সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শিবির কি নিরাপদ?

সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শিবির কি নিরাপদ?

পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে কোনো একটি অঘটন ঘটিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে লুকিয়ে থাকার সুবিধা, রোহিঙ্গা শিবিরকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। সাম্প্রতি এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

কৌশলগত দিক থেকে যদি বলা হয়, বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল হলো মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১১ লাখ রোহিঙ্গার আশ্রয়স্থল? সম্প্রতি বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শিবিরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে রোহিঙ্গাদের গুরুত্বপূর্ণ নেতা মহিব উল্লাহসহ আরও ৭ জনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। আর তাতেই প্রশ্ন আসে- সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শিবিরগুলো নিরাপত্তা হুমকির দিক থেকে ভেতর কিংবা বাইরে কতটা নিরাপদ? দ্রুততার সঙ্গে কী পদক্ষেপ সেখানে নেয়া যায়?

বাংলাদেশ-মিয়ানমারে সীমান্তের দুর্গম ও পাহাড়ি এলাকায় গড়ে ওঠা ৩৪টি রোহিঙ্গা শিবিরসহ পুরো এলাকাটি যেমন ঝুঁকিপূর্ণ, তেমনি ব্যক্তি থেকে সামষ্টিক পর্যায়েও আছে নিরাপত্তা ঝুঁকি। এলাকাটি অপরাধ কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মাদক ইয়াবার কথা। ইয়াবা পাচারের সঙ্গে জড়িত রয়েছে ৯২ শতাংশ রোহিঙ্গা এবং যার ৯৬ ভাগ ইয়াবা বাংলাদেশে ঢোকে মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা টেকনাফ দিয়ে। মাদক পাচারের পাশাপাশি মানব পাচার, অস্ত্রযুদ্ধ, চরমপন্থা এবং সন্ত্রাসবাদ মিলিয়ে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সীমান্তবর্তী হওয়ায় ক্যাম্পগুলোকে আন্তসীমান্ত যুদ্ধ এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারেরও ঝুঁকি রয়েছে।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধের হার সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। রোহিঙ্গা শিবিরে অপরাধে সঙ্গে সম্পৃক্ত এমন অন্তত ১৪টি দল সক্রিয় রয়েছে। যাতে শনাক্ত করা না যায় সেজন্য ওয়াকিটকি এবং মিয়ানমার পোস্ট অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশনস (এমপিটি) সিম কার্ড ব্যবহার করছে তারা।

২০১৭ সালের আগস্ট থেকে এখন পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরে নিহতের সংখ্যা ২৩৪ জন। এসব ঘটনায় ২ হাজার ৯৪৫ রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে ১ হাজার ৩০১টি মামলা হয়েছে। মিয়ানমারে সামরিক দমন-পীড়নের পর এবং কক্সবাজার ক্যাম্পে অবস্থানরত অপরাধীদের চাপে পড়ে হত্যা, ধর্ষণ, চোরাচালান এবং অন্যান্য অপরাধমূলক কাজের মুখোমুখি হচ্ছে সাধারণ রোহিঙ্গারা। নিজ জীবনের নিরাপত্তার কথা ভেবে কিছুসংখ্যক রোহিঙ্গা অপরাধ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হচ্ছেন।

এ ছাড়া, ক্যাম্পগুলোতে রোহিঙ্গা জনসংখ্যার ঘনত্বও উদ্বেগের কারণ। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, ৯ লাখ রোহিঙ্গা ১৩ বর্গকিলোমিটার দীর্ঘ কুতুপালং ট্রানজিট ক্যাম্পে বসবাস করছেন। যেখানে প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৭০ হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গা থাকেন।

ক্যাম্পের নিরাপত্তায় মোতায়েন করা হয়েছে তিন ব্যাটালিয়ন আর্মড পুলিশ (এপিবিএন)। এদের মোতায়েন করা হলেও তাদের পক্ষে অগোছালো ক্যাম্প ও সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন ঘনবসতি থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বেশ কঠিন।

উদ্বেগের আরেকটি বড় কারণ হলো, পর্যটনভূমি হিসেবে খ্যাত দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজার রোহিঙ্গা শিবির থেকে খুব বেশি দূরে নয়। সমুদ্রসৈকতগুলোর মধ্যে বেশ আকর্ষণীয় ইনানী থেকে কুতুপালং রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের দূরত্ব মাত্র সাড়ে সাত মাইল (৭ দশমিক ৫৭ কি.মি.) এবং কুতুপালং থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দূরত্ব মাত্র ১ দশমিক ৮৬ মাইল।

পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে কোনো একটি অঘটন ঘটিয়ে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের দুর্গম পাহাড়ি এলাকা কিংবা ঘনবসতিপূর্ণ ক্যাম্পে লুকিয়ে থাকার সুবিধা, রোহিঙ্গা শিবিরকে আরও ভয়ংকর করে তুলেছে। সাম্প্রতি এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।

সামাজিক সংহতি ছাড়া, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের অবাধে চলাফেরা করতে দিতে পারে না বাংলাদেশ। সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর এমন বিপর্যয়কর পরিস্থিতি বিবেচনা নিয়ে কিছু ব্যবস্থা নেয়া যেতে পারে।

প্রথমত, সীমান্তপ্রাচীর ও ওয়াচ টাওয়ারের মাধ্যমে ক্যাম্পে নজরদারি বাড়াতে হবে। ক্যাম্প ও সীমান্তের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা চিহ্নিত করে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর প্রভাব এখনও শিবিরে রয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এ ধরনের ঘটনা কমাতে মাঝিদের (রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের নেতা) নেতৃত্বের ভূমিকা বাড়াতে হবে।

তৃতীয়ত, ভাসানচরে আরও ৮১ হাজার রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের উদ্যোগ ত্বরান্বিত করতে হবে। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া পুনরায় শুরু না হওয়া পর্যন্ত ২০২০ সালের ডিসেম্বর থেকে শুরু হওয়া স্থানান্তর প্রক্রিয়ার আলোকে আরও রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরের সম্ভাব্যতা খুঁজে বের করতে প্রযুক্তিগত মূল্যায়ন দরকার।

চতুর্থত, মিয়ানমারের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে, অদূর ভবিষ্যতে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ক্ষীণ। প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জন্য জাতিসংঘ ঘোষিত ‘নিরাপদ স্বর্গ’ তৈরির বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভাবতে হবে। সবার অনুধাবন করা উচিত যে, ক্যাম্প এবং সীমান্তের নিরাপত্তাহীনতা গোটা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের নিরাপত্তাহীনতা।

পরিশেষে, সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শিবিরগুলো প্রতিনিয়ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ঘাঁটি হয়ে ওঠার পাশাপাশি আঞ্চলিক নিরাপত্তায় হুমকি তৈরি করছে। বাংলাদেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে বাস্তব চিত্রটি সামনে এনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের এখনই সময়।

লেখক: গবেষক, সেন্ট্রাল ফাউন্ডেশন ফর ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটিজিক স্টাডিজ (সিএফআইএসএস)। নিরাপত্তা ইস্যু, অর্থনৈতিক-কূটনীতি ও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে কাজ করেছেন ।

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন

মন্তব্য

তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ ও কিছু স্মৃতি

তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধ ও কিছু স্মৃতি

তেলিয়াপাড়ায় লড়াই করার সময় খাওয়া-দাওয়ার মারাত্মক অসুবিধার কথা আগেই বলেছি। লড়াইয়ের ষষ্ঠ দিন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর একটি ছেলে এসে জানায় তার জ্বর, শরীর কাঁপছে এবং গত পাঁচদিন ধরে সে খাবার পায়নি। হাতের রাইফেল মাটিতে রেখে দিয়ে সে হতাশার সুরে বলল, খাওয়া ছাড়া কীভাবে লড়াই করি?

কুমিড়ার যুদ্ধের পর আমি কালুরঘাটস্থ বিপ্লবী স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই। ৩০ মার্চ বেতার কেন্দ্রটি পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে ধ্বংসের পর আমি রামগড় দিয়ে সার্বরুম হয়ে আগরতলা পৌঁছি। সেখানে ৩নং সেক্টরের অধীনে বিভিন্ন অপারেশনে অংশ নিই। তেলিয়াপাড়ার লড়াই তেমনি একটি অধ্যায়।

২৫ এপ্রিল ১৯৭১। আমি তখন সিলেট জেলার তেলিয়াপাড়ায়। এটি গুরুত্বপূর্ণ রেলওয়ে স্টেশন। স্টেশনটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও সিলেটের মধ্যে রেল ও সড়ক পথের সংযোগ স্থল। ২৭ এপ্রিল আমি তেলিয়াপাড়ায় নতুন করে দায়িত্ব গ্রহণ করি। সেখানে আমি ও ক্যাপ্টেন মতিন (সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা) যৌথভাবে কাজ করি। আমাদের অধীনে প্রায় ৭০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল।

তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল ইস্ট বেঙ্গল পাকিস্তান রাইফেলস-এর। এ ছাড়াও কিছুসংখ্যক ছিল মুজাহিদ বাহিনীর। তেলিয়াপাড়ায় শত্রু বাহিনীর সঙ্গে আমাদের তুমুল লড়াই হয়। এই লড়াইয়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম আমি ও মেজর মতিন।
আমরা তেলিয়াপাড়ায় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেয়ার প্রথম দিনেই শত্রু আমাদের ওপর আক্রমণ চালায় এবং তুমুল লড়াইয়ের পর তেলিয়াপাড়া দখল করে নেয়। এই আক্রমণটা ছিল অত্যন্ত আকস্মিক। যুদ্ধের টেকনিক্যাল দিকটা বিচার করলে, আক্রমণের সময় যে বৈশিষ্ট্যগুলোর প্রতি আমাদের লক্ষ রাখতে হয় তাদের মধ্যে একটি হলো অতর্কিতে আক্রমণ।

এই অতর্কিতে আক্রমণের কারণেই আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই। কিন্তু শত্রুরা তেলিয়াপাড়া দখল করার পর মুহূর্তেই আমরা অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে পাল্টা আক্রমণ চালাই এবং হারানো জায়গা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হই।
তেলিয়াপাড়া থেকে যখন আমরা পিছু হটতে বাধ্য হই, তখন আমাদের ছেলেরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যায়। কিন্তু এই ছত্রভঙ্গ অবস্থায়ই আমরা যখন পাল্টা আক্রমণ চালাই, শত্রু তখন পিছু হটতে বাধ্য হয়। পাল্টা আক্রমণের সময় মেজর মতিনের সঙ্গে যে দলটি ছিল তারা উচ্চস্বরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ফায়ার করতে করতে অগ্রসর হওয়ার সময় শত্রুবাহিনী অনেকটা ঘাবড়ে যায়। যদিও লোকসংখ্যা কম ছিল, তবুও স্লোগানের আওয়াজে মনে হচ্ছিল যেন আমরা সংখ্যায় অনেক।

এখানে আরেকটা কথা উল্লেখ না করে পারছি না যে, পাল্টা আক্রমণের সময় আমরা মর্টারের সাহায্য নিয়েছিলাম। মর্টার ছিল মাত্র একটা, কিন্তু তাতে আবার সাইট ছিল না।

বিনা সাইটে মর্টারের গোলা যেভাবে কার্যকরী হয়েছিল তা সত্যিই ভুলবার নয়। সাইট না থাকায় আমাকে আন্দাজের ওপর গোলা নিক্ষেপ করার আদেশ দিতে হয়। শত্রুবাহিনী তেলিয়াপাড়া দখল করার পর যেখানে একত্রিত হয়েছিল, ঠিক সেখানেই গোলাগুলো পড়ে। গোলা এত সঠিকভাবে শত্রু বাহিনীর ওপর পড়বে, এ ছিল আমাদের কল্পনারও বাইরে।
তেলিয়াপাড়া পুনরুদ্ধারের পর শত্রুবাহিনী বেপরোয়া হয়ে ওঠে। এমনকি সে সময় তারা আমাদের ওপর দিনে দুবার আক্রমণ করে। কিন্তু প্রতিবারই আমাদের ছেলেরা শত্রুবাহিনীর আক্রমণের দাঁতভাঙা জবাব দেয়। কয়েকদিন লড়াই চলার পর আরও কিছুসংখ্যক লোক পাঠিয়ে আমাদের শক্তি আরও বৃদ্ধি করা হয়।
তেলিয়াপাড়ায় অবস্থানকালে আমাদের দারুণ অসুবিধার ভিতর দিন কাটছিল। খাওয়া-দাওয়ার কোনো ব্যবস্থা ছিল না। পাঁচ দিনের মতো আমরা ঠিকমতো কোনো খাবারই পাইনি।

তাছাড়া খাবার যাওবা পাওয়া যেত, তা কখনও নিশ্চিন্তে খাওয়ার উপায় ছিল না। শত্রুপক্ষ ঠিক খাওয়ার সময় আমাদের ওপর কামানের গোলাবর্ষণ শুরু করত। এ অবস্থায় আমরা কাঁচা কাঁঠাল এবং আধাপাকা লিচু খেয়েই দিনের পর দিন কাটিয়ে দেই। সে সময় কয়েকদিন প্রবল বৃষ্টিও হয়। বৃষ্টির পানিতে আমাদের ট্রেঞ্চগুলো ভরাট হয়ে যায়। রাতে শত্রুর আক্রমণের সময় সেসব পানিভর্তি পরিখায় অবস্থান নিয়েই তাদের মোকাবিলা করতে হতো।

আমার স্পষ্ট মনে আছে, এক সময় আমি এবং আমার রানার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পানি ভর্তি পরিখায় ছিলাম। আমাদের হাতে ওই সময় কোনো ম্যাপ ছিল না। ছিল না কোনো দুরবিন, প্রোটেকটার বা কম্পাস। বলতে গেলে আমাদের হাতে তখন ৩০৩ রাইফেল এবং কতগুলো এলএমজি ছাড়া আর কিছু না। অবশ্য দুটো মর্টার ছিল যার কোনো সাইট ছিল না। এ সময় শত্রুরা রাতদিন কামান থেকে গোলাবর্ষণ করত। এই শেলিংয়ের কারণে আমাদের কজন সৈনিক ওই সময়ে শহীদ হন।

একদিন শত্রুপক্ষের একটি আর্টিলারি শেল এসে তেলিয়াপাড়া চা-বাগানের ডাকবাংলোর সামনে পড়ে। তাতে বটগাছের নিচে অবস্থানরত আমাদের কজন শহীদ হন এবং সেখানেই তাদের সমাহিত করা হয়। এমন পরিস্থিতিতে আমার এবং ক্যাপ্টেন মতিনের মধ্যে তখন প্রায়ই যোগাযোগ থাকত না। যুদ্ধক্ষেত্রে বেতার যোগাযোগের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বেতার যোগাযোগ দ্বারা যুদ্ধক্ষেত্রে কমান্ড এবং কন্ট্রোল নিয়ন্ত্রিত হয়।

সেই প্রচণ্ড লড়াইয়ের ভিতর কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় মনে হতো সবাই যেন পজিশন ছেড়ে চলে গেছে, আমি একাই যেন সেখানে বসে রয়েছি। সেই প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে আদৌ বোঝা সম্ভব ছিল না কে কোথায় মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে যাচ্ছে। একমাত্র সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা করে নিজের অবস্থানে বসে থাকতাম। প্রাণপণে মোকাবিলা করে যেতাম শত্রুকে। আমাদের সঙ্গে যেসব ইপিআর, মুজাহিদ ও ছাত্র-সংগ্রামীরা ছিল তারা শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণপণে সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন। তেলিয়াপাড়ার যুদ্ধে মুজাহিদ দুলা মিয়া, মৃত্যুভয় তুচ্ছ করে লড়াই করেছিল তার কথা আজও মনে পড়ে।
কুমিল্লার সালদা নদীর কাছে দুলা মিয়ার বাড়ি।

লড়াইয়ে তার অসীম সাহস দেখে ক্যাপ্টেন মতিন তাকে একটা সেকশনের নেতৃত্বের ভার দেন। বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের জন্য এই অকুতোভয় দুলা মিয়া এবং আরেকজন দুঃসাহসী ছেলে (তার নাম এখন মনে পড়ছে না) মেজর সফিউল্লাহর কাছ থেকে ২৫ টাকা করে পুরস্কার পেয়েছিল। দুঃসাহসী মুজাহিদ দুলা মিয়া পরে সিলেটের মুকুন্দপুরের লড়াইয়ে শত্রুর হালকা মেশিনগানের গুলিতে মারাত্মকভাবে আহত হন। কয়েকটি গুলি তার পেটে এসে লাগে। কিন্তু মারাত্মকভাবে আহত হওয়া সত্ত্বেও দুলা মিয়া তার জায়গা ছেড়ে পিছু হটেননি। একইভাবে সে যুদ্ধ চালিয়ে যায়। মারাত্মক আহত অবস্থায় পরে তাকে হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।
তেলিয়াপাড়ায় লড়াই করার সময় খাওয়া-দাওয়ার মারাত্মক অসুবিধার কথা আগেই বলেছি। লড়াইয়ের ষষ্ঠ দিন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস-এর একটি ছেলে এসে জানায় তার জ্বর, শরীর কাঁপছে এবং গত পাঁচদিন ধরে সে খাবার পায়নি। হাতের রাইফেল মাটিতে রেখে দিয়ে সে হতাশার সুরে বলল, খাওয়া ছাড়া কীভাবে লড়াই করি? আমার দ্বারা আর লড়াই করা সম্ভব না।
তেলিয়াপাড়া থাকাকালীন আমাদের হেডকোয়ার্টার ছিল সীমান্তে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের অন্তর্গত। প্রায় এক নাগারে ৬ দিন লড়াই করার পর ক্যাপ্টেন মতিন এবং আমাকে সৈন্যসহ হেড কোয়ার্টারে উঠিয়ে নেয়া হলো। আমাদের জায়গায় তেলিয়াপাড়ায় এলেন লে. মোরশেদ এবং তার সৈন্যদল।

এরা ছিল ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সৈন্য। লে. মোরশেদের সৈন্যদের সঙ্গে তেলিয়াপাড়াতে শত্রু বাহিনীর প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়। তেলিয়াপাড়ায় থাকাকালীন লে. মোরশেদ কয়েকটি চমৎকার অ্যাম্বুশ করেন। শুধু একটি অ্যাম্বুশেই সে পাতা মাইনের সাহায্যে দুই ট্রাকভর্তি শত্রুসৈন্য নিহত হয়, আহতও হয় অনেক। লে. মোরশেদ সেখানে কিছুদিন ছিলেন। পরে সেখানে মেজর সফিউল্লাহর নির্দেশে আমি পুনরায় তার স্থলাভিষিক্ত হই।
এ সময়কার একটি মজার ঘটনা বলি। লে. মোরশেদের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর সকাল আটটায় ডিফেন্স পজিশন অর্থাৎ প্রতিরক্ষা অবস্থান পরীক্ষা করতে শুরু করি। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টাল সেন্টারের কয়েকটি ছেলে যারা আমার অধীনে চাকরি করত, তাদের কয়েকজন সে সময়ে লে. মোরশেদের অধীনে যোগ দিয়েছিল।

প্রতিরক্ষা অবস্থান চেক করতে গিয়ে এলএমজি পজিশনের কাছে ওদের কয়েকজন সিপাইয়ের সঙ্গে আমার প্রায় দশ মিনিট ধরে আলাপ হয়। জোয়ানদের মনোবল অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য তখন তাদেরকে নানাভাবে উৎসাহিত করে তুলছিলাম।
তারপর জোয়ানদের সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে খোঁজ নিলাম। তখন আলাপ প্রসঙ্গে চট্টগ্রামে আমার অধীনে যারা চাকরি করেছিল তাদের মধ্যে একজন আমাকে প্রশ্ন করল, স্যার, চট্টগ্রামে আমাদের কোম্পানি কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন ভূঁইয়া, তার খবর কী? তিনি কি বেঁচে আছেন? আমরা শুনেছি তিনি নাকি চট্টগ্রামের লড়াইয়ে শহীদ হয়েছেন? তার কথা শুনে অবাক হয়ে গেলাম। মনে মনে ভাবলাম ছেলেটার মাথা খারাপ নাকি! সে আমার অধীনে চাকরি করেছে অথচ আজ আমাকেই চিনতে পারছে না।
যাহোক, উত্তরে তাকে বললাম, তুমি আস্ত বোকা। কিন্তু উত্তর সন্তোষজনক না হওয়াতে সে আবারও প্রশ্ন করল, সত্যি স্যার, বলুন না, ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার খবর কী? তিনি কি বেঁচে নেই? হেসে বললাম, এতক্ষণ তুমি ক্যাপ্টেন ভূঁইয়ার সঙ্গেই কথা বলছ। আমার জবাব শুনে সে বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যায়। গভীর দৃষ্টিতে আমার পা থেকে মাথা পর্যন্ত চোখ বুলিয়ে বলে, স্যার, আপনি একেবারে বদলে গেছেন।
সত্যি বদলে যাবার কথা। সে সময়ে আমার মাথায় চুল ছিল না। তাই সব সময়ই মাথায় জিন্না টুপি পরে থাকতাম। আমাকে চিনতে না পারার এর চেয়েও বড় কারণ, আমার তখন মুখ ভর্তি দাড়ি। পরনে একটা ছেড়া শার্ট ও লুঙ্গি। পা একেবারেই খালি। অতএব এ অবস্থায় আমাকে চিনতে আরও কঠিন ছিল বৈকি।
কেবল ওই ছেলেটিই নয়, সেদিন আমাকে চিনতে আরও অনেকেই ভুল করে। তখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছিল যে, নাওয়া-খাওয়ার কোনো ঠিক ঠিকানা ছিল না, শরীরের যত্ন নেয়া তো অনেক দূরের কথা। তেলিয়াপাড়া থাকাকালীন সর্বসাকুল্যে একবারই মাত্র গোসল করেছিলাম। আমার সংগ্রামী সহযোদ্ধা ছেলেদেরও অবস্থা ছিল অনুরূপ। লড়াইয়ের পজিশন ছেড়ে অন্যত্র যাওয়া সম্ভব হয়নি। আমি এবং ক্যাপ্টেন মতিন যে সময়ে তেলিয়াপাড়া থেকে চলে যাই, তখন লক্ষ করি শতকরা ৩০ জনই অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
আমাদের যেসব সংগ্রামী তরুণ তেলিয়াপাড়ার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছে তারা কখনও তেলিয়াপাড়ার কথা ভুলতে পারবে না। কারণ প্রতিরক্ষা সংগ্রামে তেলিয়াপাড়াতেই আমাদের সবচেয়ে বেশি কষ্টের ভেতর দিয়ে লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। এই লড়াইয়ে পাকিস্তান বাহিনীর ক্ষতিও হয় প্রচুর।

একদিনের লড়াইয়ে আমরা একটা সাতটনি ট্রাক দখল করি। শত্রু বাহিনী তেলিয়াপাড়ায় আমাদের সঙ্গে প্রাণপণে লড়াই করে। সতেরো দিন প্রাণপণে যুদ্ধের পর শত্রুবাহিনী আমাদের তিনদিক দিয়ে আক্রমণ করে। শত্রুর এই ত্রিমুখী আক্রমণের ফলে আমাদের বাধ্য হয়ে তেলিয়াপাড়া ত্যাগ করতে হয়। তবু এই সতেরো দিন মাটি কামড়ে পড়ে থাকায় বিরল কিছু অভিজ্ঞতা হয়।

শত্রুর মেশিনগানের বিরুদ্ধে থ্রি নট থ্রি দিয়েও লড়াই চালিয়ে যাওয়া যায় যদি মনোবল থাকে। অনাহার, অন্ধকার, বৃষ্টি, শীতও হার মানে মানুষের দেশপ্রেমের কাছে। আমরা সৈনিক বলেই যেকোনো প্রতিকূল অবস্থার জন্যই প্রস্তুত ছিলাম, কিন্তু যারা সাধারণ মানুষ, কৃষক-ছাত্র এদের অসীম দেশপ্রেমের কোনো তুলনা নেই।

বিশেষ করে ওয়াকার আর সাদেক। দুজনই তখন ইউনিভার্সিটির ছাত্র। পরে অবশ্য তারা সেনাবাহিনীতে কমিশন পায়। এই ওয়াকার আর সাদেক শত্রুর মনে ভীতি সঞ্চার করার জন্য গোটা দশেক থ্রি নট থ্রি রাইফেল এক জায়গায় জড়ো করে ওয়ান টু থ্রি বলে একসঙ্গে ফায়ার করত। তাতে বাজ পড়ার মতো শব্দ হতো। সেই বিকট আওয়াজ নির্ঘাৎ শত্রুর বুকও কাঁপিয়ে দিত।
তাই তেলিয়াপাড়া প্রতিরক্ষা যুদ্ধের সেই দিনগুলোর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। ওখানে যুদ্ধরত অবস্থায় আমরা নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করি যা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতাকে দক্ষ সৈনিকে রূপান্তর করতে সাহায্য করে।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, অবসরপ্রাপ্ত সামরিক (মেজর জেনারেল) কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য। সভাপতি, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় কমিটি।

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন

মুরাদ হাসানের এমপি পদ থাকা না থাকা

মুরাদ হাসানের এমপি পদ থাকা না থাকা

যার বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, একজন চিত্রনায়িকার শরীর নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য এমনকি তাকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত— তিনি কী করে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে বহাল থাকেন? সংসদের বাকি ৩৪৯ সদস্য কি তার সঙ্গে সংসদের চেয়ারে বসতে বিব্রতবোধ করবেন না? এরকম নোংরা মানসিকতা ও বিশ্রী ভাষার লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে কি তার নারী সহকর্মীরা কথা বলতে পারবেন?

একটি ইউটিউব চ্যানেলে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং তার মেয়েকে নিয়ে নোংরা মন্তব্য এবং দুই বছর আগে চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহির সঙ্গে তার একটি ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনায় গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য ডা. মুরাদ হাসান তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন। তবে প্রশ্ন উঠেছে, তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না? প্রশ্নটি একেবারে অবান্তর নয়। আমরা একটু দেখতে চাই সংবিধান কী বলছে?

মঙ্গলবার আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মুরাদ হাসানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের বৈঠকে সুপারিশ করা হবে। অর্থাৎ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হতে পারে। সেক্ষেত্রে তার পরিণতি কী?

সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বেশ কিছু কারণে সংসদ সদস্য পদ বাতিল হতে পারে। যেমন: কোনো উপযুক্ত আদালত যদি তাকে অপ্রকৃতিস্থ বলে ঘোষণা করেন; তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হওয়ার পর যদি দায় থেকে অব্যাহতি লাভ না করেন; তিনি কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন; তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে কমপক্ষে দুই বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন; তিনি যদি প্রজাতন্ত্রের কোনো লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন; সংসদের অনুমতি ছাড়া তিনি যদি একটানা নব্বই বৈঠকে অনুপস্থিত থাকেন এবং সংবিধানের বহুল আলোচিত ৭০ অনুচ্ছেদের আলোকে তিনি যদি তার দল থেকে পদত্যাগ করেন অথবা সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দেন।

দেখা যাচ্ছে, উপরোক্ত একটি কারণও মুরাদ হাসানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। সংবিধান বলছে, দল থেকে পদত্যাগ করলে তার সংসদ সদস্য পদ যাবে। কিন্তু যদি তাকে বহিষ্কার করা হয়, তাহলে বিধান কী— সেটি স্পষ্ট নয়।

দল থেকে বহিষ্কার হলে সংসদ সদস্য পদ যাবে কি না, এই প্রশ্ন আগেও উঠেছে। স্মরণ করা যেতে পারে, একটি হত্যামামলার আসামি হওয়ার পরে টাঙ্গাইলের বিতর্কিত সংসদ সদস্য আমানুর রহমান খান রানাকে জেলা আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কারের পর তার সংসদ সদস্য পদ থাকবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল।

যদিও আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র বলছে, দলের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় সংসদের। ওই সময়ে তিনি দীর্ঘদিন কারাভোগও করেন। তবে তার সংসদীয় আসন শূন্য ঘোষণা করা হয়নি।

দল ও জোটের সিদ্ধান্ত অমান্য করে একাদশ জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেয়ার কারণে বিএনপি থেকে নির্বাচিত জাহিদুর রহমান জাহিদকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম থেকে নির্বাচিত দুজনকেও দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং স্পিকারের কাছে তাদের আসন শূন্য ঘোষণার আবেদন করা হয়। কিন্তু এই কারণে তাদের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয়নি।

তারও আগে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনের পর সপ্তম সংসদে বিএনপির নির্বাচিত দুজন সংসদ সদস্য তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারে যোগ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী হয়েছিলেন। তাদের সদস্যপদ বাতিলের বিষয় আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছিল। কিন্তু কোনো ফলাফল আসার আগেই ওই সংসদের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। নবম সংসদের শেষদিকে জাতীয় পার্টি থেকে সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য এইচএম গোলাম রেজাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত সংসদে তার সদস্যপদ স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে বহাল ছিল। এর আগে অষ্টম সংসদের (২০০১-২০০৬) শেষদিকে ক্ষমতাসীন বিএনপি থেকে রাজশাহী-৪ আসনের সাংসদ আবু হেনাকে বহিষ্কার করা হয়।

সেক্ষেত্রেও তার সদস্যপদ বহাল ছিল। দুটি ক্ষেত্রেই সংসদের ব্যাখ্যা ছিল, দল তাদের বহিষ্কার করেছে। কিন্তু তারা দল থেকে পদত্যাগ করেননি। যে কারণে তাদের সদস্যপদ বহাল ছিল। দশম সংসদে সরকারদলীয় সাংসদ আবদুল লতিফ সিদ্দিকী দল থেকে পদত্যাগ করেন। এ কারণে তিনি সংসদ সদস্যপদ হারান।

প্রসঙ্গত, সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে অনেক সময়ই বিভ্রান্তির সৃষ্টি হলেও এর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে দলের ভেতরে শৃঙ্খলা বজায় রাখা। যাতে করে সংসদের ফ্লোর ক্রসিং এড়ানো যায়। অর্থাৎ যিনি যে দল থেকে নির্বাচিত হয়েছেন, তিনি যেন সেই দলেই থাকে। এই আলোকে কেউ যদি দল থেকে বহিষ্কৃত হন, তাহলেও তার সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাওয়া উচিত।

অর্থাৎ দল থেকে পদত্যাগ করলে যদি সংসদ সদস্যপদ বাতিল হয়, তাহলে বহিষ্কৃত হলেও তার সংসদ সদস্যপদ বাতিল হওয়ার কথা। কিন্তু যেহেতু সংবিধানে বিষয়টি স্পষ্ট নয়, ফলে দল থেকে বহিষ্কারের পরও অনেকের সংসদ সদস্যপদ টিকে গেছে। তবে আওয়ামী লীগ যদি সত্যিই তার সংসদ সদস্যপদও বাতিল চায়, সেক্ষেত্রে তাকে দল থেকে বহিষ্কার না করে প্রতিমন্ত্রীর মতো দল থেকে পদত্যাগের নির্দেশ দিতে পারে। সেক্ষেত্রে তার সংসদ সদস্যপদ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল হয়ে যাবে এবং স্পিকার তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করবেন।

সংবিধানের ৬৬ (৪) অনুচ্ছেদ বলছে, কোনো সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হবে কি না, সে সম্পর্কে বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের কাছে পাঠানো হবে এবং এক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। সুতরাং, এমপি মুরাদের প্রতিমন্ত্রিত্ব যাওয়ার পরে যদি তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং তখন তার সংসদ সদস্যপদ থাকবে কি না তা নিয়ে বিতর্ক দেখা দেয়, তাহলে বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য নির্বাচনে কমিশনে পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এটা ঠিক, আইন ও সংবিধানের চেয়ে নৈতিকতা অনেক বড় বিষয়। আইনত তার সদস্যপদ থাকবে কি থাকবে না সেটি বিতর্কের বিষয় এবং সময়ই বলে দেবে।

একজন সংসদ সদস্য যখন প্রকাশ্যে গালাগালি, অশ্লীল ও অশ্রাব্য ভাষায় কথা বলেন এবং সেটি নিয়ে গণমাধ্যম ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়, তখন তার সংসদ সদস্যের মতো একটি সাংবিধানিক পদে থাকার নৈতিক অধিকার থাকে না। যে অভিযোগে তিনি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন, সেই একই অভিযোগে, নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধে (শাস্তি না হলেও) তার আসনটি শূন্য ঘোষণা করা উচিত। অথবা তার নিজেরই উচিত সংসদ সদস্যপদ ছেড়ে দেয়া।

মুশকিল হলো, আমাদের জনপ্রতিনিধিদের অভিধানে পদত্যাগ বলে কোনো শব্দ নেই। বরং কারো মন্ত্রণালয় বা এখতিয়ারের ভেতরে ভয়াবহ কোনো দুর্ঘটনা বা অনিয়ম হলেও তার দায় নিয়ে কেউ পদত্যাগ করতে চান না। উপরন্তু সেসব ঘটনাকে ‘বিরোধীদের ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন। আওয়ামী লীগের প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত কোনো এক প্রসঙ্গে সংসদে আলোচনায় রসিকতা করে বলেছিলেন: ‘মাননীয় স্পিকার, আমরা দুটি জিনিস ছাড়া আর কিছু ত্যাগ করতে চাই না...।’

সুতরাং যার বিরুদ্ধে সোশ্যাল মিডিয়ায় নারীদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার, একজন চিত্রনায়িকার শরীর নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য এমনকি তাকে ধর্ষণ করার হুমকি দেয়ার অভিযোগ প্রমাণিত— তিনি কী করে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে বহাল থাকেন? সংসদের বাকি ৩৪৯ সদস্য কি তার সঙ্গে সংসদের চেয়ারে বসতে বিব্রতবোধ করবেন না? এরকম নোংরা মানসিকতা ও বিশ্রী ভাষার লোকের মুখের দিকে তাকিয়ে কি তার নারী সহকর্মীরা কথা বলতে পারবেন?

ডা. মুরাদ হাসানের বিষয়টিকে শুধু একজন ব্যক্তির অপরাধ হিসেবে বিবেচনারও সুযোগ নেই। কারণ তিনি একজন জনপ্রতিনিধি; ক্ষমতাসীন দলের এমপি এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের একজন প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। তিনি যা বলেছেন, যা করেছেন তার দায় তার দল ও সংসদ এড়াতে পারে না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর নতুন অঙ্গীকার

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর নতুন অঙ্গীকার

আওয়ামী লীগের ৬ দফা ও ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যেও সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু তার অন্তরে লালিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন এবং দেশের শাসনব্যবস্থাসহ সব উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেয়ার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় বঙ্গবন্ধু সর্বদাই সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করা হলেও স্বাধীন দেশে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করেন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী চলছে। এরই মধ্যে বাঙালির জীবনে নতুন তাৎপর্য নিয়ে এলো বিজয়ের মাস- বাংলাদেশের বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীও এবার। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীর দিনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশবাসীকে শপথ গ্রহণ করাবেন বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। খবরটি চমকপ্রদ ও আশাব্যঞ্জক। এই অনুষ্ঠান নিঃসন্দেহে ‘জাতীয় শপথ’ আয়োজন বলে বিবেচিত হবে। এই আয়োজনের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী চেতনা ও আদর্শ সঞ্চারিত হবে বলে আশা করা যায়।

মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বিজয়কে সমুন্নত রাখার ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে উদ্দীপিত করার প্রেরণা শপথ অনুষ্ঠানকে মহিমান্বিত করবে। নতুন প্রজন্মসহ সবার মাঝে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা আরও শাণিত হবে। নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে, কী মহান আদর্শের ভিত্তিতে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের ভেতর দিয়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।

বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে অনেকের হতাশাবোধ দেখে বিস্মিত হয়ে যাই! তরুণ প্রজন্মের মধ্যে হতাশার কথা শুনি, তাদের এ প্রকাশ অবাক ও বিষণ্ন করে। তরুণদের মনোজগতে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও দর্শনের কার্যকারিতা সম্পর্কে আরও কাজ করা প্রয়োজন। এই প্রজন্ম যেন আদর্শিকভাবে হারিয়ে না যায়। তাই জাতিগতভাবেও অনেক কিছু করার আছে।

পৃথিবীতে সবসময় তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই রাষ্ট্র বিকশিত ও প্রগতিশীলতার দিকে এগিয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতেও তরুণ প্রজন্মের অবদান অনেক। কিন্তু বর্তমানে তরুণ প্রজন্মের অনেকের দিকে তাকালে সেই ঐতিহাসিক সত্যটিও যেন মরীচিকায় পরিণত হয়! আদর্শবিচ্যুত তরুণ প্রজন্ম নিয়ে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের রূপরেখা কল্পনাও কষ্টকর, সেজন্য এখনি সাবধান হওয়া দরকার।

স্বাধীনতার স্থপতি, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে সাড়া দিয়ে জনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ। ৯ মাসের লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে ৩০ লাখ মানুষের জীবন ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে জাতীয় জীবনে মুক্তি আসে।

পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছিল ১৬ ডিসেম্বর। আবার এই ডিসেম্বরেই পাকিস্তানিরা তাদের এ দেশীয় দোসর- রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সহযোগিতায় জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, বুদ্ধিজীবীদের হত্যায় মেতে ওঠেছিল। এ কারণে বাঙালি বিজয়ের মাসটি উদযাপন করে একই সঙ্গে আনন্দ ও বেদনায়।

প্রতিবছর বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনায় নানা অনুষ্ঠান-আয়োজনের মাধ্যমে মাসজুড়ে বিজয়ের আনন্দ উদযাপন করে বাংলাদেশ। লাল-সবুজ পতাকা ওড়ে সারা দেশে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম জাতিরাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সর্বাধিক অবদান ও আত্মত্যাগ যে মহামানবের, তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। নিজের জীবনের সর্বস্ব বিলীন করে মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়েও যিনি অবিচল চিত্তে বাংলাদেশকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরেছেন, সেই বঙ্গবন্ধু সদ্য স্বাধীন-সার্বভৌম কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে গ্রহণ করেন মহাযজ্ঞ, পালন করেন আরেক ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

১৬ ডিসেম্বর বিজয় লাভের পর বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি। এরপর রেসকোর্স ময়দানে দেয়া তার সেই ভাষণটি প্রণিধানযোগ্য। কেননা, ১৯৭১-এর সাত মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণটি যেমন ছিল স্বাধীনতার সুস্পষ্ট রূপরেখা, ঠিক তেমনি ৯ মাস পর স্বাধীন দেশে প্রত্যাবর্তনের পর রেসকোর্সে দেয়া তার ভাষণটিও ছিল ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নয়নের একটি রূপকল্প। ওই ভাষণে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ পুনর্গঠনের কাজের প্রতিই তিনি বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছিলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশকে সম্মিলিত উদ্যোগে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছিলেন বার বার। দৃপ্তকণ্ঠে তিনি ঘোষণা করেছিলেন, বাংলাদেশের পুনর্গঠন কাজ পরিচালিত হবে শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে।

উল্লেখ্য যে, পাকিস্তানে ১৯৭০-এ নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু যেসব নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে দেয়া ভাষণেও সেসব নীতিগত দিকনির্দেশনার গভীর অন্ত্যমিল খুঁজে পাওয়া যায়। অর্থাৎ, বঙ্গবন্ধু তার স্বদেশ ও জাতি নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা সদাজাগ্রত থাকত তার মনে। তাই তার প্রতিটি কথা ও কাজে বার বার ওঠে আসত স্বদেশ গঠন ও জনগণের কল্যাণের কথা।

অসাম্প্রদায়িক ও জাতীয়তাবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের সরকার পদ্ধতি নির্ধারণে মনোনিবেশ করেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের প্রথম মুজিবনগরে গঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার-কাঠামো ছিল রাষ্ট্রপতি-শাসিত যুক্তরাষ্ট্রীয় সরকার ব্যবস্থায় সংসদীয় গণতান্ত্রিক সরকার। তবে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সেসময় নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতেন। বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ১৯৭১-এর ১০ এপ্রিল স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণার এক স্থানে উল্লেখ করা হয়, সংবিধান প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রজাতন্ত্রের প্রেসিডেন্ট থাকবেন এবং সৈয়দ নজরুল ইসলাম প্রজাতন্ত্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট থাকবেন।

আওয়ামী লীগের ৬ দফা, ছাত্রদের ১১ দফার মধ্যেও সংসদীয় পদ্ধতির সরকার গঠনের কথা ছিল। বঙ্গবন্ধু তার অন্তরে চির লালিত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন এবং দেশের শাসনব্যবস্থাসহ সব উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের বিশাল কর্মকাণ্ড এগিয়ে নেয়ার কাজে ব্রতী হয়েছিলেন। রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামোয় বঙ্গবন্ধু সর্বদাই সংসদীয় গণতন্ত্রের পক্ষে ছিলেন। তাই মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করা হলেও স্বাধীন দেশে তিনি রাষ্ট্রপতির পদ ত্যাগ করেন।

বাংলাদেশের সংবিধান গৃহীত এবং ১৯৭২-এর ১৬ ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়ার পর সংবিধানের বিধিমতে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩-এর ৭ মার্চ। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলাদেশে সরকার গঠন করে। বঙ্গবন্ধু তার নিজস্ব এবং দলের সমষ্টিগত ধ্যান-ধারণার আলোকে স্বাধীন বাংলাদেশকে সোনার বাংলারূপে গড়তে অসংখ্য উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন। তার গৃহীত পদক্ষেপগুলোকে মূল ভিত্তি হিসেবে নিয়ে বাংলাদেশের সব সরকারি কর্মপরিকল্পনা প্রণীত হয়েছে এবং এখনও হচ্ছে।

প্রশাসনিক কাঠামো সমন্বয়ের পরের কাজটি ছিল জাতীয় সংবিধান প্রণয়ন। মাত্র এক বছরের মধ্যে একটি বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত সংবিধান তৈরি করে বঙ্গবন্ধু ইতিহাস সৃষ্টি করেন। এরপরের কাজটি ছিল অত্যন্ত জরুরি এবং চ্যালেঞ্জিং। বঙ্গবন্ধু সেই কাজটি করেন দৃঢ়চিত্তে ও সুচারুরূপে।

দেশ মুক্ত হওয়ার মাত্র তিন মাসের মধ্যে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সৈন্যদের সে দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করেন তিনি। এমন নজির পৃথিবীর সমসাময়িক ইতিহাসে বিরল। এ ক্ষেত্রে ভারতের সেসময়ের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর অবদানও স্মরণীয়।

দেশ পুনর্গঠনের এ মহাকর্মযজ্ঞে যখন হাত দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, ঠিক তখনই দেশের ভেতরে ও বাইরে দানা বাঁধতে থাকে ষড়যন্ত্র। সেগুলো মোকাবিলা করে উন্নয়ন ও পুনর্গঠনের পথে বঙ্গবন্ধু এগিয়ে যাচ্ছিলেন ঠিকই। কিন্তু সব প্রয়াস ব্যর্থ করে দিয়ে ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীরা বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে।

এর সঙ্গে মৃত্যু হয় একটি সদ্য স্বাধীন দেশের উন্নয়নস্পৃহার। কিন্তু তারা সফল হয়নি। জাতির পিতার হাতের স্পর্শে গড়ে ওঠা এ দেশের একেকটি প্রতিষ্ঠান আজও সাক্ষ্য দিচ্ছে- স্থপতি কখনও মরে না। জাতির পিতারও মৃত্যু নেই। তার সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় গড়ে ওঠা এ রাষ্ট্র তারই আদর্শে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাচ্ছেন তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও রিসার্চ ফেলো, বিএনএনআরসি।

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন

’৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনই স্বাধীনতা ও মুক্তির সোপান

’৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনই
স্বাধীনতা ও মুক্তির সোপান

পূর্ব পাকিস্তানের বাকি দুটি আসনের মধ্যে যারা জয়লাভ করেছিলেন তাদের একজন হলেন নুরুল আমিন এবং অপরজন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার স্মৃতিচারণামূলক ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে লিখেছেন, ভোট গ্রহণের আগেই আওয়ামী লীগ কার্যত নির্বাচনে জিতে গিয়েছে। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর। এই দিনটিতে তৎকালীন অবিভক্ত পাকিস্তানের প্রথম এবং শেষ সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সে নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সে নির্বাচনের পর বিজয়ী শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরে টালবাহানা করে।

এর জের ধরে শুরু হওয়া তীব্র রাজনৈতিক সংকট শেষ পর্যন্ত গড়ায় বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে। যার পরিসমাপ্তি ঘটে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে।

নির্বাচনের প্রেক্ষাপট

পূর্ব পাকিস্তানে গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে বাধ্য হন আইয়ুব খান।এরপর সেনাপ্রধান জেনারেল ইয়াহিয়া খান দায়িত্ব গ্রহণ করে সামরিকশাসন জারি করেন। তারপর ইয়াহিয়া খান পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন। পাকিস্তান সরকারের তৎকালীন যোগাযোগ মন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অন্যতম উপদেষ্টা জি.ডব্লিউ চৌধুরীর মতে, একটি অবাধ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে প্রেসিডেন্টের আগ্রহের কোনো ঘাটতি ছিল না।

মি. চৌধুরী উল্লেখ করেন, প্রেসিডেন্ট চেয়েছিলেন ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া যেন মসৃণ হয়। আওয়ামী লীগ নিয়ে গবেষণা করেছেন ভারতের জওহারলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্যামলী ঘোষ। পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের উপর গবেষণা করে তিনি পিএইডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন। তার বই ‘দ্য আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১’ প্রকাশিত হয় ১৯৯০ সালে। মিস ঘোষ লিখেছেন, ১৯৭০ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনের প্রচারাভিযান শুরু করে।

নির্বাচনে অংশ নেয়া দলগুলো

শেখ মুজিব ছাড়াও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে প্রভাবশালী নেতা ছিলেন মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য ভাসানী প্রথমে রাজি হলেও নভেম্বর মাসের শেষ দিকে এসে তিনি নির্বাচন বর্জনের ডাক দিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যান। তার এই সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক মহলে এখনও নানা বিতর্ক হয়।

অনেকে মনে করেন, ১৯৭০ সালে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে মওলানা ভাসানী ভুল করেছেন। তবে তার অনুসারীরা বলেন, ভিন্ন কথা। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, ভাসানী যদি নির্বাচনে শেষপর্যন্ত থাকতেন তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে ভোট ভাগ হয়ে যেত এবং আওয়ামী লীগ হয়তো একচ্ছত্র আধিপত্য পেত না।

মওলানা ভাসানীর অনুসারী হায়দার আকবর খান রনো লিখেছেন, “আমার মনে হয়, ভাসানী মনে মনে চেয়েছিলেন শেখ মুজিবকে ওয়াকওভার দিতে, যাতে শেখ মুজিবুর এককভাবে বেরিয়ে আসেন। তাতে স্বাধীনতার প্রশ্নটি সহজ হতো বলে তিনি ভেবেছিলেন।” নির্বাচনে মোট ২৪টি দল অংশ নিয়েছিল।

নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নৌকা মার্কা পায়। অপরদিকে আওয়ামী লীগের চরম প্রতিন্দ্বন্দ্বি জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টির ছিল তলোয়ার প্রতীক। নির্বাচনে অংশ নেয়া অন্য দলগুলো তেমন একটা জোরালো ছিল না।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে কোনো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেনি। ইয়াহিয়া খান সরকারের মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য এই নির্বাচনে অংশ নেয়ার অনুমতি ছিল না। জি. ডব্লিউ চৌধুরীর মতে, সেই নির্বাচন সত্যিকার অর্থে ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ অধীনে হয়েছিল। জাতীয় পরিষদের সে নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে ছিল ১৬২টি আসন এবং পশ্চিম পাকিস্তানে ছিল ১৩৮টি।

পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ সবগুলো আসনে প্রার্থী দিয়েছিল। অন্য কোনো রাজনৈতিক দল সবগুলো আসনে প্রার্থী দিতে পারেনি। পূর্ব পাকিস্তানে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ প্রার্থী দিয়েছিল পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কনভেনশন)। তাদের প্রার্থী সংখ্যা ছিল ৯৩জন। এছাড়া পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি ৭৯টি এবং জামায়াতে ইসলামী, পাকিস্তান ৭০টি আসনে প্রার্থী দিয়েছিল।

গবেষক শ্যামলী ঘোষ আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীদের বিশ্লেষণ করেছেন। তার পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে ১৬২টি আসনে আওয়ামী লীগ যাদের মনোনয়ন দিয়েছিল তাদের মধ্যে প্রায় ৪৮ শতাংশ ছিল আইনজীবী। এছাড়া ব্যবসায়ী ছিল ১৯ শতাংশ এবং কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিল ৬ শতাংশ। জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি পূর্ব পাকিস্তানে কোনো প্রার্থী দেয়নি।

জি. ডব্লিউ চৌধুরীর বর্ণনায়, জুলফিকার আলী ভুট্টো পূর্ব পাকিস্তানে কোনো প্রার্থী দেওয়ার ‘সাহস’ করেনি।

অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানের ১৩৮টি আসনের মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রার্থী দিয়েছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি। কিন্তু তারা সবকটি আসনে প্রার্থী দেয়নি। পাকিস্তান পিপলস পার্টির প্রার্থীসংখ্যা ছিল ১১৯ জন। আওয়ামী লীগ পশ্চিম পাকিস্তানে মাত্র আটজন প্রার্থী দিয়েছিল।

নির্বাচনে মোট ২৪টি দল অংশ নেয়। ৩০০টি আসনে মোট ১ হাজার ৯শ ৫৭ প্রার্থী অংশগ্রহণ করার জন্য মনোনয়নপত্র জমা দেয়। এর পর কিছু প্রার্থী তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেয়। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে ১ হাজার ৫ শ ৭৯ প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আওয়ামী লীগ ১৭০ আসনে প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে ১৬২টি আসন পূর্ব পাকিস্তানে এবং অবশিষ্ট পশ্চিম পাকিস্তানে।

জামায়াতে ইসলামী দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সংখ্যক প্রার্থী দেয়। তাদের প্রার্থী সংখ্যা ১৫১। পাকিস্তান পিপলস পার্টি মাত্র ১২০ আসনে প্রার্থী দেয়। এর মধ্যে ১০৩টি ছিল পাঞ্জাব ও সিন্ধু প্রদেশে। পূর্ব পাকিস্তানে তারা কোনো প্রার্থী দেয়নি। পিএমএল (কনভেনশন) ১২৪ আসনে, পিএমএল (কাউন্সিল) ১১৯ এবং পাকিস্তান মুসলিম লীগ (কাইয়ুম) ১৩৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।

নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ এবং প্রায় ৬৫% ভোট পড়েছে বলে সরকার দাবি করে। সর্বমোট ৫৬৯৪১৫০০ রেজিস্টার্ড ভোটারের মধ্যে ৩১,২১১,২২০ জন পূর্ব পাকিস্তানের এবং ২৩,৭৩০,২৮০ জন ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের ভোটার।

ভোটের ফলাফল

১৯৭০ সালের নির্বাচনের এক মাস আগে ভোলাসহ উপকূলীয় জেলাগুলোতে প্রবল এক সাইক্লোন আঘাত করে। সে ঝড়ের পরে পাকিস্তান সরকারের উদাসীনতা বাঙালিদের মনে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি করে।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, সে ঝড়ের পরে নির্বাচনের ফলাফল কী হতে পারে সে সম্পর্কে আগাম ধারণা পেয়েছিল সবাই। ১৯৬৯ সালের গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে কারাগার থেকে বেরিয়ে আসার পর শেখ মুজিব হয়ে ওঠেন অনেক প্রভাবশালী। পূর্ব পাকিস্তানে ১৬২টি আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে।

পূর্ব পাকিস্তানের বাকি দুটি আসনের মধ্যে যারা জয়লাভ করেছিলেন তাদের একজন হলেন নুরুল আমিন এবং অপরজন চাকমা রাজা ত্রিদিব রায়। অপরদিকে পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের মধ্যে ৮১টি আসনে জয়লাভ করে জুলফিকার আলী ভুট্টোর নেতৃত্বে পাকিস্তান পিপলস পার্টি।

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৎকালীন জনসংযোগ কর্মকর্তা সিদ্দিক সালিক তার স্মৃতিচারণামূলক ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ বইতে লিখেছেন, ভোট গ্রহণের আগেই আওয়ামী লীগ কার্যত নির্বাচনে জিতে গিয়েছে। ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচন ছিল আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

সে নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানে শেখ মুজিবুর রহমান এবং পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলী ভুট্টো একচ্ছত্র নেতা হয়ে ওঠেন। এই নির্বাচনের ফলাফল নির্দেশ করে পাকিস্তানের দুটি অংশের জনগণের মধ্যে চিন্তাধারার পার্থক্য ফুটে ওঠে।

জাতীয় পরিষদ নির্বাচনের ফলাফল

ন্যশনাল অ্যাসেম্বিলিতে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাধারণ নির্বাচনের একই সঙ্গে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বিলির ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের ৮১টিতে জয়লাভ করে।

কনজারভেটিভ দলগুলো নির্বাচনে খুব সুবিধা করতে পারেনি। সম্ভবত একই ধরনের পার্টিগুলো একে অপরের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে এমনটি হয়েছে। পিএমএল (কাইয়ুম), পিএমএল (কাউন্সিল), পিএমএল (কনভেনশন), জমিয়ত উলেমা-ই-ইসলাম, জমিয়ত উলেমা-ই-পাকিস্তান এবং জামায়াতে ইসলামী একত্রে ৩৭টি আসন পায়।

আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয় ন্যাশনাল অ্যাসেম্বিলিতে আওয়ামী লীগ ১৬০টি আসনে জয়লাভ করে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। সাধারণ নির্বাচনের একই সঙ্গে প্রাদেশিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তান অ্যাসেম্বিলির ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে জয়লাভ করে। পাকিস্তান পিপলস পার্টি পশ্চিম পাকিস্তানে ১৩৮টি আসনের ৮১টিতে জয়লাভ করে। এই জয়লাভই বাঙালিকে যুদ্ধ করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনে সার্বভৌমত্ব সৃষ্টির সাহস ও প্রেরণা জোগায়। যেখানে জড়িয়ে আছে রক্ত-মেধা, ঘাম আর সম্ভ্রমহানির করুণগাথা।

লেখক: অবসরপ্রাপ্ত সামরিক (কর্নেল) কর্মকর্তা, নিরাপত্তা বিশ্লেষক, প্রবন্ধকার ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন

ডা. মুরাদ হাসান ও সীমা লঙ্ঘনের দায়

ডা. মুরাদ হাসান ও সীমা লঙ্ঘনের দায়

ডা. মুরাদ হাসান যদি একটু সচেতন হতেন, তাহলে দেখতে পেতেন, চারপাশে কত তারকার পতন ঘটেছে স্রেফ কথা আর আচরণের কারণে। যুবলীগের একসময়কার দাপুটে নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট এখন কারাগারে। যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী হারিয়ে গেছেন। গাজীপুরের একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে ওঠা সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এখন নিঃস্ব। রাজশাহীর কাটাখালীর পৌর মেয়র আব্বাস আলী এখন কারাগারে। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে মুরাদ হাসান অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন।

ডা. মুরাদ হাসানের সবই ছিল। তার পিতা মতিউর রহমান তালুকদার সাবেক সাংসদ এবং জামালপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি। তিনি নিজে একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। ছাত্রজীবনে ছিলেন ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি। পিতার পথ ধরে তিনিও রাজনীতিতে আসেন।

২০০৮ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনে জামালপুরের একটি আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। ২০১৯ সালে দায়িত্ব পান স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর। তার ভাই হাইকোর্টের বিচারপতি। সব থাকলেও স্রেফ বাগসংযম করতে না পারায় আজ তিনি সব হারিয়েছেন। প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রথমে বইমেলায় গাড়ি নিয়ে ঢুকে বিতর্কিত হন তিনি।

এরপর স্কয়ার হাসপাতালের সিকিউরিটির সঙ্গে ঝামেলা করার ফলে মন্ত্রণালয় পরিবর্তন হয় তার। এরপর দায়িত্ব পান তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর। কিন্তু মন্ত্রণালয় বদল থেকে শিক্ষা নেননি তিনি। বরং তথ্য প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। একের পর এক বিতর্কিত বক্তব্য দিয়ে সমাজের সব মানুষকে ক্ষেপিয়ে তোলেন।

গত অক্টোবরে রাষ্ট্রধর্ম ইসলামের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে প্রথম বিতর্ক সৃষ্টি করেন তিনি। তখন সমাজের বড় একটা অংশ তার সমালোচনা করে। তবে ৭২-এর সংবিধানের পক্ষে বলায় একটা অংশের সমর্থনও পান ডা. মুরাদ হাসান। তবে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশের পক্ষে, ৭২-এর সংবিধানের পক্ষে তার অবস্থানটিও শেষপর্যন্ত বিতর্কই তৈরি করে তার বডি ল্যাঙ্গুয়েজ আর শব্দচয়নের কারণে।

যেভাবে তিনি ‘রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, এটা আমি মানি না’ বলছিলেন; তাতে অনেকেই এটাকে ইসলামের বিপক্ষে অবস্থান বলে ধরে নিয়ে সমালোচনা করেন। বিভিন্ন সময়ে বিএনপি, বেগম খালেদা জিয়া, তারেক রহমানের তীব্র সমালোচনা করেছেন তিনি। আওয়ামী লীগের একজন প্রতিমন্ত্রী বা সাংসদ এটা করতেই পারেন। কিন্তু গত সপ্তাহে বেগম খালেদা জিয়ার অসুস্থতা, তারেক রহমান এবং সর্বোপরি তারেক রহমানের কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে যে ভাষায় তিনি সমালোচনা করেছেন তা ছাড়িয়ে যায় শালীনতার সব সীমা।

কট্টর বিএনপি বিদ্বেষেী কেউও এটা ভালোভাবে নেয়নি। একই সময়ে তিনি ডা. জাফরউল্লা চৌধুরী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেত্রীদের নিয়ে তিনি অশ্লীল অভিযোগ করে ধিকৃত হন নিজদলেও। আস্তে আস্তে ছোট হয়ে আসে তার পৃথিবী, বাড়তে থাকে সমালোচনার পরিধি। সবচেয়ে বড় কথা হলো- নিজের এই অশালীন বত্তব্যকে জায়েজ করার জন্য বার বার তিনি প্রধানমন্ত্রীকে মা হিসেবে সম্বোধন করেন এবং বলেন, তিনি যা করছেন, তা প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই করছেন। কিন্তু এটা যে সত্য নয়, তা প্রমাণিত হতে সময় বেশি লাগেনি।

তার কফিনে শেষ পেরেকটি ঠোকা হয়, তার দুই বছরের পুরোনো একটি টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হওয়ায়। সেখানে তিনি চিত্রনায়িকা মাহিয়া মাহিকে অশ্লীলতম ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে তুলে আনার হুমকিও দেন। তাকে ধর্ষণ করার হুমকি দেন। হুমকির জন্য যে ভাষা তিনি প্রয়োগ করেছেন, তা আসলে শ্লীলতা, শালীনতার সব সীমা অতিক্রম করেছে। মন্ত্রিসভার সদস্য বা সংসদ সদস্য বলে নয়, কোনো সুস্থ, স্বাভাবিক, শিক্ষিত মানুষের পক্ষে এ ধরনের নোংরা ভাষা উচ্চারণ করা কল্পনার অতীত। এ স্রেফ বস্তির নোংরামি।

ডা. মুরাদ হাসান বরাবরই পারিবারিক ঐতিহ্যের বড়াই করতেন। কিন্তু নিজের মুখের ভাষায় তিনি প্রমাণ করেছেন, পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে কিছু শিখতে পারেননি তিনি। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে পড়লেও আসলে কোনো শিক্ষা তার নেই। ডা. মুরাদ যা করেছেন তাতে তিনি আওয়ামী লীগের বোঝা, রাজনীতির কীট, নারী সমাজের শত্রু; সর্বোপরি সভ্যতার কলঙ্ক। বিভিন্ন ক্লাবে তার নানাবিধ অপকর্মের কথাও এখন বাতাসে ভাসছে। ডা. মুরাদ হাসানের আজকের পরিণতির জন্য তিনি নিজেই দায়ী।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই তাকে মানসিক হাসপাতাল বা মাদকাসক্তি পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানোর দাবি করেছেন।

ডা. মুরাদ হাসান যদি একটু সচেতন হতেন, তাহলে দেখতে পেতেন, চারপাশে কত তারকার পতন ঘটেছে স্রেফ কথা আর আচরণের কারণে। যুবলীগের একসময়কার দাপুটে নেতা ইসমাইল হোসেন সম্রাট এখন কারাগারে। যুবলীগের সাবেক চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী হারিয়ে গেছেন। গাজীপুরের একচ্ছত্র সম্রাট হয়ে ওঠা সিটি মেয়র জাহাঙ্গীর আলম এখন নিঃস্ব। রাজশাহীর কাটাখালীর পৌর মেয়র আব্বাস আলী এখন কারাগারে। কিন্তু ক্ষমতার দাপটে মুরাদ হাসান অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। তাই চারপাশে এতগুলো রেড সিগন্যালও তার বেপরোয়া গতি থামাতে পারেনি। কোনো সতর্কবাণীই তার কানে ঢোকেনি। অবশ্যম্ভাবী পতনের দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে গেছেন তিনি।

ডা. মুরাদ হাসানের এই পতন আওয়ামী লীগের আরও অনেকের জন্য সতর্কবার্তা। সবাইকে বুঝতে হবে, অন্যায় করে, বাজে কথা বলে ক্ষমতায় থাকা যাবে না। আর সবকিছুরই একটা সীমা আছে। সীমা লঙ্ঘনকারীকে আল্লাহও পছন্দ করেন না।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন

শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে বাধা কোথায়?

শিক্ষার্থীদের দাবি মানতে বাধা কোথায়?

বিশ্বের অনেক দেশে এখনও শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া প্রচলিত আছে। হাফ ভাড়ার এই দাবিটি যৌক্তিক হলেও কেন শিক্ষার্থীদের এখনও পড়ার টেবিল ছেড়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে সেটাই প্রশ্ন। পাকিস্তান আমলের দাবি নিয়ে এদেশে এখনও মাঠে আন্দোলন করতে হচ্ছে এটি লজ্জাজনক নয়? ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক ১১ দফার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের বাসভাড়া অর্ধেক করার দাবি ছিল।

ঢাকায় শিক্ষার্থীরা অর্ধেক ভাড়া দেবে আর ঢাকার বাইরে কী হবে সেটি এখনও ফয়সালা হয়নি। তেলের মূল্য বৃদ্ধির অজুহাতে বাসমালিকরা বাসভাড়া বাড়িয়েছে প্রায় ৩০ শতাংশ। তেলের দাম বাড়ানোর পেছনে সরকারি অজুহাত ছিল, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়ে যাওয়া। জানা যায়, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আবার কমেছে। কিন্তু আমাদের দেশে বাসভাড়া বলি আর বাসা ভাড়া- কোনোটির দাম একবার বাড়লে তা আর কমতে দেখা যায় না।

তেলের দাম আন্তর্জাতিক বাজারে কমার পরেও এখনও সমন্বয় করা হয়নি। কিন্তু বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ঠিকই সমন্বয়ের নামে রাতারাতি বাড়ানো হয়েছে। যে অজুহাতে বাস মালিকরা বাসভাড়া বাড়িয়েছে ধারণা করা যায়, এখন যদি সরকার তেলের দাম কমায়ও, বাসভাড়া আর কমবে না। আসলে এদেশের জনগণকেই সব অনিয়মের সঙ্গে সমন্বয় করে চলতে হয়।

বাসভাড়া ইস্যুকে কেন্দ্র করে শিক্ষার্থীরা এখনও সড়কে অবস্থান করছে। তাদের দাবি হাফ পাস। বাসমালিক কর্তৃপক্ষ তাদের দাবি মেনেও নিয়েছে। কিন্তু শুধু ঢাকার জন্য। শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক প্রশ্ন ঢাকার বাইরে কেন নয়?

গণমাধ্যমে এসেছে, অর্ধেক ভাড়া দিতে চাওয়ায় এক বাস হেলপার নাকি একজন ছাত্রীকে ধর্ষণের হুমকি পর্যন্ত দিয়েছে! এই ঘটনার কয়েকটি অর্ন্তনিহিত বিষয় রয়েছে। নারীদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই ঘটনায়। সেই সঙ্গে গণপরিবহনে নারীর নিরাপত্তার প্রশ্নটিও এর সঙ্গে জড়িত। সর্বোপরি গণপরিবহনে বিরাজমান নৈরাজ্যের বিষয়টি তো রয়েছেই।

দিল্লিতে বাসে ধর্ষণকাণ্ডে (১৬ ডিসেম্বর ২০১৩) দিল্লির জনগণ রাস্তায় নেমেছিল। কিন্তু এর কিছুদিন আগেই (৬ ডিসেম্বর ২০১৩) আমাদের টাঙ্গাইলেও একই ঘটনা ঘটে। দিল্লির জনগণ রাস্তায় নামলেও ঢাকায় কেউ ওভাবে প্রতিবাদ করেনি। গণমাধ্যমে কিছু লেখালেখি হয়েছে কেবল। নারীর প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিটিই এমন হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, নারী ধর্ষণকে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। তা না হলে একজন ছাত্রী বা নারী হাফ ভাড়া দিতে চাইলে তাকে ধর্ষণ করার হুমকি কীভাবে দেয়া যায়? আর চোখের সামনে সেই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হয় যাত্রীসাধারণ; যারা এই সমাজেরই মানুষ।

এদেশে গণপরিবহনে নারী এখনও পুরোপুরি নিরাপদ নয়। বাসে ওঠা থেকে শুরু করে বাস থেকে না নামা পর্যন্ত নারী-যাত্রীকে তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকতে হয়। বাসে অন্য যাত্রী না থাকলে তো কথাই নেই। স্বল্প সংখ্যক যাত্রী থাকলেও একই কথা। কারণ, বাকিরা তো সব পুরুষ যাত্রী। এমন ভীতিকর গণপরিবহন নারীর কাম্য নয়।

মানুষ শুধু মাঝেমধ্যে এমন ঘটনা ঘটলে একটু প্রতিবাদ করবে। গণমাধ্যমে সংবাদ হলেও পারে না হলেও পারে- এ অবস্থা আর কতদিন! দেশে নারীদেরও পথ চলতে হয়, কাজেই সবার আগে নারীসহ সবার জন্য নিরাপদ সড়ক চাই, এরপর অন্য কথা।

অনেক সময় নারীরা বাসে ওঠার সময় পুরুষ হেলপার ওঠাতে সাহায্য করার নামে তাদের গায়ে হাত দেয়। অবস্থা এমন যে, হেলপারকে পুরুষ যাত্রীর গায়ে হাত দিতে দেখা না গেলেও; নারী যাত্রীদের পিঠে হাত দিয়ে বাসে ওঠাতেই হবে। নারী-যাত্রীরা যাতে বাস থেকে ওঠার সময় পড়ে না যায় সে জন্যই তারা পিঠে হাত দিয়ে বাসে ওঠানো- এটাই তাদের অজুহাত। কিন্তু এই অজুহাতে নারীর গায়ে হাত দিয়ে বাসে ওঠানো শ্লীলতাহানীরই নামান্তর। এসব বন্ধ করা জরুরি।

দিনের পর চোখের সামনে এসব হচ্ছে। আর চলন্ত বাস থেকে নামা ও চলন্ত অবস্থাতেই যাত্রী ওঠানো এদেশে যেন রেওয়াজে পরিণত হয়েছে। শুধু নামার সময় হেলপারদের বলতে শোনা যায়- বাম পা আগে দেন। বাসস্টপে বাস ঠিকভাবে থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর বালাই নেই। বলা যায়, ঢাকায় যেন কোনো বাসস্টপ নেই অথবা পুরো ঢাকা শহরই একটি বাসস্টপ। যেখানে সেখানে যাত্রী নামানো-ওঠানো নিয়ম হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই সঙ্গে রাস্তায় আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতাও রয়েছে। সুশৃঙ্খলভাবে বাস চলাচল নিশ্চিত করা না গেলে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে।

রাজধানীতে বাসের প্রতিযোগিতায় প্রাণ-হারানোর ঘটনা নতুন নয়। এ নিয়ে আগেও অনেক হাঙ্গামা হয়েছে। গত সোমবার (২৯ নভেম্বর) আবারও এক শিক্ষার্থী প্রাণ হারান। রামপুরায় অনাবিল পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় নিহত মাঈনুদ্দীন ইসলাম নামের ওই শিক্ষার্থী বাসায় ফিরছিলেন।

এই প্রতিযোগিতায় যে শুধু যাত্রী বা পথচারীরাই নিহত হয় তা নয়, বাসের হেলপারও নিহত হয়েছে। ৯ ফেব্রুয়ারি উত্তরা থেকে পোস্তগোলাগামী রাইদা পরিবহনের দুটি বাসের প্রতিযোগিতায় এক হেলপার নিহত হয়। আগে গিয়ে যাত্রী ওঠানোর জন্যই এমন প্রতিযোগিতা।

ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনার ওপর আপাতদৃষ্টিতে কারো নিয়ন্ত্রণ নেই। যে যেভাবে পারছে গাড়ি চালাচ্ছে। সড়কের অন্তত তিনভাগের একভাগ বাজারের দখলে। কুড়িল থেকে শুরু করে মালিবাগ-গুলিস্তান পর্যন্ত অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সড়কের অংশ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। যেখানে-সেখানে গাড়ি থামিয়ে রাখা হয়। মূলত, সড়কের এক লেন দিয়েই গাড়ি চলাচল করে। অন্য লেনে যাত্রী ওঠানো ও নামানো হয়; ওই একই লেনে রিকশাও চলে। ওদিকে প্রথম লেনটি বাজারের দখলে, যেখানে আবার যাত্রীরা বাসের জন্য অপেক্ষা করে। কমবেশি সব সড়কে একই অবস্থা। এই অনিয়মের মাঝেই যতটুকু নিয়ম করে চলা যায় যাত্রীরা চলাচল করছে।

বাসভাড়া বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা তাদের জন্য হাফ ভাড়ার দাবি করলেও এক সময় এদেশের গণপরিবহনে তারা হাফ ভাড়াই দিত। পরিচয়পত্র দেখে হাফ ভাড়া কার্যকর হতো। মালিকপক্ষের কারসাজিতে বাসে সিটিং সার্ভিস চালু হয়। এর মাধ্যমে হাফ ভাড়া দেয়ার প্রথাও বাতিল হয়ে যায়। বিশ্বের অনেক দেশে এখনও শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়া প্রচলিত আছে।

হাফ ভাড়ার এই দাবিটি যৌক্তিক হলেও কেন শিক্ষার্থীদের এখনও পড়ার টেবিল ছেড়ে রাস্তায় নেমে আন্দোলন করতে হচ্ছে সেটাই প্রশ্ন। পাকিস্তান আমলের দাবি নিয়ে এদেশে এখনও মাঠে আন্দোলন করতে হচ্ছে এটি লজ্জাজনক নয়? ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক ১১ দফার মধ্যেও শিক্ষার্থীদের বাসভাড়া অর্ধেক করার দাবি ছিল। দফা ১-এর (ঢ) উপদফায় বলা ছিল- “ট্রেনে, স্টিমারে ও লঞ্চে ছাত্রদের ‘আইডেন্টিটি কার্ড’ দেখাইয়া শতকরা পঞ্চাশ ভাগ ‘কন্সেসনে’ টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মাসিক টিকিটেও ‘কন্সেসন’ দিতে হইবে। পশ্চিম পাকিস্তানের মত বাসে ১০ পয়সা ভাড়ায় শহরের যেকোনো স্থানে যাতায়াতের ব্যবস্থা করিতে হইবে। দূরবর্তী অঞ্চলে বাস যাতায়াতেও শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেসন’ দিতে হইবে। ছাত্রীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াতের জন্য পর্যাপ্ত বাসের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সরকারি ও আধাসরকারি উদ্যোগে আয়োজিত খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছাত্রদের শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেসন’ দিতে হইবে।”

প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকার বাইরে শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়া কেন দেবে না? এ কেমন বৈষম্য? ঢাকার বাইরে বাস ভাড়া কি কম? নাকি সেখানকার শিক্ষার্থীরা অনেক টাকার মালিক? কাজেই, ঢাকার বাইরেও হাফ ভাড়া মেনে নেয়া যুক্তিযুক্ত। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও যেন শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবি মেনে নিতে গড়িমসি করা না হয়।

ওই ১১ দফার মধ্যে আরও একটি বিষয় উল্লেখ্য। তা হচ্ছে- দূরবর্তী অঞ্চলেও বাসে যাতায়াতের জন্য শতকরা ৫০ ভাগ ‘কন্সেসন’ চাওয়া হয়। ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমলে এদেশের শিক্ষার্থীরা যে দাবি করতে পেরেছিল, স্বাধীনতার ৫০ বছর পরে এসেও সেটি দাবি করার সাহসও পাচ্ছে না। তাই তারা কেবল ঢাকায় বা ঢাকার বাইরে যাতে হাফ ভাড়ার ‍সুযোগ দেয়া হয় সে দাবিই করে যাচ্ছে।

আমাদের ছেলে-মেয়েরা ঢাকা না ঢাকার বাইরে তা নিয়েই দিনের পর দিন রাস্তায় বসে আছে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তাদের বাহাসও করতে হচ্ছে।

কাজেই, ছাত্রদের ন্যায়সংগত দাবি পূরণে সবার এগিয়ে আসা প্রয়োজন। হাফ ভাড়ার বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও তা কার্যকর করাও জরুরি। সেই সঙ্গে শৃঙ্খলা আনতে হবে গণপরিবহন ও সড়ক ব্যবস্থাপনায়।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন

রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের পাঁচ দশক

রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি অর্জনের পাঁচ দশক

চীনের পক্ষ থেকে ১৯৭১-এ জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে বলা হচ্ছিল- ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে নিজের দখলে নিতে চায়। বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। কারণ বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা চেয়েছে এবং ভারত এ আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। কেন ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এ বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধী ৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট বলেছিলেন- `বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের পেছনে জনগণের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই স্বাধীনতার পেছনে সে দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন আমরা দেখি।'

বাংলাদেশকে কূটনৈতিক স্বীকৃতি প্রদান এবং এই ভূখণ্ডে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার চূড়ান্ত অভিযানে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত প্রকাশকালে ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর সে সময়ের ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। তা হলো- ‘আমরা কোনো দেশের ভূখণ্ড দখলে নিতে চাই না’।

মার্কিন গবেষক-লেখক গ্যারি জে ব্যস ‘দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম’ গ্রন্থে লিখেছেন-

‘ভারতের স্বীকৃতির গুরুত্ব কেবল ক্ষমতার শূন্যতা পূরণ কিংবা মুক্ত ভূখণ্ডে বিশৃঙ্খলারোধ অথবা আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা তুলে দেয়ার মধ্যে সীমিত করে দেখলে চলে না। মুক্তি বাহিনীর সঙ্গে যৌথ কমান্ড গঠন করে বাংলাদেশ ভূখণ্ড পাকিস্তানি হানাদারের কবল থেকে মুক্ত করার অভিযান শুরুর সঙ্গে সঙ্গে ভারতের উচ্চপর্যায় থেকে বারবার বলা হয়- এই স্বীকৃতির মাধ্যমে একটি বার্তা স্পষ্ট করে দেয়া হয়েছে; আমরা ভারতের ভূখণ্ডের সঙ্গে নতুন কোনো ভূখণ্ড যুক্ত করতে চাই না কিংবা কোনো ভূখণ্ড দখলও করতে চাই না।’ (দ্য ব্লাড টেলিগ্রাম, পৃষ্ঠা ২৮২)

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের কথা স্মরণ করা যেতে পারে। যুদ্ধ অবসানের ৭৬ বছর পরও জার্মানি ও জাপানে আমেরিকান সৈন্য রয়ে গেছে। ভারতীয় সৈন্যরা বাংলাদেশে ১৯৭১-এর ডিসেম্বরে মুক্তিদাতা হিসেবে প্রবেশ করেছিল, বিজয়ী শক্তি হিসেবে নয়। দুটি সার্বভৌম রাষ্ট্র মিলিতভাবে গঠন করেছিল যৌথ বাহিনী।

এ কারণেই ১৯৭২-এর ১৭ মার্চ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর বাংলাদেশ সফরের এক সপ্তাহ আগেই সব ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশের মাটি ত্যাগ করে। অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপ ও এশিয়ায় এটা করেনি বা করতে চায়নি। কারণ- 'In Germany and in Japan, the Americans who came into their countries did not arrive as liberators but as conquerors'.

চীনের পক্ষ থেকে ১৯৭১-এ জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক ফোরামে বলা হচ্ছিল- ভারত পূর্ব পাকিস্তানকে নিজের দখলে নিতে চায়। বাস্তবে এমনটি ঘটেনি। কারণ বাংলাদেশের জনগণ স্বাধীনতা চেয়েছে এবং ভারত এ আকাঙ্ক্ষার প্রতি সম্মান দেখিয়েছে। কেন ভারত বাংলাদেশকে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিচ্ছে, এ বিষয়ে ইন্দিরা গান্ধী ৬ ডিসেম্বর ভারতের পার্লামেন্ট বলেছিলেন- ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের পেছনে জনগণের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে এই স্বাধীনতার পেছনে সে দেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ প্রতিফলন আমরা দেখি।’

দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক সম্পর্কের পাঁচ দশক পূর্ণ হওয়ার দিন ৬ ডিসেম্বর। অনেকেই বলেন, রক্তের বন্ধন দুই দেশের সম্পর্কের মূল ভিত্তি। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত করতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সৈন্য প্রাণ দিয়েছে। অনেকে আহত হয়েছে। সে সময় পশ্চিম পাকিস্তানের ভূখণ্ডেও ভারতীয় সৈন্যদের লড়াই করতে হয়েছে। এর কারণও ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতি ভারতের সমর্থন।

২৫ মার্চ গণহত্যা অভিযান শুরুর পর ভারত সরকার ও জনগণ যদি বাংলাদেশের পাশে না দাঁড়াত, তা হলে আরও কত বাঙালিকে প্রাণ দিতে হতো, ভাবতেও শিউরে উঠতে হয়। পাকিস্তানি শাসকরা মানুষের জীবন-সম্পদ কোনোকিছু বিবেচনা করেনি। এই বর্বরগুলো কসাই হিসেবে পরিচিত টিক্কা খানকে কেবল গভর্নর ও সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবেই নিয়োগ দেয়নি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর পদেও বসিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১-এর ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকেই গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার বিভিন্ন রাষ্ট্রের স্বীকৃতি আদায়ে সচেষ্ট হয়। কিন্তু প্রথম স্বীকৃতি আসে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর কবল থেকে বাংলাদেশ মুক্ত হওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে- ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর। ভারত ও ভুটান কাছাকাছি সময়ে বাংলাদেশকে স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে।

ততদিনে বাংলাদেশ ভূখণ্ডের বেশির ভাগ মুক্ত। বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১-এর ১৭ এপ্রিল শপথ নিয়েছিল। কিন্তু ভারত ও ভুটান ছাড়া কোনো দেশই ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশে পাকিস্তানি সৈন্যরা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আগে স্বীকৃতি দেয়নি। রাশিয়া স্বীকৃতি দিয়েছিল ১৯৭২-এর জানুয়ারিতে, ব্রিটেন ফেব্রুয়ারি এবং যুক্তরাষ্ট্র এপ্রিলে। চীন ও সৌদি আরবের স্বীকৃতি মিলেছিল ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নৃশংসভাবে হত্যার মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতায় পরিবর্তন ঘটার পর।

অনেকেই তর্কে মাতেন- ভারত না ভুটান কে আগে স্বীকৃতি দিয়েছিল? মনে রাখতে হবে, ভারত তখনও বড় শক্তি। মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়িয়েছিল সর্বশক্তি দিয়ে। বাংলাদেশ থেকে যাওয়া এক কোটি উদ্বাস্তু মানুষকে আশ্রয় দিয়েছিল। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি অস্ত্র-সহায়তা করেছিল। রণাঙ্গনে বিপুলসংখ্যক ভারতীয় সৈন্য হতাহত হয়। বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য ইন্দিরা গান্ধী ও অন্য নেতারা বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক অভিযান পরিচালনা করেছিল। তাদের স্বীকৃতির ফলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের নিরাপত্তা জোরদার হয়েছে।

ভারত বিবেচনায় নিয়েছিল- বাংলাদেশ রাষ্ট্র একটি বাস্তব সত্ত্বা। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের নিয়ন্ত্রণ প্রায় সমগ্র ভূখণ্ডে। ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে জনগণ বঙ্গবন্ধুর প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন জানিয়েছিল। এটাও ভারতের বিচেনায় ছিল যে, বাংলাদেশি নেতৃত্ব পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই স্বাধীনতা সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিল। ২৫ মার্চ ভয়ঙ্কর গণহত্যা শুরুর দুই সপ্তাহের মধ্যে সরকার গঠিত হয় এবং তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই বাংলাদেশ ভূখণ্ডে শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা এবং জাতীয় সংগীতও ছিল পূর্বনির্ধারিত।

বাংলাদেশের সংগ্রাম ছিল গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ। কিন্তু ২৫ মার্চ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গণহত্যা শুরু করলে তাৎক্ষণিক তা সশস্ত্র সংগ্রামে পরিণত হয়। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশনা অনুযায়ী জনগণ ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা’ করতে শুরু করে। অল্প সময়ের মধ্যেই লাখো তরুণ মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয় এবং প্রশিক্ষণ শেষে সশস্ত্র যোদ্ধা হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ সরকার মাত্র দুই মাসের মধ্যেই পূর্ণাঙ্গ বেতার কেন্দ্র- স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র গড়ে তুলতে পারে, যার শিল্পী-কলাকুশলী সবাই ছিল বাংলাদেশের নাগরিক।

বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য স্পষ্ট করতে পারে। কলকাতা, দিল্লি ও লন্ডনে বাংলাদেশের কূটনীতিকরা বিশ্বজনমত পক্ষে আনায় কার্যকর ভূমিকা রাখেন। এমনকি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ অধিবেশনেও বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল উপস্থিত হয়ে প্রচার চালায়।

রণাঙ্গনে সর্বোচ্চ মাত্রায় সক্রিয় থেকেও বাংলাদেশ সরকার মুক্ত ভূখণ্ডে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখায় সক্রিয় ছিল। এ সময় পরিকল্পনা সেল গঠিত হয়, যার সদস্যরা স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ হাতে নিয়েছিলেন।

আমরা জানি- For any state to enjoy the rights, duties and obligations of international law and to be a member of the international community, recognition of the entity as a state is very important. Only after recognition of the entity as a state, it becomes acknowledged by other states who are a member of the International Community.

ভারত যখন বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পদান করে, তার কদিনের মধ্যে সে সময়ের বিশ্বের প্রবল ক্ষমতাধর রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের পক্ষে পারমাণবিক অস্ত্রসহ সপ্তম নৌবহর প্রেরণ করে। এ নৌবহর চট্টগ্রামের কাছে চলে এসেছিল- যাদের বোমারু বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও কামানের পাল্লায় ছিল বাংলাদেশ ভূখণ্ড। চীনও পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে ভারতীয় ভূখণ্ডে সামরিক অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু ১৯৭১-এর আগস্টে ভারত ও রাশিয়ার মধ্যে যে মৈত্রী চুক্তি হয়, তার শর্ত অনুসারে এক দেশ তৃতীয় কোনো দেশের সামরিক আক্রমণের শিকার হলে পরস্পরের পাশে দাঁড়ানোর অঙ্গীকার ছিল।

যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর কিংবা চীনা সৈন্য সামরিক অভিযান চালালে সে সময়ের বড় শক্তি রাশিয়ার সমর্থন ভারত পেত। বাংলাদেশকে পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করার অভিযানে ভারত-রাশিয়া চুক্তির সুফল বাংলাদেশ ভোগ করেছে।

প্রতিবেশীদের মধ্যে অনেক সমস্যা থাকে। চীনের সঙ্গে দেশটির প্রায় সব প্রতিবেশীর স্থল বা সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ আছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মেক্সিকোর বিরোধ আছে। রাশিয়ার সঙ্গে ইউক্রেনের বিরোধ আছে। ইরান-ইরাক যুদ্ধ করেছে। সৌদি আরব-ইয়েমেন বিরোধে জড়িয়ে আছে। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যেও বিরোধের ইস্যু রয়েছে। কিন্তু পাঁচ দশকের কূটনৈতিক সম্পর্কে ইতিহাসে দুটি দেশ অনেক সমস্যার সমাধান করতে পেরেছে শান্তিপূর্ণ উপায়ে।

সীমান্ত কিংবা সমুদ্রসীমা নিয়ে জট কেটেছে। অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার হচ্ছে। চীন থেকে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি পণ্য আমদনি করে। এর পরই রয়েছে ভারত। কিন্তু চীনে বাংলাদেশ যত পণ্য রপ্তানি করে, এর চেয়ে বেশি করে ভারতে। পদ্মা সেতু চালু হলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়বে। চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দরকেন্দ্রিক সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাচ্ছে। একসময় কেবল উন্নত দেশগুলোর কাছে বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ বিনিয়োগপ্রত্যাশী ছিল। এখন ভারতীয় বিনিয়োগও সম্ভাবনাময়। বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরাও ভারতকে পুঁজি খাটানোর জন্য বিবেচনা করছে। বাংলাদেশ ও ভারত একাত্তরের চেতনার পথ ধরে চলতে থাকলে বন্ধন জোরদার হবে, সন্দেহ নেই। এ পথে বাধা এলে সেটা অপসারণের পথও ওই একাত্তরের চেতনা।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
রোহিঙ্গা সংকট নিরসন না হলে অর্জন হবে শূন্য
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে পাশে থাকবে অস্ট্রেলিয়া
ভাসানচর থেকে পালাতে গিয়ে শিশুসহ ৩ রোহিঙ্গা নারী আটক
পিটিয়ে হত্যা করা সেই ‘আরসা নেতার’ মরদেহ কোথায়
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ‘আরসা নেতা’ হাশিমের মরদেহ

শেয়ার করুন