সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী: রিভিউ শুনানিতে কী হবে?

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী: রিভিউ শুনানিতে কী হবে?

এখন প্রশ্ন হলো, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়টির রিভিউ শুনানি আসলেই কবে হবে এবং রিভিউতে কি হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?

বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবিধানিক ইতিহাসে ষোড়শ সংশোধনী একটি বড় কেসস্টাডি। কেননা, এই সংশোধনী বাতিল করে আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের পরে দেশের সংসদ ও বিচার বিভাগে যেসব ঘটনা ঘটেছে, তা শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের রাজনৈতিক ইতিহাসেই বিরল। এই ঘটনায় সৃষ্ট উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতিকে তার পদ এমনকি দেশ ছাড়তে হয়। শুধু তাই নয়, ঘটনার পরে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা দুর্নীতির মামলায় সম্প্রতি তাকে ১১ বছরের কারাদণ্ডও দেয়া হয়েছে।

যদিও এসব ঘটনাপ্রবাহে অনেক দিন আলোচনার বাইরে ছিল সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী তথা বিচারকদের অভিশংসনের ইস্যুটি। তবে গত মঙ্গলবার (১৬ নভেম্বর) জাতীয় সংসদে পাসের জন্য উত্থাপিত ‘বিরোধীদলীয় নেতা ও উপনেতা (পারিতোষিক ও বিশেষাধিকার) বিল-২০২১’ বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছেন, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে উচ্চ আদালত যে রায় দিয়েছেন, সেটির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ আবেদনের বিষয়ে শিগগিরই শুনানি হবে।

২০১৭ সালের ৩ জুলাই সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন আপিল বিভাগ। ওই রায়ে হাইকোর্টের রায়ের কিছু পর্যবেক্ষণ ‘এক্সপাঞ্জ’ করে রাষ্ট্রপক্ষের আপিল ‘সর্বসম্মতভাবে’ খারিজ করে দেয়া হয়। পরে একই বছরের ১ আগস্ট এ মামলার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এর প্রায় পাঁচ মাস পরে ২০১৭ সালের ২৪ ডিসেম্বর ষোড়শ সংশোধনী নিয়ে আপিল বিভাগের দেয়া রায় রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) চেয়ে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ।

২০১৪ সালে অসামর্থ্য ও অযোগ্যতার কারণে বিচারপতিদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিয়ে জাতীয় সংসদে পাস হয় সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বিল। এর আগে, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে এ ক্ষমতা ছিল। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে ৯ জন আইনজীবী রিট করলে হাইকোর্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সংশোধনীটি বাতিল ও অসাংবিধানিক ঘোষণা করে রায় দেন। যা পরবর্তী সময়ে বহাল রাখেন আপিল বিভাগও।

আপিল বিভাগের রায় নিয়ে যতটা না, তার চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া আসে রায়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার কিছু পর্যবেক্ষণে। ফলে রায় প্রকাশের দিন থেকে শুরু করে ১৩ অক্টোবর তার দেশত্যাগের পরেও বিষয়টি রাজনীতির মাঠে আলোচনায় ছিল।

রাষ্ট্রপক্ষের রিভিউ আবেদনে আপিল বিভাগের দেয়া রায় বাতিল এবং আদালতের পর্যবেক্ষণে সংসদ সদস্যদের নিয়ে যেসব মন্তব্য করা হয়েছে এবং বিচারকদের জন্য যে আচরণবিধি করা হয়েছে, তা বাতিল চাওয়া হয়। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় ৯০৮ পৃষ্ঠার ওই রিভিউ আবেদন দাখিল করা হয়।

আবেদন জমা দেয়ার পর সেসময়ের অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছিলেন, “আবেদনে ৯৪টি গ্রাউন্ড পেশ করা হয়েছে। দুই মাস নিরলস শ্রম দিয়ে একটি আইনজীবী প্যানেল এই আবেদন প্রস্তুত করেছে।” তিনি তখন বলেন, “যেখানে জাতীয় সংসদ সংবিধানের মূল অনুচ্ছেদে ফিরে যেতে চায়, সেখানে আদালত এর বিপরীতে কোনো আদেশ বা রায় দিতে পারেন না।”

অ্যাটর্নি জেনারেলের এই মন্তব্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে, জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে যে জাতীয় সংসদের সদস্যরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট বা মতামতের ভিত্তিতে সংবিধানে পরিবর্তন আনলেন, সেটি আদালত বাতিল করতে পারেন কি না? আবার সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সর্বোচ্চ আদালত সংবিধানের কোনো সংশোধনী বাতিল করলেও সংসদ সেটি মানতে বাধ্য কি না! কারণ আদালত কোনো সংশোধনী বাতিল করলেও সংসদ যদি সেটিকে গ্রহণ করে সংবিধানে যুক্ত না করে, তাহলে ওই রায় অর্থহীন কি না— সেটিও প্রশ্ন।

স্মরণ করা যেতে পারে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের তিনদিন পর ২০১৭ সালের ৪ আগস্ট সিলেটে এক অনুষ্ঠান শেষে সেসময়ের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত পরিষ্কার ঘোষণা দেন, “আদালত যতবার এই সংশোধনী বাতিল করবেন, ততবারই সংসদ এটা পাস করবে। করতেই থাকবে।” মি. মুহিত বেশ উত্তেজিত ভঙ্গিতে বলেন, “ দেখি তারা কতদূর যেতে পারেন।’’

সুতরং এটা স্পষ্ট যে, ষোড়শ সংশোধনীর মূলে রয়েছে বিচার বিভাগের ওপর সরকারের কর্তৃত্ব বজায় রাখা। পক্ষান্তরে এ প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই, ক্ষমতা আছে বলে আদালত কি কোনো সংশোধনী বাতিল করতে পারেন? আবার ক্ষমতা আছে বলে সংসদ কি আদালতের নির্দেশনা এড়িয়ে যেতে পারে? যদি এটা হয় তাহলে রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গসমূহের মধ্যে কেবল ক্ষমতার চর্চাই হবে।

বস্তুত, রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গসমূহ যাতে এরকম ক্ষমতার চর্চায় অবতীর্ণ না হয় এবং তাদের মধ্যে যাতে একটি ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় থাকে; যাতে তারা প্রত্যেকে প্রত্যেকের সহায়ক হিসেবে কাজ করতে পারে— সেরকম পরিস্থিতিই গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান শর্ত। সবচেয়ে বড় কথা- আইন, বিচার ও নির্বাহী বিভাগ যদি একটি আরেকটির উপরে খবরদারি করতে চায়; যদি কোনো একটি অঙ্গ দেশ ও জনগণের স্বার্থের বাইরে গিয়ে এমন কোনো কাজ করে বা সিদ্ধান্ত দেয় যেখানে তাদের ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক ‘ইগো’ ‍মুখ্য হয়ে ওঠে— সেটি দেশের জন্য ভালো নয়।

মনে রাখা দরকার, বিচার বিভাগকে চাপে রেখে জনগণের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা তথা রাষ্ট্রে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বিচারকদের স্বাধীন রাখতে না পারলে, তাদের রায়গুলো রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হবে না। আবার বিচার বিভাগের সঙ্গে যারা যুক্ত, তারাও যদি দেশ, জনগণ ও পেশার প্রতি দায়বদ্ধ থেকে, নীতি-নৈতিকতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে না পারেন; নির্বাহী বিভাগ যদি মনে করে তাদের ছাড়া আইন ও বিচার বিভাগ অচল বা তাদের কলমের খোঁচায় সবকিছু বদলে যেতে পারে; সরকার বদল হলেও যেহেতু তাদের বদল নেই, অতএব তারাই ‘সুপিরিয়র’— তাহলে সেটিও রাষ্ট্রের ভেতরে শুধু বিশৃঙ্খলারই জন্ম দেবে।

এখন প্রশ্ন হলো, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল করে দেয়া রায়টির রিভিউ শুনানি আসলেই কবে হবে এবং রিভিউতে কি হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের রায় বদলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে?

রাষ্ট্রপক্ষের বড় কনসার্ন আসলে রায়ে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণ। কিন্তু পর্যবেক্ষণ কোনো রায় নয়। ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে আপিল বিভাগ যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন, তার অনেক কিছুর সঙ্গে দেশবাসীরও দ্বিমত বা ভিন্নমত আছে। সুতরাং রিভিউতে সর্বোচ্চ আদালত যদি প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণগুলো এক্সপাঞ্জ করেন, তাতেও রায় পরিবর্তন হবে না। অর্থাৎ বিচারপতির অপসারণের জন্য ষোড়শ সংশোধনীর আগে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের যে বিধান ছিল, আইনত এখন সেটিই বহাল রয়েছে এবং রিভিউতে রায় বদলে না গেলে এই বিধানই বহাল থাকবে।

একজন বিচারক রায়ে তার ব্যক্তিগত অভিমত ব্যক্ত করতে পারেন—যেটি রায়ের অংশ নয়। যেমন সম্প্রতি রাজধানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণ মামলার রায়ে বিচারক সব আসামিকে খালাস দিয়েছেন এবং সেইসঙ্গে একটি পর্যবেক্ষণ দিয়ে বলেছেন যে, ঘটনার ৭২ ঘণ্টা পরে ধর্ষণের মামলা নেয়া যাবে না।

এটি নিয়ে বেশ সমালোচনা শুরু হয় এবং ওই বিচারকের বিচারিক ক্ষমতার প্রত্যাহার করে তাকে আইন ও বিচার বিভাগে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু এতে তিনি যে রায় দিয়েছেন, সেটি বাতিল হয়ে যায়নি। একইভাবে ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ শুনানিতে যদি সর্বোচ্চ আদালত পর্যবেক্ষণগুলো এক্সপাঞ্জ বা বাতিলও করেন, তাতেও রায় বদলে যাবে না।

অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, রিভিউতে পুরো রায় বাতিল হয় না বা যে রায় দেয়া হয়েছে, তার বিপরীত কোনো সিদ্ধান্ত আসে না। কেননা, আপিল বিভাগ যে রায় দিয়েছেন, সেটিই চূড়ান্ত। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করা হয়েছিল এবং পূর্ণাঙ্গ আপিল বেঞ্চ সেটি বহাল রেখেছেন। সুতরাং এখন রিভিউ শুনানি যদি হয়ও, তাতেও মূল রায় হেরফের হওয়ার সম্ভাবনা কম।

ষোড়শ সংশোধনীর রিভিউ নিয়ে একজন সিনিয়র আইনজীবীর সঙ্গে আমার কথা হয় ২০১৯ সালে। তিনি বলেছিলেন, সাধারণত রিভিউ চাওয়া হয় তখনই, যদি রায় ঘোষণার আগে কোনো এভিডেন্স অর্থাৎ তথ্যপ্রমাণ ভুলবশত বাদ পড়ে থাকে। এছাড়া রিভিউ চাওয়ার আর কোনো গ্রাউন্ড নেই। কিন্তু ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় বাতিল চেয়ে রাষ্ট্রপক্ষ যে রিভিউ আবেদন করেছে, সেখানে এভিডেনশিয়াল গ্রাউন্ড নেই বলে তিনি মনে করেন।

সুতরাং সরকার বা রাষ্ট্রপক্ষ ষোড়শ সংশোধনীর রায় এবং রায়ে প্রধান বিচারপতির পর্যবেক্ষণগুলো বাতিল বা এক্সপাঞ্জ চেয়ে যে আবেদন করেছে, রিভিউতে যদি সেই রায় ও পর্যবেক্ষণ বাতিল হয়ে যায়, তাহলে দেশের সাংবিধানিক ও বিচারিক ইতিহাসে আরেকটি বড় কেস স্টাডি হবে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

শহীদ ডা. মিলন ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন

শহীদ ডা. মিলন ও গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থার স্বপ্ন

১৯৯০ সালে চিকিৎসকদের প্রাণের দাবি ২৩ দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিল। এ দাবিতে চিকিৎসকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না। গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, বাজেট, মেডিক্যাল শিক্ষা সংস্কারসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয় ছিল ওই আন্দোলনের দাবি। ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসকসমাজ জনগণের কাছে মর্যাদার আসন পেয়েছে।

ডা. শামসুল আলম খান মিলন ১৯৯০-এর ২৭ নভেম্বর আনুমানিক বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পেটোয়া বাহিনীর গুলিতে শহীদ হন। তিনি ছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের বায়োক্যামিস্ট্রি বিভাগের প্রভাষক। পাশাপাশি সেসময়ের বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ ) যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও প্রকৃচি-এর (প্রকৌশলী-কৃষিবিদ–চিকিৎসক) কেন্দ্রীয় নেতা।

২৭ নভেম্বর ১৯৯০, দিনটি ছিল বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতি বাতিল ও চিকিৎসকদের ২৩ দফা বাস্তবায়ন আন্দোলনের কর্মসূচি সারা দেশের চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে ২৪ ঘণ্টা কর্মবিরতি এবং সেসময়ের পিজি হাসপাতালের বটতলায় সকাল ১১টায় কেন্দ্রীয় চিকিৎসক সমাবেশ। পাশাপাশি দেশব্যাপী বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর স্বৈরাচার পতন আন্দোলনের কর্মসূচি। ছাত্র সংগঠনগুলো সর্বদলীয় ছাত্রঐক্যের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ ছিল। দেশ তখন চূড়ান্ত কর্মসূচির অপেক্ষায়।

ডা. মিলন সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে সেসময়ের পিজি হাসপাতালের দিকে রওনা হন। পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি চত্বরে আরেক রিকশায় থাকা বিএমএর সেসময়ের মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিনের সঙ্গে দেখা হয়। মিলন নিজের রিকশা ছেড়ে ওই রিকশায় ওঠেন।

আর রিকশার প্যাডেলে চাপ পড়তেই ডা. মিলন পেছন থেকে গুলিবিদ্ধ হন এবং ওখানেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ইমার্জেন্সিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু ততক্ষণে প্রিয় চিকিৎসক নেতা ডা. মিলন চিরতরে হারিয়ে যান। থ্রি নট থ্রির একটি বুলেট তার ফুসফস ও হৃদপিণ্ড ভেদ করে গিয়েছিল।

মুহূর্তের মধ্যে চারদিকে এ খবর ছড়িয়ে পড়ে। গর্জে ওঠে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজপথ। সর্বত্র জনগণের কণ্ঠ- ‘মিলন ভাইয়ের রক্ত, বৃথা যেতে দেবো না’। আন্দোলন এমন এক ঝড়ের গতি পায়, যে ঝড়ে কোনো রাজন্য বা স্বৈরাচার কখনও টিকে থাকতে পারে না।

ডা. মিলন হত্যার প্রতিবাদে পুনরুজ্জীবিত হয়ে দেশের চিকিৎসক-সমাজ, মেডিক্যাল-ছাত্র রাস্তায় বেরিয়ে পড়ে এবং এরশাদ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। চারদিক থেকে চিকিৎসক ও ছাত্রজনতা বিশাল মিছিল নিয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে জনতার এক মহাসমুদ্র তৈরি করে।

পোস্ট মর্টেম এবং বহির্বিভাগের সামনে অনুষ্ঠিত জানাজা শেষে মিলনের শেষশয্যা রচিত হয় তারই প্রিয় শিক্ষাঙ্গন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ চত্বরে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে সেদিনের সব আয়োজনের দায়িত্ব বর্তেছিল আমার ওপর।

মিলনের মৃত্যুসনদটিও আমাকে লিখতে হয়েছিল। তাকে কবরে শায়িত করার সঙ্গে সঙ্গে খবর পেলাম এরশাদ সরকার ইতোমধ্যে কারফিউ জারি করেছে। জরুরি আইন ঘোষিত হয়েছে। এটি ছিল ক্ষমতা আঁকড়ে ধরে রাখার শেষ অস্ত্র।

জনগণ ঘৃণাভরে সেই ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করল। সে রাতেই কারফিউ ও জরুরি আইন অমান্য করে লাখ লাখ মানুষের ঢল নামে ঢাকার রাজপথসহ সারা দেশে। ২৮ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের সব মেডিক্যাল শিক্ষক ও সরকারি চিকিৎসক পদত্যাগ করে এরশাদ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানায়।

এই পদত্যাগ অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর প্রভাব ফেলে। আমরা ২৮ নভেম্বর সকালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সভাকক্ষে কন্ট্রোলরুম স্থাপন করি। সেখান থেকেই বিএমএর কর্মসূচি সারা দেশে পরিচালিত হয়।

৪ ডিসেম্বর রাতে এরশাদ পদত্যাগের ঘোষণা দিতে বাধ্য হয় এবং সেই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ নয় বছরের স্বৈরাচারী দুঃশাসনের পতন ঘটে। রাতে ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট ভরে যায় আনন্দমিছিলে। আমরাও ঢাকা মেডিক্যাল থেকে মিলনের সহকর্মী হিসেবে আনন্দ-বেদনার মধ্য দিয়ে যোগ দেই সে মিছিলে।

ডা. মিলন, নূর হোসেন, জেহাদসহ আরও অসংখ্য শহীদের রক্তে এ ভূখণ্ডের ইতিহাসে আরেকটি ঐতিহাসিক সংযোজন ‘গণ-অভ্যূত্থান ৯০’। যা দেশবাসীর কাছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এক নতুন আশার সঞ্চার করে।

১৯৮৩ সালে ডাক্তার হওয়ার পর থেকে মিলন চিকিৎসক ও পেশাজীবীদের সব আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। প্রতিটি আন্দোলনে তাকে সরকারের রোষানলে পড়তে হয়। এমনকি চাকরিচ্যুত পর্যন্ত হতে হয়েছে। যদিও চিকিৎসক-পেশাজীবীদের চাপের মুখে সরকার প্রতিবারই তা প্রত্যাখ্যান করতে বাধ্য হয়েছে।

মিলন তার কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসক, পেশাজীবী ও রাজনীতিবিদদের হৃদয়ে মযার্দার আসন অর্জন করেছিল। মিলনের সঙ্গে আমার ৮৩ সাল থেকে বন্ধুত্ব হলেও, ওর জীবনের শেষ দুটি বছর একরকম অহর্নিশি আমরা একসঙ্গে থাকতাম।

অমায়িক ব্যক্তিত্বের মানুষ মিলনের সঙ্গে ঢামেক শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলাম। আমি জয়ী হওয়ার পর ওকে কোষাধ্যক্ষ পদের প্রস্তাব দিলে প্রত্যাখ্যান করেনি। দিনরাত একসঙ্গে বিএমএ, শিক্ষক সমিতি ও পেশাজীবী আন্দোলনে কাজ করেছি।

সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। আন্দোলন সংঘটিত করার জন্য সারা দেশ ঘুরে বেড়িয়েছি। এমনকি হুলিয়া মাথায় নিয়ে রাতে হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে দুজনে একসঙ্গে ঘুমিয়েছি। মিলন প্রগতিশীল রাজনীতির কর্মী ছিল এবং স্বপ্ন দেখত দেশে গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নের।

১৯৯০ সালে চিকিৎসকদের প্রাণের দাবি ২৩ দফা বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন চলছিল। এ দাবিতে চিকিৎসকের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় ছিল না। গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা বাস্তবায়নে স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন, প্রয়োজনীয় লোকবল নিয়োগ, অবকাঠামো সংস্কার, বাজেট, মেডিক্যাল শিক্ষা সংস্কারসহ বিভিন্ন জরুরি বিষয় ছিল ওই আন্দোলনের দাবি।

ডা. মিলনের আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে এদেশের চিকিৎসকসমাজ জনগণের কাছে মর্যাদার আসন পেয়েছে। যে কারণে বিএমএর সেসময়ের সভাপতি ডা. এমএ মাজেদকে র্সবদলীয় রাজনতৈকি সিদ্ধান্তে তত্ত্বাবধায়ক সরকাররে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব প্রদান করেন।

বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) এদেশের চিকিৎসকদের একমাত্র জাতীয় সংগঠন। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও মেডিক্যাল শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। দেশের চিকিৎসকসমাজ নানা রাজনৈতিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত।

এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএমএ ও দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। রাজনৈতিক মতাদর্শ ভিন্ন হতেই পারে, কিন্তু মিলনের আত্মত্যাগের সাক্ষী বিএমএতে দলমত নির্বিশেষে গণমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা, চিকিৎসকদের উন্নয়ন ও অধিকারের স্বার্থে সব চিকিৎসকদের ঐক্যবদ্ধ থাকা জরুরি।

উন্নত বিশ্বে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নীতিনির্ধারনে মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের ভূমিকা অপরিসীম। কখনও আবার প্রধান। ডা. মিলনসহ লাখো শহীদের বিনিময়ে অর্জিত এই দেশে ‘বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন’কেও সেই উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করা দরকার।

শহীদ ডা. মিলনের ৩১ তম মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি শ্রদ্ধা রেখে, এদেশের চিকিৎসক সমাজের চিকিৎসাক্ষেত্রে ভেদাভেদ ভুলে দেশের সাধারণ মানুষের চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ মেধা, শক্তি ও সুযোগ ব্যয় করবে- এটিই প্রতিজ্ঞা হওয়া উচিত।

শহীদ ডা. ফজলে রাব্বি, ডা. আলীম ও ডা. মিলনসহ বহু চিকিৎসক দেশের জন্য জীবন দিয়ে গেছেন। জাতির কাছে চিকিৎসকদের একটি র্মযাদার আসনে বসিয়ে গেছেন।

এ দেশের চিকিৎসকদের দায়িত্ব স্বাস্থ্যব্যবস্থার সব সীমাবদ্ধতা পাস কাটিয়ে, সাধারণ মানুষের সুচিকিৎসার জন্য আন্তরকিতার সঙ্গে শক্তভাবে পাশে দাঁড়ানো। তবেই স্থায়ী হবে চিকিৎসকদের র্মযাদা। শান্তি পাবে শহিদের আত্মা।

এজন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সংস্কার। স্বাস্থ্যখাতে যে বাস্তবতা বিরাজ করছে তা মোটেও সন্তোষজনক নয়। এই বাস্তবতাকে গণবান্ধব করতে কিছু সুপারিশ সংশ্লিষ্ট মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই-

১. স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিকায়ন ও কঠোর নিয়ন্ত্রণ। একটি স্বাস্থ্য কমিশন গঠনরে মাধ্যমে অবকাঠামো এবং র্কমচারীদের দায়িত্ব পুনর্গঠন করতে হবে। যেখানে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত থাকবে। প্রতিটি কাজের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং ফলো-আপ থাকা

২. শেখ হাসিনা সরকার প্রণীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০০০-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন

৩. জনসংখ্যা অনুপাতে চিকিৎসক, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগের একটি দীর্ঘমেয়াদি পরকিল্পনা

৪. জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেট। প্রয়োজনীয় বাজেটে (জাতীয় বাজেটের ন্যূনতম ১০%) বরাদ্দ এবং এর সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা

৫. স্বাস্থ্যখাতে কঠোরভাবে দুর্নীতি দমন

৬. নিয়োগ ও বদলি নীতিমালা। অর্থাৎ চিকিৎসকদের ক্যারিয়ার প্ল্যানিংসহ একটি গ্রহণযোগ্য বদলি-পদোন্নতির কার্যকর নীতিমালা থাকা যেখানে সবার অধিকার নিশ্চিত হবে

৭. মেডিক্যাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বায়ত্তশাসন

৮. ল্যাবরেটরি সার্ভিস নীতিমালা হালনাগাদ ও জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ ও সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার মান নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে যৌক্তিক মূল্যনির্ধারণ

৯. বিএমডিসিকে র্কাযকর ও শক্তিশালী করে তোলা

১০. বেসরকারি কলেজ-হাসপাতাল ও ক্লিনিক পরিচালনা

১১. চিকিৎসক ও সব হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা

১২. স্বাস্থ্য প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণ

১৩. রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন

১৪. মেডিক্যাল ইনফরমশেন সিস্টেম (এমআইএস) গঠন

১৫. অভ্যর্থনা ও তথ্যকেন্দ্র তৈরি

শেখ হাসিনা সরকার-প্রণীত সর্বজনগৃহীত জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি ২০০০-এর ওপর ভিত্তি করে সংস্কারের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে একটি সর্বজনীন স্বাস্থ্যনীতি গড়ে উঠবে এটাই বিশ্বাস।

লেখক: চিকিৎসক ও অধ্যাপক। সাবেক উপাচার্য, বিএসএমএমইউ।

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন

মিলনের রক্ত ও বিশ্বাসঘাতকতার উল্লাসধ্বনি

মিলনের রক্ত ও বিশ্বাসঘাতকতার উল্লাসধ্বনি

জনশ্রুতি হিসেবে ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ধরা হয় তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্যাডার ও তার দলকে। সেই ক্যাডার ছাত্রদলের রাজনীতি করত। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কয়েকমাস আগে গ্রেপ্তার হয়। নভেম্বরে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ছাত্রদলের কর্মীরা মিষ্টি-মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। শুধু তাই নয়, সেই ক্যাডারকে সন্তান হিসেবে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন এরশাদপত্নী। বিপুল পরিমাণ উপহারও দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন ভণ্ডুল করার জন্য তাকে কাজে লাগানো হয়।

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে পুরো দেশ তোলপাড়। দেশব্যাপী চলছিল রাজপথ-রেলপথ অবরোধ। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) একটি জরুরি সভা হবে। সে সভায় যোগ দেয়ার জন্য আজিমপুরের বাসা থেকে সকাল দশটার দিকে রিকশায় করে যাচ্ছিলেন অ্যাসোসিয়েশনের যুগ্মমহাসচিব ডা. শামসুল আলম খান মিলন। টিএসসি’র মোড়ে আসতেই ডা. মিলনকে ডাক দিলেন আরেক রিকশায় থাকা বিএমএ মহাসচিব ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন। ডা. জালাল বললেন, মিলন আমার রিকশায় চলে এস, একসাথে যাই।

রিকশা ছেড়ে দিয়ে ডা. জালালের রিকশায় চড়ে বসলেন ডা. মিলন। কিন্তু কে জানত, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ওৎ পেতে ছিল আততায়ীরা! রিকশা কিছুদূর এগোতেই হঠাৎ ডা. মিলন বললেন, জালাল ভাই, দেখেন তো আমার কী হয়েছে?

ডা. মিলনের দিকে তাকিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলেন ডা. জালাল। গুলির শব্দ তিনি পেয়েছেন, কিন্তু সেটা যে তার রিকশার সহযাত্রী ও সহকর্মীকে বিদ্ধ করেছে, টের পাননি। টের পেলেন রক্তে ভেসে যাওয়া মিলনের গুলিবিদ্ধ শরীরের দিকে তাকিয়ে।

সময় নষ্ট না করে দ্রুত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো মিলনকে। কিন্তু তাঁকে প্রাণে বাঁচানো যায়নি। এগারোটার আগেই সহকর্মীদের চেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে শহীদ হলেন মিলন। আর ভাগ্যের জোরে প্রাণে বেঁচে গেলেন ডা. জালাল।

কিন্তু কেন এই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটানো হলো? কেন ডাক্তার মিলনকে টার্গেট করা হলো? কারণ একটাই- ডা. মিলনকে হত্যার মধ্য দিয়ে এক ঢিলে অনেকগুলো পাখি মারার অপকৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল তখনকার স্বৈরাচার এরশাদ।

ডা. মিলনের জন্ম ১৯৫৭ সালের ২১ আগস্ট ঢাকায়। ১৯৮৩ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত হন। ১৯৮৮ সালে বায়োকেমিস্ট্রিতে এমফিল ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৮৯ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন।

ডা. মিলন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের চিন্তাধারায় সিক্ত মানুষ। তাকে নিয়ে নানা জায়গায় স্মৃতিচারণ করেছেন তার মা সেলিনা আক্তার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে না পারার আক্ষেপ ছিল ডা. মিলনের। ১৯৭১ সালে তিনি ছিলেন অষ্টম শ্রেণির ছাত্র। বঙ্গবন্ধু যখন স্বাধীনতার ডাক দিলেন, যার যা কিছু আছে তা-ই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করার নির্দেশ দিলেন, ডা. মিলনও সেই ডাকে সাড়া দিয়েছিলেন। পাড়ার অনেকের সঙ্গে কাঠের বন্দুক নিয়ে প্যারেড করতেন মিলন।

ছাত্র থাকা অবস্থাতেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ১৯৮২ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন মিলন।

স্বৈরাচারবিরোধিতার কারণে তাকে রংপুরের রৌমারীতে বদলি করা হয়েছিল। সরকারের তরফ থেকেও তাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়া হয়েছিল বেশ কয়েকবার। অনেকবার তাকে সরকারি দলে যোগ দেয়ার লোভ দেখানো হয়। ডা. মিলন ঘৃণার সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর তাকে চাকরি থেকেও বহিষ্কার করা হয়েছিল একবার। তবু দমানো যায়নি ডা. মিলনকে।

তিনি ছিলেন এরশাদের স্বাস্থ্যনীতির কঠোর সমালোচক। ১৯৯০ সালের ১০ অক্টোবর স্বৈরাচারবিরোধী বিক্ষোভে নাজির উদ্দিন জেহাদ নামের এক ছাত্র পুলিশের গুলিতে মারা যান। পুলিশ জেহাদের লাশ ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। এসময় ডা. মিলনের নেতৃত্বে ছাত্র ও চিকিৎসকরা তাদের প্রতিহত করে। আর সেদিনই ডা. মিলনের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় গঠিত হয় সম্মিলিত সর্বদলীয় ছাত্রজোট। তার অসম্ভব সাংগঠনিক ক্ষমতা ও দক্ষতায় ঘাবড়ে যায় স্বৈরাচার ও তার দোসরেরা। ডা. মিলন তাদের টার্গেটে পরিণত হন। আর তারই করুণ পরিণতি ঘটে ১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর।

স্বৈরাচার এরশাদ চেয়েছিল ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের দোষ ছাত্রদের উপর চাপিয়ে দেবে। এই সুযোগে আন্দোলনকারী ছাত্রদের উপর দমন-পীড়ন চালাবে। সে কারণে স্বরাষ্ট্র সচিবকে ডেকে কারফিউ জারির ইচ্ছাও পোষণ করেছিল এরশাদ। কিন্তু এরশাদের পরিকল্পনার সঙ্গে পরবর্তী ঘটনাগুলো একেবারেই মিলল না। বরং ডা. মিলনের মৃত্যুতে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন আরও বেগবান হয়ে উঠল।

কর্মবিরতির ঘোষণা দিলেন ডাক্তাররা। গণপদত্যাগ করলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘নিউজ উইক’ মন্তব্য করল- ‘ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ড বিদ্যুস্পর্শের মতো দাবানল তৈরি করেছিল। এর ফলে অনির্বাচিত সামরিক সরকারের পতন ত্বরান্বিত হয় এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার কুখ্যাত স্বাস্থ্যনীতি বাতিলের ঘোষণা দেয়।’

ডা. মিলনের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে কারা জড়িত? শুধুই কি স্বৈরাচারী এরশাদ? নাকি পর্দার আড়ালে আরও কিছু রয়ে গেছে?

১৯৯০ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত মাসিক ‘গণসংস্কৃতি’ পত্রিকায় ডা. মিলনের একটি লেখার অংশ বিশেষ থেকে অনেক কিছু পরিষ্কার হয়ে যাবে। ডা. মিলন লিখেছিলেন- ‘‘সরকার মূল সমস্যা সমূহের সমাধানের পথে না গিয়ে জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুরবস্থার জন্য চিকিৎসকদেরও দায়ী করেছেন। অথচ সরকার ২৮ পয়সা বরাদ্দ করে জনগণের কাছে কোন স্বাস্থ্যনীতি প্রণয়ন করতে চান তা বলছেন না।

সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পর্যাপ্ত ও শক্তিশালীভাবে গড়ে তুললে জনগণ কখনও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের মুখাপেক্ষী হতো না। তাই আজ প্রথম প্রয়োজন সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা। অথচ সে পথে না গিয়ে সরকার স্বাস্থ্য বেসরকারিকরণের উদ্যোগ নিচ্ছে। এর ফলে গরিব জনগণ আজ যতটুকু চিকিৎসা পাচ্ছে, তা থেকেও বঞ্চিত হবে। তাই আজ প্রথম প্রয়োজন একটি জনগণের সরকার, যারা জনগণের স্বাস্থ্যসেবাকে প্রাধান্য দেবে।”

তার মানে ডা. মিলনের প্রধান লক্ষ্য ছিল দেশের স্বাস্থ্যসেবাকে সরকারীকরণের মাধ্যমে দেশের আপামর জনগণের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া। পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাকে উন্নত করা। সামরিকশাসনের সময় অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যয় কমিয়ে জনকল্যানমূলক কাজে ব্যয় বাড়ানোর যে চাপ, চিকিৎসক সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি সে আন্দোলনের পুরোভাগে ছিলেন।

জনমুখী জাতীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা আন্দোলনের অগ্রবর্তী সৈনিক ছিলেন মিলন। মোদ্দাকথা, বেসরকারীকরণের মাধ্যমে চিকিৎসার নামে ব্যবসার ঘোর বিরোধী ছিলেন মিলন। আর সেটা পুঁজিপতি স্বাস্থ্যব্যবসায়ীদের স্বার্থে চরম আঘাত করেছে নিশ্চয়ই। যা তার জীবনের জন্য হয়ে উঠল মারাত্মক হুমকি।

এর প্রমাণ মেলে ডা. মিলন শহীদ হওয়ার পর পরবর্তী কর্মকাণ্ডে।

ডা. মিলন নিহত হওয়ার দিন সন্ধ্যায় রমনা থানায় (তখন শাহবাগ থানা হয়নি) একটি মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশি তদন্ত ঘুরতে থাকে গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের এ হাত থেকে সে হাতে। ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি আদালত চার্জ গঠন করেন। ৩১ জনকে সাক্ষী করে চার্জশিট দেয়া হয়। কিন্তু আদালত ১৪ জন সাক্ষীকে বৈরী ঘোষণা করেন। জনশ্রুতি হিসেবে ডা. মিলন হত্যাকাণ্ডের প্রধান সন্দেহভাজন ধরা হয় তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ক্যাডার ও তার দলকে। সেই ক্যাডার ছাত্রদলের রাজনীতি করত।

এরশাদবিরোধী আন্দোলনের কয়েকমাস আগে গ্রেপ্তার হয়। নভেম্বরে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর ছাত্রদলের কর্মীরা মিষ্টি-মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেয়। শুধু তাই নয়, সেই ক্যাডারকে সন্তান হিসেবে বুকে জড়িয়ে নিয়েছিলেন এরশাদপত্নী। বিপুল পরিমাণ উপহারও দিয়েছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক আন্দোলন ভণ্ডুল করার জন্য তাকে কাজে লাগানো হয়। সেটা সে সময়কার ছাত্রনেতারাও বুঝতে পেরেছিলেন। এবং তার প্রমাণও মিলল অনেক বছর পরে।

১৯৯৬ সালে সেই ক্যাডার এরশাদ গঠিত জাতীয় পার্টিতে যোগ দিয়ে বরিশাল থেকে সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হয়েছিল। এরপর মডেল তিন্নি হত্যা মামলায় ফেঁসে এখন অবধি পলাতক।

১৯৯২ সালে ডা. মিলনের মায়ের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে মিলন হত্যা মামলার পুনঃতদন্ত ও পুনর্বিচারের আবেদনও করা হয়েছিল। কিন্তু এখন অবধি তার কোনো ফলাফল জানা যায়নি।

‘মিলনের মুখ’ কবিতায় শামসুর রাহমান লিখেছেন-

“গুলিবিদ্ধ শহর করছে অশ্রুপাত অবিরত,

কেননা মিলন নেই। দিন দুপুরেই নরকের

শিকারী কুকুর তার বুকে বসিয়েছে দাঁত, বড়

নিঝুম স্থাপত্য আজ মিলনের প্রতিবাদী মুখ।”…

“…অকস্মাৎ আকাশে কে যেন দিল ঢেলে কালো কালি,

দুপুর সন্ধ্যায় সাজ প’রে বিধবার মতো চোখ

মেলে চেয়ে থাকে আর আঁচলে সংগ্রামী স্মৃতি জ্বলে,

মিলনের মুখে বৃষ্টি নয়, বাংলার অশ্রু ঝরে।

(কাব্যগ্রন্থ: খণ্ডিত গৌরব)

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি দেশে গড়ে উঠেছে, অনেকের মতো ডা. মিলনও সে সংস্কৃতির শিকার। শুধু তাই নয়, খন্দকার মোশতাকের মাধ্যমে বিশ্বাসঘাতকতার সংস্কৃতিতে নতুন করে হাওয়া লাগাল ১৯৯০ পরবর্তী রাজনৈতিক দল বিএনপি। তিন জোটের রূপরেখায় অঙ্গীকারনামা ছিল যে, স্বৈরাচারের সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন কাউকে দলে ভেড়ানো হবে না।

গণ-অভ্যুত্থানে এরশাদের পতনের সময় মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন এম কে আনোয়ার। সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্যের করা কালো তালিকায় কিছু ব্যবসায়ী ও আমলার সঙ্গে এম কে আনোয়ারের নামও ছিল। কালো তালিকায় নাম থাকার কারণে আওয়ামী লীগ থেকে প্রার্থী হতে চেয়েও মনোনয়ন না পেয়ে বিএনপি শিবিরে আস্তানা গাড়েন আনোয়ার। মোট পাঁচবার সংসদ সদস্য হন এবং দুবার খালেদা জিয়ার সরকারে মন্ত্রী ছিলেন। বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্যও হয়েছিলেন এই কালো তালিকাভুক্ত দাপুটে আমলা।

মূলত ডা. মিলনের রক্তের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শুরু সেখান থেকেই।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন

তারেক জিয়ার নতুন কৌশল গুজবসন্ত্রাস

তারেক জিয়ার নতুন কৌশল গুজবসন্ত্রাস

গুজব সিন্ডিকেটে রয়েছে সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ও চাকরিচ্যুত কজন সেনাকর্মকর্তা, বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত বিদেশে আত্মগোপনকারী ভুঁইফোঁড় সাংবাদিক, রাজাকারের সন্তান ও শিবির ক্যাডার। এ সিন্ডিকেট প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পরিবার-সরকার, বিচার বিভাগ-দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার যখন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিচ্ছে; তখনই দেশের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করার মানসে বিদেশে বসে ক্রমাগত চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে তারেক জিয়ার নেতৃত্বাধীন স্বাধীনতাবিরোধী একটি চক্র। এরা প্রতিষ্ঠিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মাধ্যমে দেশকে অকার্যকর ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অশুভ প্রয়াস নিয়ে বিশাল অর্থব্যয়ে কিছু সাইবার সন্ত্রাসী ভাড়া করে গড়ে তুলেছে গুজব সিন্ডিকেট।

তাদের এ গুজব সিন্ডিকেটে রয়েছে সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ও চাকরিচ্যুত কজন সেনাকর্মকর্তা, বিভিন্ন ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত বিদেশে আত্মগোপনকারী ভুঁইফোঁড় সাংবাদিক, রাজাকারের সন্তান ও শিবির ক্যাডার। এ সিন্ডিকেট প্রযুক্তির অপব্যবহারের মাধ্যমে ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটারসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বঙ্গবন্ধু পরিবার-সরকার, বিচার বিভাগ-দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ও পুলিশবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে।

রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণের উদ্দেশ্যে মিথ্যা তথ্য, ভুয়া ছবি দিয়ে অডিও-ভিডিও তৈরি করে ফেসবুক ও ইউটিউবে ছড়িয়ে দিচ্ছে। তারেক জিয়ার এ গুজব সিন্ডিকেট শুরুর দিকে মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে দেশকে সাময়িক অস্থিতিশীল করতে পারলেও দেশপ্রেমিক জনগণ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা উপলব্ধি করতে পেরেছে।

এবার আসা যাক তারেক জিয়া গুজবকে হাতিয়ার হিসেবে কেন ব্যবহার করছে এবং কীভাবে করছে?

জার্মানির নাৎসি নেতা এডলফ হিটলারের তথ্য উপদেষ্টা গোয়েবলস বিশ্বাস করতেন, ‘একটা মিথ্যা দশবার প্রচার করলে তা সত্যে পরিণত হয়।’ ২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে এ তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে তারা অনেক গুজব ছড়িয়েছিল এবং সফলতাও পায়। তারেক রহমান ও তার সংঘবদ্ধ চক্র বিদেশে বসে এই তত্ত্বের আলোকেই গুজব ছড়িয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করতে চাচ্ছে প্রতিনিয়ত।

ইতিহাসভিত্তিক গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনীতিতে গুজব বরাবর একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। অপরাধ বিজ্ঞানীদের মতে, কলুষিত রাজনৈতিক শক্তির মাধ্যমে প্রভাবিত হয়ে উন্নয়ন ও অগ্রগতির কারণে যাতে ইতিবাচক রাজনৈতিক ধারার ক্ষতি করা যায়- এ ধরনের মানসিকতা থেকে গুজব ছড়ানোর মতো অপরাধে মানুষ সম্পৃক্ত হয়। এর ফলে যে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন স্থবির হয়ে পড়ে, এটি তারা কখনও চিন্তা করে না।

রবার্ট এইচ নাপ তার ‘এ সাইকোলজি অব রিউমার’ বইয়ে লিখেছেন, গুজবের তিনটি মৌলিক দিক আছে। প্রথমটি হলো মানুষের মুখ। গুজব এক মুখ থেকে আরেক মুখে প্রচারিত হয়ে খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। সময় ও মানুষ- এ দুটি উপাদানের কারণে তা বিকৃতও হয় বিভিন্নভাবে। দ্বিতীয় দিকটি হলো- গুজবের জ্ঞান দেয়া। এর দুটো দিক থাকতে পারে। একটি হলো ইতিবাচক আরেকটি হলো নেতিবাচক। তৃতীয় দিকটি হলো মানুষের মন গুজব দ্বারা প্রভাবিত হতে চায় ও গ্রহণ করতে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

জনপ্রত্যাশা থেকে ছিটকে পড়ে গুজব সন্ত্রাসে ভর করে হামাগুড়ি দিয়ে চলছে বিএনপি। মাঠের আন্দোলনে ব্যর্থ হয়ে এখন গুজব ছড়িয়ে দেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করতে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে বিএনপি নিয়ন্ত্রিত এ গুজব সিন্ডিকেট। এই সংঘবদ্ধ চক্রটির ছড়ানো কিছু গুজবের নমুনা:

কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় ‘পুলিশের গুলিতে আহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবুবকর চিকিৎসারত অবস্থায় মারা গেছে!’ এই গুজব ছড়িয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে রণক্ষেত্রে পরিণত করেছিল এ চক্রটি।

‘হলে বিদ্যুৎ বন্ধ করে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা হচ্ছে!’ এই গুজবটিও ছড়ানো হয়েছিল কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময়। কিন্তু প্রত্যেক হলেই বিদ্যুৎ ছিল। সবাই ভেবেছিল আমার হলে হয়তো বিদ্যুৎ আছে, অন্য সব হলে বিদ্যুৎ বন্ধ করে হামলা হচ্ছে।

২০১৮ সালের এপ্রিলে বিএনপির নেতাকর্মীদের শত শত শেয়ারের মাধ্যমে ‘তারেক জিয়াকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবার আমন্ত্রণ’ শীর্ষক গুজবটি ছড়িয়ে দেয়া হয়; যা পরবর্তী সময়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রতীয়মান হয়।

সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহাকে নিয়ে এমন কিছু গুজব ছড়ানো হয়েছিল, যা তথ্যপ্রযুক্তিবিদদের অবাক করে দিয়েছে। দেশের বেশ কয়েকটি দৈনিক পত্রিকাকে ফেসবুকে পোস্ট করা হয়েছে নকল করে। যার কোনোটাই আসল কাগজ ছিল না। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউকে থেকে পরিচালিত ৭৮টি ফেসবুক আইডির মাধ্যমে তারা এই গুজব ছড়ায়।

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মতো একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংস আন্দোলনে পরিণত করে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির পেছনে তখন কলকাঠি নেড়েছিল এই গুজব সিন্ডিকেট। বর্তমানে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ‘পরিবহনে হাফ ভাড়া চাই’ শীর্ষক যৌক্তিক ও শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকে সহিংস করে তুলতে ইতোমধ্যেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় হয়ে উঠেছে গুজব সিন্ডিকেট।

‘পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা লাগবে।’ এই গুজবটি অত্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে দিয়েছিল এ চক্রটি। এই গুজবকে কেন্দ্র করে ছেলেধরা সন্দেহে দেশজুড়ে গণপিটুনিতে প্রাণ হারায় অন্তত ২০ জন।

২০১২ সালের শেষদিকে ফেসবুকে পবিত্র কোরআন অবমাননা করে ছবি সংযুক্ত করে গুজব ছড়ানোর কুশীলব ছিল এই গুজব সিন্ডিকেট। যার ফলে সামপ্রদায়িক শক্তি রামু উপজেলার ১২ বৌদ্ধ মন্দির ও ৩০টি বাড়িতে আগুন দেয়।

জমিজমা-সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে ঢাকার পল্লবীতে শাহীন উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যার একটি পুরোনো ভিডিওকে ফেনীর যতন কুমার সাহার হত্যার ভিডিও বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে সাম্প্রদায়িক অশান্তি সৃষ্টি করতে চেয়েছিল এ চক্রটি।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রচেষ্টায় দেশব্যাপী দৃশ্যমান উন্নয়নের পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়নে দেশ এখন ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু তথ্যপ্রযুক্তির এই সহজলভ্যতাকে নেতিবাচকভাবে ব্যবহার করছে বিএনপি-জামায়াতের মতো স্বার্থান্বেষী মহল।

তারেক জিয়া নিয়ন্ত্রিত গুজব সিন্ডিকেটের ষড়যন্ত্রপ্রসূত বিভিন্ন মিথ্যাচারকে ফেসবুক ও ইউটিউবের মাধ্যমে দেশব্যাপী ছড়িয়ে দিচ্ছে দেশীয় ভুঁইফোঁড় ‘পণ্ডিতেরা’। যদিও সাধারণ মানুষ এসব অশুভ শক্তিকে ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এরপরও সরকারকে ঘায়েল করার অপকৌশল হিসেবে যুদ্ধাপরাধী ও মানবতাবিরোধী অপশক্তি এখন সাইবারযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। তারা শুধু গুজব ছড়িয়েই ক্ষান্ত হচ্ছে না, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য উসকানি দিচ্ছে মৌলবাদী প্রেতাত্মাদের।

তাদের এ গুজব সন্ত্রাস রুখতে গোয়েন্দা সংস্থা, নিরাপত্তা বাহিনী ও সরকারের যোগাযোগের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগ রাতদিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে। গোয়েন্দা সংস্থার চৌকস সদস্যদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় গুজব ছড়ানোর কুশীলবদের ইতোমধ্যেই শনাক্ত করতে পেরেছে সরকার। গুজব ছড়িয়ে দিয়ে যাতে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করতে না পারে এ ব্যাপারে সবসময় তৎপর আমাদের নিরাপত্তায় নিয়োজিত পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন স্তরের দায়িত্বশীল সদস্য।

অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রচার রোধে মানুষকে সচেতন করে তোলার জন্য ‘আসল চিনি’ নামে একটি উদ্যোগ নিয়েছে সরকারের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ। গুজব সন্ত্রাসীদের রুখতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিকের দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে নিজে সচেতন থাকতে হবে এবং আশপাশের সকলকে সচেতন রাখতে হবে।

সবাইকে মনে রাখতে হবে- গুজব একটি সামাজিক অপরাধ, যা একটি দেশের শান্তি-শৃঙ্খলা বিনষ্টের অন্যতম কারণ। গুজব সৃষ্টি ও গুজব ছড়ানো দুটোই অপরাধ। তাই একজন সুনাগরিক হিসেবে আমাদের ব্যক্তিগত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ( ফেইসবুক, টুইটার, ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব) কোনো কিছু শেয়ার করার আগে ঘটনার সত্যতা ও প্রকৃত উৎস সম্পর্কে অবগত হয়ে শেয়ার করা উচিত। কেননা, আমাদের শেয়ার করা একটি ভুল তথ্য আমাদের বন্ধু ও অনুসারীদের মাঝে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের এ যুগে আমাদের বিবেকবোধকে কাজে লাগিয়ে কর্মের মাধ্যমে ‘হুজুগে বাঙালি’ তকমা থেকে বেরিয়ে আসা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

লেখক: ছাত্রনেতা

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন

ডা.মিলনের আত্মদান ও জাতির প্রাপ্তি

ডা.মিলনের আত্মদান ও জাতির প্রাপ্তি

বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ‘বাংলাদেশ: এ স্টাডি অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেজিমস’ বইতে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সেনাপ্রধান নূরউদ্দীন খান, খালেদা জিয়া, গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর মধ্যে একটি বৈঠক হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক জি ডব্লিউ চৌধুরীর বাসভবনে। এই জি ডব্লিউ চৌধুরী ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের যোগাযোগমন্ত্রী ও ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা ছিলেন। ওই বৈঠকেই গোলাম আযমের নাগরিকত্ব আর তার আমিরত্ব মেনে নেয়ার শর্তে ১৮ আসনধারী জামায়াত বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

১৯৯০ সালের ২৭ নভেম্বর দেশব্যাপী তিন জোটের রাজপথ-রেলপথ অবরোধ কর্মসূচি চলছিল। স্বৈরশাসক লেফটেন্যান্ট জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনকালের যে অন্তিম সময় এসে গেছে, সেটা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে অনেকটা পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল। তিন জোট এমন একটি ধাক্কা দিতে চাইছিল যাতে এরশাদ আর সামলে উঠতে না পারেন। পতন অনিবার্য হয়। ২৭ নভেম্বর বিকেলে ডা. শামসুল আলম খান মিলন, বিএমএর সেসময়ের যুগ্ম মহাসচিব, একটি সভায় যোগ দেয়ার জন্য ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে, (তিনি সেখানে শিক্ষক ছিলেন) যাচ্ছিলেন পিজি হাসপাতালে।

টিএসসি এলাকায় তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে এরশাদের লেলিয়ে দেয়া সশস্ত্র গুন্ডারা। মিলন তৎক্ষণাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ৭ বছরে অনেককেই জীবন দিতে হয়েছে। কোনো কোনো মৃত্যু স্ফুলিঙ্গের সৃষ্টি করে। মিলনের রক্তের দাগ শোকাতে না শোকাতেই এরশাদের মসনদ টলে যায়।

এরশাদ ১৯৮২ সালে বন্দুকের নল দেখিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তারকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেই দেশশাসনের ভার নিয়েছিলেন। কিন্তু শুরু থেকেই তাকে প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মুখে পড়তে হয়। তিনি কিছু ক্ষমতালিপ্সুকে সঙ্গে পেয়েছিলেন কিন্তু তার বিরুদ্ধে ছিল দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দল। কেন দেশের রাজনৈতিক দলগুলো এরশাদের ক্ষমতা দখলের বিষয়টি মেনে নিতে পারেনি, তা রীতিমতো একটি ভালো গবেষণার বিষয় হতে পারে। ফলে এরশাদের শাসনকাল ছিল আন্দোলন-সংগ্রামে মুখর।

এরশাদ যেমন দেশের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির অপূরণীয় ক্ষতি করেছেন ‘রাষ্ট্র ধর্ম’ করার মধ্য দিয়ে, তেমনি তিনি রাজনীতির কিছু উপকারও করেছিলেন। আমাদের দেশের বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন। তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য দেশের সব ধারার রাজনৈতিক দলের মধ্যে গড়ে উঠছিল এক অভূতপূর্ব ঐক্য। একজোটের মধ্যে সবাই শামিল না হলেও তিন জোটের মধ্যে প্রায় সবাই সমবেত হয়েছিল।

আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮-দলীয় জোট, বিএনপির নেতৃত্বে ৭-দল এবং বাম ঘরানার ৫-দল। এর বাইরে জামায়াতে ইসলামী আলাদা হলেও ওই তিন জোটের সঙ্গে সমন্বয় করেই কর্মসূচি ঘোষণা করত। অর্থাৎ এরশাদকে ক্ষমতা থেকে হটাতে মোটামুটি দেশে একটি জাতীয় ঐক্য গড়ে উঠছিল। কিন্তু এরশাদ পতনের পর আর সেভাবে রাজনীতিতে ঐক্য নেই। এখনও রাজনীতির মূলধারা প্রায় এক থাকলেও জোট এবং স্বতন্ত্র যেসব রাজনৈতিক ধারা দেশে চলমান আছে, সেগুলোর মধ্যে ঐক্যের চেয়ে বিরোধ বেশি। মিত্রতার চেয়ে শত্রুতা বেশি।

স্বৈরাচার ও সামরিক একনায়ক সরকারের পতনের আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে আন্দোলনরত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ৮ দল, বিএনপির নেতৃতাধীন ৭ দল ও বামপন্থিদের ৫ দল মিলে এরশাদ পরবর্তী সরকার ব্যবস্থা কীরূপ হবে তার একটি রূপরেখা প্রণয়ন করে।

১৯৯০ সালের ১৯ নভেম্বর ওই তিনটি জোট আলাদা আলাদা সমাবেশে রূপরেখা তুলে ধরে। এর ৭ দিন পর আন্দোলন চলাকালেই গুলি করে হত্যা করা হয় ডা. মিলনকে। ডা. মিলনের আত্মদান এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নতুন প্রাণপ্রবাহ তৈরি করে।

এরশাদের ক্ষমতার ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। ২৭ নভেম্বর ডা. মিলনকে হত্যা করার মাত্র সপ্তাহকাল পরেই এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হন। সেজন্য একদিক থেকে এটা বলা যায় যে, ডা. মিলনের আত্মদান বৃথা যায়নি।

অপরদিকে আবার প্রশ্ন আসে, ডা. মিলনসহ যারা এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শহীদ হয়েছেন, তারা কি শুধু ব্যক্তির পরিবর্তন চেয়েছিলেন, নাকি ওই ব্যক্তি যে নীতি-আদর্শ বা ব্যবস্থার পক্ষে, সেসবেরও পরিবর্তন তাদের কাম্য ছিল?

ডা. মিলনের আত্মদানের ৩১ বছর পর মনে প্রশ্ন জাগে, পরবর্তী তিন দশকে যে শাসন ব্যবস্থা আমরা গড়ে তুলেছি, তাতে কতটা প্রতিফলিত হয়েছে তিন জোটের রূপরেখা যা কার্যত এরশাদের পতন ত্বরান্বিত করেছিল?

একটু ভালোভাবে দেখলে এটা স্পষ্ট হবে যে, রূপরেখার প্রায় পুরোটাই পরবর্তী ক্ষমতাসীনরা বিসর্জন দিয়েছে। অবশ্য এই বিসজর্ন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল রূপরেখা প্রণয়নের অব্যবহিত পর থেকেই। আমাদের রাজনীতিবিদরা অঙ্গীকার করেন প্রধানত পালনের জন্য নয়, ভঙ্গ করার জন্যই।

ওই রূপরেখার প্রধানদিক ছিল মৌলবাদ ও স্বৈরাচারের পুনরুত্থান রুখে দিয়ে একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার। রূপরেখায় স্বৈরাচারের পতনের পর জাতীয় সংসদের অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে ভোটারদের ইচ্ছামতো ভোট দেয়ার বিধান নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছিল। অনেক কিছুই ছিল রূপরেখায়।

অঙ্গীকার করা হয়েছিল হত্যা, অভ্যুত্থান, ষড়যন্ত্রের রাজনীতির অবসান, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ‘সার্বভৌম সংসদ’ প্রতিষ্ঠা, নাগরিকের মৌলিক অধিকার সংরক্ষণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, মৌলিক অধিকার পরিপন্থি আইন রহিত করার ব্যবস্থা করা হবে। সেখানে ‘স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারায় দেশে পুনঃগণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা’ প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে।

৩ জোটের পক্ষ থেকে ‘রাজনৈতিক দলসমূহের পারস্পরিক আচরণবিধি’ নামে একটি অঙ্গীকারনামাও স্বাক্ষর করা হয়েছিল। ওই আচরণবিধির তিন নম্বর ধারা: ‘আমাদের তিনটি জোটভুক্ত দলসমূহ ব্যক্তিগত কুৎসা রটনা এবং অপর দলের দেশপ্রেম ও ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কে কটাক্ষ করা থেকে বিরত থাকবে। আমাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহ সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় প্রদান করবে না এবং সাম্প্রদায়িক প্রচারণা সমবেতভাবে প্রতিরোধ করবে।’

চার নম্বর ধারায় বলা হয়: ‘নির্বাচনী কার্যক্রমে সর্বোতভাবে সংঘাত পরিহার করার জন্য তিনটি রাজনৈতিক জোটভুক্ত দলসমূহ অঙ্গীকার করছে। সেজন্য এরশাদের স্বৈরাচারী সরকারের চিহ্নিত সহযোগী ও অবৈধ অস্ত্রধারীদের আমাদের জোটভুক্ত রাজনৈতিক দলসমূহে স্থান না দেয়ার জন্য আমাদের ইতিপূর্বে প্রদত্ত ঘোষণা কঠোরভাবে কার্যকর করা হবে।

ভোটাররা যাতে স্বাধীনভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে এবং ভোটকেন্দ্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় থাকে সে বিষয়ে আমাদের তিনটি জোটভুক্ত দলসমূহ সতর্ক দৃষ্টি রাখবে।’

এরশাদের পতনের পর পরই ওই রূপরেখাকে ছুড়ে ফেলে দেয় বিএনপি। চুক্তি অনুযায়ী স্বৈরাচারের দোসরদের নির্বাচনে মনোনয়ন দেয়ার কথা নয়। কিন্তু এম কে আনোয়ার ও কেরামত আলীকে বিএনপি মনোনয়ন দিয়ে রূপরেখার প্রতি প্রথম অবজ্ঞা দেখায়।

অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িকতাকে প্রশ্রয় না দেয়ার কথা বলা হলেও নির্বাচনি প্রচারে বিএনপি ধর্মের কার্ড খেলা শুরু করে। বক্তৃতা বিবৃতিতে বলতে থাকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে। বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া নিজে এসব উসকানিমূলক বক্তব্য দিয়ে তিন জোটের রূপরেখাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েছেন।

১৯৯১ সালে পঞ্চম সংসদ নির্বাচনের পর বিএনপি জামায়াতে ইসলামীর সমর্থক ও সহযোগিতা নিয়ে যে প্রক্রিয়ায় সরকার গঠন করে, সেখানেই তিন জোটের রূপরেখা অনুযায়ী একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যায়।

যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি শুরু হয়েছিল ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মধ্য দিয়ে, তাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়ে ’৯১ সালে জামায়াতের সহায়তায় সরকার গঠন করে বিএনপি। ওই নির্বাচনে কোনো দলই সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়েছিল। সরকার গঠন করতে হলে তাদের দরকার ছিল আরও ১১টি আসন। জামায়াত পেয়েছিল ১৮টি আর বামপন্থিরা ১৩টি। বিএনপি চাইলেই বামপন্থিদের দিকে হাত বাড়াতে পারত। বামদলগুলো বিএনপিকে সমর্থন দিতেও রাজি ছিল। কিন্তু বিএনপি সেদিনে যায়নি।

বিএনপির একজন নীতিনির্ধারক নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের ‘বাংলাদেশ: এ স্টাডি অব দ্য ডেমোক্রেটিক রেজিমস’ বইতে দেয়া তথ্য অনুযায়ী, সেনাপ্রধান নূরউদ্দীন খান, খালেদা জিয়া, গোলাম আযম ও মতিউর রহমান নিজামীর মধ্যে একটি বৈঠক হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সাবেক অধ্যাপক জি ডব্লিউ চৌধুরীর বাসভবনে। এই জি ডব্লিউ চৌধুরী ১৯৬৯ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত পাকিস্তানের যোগাযোগমন্ত্রী ও ইয়াহিয়া খানের উপদেষ্টা ছিলেন। ওই বৈঠকেই গোলাম আযমের নাগরিকত্ব আর তার আমিরত্ব মেনে নেয়ার শর্তে ১৮ আসনধারী জামায়াত বিএনপিকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়।

বিএনপি সরকার গঠনের পর জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে গণ-আন্দোলন গড়ে উঠলে বিএনপি গোলাম আযমকে আটক করতে বাধ্য হলে বিএনপি-জামায়াত সমঝোতা সাময়িক ভেঙে যায়। একপর্যায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যে আন্দোলন গড়ে ওঠে, জামায়াতে ইসলামীও সে আন্দোলনে পাশাপাশি চলার নীতি নিয়ে আগাতে থাকে।

এটা প্রচার পায় যে, জামায়াত বিএনপি ছেড়ে আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকেছে। আওয়ামী লীগ এর প্রতিবাদ করেনি। বিএনপির মিত্রকে পাশে রেখে বিএনপিকে শিক্ষা দিতে চেয়েছে হয়ত। কিন্তু এতে আওয়ামী লীগের আদর্শিক অবস্থান প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

১৯৯৬-এর নির্বাচনি প্রচারণায়ও আওয়ামী লীগ নেতাদের আচরণে ধর্মের ছাপ লক্ষ করা যায়। ১৯৯৬ সালে জামায়াত আলাদা নির্বাচন করে মাত্র তিনটি আসন পায়। আর আওয়ামী লীগকে সরকার গঠনে সমর্থন দেয় এরশাদের জাতীয় পার্টি।

আওয়ামী নীতিনির্ধারকদের মধ্যে এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয় যে, ধর্মীয় কার্ড খেললে জয়ের সম্ভাবনা বাড়ে। আবার বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামীও এটা উপলব্ধি করে যে তাদের একসঙ্গে চলতে হবে। তারা আলাদা হেঁশেলে রান্না করলে মানুষ মুখ ঘুরিয়ে নেবে। তারা আবার ঐক্যবদ্ধ হয়ে ৪-দলীয় জোট গঠন করে ২০০১ সালে আবার ক্ষমতায় আসে।

আওয়ামী লীগ ক্ষমতার বাইরে থেকে এটা বুঝতে পারে, এ দেশে ধর্মকে রাজনীতির বাইরে রাখা যাবে না। তাই আওয়ামী লীগও এখন অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা মুখে বললেও ধর্মাশ্রয়ীদের প্রশ্রয় দিয়েই চলে। ফলে এরশাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে প্রধান দলগুলো যে অঙ্গীকার করেছিল তা এখন বাতিল তালিকায়। এখনও আমরা ডা. মিলন দিবস পালন করি প্রতিবছর। কিন্তু যে রাজনৈতিক ধারা ফিরিয়ে আনার জন্য তার আত্মদান, সেটা থেকে দেশের রাজনীতি এখন অনেক দূরে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে অসাম্প্রদায়িক ধারা আর প্রবল হয়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখা যায় কি?

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন

নাকাল নগরবাসী

নাকাল নগরবাসী

কারো কোনো বিষয়ে দাবি থাকলে তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দাবি নিয়ে কথা বলা যায়। প্রয়োজনে শীর্ষ কর্তৃপক্ষের কাছেও যাওয়া যেতে পারে। গণমাধ্যম তো প্রস্তুতই রয়েছে, এসব দাবি-দাওয়ার কথা প্রচার করতে সরকারের দৃষ্টি তাতে সহজেই আকৃষ্ট করা যায়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো এখন সুলভ হয়ে গেছে। এসবকে বাদ দিয়ে আমরা এখন ৫০-৬০ বছর আগের ব্যবহৃত পদ্ধতি রাস্তা অবরোধ করে, ধর্মঘটের নামে দাবি আদায় করার জন্য যা করছি তা জনদুর্ভোগকে চরমপর্যায়ে নিতেই কেবল সাহায্য করছে।

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে জনজীবন অনেকটাই স্থবির হয়ে আসছে দিন দিন। ছোট শহরগুলোতেও অবস্থা প্রায় একই রকম হতে যাচ্ছে। এমনিতেই শহরগুলোর ওপর কর্মজীবী মানুষের চাপ ক্রমবর্ধমান হারে বেড়েই চলেছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে নাগরিক-সুবিধা নিয়ে যেকোনো শহরে বসবাস করা অকল্পনীয় বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষের ঘনত্ব এত বেশি যে রাস্তায় স্বাভাবিকভাবে হাঁটা যায় না।

রাস্তা ও ফুটপাতও প্রয়োজনের তুলনায় নেই বললেই চলে। বড় ছোট সব শহরের ফুটপাতের প্রায় সবটাই হকার মার্কেটে পরিণত হয়ে আছে। সেগুলোতে কেনাবেচাও চলছে রাতদিন। পথচারীদের এসব ভাসমান হকার মার্কেট অতিক্রম করে চলতে হয় অতিশয় ধীর গতিতে। ঢাকা শহরে এটি এখন এক অভিনব দৃশ্য। রাস্তায় বাস, ট্রাক, ছোট যানবাহন ও রিকশা গাদাগাদি করে চলছে। কোনোটারই গতি দিনের বেলা স্বাভাবিক নয়।

সুতরাং যানজট শুধু জেব্রা ক্রসিং, চৌরাস্তা বা ট্রাফিক সিগন্যালের সম্মুখে ঘটে তা নয়, সাধারণ সড়কেও স্বাভাবিকের চাইতে বেশিসংখ্যক যানবাহন হওয়ার কারণে প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হয়। কোনো একটি ছোট পরিবহন আকস্মিকভাবে থেমে গেলে কিংবা খারাপ হলে তো কথাই নেই। ট্রাফিক পুলিশ কবে সেই বিকল গাড়ি সরিয়ে নেয়ার ব্যবস্থা করবে তার ওপর নির্ভর করতে হয়। এছাড়া প্রায় সব কটি বড় শহরেই কিছু জায়গা দিয়ে অতিক্রম করতে যানজটের ধকল সহ্য করতেই হবে, সময় অতিরিক্ত ব্যয় হতে পারে এমনটিও ধরে নিতে হবে।

রাজধানী ঢাকা শহরে গত এক দশকে ওভারব্রিজ, ফ্লাইওভার যথেষ্ট হওয়া সত্ত্বেও সড়কে স্বাভাবিক গতি নিয়ে পরিবহন চলার ব্যবস্থা খুব বেশি স্বস্তি দিতে পারেনি। এর প্রধান কারণ হচ্ছে, জনসংখ্যা যেমন বাড়ছে নানা ধরনের পরিবহনের সংখ্যাও ক্রমবর্ধমান। রাস্তার সম্প্রসারণ তো সেভাবে করা সম্ভব নয়, একইভাবে নতুন নতুন রাস্তায় তৈরি করাও বড় শহরগুলোতে অসম্ভব ব্যপার। সেকারণে ঢাকাসহ বড় শহরগুলো এখন চলাচলের জন্য খুবই ধীরগতির, যানজট ও ফুটপাতবিহীন চলাচলের অনিরাপদ শহরে পরিণত হয়েছে। সময়মতো কোথাও পৌঁছানো কষ্টের এবং জটিল বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

মানুষকে তাই হাতে বেশ কিছু সময় রেখেই ঘর থেকে বের হতে হয়। এতে মানুষের সময়ের অপচয় যেমন বেড়ে চলছে একইভাবে শ্রমঘণ্টা, কর্মক্ষমতা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার পরিবেশ হ্রাস পাচ্ছে। মানুষের ধৈর্য, সহনশীলতা, মনোবৃত্তি ও স্বাস্থ্যের ঝুঁকি এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে বেড়েই চলছে। অথচ উন্নত জীবনযাপনের জন্য মানুষ আসছে শহরে। শহরগুলোতে মানুষের ঢল যেন বেড়েই চলছে। কিন্তু সেই শহরে এ তো মানুষের বসবাস, যাতায়াত, নিত্যদিনের প্রয়োজনীয়তা পূরণ ইত্যাদি এখন আর স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার মধ্যে নেই। বড় শহরগুলো অনেক আগেই নাগরিক জীবনের ধারণা হারিয়ে ফেলেছে। এমনকি অভিজাত এলাকাগুলোতেও এখন ঘিঞ্জি অবস্থা।

এমনই এক দুঃসহ বাস্তবতা আমাদের বেশিরভাগ নাগরিক জীবনের স্বাভাবিক চিত্র হিসেবে দৃশ্যমান। এর অলৌকিক কোনো সমাধান কেউ আশা করতে পারে না। স্বাভাবিক সমাধানের উপায়ও বের করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এর প্রধান কারণ হচ্ছে অর্থনৈতিক, ব্যবসা বাণিজ্যিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ সব ধরনের সেবার অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা বড় শহরকেন্দ্রিক হয়ে পড়া।

এর ফলে গ্রাম থেকে প্রতিদিন মানুষ ছুটছে শহরে, ঢাকায় এটি যেন জনস্রোতের রূপ ধারণ করেছে। এতে ঢাকার জনজীবন নানা জটে নাকাল হয়ে পড়ছে। এটি অনেকটাই সহ্যের সীমা অতিক্রম করে বসে আছে। সুতরাং নতুন করে যে চাপ প্রতিদিন সৃষ্টি হচ্ছে তার অবস্থা কতটা করুণ রূপ ধারণ করছে সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না।

এমন এক নিত্যদিনের ভয়াবহ স্বাভাবিক চিত্রের ওপর যখন পরিবহনব্যবস্থায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটতে দেখা যায় তখন জনদুর্ভোগকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যাবে সেটিই আমরা বুঝতে অক্ষম। একবার পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা আকস্মিকভাবে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রতিক্রিয়ায় সবধরনের বাস চলাচল বন্ধ করে দেয়। সঙ্গে সঙ্গে কর্মক্ষেত্রে যারা নিত্যদিন যাওয়া-আসা করেন তাদের সময়মতো পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। রাস্তায় বাস নেই তো দূরের যাত্রায় অন্য পরিবহনের ওপর ভর করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব ছিল না। গলাকাটা ভাড়ার এক মহোৎসব চলতে থাকে।

বাধ্য হয়ে অনেককেই পায়ে হেঁটে কর্মস্থলে কিংবা বাড়ি ফিরতে হয়েছে। আবার ভাড়া নিয়ে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে যাত্রীদের ইঁদুর-বিড়াল খেলা শুরু হয়েছে। মালিক-পরিবহন শ্রমিকরা ইচ্ছেমতো ভাড়া হাঁকাতে থাকে, তা নিয়ে মোবাইল কোর্ট বসায় বিপুলসংখ্যক বাস রাস্তা থেকে উধাও হয়ে যায়। গণপরিবহণের সংকটে যাত্রীদের ভোগান্তি যেন ভাগ্যের লিখনের মতো আপনা-আপনি কপালে এসে পড়তে শুরু করে! সেটি এখনও কমবেশি চলছে।

নতুন করে দেখা গেল শিক্ষার্থীদের হাফ-পাস দেয়ার দাবিতে আন্দোলন। তাতেও বেশ কিছু রুটে গাড়ি চলাচল বলতে গেলে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সেই রাস্তা অতিক্রমকারীদের জন্য তখন একমাত্র প্রকৃতিপ্রদত্ত দুই পা-ই ভরসা। সেভাবেই গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। এভাবে হঠাৎ করে গণপরিবহন যারা আটকে দিয়েছে কিংবা বন্ধ করে দিয়েছে তারা শুধু তাদের কথাটাই ভেবেছে, তাদের স্বার্থটাই দেখেছে!

গণপরিবহন বন্ধ করে দিলে যে বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতে নেমে আসে বড় ধরনের বিপর্যয়, দুর্ভোগ সেকথা তারা একবারও ভাবতে চায় না। আমরা সেভাবে তো ভাবতে বোধহয় অভ্যস্তও নই। কারো কোনো বিষয়ে দাবি থাকলে তার জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষ রয়েছে। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দাবি নিয়ে কথা বলা যায়। প্রয়োজনে শীর্ষ কর্তৃপক্ষের কাছেও যাওয়া যেতে পারে।

গণমাধ্যম তো প্রস্তুতই রয়েছে, এসব দাবি-দাওয়ার কথা প্রচার করতে সরকারের দৃষ্টি তাতে সহজেই আকৃষ্ট করা যায়। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তো এখন সুলভ হয়ে গেছে। এসবকে বাদ দিয়ে আমরা এখন ৫০-৬০ বছর আগের ব্যবহৃত পদ্ধতি রাস্তা অবরোধ করে, ধর্মঘটের নামে দাবি আদায় করার জন্য যা করছি তা জনদুর্ভোগকে চরমপর্যায়ে নিতেই কেবল সাহায্য করছে।

গার্মেন্টস শ্রমিকদের বকেয়া বেতন আদায়ের দাবিতে গোটা মিরপুরে রাস্তা অবরোধ করায় সমগ্র ঢাকা শহরই কয়েক ঘণ্টা অচল হয়ে পড়ে। এমন অচল অবস্থায় সামনে বা পেছনেও যাওয়া যায় না। লাখ লাখ মানুষের দুর্ভোগ যেন রাস্তাতেই মানুষের হাপিত্যেশের মধ্যে আটকে ছিল। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রতিদিন অমুক দলের মানববন্ধন, অমুক সংগঠনের প্রতিবাদ সভা লেগেই আছে।

ফলে ওই পথে সেই সময় পরিবহনের বিড়ম্বনার শেষ থাকে না। অন্যপথে ঘুরে যাওয়াও সহজ কথা নয়। সমাবেশটি যদি হয় বড়সর তাহলে এর ধাক্কা লাগে গোটা শহরে। তখন যানজট নয়, সব পরিবহনই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। তেমন পরিস্থিতিতে লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় পরিবহনের ভেতর আটকে থাকে। যাদের এসি গাড়ি নেই তারা প্রখর রোদে ঘামতে থাকেন।

সমাবেশ কখন শেষ হবে তা সংগঠনের নেতাদের মর্জির ওপর নির্ভর করে। তারা গণতান্ত্রিক অধিকারের কথা শোনাতে গিয়ে লাখ লাখ মানুষের পথচলার অধিকার যে হরণ করেন, কর্মস্থল কিংবা জরুরি কাজে যাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ান, সেটি তারা বুঝতে চান না। সেই প্রশ্ন এখন করাটাও বোধহয় তাদের ভাষায় গণতন্ত্রবিরোধী হয়ে পড়ে।

প্রায় প্রতিদিনই তো এ দল ও দলের আন্দোলন, সমাবেশ অবস্থান, ধর্মঘট ইত্যাদি শহরগুলোতে, এমনকি সড়ক, মহাসড়কে আকস্মিকভাবে ঘটতে দেখা যায়। সড়ক, মহাসড়কগুলো যেন জনসাধারণের জন্য নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াতের সুযোগ দেয়ার প্রস্তুতি রেখেও দিতে পারছে না! আমাদের সমাজেরই আমরা কেউ না কেউ সড়ক-মহাসড়কে অবস্থান-অবরোধ, ধর্মঘট ইত্যাদি করতে পছন্দ করি।

আমরা শহরের কোনো মাঠ অথবা জনসমাবেশের জন্য নির্ধারিত ময়দানে গিয়ে প্রতিবাদ করাকে যথেষ্ট মনে করছি না। রাস্তাই আমাদের প্রতিবাদের উত্তম জায়গা বলে বিবেচিত হচ্ছে। সেই রাস্তা যদি সরু গলিও হয় তাহলে সেখানেই হবে আন্দোলন সংগ্রামের অবস্থান, ধর্মঘট! আমরা বহুকাল আগে থেকে শিখেছি ‘লড়াই হবে রাজপথে’, ‘রাজপথ রাজপথ ছাড়ি নাই ছাড়বো না’ ইত্যাদি স্লোগান। সেই রাজপথে যদি স্বল্পসংখ্যক প্রতিবাদীও দাঁড়ায় কিংবা বসে যায় তাহলেও হাজার হাজার মানুষকে বহনকারী গাড়ি থেমে যেতে বাধ্য হয়।

পরিবহনে যাত্রীদের দুর্ভোগ দেখার কেউ নেই। পরিবহনের মালিক-শ্রমিকরাও যেমন দেখে না, কলকারখানার শ্রমিকরাও সবসময় দেখে না, রাজনীতির নেতাকর্মীরাও দেখে না, অন্য যেকোনো দাবি আদায়কারীরাও দেখে না। আসলেই আমরা যে যার মতো করে নাগরিক জীবনটাকেই বোধহয় এখন এক অভিশপ্ত জীবনে পরিণত করে ফেলেছি। এখান থেকে বের হয়ে আসার কথা কজনইবা বিবেক ও যুক্তি দিয়ে উপলব্ধি করছে? যখন নাগরিক জীবন ততটা জমে ওঠেনি তখন হয়ত রাজপথে এত পরিবহন ছিল না, শহরেও এত মানুষ ছিল না। রাজপথে আন্দোলন মিছিল হলে গোটা শহরে বসবাসকারী মানুষের জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলত না।

তখন অবশ্য সমাবেশ হতো পল্টন ময়দান কিংবা শহরের জনসভা স্থলগুলোতে কিংবা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের চত্বরে । কিন্তু এখন নগরজীবন যখন কানায় কানায় পরিপূর্ণ তখন আমাদের প্রতিবাদের সবকিছুই যেন রাস্তাঘাটে এসে পড়েছে। এই রাস্তাগুলো গভীর রাতেও এক মিনিটের জন্য পরিবহনবিহীন থাকে না। জীবন জীবিকা মানুষের এখন এতই নগর এবং পরিবহনকেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে যে, এক মুহূর্ত কোনোটি বন্ধ রাখা মানেই হচ্ছে জনদুর্ভোগে মানুষকে শুধু অতিষ্ঠ করাই নয়, জীবন জীবিকাকেও স্তব্ধ করে দেয়া। এই বাস্তবতার বোধটি আমাদের সহসাই কি জাগ্রত হবে?

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন

শিক্ষার্থীদের দাবি মানলে কী ক্ষতি?

শিক্ষার্থীদের দাবি মানলে কী ক্ষতি?

১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে আসে ১১ দফা দাবি। পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত এ ১১ দফা দাবির একটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া রাখা। সেটা কীভাবে বদলে গেল আমরা জানি না। সেটা ছাড়াও সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় আন্দোলনগুলোর একটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি। তখন ঢাকা অবরোধ করা শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির ভেতরে অন্যতম ছিল, ‘শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ এটার কোনো সুরাহা হয়নি।

রাস্তার উপরের স্টলে দাঁড়িয়ে পত্রিকা পড়া আমার পুরোনো অভ্যেস। এটা আমি যেখানেই যাই সেখানেই করে থাকি। গত বুধবার পত্রিকা দেখতে দেখতে এটা পত্রিকার ওপর আমার চোখ থেমে গেল। পত্রিকার ওপরের ছবিতে দেখা গেল একদল তরুণের রণপ্রস্তুতি। আমি মোহাম্মদপুর, ঢাকা কলেজের ওদিকে মঙ্গলবার দেখলাম ছাত্ররা রাস্তা আটকে যেভাবে আন্দোলন করে ওভাবেই আন্দোলন করছে।

আমি কজন ছাত্রের সঙ্গে কথাও বললাম। তারা বলেছে সব সময় সব কালে ছাত্রদের জন্য সব গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়া নেয়। কিন্তু এবার ভাড়া বাড়ানোর পরে ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে বাসের হেলপার কন্ডাকটরদের দুর্ব্যবহার গাড়িতে দেখেছি। বিভিন্ন সময় কথাও বলেছি। বেগতিক হয়ে ছাত্ররা আন্দোলনে নেমেছে আর তাদের ঠেকাতে সরকার দলের ছাত্র সংগঠন আন্দোলনরত ছাত্রদের সঙ্গে কথা না বলে তাদের পেটাতে মহড়া দিচ্ছে। খবরটি পড়ে খুব মনঃপীড়ায় আছি। কোনো ছাত্র আন্দোলনে নামলে আমি আমার ফেলে আসা জীবনটাকে ফিরে পাই। এরশাদবিরোধী আন্দোলন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হল আন্দোলন, একাত্তরের ঘাতক-দালালবিরোধী আন্দোলন- কোনোটাই ভুলবার নয়। কিন্তু এবারে ছাত্রদের অপরাধ কী? অপরাধ তারা গণপরিবহনে অর্ধেক ভাড়ার দাবিতে রাস্তায় নেমেছে। গণপরিবহনে ছাত্রছাত্রীদের হাফ ভাড়ার বিষয়টি নতুন নয়। দেশে কোনো সময়ই ছিল না যে, ছাত্রছাত্রীরা বাসে-লঞ্চে হাফ ভাড়ায় চলেনি। অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের হাতে বইখাতা থাকলেও কন্ডাকটর ভাড়াই চাইত না। কিন্তু সম্প্রতি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।

ছাত্রছাত্রীদের হাফ ভাড়ার বিষয়টিও তখন বাদ দেয়া হয়েছে। এর আগেও বাস মালিকদের এই পাঁয়তারা লক্ষ করা গেছে। ইতিপূর্বেও বিভিন্ন বাসে দেখা গেছে হাফ ভাড়া নেয়া হয় না বা হাফ ভাড়া চালু হয়নি লেখা। হাফ বা অর্ধেক ভাড়া নিয়ে আন্দোলনটা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ারও আগের। মানে ৫২ বছরের পুরোনো।

১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে আসে ১১ দফা দাবি। পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত এ ১১ দফা দাবির একটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া রাখা। সেটা কীভাবে বদলে গেল আমরা জানি না। সেটা ছাড়াও সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় আন্দোলনগুলোর একটি শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের দাবি। তখন ঢাকা অবরোধ করা শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবির ভেতরে অন্যতম ছিল, ‘শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।’ এটার কোনো সুরাহা হয়নি।

বর্ধিত ভাড়া চালুর কয়েক দিন ধরে শিক্ষার্থীরা দাবি জানাচ্ছে তাদের জন্য অর্ধেক ভাড়া চালুর। তার মানে ছাত্রছাত্রীদের হাফ ভাড়ার যে ৫২ বছরের রীতি সেটা ভাঙতে চাচ্ছে পরিবহন মালিকরা। যে কারণে গত রোববারও ঢাকার সায়েন্সল্যাব, ফার্মগেটে এ দাবিতে বাস ভাঙচুর হয়েছে। তবু নীরব সরকার।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন চলছে। গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। ছাত্রদের এ আন্দোলন থামাতে যেখানে সরকারের একটি ঘোষণাই যথেষ্ট সেখানে আন্দোলন এত সময় নেয়, সেটা ভাবাই যায় না। দেশের গণপরিবহনে হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়াসহ পাঁচ দফা দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়েছে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি বাস্তবায়ন না হলে বৃহস্পতিবার থেকে কঠোর আন্দোলনের কর্মসূচি দেয়া হবে বলেও জানিয়েছে ছাত্ররা। কিন্তু এ আন্দোলনে কী হবে তা কিন্তু আমরা আঁচ করতে পেয়েছি ইতোমধ্যে। এবারও হেলমেট বাহিনী না হোক অন্য কোনো বাহিনী নামবে।

গত মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর ধানমণ্ডির নীলক্ষেত ও সায়েন্সল্যাবের সড়ক কর্মসূচি চলাকালে ৫০-৬০ তরুণ লাঠিসোঁটা নিয়ে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালিয়েছিল। কিছুক্ষণ ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া চলার পর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাস্তা থেকে সরে যায়। সেখানে মিছিল থেকে আইডিয়াল কলেজের এক ছাত্রকে তুলে নেয়ার অভিযোগ মিলেছে। এর প্রায় ৫ ঘণ্টা পর ওই ছাত্র ছাড়া পায়। প্রশ্ন উঠেছে সাধারণ ছাত্রদের ওপর হামলাকারীরা কারা? শিক্ষার্থীদের দাবি, হামলাকারীরা ছাত্রলীগের নেতাকর্মী।

ছাত্রলীগের নেতাকর্মী কেন এ আন্দোলনে হামলা করবে? ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ কত তা সরকারও জানে। কিন্তু তারপরও ছাত্রদের আন্দোলনের দাবি না মেনে ছাত্রলীগকে কেন নামানো হলো এটা প্রশ্ন আসে। এই আন্দোলন ইতোমধ্যে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। যে পদ্ধতিতে আন্দোলন থামানোর চেষ্টা করা হচ্ছে তাতে আন্দোলন থামবে না, হয়ত আরও বড় হবে। গত কয়েকদিন ধরে চলা শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন ইতোমধ্যে ঢাকার বাইরেও ছড়িয়ে পড়ছে। গণপরিবহনে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হাফ ভাড়াসহ ৫ দফা দাবিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও সাভারে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েও সমাবেশ ও মানববন্ধন হয়েছে।

ছাত্রদের বক্তব্যের বরাত দিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়েছে যে, ছাত্ররা বলেছে- আমরা সড়ক ছেড়ে দিয়েছি, সরকার ও বাস মালিকদের ৪৮ ঘণ্টা সময় দিয়েছি, তারা বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে এই সময়ের মধ্যে আমাদের দাবি বাস্তবায়ন করবে। এটা হলো আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রীদের কথা।

যখন শামসুন্নাহার হল আন্দোলন হয়েছে, সেসময় বিএনপির ক্যাডাররা ক্যাডাররা যার পর নাই বিরক্ত করেছে আন্দোলনকারীদের। আমাকে একদিন এক ক্যাডার একটা পিস্তল দেখিয়ে রাজু ভাস্কর্য থেকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। আমাদের আন্দোলনরত ছাত্রদের সহমর্মিতা জানানো শিক্ষকদের লাঞ্ছিত করেছে। তাতে আন্দোলন থামেনি। আন্দোলন এভাবে থামানো যায় না। কিন্তু আন্দোলন থামাতে যে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে, মানে পত্রিকায় যে পদক্ষেপের বর্ণনা শুনেছি তা রীতিমতো ভীতিকর।

আন্দোলনরত ছাত্রদের পেটানো হলে আন্দোলন থামে না। চলমান আন্দোলন থেকে ছাত্রছাত্রীদের নিবৃত্ত করতে সরকারে উচিত তাদের দাবি মেনে নেয়া। কারণ আন্দোলনরত এই ছাত্রছাত্রীরা আমাদেরই সন্তান, ভাইবোন এটা ভুললে চলবে না। এখানে শক্তি প্রদর্শন মোটেও সমাধান আনবে না।

সরকারকে ভুললে চলবে না ২০১৮ সালে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে একটা প্রজন্মের আন্দোলনকে সরকার সঠিকভাবে নিবৃত্ত করতে পারেনি। যার মধ্য দিয়ে ওই আন্দেলনকারীদের হেলমেট বাহিনীর ওপর ভালো ধারণা হয়নি। বরং ওই সময় বিরোধীরা অপপ্রচার করেছিল অনেকেই তা বিশ্বাস করেছিল। বিশ্বাসের সে সুযোগও তাদের করে দেয়া হয়েছিল। এবারেও কি সেই পথ ধরা হবে? সেটা তাহলে আরেকটি ভুল হবে।

সরকারে মধ্যে এমন সব ব্যক্তিত্ব আছেন যারা ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছেন। আজ তারা কথা বলছেন না কেন? ছাত্রছাত্রী কতজন প্রতিদিন গণপরিবহনে ওঠে? তাদের থেকে হাফ ভাড়া নিলে এমন কী ক্ষতি? সরকার হাফ ভাড়া নিয়ে মালিক সমিতির সঙ্গে বসে একটা ঘোষণা দিলে এ সমস্যা আর থাকবে বলে মনে হয় না। কিন্তু ইতোমধ্যে বিভিন্ন সড়ক আটকে দেয়ায় পথচারীদের দুর্ভোগ ছিল অবর্ণনীয়।

কদিন আগে বাস মালিক- শ্রমিক নেতাদের কারণে মানুষের দুর্ভোগের অন্ত ছিল না। মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে তখন কোনো লাঠিয়ালকে দেখা যায়নি, তাহলে এখন ছাত্রদের পেটানো হবে কেন? কেউ আন্দোলন করতে পারবে না? তার দাবির কথা বলতে পারবে না? সরকার মালিকদের কথায় ভাড়া বাড়াতে বাধ্য হলেন। আর ছাত্রদের কথা শুনবেন না এটা হয় না। কী এমন বিশাল দাবি এটা! মেনে নিলে কী হবে? ক্ষমতায় গিয়ে আন্দোলন সংগ্রামকে এভাবে ভুলতে নেই। দমানোর চেষ্টা করতে হয় না। মেনে নেয়া যুক্তিযুক্ত।

লেখক: গবেষক, প্রাবন্ধিক-সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন

জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়েই যাচ্ছে পাকিস্তান

জঙ্গিবাদকে মদদ দিয়েই যাচ্ছে পাকিস্তান

চার দশক ধরে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে মদদ জুগিয়ে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি। শুধু মুম্বাই হামলাই নয়, আমেরিকায় ৯/১১ হামলার ষরযন্ত্রেরও আঁতুড়ঘর ধরা হয় পাকিস্তানকে। ২০০৫ সালে লন্ডন বিস্ফোরণে ৫৬ জনের মৃত্যু, ২০১৯ সালের লন্ডন ব্রিজে হামলা, ২০১৬ সালে উরিতে আক্রমণের ষড়যন্ত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের মাটি।

মুম্বাই হামলার মূল হোতারা লাহোর হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার পরে আবারও প্রমাণ হলো, পাকিস্তান জঙ্গিদের এখনও মদদ জুগিয়েই যাচ্ছে। আদালতে মুম্বাই হামলায় অভিযুক্ত ছয় জঙ্গির বিরুদ্ধে শক্ত কোনো তথ্য-প্রমাণ হাজির করেনি পাকিস্তানি কর্মকর্তারা। ফলে আলোচিত ওই হামলার মাস্টারমাইন্ড হাফিজ সইদের নিষিদ্ধ সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়ার শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে অর্থায়নের অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। আর লাহোর হাইকোর্টও তাদের বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক মহলকে বোকা বানিয়ে পাকিস্তান আবারও জঙ্গিদের পক্ষেই অবস্থান নিল। এর ফলে স্পষ্ট হলো- সন্ত্রাস দমনে পাকিস্তান বা তাদের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআইয়ের মনোভাব বিন্দুমাত্র বদলায়নি। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ছত্রছায়ায় জঙ্গিরা গোটা দুনিয়াতেই জিহাদের নামে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তান এখনও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসের আঁতুড়ঘর। আর ইসলামাবাদ তাদের এমন কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সেটা বার বার গোটা দুনিয়াকে বুঝিয়ে দিচ্ছে।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের ২৬ নভেম্বর ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাইতে আইএসআইয়ের মদদপুষ্ট জঙ্গিরা এক ভয়াবহ হামলা চালায়। তাজমহল হোটেলের অতিথিরাই ছিলেন সেদিনের আক্রমণের মূল লক্ষ্য। জঙ্গি হামলায় ৬ আমেরিকানসহ ১৬টি দেশের মোট ১৬৬ জন নিহত হয়েছিল।

গুরুতর আহত হয়েছিল আরও অন্তত ৭টি দেশের নাগরিক। নিহত বা আহতদের একটা বড় অংশই ছিল পশ্চিমা দুনিয়ার মানুষ। ইজরায়েল, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, ফ্রান্সসহ আরও বেশকিছু দেশের একাধিক নাগরিক মুম্বাই হামলায় নিহত হয়। বিবিসি-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, পশ্চিমা পর্যটকরা ওই হামলার অন্যতম টার্গেট ছিল।

গোটা দুনিয়ার সবাই জানে, হাফিজ সঈদের নেতৃত্বাধীন লস্কর-ই-তৈয়াবাই মুম্বাইয়ের হোটেল তাজে হামলা চালায়। পুরো হামলার মূল মাথা ছিল হাফিজ নিজে। সেই গড়ে তোলে লস্করের ‘ছায়া’ সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়া।

সেই জামাত-উদ-দাওয়ার শীর্ষ ৬ নেতাকে লাহোরের সন্ত্রাসবিরোধী একটি আদালত ২০২১-এর এপ্রিলে ৯ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছিল। ট্রায়াল কোর্ট সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেছিল তাদের। অভিযুক্তদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করারও নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত।

সেই সাজাপ্রাপ্তরা হলো- অধ্যাপক মালিক জাফর ইকবাল, ইয়াহিয়া মুজাহিদ, নাসারুল্লাহ, সামিউল্লাহ এবং উমর বাহাদুর। এছাড়াও পঞ্জাব পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম ডিপার্টমেন্টের একটি এফআইআরের ভিত্তিতে হাফিজ সইদের শ্যালক হাফিজ আবদুল রহমান মাক্কিকেও ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছিলেন আদালত।

লাহোর হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি মুহম্মদ আমির ভাট্টি ও বিচারপতি তারিক সেলিম শেখের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ ট্রায়াল কোর্টের রায় খারিজ করে দিয়েছেন। তথ্য প্রমাণের অভাবে উচ্চ আদালত ৬ কট্টর জঙ্গি নেতাকেই বেকসুর খালাস করে দিলেন।

আদালতের চাওয়ার চেয়েও ইমরান খানের সরকার জঙ্গিদের মুক্তি বেশি চাইছিল। তাই আদালতকে কোনো সাহায্যই করা হয়নি। এমনকি, ১৬৬ জনকে হত্যা করার মতো ভয়ংকর হামলার ষড়যন্ত্রীদের মাত্র ৯ বছরের সাজাটুকুও যাতে খাটতে না হয় সেই চেষ্টাতেই ব্যস্ত ছিল সেনাববাহিনীর হাতের পুতুল ইমরান সরকার।
ভালোভাবে খেয়াল করলে দেখা যায়, মামলাটাই এমনভাবে সাজানো হয়েছিল যাতে করে হাফিজ সইদ বা তার দলের অন্যরা বিন্দুমাত্র বিপদে না পড়ে। ২০০৮ সালের মুম্বই হামলায় লস্কর যুক্ত থাকার সমস্ত প্রমাণ পেয়েও বিশ্ববাসীর কাছে তা গোপন রাখার চেষ্টা করে পাকিস্তান। পুরো বিচার ব্যবস্থাটাকেই আন্তর্জাতিক দুনিয়ার সামনে প্রহসনে পরিণত করেছে এই সন্ত্রাসবাদী দেশটি।
মুম্বাই হামলার পর আন্তর্জাতিক চাপ বাড়তে থাকায় পাকিস্তান ৭ জনকে ‘লোক দেখানো’ গ্রেপ্তার করে। কিন্তু হামলার অন্যতম হোতা জাকিউর রহমান লাখভীকে ২০১৫ সালেই জামিনে মুক্তি দেয়।

মুম্বাই হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ভারত সমস্ত রকম প্রমাণ পাকিস্তানের হাতে তুলে দিলেও শক্তভাবে এই সন্ত্রাসীদের দমনে কোনো তাগিদই দেখায়নি দেশটি। শুধু ভারতই নয়, জঙ্গিবাদের অর্থায়নকারীদের উপর নজর রাখা আন্তর্জাতিক সংস্থা ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্সও (এফএটিএফ) জঙ্গিদের অর্থায়নে পাকিস্তানের জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়েছে।

চার দশক ধরে বৈশ্বিক সন্ত্রাসবাদকে মদদ জুগিয়ে চলেছে দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশটি। শুধু মুম্বfই হামলাই নয়, আমেরিকায় ৯/১১ হামলার ষরযন্ত্রেরও আঁতুড়ঘর ধরা হয় পাকিস্তানকে। ২০০৫ সালে লন্ডন বিস্ফোরণে ৫৬ জনের মৃত্যু, ২০১৯ সালের লন্ডন ব্রিজে হামলা, ২০১৬ সালে উরিতে আক্রমণের ষড়যন্ত্রেও ব্যবহৃত হয়েছে পাকিস্তানের মাটি।
বহুকাল ধরে জিহাদের নামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী সংগঠনকে মদদ জুগিয়ে চলেছে দেশটির সেনাবাহিনী। কিন্তু সবকিছু জেনেও পশ্চিমা দুনিয়া পরমাণু শক্তিধর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

বরং যুক্তরাষ্ট্র থেকে এত কিছুর পরেও পাকিস্তান ২০০২ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ৩৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সাহায্য পেয়েছে।
অথচ, ওসামা বিন লাদেন, খালিদ শেখ মোহাম্মদ, রামজি বিন আল-শিব, আবু জুবায়দাহ, আবু লাইথ আল লিবি এবং শেখ সাইদ মাসরির কট্টর জঙ্গিবাদীরা পাকিস্তানেই আশ্রয় নিয়েছিল।

সন্ত্রাসবাদ নিয়ে পাকিস্তানের দ্বৈত চরিত্রের কথা গোটা দুনিয়াই জানে। ২০১০ সালে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন জঙ্গিবাদে মদদের প্রশ্নে প্রকাশ্যে পাকিস্তানকে সতর্কও করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের হাউজ অফ রিপ্রেজেনটেটিভসেও সন্ত্রাসবাদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতার জন্য পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রস্তাব পেশ করা হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প সন্ত্রাসের প্রশ্নে পাকিস্তানের ‘মিথ্যা ও প্রতারণা’র কড়া সমালোচনা করে এক সময়। তালেবান ও আল-কায়েদার সঙ্গে পাকিস্তানি যোগসাজসের বিষয়টি গোটা দুনিয়ার সামনেই উন্মুক্ত। তবু সন্ত্রাসী কার্যকলাপে মদদ জুগিয়ে চলেছে সেনা নিয়ন্ত্রিত ইমরান খান সরকার। পারভেজ মোশাররফের সময় থেকেই পাকিস্তানি সেনারা দেশের জন্য কাজ করার পরিবর্তে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণে বেশি ব্যস্ত।

আর তাদের গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদকে টিকিয়ে রাখার জন্য সচেষ্ট ভূমিকা পালন করে চলেছে। প্রযুক্তিগতভাবে তালেবান ও অন্যান্য জঙ্গিগোষ্ঠী চীন থেকেও ইদানিং সাহায্য পাচ্ছে।
মুম্বাই হামলার সঙ্গে যুক্তদেরই শুধু নয়, গত বছর ডিসেম্বর মাসে পাকিস্তানের আদালত আল-কায়েদার অন্যতম নেতা ও সন্ত্রাসী আহমেদ ওমর সইদ শেখ ও তার তিন সহযোগীকে মুক্তি দিয়েছে। মার্কিন সাংবাদিক ডানিয়েল পার্ল হত্যার অভিযোগ ছিল তাদের বিরুদ্ধে।
মোদ্দাকথা, পাকিস্তান জঙ্গিবাদকে মদদ দেয়াকেই তাদের রাষ্ট্রীয় ধর্ম বলে মনে করে। তাই যুক্তরাষ্ট্র যা-ই বলুক না কেন, সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গ দেয়া তারা কিছুতেই বন্ধ করবে না বলে দৃশ্যমান হচ্ছে। তাই ২০১২ সালে যুক্তরাষ্ট্র হাফিজ সেইদের মাথার দাম ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ঘোষণা করলেও পাকিস্তানে অবাধে ঘুরে বেড়াতে পেরেছিল এই আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী। আর তাই পাকিস্তান আজও জঙ্গিবাদের আঁতুড়ঘরই হয়ে রয়েছে। বিন্দুমাত্র সন্ত্রাস দমনে আগ্রহী নয়। মাঝেমধ্যে চাপে পড়ে বেসুরো গাইলেও আসলে জঙ্গিবাদই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রধর্ম।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের বাস্তবায়ন কতদূর?
’৭২-এর সংবিধানই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির রক্ষাকবচ

শেয়ার করুন