20201002104319.jpg
টারডিগ্র্যাডদের আরেক অত্যাশ্চার্য ক্ষমতা

অতিক্ষুদ্র অণুজীব টারডিগ্র্যাড বিএলআর অতিবেগুনী আলোর সংস্পর্শে এসে নীল আলোয় উদ্ভাসিত

টারডিগ্র্যাডদের আরেক অত্যাশ্চার্য ক্ষমতা

বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সবচেয়ে সহিষ্ণু প্রাণী- টারডিগ্র্যাডদের এমন এক প্রজাতি চিহ্নিত করেছেন যারা সম্ভাব্য প্রাণঘাতি অতিবেগুনি বিকিরণেও টিকে থাকে। শুধু টিকেই থাকে না, বরং বিকিরণ শোষণ এবং নীল আলো বিচ্ছুরণ করে।

মজার চেহারা নিয়ে হয়ত অতিক্ষুদ্র প্রাণী এরা, কিন্তু টারডিগ্র্যাডরা প্রাণী জগতে টিকে থাকার লড়াইয়ে টিকে যাওয়াদের মধ্যে অন্যতম। বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, তারা এদের মধ্যে একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন যাদের রয়েছে অপ্রত্যাশিত একটি অস্ত্র - একটি ফ্লুরেসেন্ট বা প্রতিপ্রভা সুরক্ষা বর্ম। 

প্রচলিত ভাষায় পানি ভাল্লুক বা মস মিগলেট নামে পরিচিত এই টারডিগ্যাডরা আকারে ‘মাইক্রোস্কোপিক’, অর্থাৎ মাইক্রোস্কোপ ছাড়া খালি চোখে এদের দেখা মুশকিল। এরা পানিতে বসবাস করে, আকারে শূন্য দশমিক পাঁচ মাইক্রোমিটার থেকে এক মাইক্রোমিটার দীর্ঘ, দেখতে জুবুথুবু হুভার ব্যাগের মতো, যা আট পায়ে চলে।

এই প্রাণীর অবয়ব যতোই মজার হোক না কেনো, জীবনীশক্তি দারুণ। এই প্রাণীরা বায়ুশূন্য স্থান, পরমাণু বিকিরণ, অতি চরম তাপ ও চাপ এবং তীব্র আয়ন ও অতিবেগুনি বিকিরণেও টিকে থাকতে পারে।

এই পানি ভাল্লুকদের টিকে থাকার অন্যতম কৌশল হচ্ছে সুপ্ত অবস্থায় গুটিয়ে গিয়ে দশকের পর দশক বেঁচে থাকা, তখন নিজের কোষের জন্য তারা প্রোটিন উৎপাদন করে।

Tardigrade
আট পা-ওয়ালা একটি জুবুথুবু হুভার ব্যাগ- টারডিগ্র্যাড

বিজ্ঞানীরা এদের টিকে থাকার আরেকটি কৌশলও আবিষ্কার করেছেন, যা টারডিগ্র্যাডদের প্রাণঘাতি অতিবেগুনি আলো থেকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে- একটি ফ্লুরেসেন্ট বা প্রতিপ্রভা জাতীয় বস্তু যা ক্ষতিকর অতিবেগুনি বিকিরণ শোষণ করে এবং একইসঙ্গে শক্তি উৎপাদন করে যা নীল আলো হিসেবে বিচ্ছুরিত হয়।

ইনডিয়ান ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স-এর গবেষক দলের সদস্য ও এই গবেষণাপত্রের সহলেখক ড. সন্দ্বীপ ইশ্বরাপ্পা বলেন, ‘আমাদের গবেষণা বলছে [এই প্রাণীরা] পৃথিবীর সবচেয়ে শুষ্ক ও রৌদ্রজ্জ্বল স্থানে টিকে থাকতে পারে।’

বিজ্ঞান বিষয়ক বায়োলজি লেটার সাময়িকীতে প্রকাশিত এই গবেষণাপত্রে, ইশ্বরাপ্পা ও তার সহকর্মীরা বর্ণনা করেছেন, ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসে একটি কূপের দেয়ালে জন্মানো শেওলার নমুনায় কীভাবে তারা টারডিগ্র্যাডদের একটি নতুন প্রজাতির সন্ধান পেয়েছেন- যাদের নাম দিয়েছেন প্যারামাইক্রোবায়োটাস বিএলআর।

যখন তারা টারডিগ্র্যাডদের এই নতুন প্রজাতি এবং আরেকটি প্রজাতির নমুনাকে অতিবেগুনি আলোতে ১৫ মিনিট রাখেন, দেখতে পান শুধু নতুন প্রজাতির নমুনাই বেঁচে আছে। আশ্চর্যজনকভাবে, অতিবেগুনি আলোতে নতুন প্রজাতির নমুনা নীল আলো ছড়াচ্ছিল।

আরও গবেষণার জন্য, গবেষক দল টারডিগ্র্যাডদের নতুন প্রজাতির দেহ থেকে ফ্লুরেসেন্ট জাতীয় পদার্থযুক্ত একটি অংশ আলাদা করে এবং সেটা দিয়ে অতিবেগুনি আলো সংবেদনশীল প্রজাতির নমুনার দেহ আবৃত করে। এরপর তাদের অতিবেগুনি আলোতে রাখে। ফলাফলে দেখা যায় ফ্লুরেসেন্ট জাতীয় পদার্থ যুক্ত অংশটি অতিবেগুনি আলো সংবেদনশীল প্রজাতির নমুনাগুলোকে কিছু মাত্রায় সুরক্ষা দিয়েছে, যার কারণে অর্ধেক নমুনা বেঁচে গেছে।

ঈশ্বরাপ্পা জানান এই ফলাফল তাদের অবাক করেছে। তিনি বলেন, ‘প্রাণী জগতে অন্য প্রজাতির মধ্যেও অতিবেগুনি আলো সহ্য করার ক্ষমতা আছে, তবে [নতুন এই প্রজাতিটি] একমাত্র উদাহরণ যারা ফ্লুরেসেন্ট বা প্রতিপ্রভাকে প্রাণঘাতি অতিবেগুনি বিকিরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।’

ভারতীয় গবেষক দলের এই গবেষণার বিষয়ে টারডিগ্র্যাডদের বিষয়ে একজন বিশেষজ্ঞ, পোল্যান্ডের অ্যাডাম মিকিভিচ ইউনিভারসিটি-র অধ্যাপক ড. লুকাস কাচমারেক বলেন, গবেষণাটি আগের গবেষণাগুলোরই ধারাবাহিকতা। এসব গবেষণা প্রমাণ করেছে যে টারডিগ্র্যাডদের উৎপাদিত বস্তুগুলো ক্ষতিকর পরিবেশে অন্যান্য অণুজীবদের সম্ভাব্য সুরক্ষা কবচ হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। 

তবে ড. কাচমারেক এটাও মন্তব্য করেছেন যে গবেষক দলটি এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট বস্তুটি চিহ্নিত করতে পারেনি যা আসলে অতিবেগুনি বিকিরণের বিরুদ্ধে সুরক্ষার কাজটি করছে। মনে রাখতে হবে শুধু ফ্লুরেসেন্ট বা প্রতিপ্রভা থেকে এ ধরনের সুরক্ষা নাও মিলতে পারে- বরং সম্ভাব্য সুরক্ষা প্রোটিন হয়তো এর পেছনে কাজ করতে পারে- বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

(ভাষান্তর গার্ডিয়ান-এর প্রতিবেদন)

শেয়ার করুন

মন্তব্য