‘মুই এহন কুম্মে যামু’

‘মুই এহন কুম্মে যামু’

স্বামীর ভিটে থেকে উচ্ছেদ হওয়া বৃদ্ধার আকূতি। কিশোর নাতিকে নিয়ে আশ্রয় জুটেছে রাস্তার পাশের একটি ঝুপড়িতে। সেটিও নির্মাণ করে দিয়েছেন কয়েক জন সহৃদয় তরুণ।  

মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে ছিল স্বামীর এক টুকরো ভিটের ওপর ছোট্ট একটি টিনের ঘর। এই ঘরেই একদিন বধূ হয়ে এসেছিলেন আনোয়ারা বেগম। এরপর কত দিন কেটে গেছে। এক ছেলের জন্ম দেন আনোয়ারা। প্রায় দুই যুগ আগে তার স্বামী নুরু মিয়া মারা যান।

আর ছেলে মনির ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড় সিডরের সময় নিখোঁজ। এরপর পুত্রবধূ বাড়ি ছেড়ে চলে যান। তাদের এক বছরের শিশু নাইমকে বুকে আগলে রাখেন আনোয়ারা। সে এখন কিশোর। ভাড়ায় ভ্যান চালায়। যা রোজগার হয়, তা দিয়ে চলে দাদি-নাতির সংসার। মাথার ওপর টিনের চাল ফুটো হয়। পলিথিন দিয়ে ছাওয়া হয়। কিন্তু ১৩ নভেম্বর তাদের সেই জংধরা টিনের ঘর থেকে উচ্ছেদ করা হয়।

আনোয়ারা বেগম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ওইডা মোর স্বামীর ঘর। নাতিডারে লইয়া ওই ঘরে থাকতে আছি মুই। ওরা মাইর‌্যা ধইর‌্যা ঘর ভাইঙ্গা দিছে। মালামাল সব ভাইঙ্গা গুড়াইয়া দিছে। মুই এহন কুম্মে যামু, যাওনের মতো জাগা নাই কোনোহানে। পড়ানডা বাচানোর লইগ্যা এহন রাস্তার ওপর থাকতে আছি।’

এ ঘটনা বরগুনার বামনা উপজেলার ডৌয়াতলা ইউনিয়নের পাকা পোলঘাট এলাকার। নাতি নাইমকে নিয়ে সড়কের পাশে ঝুপড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন আনোয়ারা।

তাদের মানবেতর অবস্থা দেখে স্থানীয় কয়েক জন তরুণ ঝুপড়িটি নির্মাণ করে দিয়েছেন। তাদের কিনে দিয়েছেন চাল-ডালসহ কিছু খাবার।

Borgunawido

প্রতিবেশী কুদ্দুস মিয়া বলেন, প্রায় ৪০ বছর আগে আনোয়ারার স্বামী নুরুর কাছ থেকে তিনি ৫৬ শতাংশ জমি কেনেন। সম্প্রতি ওই জমিতে তার ছেলে আল-আমিনের জন্য ঘর তোলার জন্য গেলে আনোয়ারা বাধা দেন। পরে তিনি আদালতে যান। আদালত জমির দখল বুঝিয়ে দিতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেয়।

তিনি বলেন, নির্দেশ অনুযায়ী ভূমি অফিস ওই জমির দখল তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে। একই জমিতে ওই বৃদ্ধার তিন শতক জায়গা আছে। তাকে জমিরই অন্য এক জায়গায় ঘর তুলে থাকার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তিনি রাজি হননি।

বামনার ডৌয়তলা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান বলেন, নুরু জমি বিক্রি করলেও আনোয়ারা তিন শতাংশের মতো জমি সেখানে পাবেন। আনোয়ারা বড়জোর দেড় শতাংশ জমিতে বসবাস করতেন।

তিনি বলেন,কুদ্দুস ও তার ছেলেদের আমি অনুরোধ করেছিলাম ওই ঘরের জমিটুকু ছেড়ে দিতে। আমি প্রস্তাব দিয়েছিলাম যদি আনোয়ারার জমি নাও থাকে, তাহলে ওই ঘরের জমিটুকু কিনে নেয়া হবে। তবুও যাতে উনাকে ঘরছাড়া না করা হয়। কিন্তু ঘরটি ভেঙে দিয়ে কুদ্দুস জায়গা দখলে নিয়েছেন।’

জানতে চাইলে জেলা নাজির মাসুদ করিম বলেন, ‘৫৬ শতাংশ জমির মালিকানা কুদ্দুস গংদের দখল বুঝিয়ে দিতে আদালতের নির্দেশনা ছিল। সার্ভেয়ারসহ আমি গিয়ে জমির ক্রয়সূত্রে মালিক কুদ্দুসকে দখল বুঝিয়ে দিয়েছি। বৃদ্ধাকে ঘর ছাড়তে বলা হয়েছিল। তিনি ১৫ দিনের সময়ও নিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি ঘর ছাড়েননি। ফলে বিধিসম্মতভাবে আমাদের ওনার ঘরটি ভেঙে দিতে হয়েছে।’

জেলা প্রশাসক মোস্তাইন বিল্লাহ বলেন, ‘বিষয়টি মানবিক। আমি আনোয়ারার ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে তার আশ্রয়ের ব্যবস্থা করব।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য