিউদ্দিন নিজের পরিবার থেকেই নানা ধরনের বাধা-বিপত্তির মুখে পড়েছেন। তার বাবা প্রায়ই প্রশ্ন করতেন, ‘এই প্রাণীটাকে কেন তুমি ব্যবহার করছ? অন্য কোনো প্রাণী দিয়ে এটা করার চেষ্টা কেন করছ না?’

মহিউদ্দিন অবশ্য বাবার পরামর্শ মেনে অন্য প্রাণী দিয়ে এটা করা যায় কি-না সে চেষ্টা করেছিলেন। তবে এ ক্ষেত্রে শূকরের জিনগত বৈশিষ্ট্যগুলোই আদর্শ প্রমাণিত হয়।

মানবদেহে শূকরের হৃৎপিণ্ডের নেপথ্যে যে মুসলিম

তিনি জানান, শূকরের জিনগুলোকে এমনভাবে পরিবর্তন করা গেছে, যা অনেকটা মানুষের জিনের কাছাকাছি পর্যায়ে ছিল। ফলে শূকরের হৃৎপিণ্ড কোনো মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করার পর নিয়মমাফিক কিছু ওষুধ সেবন করে ওই অঙ্গটির কার্যক্ষমতা বজায় রাখা সম্ভব। জিনগত এই পরিবর্তন ঘটানো না গেলে অঙ্গটিকে শিগগিরই প্রত্যাখ্যান করত মানুষের শরীর।

ইসলামে শূকর নিয়ে নানা বিধিনিষেধ থাকলেও মুসলিম বিশ্বের বাইরে এ নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই। মহিউদ্দিন আমেরিকায় অবস্থান করায় শূকর নিয়ে তার গবেষণাটি বেশ সহজ হয়।

তবে পরিবারের উদ্বেগ আর নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস মহিউদ্দিনের মনে শূকরের ব্যবহার নিয়ে অসংখ্যবার প্রশ্ন তুলেছে। তিনি বলেন, ‘আমি ইসলামের সব নীতি মেনে চলার চেষ্টা করি। তাই এ বিষয়ে আমার মনে সব সময়েই উদ্বেগ ছিল। আমি প্রায়ই শূকর নিয়ে গবেষণাটি চালিয়ে যেতে যুক্তি খোঁজার চেষ্টা করতাম।’

সন্দেহ দূর করার জন্য তিনি বিশ্বের বেশ কয়েকজন বড় ধর্মীয় পণ্ডিতের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন। সব শেষে যে সারমর্মটি দাঁড়ায় তা হলো, ‘আল্লাহর কাছে একজন মানুষের জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় কিছু নেই।’

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন

চাঁদে আছড়ে পড়ছে ইলন মাস্কের রকেট

চাঁদে আছড়ে পড়ছে ইলন মাস্কের রকেট

এটিই হতে যাচ্ছে মানব ইতিহাসে প্রথম কোনো রকেট চাঁদে গিয়ে বিধ্বস্ত হবার ঘটনা। ছবি: সংগৃহীত

মানবজাতিকে মাল্টিপ্ল্যানেটারি স্পিসিসে পরিণত করার ইলন মাস্কের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দূরের গ্রহের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্যাটেলাইট পৌঁছে দেয়াই ছিল মিশনের উদ্দেশ্য।

মঙ্গলে মানুষ পাঠাতে চান স্পেসএক্সের সিইও ও ইনফ্লয়েনশিয়াল বিলিয়নেয়ার ইলন মাস্ক। এ কথা সবারই জানা। শুধু তা-ই নয়, নাসার চাঁদে যাওয়ার মিশন প্রজেক্ট আর্টিমেসের সঙ্গেও যুক্ত স্পেসএক্স।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এবার আর্টিমেসের আগেই ইলন মাস্কের রকেট পৌঁছে যাচ্ছে চাঁদে।

যদিও এটি কোনো চন্দ্রাভিযান নয়। ২০১৫ সালে স্পেসএক্সের ফ্যালকন-৯ রকেট মহাকাশে গমন করে। তার অভিযান ছিল পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বেরও ৪ গুণ বেশি দূরে। মানবজাতিকে মাল্টিপ্ল্যানেটারি স্পিসিসে পরিণত করার ইলন মাস্কের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দূরের গ্রহের আবহাওয়া পর্যবেক্ষণের জন্য একটি স্যাটেলাইট পৌঁছে দেয়াই ছিল মিশনের উদ্দেশ্য।

কিন্তু মিশন শেষ করার পর পর্যাপ্ত জ্বালানির অভাবে রকেটটি আর পৃথিবীতে ফেরত আসতে পারেনি। মাধ্যাকর্ষণ শক্তির বলয়ে আটকে এটি মহাকাশেই অবস্থান করতে থাকে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানী জোনাথান ম্যাকডয়েল বলেছেন, এটিই হতে যাচ্ছে মানব ইতিহাসে প্রথম কোনো রকেট চাঁদে গিয়ে বিধ্বস্ত হওয়ার ঘটনা। যদিও মহাকাশ বিজ্ঞানে এর প্রভাব সামান্য।

জোতির্বিজ্ঞানীরা বলছেন, আগামী ৪ মার্চ চাঁদে আছড়ে পড়বে মহাকাশ যানটি।

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন

বিয়েতে মৃত বাবার ‘অবতার’ করবেন আশীর্বাদ

বিয়েতে মৃত বাবার ‘অবতার’ করবেন আশীর্বাদ

দিনেশ ও জনগানন্দিনীর অবতার। যদিও বিয়েতে ঐতিহ্যবাহী পোষাকেই দেখা যাবে তাদের। ছবি: টার্ডিভার্স।

বর দিনেশ বলেন, ‘আমার শ্বশুর গত বছরের এপ্রিলে মারা গেছেন। তাই আমি তার থ্রিডি অবতার তৈরি করেছি; যা উনার মতো দেখতে। তিনি অনুষ্ঠানে আমাদের দুই জনকে আশীর্বাদ করবেন।’

তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ের বাসিন্দা দিনেশ শিবকুমার পদ্মাবতী ও তার হবু স্ত্রী জনগানন্দিনী রামস্বামীর ইচ্ছা ধুমধাম করে নিজেদের বিয়ের আয়োজনটা সারবেন। কিন্তু করোনার তৃতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত ভারতে এমন আয়োজন একেবারেই নিষিদ্ধ। সর্বোচ্চ ১০০ জনকে আমন্ত্রণ করার অনুমতি আছে রাজ্য সরকারের।

তাই বলে স্বপ্ন অধরা থেকে যাবে?

আগামী মাসের আয়োজন নিয়ে বিকল্প ভাবতে থাকেন দিনেশ- জনগানন্দিনী। এক পর্যায়ে মাথায় আসে, প্রযুক্তির সহায়তায় বাস্তবায়ন করবেন স্বপ্ন।

সিএনএন এর খবরে বলা হয়েছে, বিয়ের নিরাপদ ভেন্যু হিসেবে তারা বেছে নিয়েছেন এমন এক জায়গা, যেখানে প্রশাসন কিংবা করোনা, কারও হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। ভেন্যুটি হলো হালের আলোচিত ‘মেটাভার্স’। সেখানে তারা এক সঙ্গে দুই হাজার মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।

মেটাভার্স এমন এক ভার্চুয়াল দুনিয়া যেখানে অগুমেন্টেড রিয়্যালিটি, নানা রকম অবতার, নানা কীর্তিকলাপ মিলেমিশে রয়েছে। ১৯৯২ সালে কল্পবিজ্ঞান লেখক নীল স্টিফেনসন প্রথম ‘মেটাভার্স’ শব্দটি ব্যবহার করেন তার ‘স্নো ক্র্যাশ’ উপন্যাসে। পরে অবশ্য অনেক সিনেমায় দেখা গেছে মেটাভার্স।

নিজেদের হ্যারি পটার ভক্ত দাবি করেন এই যুবক-যুবতী। তাই তো বিয়ের জন্য হগওয়ার্ট থিম বেছে নিয়েছেন তারা। হ্যারি পোর্টারের একটি সিরিজে হগওয়ার্ড নামের একটি স্কুলে মেটাভার্সের অবাক দুনিয়ার দেখা মিলেছিল।

২৪ বছরের বিজ্ঞানমনা দিনেশ ব্লকচেইন এবং ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো বিষয়গুলোতে আগ্রহী। মেটাভার্সে বিয়ের ভেন্যুকে হগওয়ার্ট থিমে সাজাবে স্টার্ট-আপ প্ল্যাটফর্ম ‘টার্ডিভার্স’। এ জন্য গুনতে হচ্ছে ১ লাখ ৫০ হাজার রুপি।

বিয়েতে মৃত বাবার ‘অবতার’ করবেন আশীর্বাদ
দিনেশ শিবকুমার পদ্মাবতী ও তার হবু স্ত্রী জনগানন্দিনী রামস্বামী। ছবি: দিনেশ

আমন্ত্রিতরা বিশ্বের যে কোনো প্রান্ত থেকে মোবাইল ফোন, ট্যাব বা ল্যাপটপ দিয়েই যুক্ত হতে পারবেন বিয়েতে। সবচেয়ে মজার বিষয় মেটাভার্সের কল্যাণে ভার্চুয়াল এই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথিরা কনে জনগানন্দিনীর প্রয়াত বাবাকেও দেখতে পাবেন।

বিয়েতে মৃত বাবার ‘অবতার’ করবেন আশীর্বাদ
জনগানন্দিনীর বাবার ভার্চুয়াল অবতার। ছবি: টার্ডিভার্স

দিনেশ বলেন, ‘আমার শ্বশুর গত বছরের এপ্রিলে মারা গেছেন। তাই আমি তার থ্রিডি অবতার তৈরি করেছি; যা উনার মতো দেখতে। তিনি অনুষ্ঠানে আমাদের দুই জনকে আশীর্বাদ করবেন।

‘মহামারির কারণে রিসিপশনে অনেক অতিথির সমাগম সশরীরে সম্ভব না। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, ঠিক আছে, বিয়ে হোক মেটাভার্সেই।’

কোথায় হবে বিয়ে?

মেটাভার্সে রিসিপসন হলেও, মূল আয়োজন হবে তামিলনাড়ুর কৃষ্ণগিরি জেলায় জনগানন্দিনীর গ্রামের বাড়িতে। উপস্থিত থাকবেন ঘনিষ্ঠজনরা।

সেখানের আনুষ্ঠানিকতা শেষের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মেটাভার্সের মাধ্যমে অতিথিরা আয়োজনে যোগ দিতে পারবেন। ঘুরে দেখার সুযোগ পারেন হগওয়ার্ট থিমের ভেন্যুটি। শুধু তাই নয়, এ সময়ে ইচ্ছামত ভার্চুয়াল অবতার ও পোশাক ধারণ করতে পারবেন অতিথিরা।

মেটাভার্সে বিয়ের আয়োজন আগেও হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে। আমন্ত্রিতদের সশরীরের পাশাপাশি ভার্চুয়ালিও আয়োজন উপভোগের ব্যবস্থা রেখেছিলেন ওই আমেরিকান দম্পতি।

মেটাভার্স কী

বিশ্বব্যাপী প্রযুক্তিখাতে এখন সবচেয়ে আলোচিত শব্দ ‘মেটাভার্স’।

মেটাভার্স একটি ভার্চুয়াল বিশ্ব, যেখানে যন্ত্রের মাধ্যমে নিজেকে যুক্ত করে, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে, যেকোনো কাজই করতে পারবেন একজন ব্যক্তি।

দ্য ম্যাট্রিক্স, রেডি প্লেয়ার ওয়ান ও ট্রনের মতো বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্রগুলোতে এমন ভার্চুয়াল বিশ্বের সঙ্গে পরিচিত হয়েছে মানুষ।

ফেসবুক প্রতিষ্ঠাতা জাকারবার্গের মতে, মেটাভার্সের মাধ্যমে যোগাযোগ, উদ্ভাবনসহ সব ধরনের কাজ করতে পারবে মানুষ। আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ১০০ কোটি মানুষের কাছে পৌঁছাবে এ প্রযুক্তি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মোবাইল ইন্টারনেটের উত্তরসূরী হতে যাচ্ছে মেটাভার্স।

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন

মানব মস্তিষ্কে চিপ লাগানোর দ্বারপ্রান্তে নিউরালিংক

মানব মস্তিষ্কে চিপ লাগানোর দ্বারপ্রান্তে নিউরালিংক

ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করছেন ইলন মাস্ক। ছবি: সংগৃহীত

গত বছরের ডিসেম্বরে ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে ইলন মাস্ক জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের কোনো একসময়ে নিউরালিংক মানবদেহে চিপ স্থাপন করবে।

মানব মস্তিষ্কে চিপ বসানোর জন্য অনেক দিন ধরেই কাজ করে যাচ্ছে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান নিউরালিংক।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য পরিচালক নিয়োগ দিচ্ছে নিউরালিংক।

যুক্তরাষ্ট্রের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন ডিভাইস ট্রায়ালের আগে সাধারণত ট্রায়াল ডিরেক্টর নিয়োগ করে থাকে।

ধারণা করা হচ্ছে, নিউরালিংক মানব মস্তিষ্কে চিপ স্থাপনের খুব কাছাকাছি চলে গেছে।

ডিরেক্টরের দায়িত্ব সম্পর্কে বলা হয়েছে, নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে সৃজনশীল একদল ডাক্তার ও উচ্চমানের ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কাজ করতে হবে।

এর আগে গত বছরের ডিসেম্বরে ওয়ালস্ট্রিট জার্নালকে ইলন মাস্ক জানিয়েছিলেন, ২০২২ সালের কোনো একসময়ে নিউরালিংক মানবদেহে চিপ স্থাপন করবে।

যদিও ২০১৯ সাল থেকে প্রতি বছরই ইলন মাস্ক বলে আসছেন মানবদেহে চিপ স্থাপনের কথা। সম্ভবত এ বছরই বাস্তবে রূপ পাচ্ছে মাস্কের স্বপ্নের।

ইতিমধ্যে শূকর ও বানরের মস্তিষ্কে নিউরালিংক ডিভাইস সফলতার সঙ্গে স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি দাবি করছে, ডিভাইসটি স্থাপন ও অপসারণ সম্পূর্ণ নিরাপদ।

গত বছরের এপ্রিলে নিউরালিংক পেইজা নামের এক বানরের ভিডিও প্রকাশ করে। যেখানে দেখা যায়, কোনো ধরনের স্পর্শ ছাড়াই মস্তিষ্ককে ব্যবহার করে পেইজা কম্পিউটারে পিংপং গেম খেলছে।

ভিডিওটিতে দেয়া ভয়েসওভারে বলা হয়, ‘নিউরালিংক তার ব্রেইন চিপের মাধ্যমে বানরের মোটর কর্টেক্স অঞ্চলে প্রতিস্থাপন করা দুই হাজারের বেশি সূক্ষ্ম তারের ইলেকট্রোড ব্যবহার করে মস্তিষ্ক থেকে বৈদ্যুতিক সংকেত রেকর্ড ও ডিকোডের কাজ করে, যা সরাসরি কম্পিউটার ডিভাইসে প্রেরণ করে।’

প্রতিষ্ঠানটির দাবি, ডিভাইসটি ভবিষ্যতে মানুষের মস্তিষ্কসংক্রান্ত বহু সমস্যার সমাধান করবে। স্মৃতিশক্তি হারিয়ে ফেলা, ব্রেইন ড্যামেজ, হতাশা, উদ্বেগ ও আসক্তির মতো সমস্যার সমাধান ছাড়াও বিভিন্ন নিউরোসংক্রান্ত সমস্যার সমাধান করতে পারবে।

এ ছাড়া প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ব্যক্তিও স্পর্শ ছাড়াই মোবাইল, কম্পিউটারের মতো ডিভাইস ব্যবহার করতে পারবে।

তবে ইলন মাস্কের দাবি আরও বিস্তৃত। ভবিষ্যতে নতুন কোনো ভাষা শেখার ক্ষেত্রে কিংবা কোনো দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে নিউরালিংক ডিভাইস মুহূর্তে তা মস্তিষ্কে আপলোড করে দেবে। এমনকি ব্রেইনকে কপি করা সম্ভব হবে বলেও আশাবাদী মাস্ক।

নিউরালিংক ব্রেইন মেশিন ইন্টারফেস (বিএমআই) বা ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস (বিসিআই) প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করে। এ ধরনের প্রযুক্তিতে মানব মস্তিষ্কের সঙ্গে সরাসরি কম্পিউটারের সংযোগ করে দেয়া হয়। ফলে শুধু মস্তিষ্ককে কাজে লাগিয়ে কম্পিউটার ব্যবহার করা সম্ভব।

ইতিমধ্যে বানর ও শূকরের মধ্যে ডিভাইসটি স্থাপন করে সফলতা পাওয়া গেছে। পেইজা নামের বানরটি নিউরালিংক ডিভাইসের মাধ্যমে নিজের মনকে কাজে লাগিয়ে পিংপং বল নামের গেম খেলতে সক্ষম হয়।

নিউরালিংক ডিভাইস মূলত ব্রেইন কম্পিউটার ইন্টারফেস প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তি মানব মস্তিষ্ককে সরাসরি কম্পিউটারের সঙ্গে সংযোগ করিয়ে দিতে পারে। ফলে কোনো শারীরিক কর্মকাণ্ড ছাড়াই শুধু চিন্তা করে কম্পিউটারের মতো ডিভাইসকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন

দীর্ঘ অনশনে কী ঘটে শরীরে?

দীর্ঘ অনশনে কী ঘটে শরীরে?

অনশনের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে শরীর ও মনস্তত্ত্বে। গ্রাফিক্স: সংগৃহীত

তিন দিনের অনশনের পর মানবদেহ নিজের পেশিতে থাকা প্রোটিন ব্যবহার করে কোষের সক্রিয়তা বজায় রাখার প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ সংগ্রহ করে। এতে করে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট বা খনিজ যেমন, পটাশিয়ামের মাত্রা দেহে ভয়ংকর পরিমাণে কমে যায়। একই সঙ্গে দেহ চর্বি ও পেশির আয়তন হারিয়ে ফেলে।

সামাজিক বা রাজনৈতিক কঠোর আন্দোলনে অনশন বিশ্বজুড়ে একটি প্রচলিত হাতিয়ার। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যবিরোধী আন্দোলনেও অনশন কর্মসূচি পালন করছেন একদল শিক্ষার্থী।

সোজাসাপ্টা কথায় অনশন হচ্ছে না খেয়ে থাকা। অনশনকারীরা তাদের দাবি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত খাবার না খেতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।

রাজনৈতিক ও সামাজিক আন্দোলনের হাতিয়ার এই অনশনে শরীরে কী প্রভাব পড়ে এবং অনশনে মৃত্যুঝুঁকি কতটা সে বিষয়ে বৈজ্ঞানিক গবেষণা পর্যালোচনা করেছে নিউজবাংলা।

দেখা গেছে অনশনে মৃত্যুর নজির খুব বেশি না থাকলেও মানবশরীর ও মনস্তত্ত্বে এ ধরনের কর্মসূচির প্রভাব ব্যাপক।

যুক্তরাজ্যের ডিপার্টমেন্ট অফ হেলথের সহযোগিতায় ২০০৮ সালে দেশটির অন্যতম শীর্ষ মেডিক্যাল জার্নাল দ্য ল্যানসেটে প্রকাশিত হয় অনশন নিয়ে একটি প্রতিবেদন।

সেখানে বলা হয়, ‘সুস্বাস্থ্যের অধিকারী কেউ অন্তত ছয় থেকে আট সপ্তাহ কম খাবার খেয়ে বা না খেয়ে থাকতে পারেন। তবে যাদের স্বাস্থ্য খারাপ তারা তিন সপ্তাহের মধ্যে মারা পড়তে পারেন।

‘আর পানি ছাড়া অবস্থা খুব দ্রুত খারাপের দিকে যেতে পারে। আবহাওয়া উষ্ণ থাকলে সাত থেকে ১৪ দিনের মধ্যে মৃত্যুও হতে পারে।’

সবচেয়ে দীর্ঘ অনশন

ভারতের ‘আয়রন লেডি অফ মনিপুর’ খ্যাত ইরম চানু শর্মিলা প্রায় ১৬ বছর অনশন করেছিলেন। ‘আর্মড ফোর্সেস অ্যাক্ট নাইন্টিন ফিফটি এইট’ এর প্রতিবাদে তিনি ২০০০ সালের ৫ নভেম্বর অনশন শুরু করেন। শেষ করেন ২০১৬ সালের ৯ আগস্ট।

কারাগারে খাবার ও পানি গ্রহণে অস্বীকৃতি জানানোয় প্রায় পুরোটা সময় তাকে নাকে নল দিয়ে জোর করে খাবার দেয়া হয়েছে।

তবে একেবারেই খাবার গ্রহণ না করে অনশনের রেকর্ড ববি স্যান্ডের। বিতর্কিত আইরিশ রিপাবলিক আর্মির এ সদস্য কারাগারে টানা ৬৬ দিন না খেয়ে ছিলেন। মৃত্যুর আগে তিনি কোমায় চলে যান।

ক্ষুধার কষ্ট বেশিক্ষণ থাকে না

যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া কারেকশনাল হেলথ কেয়ার সার্ভিসেস বলছে, অনশন বা না খেয়ে থাকার যে কষ্ট সেটা দুই বা তিন দিন পর আর থাকে না।

কারণ, তিন দিনের অনশনের পর মানবদেহ নিজের পেশিতে থাকা প্রোটিন ব্যবহার করে কোষের সক্রিয়তা বজায় রাখার প্রয়োজনীয় গ্লুকোজ সংগ্রহ করে। এতে করে প্রয়োজনীয় ইলেকট্রোলাইট বা খনিজ যেমন, পটাশিয়ামের মাত্রা দেহে ভয়ংকর পরিমাণে কমে যায়। একই সঙ্গে দেহ চর্বি ও পেশির আয়তন হারিয়ে ফেলে।

দুই সপ্তাহ পর অনশনকারীদের দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হয়। প্রচণ্ড মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, হাত-পা নাড়তে বা কথা বলায় ধীরগতি, হৃদস্পন্দন কমে যাওয়া ও শীতের অনুভূতি হতে পারে।

দুই বা তিন সপ্তাহের মাথায় শরীরে থায়ামিনের (ভিটামিন বি-ওয়ান) মাত্রা কমে মারাত্মক স্নায়বিক সমস্যা সৃষ্টি করে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে বুদ্ধিবৃত্তি লোপ পাওয়া, দৃষ্টিশক্তি হ্রাস পাওয়া ও নড়াচড়ার সক্ষমতা কমে যাওয়া।

সাউথ আফ্রিকান সাংবাদিক ডেভিড বেরেসফোর্ড ববি স্যান্ডের মৃত্যু নিয়ে লস অ্যাঞ্জেলেস টাইমসে লিখেছেন। তিনি লেখেন, ‘মৃত্যুর আগে স্যান্ডস মাথার ভেতরে বিভিন্ন কিছুর প্রতিধ্বনি শুনতে পেতেন। স্ট্রোকের রোগীর মতো তার মুখ বেঁকে যায়। তার পায়ে কোনো অনুভূতি ছিল ন। শুধু ফিসফিসিয়ে কথা বলতে পারতেন।’

স্থায়ী জটিলতা ও মৃত্যু

এক মাস না খেয়ে থাকলে বা শরীরের ১৮ শতাংশ ওজন হারালে, মারাত্মক ও স্থায়ী জটিলতা দেখা দিতে পারে। পানি খেতে সমস্যা, দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হ্রাস পাওয়া, নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হওয়ার মতো সমস্যা দেখা যেতে পারে। বিকল হয়ে পড়তে পারে শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ।

৪৫ দিন পার হয়ে গেলে, হৃদযন্ত্র অচল হয়ে বা মারাত্মক কোনো সংক্রমণে মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই বেড়ে যায়।

অনশনের সময় শারীরিক ক্ষতির পাশপাশি মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এ সময় আগ্রাসী এবং আবেগী প্রতিক্রিয়া দেখা যাওয়া খুব সাধারণ ঘটনা।

জার্নাল অফ মেডিক্যাল এথিকসের মতে, ‘এই প্রভাবগুলো কখনো এমন পর্যায়ে যায় যে অনশনকারীরা না খেয়ে মারা যেতে পারেন।’

১৯৮১ সালের যে অনশনে ববি স্যান্ডস মারা যান, ওই অনশনে অংশ নেয়া আরও ১০ জন প্রাণ হারিয়েছিলেন। সাম্প্রতিক সময়ে অনশনে একসঙ্গে এত বেশি মৃত্যুর নজির নেই।

বাংলাদেশে সাম্প্রতিককালে অনশনের সময় অসুস্থ হয়ে মারা গেছেন এক পাটকলশ্রমিক। সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, খুলনার প্লাটিনাম জুট মিলের শ্রমিক আব্দুস সাত্তার ২০১৯ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। পাটকলশ্রমিক মজুরি কমিশন, বকেয়া মজুরিসহ ১১ দফা দাবিতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলশ্রমিকদের আমরণ অনশনে যোগ দিয়েছিলেন সাত্তার।

ইরানের রাজনৈতিক বন্দি ভাহিদ সায়েদি নাসিরি প্রায় ছয় মাস অনশনে থাকার পর ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর মারা যান।

নেপালের নাগরিক নন্দা প্রসাদ অধিকারী ছেলের খুনের বিচারের দাবিতে অনশন শুরু করেন ২০১৩ সালে। ৩৩৩ দিন অনশনের পর তিনি ২০১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর মারা যান।

এর আগে ভারতীয় শান্তিরক্ষী বাহিনী ও তামিল টাইগারদের মধ্যে শান্তিচুক্তির দাবিতে ১৯৮৮ সালের ১৮ মার্চ অনশন শুরু করেন শ্রীলঙ্কার গৃহবধূ পুপাথি কানাপাতিপিল্লাই। এর এক মাস পর ১৯ এপ্রিল তার মৃত্যু হয়।

দীর্ঘ অনশন শেষে খাওয়াটাও ঝুঁকিপূর্ণ

অনশন শেষ করার পর অনশনকারীদের খাওয়ানো ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ অনশনের সময় দেহের মেটাবলিজম বা বিপাক প্রক্রিয়ায় ব্যাপক পরিবর্তন আসে।

গ্যাস্ট্রোঅ্যান্টেরোলজি রিসার্চ অ্যান্ড প্র্যাকটিস জার্নালে ২০১১ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক সপ্তাহ না খেয়ে থাকা মানুষের দেহে ফের ইলেকট্রোলাইট ও পুষ্টি উপাদান প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত।

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন

সময়ের প্রান্তের দুটি ছায়াপথের সন্ধান

সময়ের প্রান্তের দুটি ছায়াপথের সন্ধান

জোতির্বিজ্ঞানীরা সদ্য আবিষ্কৃত দুটি ছায়াপথের নাম দিয়েছেন রেবেলস-১২-২ এবং রেবেলস-২৯-২। ছবিঃ সংগৃহীত

রেবেলস-১২-২ ও রেবেলস-২৯-২ ছায়াপথ দুটি এত দিন মহাজাগতিক ধূলিকণার মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। কোনো সন্দেহ নেই, এই আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা মহাজগতের শুরুর দিকের নক্ষত্র ও ছায়াপথগুলো সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারবে।

মহাবিশ্বের জন্ম হয়েছে বিগ ব্যাং-এর মাধ্যমে। আমাদের ছায়াপথ মিল্কিওয়ে কিংবা পার্শ্ববর্তী ছায়াপথ এন্ড্রোমিডা অথবা আমরা জানালা খুললে আকাশে যে নক্ষত্র দেখি, তার সবই উৎপত্তি বিগ ব্যাং-এর পরে।

এমনকি আমরা সময় বলতে যা বুঝি তারও জন্ম বিগ ব্যাং-এর ফলে।

বিজ্ঞানীদের ধারণা, আজ থেকে প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি বছর আগে বিগ ব্যাং হওয়ার ফলে মহাবিশ্ব জন্মলাভ করে। বিগ ব্যাং সংগঠিত হওয়ার একদম শুরুর দিকে স্থান ও সময়ের শুরুতে যে ছায়াপথগুলো জন্মলাভ করে সেগুলোর সাধারণত কসমিক ডাউন (মহাজাগতিক ভোর) সময়কার ছায়াপথ হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

অর্থাৎ কসমিক ডাউন ছায়াপথগুলোর জন্ম সময়ের উৎপত্তির একেবারে প্রান্তে।

এবার ভাইসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্থান ও সময়ের প্রান্তে জন্মলাভ করা এমন নতুন দুটি ছায়াপথ আবিষ্কার করেছেন বিজ্ঞানীরা। যাদের উৎপত্তি হয়েছিল মহাবিশ্ব সৃষ্টির ৮০ কোটি বছর পরে।

এই দুটি ছায়াপথ এত দিন মহাজাগতিক ধূলিকণার মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল। কোনো সন্দেহ নেই, এই আবিষ্কারের ফলে বিজ্ঞানীরা মহাজগতের শুরুর দিকের নক্ষত্র ও ছায়াপথগুলো সম্পর্কে আরো বিস্তারিত জানতে পারবে।

জাপানের ওয়াসেদা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রকৌশল গবেষণা প্রতিষ্ঠানের জোতির্বিজ্ঞানী ইয়োশিনোবু ফুদামোটো এবং জাপানের জাতীয় জোতির্বিজ্ঞান পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের (নাওজি) নেতৃত্বে বিজ্ঞানীরা প্রতিবেশী ছায়াপথগুলোর ওপর নজর রাখার সময় দুর্ঘটনাক্রমে দুটি ছায়াপথ থেকে আলাদা ধরনের বর্ণালি সংকেত দেখতে পান, স্বাভাবিক অতিবেগুনি রশ্মি (আলট্রা ভায়োলেট রে) থেকে অনেক বেশি উজ্জ্বল ছিল।

দলটি বলছে, ‌‘আমাদের গ্যালাক্সির উৎপত্তির সময়কে গণনা করার জন্য যে মাপকাঠি (অতিবেগুনি রশ্বিভিত্তিক) রয়েছে তা অসম্পূর্ণ।

২০১৯ সালের নভেম্বরে, ফুডোমোটো এবং তার সহকর্মীরা চিলির একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল ইন্টারফেরোমিটার অ্যাটাকামা লার্জ মিলিমিটার/ সাবমিলিমিটার অ্যারে (এএলএমএ) মহাবিশ্বের আদিম ছায়াপথগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন।

ফুডোমোটো ও তার সহকর্মীরা কাজ করেন রি-আয়োনাইজেশন-ইরা ব্রাইট ইমিশন লাইন সারভে (রেবেলস) নামের একটি প্রকল্পে। এই প্রকল্পের অধীনে তারা কসমিক ডাউনের সময়কার প্রায় ৪০টি ছায়াপথ নিয়ে অধ্যয়ন করছিলেন।

দলটি রেবেলেস-১২ ও রেবেলস-২৯ নামের দুটি ছায়াপথ পরীক্ষা করার সময় তারা কয়েক হাজার আলোকবর্ষ দূরে অবস্থিত দুটি নক্ষত্রের নিদর্শন উজ্জ্বল বর্ণালি সংকেত দেখতে পায়।

জোতির্বিজ্ঞানীরা সদ্য আবিষ্কৃত দুটি ছায়াপথের নাম দিয়েছেন রেবেলস-১২-২ এবং রেবেলস-২৯-২।

ধারণা করা হচ্ছে, মহাজাগতিক ধুলার আড়ালে কসমিক ডাউনের আরো পাঁচটি ছায়াপথ লুকিয়ে আছে।

ভাগ্যক্রমে আবিষ্কার হওয়া এই নতুন দুটি ছায়াপথের পরে জোতির্বিজ্ঞানীদের ধারণা মহাজাগতিক ধূলিকণার মেঘের আড়ালে কসমিক ডাউন যুগের আরও পাঁচটি ছায়াপথের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে। তাই বিজ্ঞানীরা জোর দিচ্ছেন মহাজাগতিক মেঘসমৃদ্ধ এলাকাগুলোতে পর্যবেক্ষণ বাড়ানোর দিকে।

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন

তিন মাস ইন্টারনেট না থাকলে কী হবে?

তিন মাস ইন্টারনেট না থাকলে কী হবে?

ইন্টারনেটবিহীন জীবন বাড়াতে পারে মনোসংযোগ। প্রতীকী ছবি

বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে আমরা যেভাবে পড়ি তা অনেকটা বুফে খাওয়ার মতো। প্লেটে প্লেটে নানা সুস্বাদু খাবার, কিন্তু এর কোনোটির স্বাদই আমরা পুরোপুরি নিতে পারি না।

২০১৮ সালের গ্রীষ্মে টানা তিন মাস ইন্টারনেট থেকে দূরে থাকার সংকল্প চেপে বসে ব্রিটিশ লেখক জোহান হ্যারির মনে। নিতান্ত খেয়ালের বশে হলেও এই অভিজ্ঞতা তাকে নতুন এক পৃথিবীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে।

স্বাভাবিকভাবেই অভ্যস্ত জীবনে হঠাৎ করে পরিবর্তন নিয়ে এলে মানুষ বেশ কিছু জটিলতার মুখোমুখি হয়। হ্যারির ক্ষেত্রে এই জটিলতা শুরু হয়ে যায় ইন্টারনেট ছেড়ে দেয়ার আগে- সিদ্ধান্ত নেয়ার পর থেকেই।

কারণ ইন্টারনেট ফিচারবিহীন একটি মোবাইল ফোন খুঁজে বের করতেই তাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। অবশেষে বোস্টনের এক দোকানি তাকে এমন একটি মোবাইল ফোন দেন যাতে ইন্টারনেটের গতি খুবই কম। দোকানি তাকে বললেন, ‘এই মোবাইল দিয়ে আপনি বড়জোর ইমেইল পড়তে পারবেন…।’

এ পর্যন্ত বলতেই হ্যারি দোকানিকে থামিয়ে দিয়ে বলেন, ‘ইমেইল তো ইন্টারনেটেরই অংশ। আমি তিন মাসের জন্য একদম অফলাইনে চলে যেতে চাই।’

হ্যারির পরিকল্পনা শুধু যে দোকানির বুঝতে সমস্যা হয়েছে তা নয়, হ্যারির বন্ধুরাও তাকে নিয়ে শুরুতে বিভ্রান্ত হয়েছেন।

‘চুরি যাওয়া মনোযোগ: কেন আপনি মনোযোগ দিতে পারেন না- এবং কীভাবে আমরা আরও গভীর চিন্তা করতে পারি’ শিরোনামে নতুন একটি বইয়ে হ্যারি এসব অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন। গত ২৫ জানুয়ারি বইটি প্রকাশিত হয়েছে।

বইয়ে হ্যারি লিখেছেন, ‘শুরুতে আমার পরিকল্পনা অন্যদের কাছে এতটাই উদ্ভট মনে হয়েছিল যে বারবার তাদেরকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হয়েছে।’

সে যা-ই হোক, কোনো প্রতিবন্ধকতাই হ্যারির পরিকল্পনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারেনি। কারণ ইন্টারনেটময় জীবন থেকে যেভাবেই হোক কিছুদিনের জন্য তিনি মুক্তি চাইছিলেন।

গবেষণা সংস্থা ডিএসকাউট-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে একজন মানুষ অন্তত ৩ ঘণ্টা ১৫ মিনিট সময় ইন্টারনেটে ব্যয় করেন। আর প্রতিদিন গড়ে আমরা ২ হাজার ৬১৭ বার মোবাইলের টাচস্ক্রিন স্পর্শ করি। এই অবিরাম সংযোগ আমাদের জীবন উন্নত করার বদলে বরং খারাপের দিকেই নিয়ে যাচ্ছে- এমনটাই মত গবেষকদের।

ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়ার গবেষকদের মতে, ইন্টারনেটের ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা আমাদের মনোযোগের ব্যাপ্তিকে অনেকাংশে কমিয়ে দিচ্ছে। এর ফলে নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে বেশির ভাগ মানুষ সর্বোচ্চ দুই মিনিট ১১ সেকেন্ড টানা মনোযোগ ধরে রাখতে পারছেন।

ইমেইল আর মেসেঞ্জারের আওয়াজ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নোটিফিকেশন আমাদের মনোসংযোগে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। যে বিষয় থেকে আমরা মনোযোগ হারাচ্ছি সেখানে ফিরে যেতে আমাদের অন্তত গড়ে ২৩ মিনিট সময় লাগছে।

পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতেই ম্যাসাচুসেটসের প্রিন্সটাউনে ছোট্ট একটি আবাস ভাড়া নেন ৪২ বছরের হ্যারি। এই জায়গাটি ছিল একেবারেই সঙ্গীবিহীন। ছিল না কোনো চাকরির যন্ত্রণা কিংবা বাচ্চাকাচ্চাও।

তাই হ্যারির এমন বিচ্ছিন্ন জীবন কারও ওপর কোনো প্রভাব ফেলেনি। শেষ পর্যন্ত তিনি একটি মোবাইল ফোনের খোঁজ পান, যাতে কোনো ধরনের ইন্টারনেট সংযোগ ছিল না। এ ধরনের মোবাইল খুব বয়স্ক ব্যক্তিদের জন্য তৈরি হয়, জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে যেন ব্যবহার করা যায়।

এক বন্ধু হ্যারিকে একটি ল্যাপটপ ধার দিয়েছিলেন, যার মধ্যে কোনো ওয়াইফাই সংযোগ ছিল না। ব্যাপারটা এমন যে, কোনো কারণে রাত ৩টার সময়ে ঘুম ভেঙে গেলে তিনি চাইলেও তখন ইন্টারনেটে প্রবেশ করতে পারবেন না।

তিন মাস ইন্টারনেট না থাকলে কী হবে?
তিন মাস ইন্টারনেটবিহীন কাটিয়েছেন ব্রিটিশ লেখক জোহান হ্যারি

ইন্টারনেটবিহীন জীবনের প্রথম সপ্তাহটি হ্যারির খুব বিক্ষিপ্ত আর ধোঁয়াশায় কেটেছিল। এ সময় তিনি মাঝে মাঝে স্থানীয় ক্যাফেতে বসে বই পড়েছেন, কখনও অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে কথাবার্তা বলেছেন। আর বেশির ভাগ সময় কেটেছে নিজের চিন্তার ভেতরে ডুব দিয়ে। আরেকটি বিষয় তিনি অনুভব করেছেন তা হলো- নীরবতা! বছরের পর বছর এই নীরবতা তার জীবনে ছিল অনুপস্থিত।

হ্যারির মনে হলো, ইন্টারনেটসহ মোবাইল ফোন আর ল্যাপটপ আনাড়ি বাচ্চাদের মতো, সারাক্ষণ শুধু চিৎকার চেঁচামেচি করে। ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মনে হয়, বাচ্চাগুলোকে একজন প্রতিপালকের দায়িত্বে দেয়া হয়েছে। ফলে তাদের চিৎকার আর বমির দৃশ্য চোখে পড়ছে না।

কিছুটা উদ্বেগও অবশ্য কাজ করছিল হ্যারির মধ্যে। মনে হচ্ছিল, না জানি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ইমেইল তিনি মিস করছেন কিংবা কোনো গুরুত্বপূর্ণ টুইট। কোনো গুরুত্বপূর্ণ লেখা হয়তো তার পড়ার অপেক্ষায় বসে আছে। এমনও কয়েক দিন গেছে, অবচেতনেই পকেটে থাকা মোবাইলে হাত চলে গেছে।

২০২১ সালে পিউ রিসার্চের এক জরিপ অনুযায়ী, আমেরিকার ৩১ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ নিরবচ্ছিন্নভাবে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ২০১৫ সালের জরিপে এই হারটি ছিল ২১ শতাংশ।

মজার ব্যপার হলো, ১৯৮৬ সালে একজন মানুষ টেলিভিশন, রেডিও এবং পড়াশোনার মধ্য দিয়ে এক দিনে গড়ে যে পরিমাণ তথ্যের মুখোমুখি হতেন তা ৪০টি সংবাদপত্রের সমপরিমাণ। তবে ২০০৭ সালের হিসাবে একজন মানুষ গড়ে প্রতিদিন ১৭৪টি পত্রিকার সমান তথ্যের মুখোমুখি হতেন। অর্থাৎ প্রতি আড়াই বছরে দ্বিগুণ পরিমাণ তথ্যের মুখোমুখি হয়েছে মানুষ। চমকপ্রদ এই তথ্যটি ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ার অধ্যাপক মার্টিন হিলবার্টের।

সেই হিসাবে আজকের দিনের মানুষ গড়ে ৭০০ পত্রিকার সমান তথ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন প্রতিদিন।

হিলবার্টের মতে, কোনো জৈবিক মস্তিষ্কের জন্য এক দিনে এ পরিমাণ তথ্যের মুখোমুখি হওয়া একটু বেশিই হয়ে যায়। এর ফলে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মানুষ শুধু কোনো বিষয়বস্তুর সারমর্মটুকুতে চোখ বুলায়। তথ্যের আধিক্যের জন্যই টুইট করা শিরোনামের ৭০ শতাংশই অপঠিত থেকে যায়। এমনকি যারা এগুলোকে রিটুইট করেন, তারাও ভেতরের খবরটুকু পড়ে দেখেন না।

বর্তমান ইন্টারনেট যুগে আমরা যেভাবে পড়ি তা অনেকটা বুফে খাওয়ার মতো। প্লেটে প্লেটে নানা সুস্বাদু খাবার, কিন্তু এর কোনোটির স্বাদই আমরা পুরোপুরি নিতে পারি না।

এর ফলে মানুষের বই পড়ার অভ্যাসও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। ১৯৯২ সালের হিসাবে শুধু আনন্দের জন্য বছরে অন্তত একটি বই পড়তেন আমেরিকায় এমন মানুষের সংখ্যা ছিল প্রায় ৬১ শতাংশ। ২০১৭ সালের হিসেবে এই সংখ্যাটি ৫৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

তা ছাড়া ২০০৩ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে আমেরিকানদের প্রাত্যহিক বই পড়ার সময় ২৮ মিনিট থেকে কমে ১৬ মিনিটে এসে ঠেকেছে।

২০১৮ সালের মধ্যে অবসরে গেম খেলা কিংবা কম্পিউটার ব্যবহারের সময় বেড়ে হয়েছে প্রতিদিন প্রায় ২৮ মিনিট।

হ্যারি লিখেছেন, ‘বই পড়া মানুষের জীবনে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই অভ্যাস মানসিক চাপ কমানোর পাশাপাশি জীবনকেও দীর্ঘায়িত করতে পারে। প্রতিদিন ৩০ মিনিট বই পড়া মানুষের আয়ুষ্কাল অন্তত দুই বছর বাড়িয়ে দিতে সক্ষম।’ তা ছাড়া এই বিষয়টি কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে মনোযোগী হওয়ার প্রশিক্ষণও দেয় মানুষকে।

হ্যারিকে নরওয়ের গবেষক অ্যান ম্যাঙ্গেন বলেছিলেন, ‘টাচস্ক্রিনে আমরা শুধু দেখি আর সারাংশে মনোযোগ দিই। অনেকটা চেরি ফল কুড়ানোর মতো। মানের চেয়ে পরিমাণকেই অগ্রাধিকার দিই।’

ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার শুরুর দিকেও এ ধরনের মানসিকতায় আটকে ছিলেন হ্যারি। তিনি পাগলের মতো চার্লস ডিকেন্সের বিষয়ে কোনো উদ্দেশ্য ছাড়াই পড়তে শুরু করেছিলেন।

তবে সেই তড়িঘড়ি অবস্থা থেকে হ্যারি শিগগিরই বেরিয়ে আসেন। প্রতিদিন সকালে তিনি তিনটি পত্রিকা কিনতেন এবং পড়তেন। পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ জানার জন্য তাকে পরের দিন সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো।

হ্যারির বিচ্ছিন্ন সময়ে ২০১৮ সালের জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যারিল্যান্ডের একটি পত্রিকা অফিসে পাঁচজনকে গুলি করে হত্যা করেন এক বন্দুকধারী। অন্য সময় হলে এই খবরটি সবার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই পেতেন হ্যারি। বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটিং করে ঘটনার আদ্যোপান্ত জেনে নিতেন। তবে আলোচিত সেই খবরটি পরদিন সকালে পেয়েছিলেন তিনি।

এ বিষয়ে হ্যারি লিখেছেন, ‘আমার যা জানার প্রয়োজন ছিল তা একটি মৃত গাছে (পত্রিকা) মাত্র ১০ মিনিট পড়েই জেনে গেলাম।’

সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হ্যারির উপলব্ধি হলো, তার জীবনে ইন্টারনেটের প্রয়োজন নেই বললেই চলে। ছয় বন্ধুর নম্বর তার ফোনে সেভ করা ছিল, যাতে জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ করা যায়। আর জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে তিনি ৯১১ নম্বরে ফোন করতে পারতেন।

এ ছাড়া কোনো বিষয়ে আগ্রহ হলে তিনি স্থানীয় লাইব্রেরিতে গিয়ে অনুসন্ধান করতেন। পরদিনের আবহাওয়ার খবর জানতে চাইলে তিনি শহরতলিতে আড্ডারত মানুষের কাছেই জেনে নিতেন।

ইন্টারনেট-বিচ্ছিন্ন অবস্থায় হ্যারি সবচেয়ে বেশি যা মিস করেছেন তা হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম।

২০১৮ সালে আগস্টের শেষ সপ্তাহে তিন মাসের ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতা শেষ করে আবারও বাকি পৃথিবীর সঙ্গে যুক্ত হন হ্যারি। তিনি ভেবেছিলেন, এ সময়ের মধ্যে তার ইমেইল হয়তো উপচে পড়ছে কিংবা বন্ধুবান্ধব ও পরিচিতরা তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছে। যদিও প্রত্যেক ইমেইলের জন্য স্বয়ংক্রিয় একটি উত্তর তিনি সেট করে রেখেছিলেন। যেখানে বলা হয়েছিল, পুরো গ্রীষ্মকাল তিনি যোগাযোগের বাইরে থাকবেন।

যা ভেবেছিলেন, তার কিছুই হয়নি শেষ পর্যন্ত। বলা যায়, ওই সময়টিতে কেউই তার খোঁজ নেননি। ইমেইল আর ইনবক্সে তিন মাসের যত বার্তা ছিল, তা দুয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পড়ে শেষ করে ফেলেন তিনি।

হ্যারি লিখেছেন, ‘পৃথিবী আমার অনুপস্থিতি খুব সহজেই মেনে নিয়েছে!’

ইন্টারনেট বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা নিয়ে আজকের দিনে হ্যারি পুরোপুরি বদলে গেছেন, বিষয়টি এমন নয়। তবে এটা ঠিক, তিনি নিজের মনোযোগকে ইন্টারনেট বিনোদনে ভাসিয়ে দিতে এখন দ্বিতীয়বার ভাবছেন।

আরও পড়ুন:
ফাল্গুনের শিলাবৃষ্টিতে ফসল নিয়ে দুশ্চিন্তা

শেয়ার করুন