20201002104319.jpg
20201003015625.jpg
কী আছে নাসিমের গোপন সুড়ঙ্গে

কী আছে নাসিমের গোপন সুড়ঙ্গে

মাহফুজ আহমেদ অপু নামে একজন বলেন, ‘অফিসে অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও নাসিমকে না পেয়ে রেগে টেবিলে লাথি দেই। একটু পরই নাসিম মোবাইলে ফোন করে জানতে চায়, কেন লাথি দিলাম?’

আবাসন ব্যবসার নামে শত শত মানুষের সঙ্গে প্রতারণার অভিযোগে নাসিম রিয়েল এস্টেটের চেয়ারম্যান ইমাম হোসনে নাসিম গ্রেফতারের পর আলোচনায় এসেছে তার অফিসের গোপন সুড়ঙ্গ।

রাজধানীর মিরপুরের চিড়িয়াখানা সড়কে বাংলাদেশ আই হসপিটালের বিপরীতে নাসিম রিয়েল এস্টেটের অফিসেই রয়েছে সেই রহস্যময় সুড়ঙ্গ।

নাসিমকে গ্রেফতারের দিনেই তিন তলা মার্কেটের দ্বিতীয় তলার অফিসটি বন্ধ করে দেয় র‍্যাব। এর আগে গোপন সুড়ঙ্গটির খবর জানতেন না মার্কেটসহ আশপাশের লোকজন।

র‌্যাবের অভিযানের পর সুড়ঙ্গের খবরে বিস্মিত এলাকাবাসী। ভুক্তভোগীদের পাশাপাশি অনেকেই মার্কেটে ভিড় করছেন সুড়ঙ্গটি দেখতে।

গত ৩০ সেপ্টেম্বর রূপনগর আবাসিক এলাকায় নাসিমের বাসায় ও চিড়িয়াখানা রোডে নাসিম রিয়েল এস্টেটের অফিসে অভিযান চালিয়ে নাসিম ও তার স্ত্রী হালিমা আক্তার সালমাকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪।

তাদের কাছ থেকে অবৈধ অস্ত্র, মাদক, জাল টাকা, ওয়াকিটকিসহ প্রতারণার নানা সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়।

অভিযানে অংশ নেয়া র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, তিনতলা ভবনের দ্বিতীয় তলায় সিঁড়ির পাশে নাসিমের আবাসন ব্যবসার অফিস। অফিসে নাসিমের কক্ষের ঠিক পেছনে রয়েছে একটি গোপন দরজা।

অফিস থেকে বের হওয়ার দরজা এড়িয়ে অন্য পথে পালাতে এই গোপন দরজা ব্যবহার করতেন নাসিম। দরজাটি খুললেই ‘সুরঙ্গ’; যা নেমে গেছে নিচতলায়। সেখানে রয়েছে নাসিমের আরেকটি সুরক্ষিত গোপন অফিস কক্ষ।

প্রতারিত হওয়া ব্যক্তি, পাওনাদার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সদস্যরা তার অফিসে গেলে এই সুড়ঙ্গ দিয়ে দোতলা থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যেতেন নাসিম।

নিচতলার গোপন অফিসে প্রবেশের জন্যও রয়েছে অত্যাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা। দোতলার অফিস ও বাইরে বসানো সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটর রয়েছে এই গোপন কক্ষে। নাসিম সেখানে বসে দ্বিতীয় তলায় আসা ব্যক্তিদের গতিবিধি নজরদারি করতেন এবং কোনো ‘ঝামেলা’ মনে হলে সে অনুযায়ী ‘ব্যবস্থা’ নিতেন।

সোমবার চিড়িয়াখানা সড়কের ১/জি, ২৫-২৯ প্লটের ওই মার্কেটটি ঘুরে জানা গেছে, মার্কেটের মালিক নাসিমই। ভবনের সিঁড়ি বেয়ে কয়েক ধাপ উঠতেই চোখে পড়ল একটি ব্যানার। তাতে লেখা, ‘প্রতারক ইমাম হোসেন নাসিমের ফাঁসি চাই’।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, নাসিম রিয়েল এস্টেটের প্লট কিনে প্রতারিতরা এই ব্যানার টাঙিয়েছেন। নাসিমের অফিস বন্ধ থাকলেও তা দেখতে অনেকেই আসছেন।

Nasim Office
নাসিমের সুরক্ষিত গোপন অফিস কক্ষ। ছবি:নিউজবাংলা

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, একটা সময় নাসিমের অফিসে প্রচুর লোকজনের আনাগোনা ছিল। কাউকে কাউকে রাগারাগি করতেও দেখা গেছে। নাসিম গ্রেফতার হওয়ার পর তারা শুনেছেন ভেতরে নাকি সুড়ঙ্গও ছিল। সেই সুড়ঙ্গ দেখতে বিভিন্ন জায়গার লোকজন আসছে। কিন্তু অফিস বন্ধ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কেটের এক কর্মচারি নিউজবাংলাকে জানান, নাসিমকে তারা মাঝেমধ্যে দেখতেন। সুড়ঙ্গের বিষয়টি নাসিম গ্রেফতার হওয়ার পর তারা জানতে পেরেছেন।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল হক নিউজবাংলাকে বলেন, নাসিম অফিসের সুড়ঙ্গ পালানোর জন্য ব্যবহার করতেন। যাদের কথা বলে ম্যানেজ করা যাবে না মনে হতো, তাদের আসার খবর পেলে পালিয়ে যেতেন। এই সুড়ঙ্গ খুবই সরু; এক জনের বেশি যাতায়াত করা যায় না।

এক আত্মীয়ের প্লট কেনার টাকা ফেরত নিতে চলতি বছরের শুরুতে নাসিমের অফিসে গিয়েছিলেন মাহফুজ আহমেদ অপু নামে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মী।

তিনি জানান, নাসিমের দোতলার অফিসে যাওয়ার পর নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ‘বিশেষ ব্যক্তিরা’ জানান, তিনি অফিসে নেই; অপেক্ষা করেন। দীর্ঘ সময় তাদের বসিয়ে রাখা হয় নাসিমের কক্ষের বাইরে। এর ফাঁকে নাসিম দোতলা থেকে নিচতলায় পালিয়ে যান।

অপু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি প্রথমে দোতলার অফিসে যাই। অনেকক্ষণ অপেক্ষার পরও নাসিমকে না পেয়ে রেগে টেবিলে লাথি দেই। একটু পরই নাসিম মোবাইলে ফোন করে জানতে চায়, কেন লাথি দিলাম?

‘তখন সন্দেহ হয়, নাসিম নিশ্চয়ই আশপাশে কোথায় আছে। তখন জোর করে তার কক্ষে ঢুকি। এক পর্যায়ে গোপন দরজাটা দেখতে পাই। এরপর সুড়ঙ্গ দিয়ে নিচে নামি। গিয়ে দেখি, একটি মনিটরের সামনে বসে আছে নাসিম, যা দিয়ে উপরে কে কী করছে, তা দেখা যাচ্ছে।’

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নাসিমের গ্রেফতারের খবরের দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এবং বিদেশ থেকে প্রবাসীরা অভিযোগ জানিয়ে ফোন করছেন। গত কয়েক দিনে সহস্রাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ জানিয়েছেন। নাসিমের নামে-বেনামে প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতারিতদের র‌্যাব-৪ অফিসে আসতে বলা হয়েছে।

রোববার সেখানে গিয়ে শতাধিক ব্যক্তিকে দেখা যায়, যাদের লিখিত অভিযোগ নিচ্ছিলেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

র‌্যাব-৪ এর অধিনায়ক অতিরিক্ত ডিআইজি মোজাম্মেল বলেন, ‘ভুক্তভোগীদের আমরা আইনি সহযোগিতা দিচ্ছি। তারা কোথায়, কীভাবে যাবে- সে ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। নাসিমের বিভিন্ন অপকর্মের অভিযোগ লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়েছে।’

শেয়ার করুন