টুকুপুত্রের বিরুদ্ধে জমি দখলে মারধরের অভিযোগ

টুকুপুত্রের বিরুদ্ধে জমি দখলে মারধরের অভিযোগ

শামসুল হক টুকু ও তার ছেলে নাসিফ শামস। ছবি: নিউজবাংলা

অভিযোগ উঠেছে, বেড়া উপজেলার ওই জমি দখলকে কেন্দ্র করে টুকুপুত্র তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভূমিহীনদের মারপিট করেছেন। পরে আহতদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলাও করিয়েছেন। তবে সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু ও তার ছেলে নাসিফ শামস রনি।

সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকুর ছোট ছেলে ড. এস এম নাসিফ শামস রনির বিরুদ্ধে পাবনার দরিদ্র চাষিদের ব্যক্তিগত ও নদীর জমি দখলের অভিযোগ উঠেছে।

অভিযোগ উঠেছে, বেড়া উপজেলার ওই জমি দখলকে কেন্দ্র করে টুকুপুত্র তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভূমিহীনদের মারপিট করেছেন। পরে আহতদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলাও করিয়েছেন। জমি কিনে টাকা না দেয়ার অভিযোগও আছে তার বিরুদ্ধে। এসব বিষয় টুকুকে জানানো হলেও তিনি ব্যবস্থা নেননি।

তবে সব অভিযোগই অস্বীকার করেছেন সাবেক প্রতিমন্ত্রী টুকু ও তার ছেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নাসিফ শামস রনি। তারা বলছেন, এর পেছনে ‘রাজনীতি’ আছে। তারা সেখানে সৌদিয়া এগ্রো সোলার পিভি পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনসহ কিছু উন্নয়ন কাজ করছেন, যা আটকাতে চাইছে একটি চাঁদাবাজ ও মাদক কারবারি চক্র।

স্থানীয় লোকজনের অভিযোগ, গত ১২ মার্চ শুক্রবার এমপিপুত্র নাসিফ শামস রনির নির্দেশে ও উপস্থিতিতে সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নদীর খাস জমি ভোগদখলকারী দরিদ্র চাষিদের মারপিট করে রোপণকৃত ফসল নষ্ট করে দেয়। প্রতিবাদে ভুক্তভোগীরা বিক্ষোভ করেন। প্রতিকার চেয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে ১৪ মার্চ লিখিত অভিযোগও দেন তারা।

লিখিত অভিযোগে বলা হয়, পাবনা ১ (সাঁথিয়া-বেড়া) আসনের সংসদ সদস্য টুকুর ছেলে নাসিফ শামস রনি বেড়া উপজেলার পায়না এলাকায় যমুনা নদীর তীরে কিছু জমি কেনেন। পরে আশপাশের মালিকানার জমিসহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের জমি কৌশলে ও জোরপূর্বক দখলে নিয়ে নেন। এরপর হুমকি-ধমকি দিয়ে আশপাশের দরিদ্র চাষিদের দখলে থাকা ব্যক্তিগত ও খাস খতিয়ানভুক্ত ১০০ বিঘা জমি দখলে নেয়ার পাঁয়তারা করতে থাকেন।

টুকুপুত্রের বিরুদ্ধে জমি দখলে মারধরের অভিযোগ
এক্সকাভেটর দিয়ে কাটা হচ্ছে জমির মাটি। ছবি: নিউজবাংলা

‘এমপিপুত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক। তিনি শিক্ষক মানুষ। তার কাছে জমি দখল করে প্রতিষ্ঠান করা আমরা প্রত্যাশা করি না।’

লিখিত অভিযোগে তারা আরও বলেন, জমির দখল না ছাড়ায় নাসিফ শামস রনি ১২ মার্চ সকালে সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে দরিদ্র চাষিদের রোপণ করা বোরো ধান নষ্ট করে কাঁটাতার দিয়ে জমি ঘিরে নেয়ার চেষ্টা করেন। বাধা দিলে সন্ত্রাসীরা তাদের বেদম মারপিট করে। এতে বিক্ষুব্ধ গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ সময় ঘটনাস্থলে উপস্থিত পুলিশ উল্টো এমপিপুত্রের পক্ষ নিয়ে বিক্ষোভকারীদের ধরে নিয়ে যায়।

তারা আরও অভিযোগ করেন, সেদিনের ঘটনায় আহতরা বেড়া হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে গেলে পুলিশ তাদের আটক করে নিয়ে যায়। এ ছাড়া ঘটনার পর থেকে ভুক্তভোগীদের নানাভাবে হয়রানি করছে পুলিশ।

১২ মার্চের ওই ঘটনার দিনই সৌদিয়া এগ্রো সোলার পিভি পাওয়ার প্ল্যান্টে চাঁদাবাজির জন্য হামলার অভিযোগ এনে বেড়া মডেল থানায় একটি মামলা করেন প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক সাইফুল ইসলাম। মামলায় ১৪ আসামির নাম উল্লেখ করা হয়। তারা হলেন- তুহিন, মহরম, কিরণ, মিলন, বাচ্চু, মানিক, লিটন, নয়ন, ইউনুছ, লালন, আশরাফুল, লায়েব, লিলন ও তামিম। তাদের মধ্যে তুহিন, মহরম ও কিরণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বেড়া থানার এসআই আরিফুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, আসামিরা বিভিন্ন সময়ে সৌদিয়া এগ্রো সোলার পিভি পাওয়ার প্ল্যান্টে চাঁদা দাবি করতেন। চাঁদা না পেয়ে ১২ মার্চ তারা প্রকল্পের তত্ত্বাবধায়ক সাইফুল ইসলামকে মারপিট করেন।

তিনি আরও বলেন, ১২ মার্চ সংঘর্ষের কোনো ঘটনা ঘটেনি। হাসপাতাল থেকেও কাউকে আটক করা হয়নি। মামলার পর ১৪ মার্চ অভিযান চালিয়ে তুহিন, মহরম ও কিরণকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তাদের কারাগারে পাঠিয়েছে।

টুকুপুত্রের বিরুদ্ধে জমি দখলে মারধরের অভিযোগ
জমি দখলে ক্যাডার বাহিনী দিয়ে ভূমিহীনদের মারপিটের অভিযোগ টুকুপুত্রের বিরুদ্ধে। ছবি: নিউজবাংলা

শামসুল হক টুকুর ছেলে নাসিফ শামস রনি গত ১৪ মার্চ পাবনা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে বেড়ায় ‘অসামাজিক কাজ বন্ধ ও উন্নয়ন কাজে বাধাদানকারীদের’ বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানান।

লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বেড়া পৌরসভার মুজিব বাঁধ সংলগ্ন পায়না থেকে মোহনগঞ্জ পর্যন্ত চাঁদাবাজি, মাদক, জুয়া, অবৈধ মাটি ও বালি উত্তোলনসহ নানা অসামাজিক কাজ চালিয়ে যাচ্ছে একটি চক্র। তাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য একটি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি টেকনিক্যাল কলেজ ও একটি সোলার পাওয়ার প্ল্যান্ট স্থাপনের চেষ্টা করছেন তিনি।

নাসিফ শামস রনির অভিযোগ, এলাকার ওই সিন্ডিকেটের নেতা আব্দুল মান্নান মানু ব্যাপারী (বেড়া পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি) ও তার ভাতিজা কিরণ ব্যাপারী বিভিন্ন সময়ে চাঁদা দাবি করে এসব উন্নয়ন কাজে বাধা সৃষ্টি করছেন।

এই কিরণই পাওয়ার প্ল্যান্টের কেয়ারটেকারের করা মামলার আসামি, যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসককে দেয়া লিখিত অভিযোগে স্থানীয় লোকজন আরও বলেন, ‘এই দখলদার টুকুর ছেলে ভয় দেখিয়ে জমি কিনে নেয়ার কথা বলে অনেকের কাছ থেকে জমি লিখে নিয়েছেন। কিন্তু জমির টাকা দেননি। টাকা চাইতে গেলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখান।’

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী দাবিদার ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি মানিক ব্যাপারী জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের ওপর টিনের ছাপড়া ঘর তুলে দীর্ঘদিন বসবাস করছেন বানভাসী ও হতদরিদ্র মানুষ।

তিনি বলেন, ‘তাদের উচ্ছেদের খবর পেয়ে শুক্রবার (১২ মার্চ) সেখানে যাই। এমপিপুত্রের লোকজন এক্সকাভেটর দিয়ে দরিদ্র চাষিদের রোপা ধান মাটিচাপা দিতে শুরু করলে আমি দলীয় পরিচয় দেই। নাসিফ শামস রনিকে ফসল নষ্ট না করার অনুরোধ করি। এতে উত্তেজিত হয়ে তিনি আমাকেও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।’

বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক টুকুকে জানানো হলেও তিনি কোনো পদক্ষেপ নেননি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

টুকুপুত্রের করা অভিযোগ অস্বীকার করে বেড়া পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি আব্দুল মান্নান মানু বলেন, ‘আমার জানা মতে এমপিপুত্র নাসিফ শামস রনি সেখানে কিছু জমি কিনে সৌদিয়া এগ্রো সোলার পিভি পাওয়ার প্ল্যান্টের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে আশপাশের সব জমি দখলের চেষ্টা করছেন। সাধারণ মানুষসহ আমাদের দখলে থাকা ব্যক্তিগত জমির ফসল নষ্ট করে দিয়েছেন এমপিপুত্র। এ বিষয়ে সংসদ সদস্য মহোদয়কে জানানো হলে তিনি কোনো ব্যবস্থাই নেননি।’

টুকুপুত্রের বিরুদ্ধে জমি দখলে মারধরের অভিযোগ
রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে উন্নয়ন কাজ বাধা দেয়ার অভিযোগ এমপিপুত্রের। ছবি: নিউজবাংলা

এ সব অভিযোগের বিষয়ে এমপিপুত্র নাসিফ শামস রনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার বাবা এই আসনের তিন বারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য। গ্রামবাসী জমি দখলের যে অভিযোগ করেছে সেটি অসত্য। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়ে তারা আমার উন্নয়ন কাজকে বাধাগ্রস্ত করছে। এখানে আমার পৈত্রিক জমির ওপরে আমার মা ও বাবার নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয়সহ সৌদিয়া এগ্রো সোলার পিভি পাওয়ার প্ল্যান্ট নামে একটি প্রকল্পের কাজ চলছে।

‘স্থানীয় কিছুর মাদক ব্যবসায়ী-সন্ত্রাসী এ কাজে বাধা দিচ্ছে। তবে কাউকে উচ্ছেদ বা মারপিটের ঘটনা ঘটেনি। স্থানীয় রাজনীতিতে দ্বন্দ্ব থাকার সুযোগ নিতে আমাকে ও আমার পরিবারকে বিতর্কে ফেলার চেষ্টা চলছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নাসিফ শামস রনির বাবা শামসুল হক টুকু নিউজবাংলাকে বলেন, ‘এটা একটা ষড়যন্ত্র। তবে জেলা প্রশাসন বিষয়টা তদন্ত করছে। অপরাধী যেই হোক- সত্যতা পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। অপরাধীদের ছাড় নয়। একটি মহল আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে মেতেছে।’

পুলিশ সুপার মহিবুল ইসলাম খান বলেন, ‘বেড়া অঞ্চলের জমি সংক্রান্ত বিষয়ে একটি ঝামেলা হয়েছে শুক্রবার। খবর পেয়ে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। এই ঘটনায় ১৪ জনের নাম উল্লেখ করে বেড়া থানায় মামলা হয়েছে। মামলায় ৫০-৬০ জনকে অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে।

‘ওই ঘটনা নিয়ে পুলিশ গ্রামবাসীকে হয়রানি করছে- এমন কোনো অভিযোগ কেউ করেনি। অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে পাবনার জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ বলেন, ‘নদী তীরবর্তী যে জমি নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে সেটি তার ব্যক্তিগত, না খাস তা যাচাই করতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও এসিল্যান্ডকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

বেড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সবুর আলী নিউজবাংলাকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসকের নির্দেশে এরই মধ্যে প্রাথমিক তদন্ত হয়েছে। প্রকল্পের মূল স্থাপনার জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের পৌনে ৩ একর জমি রয়েছে। তাদের নিজেস্ব জমি রয়েছে ১৬ একরের মতো। এর মধ্যে পৌনে ১৩ একর জমির খাজনা খারিজ করা আছে। আর খাস জমি রয়েছে ১.৯৮ একর। বিষয়টি নিয়ে আরও তদন্ত হচ্ছে। তদন্ত শেষে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

আরও পড়ুন:
সরকারি স্কুলের জায়গায় মাদ্রাসা নির্মাণের অভিযোগ

শেয়ার করুন

মন্তব্য