শ্রমিকের জীবন কি এতই ঠুনকো

শ্রমিকের জীবন কি এতই ঠুনকো

এমনিতেই করোনাকালে সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার ওপর বিদেশফেরত বেকার শ্রমিকরা চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের নিয়ে না ভাবলে আগামীতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশফেরত শ্রমিকদের তিনি কর্মসংস্থান ও নগদ সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহৎ ও সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চয়ই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য সুসংবাদ।

যাদের শ্রম-ঘাম-রক্তে বড় অর্থনীতির ভিত রচিত হয়, বদলে গিয়ে ভাবমূর্তি বেড়ে যায় দেশের, সেই শ্রমিকদেরই কোনো দাম নেই যেন আমাদের কাছে। জলের দামেই বিক্রি হয় তাদের শ্রম-ঘাম-জীবন। নিয়োগকারী মালিকদের অবহেলা কিংবা দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু হলে পশুর দামের চেয়েও কম ধরা হয় তাদের লাশের দাম। অথচ যারা দেশকে লুটেপুটে খাওয়ার উৎসব করে দাম তাদেরই বেশি। দামি তারাই যারা ব্যাংক লুট করে ঋণখেলাপি হন, শেয়ারবাজার কেলেংকারিতে জড়িত থেকেও অর্থনীতির নায়ক হয়ে ওঠেন, দেশের অর্থপাচার করে বিদেশে সুরম্য বাড়ি বানান।

তারাই সম্মানিত যারা ক্ষমতার জোরে খুন-ধর্ষণ করে পার পেয়ে যান, সুইসব্যাংকে অর্থের পাহাড় গড়েন। এসব ‘দামি’ লোকদেরই সর্বত্র ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশে শোষিত-নিপীড়িতদেরই দাম পাওয়ার কথা ছিল। তাদেরই স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল জাতির অগ্রনায়ক, উন্নয়নের কারিগর হিসেবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সস্তা শ্রমের বাংলাদেশে শ্রমিকদের শ্রম-ঘাম শোষণ করেই যে আমরা উন্নয়নশীল থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি এটা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তৈরি পোশাকখাত, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং কৃষিখাতের শ্রমিকদের শ্রমের ওপর ভর করেই যে দেশে আজ প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু সম্পদের স্ফীতি- সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাদের শ্রম শোষণ করেই গড়ে উঠছে আমাদের এই চোখ ধাঁধানো নগরগুলো। অথচ সেই শ্রমিকদেরই জীবনই সুতোয় বাঁধা, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি তাদের নেই। জীবন যেন তাদের জল নিংড়ে নেয়া কাপড়ের মতোই।

অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন শ্রমিকরাই। সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হতে হয়েছে প্রান্তিক মানুষদের। ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অবৈধপথে রাতারাতি ভাগ্য বদলে ফেলেছেন দেশের সবচেয়ে লোভী ও স্বার্থপররা। হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া লোকের সংখ্যাও বেড়েছে হু হু করে। শহরে শহরে তৈরি হয়েছে বিশাল চোখ ঝলসানো অট্টালিকাও।

গেল প্রায় দেড় দশকেই দেশে বিস্ময়করভাবে জন্ম হয়েছে অর্ধসহস্রাধিক নতুন ধনকুবের। শ্রমিকের শ্রম-ঘামে তিলোত্তমা হিসেবে গড়ে ওঠা শহরগুলোতে ভোগের উপচেপড়া পেয়ালায় চুমুক দিয়ে যাচ্ছেন নব্যধনীরা। অথচ গেল পঞ্চাশ বছরেও ভাগ্যের বদল হয়নি উন্নয়নের কারিগরদের। কেননা, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তাদের শ্রম-ঘামের অর্থ লুটে-পুটে খাচ্ছেন নব্যধনী, শিল্পপতি, ঋণখেলাপি, বেপরোয়া আমলা থেকে পাতি নেতা পর্যন্ত। শ্রমিকদের ভাগ্য যেন বানরের সেই পিঠা ভাগের গল্পের মতোই রয়ে গেল।

বাজারে প্রতিনিয়ত চাল-ডাল-নুন-তেলের দাম বাড়লেও শ্রমিকের শ্রমের দামের পারদ কিছুতেই ঊর্ধ্বমুখী হয় না। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জলের দামের শ্রমেই কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে দেশে, হু হু করে বাড়ে প্রবৃদ্ধি। প্রতিবছর বাজেটের আকারও দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়ে। অথচ শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই শিল্পপতি কিংবা সরকারের। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়া শ্রমিকদের জায়গা সমাজের সবচেয়ে পেছনের সারিতে। তাদের শ্রম-ঘামের উৎকট গন্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকেন শিল্পপতিরা। পথে-ঘাটে যেতে আসতে যে কেউ-ই যেন অধিকার রাখেন নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ করার! ভবঘুরে কিংবা বখাটেদের নিত্যদিনের হয়রানি, যৌননিপীড়নের শিকার হতে হয় তাদের। আবার বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ে পথে নামলেই পুলিশের লাঠিপেটা নির্ধারণ করা থাকে তাদের জন্য। তারা যে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জ্বালানি সে কথা আমাদের আচরণে প্রকাশই পায় না।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পরিবার বা স্বজনরা ঠিকঠাকমতো সরকারঘোষিত সহায়তা পেয়েছে কি না, দায়ীদের বিরুদ্ধে আর কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সর্বস্ব হারানোদের পরিণতি কী- এসব নিয়ে আমাদের আর ভাববার সময় নেই। শ্রমিকরাও দেয়ালে কপাল ঠুকে মালিকদের অবহেলাকে ভাগ্য বলেই মেনে নেয়। গণমাধ্যমও নতুন কোনো খবর কিংবা ঘটনার টানে দৃষ্টিরাখে অন্যখানে। গেল দশ বছরে তাজরিন, রানাপ্লাজা, নিমতলী ট্রাজেডিতে যে সংখ্যক শ্রমিক লাশে পরিণত হয়েছে তার দ্বিগুণ হয়েছে গেল এক বছরে চুড়িহাট্টা, এফআর টাওয়ার, কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানা আর গাজীপুরের ফ্যানের কারখানার অগ্নিকাণ্ডে। শ্রমিকদের জীবনের দাম দিতে জানলে এই পরিসংখ্যান পেতে হতো না আমাদের। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে কারখানায় মালিকদের গিনিপিগে পরিণত হয়েছে শ্রমিকরা। এসব অবহেলা, উদাসীনতা, অপরাধ আর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলতে শ্রমিকরা রাস্তায় নামলেই পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আবারও গিনিপিগ হিসেবে ঠাঁই তাদের সেই কারাখানাতেই।

এভাবেই শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে রেখে বছর বছর কারখানার উন্নতি হয়, শাখা বাড়ে, উৎপাদন বাড়ে, রপ্তানি বাড়ে, মালিকদের বিলাসিতা বাড়ে, প্রবৃদ্ধি বাড়ে, সরকারের ভাবমূর্তি বাড়ে। শুধুই আটকে থাকে শ্রমিকের শ্রমের দাম। হাড়ভাঙা খাটুনিতে ভেঙে যায় শরীর, শিকার হতে হয় অপুষ্টির। এক পর্যায়ে দক্ষতাও কমতে থাকে। শেষ অবধি অদক্ষ হিসেবে চাকরিচ্যুতিও ঘটে। এটাই আমাদের জাতির কারিগর শ্রমিকদের জীবনের প্রকৃতচিত্র।

যে চিত্র মধ্যযুগকেও হার মানায়। যা দেখে আঁতকে ওঠেন বিদেশি ক্রেতারা। মজুরি বাড়ানোসহ কর্মপরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়ে যান তারা। মালিকরা ‘জি জি’ বলে রপ্তানি আদেশ বাড়িয়ে নেন। ক্রেতাদের চাপ বা অনুরোধে কারখানার কর্মপরিবেশের দৃশ্যমান কিছু উন্নতি হলেও শ্রমিকদের মজুরি আর বাড়ে না, পাল্টায় না জীবনমান, বাড়ে না জীবনের দাম। সরকারও ব্যস্ত থাকে প্রবৃদ্ধি নিয়ে।

বিভিন্ন কলকারাখানায় নিয়োজিত স্থায়ী শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকেদের পাশাপাশি দিনমজুর বা মৌসুমী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজ পেলে খাওয়া, না পেলে উপোস- এমন নীতিতেই চলে তাদের জীবন। করোনা বিপর্যয়ে এসব শ্রমিকের জীবন অনিশ্চিত অন্ধকারে ঢেকে গেছে। মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। অনেকেই জীবিকার সন্ধানে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পথে নেমে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

অস্থায়ী শ্রমভিত্তিক এসব শ্রমিকের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানই নেই সরকারের কাছে। তথ্যভাণ্ডারের অভাবেই সরকারি সহায়তাও পৌঁছাচ্ছে না অনেকের কাছে। বেওয়ারিশ লাশের মতোই এদের জীবন হয়ে পড়েছে। একইভাবে বলা যায়, পোশাক খাতের মালিকরা সরকারি সহায়তা পেয়ে যেভাবে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিচ্ছেন শ্রমিকরা কি সেই সুফল পাচ্ছেন? এটা ভাবা জরুরি।

অপরদিকে, করোনা মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও দফায় দফায় প্রবাসী আয়ের রেকর্ডের বন্যা বইয়ে দেয়া প্রবাসী শ্রমিকদেরও দাম নেই আমাদের কাছে। টাকা বানানোর মেশিন ছাড়া তাদের আর কিছুই ভাবতে পারি না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা বছরের পর বছর বিস্ময়কর রেমিট্যান্সের জোগান দেন। অথচ সমাজে তো বটেই জাতীয় জীবনেও তারা অবহেলার শিকার। ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার সময়ই তাদের অনেকে দালাল কিংবা আদম ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারায়। বিমানবন্দরে নাজেহাল হওয়াসহ বিদেশে গিয়েও প্রতারণার শিকার হতে হয়। করোনাকালে দেশে ফিরে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখার সময়ে অপ্রীতিকর এক ঘটনার সময় রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের প্রতিক্রিয়া তাদের প্রতি সীমাহীন অবহেলারই প্রমাণ।

তথ্যমতে, করোনা মহামারি দুর্যোগে বিদেশে কাজ হারিয়ে দেড় বছরে দেশে ফিরেছেন পাঁচ লাখের বেশি শ্রমিক। বিদেশে সঞ্চিত সব সম্বল নিয়েই তারা ফিরে এসেছেন। এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স-প্রবাহ ফুলে ফেঁপে বার বার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তবে তারা কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে কী করছেন, সঞ্চয় শেষে তারা কীভাবে চলবেন, পরিবারকে কীভাবে সামাল দেবেন তা নিয়ে আমাদের কারো মাথাব্যথা নেই। এমনিতেই করোনাকালে সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার ওপর বিদেশফেরত বেকার শ্রমিকরা চাপ বাড়াচ্ছে।

তাদের নিয়ে না ভাবলে আগামীতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশফেরত শ্রমিকদের তিনি কর্মসংস্থান ও নগদ সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহৎ ও সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চয়ই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য সুসংবাদ। তবে কথা হলো, শ্রমিক বা অসহায়দের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যার মন যেভাবে কাঁদে সেভাবে কি আমলা ও নেতাদের মন সাড়া দেয়? যদি শ্রমিকদের সহায়তা মাঝপথেই নাই হয়ে যায়! যেমনটি ঘটেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেলায়!

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু

বাইরে করোনা ঘরে ডেঙ্গু

ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে না, আরও বহু দেশেই হচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর হওয়া সরকারের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা বা অপরাধ হলো তার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, তা না করা। গত বছরই বিভিন্ন সংস্থা থেকে এডিস মশা বৃদ্ধির ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আসলে দেশের মানুষের জীবন ও দুর্ভোগ নিয়ে দায়িত্ববোধ বা জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি এ রকম হতো না। এ ব্যাপারে সরকার ও সিটি করপোরেশনকে গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে হবে।

করোনাভাইরাসের আতঙ্কের মধ্যেই দেশজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা। দেশে গত মাসের প্রথম ১৫ দিনের চেয়ে চলতি মাসের প্রথম ১৫ দিনে বেশি ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। আগস্ট মাসের প্রথম ১৫ দিনে ডেঙ্গু শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজার ৮৪৯ জন। আর চলতি সেপ্টেম্বর মাসে একই সময়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৪৭৫ জন।

ডেঙ্গুতে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশুরা৷ ইতোমধ্যে ৪০টিরও বেশি জেলায় ছড়িয়েছে এর সংক্রমণ। ডেঙ্গু চিকিৎসা নিয়ে বিশেষভাবে চিন্তিত হয়ে উঠেছে নগরবাসী। ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন স্বজনেরা। প্রচণ্ড জ্বর, বমি, গা ব্যথা এবং কারো কারো ক্ষেত্রে হাতে-পায়ে ফুসকুড়ি কিংবা র‌্যাশ ভোগান্তি বাড়াচ্ছে। হেমোরেজিক ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর জন্য প্রায় প্রতিদিনই রক্তের খোঁজে ছুটছেন স্বজনরা। ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে কীভাবে দূরে থাকা যায়, কী করে সহজে প্রতিকার পেতে পারেন আক্রান্তরা— এ নিয়ে অনেকেই চিন্তিত ও দিশেহারা হয়ে পড়ছেন।

ডেঙ্গু বাংলাদেশে নতুন কোনো রোগ নয়। স্বাধীনতার আগে থেকে এই রোগের সংক্রমণ ছিল। তবে ২০০০ সাল থেকে মূলত সরকারিভাবে রোগটিকে আমলে নেয়া হয়। দুই দশক ধরে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ, রোগী ব্যবস্থাপনা ও এডিস মশা নির্মূলকরণে কাজ করছে সরকার। কিন্তু তাতে কোনো ফল মিলছে না। প্রতিবছরই ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়ে ফিরে আসছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ভূমিকা মোটেও সন্তোষজনক নয়।

প্রথম থেকেই সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে বলা হচ্ছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। রোগীর সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা কমিয়ে বলা সরকারের অন্যতম তৎপরতা। এর বাইরে মাঝে মাঝে মূল সড়কে ফগার মেশিন নিয়ে সিটি করপোরেশনের কর্মীদের মহড়া ছাড়া তেমন কোনো তৎপরতা চোখে পড়েনি।

করোনা নিয়ে অধিক ব্যস্ত থাকায় এ বছর ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে তেমন একটা গুরুত্ব দেয়া হয়নি। এর ফলে এখন ডেঙ্গু করোনার চেয়ে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অথচ হাসপাতালগুলোতে ঠিকমতো চিকিৎসা মিলছে না। এর দায়ভাগ সরকারেরও আছে।

সরকার সঠিক সময়ে উপযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্রমাগত ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে চলছে। যে সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করা হয়, সেটাও কার্যকর করতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষের জীবন চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছে। ঢাকা শহরে এখন চরম মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বসবাস করতে হচ্ছে।

দেশে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় রাজধানী ও এর আশপাশের ছয়টি হাসপাতালকে ডেডিকেটেড ঘোষণা করা হয় গত ২৩ আগস্ট। এই হাসপাতালগুলো হচ্ছে, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, টঙ্গীর শহীদ আহসানউল্লাহ মাস্টার জেনারেল হাসপাতাল, কমলাপুর রেলওয়ে জেনারেল হাসপাতাল, ২০ শয্যার আমিনবাজার সরকারি হাসপাতাল, মিরপুরের লালকুঠি হাসপাতাল ও কামরাঙ্গীরচর ৩১ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল। শেষ খবর পাওয়া পর‌্যন্ত কিন্তু এই হাসপাতালগুলো এখনও ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য উপযুক্ত করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এসব হাসপাতালে শুরু হয়নি ডেঙ্গুর চিকিৎসা। তা ছাড়া রয়েছে জনবলেরও সংকট। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ রোগীরা।

প্রস্তুতি না থাকার পাশাপাশি যেসব হাসপাতালকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড করা হয়েছে, এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রচার চোখে পড়ছে না। ফলে এসব হাসপাতাল সম্পর্কে জানেন না অনেকে। তা ছাড়া এসব হাসপাতালে চিকিৎসার অনেক প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতিও নেই। গুরুতর অসুস্থদের এসব হাসপাতালে চিকিৎসার সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

এদিকে এবার ডেঙ্গু ভয়াবহ রূপ নিয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। চিকিৎসকরা বলছেন, এ বছর ডেঙ্গু আক্রান্তদের ৩ থেকে ৪ দিনের মধ্যে ব্লাড প্রেশার কমছে, পেট ও বুকে পানি চলে আসছে, শকে চলে যাচ্ছে, রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এবার মশাবাহিত এই ভাইরাস সংক্রমণে গুরুতর অসুস্থতার হারও বেড়েছে। আগে যেখানে শকে যাওয়া শিশুদের মধ্যে ৫ থেকে ১০ শতাংশের মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রে জটিলতা হতো, এবার সেই হার ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

অথচ এ বছরই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকার ও সিটি করপোরেশনের প্রস্তুতি সবচেয়ে কম। যদিও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ওষুধ ছিটানো এবং সচেতনতা বৃদ্ধির মতো নানা পদক্ষেপ গ্রহণের কথা বলছে। কিন্তু সেসবের কার্যকারিতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে মশা মারার ওষুধ আনা এবং বিতরণ নিয়ে নানা রকম সমালোচনাও রয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, মশার ওষুধ ছিটানো হয় কেবল প্রধান সড়কের আশপাশে। কিন্তু বিভিন্ন গলি, দুই বাসার ফাঁক-ফোঁকর, আরও নানা ধরনের দুর্গম স্থানে যেখানে ওষুধ ছিটানোর দায়িত্বে থাকা কর্মীরা সহজে পৌঁছতে পারেন না, সেখানে নিরাপদে এডিস মশা বংশ বৃদ্ধি করতে থাকে।

সিটি করপোরেশন সঠিক সময়ে কার্যকর উদ্যোগ না নেয়ায় ও উপযুক্ত কীটনাশক ব্যবহার না করায় ঢাকায় ভয়াবহ আকারে ডেঙ্গু বাড়ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজন অ্যাডাল্ট মশা মারা। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কোনো হাত নেই। এই কাজটি অবশ্যই সিটি করপোরেশনকেই করতে হবে। কিন্তু তারা সেই কাজটি দক্ষতার সঙ্গে করতে পারছে না।

সিটি করপোরেশন যে ফগিং করে সেটি ত্রুটিপূর্ণ। তাছাড়া তাদের লোকবল ও কর্মীদের দক্ষতা নিয়েও সন্দেহ আছে। তাদের অধিকাংশ কাজ ত্রুটিপূর্ণ। সিটি করপোরেশনের নিজস্ব কোনো কীটতত্ত্ববিদ নেই। দেশের যারা স্বীকৃত কীটতত্ত্ববিদ আছেন, তাদের পরামর্শও শোনা হয় না।

সরকারের দিক থেকে পরিকল্পিত উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। কারণ এডিস মশা তাৎক্ষণিককভাবে নির্মূলকরণের ব্যাপার নয়। সারা বছর ধরে এডিসের বিরুদ্ধে কাজ করতে হয়। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গুর প্রকোপ থাকা সত্ত্বেও আমাদের দেশে পরিকল্পিত দীর্ঘমেয়াদি কোনো গ্রহণ করতে দেখা যায় না।

কীটনাশক প্রয়োগ এবং ডেঙ্গু ঠেকাতে নাগরিকদের যুক্ত করার ক্ষেত্রেও কোনো উদ্যোগ নেই। বিশেষ করে স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে পাড়ায় পাড়ায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা কমিটি গঠনের কাজটি একেবারেই করা হচ্ছে না। এ ক্ষেত্রে কাউন্সিলরদেরও কাজে লাগানো হচ্ছে না।

এই কাজে রাজনৈতিক দলের কর্মীদেরও ব্যবহার করা যেতে পারে। ক্ষমতাসীন দল এ ব্যাপারে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে। রাজনৈতিক দলের কর্মীরা কেবল চাঁদাবাজি করবে, ক্ষমতার দাপট দেখাবে, দলের নেতানেত্রীদের নামে স্লোগান দেবে, দেশের মানুষের কল্যাণের কথা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলবে, আর বাস্তবে আত্মকেন্দ্রিক একটা মানুষ হিসেবে গড়ে উঠবে, তা হয় না। এ জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর অঙ্গীকার প্রয়োজন।বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের। ঢাকা শহরের প্রত্যেক পাড়া-মহল্লায় আওয়ামী লীগের কমিটি আছে।

এই কমিটিকে এলাকার পরিচ্ছন্নতা অভিযানে যুক্ত করা যেতে পারে। যারা নিজি এলাকায় এডিস মশার বংশ ধ্বংস করার জন্য সপ্তাহে অন্তত একদিন হলেও অভিযান পরিচালনা করবেন। কোনো এলাকায় কোনো ডেঙ্গু রোগী পাওয়া গেলে সেই এলাকায় কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থেকে ডেঙ্গু মশার প্রজননস্থল খুঁজে বের করে সেটা ধ্বংস করার অভিযানে নেতৃত্ব দেবেন। কেবল সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্ন কর্মীর উপর নির্ভর করে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এর জন্য স্থানীয় নাগরিকদের যুক্ত করতে হবে। তাদের ভূমিকা জোরদার করতে হবে।

ডেঙ্গু শুধু বাংলাদেশে হচ্ছে না, আরও বহু দেশেই হচ্ছে। ডেঙ্গু জ্বর হওয়া সরকারের ব্যর্থতা নয়, ব্যর্থতা বা অপরাধ হলো তার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, তা না করা। গত বছরই বিভিন্ন সংস্থা থেকে এডিস মশা বৃদ্ধির ব্যাপারে সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হয়েছিল, কিন্তু সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আসলে দেশের মানুষের জীবন ও দুর্ভোগ নিয়ে দায়িত্ববোধ বা জবাবদিহির ব্যবস্থা থাকলে পরিস্থিতি এ রকম হতো না। এ ব্যাপারে সরকার ও সিটি করপোরেশনকে গা-ঝাড়া দিয়ে মাঠে নামতে হবে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

পরিবেশগত ব্যবস্থাপনা, অন্য জীব দিয়ে এডিস মশাকে নিয়ন্ত্রণ, কীটনাশক হিসেবে লার্ভি সাইড ও অ্যাডাল্টি সাইডের প্রয়োগ এবং জনগণকে এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্তকরণ౼ এই চারটি পদ্ধতি সারাবছর ধরে বাস্তবায়ন করতে হবে। সিটি করপোরেশন সারা বছর কাজ করলেও এই চারটি বিষয়কে একত্রিত করে সমন্বিত মশক ব্যবস্থাপনার কাজটি করে না। এ ব্যপারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ ও অঙ্গীকার প্রয়োজন।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

চট্টগ্রাম সিআরবি: পাহাড়ের কান্না কেউ শুনবে না? 

চট্টগ্রামে আরও হাসপাতাল দরকার। এবং হাসপাতাল নির্মাণ করতে চাইলে জায়গা অনেক আছে। কিন্তু সিআরবির সবুজ কিংবা বসতি ধ্বংস করে হাসপাতাল কেন? টাকা থাকলে হাসপাতাল অনেক বানানো যাবে, কিন্তু টাকা থাকলেই দ্বিতীয় সিআরবি পাহাড় কি বানানো যাবে? ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি কবিতাটি নীতি নির্ধারকদের অনেকেই পড়েছেন। মাঘ মাসের শীত খুব তীব্র কিন্তু শীতের হাত থেকে বাঁচতে দরিদ্র মানুষের কুটিরে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহানো অন্যায় এবং অমানবিক।

বন্দর নগর, শিল্প নগর, বাণিজ্য নগর হিসেবে চট্টগ্রামকে যেমন সবাই জানে তেমনি জানে পাহাড়, বন, নদী, সমুদ্রের সমন্বয়ে এ এক সুন্দর নগর। বাণিজ্যের আকর্ষণে যেমন মানুষ এসেছে তেমনি সৌন্দর্য দেখতে আসা মানুষের সংখ্যাও নেহাত কম নয়। সেই চট্টগ্রাম মহানগরে শুরু হয়েছে এক অভূতপূর্ব আন্দোলন। বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের মধ্যে ১৮ মার্চ ২০২০ এক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটা হলো হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের। এ খবর প্রকাশের পর থেকেই বিভিন্নভাবে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এর বিরোধিতা করে আন্দোলন দানা বেঁধে উঠছে এবং দিন দিন শক্তিশালী হয়ে উঠছে।

নাগরিকরা একটি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ নির্মাণের বিরোধিতা করছেন। শুনতে কি অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? নিজের এলাকায় হাসপাতাল কে না চায়? আর এই করোনা দুর্যোগে মানুষ হাড়ে হাড়ে বুঝেছে হাসপাতালের প্রয়োজনীয়তা আর দেখেছে চিকিৎসা ব্যবস্থার দুর্বলতা। তাহলে চট্টগ্রামের মানুষের কী হলো? তারা হাসপাতালের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছেন কেন? একটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ আসনবিশিষ্ট মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মানুষ কেন প্রতিবাদ করছেন?

এই প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু যারা আন্দোলন করছেন তারা হাসপাতাল চান না এই অপবাদ দেয়া কিংবা এককথায় এই আন্দোলনকে ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দেয়া যাবে না। কারণটা একটু গভীরে গিয়ে খুঁজতে হবে। যারা আন্দোলন করছেন তারা সবাই চট্টগ্রামের রাজনৈতিক, সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত। চট্টগ্রামের যেকোনো নাগরিক সমস্যায় তারা শুধু বিবৃতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করেন না, তারা জনসাধারণের পক্ষে পথে নামেন। এবারও তেমনি এক অভিন্ন দাবিতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন। প্রাণ-প্রকৃতিকে বাণিজ্যিক থাবা থেকে রক্ষা করতে তারা আন্দোলনে নেমেছেন, প্রতিদিন পালিত হচ্ছে নানা ধরনের কর্মসূচি। মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন, প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্নভাবে প্রতিবাদ হচ্ছে।

সিআরবি (সেন্ট্রাল রেলওয়ে বিল্ডিং) রক্ষার এ আন্দোলনের সূচনা হয়েছে যখন প্রকাশ পেয়েছে যে, বাণিজ্যিক হাসপাতাল তৈরির নামে চট্টগ্রামের সিআরবি পাহাড়কে পছন্দ করেছে ইউনাইটেড গ্রুপ আর সরকার তাদের জন্য রেলওয়ের জায়গা বরাদ্দ দিচ্ছে। পিপিপি বা পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের মাধ্যমে তৈরি হবে বাণিজ্যিক হাসপাতাল। এই হাসপাতালে সাধারণ মানুষের সেবা নয়, ধনী মানুষের চিকিৎসা হবে।

চট্টগ্রামের জনসংখ্যার বিবেচনায় আরও হাসপাতাল দরকার। এটা কেউ অস্বীকার করবে না। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে– জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে সরকারি হাসপাতাল স্থাপন করা হবে না কেন? হাসপাতালের জন্য সিআরবি পাহাড়-সংলগ্ন এলাকা বেছে নেয়া হলো কেন? বেসরকারি ব্যয়বহুল বাণিজ্যিক হাসপাতালে সাধারণ জনগণ কি চিকিৎসাসেবা পাবে? একদল চিকিৎসা ব্যবসায়ী আর চিকিৎসাবিলাসীদের জন্য কি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য, সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র আর সম্পদ হাতছাড়া হয়ে যাবে?

সরকারের এই সিদ্ধান্তে বিক্ষুব্ধ ও হতবাক মানুষের প্রশ্ন, ব্যবসার হাত থেকে কি কিছুই রক্ষা পাবে না? নদী-বন, পাহাড়-সমুদ্র সবই বাণিজ্য আর লুণ্ঠনের থাবায় ক্ষত বিক্ষত। এবার নজর পড়েছে চট্টগ্রামের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের আধার, সৌন্দর্য আর ফুসফুসের মতো স্থান সিআরবির পাহাড়ের ওপর। চট্টগ্রামের কেন্দ্রস্থলে রেলওয়ে স্টেশন, স্টেডিয়াম, লাভ লেইন, টাইগার পাস, বাটালি হিলের মধ্যখানে এক দারুণ সুন্দর জায়গা এই সিআরবি পাহাড়। একে চট্টগ্রাম মহানগরের শ্বাসকেন্দ্র বললে অত্যুক্তি হয় না মোটেই।

১৮৭২ সালে তৈরি করা বন্দর নগরীর প্রাচীনতম ভবন, ১৮৯৯ সালে তৈরি বাষ্পীয় রেল ইঞ্জিনের মডেল, পাহাড়ের শীর্ষে হাতির বাংলোর পাশে দাঁড়িয়ে একনজরে পুরো চট্টগ্রাম শহর দেখা, সকালে হাঁটা, বিকেলে ঘুরে বেড়ানো, পয়লা বৈশাখসহ নানা সাংস্কৃতিক আয়োজনের স্থান, শত বছরের পুরোনো বিশাল গাছগুলো দেখে বিস্মিত বা মুগ্ধ হওয়া সব মিলে এই পাহাড় চট্টগ্রামবাসীর প্রশান্তি ও ভালোবাসার স্থান। এক অর্থে একে ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সাংস্কৃতিক বলয়। চট্টগ্রামে কেউ নতুন এলে তাকে নিয়ে সিআরবি পাহাড়ে ঘুরতে যাওয়া এক অবধারিত বিষয় চট্টগ্রামবাসীর কাছে।

শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, সিআরবি এলাকা জড়িয়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন আর স্বাধীনতা যুদ্ধের সঙ্গে। এর পাশেই আছে হাসপাতাল কলোনি যা আব্দুর রব কলোনি নামে পরিচিত সেখানে আছে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রবসহ ১০ জন শহিদের কবর। মুক্তিযুদ্ধের কথা বলতে বলতে মুক্তিযুদ্ধের সব অর্জনকে বিসর্জন দেয়ার প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হয়েছে বর্তমান সরকার।

এখন অতীতের স্মৃতি রক্ষার চাইতে ভবিষ্যতের ব্যবসা তাদের কাছে অনেক লোভনীয় বিষয়। তাই সংবিধানের ধারাকে উপেক্ষা করতেও তারা দ্বিধা করছে না। সংবিধানের ১৮ ক ধারা অনুসারে রাষ্ট্র বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নাগরিকদের জন্য পরিবেশ সংরক্ষণ, উন্নয়ন করবে। প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ এবং নিরাপত্তা বিধান করবে। সংবিধানের এই ধারা অনুযায়ী সিআরবিতে কোন ধরনের স্থাপনা সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

জনগণের অসন্তোষ ও আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য এখন নতুন কৌশল অবলম্বন শুরু হয়েছে। বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নামে ইউনাইটেড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার কথা প্রচার শুরু করেছে তারা। আন্দোলনকে বিভ্রান্ত করতে আবেগের ব্যবহার করার এ এক পুরোনো কৌশল। প্রথমত, হাসপাতাল হবে, দ্বিতীয়ত, বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নাম এই দুই বিষয়কে সামনে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে কোনো কোনো পক্ষ থেকে।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন বীরকন্যা প্রীতিলতার নামে ছাত্রী হলের নামকরণের দাবিতে আন্দোলন গড়ে উঠেছিল তখনও আন্দোলনকে ভিন্নখাতে পরিচালিত করার উদ্দেশ্যে এরকম তৎপরতা চালানো হয়। কিন্তু তখন সেটা ছিল ছাত্রী হলের নামকরণ নিয়ে রাজনৈতিক পাল্টাপাল্টি। কিন্তু এখন চিকিৎসা ব্যবসায়ীর মুনাফা অর্জনের কাজে আবেগের ব্যবহার করার চেষ্টা হচ্ছে। ইতোমধ্যে আন্দোলনকে বিভক্ত ও দুর্বল করার জন্যও বিভিন্নমুখী তৎপরতা শুরু হয়েছে। কিন্তু চট্টগ্রাম নগরবাসীর প্রশ্ন, রাষ্ট্রের সম্পদ, দেশের ঐতিহ্য, সাধারণ মানুষের শ্বাস নেবার জায়গা সব কিছু কি গৌণ হয়ে যাবে মুনাফা শিকারিদের কৌশলের কাছে?

বন-পাহাড়, নদী-সাগর মিলে চট্টগ্রাম প্রকৃতির এক অপূর্ব সুন্দর স্থান। কিন্তু রেল, বন্দরসহ পাহাড়ের জায়গা লুণ্ঠন, দখল ও দূষণে অবস্থা এখন যা দাঁড়িয়েছে কিছুদিন পর বলতে হবে একসময় খুব সুন্দর জায়গা ছিল। দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় চাক্তাই খালের মরণ দশার কারণে জলাবদ্ধতা, পাহাড় কেটে প্রাকৃতিক ভারসাম্য ও সৌন্দর্য নষ্ট করার ফলে চট্টগ্রাম এখন যানজট ও জলজটের শহরে পরিণত হয়েছে।

সুন্দর কিছু গড়ে ওঠে প্রকৃতি আর মানুষের শ্রমে। আর তাকে ভোগদখল করতে চায়, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর সম্পদ বানাতে চায় সুবিধাভোগীরা। এ কাজে ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে তারা সিদ্ধহস্ত। অতীতের ধারাবাহিকতায় সিআরবি পাহাড় এখন তাদের সর্বশেষ টার্গেট। মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে পাঁচতারা হোটেলের মতো হাসপাতাল হবে, সুদৃশ্য ভবনের মেডিক্যাল কলেজ হবে।

সেখানে চিকিৎসা নেবেন এবং ছেলেমেয়েদেরকে পড়াবেন যাদের অঢেল টাকা আছে। যদিও তাদের টাকা আসবে জনগণকে শোষণ করে বা জনগণের সম্পদ লুণ্ঠন করেই। আর পরিবেশ ধ্বংস ও সম্পদ লুণ্ঠনের দায় ভোগ করবে জনগণ। অভিজ্ঞতা বলে প্রতিবাদ না করে শুধু তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলে জনগণের সম্পত্তি পাহাড় ধনশালী আর ক্ষমতাশালীদের কুক্ষিগত হওয়ার হাত থেকে রক্ষা করা যাবে না।

চট্টগ্রামে আরও হাসপাতাল দরকার। এবং হাসপাতাল নির্মাণ করতে চাইলে জায়গা অনেক আছে। কিন্তু সিআরবির সবুজ কিংবা বসতি ধ্বংস করে হাসপাতাল কেন? টাকা থাকলে হাসপাতাল অনেক বানানো যাবে, কিন্তু টাকা থাকলেই দ্বিতীয় সিআরবি পাহাড় কি বানানো যাবে? ছোটবেলায় পাঠ্যপুস্তকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সামান্য ক্ষতি কবিতাটি নীতি নির্ধারকদের অনেকেই পড়েছেন। মাঘ মাসের শীত খুব তীব্র কিন্তু শীতের হাত থেকে বাঁচতে দরিদ্র মানুষের কুটিরে আগুন জ্বালিয়ে আগুন পোহানো অন্যায় এবং অমানবিক। তাই রানীকে শাস্তি পেতে হয়েছিল। ছোটবেলায় পড়া এই কবিতার মর্মার্থ কি আমরা উপলব্ধি করতে শিখব না, নাকি পাঠ্যপুস্তকের এই কবিতা শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য পড়া হিসেবে বিবেচিত হবে?

একদল মানুষের মুনাফা অর্জন, প্রজেক্ট দেখিয়ে ব্যাংক ঋণ গ্রহণ, কিছু মানুষের চিকিৎসা বিলাসিতার জন্য সাধারণ মানুষের সম্পদ কেড়ে নেয়া হবে? একবার কি ভাববেন না, সাধারণ মানুষের হাঁটার জন্য জায়গা কোথায়? ছেলেমেয়েরা মুক্ত পরিবেশে ছোটাছুটি করবে এমন খোলা জায়গা কোথায়? ৬০ লাখ অধিবাসীর চট্টগ্রাম মহানগরে বুক ভরে শ্বাস নেয়ার জায়গা দিন দিন কমে আসছে।

যারা নগরটিকে নিজেদের প্রিয় আবাসভূমি মনে করেন তারা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বলেন, আগে চট্টগ্রাম ছিল এক সবুজে ঘেরা শহর। সেই সবুজ যেন দিন দিন বিতাড়িত হচ্ছে চট্টগ্রাম থেকে। সুন্দর পাহাড় ও প্রাকৃতিক পরিবেশ কেউ তৈরি করেনি। প্রাকৃতিক নিয়মে তা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষ প্রকৃতিকে সাজিয়ে রাখবে না কি সংহার করবে সেটাই এখন বড় প্রশ্ন। যোগাযোগের সুব্যবস্থা আর খোলামেলা পরিবেশে হাসপাতাল চিকিৎসা ব্যবসায়ীদের জন্য লোভনীয় কিন্তু তাদের লোভ ও লাভের জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে সাধারণের সম্পত্তি কেড়ে নেয়া অন্যায় ও অমানবিক, এই বোধ কি জাগবে না?

সিআরবি রক্ষার আন্দোলনে চট্টগ্রামে যারা পথে নেমেছেন যারা তারা তাদের কর্তব্যের কথা সুস্পষ্টভাবেই বলছেন। তারা হাসপাতালের বিরুদ্ধে নন, তারা প্রকৃতি-ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি রক্ষা করতে চান। তারা সাধারণ মানুষের জন্য হাসপাতাল মেডিক্যাল কলেজ সবই চান কিন্তু প্রকৃতি ধ্বংসের বিনিময়ে নয়। যখন থেকে আধুনিক রাষ্ট্র গড়ে উঠেছে তখন থেকেই প্রাকৃতিক সম্পদের মালিক দেশের জনগণ। এ কথা আমদের সংবিধানেও উল্লেখ আছে।

রাষ্ট্রের দায়িত্ব প্রাকৃতিক সম্পদকে সুরক্ষিত রাখা। কিন্তু যদি মুনাফা শিকারিদের হাতে সম্পদ ও ঐতিহ্য তুলে দেয়া হয় তখন সেই অপচেষ্টা রুখে না দাঁড়ালে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য বাংলাদেশ তৈরি হবে কীভাবে? ফলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায় থেকেই সিআরবি পাহাড় ও তার সৌন্দর্যকে রক্ষা করতে হবে। এই আন্দোলন শক্তিশালী না হলে যেখানেই প্রাকৃতিক সৌন্দর্য সেখানেই বাণিজ্যের থাবা পড়বে। তা বান্দরবনের ম্রো জনগোষ্ঠীর পাহাড় কিংবা সিআরবি পাহাড় যা-ই হোক না কেন!

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন: 
দুই দলের প্রস্তুতির হাওয়া

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়। তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত।

বৈশ্বিক করোনা সংক্রমণের ঢেউ দেশে এখনও পুরোপুরি কমেনি। সবেমাত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হচ্ছে। কিছুদিন আগে ব্যবসা- বাণিজ্য, অফিস-আদালত, শিল্প-কলকারখানা, যানবাহন, পর্যটনসহ সব কিছু খুলে দেয়া হয়েছে। দীর্ঘ দেড় বছরে করোনার দুটি ঢেউ দেশের অর্থনীতি, শিক্ষা, প্রশাসনসহ সবক্ষেত্রে বড় ধরনের আঘাত সৃষ্টি করেছে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে বেশ সময়ের প্রয়োজন। শিক্ষায় যে ক্ষতি হয়েছে তা পুষিয়ে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা কার্যক্রম বজায় রাখা দরকার। সবকিছুই নির্ভর করবে করোনার নতুন কোনো ঢেউ আবার যেন হানা না দেয় তার ওপর। সেটি কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না। দুনিয়ার অভিজ্ঞতা এখনও সুখকর নয়। অনেক দেশেই করোনার চতুর্থ ঢেউ এবং নতুন ভ্যারিয়েন্টের আবির্ভাব ঘটতে দেখা যাচ্ছে। সেকারণেই আমাদের দেশে কতদিন বর্তমান সহনীয় অবস্থাটি দেখতে পাব তা নিশ্চিত করে বলে যায় না।

এমনই এক অনিশ্চিত অবস্থায় দেশের রাজনীতিতে নির্বাচনের হাওয়া দুই বড় দলের দিক থেকে বয়ে আসতে দেখা যাচ্ছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করেই এই হাওয়া বইয়ে দেয়া হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে ২০২৩ সালের শেষ সপ্তাহে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। সেই হিসাবে বাকি রয়েছে দুই বছর তিন মাসের মতো সময়। করোনার সংক্রমণ যদি বর্তমান ধারায় কমে আসতে থাকে তাহলে রাজনৈতিক সভা সমাবেশ বা কর্মকাণ্ড হয়ত স্বাভাবিক গতিতে দলগুলো পরিচালিত করতে মাঠে নামবে। কিন্তু সেই নামাটি যদি আবার নতুন কোনো কোভিড ভ্যারিয়েন্টের রূপান্তর ঘটায় তাহলে পরিস্থিতি কী হবে বলা মুশকিল।

এই বছরের শুরুতে ভারতে বেশ কিছু রাজ্যসভা নির্বাচনের পর ডেলটা ভ্যারিয়েন্টের প্রকোপ ভারতকে কতটা নাজুক অবস্থায় ফেলে দিয়েছিল সেটি সবারই স্মরণে থাকার কথা। আমরাও সেই ঢেউয়ে অনেকটাই ভেসে বেড়াচ্ছি। সুতরাং নির্বাচনি হাওয়া বইয়ে দেয়ার রাজনৈতিক প্রচেষ্টা ২০২২-২৩ সালে কতটা সুখের হবে, জনগণ তাতে কতটা স্বাছন্দ্যে অংশ নেবে সেটি তখনকার পরিস্থিতির ওপরই নির্ভর করবে। বেশিরভাগ মানুষই করোনার ভয়াবহতা সম্পর্কে কমবেশি অবগত। একইসঙ্গে দেড় বছরে অনেক মানুষ করোনার কারণে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্বজনদের হারিয়েছে, এখনও অনেকে কোভিড-উত্তর শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত।

ফলে সামনের দিনগুলো আগের মতো মানুষকে রাজনৈতিক মাঠে স্বতঃস্ফূর্তভাবে নামতে খুব বেশি উদ্বুদ্ধ করবে এমনটা আশা করা মনে হয় প্রশ্নের মধ্যেই থাকবে। তাছাড়া জীবন-জীবিকার সংগ্রাম বিপুলসংখ্যক মানুষের সামনে এখন গুরত্বপূর্ণ বিষয়। অর্থনৈতিক ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার যে সুযোগটি যার যার সামনে রয়েছে তারা সেটাকেই প্রাধান্য দেবেন- এটাই স্বাভাবিক। দেশে গত একযুগে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে।

সামাজিকভাবেও মানুষের একটি নতুন অবস্থান তৈরি হয়েছে। করোনার অভিঘাতে পড়েও মানুষ দেড় বছর নিজেদেরকে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে ধরে রাখার বেশ কিছু অবলম্বন খুঁজে নিতে পেরেছে। সুতরাং সামনের দিনগুলোতে দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের কোনো সংঘাতময় পরিস্থিতি বেশিরভাগ মানুষই সৃষ্টি হওয়ার পক্ষে যেতে চাইবে না। তাছাড়া আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতা মানুষকে নতুন কিছু উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। মানুষ যখন দেখছে ক্ষমতার পরিবর্তন সেখানে অর্থনৈতিক সংকট ভয়াবহ আকারে খারাপের দিকে মোড় নিতে যাচ্ছে, মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের মানুষজন আসবাবপত্র পানির দামে বিক্রি করতে চাইলেও গ্রাহক খুঁজে পাচ্ছে না, খাদ্যসংকট চরম আকার ধারণ করতে যাচ্ছে।

নারীরা রাস্তায় তাদের অধিকারের জন্য মিছিল করছে, ক্ষমতাসীনরা নারীদেরকে শিক্ষা, চাকরি ইত্যাদি থেকে বঞ্চিত করার সব বেআইনি কর্মকাণ্ড চালিয়ে দিচ্ছে, তখন বাংলাদেশের সর্বত্র এক ধরনের পর্যবেক্ষণ দেশের রাজনীতির উত্থান পতনে নতুন অভিজ্ঞতা হিসেবে যুক্ত হতে পারে বলে মনে হচ্ছে। কোনো অবস্থাতেই কেউ বিরাজমান স্থিতাবস্থা ভেঙে পড়ুক, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, নৈরাজ্য বাংলাদেশে তৈরি হোক সেটি খুব বেশি সমর্থন পাবে বলে মনে হয় না। তাছাড়া ২০১৩-১৫ সালের নৈরাজ্যকর অভিজ্ঞতা এখনও দেশে অনেকের স্মরণে আছে। সেকারণে বাংলাদেশে আগামী ২ বছর রাজনীতিতে সংঘাত সংঘর্ষের পরিস্থিতি শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জীবনে কাবুলের মতো নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার ন্যূনতম সুযোগ সৃষ্টিতে বেশিরভাগ মানুষই অংশ নেবে বলে মনে হয় না।

বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সভা গণভবনে দলের সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় গত ৯ সেপ্টেম্বর। এতে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের ৫৩ সদস্য অংশগ্রহণ করেন। তারা দলের নিজ নিজ এলাকার পরিস্থিতি উপস্থাপন করেন। এতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক পরিস্থিতি, নেতৃবৃন্দের কার্যক্রম, কোথাও কোথাও দ্বন্দ্ব-সংঘাত ইত্যাদি সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা হয়।

আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তৃণমূল পর্যায়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অনেক স্থানেই নেতাকর্মীদের জনসংযোগ ও সম্পৃক্ততার অভাব সম্পর্কে নেতৃবৃন্দ দলের সভাপতিকে অবহিত করেন। দীর্ঘদিন দল ক্ষমতায় থাকার কারণে অনেক জায়গায় নেতাকর্মীদের মধ্যে চাওয়া পাওয়া ও দ্বন্দ্ব বেড়ে যাওয়ায় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে স্থবিরতা বিরাজ করছে। তারপরও করোনার এই সংকটময়কালে আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী সাধারণ মানুষকে নানাভাবে সাহায্য ও সহযোগিতা প্রদান করেছেন। অনেকে করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণও করছেন। কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা শেষে দলের সভাপতি শেখ হাসিনা তার দিকনির্দেশনামূলক বক্তৃতায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি দলের অভ্যন্তরে যারা কোন্দল ও সংঘাতে লিপ্ত আছেন তাদেরকে হুঁশিয়ার করে দেন এবং দলের জন্য যারা অবদান রাখছেন তাদেরকে দলের কর্মকাণ্ডে আরও সক্রিয় হওয়ার পরামর্শও দিয়েছেন।

আগামী নির্বাচন উপলক্ষে তিনি দলের প্রস্তুতি গ্রহণের লক্ষ্যে অর্থনৈতিক নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশনা দিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন উপকমিটিকে পরবর্তী নির্বাচনি ইশতেহারে যে যে বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত হবে সেসব বিষয়ে আপডেট করার নির্দেশ দেন। ভবিষ্যতে আওয়ামী লীগ শিক্ষা, অর্থনীতি, বিদ্যুৎ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে কীভাবে বাংলাদেশকে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে কাজ করবে সে সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা ইশতেহারে থাকার কথা তিনি জানান।

আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী কমিটির এই সভার পর জাতীয়তাবাদী দল ( বিএনপি) নড়েচড়ে ওঠে। প্রথমে দলটি জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত মহিলা দলের এক সভায় বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার কথা উল্লেখ করেন। ওই সভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বরচন্দ্র রায় আগামী নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া অনুষ্ঠিত হতে না দেয়ার কথাও উল্লেখ করেন। এরপরেই গত মঙ্গল, বুধ ও বৃহস্পতিবার কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি এবং দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের নিয়ে বিএনপি এক জরুরি সভা আহ্বান করে।

২০১৮ সালের ৩ ফেব্রুয়ারির পর এই সভাটি অনুষ্ঠিত হয়। ২০১৮ সালের সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। বর্তমানে তিনি কারাদণ্ডে থাকায় দলের কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে পারছেন না। এই অবস্থায় লন্ডনে অবস্থানরত তারেক রহমান দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসনের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনিও কারাদণ্ডে দণ্ডিত। সেকারণে লন্ডন থেকে তিনি অনলাইনে বিএনপির গুলশানস্থ চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত এই সভায় সভাপতিত্ব করেন, যা গণমাধ্যমে আইনগতভাবে প্রকাশিত হওয়ার বিধান না থাকায় প্রদর্শিত হয়নি। মঙ্গলবারের সভায় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যগণ অংশ্রগ্রহণ করেন, বুধবার জ্যেষ্ঠ যুগ্ম ও যুগ্ম সম্পাদক এবং বৃহস্পতিবার দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বসেছেন। সভায় অংশগ্রহণকারী নেতৃবৃন্দের মধ্য থেকে অনেকেই আগামীদিনের আন্দোলন সংগ্রাম ও নির্বাচনের ব্যাপারে বক্তব্য প্রদান করেন। নেতৃবৃন্দ নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকার ছাড়া নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না মর্মে অভিমত প্রকাশ করেন। একারণেই তারা নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় চালু করার দাবিতে আন্দোলন করার ওপর জোর দেন। সেক্ষেত্রে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ কিংবা যুগপৎভাবে আন্দোলন সংগঠিত করার জন্য দলকে প্রস্তুত করার কথা জানান।

এছাড়া আগামী সপ্তাহে বিএনপির সমমনা পেশাজীবীদের সঙ্গেও মতবিনিময়ের একটি সম্ভাবনার কথা গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়েছে। সভার কার্যক্রম যেহেতু রুদ্ধদ্বার ছিল তাই ভেতরের সব কথা বাইরে জানা যায়নি। বোঝা গেছে বিএনপি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে গুরত্বের সঙ্গে নিয়েছে। সেজন্য দলটি বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের অধীনে নয় বরং নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত করার দাবিতে ব্যাপক আন্দোলন সংগঠিত করার ব্যাপারে একমত পোষণ করেছে। সেক্ষেত্রে সরকারের বিরুদ্ধে যেকোনো মূল্যে ত্যাগ স্বীকার করার আন্দোলন দাঁড় করাতে সবাইকে সংগঠিত করার কাজে নামতে ব্যাপক সাংগঠনিক সফর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হয়ত শিগগিরই বিএনপি নেতৃবৃন্দ সেভাবে মাঠে নামবে।

বিএনপির সামনে বেশ কিছু জটিল সমস্যা রয়েছে। প্রথমত, দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ এবং অসুস্থ। সরকারের নির্বাহী আদেশে তিনি জামিনে বাসায় আছেন। দ্বিতীয়ত, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানও বিচারিক আইনে দণ্ডিত। তিনিও দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। বিএনপি মূলত এই দুজনের নির্দেশনা ও ভাবমূর্তিতে পরিচালিত হয়।

তারেক রহমান সাজাপ্রাপ্ত আসামি এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতেও একজন ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে অভিযুক্ত। দলের অভ্যন্তরে কোন্দল এবং নিষ্ক্রিয়তা দীর্ঘদিন থেকে বিরাজ করছে। এছাড়া ২০০১-০৬ সালের জোট সরকারের কর্মকাণ্ডে দেশ এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিএনপির ভাবমূর্তির চরম সংকট এখনও কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি। এছাড়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সবচাইতে অপব্যবহারটি ২০০৬ সালে জোট সরকারের হাতেই ঘটেছিল। সেকারণে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রতি সমর্থন জোরালো করার ভিত্তি বিএনপির খুব বেশি জোরালো হবে না। এছাড়া জামায়াত ও স্বাধীনতাবিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির সঙ্গে দলটির আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা সম্পর্ক বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক শক্তি, জঙ্গিবাদী এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানকেই উৎসাহিত করবে এটি নিশ্চিত হওয়ায় রাজনীতি সচেতন মহল, মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত, তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ বিএনপির প্রতি আগের মতো আস্থা রাখার পর্যায়ে নেই।

আওয়ামী লীগের তৃণমূল থেকে মাঝারি পর্যায় পর্যন্ত অনেকের কর্মকাণ্ডে সমাজে ক্ষোভ এবং সমালোচনা রয়েছে। কিন্তু শেখ হাসিনা বর্তমান দেশীয় এবং বৈশ্বিক বাস্তবতায় বাংলাদেশকে যেভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে দৃঢ়তার সঙ্গে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তার সঙ্গে পাল্লা দেয়ার নেতৃত্ব বিএনপি বা অন্য কোনো দলে দেখা যাচ্ছে না। সেকারণে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্র নিয়ে যে অসন্তুষ্টি রয়েছে তা এককভাবেই যেমন আওয়ামী লীগের ওপর দায় চাপিয়ে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, তেমনি বিরোধী দল যতক্ষণ পর্যন্ত অসাম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক আদর্শের ধারায় ফিরে না আসবে ততক্ষণ পর্যন্ত সমস্যাগুলো একক কোনো দল বা জোটের পক্ষে সমাধান করাও সম্ভব হবে না। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে পুনর্গঠিত করা না গেলে সুশাসন, নির্বাচন ও গণতন্ত্রের বিকাশ নিশ্চিত হওয়া নয়।

লেখক: অধ্যাপক-গবেষক

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান

শিক্ষায় বৈষম্যহীনতাই প্রগতির সোপান

ছাত্র-অভ্যুত্থানের তৃতীয় দিনের মধ্যে সরকার শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত এবং একই সঙ্গে ১৯৬৩ সালের স্নাতক পরীক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বলা যায়, আইয়ুব খানের মতো তথাকথিত লৌহ মানবও ছাত্র-আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবস। পঞ্চাশের দশকের স্বাধিকার আন্দোলন এবং ষাটের দশকের শেষনাগাদ জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের মধ্যে সমন্বয়ক হিসেবে ১৯৬২’র ছাত্র-আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ এ দিবস।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর মুর্শিদাবাদে জন্মগ্রহণকারী বাঙালি রাষ্ট্রপতি ইস্কান্দার মির্জা প্রথমবারের মতো সমগ্র পাকিস্তানে সামরিক আইন জারি করেন এবং সেনাবাহিনীর সর্বাধিনায়ক জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিযুক্ত করেন। সামরিক শাসন জারির ২০ দিনের মাথায় মির্জার দেখানো পথেই তাকে উৎখাত করে ১৯৫৮ সালের ২৭ অক্টোবর রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন আইয়ুব খান।

পূর্ব বাংলাকে দাবিয়ে রাখতে হলে এখানকার শিক্ষা সংস্কৃতিকেই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, এটা আইয়ুব খান খুব ভালো জানতেন। আর তাই ক্ষমতা দখলের দুই মাসের মাথায় ১৯৫৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর তৎকালীন শিক্ষাসচিব ড. এস এম শরীফকে প্রধান করে ১১ সদস্যবিশিষ্ট শিক্ষা-কমিশন গঠন করেন যা ‘শরীফ কমিশন’ নামে পরিচিত।

১৯৫৯ সালের আগস্ট মাসে কমিশন সরকারের কাছে রিপোর্ট হস্তান্তর করে। কমিশনের রিপোর্টে ষষ্ঠ থেকে ডিগ্রি পর্যন্ত ইংরেজিকে বাধ্যতামূলক, উর্দুকে সর্বজনীন ভাষায় রূপান্তর, উর্দু ও বাংলা ভাষার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে পাকিস্তানের জন্য একটি অভিন্ন বর্ণমালার সুপারিশ এবং অবৈতনিক শিক্ষার ধারণাকে অবান্তর বলে ঘোষণা করা হয়। কমিশনের সুপারিশে- ১. প্রতিটি স্কুলে ৬০ শতাংশ ব্যয় সংগৃহীত হবে ছাত্রদের বেতন থেকে বাকি ২০ শতাংশ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ নির্বাহ করবে। ২. পাস ও অনার্সকোর্সের সময়গত পার্থক্য বিলোপ করা হয়।

কমিশন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বায়ত্তশাসনের পরিবর্তে পূর্ণ সরকারি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে রাজনীতি নিষিদ্ধ এবং ছাত্র-শিক্ষকদের কার্যকলাপের ওপর তীক্ষ্ণ নজরদারি করার প্রস্তাব করে।

রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি পেলেও বাংলা ভাষাকে সাম্প্রদায়িকীকরণের লক্ষ্যে বিকৃতি চলতে থাকে। কবি নজরুলের বিখ্যাত কবিতা ‘চল্ চল্ চল্’-এর ‘নব নবীনের গাহিয়া গান, সজীব করিব মহাশ্মশান’ চরণের সংশোধন করে, লেখা হয় ‘সজীব করিব গোরস্থান’। জনপ্রিয় ছড়া, ‘সকালে উঠিয়া আমি মনে মনে বলি/ সারাদিন আমি যেন ভালো হয়ে চলি।’ পরিবর্তন করে করা হয়- ‘ফজরে উঠিয়া আমি দিলে দিলে বলি/ সারাদিন আমি যেন নেক হয়ে চলি।’

১৯৫৯ সালে সর্বদলীয় ছাত্র সংগঠনগুলোর একুশের সম্মিলিত অনুষ্ঠানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ সভাপতির ভাষণে এসব বিকৃতিসহ অন্যান্য তথাকথিত সংস্কার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। ছাত্ররা সম্মিলিতভাবে প্রস্তাব গ্রহণ করেন যে, এসব তারা মেনে নেবেন না।

১৯৬১ সালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের জন্মশতবার্ষিকী পালনকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিবেশ দীর্ঘদিন পর আবার চাঙা হয়ে ওঠে। সামরিক শাসনের ফলে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার কারণে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে রাজনৈতিক দাবিকে সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা চলে। ১৯৬১ সালের গোড়ার দিকে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনকে কেন্দ্র করে ছাত্র-আন্দোলনের পরোক্ষ প্রস্তুতি চলতে থাকে। ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ অন্যদের সঙ্গে নিয়ে ১৯৬১ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপন ও রবীন্দ্র জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠান পালন করে।

১৯৬১ সালের ডিসেম্বরেই তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ মুজিবুর রহমান ও ইত্তেফাক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া এবং কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক মণি সিংহ ও সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য খোকা রায়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনায় আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় ৬১’র ডিসেম্বরে পরবর্তী ২১ ফেব্রুয়ারি উদযাপনের লক্ষ্যে ছাত্র ইউনিয়ন নেতা মোহাম্মদ ফরহাদের উদ্যোগে ইস্কাটনের একটি বাড়িতে এক গোপন সভায় ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ সামরিক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে শিক্ষার দাবিকে কেন্দ্র করে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

১৯৬২ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে শরীফ কমিশনের বিরুদ্ধে আন্দোলন জোরদার হতে শুরু করে। ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্টকাল বন্ধ ঘোষণার প্রতিবাদে ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্রলীগ মিছিল করে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খুললে ১৫ মার্চ থেকে অব্যাহতভাবে ধর্মঘট চলতে থাকে।

ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন, ডাকসু, বিভিন্ন হল ও কলেজ ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে সাধারণ ছাত্রদের মতামতের প্রতিফলন ঘটিয়ে আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করে। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। ১৫ আগস্ট দেশব্যাপী ধর্মঘট এবং ১০ সেপ্টেম্বর সচিবালয়ে অবস্থান ধর্মঘটের ডাক দেয়া হয়।

১০ সেপ্টেম্বর সরকার ১৪৪ ধারা জারি করলে প্রতিবাদস্বরূপ ১৭ সেপ্টেম্বর হরতালের ডাক দেয়া হয়। ওইদিন সকাল ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে হাজার হাজার ছাত্র-জনতার সমাবেশ শেষে কার্জন হল থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। ছাত্রদের সঙ্গে যোগ দেয় ব্যবসায়ী, কর্মচারী, রিকশা শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণিপেশার সংগঠন। জগন্নাথ কলেজে গুলি হয়েছে- এমন সংবাদ পেয়ে মিছিল নবাবপুরের দিকে যাত্রা শুরু করে।

হাইকোর্টের সামনে পুলিশি বাধায় মিছিলকারীরা আবদুল গনি রোডে অগ্রসর হয়। পুলিশ মিছিলের পেছন থেকে লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস ও গুলিবর্ষণ করে। নবকুমার স্কুলের ছাত্র বাবুল, বাস কন্ডাক্টর গোলাম মোস্তফা ঘটনাস্থলেই নিহত হন। গুলিবিদ্ধ গৃহকর্মী ওয়াজিউল্লাহ পরদিন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। যশোর, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে অনুষ্ঠিত কর্মসূচিতে পুলিশের নির্যাতনে বহু ছাত্র আহত ও গ্রেপ্তার হন। টঙ্গীতে গুলিতে নিহত হন শ্রমিক সুন্দর আলী।

তিনদিন পূর্ব বাংলায় ব্যাপক ছাত্র-অভ্যুত্থান ঘটে। ছাত্র-অভ্যুত্থানের তৃতীয় দিনের মধ্যে সরকার শরীফ শিক্ষা কমিশন রিপোর্ট স্থগিত এবং একই সঙ্গে ১৯৬৩ সালের স্নাতক পরীক্ষার্থীদের ডিগ্রি প্রদান করার ঘোষণা দেয়। এ আন্দোলনের প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে বলা যায়, আইয়ুব খানের মতো তথাকথিত লৌহ মানবও ছাত্র-আন্দোলনের কাছে নতিস্বীকার করে শরীফ শিক্ষা কমিশনের রিপোর্ট বাস্তবায়ন স্থগিত করতে বাধ্য হন।

এর পর থেকে প্রতিবছর একটি সর্বজনীন, গণমুখী, বিজ্ঞানভিত্তিক একধারার শিক্ষাব্যবস্থার দাবিতে ছাত্র-আন্দোলন ও শহিদদের আত্মদান তথা শিক্ষার ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের প্রতীক হিসেবে ১৭ সেপ্টেম্বরকে ‘শিক্ষা দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়। ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনের এই অর্জনের ধারাবাহিকতায় ১৯৬৬ সালে ৬ দফা, ’৬৯-এর ১১ দফার ভিত্তিতে গণ-অভ্যুত্থান ও আইয়ুব খানের পতন, ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে বাঙালি রাজনীতিকদের নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জিত হয়।

১৯৭১ সালে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ শহিদ আর ২ লাখ নারী ও শিশু নির্যাতনের মধ্যে দিয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে হিসাব মিলাতে বসলে বলতে হয় শিক্ষাক্ষেত্রে এখনও আমরা খুব একটা অগ্রসর হতে পারিনি।

শিক্ষানীতি প্রণয়নকালে প্রথম শিক্ষা কমিশন-প্রধান ড. কুদরাত-ই-খুদা বলেছিলেন- “শিক্ষা ব্যবস্থা একটি জাতির আশা আকাঙ্ক্ষা রূপায়ণের ও ভবিষ্যৎ সমাজ নির্মাণের হাতিয়ার। কাজেই দেশের কৃষক, শ্রমিক, মধ্যবিত্তসহ সব শ্রেণির জনগণের জীবনে নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজনের উপলব্ধি জাগানো, নানাবিধ সমস্যা সমাধানের যোগ্যতা অর্জন এবং তাদের বাঞ্ছিত নতুন সমাজতান্ত্রিক সমাজ সৃষ্টির প্রেরণা সঞ্চারই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান দায়িত্ব ও লক্ষ্য। এই লক্ষ্য আমাদের সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত রাষ্ট্রীয় মূলনীতিসমূহের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। শিক্ষার মূলনীতির সঙ্গে এই সাংবিধানিক নীতিমালার যোগ সাধন করে বাংলাদেশের শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যাবলি নির্ধারণ করা যায়।”

সংবিধানে স্বীকৃত শিক্ষার অধিকার আমরা আজও পাইনি। ধনীক শ্রেণির কাছে শিক্ষা কেনাবেচার পণ্যে পরিণত হয়েছে। সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের বিষয়টি স্বীকৃত হলেও শিক্ষা এবং কর্মক্ষেত্রে বাংলাচর্চা সীমিত হয়ে পড়েছে। তিন বছরের ডিগ্রি, চার বছরের অনার্স কোর্স চালু হয়েছে। বিজ্ঞান ও সমাজবিজ্ঞানের বদলে বাণিজ্য শাখায় শিক্ষার্থী বাড়ছে।

বিগত বছরগুলোতে পাসের হার বৃদ্ধিতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের বর্ধিত চাহিদা থেকে বেড়েছে ব্যবসায়িক স্বার্থে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা। অধিকাংশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ-এমবিএ কিংবা প্রযুক্তিগত কোর্স পড়ানোতেই সীমাবদ্ধ। এভাবে মৌলিক বিদ্যাচর্চা ব্যাহত হওয়ায় দেশে উচ্চতর গবেষণার সংখ্যা ও মান কমেছে।

রাষ্ট্রের ধর্মনিরপেক্ষ চেহারা বদলানো হয়েছে। হেফাজতের ১৩ দফা অনুযায়ী পাঠ্যসূচি পরিবর্তন করে শিক্ষার সাম্প্রদায়িকীকরণ করা হয়েছে। গুণগত কোনো পরিবর্তন ব্যতিরেকেই মাদ্রাসা শিক্ষার প্রাপ্ত ডিগ্রিকে দেয়া হয়েছে সাধারণ শিক্ষার সমমান। মাদ্রাসা বাড়ানো ও উন্নয়নের জন্য সরকারি অর্থ বরাদ্দ বাড়ছে। সেভাবে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল খোলার জন্য সরকারি বরাদ্দ বাড়ছে না।

ছাত্র সংগঠনের নাম আগেরটা থাকলেও তারা ক্ষমতাসীন দলের লাঠিয়ালবাহিনীতে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্দোলনের মধ্যে গণজাগরণ মঞ্চ, যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ, বর্ধিত বেতন-ফি কমানো, নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা, বেসরকারি শিক্ষায় ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন ও সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করে করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে প্রগতিশীল ও দেশপ্রেমিক ছাত্রদের নেতৃত্বে সংগঠিত হয়েছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও তরুণেরা।

করোনা মহামারিতে সবচেয়ে বেশি বিপর্যস্ত শিক্ষাব্যবস্থা। প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক, পরিচালনা কমিটি এবং মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের জন্য ৬৩টি নির্দেশনা পালন করার শর্তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলেছে। কিন্তু শিক্ষা কার্যক্রম যথাযথভাবে শুরু করতে হলে এই খাতে সরকারের আরও মনোযোগ ও বিনিয়োগ দরকার। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আসার আহ্বান নয় বরং শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও অর্থনৈতিকভাবে কী ধরনের সমস্যা মোকাবিলা করছে তা বিবেচনায় নিয়ে সমাধানও জরুরি।

করোনাকালে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টায় যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিরাপদে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফেরার মাধ্যমে সব শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিশ্চিত হোক এবারের শিক্ষা দিবসে এই হোক আমাদের সবার চাওয়া।

তথ্যসুত্র:

১. ড. মোহাম্মদ হাননান, বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের ইতিহাস, আগামী প্রকাশনী, ১৯৯৪।

২. আবুল কাশেম, বাষট্টির শিক্ষা আন্দোলন: প্রকৃতি ও পরিধি, ইতিহাস সমিতি পত্রিকা, সংখ্যা ২৩-২৪, ১৪০২-১৪০৪।

৩. বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম।

লেখক: সাবেক ছাত্রনেতা ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও ইন্দিরা গান্ধী

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। গণহত্যা শুরুর মাত্র ১ দিন পর ২৭ মার্চ শনিবার ইন্দিরা গান্ধী গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা করেন। এর ৩ দিন পর ৩১ মার্চ ভারতের লোকসভা বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানায়। ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠককালে বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন ইন্দিরা গান্ধী। গণহত্যার পর তখনও কেউ জানে না বঙ্গবন্ধু কোথায়। তিনি জীবিত নাকি পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করেছে।

চলতি বছর স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে বাংলাদেশ। একই সময়ে উদযাপিত হচ্ছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। বাঙালি জাতির সবচেয়ে কঠিন সময় অর্থাৎ স্বাধীনতাযুদ্ধ চলাকালে যেসব দেশ, পত্রপত্রিকা, সাংবাদিক ও স্বনামধন্য ব্যক্তি সহযোগিতা করেছে তাদের স্মরণ ও শ্রদ্ধা করা জরুরি।

যে দেশের সহযোগিতা ছাড়া ৯ মাসের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের জয় ছিল প্রায় অসম্ভব, সে দেশটি হচ্ছে প্রতিবেশী ভারত। ভারতের জনগণ, সেসময়ের সরকার ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমাদের স্বাধীনতার জন্য যে অবদান রেখেছেন তার কোনো তুলনা হয় না।

পাকিস্তান সামরিক জান্তার গণহত্যার মুখে বাংলাদেশের প্রায় ১ কোটি মানুষ ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করে। স্বাধীনতাযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকার ভারতে থেকেই কার্যক্রম চালিয়েছে। মুক্তিযোদ্ধাদের ভারত শুধু আশ্রয় দেয়নি, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রও দিয়েছে। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সেসময় ভারতে অবস্থানকালে সে দেশের জনগণের সহযোগিতা ও সহমর্মিতার কথা শ্রদ্ধাভরে, কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি। ভারতের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী নেহরুকন্যা ইন্দিরা গান্ধী বাঙালিদের তার দেশে আশ্রয় ও আহার দিয়েছেন, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনের জন্য এবং শত্রুর হাতে বন্দি বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষার জন্য বিশ্বের বহু রাষ্ট্র সফর করেছেন।

বাংলাদেশকে সমর্থনের কারণেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেসময়ের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন সেদেশ সফরকালে ইন্দিরা গান্ধীকে অসম্মান করে এবং হতচ্ছাড়া মেয়েলোক হিসেবে উল্লেখ করে বলে, ‘তাকে আমি দেখে নেব।’ তাছাড়া ক্রুদ্ধ নিক্সন মিসেস গান্ধীকে ‘বিচ’ (কুত্তি) ও বাস্টার্ড (বেজন্মা) বলেও গালি দেয়।

ইন্দিরা জানতেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠেকিয়ে রাখতে নিক্সন-কিসিঞ্জার জুটি যা যা দরকার, তা-ই করবে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র-চীনকে মোকাবিলা করার জন্যই ১৯৭১-এর আগস্টে অন্যতম পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ২৫ বছরের মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষর করে ইন্দিরার ভারত। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী গণহত্যা শুরু করলে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

গণহত্যা শুরুর মাত্র ১ দিন পর ২৭ মার্চ শনিবার ইন্দিরা গান্ধী গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা করেন। এর ৩ দিন পর ৩১ মার্চ ভারতের লোকসভা বাংলাদেশের প্রতি সমর্থন জানায়। ৪ এপ্রিল তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে বৈঠককালে বাংলাদেশকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন ইন্দিরা গান্ধী। গণহত্যার পর তখনও কেউ জানে না বঙ্গবন্ধু কোথায়। তিনি জীবিত নাকি পাকিস্তানিরা তাকে হত্যা করেছে।

বাংলাদেশ সরকার তখনও গঠিত হয়নি। ঠিক ওই সময়ে বাংলাদেশে গণহত্যার নিন্দা ও স্বাধীনতার প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধী অবিস্মরণীয় ইতিহাস সৃষ্টি করেন।

তিনি নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে- পাকিস্তান সামরিক চক্রের বাংলাদেশে গণহত্যার তীব্র প্রতিবাদ ও নিন্দা করেন ২৭ মার্চ। ৩১ মার্চ লোকসভায় গৃহীত সর্বসম্মত প্রস্তাবে প্রতিবেশী বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধের দাবি জানিয়ে বলা হয়, স্বাধীন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম বৈধ ও ন্যায্য। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে উদ্বেগ ও সমবেদনা প্রকাশ করে প্রস্তাবে বলা হয়- “১৯৭০-এর ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পূর্ব বাংলার জনগণ যে নির্ভুল রায় দিয়েছে, সেই গণরায়কে সম্মান দেয়ার পরিবর্তে পাকিস্তান সামরিক সরকার ট্যাঙ্ক, মেশিনগান, বন্দুক, বেয়নেট, ভারী সমরাস্ত্র ও বিমানবহর ইত্যাদি দিয়ে বর্বরোচিত আক্রমণ দ্বারা সে দেশের জনগণকে দমন করার চেষ্টা চালাচ্ছে। এ সভা পূর্ব বাংলায় জনগণের ন্যায্য ও গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সংহতি ঘোষণা করছে। পূর্ব বাংলার নিরস্ত্র জনগণের উপর সকল প্রকার শক্তি প্রয়োগ ও নির্বিচারে গণহত্যা বন্ধের দাবি জানাচ্ছে এ সভা এবং গভীর প্রত্যয় ব্যক্ত করছে যে, পূর্ব বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষের মুক্তির এ ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থান জয়যুক্ত হবে।”

৪ এপ্রিল (মতান্তরে ৩ এপ্রিল) ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের আগের দিন দিল্লিতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর এক ঊর্ধ্বতন পরামর্শদাতা তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে আলোচনাকালে জানতে চান, আওয়ামী লীগ ইতোমধ্যে কোনো সরকার গঠন করেছে কি না। মিসেস গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকের সূচনাতে তাজউদ্দীন আহমদ জানান, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরুর আগে ২৫/২৬ মার্চেই বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করে একটি সরকার গঠন করা হয়।

শেখ মুজিবকেই স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারের রাষ্ট্রপতি এবং মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকে যোগদানকারী সব প্রবীণ নেতাই (পরে ‘হাইকমান্ড’ নামে পরিচিত) ওই মন্ত্রিসভার সদস্য। তখন অনেক নেতার সঙ্গে যোগাযোগ না হওয়া সত্ত্বেও দিল্লিতে সমবেত দলীয় প্রতিনিধিদের পরামর্শে তাজউদ্দীন নিজেকে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে উপস্থাপিত করেন ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে বৈঠকে।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে, তাজউদ্দীন আহমদের এই উপস্থিত সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে অসামান্য শক্তি সঞ্চারিত হয়। সদ্য গঠিত বাংলাদেশ সরকারের আবেদন অনুসারে স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র ৮/৯ দিনের মধ্যে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে সকল প্রকার সহযোগিতা দেয়ার প্রতিশ্রুতি ঘোষণা করেন। ফলে স্বাধীনতা ঘোষণার শুরুতেই স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সম্ভাবনাময় হয়ে ওঠে।

কারো প্রশ্ন থাকতে পারে, ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী এত কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে সাহায্য-সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দিলেন কেন? উত্তরে ৩টি কারণের কথা বলা যেতে পারে:

প্রথমত, ১৯৪৭ সালে পাক-ভারত প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই দুদেশের মধ্যে বৈরী সম্পর্ক ছিল। ১৯৬৫ সালে দুদেশের স্বল্পস্থায়ী যুদ্ধের কথা কারো অজানা নয়। তাছাড়া পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধিকার আন্দোলনের প্রতি গোড়া থেকেই ভারতের সহানুভূতিশীল মনোভাব ছিল।

দ্বিতীয় কারণ ছিল, আদর্শগত। ভারতের কংগ্রেস ও বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সংসদীয় গণতন্ত্র এবং অসাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে বিশ্বাসী। তৃতীয় কারণটি একেবারেই মানবিক। পূর্ব বাংলায় নিরীহ জনগণকে পশ্চিম পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর নির্বিচার হত্যায় সমগ্র দুনিয়ার মানুষ আলোড়িত হয়েছিল।

তাছাড়া ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে পূর্ব বাংলার মানুষের প্রতি ভারতের মানবিক সহানুভূতি ও সমবেদনায় সাড়া পড়েছিল সবচেয়ে বেশি। এমন অবস্থায় ভারত সরকার ও সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরার পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনকে সমর্থন করার রাজনৈতিক ও মানবিক উভয় কারণই সমানভাবে ছিল।

১০ এপ্রিল শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি এবং তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের কথা ঘোষণা করা হয়। সেদিন রাতে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ এক দীর্ঘ ভাষণে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার প্রেক্ষাপটসহ বিস্তারিত বর্ণনা করেন। ভারতের শিলিগুড়ির এক অজ্ঞাত বেতার কেন্দ্র থেকে এ ভাষণ প্রচারিত হয়।

পরে ভাষণটি আকাশবাণীর নিয়মিত কেন্দ্রসমূহ থেকে পুনঃপ্রচারিত হয়। ১৭ এপ্রিল ভারত সরকারের সার্বিক সহযোগিতায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে কুষ্টিয়ার মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগানে স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করে। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ বৈদ্যনাথতলার নতুন নামকরণ করেন মুজিবনগর।

জুলাইয়ের শেষদিকে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি নাটকীয় ঘটনা ঘটল, ভারতের জন্য যা ছিল উদ্বেগজনক। পাকিস্তানের সামরিক সরকারের সহযোগিতায় খুব গোপনে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. হেনরি কিসিঞ্জার চীন সফরে যায়। এই সফরে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এবং কিসিঞ্জারের দূতিয়ালিতে আমেরিকার সঙ্গে চীনের বরফশীতল সম্পর্কের অবসান ঘটে। এই ঐতিহাসিক ঘটনার মধ্যস্থতায় পাকিস্তান বিশ্বের দুই বৃহৎ শক্তির প্রিয়পাত্রে পরিণত হলো।

ভারতের ওপর আরও চাপ সৃষ্টির অসৎ উদ্দেশ্যে নতুন শক্তিতে বলীয়ান পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ২ আগস্ট ঘোষণা করল- রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে কারাগারে আটক শেখ মুজিবুর রহমানের বিচার খুব শিগগিরই শুরু হবে। ভারতের সরকার ও সে দেশের জনগণ জেনারেল ইয়াহিয়ার ন্যক্কারজনক ঘোষণার তীব্র প্রতিবাদ জানায়। দিল্লি, কলকাতা, বোম্বেসহ ভারতের বড় বড় শহরে শেখ মুজিবের বিচারের উদ্যোগের প্রতিবাদ জানিয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সভার আয়োজন করে।

প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সুস্পষ্ট ভাষায় বিশ্ববাসীসহ পাকিস্তানকে জানিয়ে দিলেন, শেখ মুজিবের বিচারের আয়োজন করা হলে এর পরিণতি হবে ভয়াবহ। পাকিস্তানকে মুজিবের বিচারপ্রহসন বন্ধে চাপ দেয়ার জন্য ইন্দিরা বিশ্বের বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানকে চিঠি লিখলেন।

৪ আগস্ট লোকসভায় সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা শেখ মুজিবের জীবন রক্ষার জন্য যেকোনো উদ্যোগ নিতে সরকারের প্রতি দাবি জানায়। তবে যেরকম নাটকীয়ভাবে চীন-মার্কিন সম্পর্ক নতুনভাবে শুরু হয়, এর চেয়ে আরও অধিক নাটকীয়তার মধ্যে দিল্লিতে ৯ আগস্ট ভারত-রাশিয়া মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সর্দার শরণ সিং ও সফররত রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদ্রে গ্রোমিকো ২৫ বছর মেয়াদি ওই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন। এই চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো- চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দুই দেশের একটি যদি তৃতীয় কোনো রাষ্ট্র দ্বারা আক্রান্ত হয়, তখন অপর দেশ তার মিত্রের সাহায্যে এগিয়ে আসবে। সোভিয়েত আক্রান্ত হলে ভারত এবং ভারত আক্রান্ত হলে সোভিয়েত সব রকমের সাহায্য করতে পারবে।

আখেরে এ চুক্তির ফল ভোগ করেছে বাংলাদেশ। ভারত-সোভিয়েত মৈত্রীচুক্তি স্বাক্ষরিত না হলে একাত্তরে ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করতে পারত কি না প্রশ্ন থাকে। ডিসেম্বরে বিজয়ের চূড়ান্ত ক্ষণে সপ্তম নৌবহরের মাধ্যমে আমেরিকা বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্বপ্নকে শেষ করে দিতে চেয়েছিল। ওই বিপদের সময় ত্রাণকর্তা হিসেবে এগিয়ে আসে সোভিয়েত ইউনিয়ন।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জনমত সৃষ্টি এবং পাকিস্তান সরকারের অত্যাচারে ভারতে আসা বাংলাদেশের এক কোটি মানুষের চাপে পিষ্ট ভারতে সেসময়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করার জন্য ইন্দিরা গান্ধী নভেম্বরের দিকে বিশ্বের শক্তিশালী কিছু দেশ সফর করেন। অবশেষে পাকিস্তানই ‘সুযোগ’ করে দেয় ভারতকে। ৩ ডিসেম্বর আকস্মিক ভারত আক্রমণ করে বসে পাকিস্তান। পাল্টা আক্রমণে বাধ্য হয় ভারত সরকার। এ সময় বাংলাদেশ এবং ভারত সরকারের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যৌথ বাহিনী গঠিত হয়।

মুক্তিবাহিনীর গেরিলা হামলায় পাকিস্তানি সৈন্যরা বিভিন্ন স্থানে পিছু হটতে বাধ্য হয়। মুক্তিবাহিনী নব উদ্যমে আক্রমণ শুরু করলে পাকিস্তানি সেনারা বেসামাল হয়ে পড়ে। অবশেষে পর্যুদস্ত পাকিস্তানি বাহিনী ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

আমাদের মুক্তিসংগ্রামে ভারতের অবিস্মরণীয় অবদানের কথা স্বীকার করতেই হবে। সে দেশের জনগণ ও প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সার্বিক সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভ আরও জটিল হতো।

আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধে ১৪ হাজার ভারতীয় সেনাসদস্য জীবন দান করে। পৃথিবীর সব দেশের আগে ভারতই সর্বপ্রথম (৬ ডিসেম্বর) বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়। বাঙালি জাতি প্রতিবেশী ভারত, সে দেশের জনগণ ও মহীয়সী ইন্দিরা গান্ধীকে চিরকাল শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে

স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী হবে যেভাবে

সংবিধান সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। রাষ্ট্রের সেবকের চেয়ে বড় কোনো পদবি আর কী হতে পারে! সরকারি ডাক্তাররাও তাই। অন্য সবাই এই পদ ও দায়িত্বের অবমূল্যায়ন করলেও ডাক্তারদের মতো মানবিক পেশায় নিয়োজিতদের কাছে মানবসেবাই বড় কথা।

মহামারি করোনা পৃথিবীকে বদলে দিয়েছে। বাংলাদেশে করোনা আঘাত হেনেছে ১৮ মাসের বেশি। করোনা আঘাত হানার প্রথমদিকে দেশের সব অফিস-আদালত, কল-কারখানার সঙ্গে কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বন্ধ হয়ে যায় দেশের হাসপাতালগুলোও। এমনকি প্রাইভেট হাসপাতালের জরুরি বিভাগগুলোও বন্ধ ছিল কিছুদিন।

রোগীর স্বজনরা রোগীকে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি করেছেন। কখনও ইমারজেন্সি খালি নেই, কখনও আইসিইউ খালি নেই- এসব অজুহাতে হাসপাতালগুলো রোগী ফিরিয়ে দিয়েছে। মানুষের জন্য সে সময়টা ছিল দুঃস্বপ্নের মতো। তবে করোনাকালে অনেক ঝুঁকি নিয়ে হলেও চিকিৎসকরাই এগিয়ে এসেছেন মানুষের পাশে। হাসপাতালগুলোও খুলেছে চিকিৎসার দ্বার।

আমাদের দুঃস্বপ্ন কি কেটে গেছে? অবস্থার কি ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে? আসলে, করোনাকালে দেশের চিকিৎসাসেবার আসল চিত্রই ফুটে উঠেছে। গত দেড় বছরে আমাকে বহুবার একাধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে আসা-যাওয়া করতে হয়েছে। একবছর আগে আমার শ্বশুর হঠাৎ অসুস্থ হয়ে গেলে তাকে নিকটস্থ এভার কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে যাই। ইমারজেন্সির বাইরে থেকেই অক্সিমিটার দিয়ে তার অক্সিজেন পরীক্ষা করে বলা হলো- আইসিইউ খালি নেই। পরে অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

মাস খানেক আগে গিয়েছি ঢাকা মেডিক্যালে। ইমারজেন্সি বিভাগ থেকে শুরু করে হাসপাতালের ভেতরের করিডোরেও রোগীদের রাখা হয়েছে। সিট খালি নেই। সব সরকারি হাসপাতালেই মোটামুটি একই চিত্র।

মানুষের এই দুরবস্থার সুযোগ নিয়ে অনেক হাসপাতাল রমরমা ব্যবসা করছে। হাসপাতালে নেয়ার আগে আমাদেরকে ভাবতে হয় গলাকাটা বিলের কথা। জরুরি বিভাগে নেয়ার আগেও সাত-পাঁচ ভেবে পা ফেলতে হয়। এভাবে চিকিৎসার পেছনে গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা।

আমাদের ক্রমবর্ধমান চিকিৎসাব্যয় ও ক্রমহ্রাসমান প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবা নিয়ে কারো কোনো মাথাব্যথা নেই। সরকারি হাসপাতালের সরকারি ফি না বাড়লেও ওষুধপথ্য ও অন্যান্য চিকিৎসা সরঞ্জামের দাম দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। এছাড়া ভেজাল ওষুধে দেশ সয়লাব। করোনা ও ক্যানসারসহ নানা জটিল রোগের ভেজাল ওষুধও পাওয়া যায় মহল্লার দোকানে। নামিদামি ব্র্যান্ডের মোড়ক লাগিয়ে ওষুধ এখন তৈরি হচ্ছে দেশেই। ঢাকার মিটফোর্ড বা অন্যান্য এলাকা থেকে অনলাইনে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে হোম ডেলিভারি দেয়া হচ্ছে এসব ওষুধ। দেশে আসল ওষুধ শিল্পের বিকাশ হয়েছে সন্দেহ নেই। কিন্তু নকল ওষুধ তৈরি, সরবরাহ ও বিপণনেও অসাধু ব্যবসায়ীরা পিছিয়ে নেই।

দেশে নানা ক্ষেত্রে উন্নয়ন হচ্ছে এতে সন্দেহ নেই। অন্যান্য সেক্টরের মতো চিকিৎসা ক্ষেত্রেও অবকাঠামোগত উন্নয়ন চোখে পড়ার মতো। সম্ভাব্য ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালগুলোর শয্যাসংখ্যাও বাড়ানো হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন স্থাপনাও নির্মাণ হচ্ছে। ঢাকা মেডিক্যালের নতুন ভবন ও বার্ন ইউনিট সবার নজর কাড়ে। অন্যান্য হাসপাতালেও হয়তো শয্যাসংখ্যা বাড়ানো হতে পারে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা অপ্রতুল। কাজেই, বিদ্যমান হাসপাতালগুর শয্যাসংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।

সংবিধান বলছে, রাষ্ট্র নাগরিকদের জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করবে [১৫(ক)], জনস্বাস্থ্যের উন্নতিসাধনকে রাষ্ট্র তার প্রাথমিক কর্তব্য বলে গণ্য করবে [১৮(১)] । কিন্তু হাসপাতাল যদি রোগী ফিরিয়ে দেয়, ভেজাল ওষুধ খেয়ে যদি রোগীর ক্ষতি হয় তবে রাষ্ট্র কীভাবে তার কর্তব্য পালন করবে? জানি, রাষ্ট্রের পক্ষে এতকিছু করা সম্ভব নয়।

রাষ্ট্র হাসপাতাল তৈরি করে দিতে পারে, সেই হাসপাতাল পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনার জন্য একটি কর্তৃপক্ষ নিয়োগ করে দিতে পারে, ওষুধ তৈরি ও বিপণনের নীতিমালা প্রণয়ন করে দিতে পারে। কিন্তু সেই হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ যদি তাদের দায়িত্বে ও হিসাবের খাতায় নয়-ছয় করে তবে রাষ্ট্র বা সরকার তা কীভাবে তদারকি করবে? আমাদের হয়েছে, ‘সর্ব অঙ্গে ব্যথা, ওষুধ দেব কোথা’ অবস্থা। সে ওষুধেওতো ভেজাল। কুইনাইন জ্বর সারাবে, কুইনাইন সারাবে কে? সরকারকে হাসপাতালও তৈরি করতে হয়, জ্বর সারাতে হয় আবার কুইনাইনও সারাতে হয়। কাজেই সরকার বা রাষ্ট্রের এখন দাঁড়িপাল্লায় ব্যাং মাপার মতো অবস্থা দাঁড়িয়েছে। একটা ঠিক করে তো আর দুইটা বিগড়ে যায়।

দেশে অনেক হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজ হলেও সেগুলো এখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ না বলেই মনে হয়। ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোর সরকারি হাসপাতাল থেকেও রোগী পাঠিয়ে দেয়া হয় ঢাকা মেডিক্যালে। এমনকি বরিশাল, ফরিদপুর, রাজশাহী, রংপুর মেডিক্যাল থেকেও রোগীকে ঢাকা মেডিক্যালে রেফার করা হয়। পূর্ণাঙ্গ আইসিইউ-সেবা পর্যন্ত পাওয়া যায় না ওইসব হাসপাতালগুলোতে। কাজেই দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলোকে আরও সমৃদ্ধ করা হোক, স্বয়ংসম্পূর্ণ করা হোক। শুধু প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল করা নয়।

এদিকে বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। হাসপাতালে একবার ভর্তি হলে এর খরচ কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা বলা মুশকিল। সাধ্যের মধ্যে না থাকায় চিকিৎসার মাঝপথেই অনেক রোগীকে স্বজনরা অন্য হাসপাতাল অথবা বাড়িতে নিয়ে যায়। প্রাইভেট হাসপাতালের চিকিৎসাব্যয় নিয়ে কথা বলার কেউ নেই।

দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে বহুবার কোর্ট-কাচারি পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। সম্প্রতি হাসপাতাল থেকে রোগী ফিরিয়ে দেয়ার বিষয়টি নতুন করে হাইকোর্টের নজরে আনে বাংলাদেশে লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট)। হাইকোর্ট দেশের সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন। একজন রোগীকে জরুরিসেবা দেয়া যেকোনো হাসপাতালের মৌলিক ও নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু এটা যে সব সম্ভবের দেশ!

এই সম্ভবের (জরুরি চিকিৎসাসেবা না দেয়া) বিরুদ্ধে ব্লাস্ট রিট করলে হাইকোর্ট গত রোববার সব হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেন। আদেশে আরও বলা হয়- ‘কোনো অসুস্থ ব্যক্তিকে যখনই হাসপাতাল বা ক্লিনিক অথবা চিকিৎসকের কাছে আনা হয়, ওই অসুস্থ ব্যক্তির তাৎক্ষণিক জরুরি স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অসম্মতি জ্ঞাপন করতে পারবে না।

ব্লাস্টের ওই রিটের রুলে আদালত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দিয়েছেন। বেসরকারি হাসপাতাল বা ক্লিনিকের নতুন লাইসেন্স ইস্যু করার সময় ও লাইসেন্স নবায়ন করার সময় জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থাকতে হবে শর্ত যুক্ত করে দিতে কেন নির্দেশনা দেয়া হবে না, তা জানতে চেয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকের কাছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের রুলের জবাবের ওপর ভিত্তি করে আদালত তার পরবর্তী আদেশ দেবেন। জরুরি স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থাকা হাসপাতাল বা ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার জন্য বাধ্যতামূলক করাই যুক্তিসংগত।

এছাড়া আদালত দেশের স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক চিত্রও প্রতিবেদন আকারে জানতে চেয়েছে। আমরা আদালতের চূড়ান্ত আদেশ ও এর বাস্তবায়নের অপেক্ষায় রইলাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সরকারি প্রতিবেদন ও বাস্তবতা সব সময় এক হয় না। প্রতিবেদন তৈরি করা হয় ডাটাবেজের ওপর ভিত্তি করে আর চিকিৎসা দেয়া একটি মানবিক ও ম্যানুয়াল কাজ। সরকারি হাসপাতালগুলোতে অনেক সুযোগ-সুবিধাই আছে, কিন্তু সেগুলো অচল হয়ে পড়ে আছে। দক্ষ জনবলের অভাবে অনেক দামি মেশিনই অকেজো হয়ে পড়ে আছে অথবা ইচ্ছা করেই সেগুলো কাজে লাগানো হচ্ছে না। গণমাধ্যমে এ খবর আমরা দেখতে পাই।

ফলে রোগী বাধ্য হয়েই বিভিন্ন টেস্টের জন্য প্রাইভেট ল্যাবরেটরিতে যায়। এর সঙ্গে হাসপাতাল প্রশাসনের কোনো যোগসাজস আছে কি না নাকি বিষয়টি নিতান্তই অবহেলাজনিত তা খতিয়ে দেখা দরকার। উচ্চমূল্যে মেশিন প্রকিউর করে কেন তা আজীবন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে ফেলে রাখা হয় তা-ও খতিয়ে দেখতে হবে।

স্বাস্থ্য নিয়ে গত দেড় বছরে সংসদ ও সংসদের বাইরে আলোচনা-সমালোচনা কম হয়নি। ১৫ সেপ্টেম্বরও সংসদে Medical Collegues (Governing Bodies) (Repeal) Bill 2021 বাছাই কমিটিতে পাঠানো ও বিলটির ওপর সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর আলোচনাকালে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনায় সংসদ সদস্য বলেন-‘আমরা এখন পর্যন্ত সরকারি হাসপাতাল এবং বেসরকারি হাসপাতালের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতে পারিনি। যারা আজকে সরকারি হাসপাতালে কর্মরত তারাই আজকে বেসরকারি হাসপাতালের ব্যবসা করছে।’ কাজেই, সরকারি হাসপাতালের নাম, পদবি ব্যবহার করে বেসরকারি হাসপাতালেই বেশি সেবা দেয়া একটি ব্যাধি। ডাক্তারদের এই ব্যাধি দূর করতে হবে।

প্রাইভেট প্রাকটিস বন্ধ করার মতো অবস্থা বাংলাদেশের এখনও হয়নি। তাতে সাধারণ মানুষই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পাবলিক প্রাকটিস (সরকারি হাসপাতালের সেবা) ও প্রাইভেট প্রাকটিসের মধ্যে সমন্বয়ের কাজটি ডাক্তারদেরই করতে হবে।

সংবিধান সরকারি কর্মচারীদের রাষ্ট্রের সেবক হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। রাষ্ট্রের সেবকের চেয়ে বড় কোনো পদবি আর কী হতে পারে! সরকারি ডাক্তাররাও তাই। অন্য সবাই এই পদ ও দায়িত্বের অবমূল্যায়ন করলেও ডাক্তারদের মতো মানবিক পেশায় নিয়োজিতদের কাছে মানবসেবাই বড় কথা। তারা সেটি করছেনও।

আসলে দেশের স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আমাদের একটি পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা চাই। সমস্যা হলে তা নিয়ে বিচ্ছিন্ন ভাবনা সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিত পারে না। আমাদের স্বাস্থ্যসেবার অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম দেখার কেউ নেই, কথা বলার কেউ নেই। পৃথিবীর অনেক দেশেই স্বাস্থ্যসেবা রেগুলেটরি কমিশন আছে। আমাদের দেশেও একটি স্বাস্থ্যসেবা রেগুলেটরি কমিশন হতে পারে। যদিও আমাদের দেশে অনেক কমিশনই আছে। কমিশনের কার্যকারিতাই মূল কথা।

গত বুধবার সংসদে স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা হলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, সমালোচনা আমাকে শক্তিশালী করে। তা করুক। স্বাস্থ্যমন্ত্রী শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশের স্বাস্থ্যসেবাও যদি শক্তিশালী হয় তবে সেটিই কাম্য।

লেখক: আইনজীবী ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো

আঁধার কেটে ওই তো আসে আলো

যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারা বলছিল বাংলাদেশ টিকবে না। পাকিস্তানের কিছু লোক মনে করত- অচিরেই বাংলাদেশের নেতারা তাদের হাতে পায়ে ধরে মাফ চাইবে, বলবে- ভুল হয়েছে হুজুর। আবার আমাদের পাকিস্তানে নিয়ে নেন। সেই বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে! অর্থনীতি ও সামাজিক সব সূচকে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে। পাকিস্তানের সহযোগীরা এসব কেমন করে সহ্য করবে? কিন্তু সরাসরি স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এখন আর সম্ভব না। তাই একটু ঘুরিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছিল- নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। এ জন্য তারা হরতাল ডেকেছিল।

বিদ্যালয় খুলে দেয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীরা ভাগ ভাগ করে ক্লাসে যোগ দিয়েছে। করোনাকালের অভিশাপ থেকে মুক্তি মিলতে শুরু করেছে, এমন বিশ্বাস ক্রমে বাড়ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও হয়ত খুলে যাবে।

রাজনীতির মাঠ উত্তপ্ত হবে, এমন কথা বলছে কেউ কেউ। করোনার মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলো তেমন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারেনি। গত মার্চে ধর্মীয় চরমপন্থি কয়েকটি দল মাঠে নেমেছিল স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উৎসব ভণ্ডুল করার জন্য। তারা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরকে ইস্যু করেছিল।

বলেছিল- বিজেপির এই নেতা গুজরাটে মুসলিম হত্যার জন্য দায়ী। তাকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। এর কিছুদিন আগে এই মহলটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলে দেয়ার হুমকি দিয়েছিল। নরেন্দ্র মোদি মুসলিমবিদ্বেষী, এ বক্তব্যের পেছনে সত্যতা থাকতেই পারে। কিন্তু তার বাংলাদেশ সফর ছিল ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল সর্বশক্তি দিয়ে। তারা এক কোটি নাগরিককে আশ্রয় দেয়। লাখ লাখ মুক্তিযোদ্ধাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করার জন্য প্রশিক্ষণ দেয়। বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি জান্তা যাতে প্রহসনের বিচারে ফাঁসি দিতে না পারে সে জন্য ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের সর্বত্র প্রচার চালান।

সে সময় জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ প্রভৃতি দল ছিল পাকিস্তানের সামরিক জান্তার পক্ষে। তারা আলবদর, রাজাকার বাহিনী গঠন করে। পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে গণহত্যায় অংশ নেয়। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হোক, সেটা তারা চায়নি। কিন্তু তারা সফল হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে গলা মিলিয়ে তারা বলছিল বাংলাদেশ টিকবে না। পাকিস্তানের কিছু লোক মনে করত- অচিরেই বাংলাদেশের নেতারা তাদের হাতে পায়ে ধরে মাফ চাইবে, বলবে- ভুল হয়েছে হুজুর। আবার আমাদের পাকিস্তানে নিয়ে নেন। সেই বাংলাদেশ স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করছে! অর্থনীতি ও সামাজিক সব সূচকে বাংলাদেশ এখন পাকিস্তানের চেয়ে অনেক অনেক এগিয়ে।

পাকিস্তানের সহযোগীরা এসব কেমন করে সহ্য করবে? কিন্তু সরাসরি স্বাধীনতার বিরোধিতা করা এখন আর সম্ভব না। তাই একটু ঘুরিয়ে অগ্রসর হতে চেয়েছিল- নরেন্দ্র মোদিকে বাংলাদেশে আসতে দেয়া হবে না। এ জন্য তারা হরতাল ডেকেছিল। কটি জেলায় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায় তারা। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট- মুক্তিযুদ্ধের অবমাননা। তবে তারা ব্যর্থ হয়। জনগণ তাদের বক্তব্য গ্রহণ করেনি। করোনাকালে এসব শক্তি মানুষের পাশে দাঁড়ায়নি। অর্থনীতির চাকা সচল হোক, এটা চায়নি। তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দিতে বলেছে। এর কারণ শিক্ষার ঘাটতি পূরণ নয়। তারা মতলব গোপন করেনি। বলেছে- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকলে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যায়, সরকারবিরোধী তৎপরতা জোরদার করা যায়। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। ছাত্রছাত্রীরা পড়তে চায়।

সব বাধা জয় করতে চায়। একটি ছবিতে দেখেছি বন্যাকবলিত এলাকায় একটি শিশু কলাগাছের ভেলা চালাচ্ছে বাঁশের লগি দিয়ে, ভেলায় বসা চারটি শিশু। পাঁচজনের মুখেই মাস্ক। করোনাকালের বাস্তবতা। স্কুল ইউনিফর্ম পরেছে সবাই। লগি হাতে ছেলেটির কাঁধে বইয়ের ব্যাগ। ভেলায় বসা চারজনই ছাত্রী, বই হাতে। করোনার প্রায় দেড় বছর বন্ধ থাকার পর স্কুল খুলেছে, সেখানেই চলেছে তারা প্রকৃতির প্রচণ্ড বাধা উপেক্ষা করে। এ ছবিটি ফেসবুকে ঘুরছে, হয়ত কোনো পত্রিকাতেও ছাপা হয়েছে।

আরেকটি ছবি দেখেছি ফেসবুকে- যেখানে কলা গাছের ভেলা নয়, কাঠের নৌকায় চলেছে কয়েকজন। মাঝি ও যাত্রী সবাই মেয়ে- একজন লগি হাতে, অন্যরা বসা। চলেছে স্কুলে- তাদের মুখাবয়বে দৃঢ় সংকল্প- কোনো বাধা মানব না।

২০১৮ সালে সুনামগঞ্জের হাওর এলাকার একটি ছবি প্রকাশিত হয়েছিল ঢাকার একটি সংবাদপত্রে- দুই কিশোরী স্কুলের অবসরের সময় ছুটে গেছে পাশেই তাদের বাড়িতে- একজনের মা রোদে ধান শোকাচ্ছে। দুই ছাত্রী স্কুল থেকে ছুটে এসে তাকে ২০-২৫ মিনিট সাহায্য করে ফের ছুটল স্কুলে- অফ পিরিয়ড সময় যে শেষ!

আমার কেবলই মনে হয়েছে- বেগম রোকেয়া যদি এ দৃশ্য দেখতেন! তিনি নারী শিক্ষার প্রসার চেয়েছেন। জানতেন, এ পথ সহজ নয়। মেয়েরা বাধা পাবে পরিবার থেকে, সমাজ থেকে। তার সময়টি ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ। তারা নারী শিক্ষায় প্রকাশ্যে বাধা দিত না। কিন্তু নারী-পুরুষ, কেবল সীমিত সংখ্যক শিখবে- এটা চেয়েছে। এখন ধর্মের নামে নারীশিক্ষা বাধাগ্রস্ত করার অপচেষ্টা চলছে। বেগম রোকেয়ার জন্য কাজ করা কি আরও কঠিন হতো?

কয়েক বছর আগে সংবাদপত্রে একটি ছবি ছিল লালমনিরহাট এলাকার। বেগম রোকেয়ার জন্মস্থান পায়রাবন্দের কাছেই ওই এলাকা। বন্যার পানিতে স্কুলে যাওয়ার পথের মাটির সড়কের একটি অংশ তলিয়ে গিয়েছিল। একদল ছাত্রী স্কুল ইউনিফর্ম পরা, সেই পানি ভেঙেই চলেছে ক্লাসে। হাতে বই তাদের। এরা কেউ বেগম রোকেয়াকে দেখেনি। কিন্তু তার আদর্শ অনুসরণ করছে। যে স্থানীয় সাংবাদিক ছবিটি পাঠিয়েছিলেন, তার ভাষ্য ছিল ভিন্ন- সড়কটি সময়মতো সংস্কার করা হয়নি বলে বন্যার সময় অশেষ কষ্ট করে ছাত্রীদের স্কুলে আসতে হয়। এ ভাষ্য সঠিক। কিন্তু আমি দেখেছি ছাত্রীদের চোখে-মুখে অদম্য মনোভাব- কেউ আমাদের রুখতে পারবে না। সুলতানার স্বপ্ন এরা বাস্তবে রূপ দেবেই।

মহীয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন চেয়েছিলেন- প্রতিটি নারী যেন এগিয়ে যায়। কেবল পড়াশোনা নয়, রাষ্ট্র ও সমাজ জীবনের সব ক্ষেত্র যেন তাদের দৃপ্ত পদচারণায় মুখরিত হয়। এমনকি তিনি দেশ প্রতিরক্ষার কাজেও নারীদের দেখতে চেয়েছেন সামনের সারিতে।

তার জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত- ১৮৮০ থেকে ১৯৩২, মাত্র ৫২ বছর। এ সময়ের বড় অংশ কেটে গেছে জীবন সংগ্রামে। কত বাধা মোকাবিলা করেছেন তিনি- পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র- বাধার প্রাচীর গড়ে তুলতে কতজনের উৎসাহের যেন শেষ নেই। কিন্তু তিনি থামতে জানতেন না। শত কাজের মধ্যেও লিখে গেছেন, সাহিত্যসাধনায় মগ্ন থেকেছেন। তার রচনা কেবল বাংলাভাষার পাঠকদের জন্য নয়, বিশ্বসাহিত্যেরও অমূল্য সম্পদ।

বাংলাদেশে এখনও এমন শক্তি রয়েছে, যারা নারী শিক্ষা চায় না। কল-কারখানায়, কৃষিতে, গণমাধ্যমে, সরকারি অফিসে নারী কাজ করুক, নিজের অধিকার বুঝে নিক- সেটা চায় না। প্রকাশ্যেই হুমকি দেয়া হয়েছে- নারীকে থাকতে হবে ঘরে। আফগানিস্তানে তালেবান শাসকরা যেমন বলছে- নারীর কাজ কেবল সন্তান উৎপাদন, তাকে প্রকাশ্যে আসা চলবে না।

এর প্রতিবাদ অবশ্য আফগানিস্তানেই আমরা দেখছি। আবার নারীকে ব্যবহার করেই নারী অধিকার খর্ব করার ঘটনা ঘটেছে আফগানিস্তানে। কয়েকদিন আগে ‘অবগুণ্ঠনবতী’ একদল নারীকে তালেবান শাসকরা রাজপথে নামিয়ে দিয়েছিল, যারা বলছে সোচ্চার কণ্ঠে- নারীদের আমরা রাজপথে দেখতে চাই না। তারা দাবি জানাতে পারবে না। তাদের স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া চলবে না। অফিসেও তারা যেতে পারবে না। তারা সাংবাদিকতা করতে পারবে না। টেলিভিশনে মুখ দেখাতে পারবে না। নারীকে ব্যবহার করে নারী স্বাধীনতা হরণের দাওয়াই! বাংলাদেশেও এমনটি ঘটতে দেখছি আমরা।

বাংলাদেশের সৌভাগ্য যে ২০০৯ সালের শুরু থেকে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা নারী শিক্ষার ওপর বাড়ি গুরুত্বারোপ করেছেন। বর্তমানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে (মাদ্রাসাসহ) প্রায় চার কোটি শিক্ষার্থী রয়েছে। এদের অর্ধেক ছাত্রী। তারা পরীক্ষায় ভালো করছে। মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অনেকেই কলেজে পড়াশোনার জন্য ভর্তি হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের চৌকাঠে পা রাখছে।

এটাও লক্ষণীয় যে, বাংলাদেশে এখন শিল্প-কারখানায় যে শ্রমশক্তি, তার বেশিরভাগ নারী। তাদের কারণে রপ্তানি খাত সচল। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ তেজি। কৃষিতেও সফল। কে তাদের অগ্রযাত্রায় বাধার প্রাচীর তৈরি করে সফল হবে?

করোনাকালে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেক ছাত্রীর বিয়ে হয়েছে, এমন উদ্বেগজনক খবর দেখেছি। বাল্যবিবাহের ঘটনাও এসেছে সংবাদপত্রে। এ সব নিঃসন্দেহে উদ্বেগের। কিন্তু রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যে উজ্জ্বল আলোকশিখা ধরে আছেন, তা পথ দেখাচ্ছে নারীর অগ্রযাত্রায়, কে তাদের রুখবে? সংবাদপত্রে ও সামাজিক গণমাধ্যমে যে সব ছবি ভাইরাল, আমাদের ভরসাস্থল তো আছেই!

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিকতায় একুশে পদকপ্রাপ্ত।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন