বাজেট আলোচনায় স্তুতি কেন?

বাজেট আলোচনায় স্তুতি কেন?

পার্লামেন্টে এবারও সংক্ষিপ্ত বাজেট অধিবেশন চলছে। ৩ জুন বাজেট প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী। ফাইল ছবি

‘বাজেট অধিবেশনে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্যরা যতটুকু যা বলেন, তা নিজের প্রচারের জন্য বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সামনে বিশেষ করে। সবাইতো সে সুযোগও পান না। সেখানে স্তুতি গাওয়া হয়। প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের কথা বলা হয় না।’

‘বাজেট নিয়ে আমি কিছু বলব না। কারণ এটা বড় খটমটে ব্যাপার। এটা আমার ভালো লাগে না। যদিও তিন অক্ষরের শব্দটি মানুষের জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ।’ বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মশিউর রহমান রাঙ্গা এমন মন্তব্য করেন।

রাঙ্গাকে বাজেট নিয়ে আলোচনার জন্য সোমবার সময় দেয়া হয় ১৫ মিনিট। এক মিনিটেরও কম সময় তিনি এ জন্য ব্যয় করে বাকি সময় অন্যান্য রাজনৈতিক ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করে পার করে দেন।

এটাই এখন সংসদের স্বাভাবিক চিত্র। বাজেট নিয়ে বাজেট অধিবেশনে কথাই বলতে চান না সংসদ সদস্যরা। বাজেট আলোচনায় তারা যতটা সময় পান তার অধিকংশই ব্যয় করেন নেতৃত্বের স্তুতি ও বিরোধীদের গালমন্দ করতে। কিছু সময় তারা নির্বাচনী এলাকার উন্নয়ন নিয়েও কথা বলেন।

সংসদ সদস্যরা যে বাজেট নিয়ে তেমন আলোচনা করেন না, করতে চান না সে বিষয়টি নতুন করে এবার আলোচনায় আসে বাজেট ঘোষণার পর। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বাজেট নিয়ে যে আলোচনার আয়োজন করে সেখানে বিস্ফোরক মন্তব্য করেন সরকার দলীয় সংসদ সদস্য সাবের হোসেন চৌধুরী। একই আলোচনায় ১৪ দলের অন্যতম সদস্য ও ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি এবং সাবেক মন্ত্রী রাশেদ খান মেননের বক্তব্যও নজর কাড়ে।

সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বাজেট প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের কোনো ভূমিকা নেই। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদেরও এখন জাতীয় বাজেট কিংবা সরকারের অন্যান্য নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনো ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়া হয় না।’

রাশেদ খান মেমন বলেন, ‘এখন বাজেট অনেকটা আমলা নির্ভর। বাজেটে মানুষের কথা বলার সুযোগ হয় না। তাই এই বাজেট নিয়ে আলোচনা অর্থহীন।’

অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহানের মতে, ‘বাজেট আলোচনা এক ধরনের নাটক। সংসদ সদস্যরা নিজেদের এলাকার প্রকল্প নিয়ে কথা বলেন। বাজেট আলোচনায় গড়ে ১০ মিনিট সময় দেয়ার কোনো মানে নেই।’

পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান মনসুর বর্তমান বাজেট আলোচনা নিয়ে বলেন, ‘বাজেট অধিবেশনে যোগ দিয়ে সংসদ সদস্যরা যতটুকু যা বলেন, তা নিজের প্রচারের জন্য বলেন। প্রধানমন্ত্রীর সামনে বিশেষ করে। সবাইতো সে সুযোগও পান না। সেখানে স্তুতি গাওয়া হয়। প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর অর্থনৈতিক দর্শন বাস্তবায়নের কথা বলা হয় না।’

গত বছর বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছিল ২০২০ সালের ১০ জুন। সংক্ষিপ্ত ওই অধিবেশনে চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য পাঁচ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেছিলেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তাফা কামাল। পরে ৩০ জুন আকার ঠিক রেখে ওই বাজেট পাস হয়। ৯ কার্যদিবসের ওই অধিবেশন ছিল ইতিহাসের সংক্ষিপ্ততম বাজেট অধিবেশন।

এবারও বাজেট অধিবেশন হচ্ছে সংক্ষিপ্ত। তবে গতবারের চেয়ে তিন কর্মদিবস বাড়েছে। ১২ কার্যদিবসের এই অধিবেশন শুরু হয় ২ জুন। ৩ জুন অর্থমন্ত্রী সংসদে ২০২১-২২ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেন। দুইদিন বিরতি দিয়ে ৬ জুন সম্পুরক বাজেটের ওপর আলোচনা শুরু ও ৭ জুন তা পাস হয়।

এরপর টানা ছয় দিন বিরতি দিয়ে প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনা ১৪ জুন থেকে শুরু হয়। এই আলোচনা চলে ১৫, ১৬, ১৭ জুন। এরপর ২৮ জুন আবার আলোচনা হয়। সাধারণ আলোচনা শেষে ২৯ জুন অর্থবিল এবং ৩০ জুন মূল বাজেট ও নির্দিষ্টকরণ বিল পাস হবে। পরদিন ১ জুলাই বাজেট অধিবেশন শেষ হবে।

অধিবেশন সূচী অনুযায়ী, প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর মাত্র পাঁচদিন আলোচনা হবে। পুরো বাজেট পাসের প্রক্রিয়া ব্যয় হবে ১০ দিন। সেক্ষেত্রে ২০ থেকে ২৫ ঘণ্টা বাজেট আলোচনা হতে পারে। প্রতিদিন বেলা সাড়ে ১১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত এই আলোচনা চলছে।

সাবের হোসেন চৌধুরী

সিপিডির ওই আলোচনায় অংশ নিয়ে সাবের হোসেন চৌধুরী বলেন, ‘বাজেট প্রণয়নে সংসদ সদস্যদের কোনো ভূমিকা নেই। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদেরও এখন জাতীয় বাজেট কিংবা সরকারের অন্যান্য নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা রাখার সুযোগ দেয়া হয় না।’

“সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের সময় অন্তত বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির প্রধানদের নিয়ে বৈঠক হতো। কিন্তু এখন সেটিও হয় না। তাহলে আমরা কি সংসদে আছি শুধু ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলার জন্য?”

রাশেদ খান মেনন

একই আলোচনায় রাশেদ খান মেনন বলেন, ‘বাজেট নাটক কি-না, জানি না। একটি স্টেজ থাকে, সেখানে গিয়ে আমরা হাজির হই। বাজেট নিয়ে সংসদে আলোচনা অর্থহীন। আলোচনা করতে হয় বলেই করি। ১০ মিনিট সময় বরাদ্দ থাকলে কী হয়, একটি পয়েন্ট আলোচনা করতেই ১০ মিনিট চলে যায়। বাজেট অনেকটা আমলানির্ভর হয়ে গেছে।’

আহসান এইচ মনসুর

বাজেট অধিবেশনের এই হাল নিয়ে নিউজবাংলার সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন অর্থনীতি বিশ্লেষক ও পলিসি রিচার্স ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।

তিনি বলেন, বর্তমান বাজেট অধিবেশন পরিনত হয়েছে একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায়। যেন করতে হয় বলেই করা। মূল জিনিসটা হলো বাস্তবে এর কার্যকারিতা কী? কার্যকারিতা আসলে খুবই কম।’

‘আমি সবার কথা বলব না। অনেকেই হয়তো বাজেট নিয়ে ভালো কথা বলেন। তবে বেশির ভাগই বাজেট নিয়ে অধিবেশনে তেমন কিছু বলেন না।’

তিনি বলেন, ‘অবশ্যই তাদের (এমপিদের) বাজেট নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণ করা উচিত। মূল্য বা কর কেন বাড়ছে, কেন কমছে, জবাবদিহিতা কোথায়, কেন রেভিনিউ বাড়ছে না, কেন জেনেশুনে অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা ধরা হলো, কেন বেতন বাড়ানো হলো এসব বিষয়ে তো সংসদ সদস্যরাই আলোচনা করবেন।’

‘ইফেক্টিভলি এখন হয়ে গেছে সংসদ সদস্যরা কেবল সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বজায় রাখতেই সংসদে যাচ্ছেন। এখন তো বিরোধী দল তেমন কিছু না। তাই এখন সরকারি দলেরই উচিত গঠনমূলক সমালোচনা করা। সেটা হচ্ছে না।’

আহসান মনসুর বলেন, ‘এ থেকে মুক্তির জন্য এখন পরামর্শ হলো যারা বাজেট বোঝেন, তারা যেন ভালোমতো আলোচনা করেন। এমপি সাহেবরা তো সবাই এটা ভালো বোঝেন না।’

‘এজন্য একটি সাব কিমিটি করে দেয়া উচিত। আমাদের অর্থমন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটি আছে। তারা সাত দিন আলোচনা করবেন। এরপর বাজেট সংসদে উঠবে। সাব কমিটির চুলচেরা বিশ্লেষণ শোনার পর সাধারণ সদস্যরা আলোচনা করবেন। যুক্তরাষ্ট্রে কিন্তু এটা করা হয়। সাব কমিটি আলোচনা না করলে বাজেট পাস হয় না। তারা আলোচনার পর সংসদে বাজেট উত্থাপিত হয়। যারা বাজেট সম্পর্কে জানেন না, তারা বলবেন কী? আমার হয়তো জনপ্রিয়তা আছে, এমপি হয়ে চলে এলাম। কিন্তু বাজেট নিয়ে কী বলব? তাই দোষ দিয়ে লাভ নেই।’

‘প্রধানমন্ত্রীকে দায়িত্ব নিতে হবে। ইয়াংদের নিয়ে আসতে হবে। বারবার রদ্দি মাল নিয়ে এসে লাভ নেই। তারপর মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে।’

রেহমান সোবহান

জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনাকে ‘নাটক’ হিসেবে অভিহিত করেছেন সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান।

তিনি বলেন, বাজেট আলোচনা এক ধরনের নাটক। সংসদ সদস্যরা নিজেদের এলাকার প্রকল্প নিয়ে কথা বলেন। প্ল্যাকার্ড নিয়ে সংসদ সদস্যরা সংসদে কথা বলেন। বাজেট আলোচনায় একজন সংসদ সদস্য জন্য গড়ে ১০ মিনিট সময় দেয়ার কোনো মানে নেই।

আরও পড়ুন:
জানুয়ারি-ডিসেম্বর অর্থবছর করার তাগিদ

শেয়ার করুন

মন্তব্য