আপিল বিভাগে নতুন বিচারক নিয়োগ কবে

আপিল বিভাগে নতুন বিচারক নিয়োগ কবে

আইনজীবীরা বলছেন, সপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগসহ হাইকোর্ট বিভাগেও বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে মামলার জটে একসময় বেসামাল হয়ে পড়বে বিচার বিভাগ। তবে আইনমন্ত্রী বলছেন, দেখা যাক।

করোনাভাইরাসে আদালত বন্ধ থাকায় একদিকে যেমন বাড়ছে মামলার জট, অন্যদিকে বয়সের সীমা পূর্ণ করে বিচারপতিদের অবসরে যাওয়ায় তৈরি হচ্ছে বিচারক সংকট। ১০ বছর আগে যেখানে সপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে বিচারপতি ছিলেন ১১ জন, গত এক দশকে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ জনে।

প্রয়োজনীয়সংখ্যক বিচারকের অভাবে আপিল বিভাগে এখন একটি মাত্র বেঞ্চে বিচারকাজ চলছে। বর্তমানে যে সংখ্যক মামলা রয়েছে, তা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে আপিল বিভাগে দ্রুত বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে তিনটি বেঞ্চ গঠন করা দরকার বলে মনে করছেন সিনিয়র আইনজীবীরা।

আইনজীবীরা বলছেন, সপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগসহ হাইকোর্ট বিভাগেও বিচারক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে মামলার জটে একসময় বেসামাল হয়ে পড়বে বিচার বিভাগ। তবে আইনমন্ত্রী বলছেন, দেখা যাক।

২০১৭ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিদায়, এরপর জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞার পদত্যাগ ছাড়াও বেশ কয়েকজন বিচারপতি অবসরে যাওয়ায় আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা কমতে থাকে। পরে একসঙ্গে তিনজন বিচারপতি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি। এর ফলে সে সময়ে সাত বিচারপতি মিলে আপিল বিভাগের দুটি বেঞ্চে বিচারিক কাজ পরিচালনা করে আসছিলেন। এরপর অবসরে চলে যান বিচারপতি জিনাত আরা, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে আরও দুইজন বিচারপতি নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি।

সম্প্রতি বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী অবসরে গেলে আপিল বিভাগের বিচারপতির সংখ্যা নেমে আসে পাঁচজনে।

পাঁচ বিচারপতি আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চে বিচারকাজ পরিচালনা করে আসছেন।

এই পাঁচজন হলেন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি নূরুজ্জামান ও বিচারপতি ওবায়দুল হাসান।

বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এ নিয়ে আমি আগেই বলেছি। বর্তমানে বিচার বিভাগে যে পরিমাণ মামলা আছে, তা নিষ্পত্তির জন্য বিচারকের সংখ্যা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সাপোর্টও বাড়াতে হবে।

‘কিন্তু দেখা যায় বিচার বিভাগের প্রতি সরকারের কেন যেন একটা অনীহা মনোভাব আছে। একসময় আপিল বিভাগে বিচারক ছিলেন ১১ জন। সেখানে এখন ৫ জন। আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারক থাকলে তিনটি বেঞ্চ হতে পারত। অথচ সেখানে একটি বেঞ্চে বিচারকাজ চলছে।’

তিনি বলেন, ‘আমি বারবার বলে আসছি, মামলার যে সংখ্যা আছে তা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য বা কীভাবে মামলার ভার থেকে কোর্টকে দ্রুত মুক্ত করা যায়, সে জন্য একটা তক্ষক কমিশন করা হোক। সেই কমিশনের প্রতিবেদন অনুযায়ী বিচার বিভাগের মামলা নিষ্পত্তির জন্য পদক্ষেপ নিতে পারবে। নতুবা জনগণ হতাশ হয়ে যাচ্ছে, বিচার পাচ্ছে না।

‘করোনার মহামারি, সব মিলিয়ে দেশে একটা অরাজক পরিস্থিতির তৈরি হবে। করোনা ছাড়াও স্বাভাবিকভাবে দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করতে বিচারক সংখ্যা যেভাবে বৃদ্ধি করা উচিত সরকার সেটা করছে না। সরকার এখানে চরম অবহেলা দেখাচ্ছে। এর ফলাফল ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।

‘সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন বিচার না পাওয়ার ধারণা সৃষ্টি হবে তখন একটি অরাজকতা সৃষ্টি হবে। দেশের জন্য এটা শুভ হবে না। দেশে যদি আইনের শাসন সঠিকভাবে না থাকে তাহলে সেখানে উন্নয়নের শুভ প্রতীকার মানুষ পায় না।’

আরেক সিনিয়র আইনজীবী মুনসুরুল হক চৌধুরী বলেন, অবশ্যই বিচারক নিয়োগ দেওয়া দরকার। আপিল বিভাগে তিনটা বেঞ্চ হওয়া উচিত। এটি অত্যন্ত জরুরি।

তিনি বলেন, মামলার জট কমাতে হলে এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে শুনানি করতে হলে বিচারক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। এটা শুধু আপিল বিভাগের জন্য নয়। হাইকোর্ট বিভাগেও বিচারক নিয়োগ দেওয়া জরুরি। এটা অনেক দিন আগেরই দাবি।

মুনসুরুল আরও বলেন, ‘আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ তো হাইকোর্ট বিভাগ থেকেই যাবে। ফলে হাইকোর্ট বিভাগেও বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া দরকার।’

যোগ্য ব্যক্তিকে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে দলমতনির্বিশেষে দক্ষ, যোগ্য, সৎ ব্যক্তিকেই বিবেচনা করা উচিত বলেও তিনি মনে করেন।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আপিল বিভাগের দুটি বেঞ্চ পরিচালনার জন্য বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া দরকার। আশা করছি অচিরেই বিচারপতি নিয়োগ দেবে সরকার। লকডাউনের কারণে হয়তো হচ্ছে না। লকডাউন উঠে গেলে আশা করি বিচারপতি নিয়োগ হবে।’

বিষয়টি নিয়ে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আনিসুল হকের কাছে প্রশ্ন করা হলে তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি জানি, আপিল বিভাগে বর্তমানে পাঁচজন বিচারপতি আছেন। দেখা যাক কী করা যায়।’

শিগগিরই নিয়োগ হবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ‘দেখি।’

সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা যায়, ১০ বছর আগেও সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারপতি কর্মরত ছিলেন। এরপর সর্বশেষ ২০১৭ সালের শুরুতেও আপিল বিভাগে ৯ জন বিচারপতি কর্মরত ছিলেন। ওই বছরের ১৪ মার্চ বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম ও ৭ জুলাই বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা অবসরে যান। এরপর ওই বছরের শেষের দিকে এসে পদত্যাগ করেন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা।

২০১৮ সালের ১ জানুয়ারি মারা যান বিচারপতি বজলুর রহমান ছানা। আর ফেব্রুয়ারি মাসে পদত্যাগ করে আরেকজন বিচারিপতি আব্দুল ওয়াহহাব মিঞা। এর ফলে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা দাঁড়ায় ৪ জনে। পরবর্তী সময়ে দুই দফায় পাঁচজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়া হলেও অনেক বিচারপতি অবসরে যাওয়ায় এখন বিচারপতির সংখ্যা আবার ৫ জনে দাঁড়িয়েছে।

আপিল বিভাগে কতজন বিচারপতি থাকবেন?

সংবিধানে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতির কোনো সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়নি। সংবিধান অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির পরামর্শ ও প্রয়োজন অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন সময়ে বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনজন বিচারপতি নিয়ে আপিল বিভাগে বিচারকাজ শুরু হয়। ২০০৯ সালে আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা ১১ জনে উন্নীত করে সরকার। ১৯৯৫ সালে আপিল বিভাগে চতুর্থবারের মতো বিচারক সংকট দেখা দিয়েছিল। এর আগে ১৯৭৩, ১৯৭৮ ও ১৯৮৫ সালে আপিল বিভাগে চারজন করে বিচারপতি কর্মরত ছিলেন।

সংবিধানের ৯৪ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ ও নিয়োগ করে থাকেন।

ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “প্রধান বিচারপতি (যিনি ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ নামে অভিহিত হইবেন) এবং প্রত্যেক বিভাগে আসন গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি যে সংখ্যক বিচারক নিয়োগের প্রয়োজনবোধ করবেন, সেই সংখ্যক অন্যান্য বিচারক লইয়া সুপ্রিম কোর্ট গঠিত হইবে।’ সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত বিচারপতি পদে থাকা যায়।”

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আবারও মাঠে সেই ডেসটিনি

আবারও মাঠে সেই ডেসটিনি

ডেসটিনি কার্যালয়। ছবি: সংগৃহীত

সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদন নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করেছে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি। এক দশক নিষ্ক্রিয় থেকে আবারও কার্যক্রম শুরু করেছে আলোচিত এই সমবায় প্রতিষ্ঠান। তবে পুরোনো বিনিয়োগকারীদের অর্থ কীভাবে ফেরত দেয়া হবে, সে বিষয়ে সবাই নীরব।

আর্থিক খাতের আঁতকে ওঠা প্রতিষ্ঠানের নাম ডেসটিনি। প্রলোভন দেখিয়ে লুট করা হয়েছে গ্রাহকের হাজার হাজার কোটি টাকা। অনিয়মের কারণে প্রতিষ্ঠানের অনেক শীর্ষ কর্তাই এখন জেলে। তবে প্রায় ১০ বছর পর আবার মাঠে নেমেছে বিতর্কিত সমবায় প্রতিষ্ঠান ডেসটিনি।

দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থেকে আবারও আলোচনায় ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি। নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদনে গঠন করা হয়েছে নতুন কমিটি। পুরোনো কমিটিতে যারা ছিলেন, তারা এখন নতুন কমিটিতে নেই। বলা হচ্ছে, যেহেতু তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, তাই নতুন কমিটিতে তাদের স্থান হয়নি।

সমবায় অধিদপ্তরের যুগ্ম নিবন্ধক মোহাম্মদ হাফিজুল হায়দার চৌধুরী নিউজবাংলাকে বলেন, সমবায় থেকে নিবন্ধন নিয়ে কার্যক্রম শুরু করেছে ডেসটিনি। তিনি বলেন, ডেসটিনি কো-অপারেটিভে কোনো সমস্যা হয়নি। যে ১২ জন নিয়ে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এ জন্য তারা আবার নিবন্ধন নিয়ে কাজ পরিচালনা করতে পারবে।

ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের সহসভাপতি জাকির হোসেন জানান, সরকারের সকল নিয়মনীতি মেনে আবারও ব্যবসা করতে চায় ডেসটিনি। এ ক্ষেত্রে কোম্পানির সম্পদ বিক্রি করে গ্রাহকদের দায়দেনা পরিশোধ করা হবে। তিনি জানান, এমএলএম ব্যবসা করার জন্য আবেদন করা হয়েছে। তবে এই আইনটি যুগোপযোগী করতে হবে।

সমবায় বিশেষজ্ঞ এমদাদ হোসেন মালেক নিউজবাংলাকে বলেন, ‘বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন এমএলএম কোম্পানি লোভনীয় অফার দিয়ে গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছে। ডেসটিনি আবার কোন ফর্মে নিবন্ধন করে ব্যবসা করবে? আগে যে কয়েক হাজার কোটি টাকা গ্রাহকের পকেট থেকে বের করে নিয়েছে, তারা তো এখনও টাকা ফেরত পায়নি।’

কমিটি অনুমোদন দিয়েছে সমবায় অধিদপ্তর

গত ২৮ জুন ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডের নতুন কমিটির অনুমোদন দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা সমবায় অধিদপ্তর। ১২ সদস্যের এই কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান লে. জেনারেল এম হারুন অর রশিদ (অব.)। সহসভাপতি হয়েছেন মো. জাকির হোসেন, আর সম্পাদক হয়েছেন আজম আলী।

আবারও মাঠে সেই ডেসটিনি

নির্বাচন পরিচালনার জন্য ১৭ মে সমবায় সমিতি বিধিমালা ২০০৪-এর ২৬(২) বিধি অনুসারে সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে তিন সদস্যের নির্বাচন কমিটি গঠন করা হয়। ১২টি পদের বিপরীতে ২৩ জন মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। তবে ‍পরে ১৩ জন তাদের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেন। ফলে সীমিত ব্যবস্থাপনা কমিটির ১২টি পদে ১২ জন প্রার্থীই থাকেন। একই পদের বিপরীতে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী না থাকায় বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন সবাই।

নির্বাচনে সভাপতি, সহসভাপতি, সম্পাদক, যুগ্ম সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষ পদে একজন করে এবং ব্যবস্থাপনা কমিটি সদস্য হিসেবে ৭ জনসহ মোট ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়।

কার্যক্রম শুরু করেছে ডেসটিনি

দীর্ঘদিন পর আবার অনুমোদন পেয়ে নড়চেড়ে বসেছে ডেসটিনি। এতদিন ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকায় তৈরি হয় স্থবিরতা। ডেসটিনির মালিকানাধীন সব সম্পদ পুলিশের নিয়ন্ত্রণে হলেও প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম শুরু হয়েছে।

কাকরাইল মোড়ে আলিস টাওয়ারের কয়েকটি ফ্লোরে সীমিত পরিসরে কাজ শুরু করা হয়েছে। নতুন নেতৃত্ব পাওয়া সকলেই প্রতিদিন ওই অফিসে বসছেন। অফিস চালু হওয়ার খবরে বিনিয়োগকারী অংশীদাররাও আসতে শুরু করেছেন।

আবারও মাঠে সেই ডেসটিনি

রাজধানীর কাকরাইলের মাহতাব প্লাজায় ডেসটিনির যে তিনটি অফিস ছিল, সেই অফিসগুলো এখন বন্ধ। এতদিন চালু থাকলেও কয়েক দিন আগে পুলিশ অফিস গেটে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। কো-অপারেটিভের কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য নতুন কমিটি অফিস নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করছে।

জানা গেছে, ডেসটিনির যেসব সম্পত্তি এখন পুলিশের জিম্মায়, সেগুলো এই কমিটির নিয়ন্ত্রণে নেয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষ করে মাল্টিপারপাসের নামে থাকা সম্পত্তি নিতে চায় কমিটি।

গ্রাহকের হা-হুতাশ

কেউ দিয়েছে হাজার, কেউ লাখ লাখ টাকা। কোটি টাকাও দিয়েছে অনেক পরিবার। ১০ বছর আগের দেয়া সেই টাকার জন্য আক্ষেপ এখনও স্পষ্ট। কেউ প্রকাশ্যে, কেউ বা অপ্রকাশ্যে চাহিদা তুলে ধরছেন। কিন্তু কোথায় গেলে মিলবে টাকা, তা কেউ জানে না।

ডেসটিনির অফিসে অফিসে এখনও খোঁজ নেন গ্রাহকরা। কবে চালু হবে, বিনিয়োগকৃত টাকার কোনো হদিস কি মিলেবে? কিন্তু কোনো সদুত্তর নেই। সমবায় অধিদপ্তর থেকে নতুন কমিটি করে দেবার পর আলিস টাওয়ারে গ্রাহকদের ভিড় বাড়ছে।

ডেসটিনি কো-অপারেটিভে অনিয়ম

সমবায় মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে ২০১২ সালের ৪ এপ্রিল সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক অমিয় কুমার চট্টোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি ডেসটিনি কো-অপারেটিভে ১ হাজার ৪৪৮ কোটি ৭৮ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫২ টাকার অনিয়ম খুঁজে পায়।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধকের অনুমোদন না নিয়ে সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা অর্থ ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ, অনুমোদনহীনভাবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণ ও সেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনা, সম্পদের মূল্য বেশি দেখানো, বাজেটবহির্ভূত এবং অনুমোদনহীন বিভিন্ন ব্যয়ের মাধ্যমে এসব অনিয়ম করা হয়।

বিশ্লেষক মন্তব্য

সমবায় বিশ্লেষক এমদাদ হোসেন মালেক বলেন, ‘পুরোনো বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ কি বর্তমান কমিটি দেখবে নাকি নতুন করে কার্যক্রম পরিচালনা করবে, সেটি স্পষ্ট নয়। তারা যদি নতুন করে রেজিস্ট্রেশন নেয়, তাহলে আগের বিনিয়োগকারীরা অর্থ কি ফেরত পাবেন? যদি ফেরত পান, কী উপায়ে পাবেন? এগুলো স্পষ্ট না করে ব্যবসা কাজ শুরু করলে জনমনে সন্দেহের জায়গা তৈরি হবে।’

তিনি আরও বলেন, ডেসটিনির পরে ইউনি পে টু ইউ এসেও একই কাজ করেছে। প্রায় হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে তারা। এ ছাড়া যুবক নামে আরও একটি প্রতিষ্ঠানও কয়েক হাজার কোটি টাকা নিয়ে গেছে। যুবকের সম্পত্তি বিক্রি করে গ্রাহকের টাকা দেয়া সম্ভব ছিল। কিন্তু গ্রাহকের টাকা ফিরিয়ে দেয়ার ব্যবস্থা কেউ এখনও করেনি।

তিনি বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা বলে নতুন আইনের আওতায় না নিয়ে এসে কোনোভাবেই এসব ব্যবসাকে অনুমোদন করা উচিত নয়। আগে নিয়ন্ত্রণমূলক জায়গায় নিয়ে তারপর অনুমতি নিতে হবে। না হলে ডেসটিনি আবার নতুন আঙ্গিকে এসে গ্রাহক ঠকাবে।

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন

মৃত্যুপথযাত্রী করোনা সনদ পাবে কোথায়

মৃত্যুপথযাত্রী করোনা সনদ পাবে কোথায়

যেকোনো রোগের চিকিৎসা করাতে গেলে হাসপাতালগুলো আগে চায় করোনা সনদ। এমন নীতির কারণে অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্তদের ভোগান্তির শেষ নেই। ছবি: নিউজবাংলা

আগে করোনা টেস্ট, পরে যেকোনো রোগের চিকিৎসা, হাসপাতালগুলোর এমন নীতির অজুহাতে জরুরি সেবা দেয়া থেকে বিরত থাকছেন চিকিৎসকরা। বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত রোগীরা দ্রুত চিকিৎসাসেবা পাচ্ছেন না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটা মেনে নেয়া যায় না।

দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে ভুগছিলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আজিজুর রহমান। নরসিংদীতে নিজ এলাকায় এক হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের অধীনে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। গত বুধবার হঠাৎ তার অবস্থার অবনতি হয়।

তীব্র শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়ায় আজিজুর রহমানকে দ্রুত ঢাকার হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসক। রোগীর স্বজনরা তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে রাজধানীর ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসেন।

চিকিৎসকরা প্রথমে রোগীকে ভর্তি নিতে অনীহা প্রকাশ করেন। রোগীর স্বজনদের তারা বলেন, চিকিৎসা নেয়ার আগে করোনা পরীক্ষা করতে হবে। রোগীর স্বজনদের অনুনয়-বিনয়েও কর্তব্যরত চিকিৎসকদের মন গলেনি। একপর্যায়ে তারা জানিয়ে দেন কোভিড পরীক্ষা ছাড়া কোনো রোগীর চিকিৎসা হবে না।

আজিজুরের দুই ডোজ করোনা প্রতিরোধী টিকা নেয়ার সনদ সঙ্গেই ছিল। এর পরও সংকটাপন্ন এই রোগীকে দ্রুত মহাখালী কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন ইব্রাহিম কার্ডিয়াকের চিকিৎসকরা।

তবে অ্যাম্বুলেন্সে পর্যাপ্ত অক্সিজেন মজুত ছিল না। অ্যাম্বুলেন্সচালক রোগীর স্বজনকে জানান, যে অক্সিজেন আছে, সেটা দিয়ে ৪০ মিনিট রোগীকে অক্সিজেনের আওতায় রাখা সম্ভব হবে।

যানজটের কারণে ইব্রাহিম কার্ডিয়াক থেকে ডিএনসিসির করোনা হাসপাতালে আসতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা ৩০ মিনিট। রাস্তায় রোগীর মৃত্যু ঘটে। ডিএনসিসি হাসপাতালে নিয়ে গেলে দায়িত্বরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ইব্রাহিম কার্ডিয়াক হাসপাতালের দায়িত্বরত চিকিৎসক বলছেন, তাদের হাসপাতালে করোনা চিকিৎসার জন্য আলাদা কোনো ইউনিট নেই। আজিজুর রহমানের করোনা উপসর্গ ছিল, সেই কারণে করোনা পরীক্ষা করার কথা বলা হয়। সেই সঙ্গে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের সুযোগ নেই হাসপাতালে, যা দিয়ে আধা ঘণ্টায় করোনা পরীক্ষা করা যেত।

শুধু আজিজুর রহমান নন, বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে নন-কোভিড (অন্য রোগে আক্রান্ত) সংকটাপন্ন রোগীদের এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। যথাসময়ে প্রয়োজনীয় জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এসব রোগী। এমন পরিস্থিতিতে রীতিমতো দিশেহারা সাধারণ মানুষ।

রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের পথে। ডেঙ্গু পরিস্থিতিও অনেকটা স্থিতিশীল। এর মধ্যে মৌসুমি জ্বর ও সর্দি দেখা দিয়েছে। এসব কারণে সাধারণ রোগীর চাপ বেড়েছে হাসপাতালগুলোতে। এমন বাস্তবতায় সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতালগুলো। ফলে আগে কোভিড টেস্ট, পরে যেকোনো রোগের চিকিৎসা- এমন নীতিতে জরুরি সেবা থেকে বিরত থাকছেন সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা।

একই নীতির কারণে জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলায় প্রসববেদনা নিয়ে পরপর তিনটি হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা না পেয়ে আল্পনা নামের এক প্রসূতির মৃত্যু এবং এক প্রসূতির ক্লাবে সন্তান প্রসবের ঘটনা ঘটে।

এসব ঘটনার পর নাগরিকদের জরুরি চিকিৎসাসেবা দিতে হাসপাতালগুলো বাধ্য বলে উল্লেখ করেছে হাইকোর্ট। কোনো হাসপাতাল অসম্মতি জানাতে পারবে না বলেও জানানো হয়েছে। ১২ সেপ্টেম্বর বিচারপতি ফারাহ মাহবুব ও বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।

সেই সঙ্গে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ধরনের আচরণ কোনোভাবে কাম্য নয়। কোভিড, নন-কোভিড সব রোগীর চিকিৎসা সমভাবে নিশ্চিত করতে হবে।

এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য নজরুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, চিকিৎসকদের দায়িত্ব করোনা, নন-করোনা সব রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করা। করোনা পরীক্ষার জন্য চিকিৎসা বন্ধ রাখতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। এ ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষার জন্য সব হাসপাতালে করোনা পরীক্ষায় র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের ব্যবস্থা রাখতে হবে। অবশ্যই লক্ষ রাখতে হবে করোনার কারণে নন-কোভিড রোগীদের চিকিৎসা যাতে ব্যাহত না হয়।

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুুুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘করোনার মধ্যে অন্যান্য সেবাও অব্যাহত রাখতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসদের নিরাপত্তার জন্য করোনা পরীক্ষা করানো হয়। তবে করোনা পরীক্ষার সনদের অপেক্ষায় চিকিৎসাসেবা পাবে না সাধারণ মানুষ, এমনটা হতে পারে না।

‘এ বিষয়ে অবশ্যই চিকিৎসকদের সদয় হতে হবে। এ সমস্যা সমাধানে ইতিমধ্যে অনেক হাসপাতালে এখন র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ওখানে ৩০ মিনিটের মধ্যে ফল পাওয়া যাবে। আমি সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের চিকিৎসকদের বলব, তারা যেন এ বিষয়ে মানুষের প্রতি মানবিক হন। এ ছাড়া এ সমস্যা সমাধানে র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করার জন্য নতুন ৩০টি মেশিন কেনার প্রস্তুতি চলছে।’

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন

পরীক্ষামূলক ফাইভজি চালু করবে টেলিটক

পরীক্ষামূলক ফাইভজি চালু করবে টেলিটক

প্রতীকী ছবি

ঢাকার ২০০ স্থানে ফাইভজি চালু করতে প্রকল্প প্রস্তাব করেছে টেলিটক। আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে প্রকল্প শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে অপারেটরটির।

আগামী বছরই দেশে পঞ্চম প্রজন্মের নেটওয়ার্ক সেবা ফাইভজি চালুর চিন্তাভাবনা করছে সরকার। সরকারি মোবাইল অপারেটর টেলিটক শুরুতে রাজধানীর ২০০টি স্থানে পরীক্ষামূলক ফাইভজি সেবা চালু করবে।

প্রথম ধাপে ১ লাখ গ্রাহককে পাঁচটি সেবার আওতায় আনতে চায় টেলিটক। এ পরিষেবা দিতে আড়াই শ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে অপারেটরটি।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, গণভবন, বঙ্গভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, সচিবালয়, সরকারি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, ঢাকার কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ থানা ও বেশ কিছু বাণিজ্যিক ও আবাসিক এলাকার গ্রাহক ফাইভজির আওতায় আসবে। এতে প্রতি সেকেন্ডে ১০০ মেগাবাইট (১০০ এমবিপিএস) গতির ইন্টারনেট সেবা পাবে তারা।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ইন্টারনেটের গতি সুদান ও উগান্ডার মতো দেশের চেয়েও কম। ইন্টারনেটে গতির হিসাবে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩৭ দেশের মধ্যে ১৩৫তম। বাংলাদেশের পেছনে আছে শুধু আফগানিস্তান ও ভেনেজুয়েলা।

ইন্টারনেট অ্যাকসেস ও পারফরম্যান্স অ্যানালিসিস কোম্পানির তথ্য বলছে, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি গতির ইন্টারনেট রয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতে। ডাউনলোডের গতি সেখানে ১৯৩ এমবিপিএসের বেশি। আর বাংলাদেশে এর গতি ১২.৪৮ এমবিপিএস। গ্রাহকদের এবার কমপক্ষে আট গুণ বেশি গতি দিতে চায় টেলিটক।

এ বিষয়ে ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার নিউজবাংলাকে বলেন, ‘পরীক্ষামূলক ফাইভজি নেটওয়ার্কের জন্য প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে চলতি বছরই ফাইভজির যুগে প্রবেশ করবে বাংলাদেশ। টেলিটক ফাইভজি নেটওয়ার্ক নিয়ে কাজ করছে। এ জন্য শুরুতে ঢাকায় কিছু অবকাঠামো তৈরি করা হবে।

‘এটি শেষ হলে সারা দেশের জন্য বড় প্রকল্প নেয়া হবে। একই সঙ্গে সারা দেশে ফোরজি নেটওয়ার্ক ও ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ সম্প্রসারিত করা হচ্ছে।’

বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) হিসাব বলছে, দেশে ইন্টারনেট ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। জুলাই শেষে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২ কোটি ৩৭ লাখে। এর মধ্যে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১১ কোটি ৩৬ লাখ। আর ব্রডব্যান্ডের গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ৫ লাখের কিছু বেশি।

টেলিটক বলছে, দেশের প্রায় ৫৬ শতাংশ মানুষ মোবাইল সেবার আওতাভুক্ত। এদের মধ্যে ২৮ শতাংশ গ্রাহক স্মার্টফোনে মোবাইল ইন্টারনেট ব্যবহার করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব উন্নত দেশ ও কিছু উন্নয়নশীল দেশে ফাইভজি সেবা চালু হয়েছে।

বাংলাদেশে এ প্রযুক্তি দেশব্যাপী চালুর আগে স্বল্প মাত্রায় পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা প্রয়োজন। এমন বাস্তবতায় রাষ্ট্রীয় মোবাইল কোম্পানি হিসেবে টেলিটক ঢাকার উত্তরা, গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, রমনা ও শাহবাগের মতো কিছু এলাকায় সীমিত আকারে ২০০টি এজি বিটিএল স্থাপনের মাধ্যমে পরীক্ষামূলক কার্যক্রম পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে।

‘ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় টেলিটকের নেটওয়ার্কে বাণিজ্যিকভাবে পরীক্ষামূলক পাঁচটি প্রযুক্তি চালুকরণ’ নামে এই প্রকল্পে খরচ হবে ২৫৪ কোটি ৮ লাখ টাকা। এ বছর শুরু হয়ে আগামী বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে এটি বাস্তবায়নের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।

টেলিটকের প্রকল্প প্রস্তাব পেয়ে তা যাচাই-বাছাই করছে পরিকল্পনা কমিশন।

কমিশন বলছে, এ প্রকল্পে বিশদ কোনো সমীক্ষা হয়নি। ফাইভজি একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন অত্যাধুনিক কারিগরি প্রযুক্তি। এটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু করার আগে ইন-হাউজ সমীক্ষার পরিবর্তে এ বিষয়ে অত্যন্ত দক্ষ ও কারিগরি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন তৃতীয় কোনো পক্ষ দিয়ে পূর্ণাঙ্গ সম্ভাব্যতা সমীক্ষা হওয়া প্রয়োজন।

ফাইভজির আগে শক্তিশালী ফোরজি সেবা দেয়া উচিত জানিয়ে কমিশন আরও বলছে, ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে টেলিটকের ফোরজি সেবা শুরু হলেও এর কাভারেজের আওতায় এসেছে শুধু বিভাগীয় এবং জেলা শহরগুলো। এ ক্ষেত্রে ফাইভজি সেবা শুরু করার আগে ফোরজির কাভারেজ এরিয়া আরও শক্তিশালী ও সম্প্রসারণ হওয়া প্রয়োজন।

এ ছাড়া ফাইভজি প্রযুক্তিনির্ভর টেলিকম যন্ত্রপাতি সংযোজন করতে গিয়ে কোনো জটিলতার সৃষ্টি হবে কি না, তা পরীক্ষা করাও দরকার।

কমিশন আরও বলছে, সব ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ফাইভজি প্রযুক্তি গ্রহণ করতে পারবে না। এটি ব্যবহার করতে হলে অবশ্যই ফাইভজি উপযোগী মোবাইল ডিভাইস থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকার সুবিধাভোগীদের আনুমানিক কত শতাংশের কাছে ফাইভজি উপযোগী মোবাইল ডিভাইস আছে, সে বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া প্রয়োজন।

অন্যান্য মোবাইল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর তুলনায় টেলিটকের নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা সীমিত ও অপেক্ষাকৃত দুর্বল। নেটওয়ার্ক ব্যবস্থার সামগ্রিক উন্নয়ন ছাড়া ফাইভজি প্রযুক্তি গ্রহণ কতটুকু ফলপ্রসূ হবে, সে বিষয়টিও আলোচনার বিষয়।

এর আগে গত মাসে একনেক সভা শেষে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত ও অবকাঠামো বিভাগের সদস্য মামুন আল রশীদ বলেন, ‘ঢাকার অন্তত ২০০টি স্থানে ফাইভজি সেবা চালুর জন্য টেলিটকের একটি প্রকল্প প্রস্তাব আগস্ট মাসে আমরা পেয়েছি। আমরা সেটা যাচাই করছি। প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে ঢাকায় এ সেবা চালু হবে।’

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন

হাসপাতালে শয্যা বাড়ছে, সেবা না

হাসপাতালে শয্যা বাড়ছে, সেবা না

সিলেট বিভাগে ২২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হয়েছে। তবে এগুলোর কোনোটিরই জনবল বা সরঞ্জাম বাড়েনি। ফলে চিকিৎসাসেবায় চাপ আগের চেয়ে বেড়েছে।

৩১ শয্যার শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০১২ সালে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। তবে দীর্ঘ ৯ বছরেও এখানে নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়নি। এ নিয়ে ছয়বার আবেদন করা হয়। সবশেষ গত বছরের মার্চে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ে লোকবল বাড়ানোর চিঠি পাঠানো হয়। তাতেও কাজ হয়নি।

এমনকি এখানে ৩১ শয্যার সেবা চালানোর লোকবলও নেই। এ ছাড়া ইসিজি ও আলট্রাসনোগ্রাফ যন্ত্র থাকলেও টেকনিশিয়ানের অভাবে এগুলো অব্যবহৃত পড়ে আছে। এক্স-রে মেশিন বিকল অনেক দিন ধরে।

সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকেও ২০১৬ সালে ৫০ শয্যার হাসপাতালে উন্নীত করা হয়। পাঁচ বছরেও বাড়ানো হয়নি এর লোকবল। নেই ৫০ শয্যার অনুপাতে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র ও ওষুধপাতি। এখানেও একমাত্র এক্স-রে মেশিন বিকল। বিকল অ্যাম্বুলেন্সও।

সিলেটের প্রায় সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেই সেবার নাজুক অবস্থা। তড়িঘড়ি করে শয্যার বাড়ানোর নামে অবকাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। কিন্তু বাড়ছে না সেবার পরিধি। শয্যা বাড়ালেও বাড়ছে না লোকবল, যন্ত্রপাতি ও আনুষঙ্গিক সুবিধা। ফলে বিপাকে পড়তে হচ্ছে রোগী ও চিকিৎসকদের।

হাসপাতালগুলোতে রোগ নির্ণয়ের অনেক যন্ত্র দীর্ঘদিন ধরে নষ্ট। কোনোটিতে যন্ত্র থাকলেও নেই টেকনিশিয়ান।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর দুরবস্থা সম্পর্কে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, ‘সিলেটের স্বাস্থ্য খাত অন্যান্য বিভাগের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। জনবল সংকট রয়েছে সিলেট জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে। ২০১১ সালের পর আর কোনো নিয়োগ দেওয়া হয়নি এই বিভাগে।’

তিনি বলেন, ‘সিলেট বিভাগে শুধু হাসপাতাল ভবনের নামে বক্স বানানো হচ্ছে। কিন্তু এই বক্সে কে থাকবে, কারা সেবা নিবে, কারা সেবা দিবে, কী দিয়ে সেবা দিবে– এগুলো নিয়ে কেউ ভাবে না। শুধু একের পর এক ভবন বানানো হচ্ছে। আর হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো হচ্ছে।’

৩০ শতাংশ চিকিৎসক

সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সিলেট বিভাগে ৩৮ উপজেলায় ৩৪টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স রয়েছে। এর মধ্যে গত ১০ বছরে পর্যায়ক্রমে ২২টিকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। ১২টি এখনও আছে ৩১ শয্যায়।

হাসপাতালে শয্যা বাড়ছে, সেবা না

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্মকর্তারা জানান, রোগীদের সেবা দেয়ার জন্য একটি ৫০ শয্যা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪ জন চিকিৎসক, ১৫ জন দ্বিতীয় শ্রেণির কর্মকর্তা, ৬৭ জন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী ও ২৩ জন চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী প্রয়োজন। প্রতিটি হাসপাতালে দুটি অ্যাম্বুলেন্স থাকার কথা রয়েছে।

তবে ২৪ জনের জায়গায় সিলেট বিভাগের বেশির ভাগ ৫০ শয্যার হাসপাতালে কর্মরত আছেন ৪ থেকে ৭ জন চিকিৎসক। দিরাই ও কুলাউড়ায় আছেন ৪ জন, শ্রীমঙ্গলে ৫ জন।

৩১ শয্যার হাসপাতালগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের শাল্লায় আছেন মাত্র একজন চিকিৎসক।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সিলেটের ৫০ শয্যার উপজেলা হাসপাতালগুলো প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ৩০ শতাংশ চিকিৎসক, ৩৫ শতাংশ ডায়াগনস্টিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য পদে (দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি) মাত্র ৩০ শতাংশ জনবল রয়েছে।

বিভাগের মধ্যে সিলেট জেলার ১৩টি উপজেলার মধ্যে ১১টিতে আছে উপজেলা হাসপাতাল। এগুলোর মধ্যে ২০০৯ সালে গোয়াইনঘাট ও বিয়ানীবাজার উপজেলা হাসপাতাল ৩১ থেকে ৫০ শয্যা করা হয়েছে। ২০১৩ সালে গোলাপগঞ্জ উপজেলা হাসপাতাল ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়। ২০১৬ সালে জৈন্তাপুর, ২০১৭ সালে ফেঞ্চুগঞ্জ ও ২০১৮ সালে দক্ষিণ সুরমা, বিশ্বনাথ, কানাইঘাট ও জকিগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালকে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়।

কয়েক কোটি টাকা ব্যয় করে হাসপাতাল ভবন নির্মাণেই এখন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে ৩১ শয্যা থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত হাসপাতালের কার্যক্রম। উপজেলা হাসপাতালগুলোতে ৩১ শয্যার হাসপাতালের জনবলই নেই। ফলে ৫০ শয্যার হাসপাতাল চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে সংশ্লিষ্টদের।

পুরো বিভাগে চিকিৎসক প্রয়োজন ৯১০ জন; কিন্তু কমর্রত আছেন ৪০০ জন। সিনিয়র স্টাফ নার্স প্রয়োজন ১ হাজার ৩২৩ জন, কর্মরত আছেন ১ হাজার ১৪৭ জন। নার্সিং সুপারভাইজার প্রয়োজন ৪৬ জন, আছেন ২৩ জন। স্টাফ নার্স প্রয়োজন ৫৬ জন, আছেন ২৭ জন। মিডওয়াইফ প্রয়োজন ১৭৪ জন, আছেন ৯৫ জন। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (ল্যাব) প্রয়োজন ৯০ জন, আছেন ২২ জন। রেডিওগ্রাফি (এক্স-রে) টেকনোলজিস্ট প্রয়োজন ৩৪ জন, কমর্রত আছেন ১০ জন। ফার্মাসিস্ট প্রয়োজন ১৭০ জন, আছেন ২৯ জন।

সরঞ্জাম সংকট

বিভাগের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ৪০টি এক্স-রে মেশিন থাকলেও সচল আছে মাত্র ১৪টি। সচল এক্স-রে মেশিনের মধ্যে সিলেট জেলায় আছে চারটি, সুনামগঞ্জ জেলায় তিনটি, হবিগঞ্জ জেলায় দুটি ও মৌলভীবাজার জেলায় আছে পাঁচটি।

সিলেট বিভাগের ৩৪ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অ্যাম্বুলেন্স আছে ৪৭টি। এর মধ্যে সচল আছে ৩৪টি। এর মধ্যে সিলেট জেলায় আছে ১১টি, সুনামগঞ্জ জেলায় ৯টি, হবিগঞ্জ জেলায় আছে ছয়টি ও মৌলভীবাজার জেলায় আছে আটটি।

সুনামগঞ্জ

জেলার সদর হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ কমিউনিটি ক্লিনিকে চিকিৎসকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।

২৫০ শয্যার সুনামগঞ্জ জেলা সদর হাসপাতাল সম্প্রতি আটতলা ভবন ও নতুন নতুন চিকিৎসা সরঞ্জাম পেলেও লোকবলের অভাবে তা নষ্ট হচ্ছে।

সিভিল সার্জন অফিস সূত্রে জানা যায়, জেলায় স্বাস্থ্য বিভাগের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণি মিলিয়ে মোট ১ হাজার ৯৯৩ পদের বিপরীতে আছেন ৯৮০ জন। পদ শূন্য ১০১০টি।

প্রথম শ্রেণির ২৯৮ পদের মধ্যে খালি রয়েছে ১৬৬টি। সিনিয়র কনসালট্যান্ট ১০টির মধ্যে কর্মরত আছেন পাঁচজন, জুনিয়র কনসালট্যান্ট ৬৬টির মধ্যে আছেন ৯ জন, আবাসিক চিকিৎসক ১৩টি পদের মধ্যে খালি আছে ৮টি, আবাসিক ফিজিশিয়ান ও আবাসিক সার্জনের একটি করে পদ থাকলেও সেগুলো খালি রয়েছে।

চিকিৎসা কর্মকর্তার ৬১টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩৪ জন। জরুরি চিকিৎসা কর্মকর্তার ২৯টির মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। সহকারী রেজিস্ট্রার/সার্জন পদে ৭৩ জনের মধ্যে ৪৯ জন, চিকিৎসা কর্মকর্তা (আয়ুর্বেদিক/ হোমিওপ্যাথিক) পদে দুই জনের মধ্যে একজন কর্মরত আছেন। রেডিওলজিস্ট দুটি পদের মধ্যে সব খালি। প্যাথোলজিস্ট দুটি পদের মধ্যে আছেন একজন। আর অ্যানেসথেসিস্ট আটটি পদের বিপরীতে আছেন একজন।

হাসপাতালে শয্যা বাড়ছে, সেবা না

জেলার স্বাস্থ্য খাতে দ্বিতীয় শ্রেণির ৪৪৭ পদের বিপরীতে আছেন ২৬৫ জন। এর মধ্যে বেশির ভাগ সংকট রয়েছে সিনিয়র স্টাফ নার্স ও মিডওয়াইফ পদে। এগুলোতে ৪২৭ জনের বিপরীতে আছেন ২৫৩ জন। নার্সিং সুপারভাইজার ১৩টি পদের মধ্যে খালি রয়েছে পাঁচটি।

তৃতীয় শ্রেণির ৮৯৮ পদের মধ্যে খালি রয়েছে ৪৩৭টি। চতুর্থ শ্রেণির ২৮৪ পদের মধ্যে খালি রয়েছে ১৯৪টি।

সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. শামস উদ্দিন জানান, ‘জেলার স্বাস্থ্য বিভাগে জনবল সংকট খুব বেশি। শূন্য পদে নিয়োগের ব্যাপারে কর্তৃপক্ষ ভালো জানেন। আমরা প্রতিনিয়ত চিঠিপত্র পাঠাচ্ছি। আশা করি, দ্রুতই এর সমাধান হবে।’

হবিগঞ্জ

যন্ত্রপাাতি, জনবল, পানি আর উন্নত সেবাসহ নানামুখী সংকটে হবিগঞ্জের চিকিৎসাব্যবস্থা। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলো তো বটেই, হবিগঞ্জ জেলা আধুনিক সদর হাসপাতালেও মিলছে না সঠিক চিকিৎসা। বাধ্য হয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে যাচ্ছে সাধারণ মানুষ।

হবিগঞ্জ জেলা সদর আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক কার্যালয় থেকে জানা যায়, বর্তমানে হাসপাতালটিতে আছেন তত্ত্বাবধায়ক ও একজন আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা। ৫৭ জন চিকিৎসকের জায়গায় আছেন মাত্র ২২ জন; ১২৩ জন নার্সের স্থলে আছেন ৩৭ জন এবং টেকনিশিয়ানসহ অন্য পদে ১১২ জনের স্থলে আছেন মাত্র ৫৫ জন।

হাসপাতালটি কাগজে-কলমে ২৫০ শয্যার হলেও প্রকৃত অর্থে চলছে ১০০ শয্যাতে। এখানে নেই পর্যাপ্তসংখ্যক শয্যা, স্যালাইন লাগানোর স্ট্যান্ড, ট্রলি বা হুইলচেয়ার। দীর্ঘদিন ধরে বিকল এক্স-রে মেশিন, আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন, ইসিজি, অ্যানেসথেসিয়া, মাইক্রোস্কোপ, অ্যানালাইজার, রেফ্রিজারেটর ও জিন এক্সপার্ট মেশিন।

এর মধ্যে নতুন কয়েকটি মেশিন এলেও দক্ষ জনবলের অভাবে সেগুলো ঢেকে রাখা হয়েছে সাদা কাপড়ে। রক্ত পরীক্ষা ছাড়া কোনো ধরনের পরীক্ষাই হয় না হাসপাতালটিতে। আবার অনেক মূল্যবান যন্ত্রাংশ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হচ্ছে।

হাসপাতালে পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। একমাত্র পানির ট্যাংকটি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পর সেটি প্রতিস্থাপন করতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে হাসপাতালের পানির একমাত্র উৎস করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে হাত ধোয়ার জন্য বসানো বেসিন ও হাসপাতাল কোয়ার্টারের একটি টিউবওয়েল।

এদিকে উদ্বোধনের চার বছর পরও হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের আটতলা নতুন ভবনের কার্যক্রম শুরু হয়নি। ৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা ভবনটি ২০১৭ সালের জুলাই মাসে উদ্বোধন করেন তৎকালীন স্বাস্থ্যমন্ত্রী প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিম।

সরেজমিনে দেখা যায়, নতুন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায় শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের ক্যাম্পাস, পঞ্চম তলায় শিশু ওয়ার্ড এবং ষষ্ঠ তলায় করোনা আইসোলেশন সেন্টার। বাকি তলাগুলো এখনো ফাঁকা।

এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ সদর আধুনিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোহাম্মদ আমিনুল হক সরকার বলেন, ‘জনবল সংকটের কারণ চিকিৎসাসেবা অনেকটা ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকটের মধ্যেও আমরা শতভাগ চিকিৎসা দেয়ার চেষ্টা করছি। তবে জনবল সংকট নিরসনে নিয়োগ প্রক্রিয়াধীন। আশা করি, শিগগির জনবল সংকট কিছুটা হলেও দূর হবে।’

তিনি বলেন, ‘পানি সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি। করোনাভাইরাসের প্রভাবের কারণে অনেক কাজই সম্ভব হয়নি। শয্যাসহ বিভিন্ন সরঞ্জামেরও চাহিদা জানিয়ে মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া নতুন ভবনের কার্যক্রম আংশিক চালু করা হয়েছে। সেখানে অপারেশন থিয়েটারসহ বিভিন্ন যন্ত্রাংশ বসানোর কাজ চলমান।’

নতুন ভবনের মধ্যে শেখ হাসিনা মেডিক্যাল কলেজের ক্যাম্পাস থাকায় পুরোপুরি চালু করা সম্ভব হচ্ছে না। তারা এখান থেকে স্থানান্তর হলেই হাসপাতালের কার্যক্রম পুরোপুরি শুরু হবে বলে জানান তিনি।

আধুনিক সদর হাসপাতালের মতোই নাজুক অবস্থা জেলার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। সেখানেও চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ানসহ প্রচুর পরিমাণে জনবল সংকট। কোথাও নেই অ্যাম্বুলেন্স কিংবা ড্রাইভার। আর যন্ত্রাংশ সংকট আরও চরমে।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগ থেকে জানা যায়, জেলার সিভিল সার্জন কার্যালয়সহ আটটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মোট ১ হাজার ১৮৬টি পদের বিপরীতে আছেন ৭৫৪ জন। এর মধ্যে প্রথম শ্রেণির ১৭৪ জনের স্থলে আছেন মাত্র ১০৩ জন, দ্বিতীয় শ্রেণির ১৬৮ জনের স্থলে আছেন ১২৭ জন, তৃতীয় শ্রেণির ৬৯১ জনের স্থলে আছেন ৪৪০ জন এবং চতুর্থ শ্রেণির ১৪৮ জনের স্থলে আছেন মাত্র ৮৪ জন।

সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শূন্য পদের সংখ্যা ১৮টি, মাধবপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬৩টি, চুনারুঘাট স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫২টি, বাহুবল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫৪টি, লাখাই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৩৯টি, নবীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৭৭টি, বানিয়াচং স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৬১টি এবং আজমিরীগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৪৬টি।

হাসপাতালে শয্যা বাড়ছে, সেবা না

জেলার কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রাথমিক চিকিৎসা ছাড়া কিছু পাওয়া যায় না। অ্যাম্বুলেন্স থাকলেও সেটির সেবা পাচ্ছেন না রোগীরা।

মৌলভীবাজার

যন্ত্রপাতির অভাব, চিকিৎসক নার্সসহ বিভিন্ন পদে লোকবল সংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে মৌলভীবাজারের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোর চিকিৎসাসেবাও।

জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন ভর্তি হয় ৩০ থেকে ৫০ জন রোগী। তবে চিকিৎসক ও যন্ত্রপাতির সংকটে সেবা বঞ্চিত থাকতে হচ্ছে রোগীদের।

শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সেবা নিতে আসা উত্তর ভাড়াউড়া গ্রামের রতন বৈদ্য বলেন, এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে কোনো সেবা পাওয়া যায় না। রোগীকে ভালো করে দেখার আগেই সদর হাসপাতালে রেফার করে দেয়া হয়।

তবে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সাজ্জাদ হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘সংকটের মধ্যেও আমরা রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা দেয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। জনবল চেয়ে সিভিল সার্জন অফিসে চিঠি পাঠিয়েছি। ৫০ শয্যার জনবল নিয়োগ হলে রোগীরা আরও ভালো সেবা পাবেন।’

কমলগঞ্জ উপজেলায় ৩১ শয্যার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি তিন বছর আগে ৫০ শয্যায় উত্তীর্ণ হয়। তবে এখানকার ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, সনোলজি মেশিন থাকলেও তা বাক্সবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। সনোলজিস্ট, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্টসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো খালি।

এই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ইউনিয়ন উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৯ জন চিকিৎসকের পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১২ জন। মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ১২ জনের জায়গায় আছেন ৯ জন। ফার্মাসিস্ট পদে ৩ জনের স্থলে কেউই নেই। প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরিতে ২ জনের জায়গায় কাজ করছেন ১ জন।

কমলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহবুবুল আলম ভূঁইয়া বলেন, ‘চিকিৎসকের চারটি পদ শূন্য আছে। গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি ও অ্যানেসথেসিয়া কনসালট্যান্ট নেই। লোকবলের অভাবে ডিজিটাল এক্স-রে ও আলট্রাসনোগ্রাফি মেশিন চালানো যাচ্ছে না। কোনো ফার্মাসিস্ট নেই।

রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসকের পদ আছে ১০টি। এর মধ্যে বিশেষজ্ঞ চারটি পদ শল্যচিকিৎসক (সার্জারি), দন্ত চিকিৎসক, মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং গাইনি চিকিৎসকের পদ অনেক দিন ধরে শূন্য পড়ে আছে। এখানে ৬ জন মেডিক্যাল চিকিৎসক পদের মধ্যে বর্তমানে ৪ জন কর্মরত আছেন।

১৫ জন সিনিয়র স্টাফ নার্সের বিপরীতে আছেন ৮ জন। এই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য কোনো ল্যাব নেই। এক্স-রে মেশিন থাকলেও অপরারেটর না থাকায় ২০১১ সাল থেকে এটি অব্যহৃত অবস্থায় পড়ে আছে। বন্ধ রয়েছে অপারেশন থিয়েটারও। হাসপাতালের দুটি অ্যাম্বুলেন্সের মধ্যে একটি অচল।

রাজনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. বর্ণালী দাস বলেন, ‘লোকবল যা আছে, তা দিয়েই আমরা চালাচ্ছি। নতুন ভবনের কাজ সম্পন্ন হয়ে গেলে অনেক সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।’

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৯৯৫ সালে এক্স-রে মেশিন স্থাপন করা হয়। তবে ১৯৯৮ সালে এক্স-রে মেশিন পরিচালনার জন্য রেডিওলজিস্ট পদটি শূন্য হয়ে যায়। এরপর থেকে এক্স-রে মেশিন বন্ধ থাকে। ১০ বছর আগে আসা ইসিজি যন্ত্রটিও টেকনোলজিস্টের অভাবে এখনও প্যাকেটবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এক কর্মী জানান, ২০১৯ সালের জুলাই মাসে উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এক্স-রে মেশিনটি মেরামত করে অস্থায়ী একজন রেডিওলজিস্ট নিয়োগের মাধ্যমে সেবা কার্যক্রম চালু করা হবে। পরে টেকনিশিয়ানরা মেশিনটি পর্যবেক্ষণ করে জানান, এটি আর সচল করা সম্ভব নয়।

তিনি জানান, ‘২০২০ সালের নভেম্বর মাসে স্বাস্থ্যসেবা কমিটির সভায় নতুন এক্স-রে মেশিন সংযোজনের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চাহিদা চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। পুরাতন অ্যাম্বুলেন্সটি মেরামতের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাখালী টেমো (গাড়ি মেরামত) কার্যালয়ের কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছিল। সেখানকার বিশেষজ্ঞ একটি টিম কয়েক মাস আগে অ্যাম্বুলেন্সটি দেখে গিয়েছেন। এখনও সেটি মেরামতের কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।’

হাসপাতালে শয্যা বাড়ছে, সেবা না

কুলাউড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. ফেরদৌস আকতার বলেন, ‘আমি মাস তিনেক হলো এখানে এসেছি। লোকবলসহ এক্স-রে মেশিন নতুন সংযোজনের জন্য কর্তৃপক্ষকে জানানো আছে। এ ছাড়া অন্যান্য চিকিৎসা যন্ত্রপাতি সচল করতে প্রতি মাসেই লিখিতভাবে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়।’

বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ২০১৮ সালে ৩১ থেকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছিল; কিন্তু সে অনুপাতে বাড়েনি সেবার মান। বাড়েনি লোকবলও।

এমনকি ৩১ শয্যার জনবলের মধ্যে মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট (রেডিওগ্রাফি) পদটি ১৫ বছর ধরে শূন্য। এতে রোগীরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সুবিধা পাচ্ছেন না। মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টের (ল্যাব) দুটি পদের একটি শূন্য। এতে সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের ছুটতে হয় বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।

অন্যদিকে জুনিয়র কনসালট্যান্ট (মেডিসিন) ও আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার (আরএমও) পদটি শূন্য আছে। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিক্যাল অফিসারের (স্যাকমো) ১৩টি পদের মধ্যে ৮টি পদ শূন্য, নার্সের ১৪টি পদের মধ্যে ৪টি শূন্য, নার্সিং সুপারভাইজারের ২টি পদের মধ্যে একটি শূন্য, মিডওয়াইফের ৫টি পদের মধ্যে ২টি পদ শূন্য, সহকারী স্বাস্থ্য পরিদর্শকের সাতটি পদের মধ্যে ৬টি পদ শূন্য, স্বাস্থ্য পরিদর্শকের ২টি পদের ২টিই শূন্য, অফিস সহকারীর ৩টি পদের মধ্যে ২টি পদ শূন্য, ক্লিনারের ৫টি পদের মধ্যে ৪টি পদ শূন্য, নিরাপত্তা প্রহরীর ২টি পদের মধ্যে ১টি পদ শূন্য রয়েছে।

বড়লেখা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রত্নদ্বীপ বিশ্বাস বলেন, ‘৩১ শয্যার জনবল দিয়েই ৫০ শয্যার কার্যক্রম চলছে। ৩১ শয্যার জনবলেও বেশ কিছু পদ শূন্য ছিল। এই সীমিত জনবল নিয়েও আমরা সাধ্যমতো জনগণকে স্বাস্থ্যসেবা দিয়ে যাচ্ছি। জনবল নিয়োগের ব্যাপারে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। জনবল বাড়লে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।’

একই অবস্থা জেলার অন্যান্য উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোরও।

মৌলভীবাজার জেলা সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মুর্শেদ মোবাইলে বলেন, ‘সব কটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অত্যাধুনিক ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন সংযোজন করছে সরকার। মৌলভীবাজারের সব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তা চালু হবে। এ ছাড়া বন্ধ থাকা যন্ত্রগুলো সচল করা ও লোকবল নিয়োগের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে আমি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলাপ করব।’

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন

বাংলাদেশের ইলিশে খুশির জোয়ার পশ্চিমবঙ্গে

বাংলাদেশের ইলিশে খুশির জোয়ার পশ্চিমবঙ্গে

পদ্মার ইলিশ

খুচরা বাজারে দাম কত হবে, প্রাথমিকভাবে না জানা গেলেও ব্যবসায়ীরা অনুমান করছেন, প্রতি কেজি ইলিশ ১২০০ থেকে ১৩০০ ভারতীয় মুদ্রায় বিক্রি হতে পারে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাঠানো উপহার পদ্মার ইলিশ হাওড়া বাজারে ঢুকতেই খুশির জোয়ার বয়ে গেছে গোটা পশ্চিমবঙ্গে।

বুধবার বিকেল পাঁচটায় বেনাপোল-পেট্রাপোল সীমান্ত দিয়ে কাস্টমস ও অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রথম দফায় ৮০ মেট্রিক টন ইলিশভর্তি ট্রাক ভারতে প্রবেশ করে। পরে রাতেই এসব ইলিশ হাওড়া পাইকারি বাজারে যায়। ইলিশের আশায় অনেক রাত পর্যন্ত জেগেছিলেন এই বাজারের ব্যবসায়ীরা।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই শুরু হয়ে যায় হাওড়া বাজারে পদ্মার ইলিশের নিলাম। এখান থেকেই পরে ছড়িয়ে পড়ে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বাজারে। ইলিশ কেনার আশায় এদিন প্রস্তুতি নিয়েই বাড়ি থেকে বের হন অনেক ক্রেতা।

আশ্বাস দেয়া বাকি দুই হাজার মেট্রিক টন ইলিশ আগামী ১০ অক্টোবরের মধ্যে ভারতে ধাপে ধাপে প্রবেশ করবে।

খুচরা বাজারে দাম কত হবে, প্রাথমিকভাবে না জানা গেলেও ব্যবসায়ীরা অনুমান করছেন, প্রতি কেজি ইলিশ ১২০০ থেকে ১৩০০ ভারতীয় মুদ্রায় বিক্রি হতে পারে।

২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশ ভারতে ইলিশ রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। কিন্তু এবার নিয়ে গত তিন বছর ধরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার হিসেবে বাংলাদেশ সরকার পূজার আগে ভারতে ইলিশ রপ্তানি করছে।

বেশ কয়েক বছর ধরেই পশ্চিমবঙ্গের বাজারে ইলিশের খরা চলছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র নিয়ে প্রথম দফার ইলিশ বাজারে পৌঁছায় খুশি রাজ্যটির ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা।

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন

গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা

গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা

প্রতীকী ছবি

সিলেট অঞ্চলের ক্ষেত্রগুলোতে খনন করা হচ্ছে নতুন নতুন কূপ। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্ষেত্র ও কূপগুলোয় আরও গভীরে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। তবে এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত।

দেশে চলমান গ্যাস সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে উৎপাদন ব্যবস্থা। র‌্যাশনিং করা হচ্ছে সিএনজি স্টেশনগুলোতে। আমদানি করা এলএনজিতে মিটছে না চাহিদা।

এ অবস্থায় দেশের প্রচলিত গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন বাড়াতে চায় সরকার। এর অংশ হিসেবে সিলেট অঞ্চলের ক্ষেত্রগুলোতে খনন করা হচ্ছে নতুন নতুন কূপ। একই সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাওয়া ক্ষেত্র ও কূপগুলোয় আরও গভীরে গ্যাস অনুসন্ধানের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এ কাজে দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সকে কাজে লাগাতে চায় বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।

মন্ত্রণালয় জানায়, যেসব উদ্যোগ নেয়া হয়েছে, সেগুলো শেষ হলে দেশে গ্যাসের উৎপাদন বাড়বে। এতে সংকট কিছুটা হলেও কমবে। তবে যতক্ষণ তা না হচ্ছে, ততক্ষণ ব্যাকআপ হিসেবে থাকবে এলএনজি আমদানি ও তার ব্যবহার।

এ বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জ্বালানি নিরাপত্তা রক্ষা করতে যা যা করা দরকার, সরকার সেটা করছে। আগামীতে জ্বালানি নিরাপত্তা আরও সংহত করতে আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’

তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০৪১ এর যে উন্নত বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেন, সেখানে জ্বালানি নিরাপত্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই নিরাপত্তার জন্য স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। আশা করি, সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব ধরনের সংকট দূর করা সম্ভব হবে।’

তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের দেশীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্সের নির্বাহী পরিচালক মোহাম্মাদ আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘দেশে গ্যাস উত্তোলনে সরকার সর্বশক্তি নিয়োগ করতে চায়। এজন্য বাপেক্সও নিজেকে প্রস্তুত করেছে। সরকারও আমাদের সব ধরনের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত। আমরা সহযোগিতা পাচ্ছি।’

জ্বালানি বিভাগের দেয়া তথ্য মতে, সরকার তার নিয়মিত গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন বাড়াতে চাইছে। এরই অংশ হিসেবে চলমান কূপের পাশাপাশি ওয়ার্কওভার (নতুন ও গভীর) কূপ খনন করা হচ্ছে।

এর বেশির ভাগই সিলেট বিভাগে। বাপেক্সের নতুন তিনটি কূপ থেকে গ্যাসের উৎপাদন বাড়বে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট। তবে এ জন্য অপেক্ষা করতে হবে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। এ ছাড়া, আরও কয়েকটি কূপ খননের কাজ চলমান আছে। এই সব প্রকল্প শেষ হলে দেশে ক্রমশ বাড়তে থাকা গ্যাসের ঘাটতি কিছুটা কমবে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, বর্তমানে গ্যাসের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হচ্ছে। এতে খরচ ধরা হয়েছে ১৬৩ কোটি ৩২ লাখ টাকা।

এর আওতায় সিলেটের জৈন্তাপুর, বিয়ানীবাজার ও গোলাপগঞ্জ গ্যাস ক্ষেত্রে তিনটি নতুন কূপ খনন বা ওয়ার্কওভার করা হচ্ছে। এগুলো হলো সিলেট গ্যাস ক্ষেত্র, কৈলাসটিলা গ্যাস ক্ষেত্র ও বিয়ানীবাজার গ্যাসক্ষেত্র।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরামর্শে রূপকল্প-২ এর আওতায় এই নতুন গ্যাসকূপ খননের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এটা বাস্তবায়ন করছে সরকারি কোম্পানি বাপেক্স।

সূত্র জানায়, এর মধ্যে সিলেট গ্যাস ক্ষেত্রের ৮ নম্বর কূপের খননকাজ শেষ হবে আগামী বছরের জানুয়ারি মাসে। কৈলাসটিলা গ্যাস ক্ষেত্রের ৭ নম্বর কূপের খনন শেষ হবে ২০২২ সালের এপ্রিলে ও বিয়ানীবাজার-১ কূপের খনন শেষ হবে আগামী বছরের মাঝামাঝি বা জুন নাগাদ।

বাপেক্স সূত্র বলছে, নির্ধারিত সময়ের ছয় মাস আগেই তাদের প্রকল্প শেষ হবে। ফলে গ্যাসের যে সংকট চলমান আছে, তা অনেকাংশে কমে আসবে।

মন্ত্রণালয় জানায়, এরই মধ্যে ওয়ার্কওভার অপারেশনের কাজ এবং বাপেক্সের সঙ্গে চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। শেষ হয়েছে দরপত্র ও মালামাল সংগ্রহের কাজ। এখন চলছে দরপত্র মূল্যায়ন, যা প্রায় শেষ পর্যায়ে। শেষ হয়েছে বিদেশি পরামর্শক নিয়োগের কাজও। পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করা হয়েছে পরিবেশ অধিদপ্তরে। বর্তমানে সিলেট-৮ নম্বর কূপের (জৈন্তাপুর এলাকায়) রিগ ফাউন্ডেশন মডিফিকেশন কাজ চলমান আছে। এই কূপের লোকেশেন শ্রীকাইল-৪ কূপ খনন শেষে বিজয়-১৮ রিগ মবিলাইজেশন শুরু হয়েছে।

মন্ত্রণালয় জানায়, গ্যাস সংকট থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে সিলেট জেলার জকিগঞ্জ উপজেলায় রূপকল্প-২ খনন প্রকল্পের আওতায় জকিগঞ্জ-১ অনুসন্ধান কূপ খনন এরই মধ্যে শেষ হয়েছে। চলতি বছরের ১ জানুয়ারি খননের কাজ শুরু হয়। খননের সময়সীমা ঠিক করা হয়েছিল ৩০ সেপ্টেম্বর। কিন্তু এর আগেই এই কূপটির সফল খনন শেষ করে বাপেক্স। এতে ব্যয় হয় ৮৭ কোটি ২২ লাখ টাকা।

এদিকে এরই মধ্যে জকিগঞ্জ-১ কূপে ২ হাজার ৯৮১ মিটার খনন সম্পন্ন করে ৪টি জোনে ডিএসটি সম্পন্ন করেছে বাপেক্স। কূপটির ২ হাজার ৮৭০ মিটার গভীরে ৬৮ বিসিএফ বা বিলিয়ন ঘনফুট বাণিজ্যিক গ্যাসের মজুদ পাওয়া গেছে।

এ পরিপ্রেক্ষিতে গত ৯ আগস্ট জ্বালানি নিরাপত্তা দিবসে জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রকে দেশের ২৮তম গ্যাসক্ষেত্র হিসেবে ঘোষণা করে সরকার।

বর্তমানে জকিগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্র এলাকায় জকিগঞ্জ-১ কূপের বিজয়-১২ রিগ ডাউন করে মেইন্যানটেনেন্সের কাজ চলমান আছে এবং এই কাজ শেষে সালদা নদী-২ ওয়ার্কওভারের উদ্দেশ্যে মবিলাইজেশন শুরু হবে।

অন্যদিকে মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া ও রাজনগর উপজেলায় অবস্থিত ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রেটির দুইটি কূপ খননের কাজ চলমান আছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

এই কূপ খননে বাপেক্সের নিজস্ব অর্থায়নে ফেঞ্চুগঞ্জ-৩ কূপ এবং ফেঞ্চুগঞ্জ-৪ কূপ ওয়ার্কওভার কার্যক্রম চলছে।

ফেঞ্চুগঞ্জ গ্যাসক্ষেত্রে বিজয়-১০ রিগের মাধ্যমে ফেঞ্চুগঞ্জ-৪ কূপ ওয়ার্কওভার সম্পন্ন করা হয়েছে এবং জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ১০-১২ এমএমসিএফ হারে গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে।

বর্তমানে একই রিগ ফেঞ্চুগঞ্জ-৩ কূপ ওয়ার্ক ওয়ার্কওভারের লক্ষ্যে মবিলাইজেশন সম্পন্ন করে ওয়ার্কওভার কাজ শুরু করা হয়েছে।

এছাড়া সিলেট গ্যাস ফিল্ডস লিমিটেড (এসজিএফএল)-এর হরিপুর স্ট্রাকচারে সরকারি অর্থায়নে ডিসেম্বর ২০১৩ থেকে ডিসেম্বর ২০২১ মেয়াদকালে ১৭১ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে সিলেট-৯ নম্বর কূপ খনন হচ্ছে।

এরই মধ্যে সিলেট-৯ নম্বর কূপটির খনন শেষে গ্যাস গ্যাদারিং পাইপলাইন নির্মাণ করে চলতি মাসের ৩ তারিখ থেকে দিনে ৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জালালাবাদ গ্যাস সরবরাহ এলাকায় সরবরাহ করা হচ্ছে।

গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
সম্প্রতি সিলেটের হরিপুর গ্যাস ক্ষেত্রে চারটি স্তরে গ্যাসের অবস্থান চিহ্নিত করেছে বাপেক্স

আরও যা ভাবা হচ্ছে

দেশের চলমান গ্যাস সংকট মোকাবিলা ও ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে আরও কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে রয়েছে বন্ধ হয়ে যাওয়া খনি ও কূপগুলোর আরও গভীরে অনুসন্ধান। একই সঙ্গে উন্নত প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে দেশের হাইপ্রেশার জোনগুলোতে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কূপ খনন করা। এইসব কাজে দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ও কার্যকর করে তোলা হবে।

গ্যাস সংকটের কারণ

বর্তমানে দেশে গ্যাসের দৈনিক চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট। গত ১৪ সেপ্টেম্বর পেট্রোবাংলা মোট সরবরাহ করে ৩১০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর মধ্যে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে ২৪২ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে। চাহিদা ও সরবরাহে ঘাটতি ছিল ১২০ কোটি ঘনফুট।

গত দশকের প্রথম দিকে সরকারের নানা কার্যক্রমে দেশের দৈনিক গ্যাস উৎপাদন বেড়ে ২৭০ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছিল। বর্তমানে তা কমে ২৪০ কোটি ঘনফুটে নেমে এসেছে।

কমছে দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন

বর্তমানে দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে ২৪০ কোটি ঘনফুট গ্যাস মিলছে। জ্বালানি বিভাগের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছর গ্যাসের দৈনিক উৎপাদন ২৩০ কোটি ঘনফুটে নেমে আসতে পারে।

নতুন বড় কোনো গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত না হলে ২০২২-২৩ সালে দেশের ক্ষেত্রগুলো থেকে দিনে গ্যাস উৎপাদন ১৮ দশমিক ৪ কোটি ঘনফুট কমতে পারে। ২০২৩-২৪ সালে দৈনিক উৎপাদন ৪৩ দশমিক ৫ কোটি ঘনফুট কমে যেতে পারে। এ সময় শেভরনের অধিকাংশ গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন বন্ধ হতে পারে। বিকল্প হিসেবে সরকার এলএনজির আমদানি বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরের দিকে এলএনজি থেকে আমদানি করে দৈনিক ২০০ থেকে ২৫০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাহিদা মেটানো হবে বলে সরকারের ধারণা।

দেশে গ্যাসের যত ব্যবহার

সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ এবং বাংলাদেশ তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) থেকে পাওয়া তথ্যমতে, প্রতি বছর দেশে গ্যাস ব্যবহার হয় গড়ে ১ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) বা ১০০ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ) থেকে ১ দশমিক ১ টিসিএফ। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে ৪৩ দশমিক ২৮ শতাংশ, শিল্প কারখানায় ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ, বাসাবাড়িতে ১৫ দশমিক ২৫ শতাংশ, শিল্পকারখানার নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্রে (ক্যাপটিভ পাওয়ার) ১৫ দশমিক ১২ শতাংশ, সার উৎপাদনে ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ, সিএনজি স্টেশনে ৪ দশমিক ১৬ শতাংশ, বাণিজ্যিক দশমিক ৭৬ শতাংশ ও চা-বাগানে দশমিক ১০ শতাংশ ব্যবহার হয়।

এ মুহূর্তে গ্যাসের অভাবে প্রায় ২ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে না। প্রতি ইউনিট গ্যাসে বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ গড়ে ৩ টাকা, কয়লায় সাড়ে ৮ টাকা, তেলে (ফার্নেস) ১৪ টাকা ও তেলে (ডিজেল) ২৪ টাকা। সে কারণে বিদ্যুৎ বিভাগ লোকসান কমানোর জন্য গ্যাস দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়।

গ্যাস সংকট কাটাতে দেশীয় উৎপাদন বাড়ানোর চিন্তা
গ্যাস সংকটের কারণে মাঝেমধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসাবাড়িতে জ্বলে না গ্যাসের চুলা

দরকার গভীর ও নতুন এলাকায় খনন

বাংলাদেশে যেসব স্থানে গ্যাস পাওয়া গেছে, তা গড়ে ৫ হাজার মিটার গভীরতায়। বিজিএফসিএলের পাঁচটি গ্যাসক্ষেত্রেও এই স্তর থেকে গ্যাস মিলেছে। এই স্তরের আরও নিচে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এ জন্য প্রয়োজন ডিপ ড্রিলিং বা মাটির আরও গভীরে খনন।

বাংলাদেশের সরকারি সংস্থা বাপেক্সসহ বিদেশি যেসব কোম্পানি রয়েছে, তাদের রিগগুলো গড়ে ৫ হাজার মিটার খনন করার ক্ষমতা রয়েছে। ৭ হাজার মিটারের বেশি গভীরতায় খনন করতে হলে নতুন রিগ কিনতে হবে বাপেক্সের জন্য। এ ছাড়া রিগ ভাড়া করে ও ঠিকাদার দিয়েও বেশি গভীরতায় খনন করা গেলে গ্যাসের নতুন মজুদের সন্ধান মিলবে বলে অনেকে মনে করেন।

দেশে একমাত্র ভোলায় দুটি গ্যাসক্ষেত্র ছাড়া আবিষ্কৃত সব ক্ষেত্রের ভূ-কাঠামোগত বৈশিষ্ট্য হলো ‘অ্যান্টি ক্লেইন স্ট্রাকচার। ভোলায় আবিষ্কৃত দুটি ক্ষেত্র নতুন বৈশিষ্ট্যের স্ট্র্যাটিগ্রাফিক ভূ-কাঠামোর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ভোলা, বরিশাল হয়ে খুলনা এমনকি রাজশাহী পর্যন্ত এই স্ট্র্যাটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি। পাবনার মোবারকপুর স্ট্র্যাটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে দেশের ২৭তম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে।

ভোলা ও পাবনার মোবারকপুর হলো বেঙ্গল বেসিনভুক্ত এলাকা। এসব এলাকার বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো দেশের প্রধান নদীগুলোর অববাহিকায় মিলছে গ্যাস। অথচ এসব স্থানে অনুসন্ধান ও উত্তোলন কূপ খননের দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি নেই সরকারের।

ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠান ওএনজিসিও একই ধরনের ভূকাঠামোয় গ্যাস ও তেল পেয়েছে। এটি মোবারকপুর থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের স্ট্র্যাটিগ্রাফিক স্ট্রাকচারে ইছাপুরে। এই ভূকাঠামো গোটা উত্তরবঙ্গে রয়েছে। সেখানেও গ্যাস প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

তবে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়াতে যে পরিমাণ কূপ নতুন নতুন এলাকায় খনন করা দরকার, পেট্রোবাংলা তা করছে না।

প্রস্তুত বাপেক্স

দেশের একমাত্র রাষ্ট্রীয় তেল ও গ্যাস অনুসন্ধান এবং উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেড বা বাপেক্স। অনেক সময় প্রতিষ্ঠানটি বেশির ভাগ ক্ষেত্র আবিষ্কার করেও উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ পায় না। এক অজানা কারণে বাপেক্সের আবিষ্কৃত ক্ষেগুলোয় কূপ খনন, উত্তোলন ও ব্যবস্থাপনার কাজ দেয়া হয় বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোতে। প্রশ্ন আছে বাপেক্সের সক্ষমতারও।

তবে বাপেক্সের এমডি মোহাম্মদ আলী নিউজবাংলাকে বলেন, বাপেক্স এখন ৫ হাজার মিটারের বেশি ৭ হাজার মিটার সক্ষমতার রিগ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে। সরকারও এ জন্য সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে। এ ছাড়া বাপেক্স সব ধরনের বিশেষজ্ঞ নিয়োগের কাজ শেষ করেছে।

বিদেশি প্রতিষ্ঠানে কাজ করা অভিজ্ঞ কর্মীদের নিয়োগ দিয়েছে বাপেক্স। একই সঙ্গে অবসরে চলে যাওয়া অভিজ্ঞ বাপেক্স কর্মীদেরও চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ধরে রাখা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘সরকার চায়, বাপেক্সকে শক্তিশালী করে দেশের গ্যাস সংকট মোকাবেলা করতে। আমরা সেই চ্যালেঞ্জ নিতে প্রস্তুত। এ জন্য সরকারেরও সব ধরনের সহযোগিতা পাচ্ছি।’

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন

দূরের বস্তু দেখার ক্ষমতা হারাচ্ছে শিশুরা

দূরের বস্তু দেখার ক্ষমতা হারাচ্ছে শিশুরা

মোবাইল ও কম্পিউটার ডিভাইস মাত্রাতিরিক্ত আসক্তিতে বাড়ছে শিশুদের ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত রোগ মায়োপিয়া। ছবি: নিউজবাংলা

করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকায় বাচ্চাদের হাতে উঠেছে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ, নোটবুক। যারা আগে এসব ডিভাইস থেকে দূরে ছিল তারাও হয়েছে আসক্ত। খেলার সময়, খাওয়ার আগে, অনলাইন ক্লাস, ঘুমের সময় ক্ষণে ক্ষণে চাই মোবাইল। আর এতে করে শিশুদের মাঝে ‘মায়োপিয়া’ বা চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত রোগ বাড়ছে।

রাজধানীর একটি ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী আরিশা। বয়স ১১ বছর। চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত রোগের কারণে চিকিৎসকের পরামর্শে গেল তিন বছর ধরে চশমা ব্যবহার করছেন। ছয় মাস পর পর চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করা লাগে। সবশেষ জুনে চশমার পাওয়ার পরিবর্তন করা হয়েছে।

আরিশার মা ফামিদা তারিন জানান, এটা জন্মগত কোনো সমস্যা নয়। পড়াশোনা ও অধিক সময় মোবাইল ব্যবহারের কারণে কমে এসেছে দূরের দৃষ্টি শক্তি। করোনার কারণে মোবাইল নির্ভরতা আরও অনেক বেড়েছে। করোনার মধ্যে রুটিনের বাইরে চলে গেছে মোবাইল ব্যবহারের পরিমাণ।

ফামিদা বলেন, ‘মাঝে মাঝে মাথা ব্যথা ও চোখ ব্যথায় ভোগে আরিশা। এখন রাতে ঘুমায় দেরি করে, সকালে ওঠে দেরি করে। উঠেই মোবাইল খোঁজে। কিছু বললে বলে মোবাইলে পড়ালেখা করবে। আর আমরা সাংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকায় মনিটরিংও করতে পারছি না।’

আরিশার মতো হাজার শিশু এখন এই সমস্যায় ভুগছে।

করোনাভাইরাসের কারণে দীর্ঘদিন ঘরবন্দি থাকায় বাচ্চাদের হাতে উঠেছে মোবাইল কিংবা ল্যাপটপ, নোটবুক। যারা আগে এসব ডিভাইস থেকে দূরে ছিল তারাও হয়েছে আসক্ত। খেলার সময়, খাওয়ার আগে, অনলাইন ক্লাস, ঘুমের সময় ক্ষণে ক্ষণে চাই মোবাইল। আর এতে করে শিশুদের মাঝে ‘মায়োপিয়া’ বা চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত রোগ বাড়ছে।

করোনার সময়ে মাইওপিয়ায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

দূরের বস্তু দেখার ক্ষমতা হারাচ্ছে শিশুরা

কী পরিমাণ এমন রোগী রয়েছে তার পরিসংখ্যান না থাকলেও দেশের সবচেয়ে বড় জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের বহির্বিভাগের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক। গেল দুই বছরে এই হাসপাতাল থেকে সেবা নেওয়া মায়োপিয়া রোগী বেড়েছে ১১ শতাংশ।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, করোনার আগে এই হাসপাতালে সেবা নেয়া রোগীর ২২ শতাংশ মাইয়োপিয়া আক্রান্ত রোগী পাওয়া যেতে। করোনা কারণে ঘরবন্দি থাকায় শিশুদের মধ্যে বেড়েছে এ রোগ। এখন বেড়ে ৩৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।

দূরের বস্তু দেখার ক্ষমতা হারাচ্ছে শিশুরা

চিকিৎসকরা বলছেন, প্রায় দুই বছর শিশুরা ঘরবন্দি। কাজ না থাকায় সারাক্ষণ স্ক্রিনে; দূরের জিনিস দেখেনি। ফলে তাদের দূরের দৃষ্টিশক্তি ঠিকমতো তৈরিই হচ্ছে না। আটবছর পর্যন্ত শিশুদের চোখের গঠনগত পরিবর্তন হতে থাকে। এই বয়সের শিশুরা যদি দূরের জিনিস না দেখে তাহলে আস্তে আস্তে দূরের দৃষ্টিশক্তিই হারিয়ে ফেলবে। বড় হওয়ার পরেও তাদের এই সমস্যা কাটবে না।

এ বিষয়ে জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিউটের অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী জানান, করোনার কারণে মায়োপিয়া রোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। সরকারের দেয়া বিধিনিষেধ স্বাভাবিক হওয়ার পর হাসপাতালে রোগী অনেকগুণ বেড়েছে।

নিউজবাংলাকে তিনি বলেন, ‘লকডাউনের মধ্যে আমাদের হাসপাতালে দৈনিক ৪০ থেকে ৫০ জন রোগী দেখলেও এখন এই সংখ্যা বেড়ে ৩০০ খেকে ৪০০ হয়েছে। এদের মধ্যে ৩৩ শতাংশই দূরে দেখার দৃষ্টিতে সমস্যা নিয়ে আসে। তার একটি বড় অংশ শিশুরা।’

খায়ের আহমেদ জানান, করোনার আগে ২০১৯ সাল ও ২০২০ সালে ২০ থেকে ২২ শতাংশ ছিল মায়োপিয়া। করোনার মধ্যে এ জাতীয় রোগীর হার বেড়েছে ১১ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ করোনা মধ্যে শিশুদের ডিভাইসে আশক্তি।

শিশুরা এখন অধিকাংশ সময় এখন অনলাইনে কাটায়। করোনা সংক্রমণের আগে বাচ্চারা বাবা-মায়ের সঙ্গে বিভিন্ন স্থানের ঘুরতে যেতে পারত, এখন সেটাও করতে পারেনা। ঘরবন্দি বাচ্চারা সময় কাঁটতে মোবাইলকে বেছে নিচ্ছে। ঘুমের সময় ছাড়া বাকি সময় কাটছে মোবাইলের মাধ্যমে।

করণীয় কী

করোনার কারণে এতদিন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ছিল। ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হচ্ছে। শিশুদেরকে মোবাইল, ল্যাপটপ জাতীয় ডিভাইস থেকে ফেরাতে তাদের হাতে তুলে দেয়া যেতে পারে গল্পের বই। সেই সঙ্গে শিশুদের সঙ্গে বাবা-মায়েরা গল্প করতে পারে। পরিবারের সবাই মিলে মিলে মাঝে মাঝে আড্ডার ব্যবস্থা করতে পারে।

সবাই মিলে চেষ্টা করলে এই সমস্যা কাটিয়ে তোলা যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের পরামর্শ, শিক্ষকরা অনলাইনে ক্লাস নিলে যেন বিরতি নেয়। ৩০ মিনিট পর পর গ্যাপ দিলে বেশি ভালো হয়।

এ সমস্যা কাটাতে আরও কিছু পরামর্শ দিয়েছেন শিশু বিশেষজ্ঞরা। এর মধ্যে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের কথা বলেছেন তারা। শাক-সবজি বেশি করে খেতে হবে। শহর এলাকার বাচ্চাদের বেশির ভাগ ফাস্ট ফুডের ওপর নির্ভরশীল। এই খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করতে হবে।

দূরের বস্তু দেখার ক্ষমতা হারাচ্ছে শিশুরা

ডিভাইসগুলো অবশ্যই সীমিত পরিসরে ব্যবহার করতে হবে। অল্প আলোতে লেখাপড়া যাতে না করে সেটাও লক্ষ্যে রাখতে হবে। বাড়ির কাজ করলে বিরতি দিয়ে দিয়ে করতে হবে। গল্পের বই একটানা যেন দীর্ঘ সময় ধরে না পড়ে। এক্ষেত্রে শুধু অভিভাবকরা নয়, চিকিৎসক ও শিক্ষকদেরও ভূমিকা রাখতে হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের চক্ষু বিজ্ঞানের বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাজনীন খান নিউজবাংলাকে বলেন, চোখের ক্ষীণ দৃষ্টিজনিত সমস্যা দূর করতে কোনোভাবে যেন একনাগাড়ে কম্পিউটারের সামনে বা কোনো ডিভাইসের সামনে না থাকে সেটা নিশ্চিত করতে হবে।

তার ভাষ্য, শিশুদের চোখের সমস্যা স্থায়ী হয়ে যাওয়ার কারণ সঠিক সময়ে তাদের চোখ বা দৃষ্টিশক্তি পরীক্ষা করা হয় না। শিশুদের দৃষ্টিশক্তি কম থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে যতক্ষণ তারা কথা না বলে বোঝাতে পারছে ততক্ষণ তাদের অভিভাবকরা বুঝতেই পারেন না তার শিশুর চোখের দৃষ্টিশক্তি কত।

দেশের বাইরেও পরিস্থিতি আশঙ্কাজনক

করোনাভাইরাস মহামারিতে ঘরে আটকে থাকা শিশুদের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্য বেরিয়ে এসেছে চীন ও হংকংয়ে পরিচালিত কয়েকটি গবেষণাতেও।

আরও পড়ুন: ঘরবন্দি শিশুদের দূরের বস্তু দেখার ক্ষমতা কমছে

হংকংয়ের দ্য চায়নিজ ইউনিভার্সিটি অফ হংকং-এর একদল গবেষক দেড় বছরের বেশি সময় গবেষণা চালানোর পর বলছেন, দূরের বস্তু পরিষ্কার দেখতে পাওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে অনেক শিশু। তাদের নিবন্ধটি ব্রিটিশ জার্নাল অফ অফথমলজিতে সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে।

গবেষকরা গত বছর ৬ থেকে ৮ বছর বয়সী ৭০৯ শিশুকে পর্যবেক্ষণ করে অনেকের মধ্যেই হ্রস্বদৃষ্টি বা মায়োপিয়ার লক্ষণ দেখতে পান। এ ধরনের শিশুরা কাছের বস্তুকে ভালোভাবে দেখতে পেলেও দূরের বস্তু ছিল ঘোলাটে। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় করোনার প্রথম বছরে শিশুদের মায়োপিয়ায় আক্রান্তের হার বেড়েছে ১০ শতাংশ।

গবেষকরা বলছেন, মহামারির সময়ে শিশুদের জীবনযাপনে পরিবর্তন আসায় মায়োপিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। তারা বাড়ির বাইরে যেতে পারছে না। পাশাপাশি দিনভর ঘরের ভেতরে ডিজিটাল মাধ্যমে আসক্তি, আঁকাআঁকি, বই পড়ার মতো কাজ করায় ‘হ্রস্বদৃষ্টি’ তৈরি হচ্ছে।

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, মায়োপিয়ার ক্ষেত্রে জিনগত কারণের চেয়ে বেশি দায়ী ঘরের বাইরে না যাওয়া। ঘরের মধ্যে দীর্ঘদিন আটকে থাকলে মানুষের চোখ দূরের বস্তুকে দেখার জন্য প্রয়োজনীয় অভিযোজন ক্ষমতা হারাতে থাকে।

হংকংয়ের গবেষকরা তাদের নিবন্ধে লিখেছেন, ‘মহামারির বিস্তার ঠেকাতে ঘরে থাকার বাধ্যবাধকতা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার মতো ব্যবস্থা চিরদিন থাকবে না, তবে এই সময়ে ডিজিটাল ডিভাইসে আসক্তিসহ মানুষের জীবনযাপনে যে পরিবর্তন ঘটছে, তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সবার জীবনে, বিশেষ করে শিশুদের ওপর থাকবে।’

আধুনিক জীবনে বিভিন্ন দেশেই মায়োপিয়া উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। চীনের ৯০ শতাংশের মতো মানুষ হ্রস্বদৃষ্টির সমস্যায় আক্রান্ত, এ কারণে দেশটিতে মায়োপিয়াকে মহামারি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

একটি গবেষণায় দেখা গেছে, চীনে ২০২০ সালে ৬ বছর বয়সী শিশুদের মায়োপিয়ায় আক্রান্তের সংখ্যা আগের বছরের চেয়ে তিন গুণ বেড়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে প্রকাশিত ওই গবেষণায় চীনে মায়োপিয়া বাড়ার কারণ হিসেবেও লকডাউনকে দায়ী করা হয়েছে।

আক্রান্তের লক্ষণ কী কী

ঘরে থাকা শিশু বারবার মোবাইল বা টেলিভিশন দেখার ইচ্ছা প্রকাশ করলে, বারবার চোখের পাতা বন্ধ করে খুলতে থাকলে মাওপিয়া আক্রান্ত হতে পারে। মাঝে মাঝে মাথা ও চোখব্যথা হতে পারে।

অনেক সময় দৃষ্টিত্রুটির কারণে চোখ বাঁকা হতে পারে। আবার চোখ বাঁকা হওয়ার কারণে দৃষ্টিতে ত্রুটি হতে পারে। কিছু পড়তে গেলে শিশু চোখ কুঁচকে দেখার চেষ্টা করছে কি না, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে।

লক্ষণগুলো দেখা দিলে অভিভাবকদের উচিত দ্রুত সময়ের মধ্যে শিশুকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এখন আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়েছে। আক্রান্ত শিশুরা যখন স্কুলে গিয়ে ক্লাস করবে, তাদের ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা দেখতে অসুবিধা হবে।

‘তারা (আক্রান্ত শিশু) ব্ল্যাকবোর্ডের লেখা খাতাতে তুলতে পারে না। এ কারণে পাশের বাচ্চা থেকে লেখা কপি করে।’

চিকিৎসা কী

এ রোগের প্রধান কারণ মোবাইল ফোন অথবা অন্য কোনো ডিভাইসের প্রতি নির্ভরতা। কম্পিউটার বা মোবাইল থেকে এক ধরনের নীল আলোর বিচ্ছুরণ ঘটে। নিয়মিত দীর্ঘসময় ধরে নীল উজ্জ্বল আলো চোখের ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যা দীর্ঘমেয়াদে অঙ্গটির ক্ষতি করে। করোনাভাইরাসের কারণে এ সমস্যা বেড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ রোগ থেকে বাঁচতে অভিভাবকদের সচেতনতা সবচেয়ে জরুরি।

জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ডা. খায়ের আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আমরা যারা চক্ষু বিশেষজ্ঞ, তাদের যেমন ভূমিকা রয়েছে, একই সঙ্গে এখানে অন্য চিকিৎসক ও অভিভাবকদের তেমন ভূমিকা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে শিশু চিকিৎসকরা। শিশুদের কোনো সমস্যা দেখা দিলে অভিভাবকরা দ্রুত তাদের কাছে নিয়ে আসেন। তারা অন্যান্য পরীক্ষার সঙ্গে চোখের পরীক্ষা করানোর পরামর্শ দিতে পারেন।

‘এসব সমস্যা দেখা দিলে হয়তো চশমা দিয়ে সমাধান করা যাবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সচেতনতায় এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব।’

আরও পড়ুন:
শিশু হত্যায় আসামির মৃত্যুদণ্ড চূড়ান্ত রায়ে বহাল
আপিলে ভার্চুয়াল পদ্ধতিতে ৪ হাজারের বেশি মামলা নিষ্পত্তি

শেয়ার করুন