20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
তাজরীনে আগুন: ৪৫ জন কি ক্ষতিপূরণ পাবে না

ক্ষতিপূরণের দাবিতে প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান নেয়া তাজরীন ফ্যাশনসের শ্রমিকরা। ছবি: সাইফুল ইসলাম

তাজরীনে আগুন: ৪৫ জন কি ক্ষতিপূরণ পাবে না

২০১২ সালের ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ান নিশ্চিন্তপুরের পোশাক কারখানায় আগুনে প্রাণ হারান ১১৪ জন। প্রাণে বাঁচতে চার তলা থেকে ঝাপ দিয়ে শারীরিক সক্ষমতা হারিয়ছেন বহুজন। ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ তুলে আট বছর পর জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন ৪৫ জন। ৬৯ দিন ধরে কর্মসূচি চললেও কোনো আশ্বাস পাচ্ছেন না।

আশুলিয়ার তাজরীন ফ্যাশনে আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ জন শ্রমিক প্রায় আড়াই মাস ধরে ক্ষতিপূরণের দাবিতে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান করছেন।

কারও কাছ থেকে আশার বাণী না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন আট বছর আগে আহত মানুষগুলো। এদের কারও মেরুদণ্ড ভাঙা, কারও হাত অচল, কারও পায়ে মারাত্মক জখম।

আগুনে পুড়ে যেতে থাকা ভবনের চার তলায় ছিলেন এই শ্রমিকরা। জীবন রক্ষায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন শ্রমিকরা। প্রাণে বেঁচেছেন বটে, তবে প্রতিটা মুহূর্ত হয়ে গেছে যন্ত্রণা ক্লিষ্ট।

শ্রমিকরা বলছেন, বিভিন্ন সংস্থা থেকে যৎসামান্য সহায়তা মিলেছে। কিন্তু শ্রম মন্ত্রণালয় বা পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ক্ষতিপূরণ তারা পাননি।

আগামী ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশে পোশাক খাতে সবচেয়ে মর্মান্তিক দুর্ঘটনার একটির আট বছর পূর্তি। সেদিন প্রাণ হারান ১১৪ জন। আহত হন বহুজন।

তাদের এই কর্মসূচির সঙ্গে অবশ্য দিবসের সম্পর্ক নেই। তারা চেয়েছিলেন গণমাধ্যমের, কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের।

কিন্তু কেউ যায়নি পাশে।

পরিবারের স্বজনদের সঙ্গে অবস্থানে অংশ নেন শিশুরাও। ছবি: সাইফুল ইসলাম

গত ১৮ সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচি পড়েছে ৬৯ দিনে। বহুজন অসুস্থ হয়েছেন। তখন হাসপাতালে বা বাড়িতে যেতে বাধ্য হয়েছেন। সুস্থ হলেই আবার এসেছেন প্রেসক্লাবে।

খোলা আকাশের নীচে জীবন কষ্টকর, তবে কাজ করতে শারীরিক সক্ষমতা হারানো মানুষদের কাছে এটা আরও বেশি যন্ত্রণার। কিন্তু জীবন আর চলে না যখন, তখন এই কষ্ট আর কষ্টই মনে হচ্ছে না।

তিনটি দাবি এই শ্রমিকদের। ১. আর্থিক ক্ষতিপূরণ, ২. আহত শ্রমিকদের সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মত পুনর্বাসন, ৩. আহত শ্রমিকদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

কর্মসূচির প্রথম সপ্তাহেই শ্রম মন্ত্রণালয় ও বিজিএমইএতে স্মারকলিপি দিলেও এখনো শুধু আশ্বাস ছাড়া কিছু পাননি তারা। পরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও জমা দিয়েছেন আবেদনপত্র।

তাদের অভিযোগ, আট বছর ধরে তারা শুধু ক্ষতিপূরণ, পুনর্বাসন ও সুচিকিৎসার আশ্বাস পেয়ে আসছেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

নিউজবাংলার সাথে কথা মো. সোলায়মান নামে একজনের সঙ্গে, যিনি তাজরীন গার্মেন্টসের চার তলায় সুইং সুপারভাইজর হিসেবে কাজ করতেন।

তিনি বলেন, ‘আগুন লাগার পরে গেটে তালা মাইরা দেয়। পরে জীবন বাচাইতে লাফ দেই। এরপর মেরুদণ্ডের সমস্যায় কাজ করবার পারি না।’

সোলায়মান জানান, ফয়জুর নামে একজন এসেছিলেন বিজিএমইএ থেকে। বলেন, ‘আমোগো সবার নামের লিস্ট নিয়ে গেছে। বইলা গেছে যে আমাগো নাম নাকি তারা যাচাই বাছাই করব। কিন্তু সেটাও ১৮ দিন আগে। এর মধ্যে আর কেউ আসেনি। আমাদের সাথে কথাও বলেনি।’

আরেক শ্রমিকর নাসিমা আক্তার বলেন, ‘যাগো বাড়িঘর আছে, যারা চলার মতো, তারা চইলা গেছে। যারা একটু কাম করতে পারে, তারা করতেছে। কিন্তু আমরা যারা এক্কেবারেই পঙ্গু তারা সারাজীবন কোনো কাজকর্ম করতে পারুম না।’

নাসিমার হাত ভেঙে গেছে, যেটা আর পূর্ণাঙ্গ শক্তি ফিরে পায়নি।

‘আমরা দুই মাস এইখানে পইড়া আছি। মালিকপক্ষ, বিজিএমইএসহ সবাই বলছিল ক্ষতিপূরণ দিব, পুনর্বাসন করব। ওই আশায় আমরা এত বছর অপেক্ষা করছি। কিন্তু মালিকপক্ষ, সরকারপক্ষ, বিজিএমইএ কেউ কিছু করে নাই।’

চার বছর আগের আলোচিত এই দুর্ঘটনার পর আহতদের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা- আইএলও মাধ্যমে কাউকে এক লাখ, কাউকে দুই লাখ, কাউকে আড়াই লাখ টাকা দেয়া হয়েছিল তখন।

তখন বিজিএমইএর পক্ষ থেকেও ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছিল শ্রমিকদের। তাহলে এরা বাদ পড়ল কেন?

ক্ষতিপূরণের দাবিতে প্রায় আড়াই মাস থেকে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান করছেন তারা। ছবি: সাইফুল ইসলাম

বিজিএমইএ এর সিনিয়র সহসভাপতি ফয়সল সামাদ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আসলে তাজরীনের যে ঘটনাটা সেটার জন্য একটা ওয়ার্কিং কমিটি করে দেয়া হয়েছিল। এখন যদি আমাকে এই বিষয়ে কিছু বলতে হয় তবে সেটা চেক করে বলতে হবে। বিজিএমইএ থেকে কে প্রতিনিধি ছিল বা যারা প্রেসক্লাবে আছে তারা কারা। প্রেসক্লাবে তো যে কেউ যেতে পারে।’

ফয়সল সামাদ বলেন, ‘এখন ভ্যালিডিটিটা আমাদের চেক করতে হবে। এখানে যারা প্রেসক্লাবে আছে তারা এর আগে বিজিএমইএ তে গিয়েছে কি না সেটাও দেখতে হবে। আমার জানামতে তাজরীনে যাদের পাওনা যতটা দেয়ার সেটা দেয়া হয়েছে। সেটার একটা শিডিউল আছে।’

গার্মেন্টস শ্রমিক ঐক্য ফোরামের সভাপতি মোশরেফা মিশু বলেন, ‘শ্রমিকদের সাথে শুরু থেকেই অবহেলা করা হচ্ছে। এই শ্রমিকরা ৬৯ দিনের মতো অবস্থান কর্মসূচি পালন করছে। কিন্তু সরকার বা মালিক পক্ষের কেউই তাদের প্রতি সহানুভূতি জানাতে আসেনি। আজ এখনও যারা আছেন তাদের কারও হাত, কারও পা ও কারও পাঁজর ভাঙা। এই অবস্থায় বিজিএমইএ তাদের পাশে দাঁড়াতে পারত।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য