‘টোকাইন্না মাংস বেইচ্চা ঘর ভাড়া দিমু’

‘টোকাইন্না মাংস বেইচ্চা ঘর ভাড়া দিমু’

বুধবার দুপুর থেকেই কোরবানির মাংস কেনা-বেচার হাট বসে খিলগাঁও রেল গেটে। ছবি: নিউজবাংলা

‘টাকার অভাবে মাংস বিক্রি করতে আসছি ভাই। বাবা নাই। চাচারা বড়লোক। তারা কোরবানি দিছে। আমি পারি নাই। এই মাংস বিক্রি করে যা পাবো তাই সংসারের পেছনে খরচ করব। একটা চাকরি করতাম। করোনায় চাকরি চলে গেছে। বউ বাচ্চা নিয়া তো বাঁচতে হবে ভাই।’

‘মাংস কি সাধে ব্যাচতে আইছি বাজান? টোকাইন্না মাংস বেইচ্চা ঘর ভাড়া দিমু। করোনার লাইগা মাইনসের বাসায় কাম হরতে হারি না। বাসা ভাড়া তো দেওন লাগব। ট্যাকা কই পামু? খাওনের লাইগা একটু রাইক্ষা বাকিডা বেইচ্ছা দিতে আইছি।’

খিলগাঁও রেল গেটে কোরবানির মাংস বিক্রির হাটে এসে নিউজবাংলাকে কথাগুলো বলছিলেন আমেনা বেগম। তার মতো অনেকেই এই হাটে এসেছেন সারা দিনের মানুষের কাছ থেকে কুড়িয়ে আনা মাংস বিক্রি করতে।

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে রাজধানীর বিভিন্ন জায়গায় বসেছে কোরবানির মাংস বিক্রির অস্থায়ী হাট।

রাজধানী ও দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা কসাই ও দিনমজুর, ভিক্ষুকসহ গরীব মানুষেরা যে যেখান থেকে মাংস সংগ্রহ করেছেন, তাই নিয়ে এসব হাটে হাজির হয়েছেন বিক্রি করতে। ক্রেতাদের কেউই কোরবানি দিতে পারেননি।

এসব মাংসের বেশির ভাগ ক্রেতা রিকশাওয়ালা ও দিনমজুর, যাদের কোরবানি দেয়ার আর্থিক সক্ষমতা নেই। একটু কম দামে মাংস কেনার আশায় হাটে এসেছেন তারা।

মাংস কিনতে আসা কোরবান আলী বলেন, ‘রিকশা চালাইয়া খাই। কোরবানি দেওনের ক্ষমতা নাই। মাইনসের বাড়িতে মাংস চাইতে যাইতেও লজ্জা লাগে। বউ-বাচ্চাগো কোরবানির মাংস খাওয়ানোর জন্য কিনতে আইছি। ৩০০ থেইকা ৬০০ ট্যাকা দামের মাংস আছে এইহানে। যার যেমন ট্যাকা সে সেমন মাংস কিনে।’

গরুর ভুড়ি, বট, মাংস, মাথা, চর্বি সবই আছে মাংসের হাটগুলোতে। সামর্থ্য অনুযায়ী মাংস কিনছে মানুষ। সারা দিনের কুড়ানো মাংস পুঁটলিতে বেঁধে অনেকে হাজির হচ্ছেন এই হাটে। দলে দলে মানুষ এসে মাংস কিনে নিয়ে যাচ্ছে।

‘টোকাইন্না মাংস বেইচ্চা ঘর ভাড়া দিমু’

মো. সোহেল বলেন, ‘একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। কোরবানি দেয়ার সামর্থ্য নাই। এখানে ভালো মাংস পাওয়া যায়। অনেক মানুষ মাংস আনে। তাই দেখে-শুনে কেনা যায়। গত বছরও এই মাংস কিনেছিলাম। দামও কিছুটা কমে পাওয়া যায়।’

মাংস বিক্রেতা গোলাম সারোয়ার জানালেন, তিন চাচার বাসা থেকে তিনি ১৫ কেজি মাংস পেয়েছেন। এর মধ্যে পাঁচ কেজি রেখেছেন নিজ পরিবারের জন্য। বাকিটা বিক্রি করতে এসেছেন হাটে।

নিউজবাংলাকে সারোয়ার বলেন, ‘টাকার অভাবে মাংস বিক্রি করতে আসছি ভাই। বাবা নাই। চাচারা বড়লোক। তারা কোরবানি দিছে। আমি পারি নাই। এই মাংস বিক্রি করে যা পাবো তাই সংসারের পেছনে খরচ করব। একটা চাকরি করতাম। করোনায় চাকরি চলে গেছে। বউ বাচ্চা নিয়া তো বাঁচতে হবে ভাই।’

এসব মাংসের হাটে বড় বিক্রেতারা হচ্ছেন কসাইয়েরা। তাদের বেশির ভাগ ঢাকার বাইরে থেকে আসা। ঈদের আগের রাতে ঢাকায় এসেছেন তারা। সারা দিন গরু কেটে পাওনা মাংস বিক্রি করে আবার গ্রামে ফিরে যাবেন।

কিশোরগঞ্জ থেকে আসা কসাই কালাচাঁন মিয়া বলেন, ‘রাতে ঢাকা আইছি কয়েকজন মিল্লা। প্রতি বছর আসি আমরা। কোরবানি দিয়ে চলে যাই। গরু বুঝে ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার টাকা নেই। জবাই করে মাংস বানিয়ে দেই। গ্রেহস্থ আমাদের মাংসও দেয়। এই মাংস বিক্রি করতে আসছি।’

মাংস বিক্রির কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এই মাংস বাড়ি নিতে গেলে পচে যাবে। তাই বিক্রি করে টাকা নিয়ে বাড়ি গিয়ে কিনে খাবো।’

আরও পড়ুন:
আশ্রয়ণ প্রকল্পে কোরবানির মাংস
‘২০ কেজি পাইছি, ১৫ কেজি বেইচ্চালছি’
মাংস কাটতে গিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আহত অর্ধশত
বর্জ্য জমতে দিচ্ছে না সিটি করপোরেশন
২৪ ঘণ্টার মধ্যে বর্জ্য অপসারণ: তাপস

শেয়ার করুন

মন্তব্য