শর্ট নোটিশে ‘শাটডাউন’!

শর্ট নোটিশে ‘শাটডাউন’!

লকডাউন দেয়ার কথা তো আরও আগেই। লকডাউন যে প্রয়োজন তা মানুষকে বোঝানো উচিত ছিল সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের মধ্য দিয়ে। লকডাউনের সময় কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, কেন সেটা মানা জরুরি তা বুঝতে ও বোঝাতে মানুষকে আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন ছিল। আরও আগেই দেয়া দরকার ছিল লকডাউন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন লকডাউন তো কেবল একটি ঘোষণা নয়। এর সঙ্গে সম্পর্কিত সারা দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোই। মানুষের চিকিৎসা, কর্মপদ্ধতি, জীবন যাপন কী হবে সব বিষয়ে সমন্বয় দরকার ছিল। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতাও রয়েছে।

শাটডাউন শব্দটির অর্থ খুঁজবার চেষ্টা করি চিকিৎসাবিজ্ঞানে। না নেই, কোথাও নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞানের কোথাও শাটডাউন শব্দটি নেই। এপিডেমিওলজি যারা পড়েছেন তারা কেউই সম্ভবত এই শব্দের সঙ্গে পরিচিত নন। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও শব্দটি এপিডেমিওলজির কোথাও পাইনি। দু’চারজন সিনিয়র প্রফেসরের সঙ্গে আলাপ করলাম, না, তাদেরও জানা নেই। তাহলে সরকারি বিশেষজ্ঞরা ‘শাট ডাউন’ কোথায় পেলেন তা আমার কাছে বিস্ময়। শুধু আমার কাছে কেন অনেকের কাছে নিশ্চয়ই।

করোনা পরিস্থিতি কি আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি? যদি রেখে থাকি তাহলে তো অন্যান্য দেশের চিত্র থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত ছিল। অনেক দেশেই করোনা চলে যাবার পরও আবার আঘাত হেনেছে। তাদের প্রস্তুতি ছিল, ফলে তারা মোকাবিলা করতে পেরেছে। এখানে যে করোনা বাড়ছে তা তো সাদা চোখেই দেখা যাচ্ছিল। ইন্ডিয়ান ভেরিয়েন্ট, ডেল্টা ভেরিয়েন্ট সবই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কী সচেতন করেছে মানুষদের? কিছু বিজ্ঞাপন প্রকাশ করাই কি সচেতনতা? দায়সারাভাবে কাজ করলে সে কাজের সুফল পাওয়া দূরের কথা, ফল পাওয়াও দুষ্কর। সাত জেলার সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে কঠোর কোনো নিয়ম কানুন মানা হয়নি। যা হয়েছে তা সবাই জানেন।

কিছু লোক জীবন না জীবিকা এমন বিতর্ক নিয়ে ব্যস্ত । জীবন থাকলেই তো কেবল জীবিকা। জীবন নেই তো জীবিকা কীসের, এ নিয়ে কেন তর্ক করতে হবে? যারা এই অমূলক বিতর্ককে উস্কে দিচ্ছেন তাদের কোনো না কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে। সুবিধাবাদীরা সব সময়, সব ক্ষেত্রেই সুবিধা নিতে চায়। হোক সেটা করোনাকাল বা যেকোনো সময়। তবে সরকারের ব্যর্থতাও রয়েছে। ব্যর্থতা প্রণোদনায় নয়। বিতরণ ও ব্যবস্থাপনায়। সরকারের প্রণোদনা যদি সঠিকভাবে তৃণমূল পর্যন্ত সাধারণ মানুষের মধ্যে পৌঁছাত তাহলে মানুষ জীবিকা নিয়ে এত দুশ্চিন্তা করত না। কিন্তু রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অসততা, অসচ্ছতা, স্বেচ্ছাচারিতা মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অসন্তোষ তৈরি করেছে। মাস্ক নিয়ে অনিয়ম, চিকিৎসকদের প্রতিশ্রুত পারিশ্রমিক পরিশোধ না করা, করোনা সার্টিফিকেটের অসৎ বাণিজ্য এমনকি হঠাৎ করে একটি হাসপাতালের উধাও হয়ে যাওয়া মানুষকে চরম বিরক্তির মধ্যে রেখেছে।

লকডাউন দেয়ার কথা তো আরও আগেই। লকডাউন যে প্রয়োজন তা মানুষকে বোঝানো উচিত ছিল সচেতনতামূলক প্রচারাভিযানের মধ্য দিয়ে। লকডাউনের সময় কীভাবে স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে, কেন সেটা মানা জরুরি তা বুঝতে ও বোঝাতে মানুষকে আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন ছিল। আরও আগেই দেয়া দরকার ছিল লকডাউন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন লকডাউন তো কেবল একটি ঘোষণা নয়। এর সঙ্গে সম্পর্কিত সারা দেশের মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোই। মানুষের চিকিৎসা, কর্মপদ্ধতি, জীবন যাপন কী হবে সব বিষয়ে সমন্বয় দরকার ছিল। পাশাপাশি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতি জনগণের আস্থাহীনতাও রয়েছে।

হঠাৎ করে লকডাউনের বদলে ‘শাটডাউন’, কোভিড-১৯ এর জাতীয় পরামর্শক টিমের এমন প্রস্তাবনায় রীতিমতো ভড়কে গেছে মানুষ। কেউ কেউ মনে করছেন, সোমবার নয়, আজ থেকেই শাটডাউন। এমনকি টার্মটি ফাইনালি লকডাউন না শাটডাউন হবে তা নিয়েও রয়েছে ধোঁয়াশা। ফলে কোথায় যাবে, কী করবে সাধারণ মানুষ, জীবিকা অন্বেষণের কী হবে— এমন অনেক প্রশ্নে মানুষ এখন দিশেহারা। মানুষ ছুটছে রেল স্টেশনে, ছুটছে লঞ্চ ঘাটে, ছুটছে বাসস্ট্যান্ডে— কেউ বা পায়ে হেঁটে ছাড়ছে শহর। বাড়ছে ভিড়। যেকোনো টার্মিনালেই এখন শুধু মানুষ আর মানুষ, ভোগান্তির শেষ নেই। অথচ একটু সময় নিয়ে যদি সতর্ক করা হতো, নির্দেশনা দেয়া যেত তাহলে ভোগান্তি কমত। কমত করোনাও।

লেখক: সাংবাদিক কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরো হবে না তো?
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি
শেখ হাসিনার অসাধারণ নেতৃত্ব ও অগ্রযাত্রার কথা
মুজিববর্ষে গৃহহীনদের বাড়ি
ক্লাব-সংস্কৃতি ও আমাদের সাংস্কৃতিক দায়

শেয়ার করুন

মন্তব্য