মানবাধিকারে অ্যালার্জি

মানবাধিকারে অ্যালার্জি

মিয়ানমারের বিষয়ে মানবাধিকারের বিপরীতে শুধু চায়নাই হাঁটেনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই হাঁটছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সব থেকে বড় সংগঠন ‘আশিয়ান’-ই প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন- সেখানে যখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে বৈধ সরকারপ্রধান হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়, সে সময়ে মিয়ানমারের রাস্তায় নারী ও শিশুর লাশ।

চায়না সরকারের একটি মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস অন্যান্য দেশের সরকারি মুখপত্র থেকে অনেক বেশি রাখঢাক না করেই লেখে। এ কারণে তাদের সরকারের মনোভাব ও অনেক নীতির কিছু আভাস সেখানে পাওয়া যায়। এই গ্লোবাল টাইমসে গত বেশ কয়েক মাস বা বছরের কাছাকাছি হবে- লক্ষ করা যাচ্ছে, মানবাধিকারে তাদের অনেক বেশি অ্যালার্জি।

বরং যেসব বিষয় নিয়ে চায়নায় মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে বলে পশ্চিমা দুনিয়ায় প্রশ্ন ওঠে, সেগুলোর তারা বেশ সরাসরি জবাব দিয়ে তাদের দেশের অবস্থানের ন্যায্যতা প্রমাণের চেষ্টা করে। এর পাশাপাশি একটু মিলিয়ে দেখলে দেখা যায়, অন্য দেশে যখন সত্যি সত্যি মানবাধিকার খুব বড়ভাবে লঙ্ঘন হয়, তখন তারা চুপ করে থাকে। এর থেকে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায় চায়না সরকারের নীতি, পৃথিবীর যেখানে যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন হোক না কেন, তাদের তাতে মোটেই মাথাব্যথা নেই।

তাদের প্রতিবেশী মিয়ানমারে এ মুহূর্তে পৃথিবীতে সব থেকে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে। আগেও হয়েছে। আগেও চায়নাকে এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্য করতে কেউ শোনেনি। এখনও শুনছে না। বরং তারা চেষ্টা করে যাচ্ছে, কত দ্রুত মিয়ানমারের অবস্থা স্বাভাবিক করতে পারে মানবাধিকার লঙ্ঘিত সরকারকে দিয়ে।

চায়নার এই সমর্থনের কারণে সেখানে যারা সরকারের দ্বারা নির্যাতিত হচ্ছে তারা ক্ষুব্ধ চায়নার ওপর। চলতি মাসের ১১ তারিখে বড় আকারের বোমা মেরেছে চায়নার একটি কারখানার ওপর। এরপরও চায়না তাদের নীতি থেকে সরে এসে মিয়ানমারের সাধারণ মানুষের আন্দোলন ও নির্বাচিত সরকারের পক্ষের আন্দোলনকে কোনো সমর্থন না দিয়ে বরং ভিন্নপথে হেঁটেছে। তার পরের দিনই চায়নার রাষ্ট্রদূত মিয়ানমারের সামরিক সরকারপ্রধানের সঙ্গে দেখা করে তাকে সহযোগিতার আরও আশ্বাস দিয়েছে।

মিয়ানমারের বিষয়ে মানবাধিকারের বিপরীতে শুধু চায়নাই হাঁটেনি। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশই হাঁটছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সব থেকে বড় সংগঠন ‘আশিয়ান’-ই প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন- সেখানে যখন মিয়ানমারের সামরিক সরকারকে বৈধ সরকারপ্রধান হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ দেয়া হয়, সে সময়ে মিয়ানমারের রাস্তায় নারী ও শিশুর লাশ।

দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর ভেতর একমাত্র জাপান ছাড়া আর সব দেশই কখনই মানবাধিকারের কোনো গুরুত্ব দেয় না। সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া এসব দেশেই গণতন্ত্র আছে। কিন্তু কেউই গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত মানবাধিকারের বিষয়টিকে কোনো রকম দায়িত্ব বলে মনে করে না। বরং ফিলিপাইনের প্রেসিডেন্ট তো একবার হুমকিই দিয়েছিলেন, মানবাধিকারকর্মীরা যদি তার এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ের বাধা হয়, তিনি মানবাধিকারকর্মীদের প্রতিও গুলি চালাতে নির্দেশ দিতে দ্বিধা করবেন না। তার উদ্দেশ্য মহৎ ছিল।

তিনি দেশ থেকে মাদক উচ্ছেদ ও মাদক চোরাচালান বন্ধ করার জন্য এক্সট্রা জুডিশিয়াল কিলিংয়ে নেমেছিলেন। শুধু ফিলিপাইন নয়, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরও অনেক দেশ, দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশ ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশও এ পথে গেছে। কেউই পারেনি মাদক নির্মূল করতে। আসলে তরবারিতে যদি শান্তি ও সমাধান হতো তাহলে তো মধ্যযুগেই পৃথিবীতে সব থেকে বেশি আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হতো। কারণ, তখন তরবারি আরও বেশি ব্যবহৃত হতো। মানুষকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জন্যে, যে রাষ্ট্র সিকিউরিটি ও আইনের শাসন দেবে। যেখানে বিচারের মাধ্যমে ছাড়া কাউকে হত্যা করা যাবে না, এমন একটি রাষ্ট্র তৈরির জন্যে মানুষকে এই দীর্ঘ সংগ্রামের পথে হাঁটতে হতো না।

চায়না এখন হংকংয়ের প্রেসের ওপর হামলা করেছে। এর সপক্ষেও তাদের মেইন ল্যান্ডের মিডিয়াগুলো কথা বলছে। তারা প্রেসের ওপর ওই হামলাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে না দেখে বরং ওই মিডিয়া হাউসটিই ক্ষতিকারক হিসেবে চিহ্নিত করছে।

চায়না এত দিন পৃথিবীর অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেদের উপস্থিত করছিল। গত কয়েক বছর নিজেরদের রাজনৈতিক শক্তি হিসেবেও আবির্ভূত করার চেষ্টা করছে। তারা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি থেকে আমেরিকা ও জাপানকে হটিয়ে দিতে চাচ্ছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দুটি দেশ এখন মোটামুটি তাদের রাজনৈতিক করতলে। পাকিস্তান শতভাগ, শ্রীলঙ্কা অনেকখানি। তারা নেপালের রাজনীতিতেও প্রকাশ্যে প্রবেশ করেছে।

এমনকি কিছুদিন আগে ইন্দো-প্যাসেফিক জোটের ও তাদের প্রস্তাবিত কোয়াডে বাংলাদেশের যোগদান করা না করার বিষয় নিয়ে কোনো কারণ ছাড়াই মন্তব্য করেছে। যা শুধু বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কথা বলা নয়, সরাসরি জানিয়ে দেয়া বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সহযোগী শুধু চায়না থাকবে না, এ দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়েও তাদের একটি অবস্থান থাকবে।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার পরে দেখা যাচ্ছে চায়না চেষ্টা করছে সেন্ট্রাল এশিয়া ও আফ্রিকার কিছু দেশে তাদের রাজনৈতিক উপস্থিতি নিয়ে যেতে। কিন্তু চায়না যখন তাদের এই রাজনৈতিক উপস্থিতি নিয়ে যেতে চাচ্ছে, সে সময়ে এটাও পরিষ্কার হয়েছে, চায়নার যে রাজনৈতিক পথ তাতে মানবাধিকারের কোনো অবস্থান নেই। তাই সে উইঘুর হোক আর হংকংয়ের প্রেস হোক।

পূর্ব এশীয় দেশগুলো কমবেশি রেজিমেন্টাল সোসাইটির দেশ। কিন্তু দক্ষিণ এশীয় দেশগুলো মোটেই রেজিমেন্টাল নয়। বরং অনেক বেশি আর্গুমেনটেটিভ। এমনকি পাকিস্তানের সোসাইটিও। ইমরান খান সব ক্লাসে কোরআন শরিফ পড়া বাধ্যতার পথে হাটঁছেন, তা নিয়ে তাদের সমাজে সরবে অনেকই বলছেন, পবিত্র ধর্মগ্রন্থ বাসায় বসে পড়ার। এটা সিলেবাসের পড়ার জন্যে হতে পারে না। এর থেকে বোঝা যায়, পাকিস্তানের সোসাইটি কতটা আর্গুমেনটেটিভ। শ্রীলঙ্কাও এর থেকে কম নয়। আর ভারত ও বাংলাদেশ আরও বেশি।

ভারত ও বাংলাদেশে যে রাষ্ট্রনায়কই মানুষের ব্যক্তিগত মানবাধিকারকে অস্বীকার করে ও প্রেসের ওপর বা মিডিয়ার ওপর কঠোরতা প্রয়োগ করে দেশ ও সমাজ চালাতে গেছেন। তিনি তার বিপরীত প্রতিক্রিয়া নিউটনের থিওরিকেও ছাড়িয়েও আরও বেশি মাত্রায় পেয়েছেন। অনেকেই এ আঘাতে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন বা নির্বাচনে হেরেছেন।

ইন্দিরা গান্ধীর মতো জনপ্রিয় নেত্রীকেও জরুরি আইন জারি করার পর মানুষের মৌলিক অধিকার ও প্রেসের ওপর হাত দিয়ে নির্বাচনে হারতে হয়েছিল মাত্র তেরো দিন বয়সের একটি জোটের কাছে। আফ্রিকার দেশগুলোতে অনেক এথনিক সংঘাত আছে। তারপরেও তারা রেজিমেন্টাল সোসাইটি নয়। বরং অনেক বেশি পশ্চিমা গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের চরিত্রে বিশ্বাসী। সেখানেও মানবাধিকার-বর্জিত রাজনীতি চালু করা সম্ভব নয়।

আরও সত্য হলো বর্তমান বিশ্বে মানবাধিকার-বর্জিত রাজনীতি নিয়ে শেষ অবধি কেউ টিকতে পারবে না। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষই এখন অনেক বেশি উন্মুুক্ততায় বিশ্বাসী। এ সময়কে যে দেশ বা যে শক্তি অস্বীকার করবে- তারাই ভুল করবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’

‘অমল ধবল পালে লেগেছে মন্দ মধুর হাওয়া’

শরতের শান্ত শ্যামল রৌদ্রছায়ার সঙ্গে ধানের খেতে ঢেউ খেলে যায় আবহমান বাংলার কৃষকের প্রাণ। কারণ কৃষিভিত্তিক এ দেশে শরৎই আগাম বারতা নিয়ে আসে সুদিনের সুদৃঢ় নিশ্চয়তার, বেঁচে থাকার অনিঃশেষ আশ্বাস জানিয়ে দেয়, নবান্ন সমাগত।

আষাঢ়-শ্রাবণের অঝোর বর্ষণ শেষে মেঘাচ্ছন্ন সকাল ধীরে ধীরে উজ্জ্বল, পরিপাটি হতে থাকে। পাতার ফাঁক গলে সোনালি সূর্যের কিরণ মৃত্তিকার বুকে অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে আসে শ্বেতশুভ্র শরৎ।
এবারেও শরৎ এসেছে চুপিচুপি, ঠিক গেল বছরের মতো। শ্রাবণের রেশ এখনও কাটেনি। থেমে থেমে বৃষ্টি, বর্ষাকেই মনে করিয়ে দেয় প্রবলভাবে৷ মহামারি না কি জলবায়ুর পরিবর্তন; কোন কারণে ঋতু বৈচিত্র্যের এ অঞ্চলের ঋতুরা ভিন্ন আচরণ করছে বোঝা যাচ্ছে না। অথচ শুভ্রাকাশে সাদা মেঘের সঙ্গে হালকা মৃদুমন্দ হাওয়া মিলেমিশে তৈরি হওয়া চমৎকার মনমোহন আবেশই বলে দিত শরৎ এসেছে।
ঋতু বৈচিত্র‍্যের সেই প্রকৃতি কেমন যেন পাল্টে গেছে। বছরের অল্প কিছু সময় বাদ দিলে বাকি সময়টা তীব্র গরমের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। মাঝেমধ্যে বৃষ্টিও হয়। সেই বৃষ্টিতে আর্দ্রতার পরিমাণ বেড়ে গিয়ে ভ্যাপসা গরমে জীবন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণের জাঁতাকলে পড়ে শরৎ তার বৈশিষ্ট্য হারিয়েছে অনেকখানি, বিন্যাসে এসেছে পরিবর্তন। তাই তো শরতের এই দ্বিতীয় পক্ষেও বলতে হচ্ছে 'আবার শ্রাবণ হয়ে এলে ফিরে, মেঘ-আঁচলে নিলে ঘিরে'।
শরৎ ঠিক তেমনই এক ঋতু যা শীত-গ্রীষ্মের মেলবন্ধন তৈরি করে। শরতের শেষদিকে শীতের প্রস্তুতি নিতে শুরু করে সবাই। বর্ষার অনুজ্জ্বল দিনের পর শরতের হালকা সাদা মেঘের মতো আমাদের মনও যেন হালকা হতে থাকে। শরতের দিনগুলোকে তাই স্বপ্নের মতোই মনে হয়। মনের গহীনে ছড়িয়ে থাকা নানা রকমের স্বপ্ন কুড়িয়ে আমরা ভবিষ্যতের মালা গাঁথি।

শরতের আকাশ-বাতাস, নদী-ফুল, প্রকৃতি; সবকিছুই শান্ত স্নিগ্ধ মায়াময়। বিলের শাপলা, নদীতীরের কাশফুল, উঠোনের শিউলি সবই কোমল, স্নেহমাখা। যখন বিলের মন্থর বাতাসে দোল খায় শাপলা ফুলেরা, যখন টুপটাপ ঝরে পড়ে শিউলি ফুল, যখন ঢেউহীন শান্ত নদীর দুকূল ছাপিয়ে দৃশ্যমান হয় কাশবনের রুপালি নান্দনিক দৃশ্য, তখনই মনোজগতে অনুভূত হয়- শরৎ এসেছে।
শরতের স্নিগ্ধতাকে মোহময় করে তোলে এ মৌসুমের বিচিত্র ফুলেরা। নদী কিংবা জলাশয়ের ধারে ফোটে কাশ, ঘরের আঙিনায় শিউলি বা শেফালি, খাল-বিল, পুকুর-ডোবায় থাকে অসংখ্য জলজ ফুল। শেষরাতে মৃদু কুয়াশায় ঢেকে থাকা মায়াবী ফুলেরা যেন আরও রূপসী হয়ে ওঠে।

শিশিরভেজা শিউলি, বাতাসে মৃদু দোল খাওয়া কাশবনের মঞ্জরি, পদ্ম-শাপলা-শালুকে আচ্ছন্ন জলাভূমি শরতের চিরকালীন রূপ। সত্যিই বিচিত্র রূপ নিয়ে শরৎ আমাদের চেতনায় ধরা দেয়। মেঘ, আকাশ আর কাশফুলের ছায়া পড়ে নদীর নীলজলে। এমন মনোলোভা দৃশ্য শরৎ ছাড়া অন্যকোনো ঋতুতে দেখা পাওয়া ভার।
প্রকৃতির এক শুদ্ধ রূপ শরৎ। শরতের প্রকৃতি বর্ষার অবগুণ্ঠন ভেদ করে শুভ্রতার আচ্ছাদনে আবিষ্ট হয়ে অনন্য সাধারণ হয়ে ওঠে। জলহারা শুভ্র মেঘের দল নীল নির্জন নির্মল আকাশে উদ্দাম ভেসে বেড়ায়। সেই সঙ্গে কাশফুলের মৃদু বাতাসে দোল খাওয়া প্রকৃতিতে শুধুই মুগ্ধতা ছড়ায়। তখনই স্নিগ্ধতার আবেশ ছড়িয়ে স্মৃতিতে দোলা দেয়, চঞ্চল চপলতায় নিমগ্ন হতে মন চায়।

সোনা ঝরা সকাল, নির্লিপ্ত দুপুর, রুপালি বিকেল কিংবা শান্ত নির্মেঘ সন্ধ্যার পর ভরা পূর্ণিমায় উদ্ভাসিত আলোয় স্নিগ্ধ হয়ে ওঠে চরাচর। অলৌকিক সৌন্দর্যে মোহময় মায়ায় প্রবল ঘোর তৈরি হয়। কবিগুরুর বন্দনাতেও সেই মুগ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে। এই শরতেই প্রিয়তমাকে দেখার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেছেন- “তোমায় দেখেছি শারদ প্রাতে, তোমায় দেখেছি মাধবী রাতে।”
কামিনী শেফালী টগর ছাতিম কাশফুল আর গগনশিরীষের শৈল্পিক শুভ্রতার সঙ্গে দিনভর মায়াময় আলোছায়ার খেলা আর রাতের স্নিগ্ধ মোহময় জ্যোৎস্না গায়ে মেখে রোজকার জীবনের কঠিন বাস্তবতায় হতাশা আর কষ্টের মাঝেও শুভ্রতার পরশে সজীব হয়ে ওঠে প্রাণ। বিমগ্ন হৃদয় আত্মহারা হয়ে দুঃখকে সাথি করেই এগিয়ে যেতে চায়- “দুঃখকে আজ কঠিন বলে,/ জড়িয়ে ধরতে বুকের তলে,/ উধাও হয়ে হৃদয় ছুটেছে,/ প্রাণে খুশির তুফান উঠেছে।”

নদীর তীরে, বনের ধারে, মেঠোপথে, গ্রামের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে, এমনকি শহরের কোলাহলেও একটুখানি জলমগ্ন স্থানে অপরূপ শোভা ছড়িয়ে বিকশিত হয় কাশফুল । বিলে-ঝিলে শাপলা-শালুক, পদ্মরা মেলে ধরে তাদের মোহময় মাধুর্য। এমন নিরুপম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পুলকিত করেনি তেমন মানুষ খুঁজে পাওয়া ভার। শরতের শান্ত স্নিগ্ধ রূপ মনে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়- “শরৎ-আলোর আঁচল টুটে,/ কিসের ঝলক নেচে উঠে,/ ঝড় এনেছ এলোচুলে,/ তোমার মোহন রূপে কে রয় ভুলে।” শরৎকে কি ভোলা যায়?

নির্জন মাঠে নিঃশব্দে বেড়ে ওঠা সবুজ ধানের নয়নাভিরাম দৃশ্য, শুধু কৃষকের হৃদয় মন জুড়ায় না, প্রতিটি প্রাণ উন্মনা হয়, চোখে সোনালি স্বপ্ন খেলা করে, খুশির ঝিলিক বয়ে যায়।

শরতের শান্ত শ্যামল রৌদ্রছায়ার সঙ্গে ধানের খেতে ঢেউ খেলে যায় আবহমান বাংলার কৃষকের প্রাণ। কারণ কৃষিভিত্তিক এ দেশে শরৎই আগাম বারতা নিয়ে আসে সুদিনের সুদৃঢ় নিশ্চয়তার, বেঁচে থাকার অনিঃশেষ আশ্বাস জানিয়ে দেয়, নবান্ন সমাগত।

নিস্তরঙ্গ জীবনে বাংলার ঋতুরা বৈচিত্র্য আর ভালোবাসার পসরা নিয়ে আসে প্রাত্যহিক জীবনের দুঃখ কষ্ট ভুলিয়ে দিতে। সুখ-দুঃখের একঘেঁয়ে ক্লান্তিকর জীবনে একটুখানি অনুরক্তি আসক্তি দোলা দেয়, আশা জাগায়।

স্নিগ্ধ শান্ত শুভ্র শরৎও হৃদয়কে আর্দ্র করে, অবসাদ দূর করে জাগতিক জীবনে এনে দেয় অপার্থিব মোহনীয় কাব্যময়তা। বেঁচে থাকাটা অর্থপূর্ণ মনে হয়। পাওয়া না পাওয়ার হিসাব বাদ দিয়ে বিচিত্রতর উপলব্ধি নিয়ে সামনের পানে এগোতে ইচ্ছে করে-“আমার রাত পোহালো শারদ প্রাতে। বাঁশি, তোমায় দিয়ে যাব কাহার হাতে।”

হৃদয়ের গোপন গভীর থেকে আত্মতুষ্টির রিনিঝিনি দ্যোতনা ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র অস্ত্বিত্বে, নতুন করে বাঁচার অনুভূতি জাগে- জীবন সত্যিই আনন্দময়।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক।

শেয়ার করুন

চলমান শিক্ষাভাবনা

চলমান শিক্ষাভাবনা

একটি জাতির সংস্কৃতি তার ভাষার বাহনে চড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা হারিয়ে ফেললে প্রজন্ম সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে যেকোনো অশুভ শক্তি আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করতে পারবে সহজে। পাকিস্তানি শাসকচক্র এ সত্য ১৯৪৭ সালেই বুঝেছিল। তাই বাংলা ভাষার ওপরই প্রথম আঘাত করে। আমাদের পূর্বসূরিরা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে আত্মপরিচয়কে সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু চৈতন্য-বিচ্ছিন্ন আমরা নানাভাবে একে লালন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

সম্প্রতি স্কুলশিক্ষায় নতুন কারিক্যুলাম-ভাবনা উপস্থাপন করেছে শিক্ষামন্ত্রণালয়। এ রূপকল্প ২০২৩ থেকে কার্যকর করার কথা রয়েছে। প্রাথমিক দৃষ্টিতে রূপকল্পটি উৎসাহব্যঞ্জক। এতে শিক্ষাব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ বাঁক আসবে বলে আমরা মনে করি। তবে কিছু ক্ষেত্রে পুনর্মূল্যায়ন ও সংস্কারের অবকাশ রয়েছে। আশা করব দায়িত্বশীলতার সঙ্গে মন্ত্রণালয় সেসব বিষয় বিবেচনা করবে। এখানে বড় প্রশ্ন শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি নিয়ে আমরা কতটা সক্রিয় হতে পারছি এবং সে বিষয়টির ওপর কতটা দৃষ্টি দেয়া হচ্ছে।

প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি এলে আমরা ভাষা প্রশ্নে নড়েচড়ে ওঠি। বাংলা ভাষার মর্যাদা নিয়ে কথা বলি। একুশে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে পৃথিবীর তাবৎ ভাষার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন নিয়ে আমাদের দায়দায়িত্বের কথাও বলি।

টেলিভিশন চ্যানেলগুলোকে মুখর-মুখরা জ্ঞানীজন টকশো মুখরিত করে। চমৎকার শব্দমালায় বক্তৃতার মঞ্চ আমোদিত হয়। পত্রিকার পাতায় নানা শিরোনামে প্রকাশিত হয় নিবন্ধ। আসলে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ দিনগুলোর গুরুত্ব এখানেই যে, অন্তত সেই বিশেষ দিন যে চৈতন্য ধারণ করে আছে, সারা বছর তা পাথরচাপা থাকলেও বছরের বিশেষ সময়ে দৃশ্যমান হয়। এতেও যদি নতুন করে দেশের কিছুসংখ্যক মানুষ এবং নীতিনির্ধারকগণ প্রাণিত হতে পারে- তাহলেইবা মন্দ কী!

একুশ আমাদের অহঙ্কার হলেও একুশের মূল চেতনা থেকে আমরা ক্রমে দূরে সরে যাচ্ছি। এটি আমাদের সামাজিক সচেতনতা ও শিক্ষা সংকটের বড় দিক। এ সংকট তৈরি হচ্ছে প্রধানত সংস্কৃতিবোধ ও ইতিহাস চেতনা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে। যেখানে ইতিহাস ও ঐতিহ্যচর্চা জরুরি সেখানে দশম শ্রেণি পর্যন্ত অভিন্ন শিক্ষার ধারায় ইতিহাস পাঠকে গুরুত্বহীন করে ফেলা হয়েছে।

ভাষা-আন্দোলনের পর প্রায় সত্তর বছর পেরিয়ে গেলেও বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির যতটুকু বিকাশ ঘটার কথা ছিল তার সিকিভাগও হয়নি। কিছু ক্ষেত্র আবার অপূর্ণ স্বাজাত্যবোধের কারণে ভূতের পায়ে হেঁটে পিছিয়েও গেছে। এমন কথাও চলে আসছে যে, বিশ্বায়নের যুগে বাংলা ভাষাচর্চা অত জরুরি কেন? এখন বিশ্ব-সংস্কৃতির জোয়ারে গা ভাসাব- বাঙালি সংস্কৃতি নিয়ে পড়ে থাকা কেন? ফলে একই দেশে তিন-চার ধরনের শিক্ষা ব্যবস্থা অসম প্রতিযোগিতায় এগোচ্ছে। এই জগাখিচুড়ির মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বাংলা ভাষা ও বাঙালি সংস্কৃতি।

স্পষ্টতই চারটি শিক্ষাধারা এখন প্রচলিত। মূলধারার বাংলা মাধ্যম স্কুল এবং এর ইংরেজি ভার্সন, ইংরেজি মাধ্যম স্কুল, আলিয়া-ধারার মাদ্রাসা এবং কওমি মাদ্রাসা। আগে বাংলা মাধ্যম স্কুলগুলোর পাঠক্রম ও পরিচর্যাতে বাংলাচর্চায় ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের সচেতনতা যতটা ছিল, এখন আর তেমনটি নেই। এসএসসি ও এইচএসসির ফলাফলে এ প্লাস বা স্বর্ণখচিত এ প্লাস পাওয়ার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকগণ শুদ্ধ বানান ও ভাষায় বাংলাচর্চার দিকে মনোযোগ দেয়ার সময় পাচ্ছে না।

তাই দীর্ঘ প্রতিযোগিতায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া মেধাবী শিক্ষার্থীরা যখন ভুল বানান আর দুর্বল বাক্যগঠনে উত্তরপত্র লেখে তখন বোঝা যায় সংকটটি কোথায়। আমার মতো ষাটোর্ধ্ব অনেকেই স্মরণ করতে পারবে শুদ্ধ বানান আর বাক্যে বাংলা-ইংরেজি লেখাটা স্কুলই শিখিয়ে দিত। এখন এসবের ধার ধারে না কেউ।

এক পৃষ্ঠা ইংরেজি লেখায় একটি শব্দের বানানে ‘ই’-এর বদলে ‘এ’ হয়ে গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যায়। এমন আকাটমূর্খ ছাত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন শিক্ষক-অভিভাবক। অপরদিকে বাংলা বানান পাঁচটা ভুল করলেও অর্ধেকটা চোখে পড়ে শিক্ষকের। বাংলা বানানে ভুল আর বাক্য গঠনে সাধু-চলিত মিশে গেলেও তা গর্হিত অপরাধ নয় জেনে শিক্ষার্থী অবিচল থাকে। এ কারণে বর্তমানে শিক্ষকতায় আসা (স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত) তরুণ শিক্ষকদের একটি বড় অংশের বাংলা ভাষা আর বানানের দুর্বলতা তাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যেও পল্লবিত হচ্ছে।

অপরদিকে বিশ্বায়নের অপূর্ণ ব্যাখ্যায় আর চারপাশের ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষার দাপটে মূলধারার বাংলা মাধ্যমে পড়া শিক্ষার্থীরা এক ধরনের হতাশা ও বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে না ঘরকা না ঘাটকা দশায় পৌঁছেছে।

ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে দ্রুত। দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতি শেখার তেমন অবকাশ নেই এদের পাঠক্রমে। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিচ্ছিন্ন এ প্রজন্মের অনেকে। অদ্ভুত বিষয় হচ্ছে, এ ধারার শিক্ষার্থীরা তাদের পাঠক্রম বিন্যাসের দুর্বলতার কারণে যতটা ভালো ইংরেজি বলতে পারছে তত ভালো দখল দেখাতে পারছে না ইংরেজি ভাষা ও গ্রামারে। বিশেষ করে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এদের মধ্যে দেশাত্মবোধ তৈরি হওয়াটা খুব কঠিন।

আলিয়া-ধারার মাদ্রাসাশিক্ষা বাংলা মাধ্যমের সঙ্গে অনেকটাই সম্পর্কিত। তাই বাংলা মাধ্যম শিক্ষার অনুরূপ সংকট এই অঞ্চলেও রয়েছে। তবে সবচেয়ে বড় সংকটে আছে কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা। এদেশের মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের এক-তৃতীয়াংশ কওমি মাদ্রাসায় পড়ে। আরবি, ফারসি ও উর্দু কওমি মাদ্রাসার শিক্ষামাধ্যম। বাংলা ও ইংরেজির সঙ্গে এদের তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। দেশ, জাতি ও জাতীয় ঐতিহ্য সম্পর্কে এ অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের অনেকের ধারণাই খুব অস্পষ্ট। এরা নিজেদের এবং দেশ ও সমাজের বোঝায় পরিণত হচ্ছে।

একটি জাতির সংস্কৃতি তার ভাষার বাহনে চড়ে ছড়িয়ে পড়ে। ভাষা হারিয়ে ফেললে প্রজন্ম সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। ফলে যেকোনো অশুভ শক্তি আজ্ঞাবহ দাসে পরিণত করতে পারবে সহজে। পাকিস্তানি শাসকচক্র এ সত্য ১৯৪৭ সালেই বুঝেছিল। তাই বাংলা ভাষার ওপরই প্রথম আঘাত করে। আমাদের পূর্বসূরিরা আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা করে আত্মপরিচয়কে সমুন্নত রাখতে পেরেছিল। কিন্তু চৈতন্য-বিচ্ছিন্ন আমরা নানাভাবে একে লালন করতে ব্যর্থ হচ্ছি।

এক ধরনের উগ্র আধুনিকতা ও অপূর্ণ বৈশ্বিক ভাবনা এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাজার অর্থনীতির বিকৃত ধারণা থেকে আমরা বাঙালি সংস্কৃতির বিকলাঙ্গ অবয়ব উপস্থাপন করছি। আমাদের চারপাশে অর্থবিত্তে আভিজাত্য খোঁজা অনেক পরিবারকেই পাওয়া যাবে যাদের বাংলা ভালো বলতে না পারা বা লিখতে না পারার মধ্যে এক ধরনের অহমিকার ছোঁয়া থাকে।

আমার শিক্ষক প্রয়াত খ্যাতিমান ইতিহাসবিদ, সাবেক অর্থমন্ত্রী ড. এ আর মল্লিক ক্লাসে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে একটি গল্প বলেছিলেন। ভাষা প্রশ্ন সামনে এলে এ গল্পটি নতুন করে মনে পড়ে আমার। মুক্তিযুদ্ধের আগে থেকে স্যার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ছিলেন। সে সময়ে তাদের বাসায় এক বিহারি ভিক্ষুক আসত। ভিক্ষা চাইত তার ভাষা উর্দুতে। মুক্তিযুদ্ধের পর একদিন স্যারের দরজায় সেই বৃদ্ধ ভিখারি। যথারীতি উর্দুতেই ভিক্ষা চাচ্ছে। আমার মুক্তিযোদ্ধা স্যারের কাছে এবার বিসদৃশ লাগল। তিনি বললেন, বাংলায় ভিক্ষা না চাইলে তিনি ভিক্ষা দেবেন না। এবার অসহায় হয়ে পড়ল ভিক্ষুক। উপসংহার টানলেন স্যার। বললেন, ও বেচারা হয়ত ঢাকায় কাটিয়ে দিয়েছে জীবনের সবচেয়ে বড় সময়। কিন্তু জীবনযাত্রার কোনো পর্যায়েই তার বাংলা শেখার দায় পড়েনি। ভাঙা-আধাভাঙা উর্দুতে তাকে সাহায্য করেই আমরা গৌরব বোধ করেছি। অর্থাৎ আমরা আমাদের আত্মমর্যাদাবোধকেই যেন খুঁজে পাইনি।

সামাজিক জীব হিসেবে বসবাস করতে হয় বলে নিজের নেয়া শপথ নিজেকেই ভাঙতে হয়। বাঙালি পরিবারের বিয়ে ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠানে ইংরেজি ভাষায় দাওয়াতপত্র পেলে তেমন অনুষ্ঠানে যাব না বলে এক সময় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। শেষপর্যন্ত সামাজিকতার দায়ে সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারিনি। এই প্রবণতা ইদানীং অনেক বেড়েছে। ব্যবসায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, আমলা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব থেকে শুরু করে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারও ইংরেজিতে দাওয়াতপত্র লিখে আত্মপ্রসাদ লাভ করে। আমাদের সমাজবাস্তবতায় বিয়ের অনুষ্ঠানে শিক্ষিত-স্বল্পশিক্ষিত নানা স্তরের মানুষকে দাওয়াত দিতে হয়।

এক সময় দেখতাম ডাকঘরে অশিক্ষিত মানুষের চিঠি লিখে দেয়ার জন্য পয়সার বিনিময়ে লেখক থাকত। এখন বোধহয় বিয়ের দাওয়াতপত্র পড়ে দেয়ার জন্য আরেকটি পেশা সৃষ্টি হতে পারে। বেশ কবছর আগের কথা। তখন সরদার ফজলুল করিম স্যার জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতেন ক্লাস নিতে। স্যারকে একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, এক বাঙালি আরেক বাঙালিকে তার সামাজিক অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে দাওয়াত করে কেন? মৃদু হেসে স্যার বলেছিলেন, এটি এক ধরনের শ্রেণিচরিত্র। অর্থবিত্ত বা অবস্থানে সে যে একটু উঁচুতে তা প্রকাশের একটি সুযোগ খোঁজে এখানে। এ ধারার সবাই এই শ্রেণিভুক্ত হতে চায়।

প্রজন্মকে স্বাজাত্যবোধ থেকে দূরে সরাতে আমাদের টিভি চ্যানেল আর বেসরকারি রেডিও কম কসরত করছে না। তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশ্যে তৈরি অনেক অনুষ্ঠানে উপস্থাপক ‘প্রিয় দর্শক’-এর বদলে ‘হাই ভিউয়ার্স’ বলে হাত-পা ছুড়ে মাঝেমধ্যে অদ্ভুত উচ্চারণে ইংরেজি শব্দ বলে খাওয়ার অযোগ্য এক খিচুড়ি বানাতে থাকে। এসব অনুষ্ঠানের প্রভাবও কম নয়। ক্যাম্পাস বা পথঘাটে তরুণ-তরুণীর শব্দচয়ন ও অঙ্গভঙ্গি দেখলে এর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়।

বাংলা একাডেমি একটি প্রমিত বাংলা বানানরীতি প্রণয়ন করেছে। আবার জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তাদের বই লেখার জন্য একটি বানানরীতি ধরিয়ে দেয়। বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে লিখতে গিয়ে আরেক বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। আমার প্রমিত বানানরীতির কোনো কোনো বানান সংশোধন করা হয়। জানতে চাইলে বলা হয়, এটি এই পত্রিকার সম্পাদকীয় নীতিমালা। এসব অসংগতি দেখলে বোঝা যায় একুশের চেতনা আমাদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে পারেনি এখনও। এই চেতনা অন্য ভাষাকে বৈরী জ্ঞান করা নয়- নিজ ভাষা ও সংস্কৃতিকে সম্মান দেয়া।

আত্মগৌরববোধ ছাড়া প্রজন্ম দেশপ্রেমিক হতে পারে না। নিজদেশ নিয়ে বড় স্বপ্ন বুনতে পারে না। সবচেয়ে বড় কথা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনায় একটি বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে। আমরা প্রজন্মকে ঐতিহ্যসচেতন করে তুলতে পারছি না। তাই আত্মমর্যাদার জায়গাটি খুব স্পষ্ট নয় প্রজন্মের সামনে।

আরও লক্ষ করব, প্রস্তাবিত শিক্ষা-সংক্রান্ত নীতিতে বৃত্তিমূলক ও নিত্য ব্যবহারিক বিষয় যতটা গুরুত্ব পেয়েছে জ্ঞানভিত্তিক মানবিক বিষয় চর্চার অবকাশ ততটা নয়। স্কুল শিক্ষার্থী দেশপ্রেমের প্রথম পাঠ পাবে তার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষা কারিক্যুলামের ভেতর থেকে।

পৃথিবীর কোনো দেশেরই সভ্য ও মেধাবী নীতিনির্ধারকরা চায় না তাদের শিক্ষার্থীরা রোবটের মতো বেড়ে উঠুক। মানবিক গুণসম্পন্ন প্রজন্ম পেতে হলে তাকে মানবিক বিষয়গুলো চর্চা করাতে হবে। আগে বিবেচনা করতে হবে দশম শ্রেণি পর্যন্ত প্রস্তাবিত ১০টি বইয়ের মধ্যে আলাদা বই না হয়ে স্বাস্থ্যশিক্ষা ধরনের বই সমাজ পাঠের অন্তর্ভুক্ত হবে, না সমাজ পাঠ থেকে বের করে ইতিহাস ও ঐতিহ্য বিষয়কে পূর্ণ পাঠের ব্যবস্থা করা হবে।

আমরা বিশ্বাস করি, আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অঞ্চলের সব দেশপ্রেমিক মানুষ যদি ঐক্যবদ্ধভাবে বাস্তবতার নিরিখে জাতীয় শিক্ষা ও সংস্কৃতির নীতি প্রণয়ন করে তবে নতুন প্রজন্মের মনে দেশাত্মবোধ জাগিয়ে তোলা সম্ভব হবে। দেশাত্মবোধহীন জাতি কি দেশের সার্বিক উন্নয়নের দায়িত্ব নিতে পারে?

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগারকারীদের চিহ্নিত করা দরকার 

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগারকারীদের
চিহ্নিত করা দরকার 

আমরা ক্ষমতায় আছি, আমরা তো আপনাদের হত্যা করছি না, এমনকি হত্যার কথা বলা দূরের কথা- ওই রকম কোনো চিন্তাও করছি না, আপনাদের আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে বের করার কথাও বলছি না। তাহলে আপনারা আমাদের হত্যার কথা কেন বলছেন? আমরা যদি এখন আপনাদের হত্যার হুমকি দেই, বিষয়টি কেমন হবে? আওয়ামী লীগ হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কিংস পার্টি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াই জাতির পিতাকে হত্যা করে এদেশে হত্যা আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে।

রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিষোদগারকারী তাজ হাশমি, সামসুল আলম, কনক সরওয়ারসহ যেসব চতুষ্পদ প্রাণী প্রতিনিয়ত বাংলাদেশবিরোধী অশ্লীল অপপ্রচার করে যাচ্ছে, তাদের আর কোনো ছাড় নয়। বিদেশে অবস্থান করার কারণে তাদের সাময়িক সময়ের জন্য আইনের আওতায় আনা না গেলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। তারা প্রতিনিয়ত আমাদের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি দেয়াসহ অপপ্রচার করে যাচ্ছে, এই প্রাণীরা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুকন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনাকে ভিডিও বার্তায় হত্যার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, প্রতিনিয়ত বাংলাদেশবিরোধী ঘৃণা আর বিষোদ্গার ছড়াচ্ছে। এক ভিডিও বার্তায় দেখলাম তাজ হাশমি নামে এক ব্যক্তি আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিচ্ছে, পাশাপাশি রাষ্ট্রবিরোধী নানা অশ্লীল কথা বলছে। এটি দেখার পর কোনো সুস্থ মানুষ স্থির থাকতে পারে না।

আমরা লক্ষ করছি, বেশ কিছু দিন ধরে বিএনপি ও তাদের সমমনা কিছু রাষ্ট্রবিরোধী ব্যক্তি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনবরত আমাদের হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, তারা এই সরকারের পতন ঘটাবে, সরকার পতনের পর তারা আওয়ামী লীগের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করবে, কাউকে দেশ থেকে পালাতে দেবে না, কেউ প্রাণে বাঁচবে না- ইত্যাদি। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকও এই ধরনের ইঙ্গিত দিলেন।

আমার কথা পরিষ্কার। আপনারা ক্ষমতায় এলে আমাদের লাখ লাখ মানুষকে হত্যা করবেন, কারণ আমরা অনেক খারাপ। আপনারা অনেকেই দেশে আছেন, আর যারা বিদেশে বসে এইগুলো বলছেন তাদের আত্মীয় স্বজনরা বাংলাদেশেই আছেন। আমরা ক্ষমতায় আছি, আমরা তো আপনাদের হত্যা করছি না, এমনকি হত্যার কথা বলা দূরের কথা- ওই রকম কোনো চিন্তাও করছি না, আপনাদের আত্মীয়-স্বজনদের খুঁজে বের করার কথাও বলছি না।

তাহলে আপনারা আমাদের হত্যার কথা কেন বলছেন? আমরা যদি এখন আপনাদের হত্যার হুমকি দেই, বিষয়টি কেমন হবে? আওয়ামী লীগ হত্যার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। কিংস পার্টি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াই জাতির পিতাকে হত্যা করে এদেশে হত্যা আর ষড়যন্ত্রের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে। আপনারা তার লিগেসিই বহন করছেন।

একটা কথা বলে রাখি, আমরা আপনাদের মতো চতুষ্পদ প্রাণীদের যথোপযুক্ত শাস্তি দিতে প্রস্তুত আছি। আমাদের রাষ্ট্র এবং আমাদের নেত্রী জাতির পিতার কন্যা রাষ্ট্রনায়ক শেখ হাসিনার মর্যাদা রক্ষার্থে আপনাদের মতো রাষ্ট্রবিরোধী দুষ্টচক্রকে নির্মূল করতে যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রস্তুত আছি। আমরা বাংলাদেশে আপনাদের বাড়ি-ঘর কোথায় তা জানতে পেরেছি। আপনাদের আত্মীয়স্বজন কারা তাদেরকেও আমরা চিনি। নামে-বেনামে আপনাদের অনেকেরই বাংলাদেশে বাড়ি-ঘর, সম্পত্তি এমনকি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান রয়েছে। আর আপনাদের যারা উস্কে দিচ্ছে, তাদের সবার পরিচয়, তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের বিবরণ গোপন নয়।

পশ্চিমা দেশগুলোতে আমাদের মিশনগুলোকেও বলব, রাষ্ট্রবিরোধী এই দুষ্টচক্রটিকে আর ছাড় নয়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষায় এদের বিরুদ্ধে ডিপ্লোমেটিক চ্যানেলসহ অন্য সকল রুটে ব্যবস্থা নেয়া দরকার।

আমাদের শরীরে জাতির পিতার আদর্শের রক্ত । ৭৫-এর কারণে প্রতিনিয়ত আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। পিতার আদর্শের একজন সৈনিক হিসেবে প্রতিনিয়ত সেই ব্যথা অনুভব করি। খুনি চক্র এবং তাদের প্রেতাত্মাদের আমরা নির্মূল করবই ইনশাল্লাহ। এই যুদ্ধে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে উদ্বুদ্ধ নতুন প্রজন্ম আমাদের সঙ্গে রয়েছে।

লেখক: তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ

শেয়ার করুন

বিচারকের ভুল কি ‘সরল বিশ্বাসে’ হয়?

বিচারকের ভুল কি ‘সরল বিশ্বাসে’ হয়?

একজন নারীকে পর পর তিন দফায় রিমান্ডে নেয়া যায় কি না— তা নিয়ে নানা মহলেই প্রশ্ন ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বিষয়টির সমালোচনা শুরু হয়। পরীমনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। প্রশ্ন হলো- বিচারক এমন কাজ কেন করবেন যে, তাকে ক্ষমা চাইতে হবে? রিমান্ড কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে দেয়া যায়, সেটা না জেনেই কি তারা বিচারক হয়েছেন? আদালতে বসে বিচারকরা ক্ষমা চাওয়ার মতো আর কী কী করেন?

চিত্রনায়িকা পরীমনিকে দ্বিতীয় ও তৃতীয় দফা রিমান্ডে পাঠানো নিম্ন আদালতের দুই বিচারক হাইকোর্টে ক্ষমা চেয়ে বলেছেন, তারা কাজটি করেছেন সরল বিশ্বাসে। দাবি করেছেন, ‘এটি অনিচ্ছাকৃত ভুল’।

প্রসঙ্গত, গত ৪ আগস্ট রাতে প্রায় চার ঘণ্টার অভিযান শেষে বনানীর বাসা থেকে পরীমনি ও তার সহযোগী দীপুকে আটক করে র‌্যাব। পরদিন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে পরীমনি ও তার সহযোগীর বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী। এর পর ৩ দফায় মোট ৭ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয় তাকে। কিন্তু বাসায় মাদক পাওয়া গেছে— এমন অভিযোগে দায়ের করা মামলায় একজন নারীকে পর পর তিন দফায় রিমান্ডে নেয়া যায় কি না— তা নিয়ে নানা মহলেই প্রশ্ন ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায়ও বিষয়টির সমালোচনা শুরু হয়।

পরীমনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। প্রশ্ন হলো- বিচারক এমন কাজ কেন করবেন যে, তাকে ক্ষমা চাইতে হবে? রিমান্ড কখন কাকে কোন পরিস্থিতিতে দেয়া যায়, সেটা না জেনেই কি তারা বিচারক হয়েছেন? আদালতে বসে বিচারকরা ক্ষমা চাওয়ার মতো আর কী কী করেন?

সরকারি কর্মচারীদের আত্মরক্ষার সবচেয়ে বড় অস্ত্রের নাম ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’। যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো সদস্য প্রকাশ্যে কোনো নাগরিককে গুলি করে এবং তার বিরুদ্ধে মামলা হয়, তাহলে তদন্ত রিপোর্টে উক্ত অপরাধকে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত’ কিংবা ‘আত্মরক্ষার্থে পাল্টা গুলি’ বলে উল্লেখ করে অভিযুক্তকে দায়মুক্তি দেয়া সম্ভব।

মূলত সব আইনের শেষাংশে এই ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বিষয়টি যুক্ত করে গণকর্মচারীদের সুরক্ষা দেয়া হয়। এমনকি নাগরিককে তথ্য দিতে বাধ্য করার বিধান ‘তথ্য অধিকার আইন’ও যদি কোনো কর্মকর্তা জেনে-বুঝে এবং অসৎ উদ্দেশ্যে লঙ্ঘন করেন, তারপরও তার এই কাজকে সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ বলে প্রমাণ করা সম্ভব এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তা আইনের এই ধারাবলে সুরক্ষা পেতে পারেন। যেহেতু সব আইনের খসড়া সরকারি কর্মকর্তারাই করেন, ফলে তারা আত্মরক্ষা ও সুরক্ষার জন্য একটি পথ সব সময়ই খোলা রাখেন। আইনের এই বিধানের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো, ‘সরল বিশ্বাস’ বলতে কী বোঝায়, তা আইনে সুস্পষ্ট নয়।

যে কারণে দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ একবার বলেছিলেন, ‘পেনাল কোড অনুযায়ী সরল বিশ্বাসে সরকারের কোনো কর্মচারী অপরাধ করলে সেটি অপরাধ নয়’। ওই সময়ে তার বক্তব্য নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় সমালোচনার ঝড় বইলেও আসলে এটি নতুন কিছু নয়। ইকবাল মাহমুদ একটি পুরোনো কথাই নতুন করে বলেছেন। তবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী দুর্নীতি করলেও যে তিনি সরল বিশ্বাসে পার পেয়ে যাবেন— দুদক চেয়ারম্যান তা বলেননি।

বাস্তবতা হলো- যেকোনো আইন যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সেখানে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে এই যে ধারাটি থাকে, সেখানে সরকারি কর্মচারীদের দায়মুক্তির সুযোগ এত বেশি থাকে যে, যেকেউ চাইলে এটির অপপ্রয়োগ করতেই পারেন।

হালের সবচেয়ে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনেও এই সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধের বিধান যুক্ত আছে। ৫৭ ধারায় বলা হয়েছে, ‘এই আইনের অধীন দায়িত্ব পালনকালে সরল বিশ্বাসে কৃত কোনো কার্যের ফলে কোনো ব্যক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হইলে বা ক্ষতিগ্রস্ত হইবার সম্ভাবনা থাকিলে, তজ্জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কোনো কর্মচারী বা ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো দেওয়ানি বা ফৌজদারি মামলা বা অন্য কোনো আইনগত কার্যক্রম গ্রহণ করা যাইবে না।’ অর্থাৎ বায়বীয় অভিযোগে পুলিশ যদি কারো বিরুদ্ধে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মামলা নেয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি হয়রানির শিকার হন, তাতে পুলিশের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া যাবে না। কারণ তিনি এটা প্রমাণ করে দেবেন যে, কাজটি তিনি সরল বিশ্বাসে করেছেন।

প্রশ্ন হলো, সরল বিশ্বাসের সংজ্ঞা কী এবং এটা কে ঠিক করবেন যে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাজটি না বুঝে করেছেন? আইনে সরল বিশ্বাসের কোনো ব্যাখ্যা নেই। এটা নির্ভর করে যিনি ঘটনাটি তদন্ত করবেন এবং যিনি বিচার করবেন, তাদের ওপর। ফলে পুলিশ বা অন্য কোনো বাহিনীর সদস্য অথবা প্রজাতন্ত্রের অন্য যেকোনো পর্যায়ের কোনো কর্মচারী যদি কোনো নাগরিককে হয়রানি করেন, বিপদে ফেলেন, ফাঁসিয়ে দিয়ে পয়সা খান অথবা কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর কারণে একজন নাগরিকের জীবন বিপন্ন হয়, তারপরও ওই কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে সুরক্ষা দেয়ার বিধান আইনেই রয়েছে। বাস্তবতা হলো- আমাদের সব আইন সরকারি কর্মচারী এবং আইন প্রয়োগকারীদের সুরক্ষা দিতে যতটা আন্তরিক, নাগরিককে সুরক্ষা দিতে ততটা নয়।

এই বাস্তবতা মাথায় রেখেও এটি বলা যায় যে, জগতের সবাই ভুল করলেও বিচারক ভুল করবেন না; সবাই অন্যায় ও দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হলেও বিচারকরা এর ঊর্ধ্বে থাকবেন— এটিই প্রত্যাশা। কিন্তু এই চাওয়া ও পাওয়ার মাঝখানে ব্যবধান যে বিস্তর, সেটি নানা সময়ে নানা ঘটনায় দৃশ্যমান হয়। সুতরাং বিচারকের ভুলকে ‘সরল বিশ্বাসে কৃত অপরাধ’ বলে গণ্য করার সুযোগ রয়েছে কি না— সে প্রশ্নও তোলা দরকার। কারণ তিনি বিচার করেন যুক্তি-তর্ক ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে।

অন্য যেকোনো পেশার মানুষের ভুল আর বিচারকের ভুল এক জিনিস নয়। একজন বিচারক কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে ফাঁসির দণ্ড দিয়ে বলতে পারেন না যে তিনি সরল বিশ্বাসে এই দণ্ড দিয়েছেন। বরং তাকে যুক্তি তর্ক ও তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতেই দণ্ড অথবা খালাস দিতে হয়।

এখানে আইনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সম্ভবত এ কারণেই পরীমনিকে রিমান্ড দেয়া ওই দুই বিচারকের ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি হাইকোর্ট। বরং উচ্চ আদালত মনে করছেন যে, তাদের ব্যাখ্যায় হাইকোর্টকে উল্টো হেয় করা হয়ছে। ফলে তাদের কাছে আবার ব্যাখ্যা চেয়ে আদেশের জন্য ২৯ সেপ্টেম্বর দিন ঠিক করা হয়েছে। দেখা যাক, ওইদিন দুই বিচারক আবার কী ব্যাখ্যা দেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট কী আদেশ দেন।

ঘটনাটি পরীমনির জামিন ইস্যুতে হলেও রিমান্ড নিয়ে নাগরিক সমাজ ও মানবাধিকারকর্মীদের উদ্বেগ ও প্রশ্ন অনেক পুরোনো। রিমান্ডে নেয়া কোনো ব্যক্তিকে নির্যাতনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট আইন রয়েছে। এ ব্যাপারে উচ্চ আদালতেরও নির্দেশনা আছে। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে—এমন অভিযোগও ভুরি ভুরি।

রিমান্ডে নিয়ে আসামিদের সঙ্গে কী আচরণ করা হয়, তা মোটামুটি সবাই জানেন। না জানারও কোনো কারণ নেই। প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদের অনেকেই রিমান্ডে নির্যাতনের বর্ণনা দিয়েছেন, সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। কেউ কেউ এ নিয়ে বইপত্রও লিখেছেন। বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের একটি বইয়ের নাম ‘কারাগারে কেমন ছিলাম’। অধ্যাপক হারুন-অর-রশিদের একটা বইয়ের নাম ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগস্টের ঘটনা গ্রেপ্তার রিমান্ড ও কারাগারের দিনগুলি’। অধ্যাপক ড. মো আনোয়ার হোসেনের বইয়ের নাম ‘কাঠগড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : রিমান্ড ও কারাগারের দিনলিপি’। এরকম আরও অনেকেই বই লিখেছেন।

সুতরাং রিমান্ডে কী হয়, সেটি কারো অজানা নয়। দেশের অত্যন্ত সম্মানজনক মানুষ ও প্রভাবশালী রাজনীতিবিদদেরও রিমান্ডে নিয়ে যে ভয়াবহ নির্যাতন করা হয়, সেটিও নতুন কোনো খবর নয়।

সন্দেহভাজন আসামি বা ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার ও রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে ২০০৩ সালের ৭ এপ্রিল ১৫ দফা নির্দেশনাসহ একটি যুগান্তকারী রায় দেন হাইকোর্ট, যা ২০১৬ সালে বহাল রাখেন আপিল বিভাগও। রায়ে আসামি গ্রেপ্তারের বিষয়ে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ এবং রিমান্ডে নেয়ার বিষয়ে ১৬৭ ধারা সংশোধনের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল; কিন্তু উল্লিখিত দুটি ধারা সংশোধন করে আপিল বিভাগের নির্দেশনা এখনও যুক্ত করা হয়নি।

ফলে পুলিশ নানা অজুহাতে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করছে; কখনও জোর করে আসামিকে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিতে বাধ্য করছে। নির্যাতনে অনেক সময় আটক ব্যক্তির মৃত্যুও হচ্ছে। প্রশ্ন হলো- রিমান্ডে নির্যাতনের বিষয়ে সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশনা যদি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অমান্য করে, তাহলে সেটি আদালত অবমাননার পর্যায়ে পড়ে কি না?

সুতরাং চিত্রনায়িকা পরীমনির ইস্যু নিয়ে যে আলোচনা ও বিতর্ক নতুন মাত্রা পেল, এবার এর একটি বিহিত হোক। রিমান্ড যে চাইলেই পাওয়া যায় না; যে কাউকে রিমান্ড দেয়া যায় না; রিমান্ডে যে কিছু নিয়ম-নীতি মেনে চলতে হয়; একজন অপরাধীকে রিমান্ডে নিলেও যে তার মানবাধিকারের বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়— সে বিষয়টি সংশ্লিষ্টদের নতুন করে মনে করিয়ে দেয়া দরকার। সেসঙ্গে রিমান্ডে নিয়ে মারধর না করার শর্তে ভুক্তভোগী বা তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেয়ার বিষয়টি সবার জানা— সেটিরও অবসান হওয়া দরকার।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

শেয়ার করুন

পরীমনি ও ইভানার জয়-পরাজয়!

পরীমনি ও ইভানার জয়-পরাজয়!

পরী যখন সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থোড়াই কেয়ার করে কাঁটা বিছানো পথে সদর্পে হাঁটেন, তখন তার জন্য সবার তো ভালোবাসা ঝরে পড়ার কথা, অথচ ঝরে না। ঝরে ইভানার জন্য, কারণ ইভানার গল্প আপনাদের চেনা, পরীরটা নয়।

‘পরীমনি দেশ ও জাতির জন্য কী করেছেন’- এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজে খুঁজে ক্লান্ত অনেকেই। তাদের অনেককে দেখছি স্কলাস্টিকা স্কুলের ক্যারিয়ার গাইডেন্স কাউন্সিলর ইভানা লায়লা চৌধুরীর ‘আত্মহননের’ খবরে নড়েচড়ে উঠেছেন।

নড়াচড়া করা খারাপ নয়, এতে বরং নিত্যনতুন সামাজিক আলাপ-আলোচনা বহাল থাকে। মানুষ তথা সমাজ ঋদ্ধ হয়। তবে লক্ষ করলাম, তাদের এই নড়াচড়া ইভানার স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়রা কতটা অত্যাচারী ছিলেন এবং তার বাবা-মা কতটা নীরব দর্শকের ভূমিকায় ছিলেন, যা তাকে মৃত্যুর পথ বেছে নিতে বাধ্য করেছে- সেটি নিয়ে।

দেখা গেল যারা পরীমনি ইস্যুতে হাওয়ায় ভাসছিল, পরীর নাম শুনলে যাদের বিবমিষা জাগছিল, যারা বলছিল পরী খারাপ, বেয়াদব, উদ্ধত, তিনি বঙ্গসমাজের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণ আচরণ করছেন, আজ তারাই ইভানার নির্যাতনের কাহিনি বলে আহাজারি করছে।

পরীমনিকে যারা ‘ধুরো, বাংলা সিনেমার সস্তা নায়িকা। ওকে নিয়ে কীসের আলাপ!’ বলে পরীর পাতা উল্টে ফেরদৌসি কাদরীকে সামনে আনছিলেন, বোঝাতে চাচ্ছিল, ‘দেখ, অর্জন কোনটা? আসল রেখে নকলের পিছনে ছুটছ তোমরা?’- সেই তারাই এখন ইভানাকে নিয়ে আলোচনা তুলছে।

স্যরি টু সে, ইভানার প্রতি তাদের ‘সমবেদনা’র ধরন আমাকে হতাশ করছে। পাশাপাশি ঘটে যাওয়া পর পর কিছু ঘটনায় তাদের অভিব্যক্তি প্রকাশের ভিন্নতা দেখে আমার এই হতাশা।

আমি বলছি না যে ইভানার মৃত্যু দুঃখজনক নয়। অবশ্যই দুঃখজনক, তবে তারা যদি কেবল চেনা চরিত্রের জন্য দুঃখবোধ করে আর চরিত্র অচেনা হলেই প্রশ্ন ছুড়ে দেয় তখন বলতেই হবে তাদের অবস্থান ‘পক্ষপাতমূলক’। তারা খুব চেনা পথে হাঁটে। কারণ তারা জানে, স্বামী ও শ্বশুরপক্ষীয়ের হাতে নির্যাতিত নারীর পক্ষ নেয়া সহজ।

ইভানার প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, যে সম্পর্কের মধ্যে দিনের পর দিন অপমান-অবহেলা, অত্যাচার জড়িয়ে ছিল সে পরিস্থিতি তৈরিতে তিনি নিজেও ভূমিকা রেখেছেন। তিনি অত্যাচারিত হওয়াকে সজ্ঞানে মেনে নিয়েছিলেন।

নির্যাতিত হতে হতে মহৎ স্ত্রী হতে চেয়েছেন। হতে চেয়েছিলেন বাবা-মায়ের আদর্শ সন্তান, কারণ তারা বিয়ে বিচ্ছেদ কাম্য না বলে মানিয়ে নিতে বলেছিলেন। সহায়তা করেননি। একটা ভয়ংকর বিষাক্ত সম্পর্ক ইভানা টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। বাবা-মা বা সমাজের দিকে তাকিয়ে এক সময়ে এই বিবেচনায় গিয়ে পৌঁছেছিলেন যে, ‘বিয়ে বিচ্ছেদ অপেক্ষা মৃত্যু শ্রেয়।’

আহা বিয়ে! যে বিয়ে সারাক্ষণ দেয় অপমান, অবহেলা। সেজন্য প্রাণপাত করা যায়, তবু বের হয়ে আসা যায় না। শুধু ইভানা নয়, এরকম উদাহরণ ভুরি ভুরি আছে। তিক্ত দাম্পত্য তাই বলে বিচ্ছেদ! কখনও নয়। নিজেও বিচ্ছেদে যাবে না, পার্টনারকেও যেতে দেবে না।

যারা বলবে এত কি সহজ বের হয়ে আসা? এর উত্তর হলো, একদমই সহজ নয়, কিন্তু একটা চলনসই চাকরি, বাবা-মায়ের দর্শনীয় সামাজিক অবস্থান, বিদ্যাবুদ্ধি নিয়ে ইভানার মতো মেয়েরা যখন কোমরে জোর পান না, নীরবে মরে যান আমার তখন কষ্ট হয় না। ভীষণ রাগ হয়। জীবনের কী অপচয়! সম্ভাবনার কী অপচয়!

তাই ‘শিক্ষিত’, ‘এলিট’ লোকজন যখন মা-বাবাকে দোষী করি যে, কেন তারা নিজের মেয়ের পাশে সময়মতো দাঁড়ালেন না? মেয়েকে নরক থেকে উদ্ধার করলেন না তাহলে মেয়েটি বেঁচে যেত, ফুটফুটে শিশুগুলো মাকে পেত তখন আমার আরও রাগ হয়।

হায়! আপনারা এ কোন ধরনের এলিট, শিক্ষিত যারা ইভানার শ্বশুরবাড়িতে অবহেলিত হওয়া, নির্যাতিত হওয়াকেই স্বাভাবিক বলে মেনে নেন এবং আশ্রয় না দেবার জন্য বাবা-মাকে উল্টো দোষী করেন। কেন বলেন না ইভানার নিজেকে নির্যাতিত হতে দেয়া ঠিক হয়নি। ইভানার মতো মেয়ের নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেয়া উচিত ছিল। আপনারা কি তবে ইভানার নির্যাতিত রূপই পছন্দ করেন? আর তাই ইভানাদের নিজের সিদ্ধান্ত নিজের নিতে না পারার অক্ষমতাকে প্রশ্নই করেন না।

অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার পরেও নিজের মেরুদণ্ড সোজা করে বাঁচার ব্যর্থতাকে বাহবা জানান, স্বামীকে, বাবা-মাকে দোষারোপ করেন। চেতন-অবচেতনে আপনাদের কি তবে ইভানার মতো আদর্শ স্ত্রী ও কন্যা হতে চাওয়া নারীই পছন্দ? কেননা এরা সমাজের প্রদর্শিত গাইডলাইনের মধ্যে থেকে ‘ক্ষমতায়িত’ হয়। আর এজন্যই পরীর অবস্থান বুঝতে আপনাদের এত সমস্যা হয়, এত দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাজ করে।

পরী যখন সমস্ত প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থোড়াই কেয়ার করে কাঁটা বিছানো পথে সদর্পে হাঁটেন, তখন তার জন্য সবার তো ভালোবাসা ঝরে পড়ার কথা, অথচ ঝরে না। ঝরে ইভানার জন্য, কারণ ইভানার গল্প আপনাদের চেনা, পরীরটা নয়।

চেনা গল্পের বাইরে চিন্তা করতে পারেন না বলেই ইভানার পাশে দাঁড়াতে আপনাদের সময় লাগে না, কিন্তু পরী কী করেছে সেটা কয়েক মাসেও টের পান না, উল্টো বলতে থাকেন পরীর অবদান কী?

আপনারা সেসব নারীর জন্য হৃদয় উজার করে কাঁদেন যারা পড়ে পড়ে মার খায়, অত্যাচারিত হয়ে একদিন মরে যায়। অথচ যে মেয়েরা অত্যাচারিত হতে হতে জ্বলে ওঠে, নিজের অহম নিয়ে সমাজ-রাষ্ট্রের দিকে আঙুল তোলে, তাদেরকে আপনাদের মনে হয় নাটুকে। বেহায়া!

পরীমনির ছবি নিয়ে নৈতিকতার ধ্বজাধারীরা মোরাল পুলিশিং করতে মাঠে নামলে অথবা এ সমাজ কেমন নারী চায় সে বিষয়ে গাইডলাইন দিলে আপনারা খুশি হন, কারণ তারা আপনাদের মনের কথাটা বলেন। কিন্তু ‘উচ্চ বিদ্যাধারী’ না হয়েও পরী তখনও শক্তি রাখেন প্রকাশ্যে মধ্যমা প্রদর্শনের।

লেখক: নৃবিজ্ঞানী ও গবেষক

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনার শান্তির উদ্যোগ

শেখ হাসিনার শান্তির উদ্যোগ

শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিস হুইলের যে আটটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সে বিষয়গুলোকেই তার ভাষণের প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়েছেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের থিমটাও তার ভাষণের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছিলেন ও শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছিলেন, তার পথ ধরে তার কন্যাও আজ বর্তমান বিশ্ব উপযোগী শান্তির ললিত বাণী শোনাচ্ছেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন।

দুনিয়াজুড়ে অস্ত্রের ঝনঝনানির কমতি নেই। আজ এক দেশে তো কাল আরেক দেশে অস্ত্রবাজি চলছেই। শোষকগোষ্ঠীর নানামুখী স্বার্থের কারণে থেমে নেই এই যুদ্ধবাজি।

শান্তিনিকতেন বসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর পর্যন্ত ১৯৩৭ সালে লিখেছিলেন-

‘নাগিনীরা চারিদিকে ফেলিতেছে বিষাক্ত নিশ্বাস,

শান্তির ললিত বাণী শোনাইবে ব্যর্থ পরিহাস-

বিদায় নেবার আগে তাই

ডাক দিয়ে যাই

দানবের সাথে যারা সংগ্রামের তরে

প্রস্তুত হতেছে ঘরে ঘরে॥

(প্রান্তিক কাব্যগ্রন্থ)

দুনিয়ার বেশিরভাগ মানুষ শান্তিপ্রিয়। পৃথিবীর মানুষ শান্তি চায়। কিন্তু বাস্তব কথা হচ্ছে শান্তিপ্রিয় মানুষের কণ্ঠস্বরের চেয়ে গোলাগুলি আর বোমাবাজির ডেসিবেল (শব্দের তীব্রতার পরিমাপক) বেশি। শান্তির জন্য শান্তিপ্রিয় মানুষের উদ্যোগ বেশিরভাগ সময়েই মাঠে মারা যায়। তবু দুনিয়ার মহান মানুষেরা শান্তির জন্য ছুটে বেড়ান। এই উদ্যোগ থেকেই বিশ্ব সংস্থা জাতিসংঘ পর্যন্ত যুদ্ধবিহীন বিশ্ব প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৮২ সাল থেকে প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসের তৃতীয় মঙ্গলবার আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবস হিসেবে পালন করার ঘোষণা দেয়। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ দিবসটিকে ‘শান্তির আদর্শকে শক্তিশালী করার জন্য নিবেদিত’ দিন বলে ঘোষণা করে। এদিনটিতে অস্ত্র সরিয়ে রেখে বিশ্বজুড়ে সম্প্রীতির প্রতি যুদ্ধবাজদের প্রতিশ্রুতি নিশ্চিত করার আহ্বান জানায়। ২০০২ সাল থেকে সেপ্টেম্বরের তৃতীয় মঙ্গলবারের পরিবর্তে প্রতিবছর ২১ সেপ্টেম্বর ‘আন্তর্জাতিক শান্তি দিবস’ হিসেবে উদযাপনের সিদ্ধান্ত দেয়া হয়।

শান্তির জন্য জাতিসংঘের এই দিবস ঘোষণার আগেই নতুন দেশ হিসেবে জন্মের শুরু থেকেই বাংলাদেশ শান্তির পিছনে ছুটে বেড়িয়েছে। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সব সময় শান্তির অন্বেষণে ছুটেছেন। যেখানে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানেই শান্তির ললিত বাণী প্রচার করেছেন।

১৯৭৩ সালের ২৩ মে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজার অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুকে জুলিও কুরি শান্তি পদক পরিয়ে দিয়ে বিশ্ব শান্তি পরিষদের তৎকালীন মহাসচিব রমেশচন্দ্র বলেছিলেন- “শেখ মুজিব শুধু বঙ্গবন্ধু নন, আজ থেকে তিনি বিশ্ববন্ধুও বটে।”

বঙ্গবন্ধু সেদিন বলেছিলেন- “লাখো শহীদের রক্তে সিক্ত স্বাধীন বাংলার পবিত্র মাটিতে প্রথম এশীয় শান্তি সম্মেলনে যোগদানের জন্য আগত শান্তির সেনানীদের জানাই স্বাগতম। উপনিবেশবাদী শাসন আর শোষণের নগ্ন হামলাকে প্রতিরোধ করে ত্রিশ লক্ষ শহীদের প্রাণের বিনিময়ে আমরা ছিনিয়ে এনেছি আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, তাই বাংলাদেশের মানুষের কাছে শান্তি আর স্বাধীনতা একাকার হয়ে মিশে গেছে। আমরা মর্মে মর্মে অনুধাবন করি বিশ্বশান্তি তথা আঞ্চলিক শান্তির অপরিহার্যতা।...

... আমি নিজে ১৯৫২ সালে পিকিং-এ অনুষ্ঠিত প্রথম এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলীয় শান্তি সম্মেলনের একজন প্রতিনিধি ছিলাম। বিশ্ব শান্তি পরিষদের ১৯৫৬ সালের স্টকহোম সম্মেলনেও আমি যোগ দিয়েছিলাম। একই সাথে এটাও আমি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে চাই, বিশ্বশান্তি আমার জীবনের মূলনীতি। নিপীড়িত, নির্যাতিত, শোষিত, শান্তি ও স্বাধীনতাকামী সংগ্রামী মানুষ, যেকোনো স্থানেই থাকুক না কেন, তাঁদের সাথে আমি রয়েছি। আমরা চাই বিশ্বের সর্বত্র শান্তি বজায় থাকুক, তাকে সুসংহত করা হোক।”... (সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৫৯-৬৬০, বাংলা একাডেমি, সম্পাদক: মোনায়েম সরকার।)

জাতিসংঘ শান্তির জন্য একটি দিন ঘোষণার উদ্যোগ নিয়েছিল ১৯৮১ সালে। তারপর ১৯৮২ সাল থেকে দিবসটি পালিত হতে শুরু করল। কিন্তু বঙ্গবন্ধু তো এই জাতিসংঘেই অনেক আগেই শান্তির বাণী প্রচার করেছেন। ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রথম বাংলা ভাষায় দেয়া ভাষণে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন- ‘....বাংলাদেশ প্রথম হইতেই শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান ও সকলের প্রতি বন্ধুত্ব- এই নীতিমালার উপর ভিত্তি করিয়া জোটনিরপেক্ষ নীতি গ্রহণ করিয়াছে। কেবলমাত্র শান্তিপূর্ণ পরিবেশই কষ্টলব্ধ জাতীয় স্বাধীনতার ফল ভোগ করিতে আমাদেরকে সক্ষম করিয়া তুলিবে এবং সক্ষম করিয়া তুলিবে দারিদ্র্য, ক্ষুধা, রোগ, অশিক্ষা ও বেকারের বিরুদ্ধে লড়াই করিবার জন্য আমাদের সকল শক্তি ও সম্পদকে সমাবেশ ও কেন্দ্রীভূত করিতে। এই ধারণা হইতে জন্ম নিয়াছে শান্তির প্রতি আমাদের প্রতিশ্রুতি। এই জন্য সমঝোতার অগ্রগতি, উত্তেজনা প্রশমণ, অস্ত্র সীমিতকরণ এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান নীতির সম্প্রসারণের লক্ষ্যে এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, ল্যাটিন আমেরিকা-বিশ্বের যেকোনো অংশে যেকোনো প্রচেষ্টা গ্রহণ করা হউক না কেন, আমরা তাহাকে স্বাগত জানাই। এই নীতির প্রতি অবিচল থাকিয়া আমরা ভারত মহাসাগরীয় এলাকা সম্পর্কে শান্তি এলাকার ধারণা, যাহা এই পরিষদ অনুমোদন করিয়াছে, তাহাকে সমর্থন করি।

আমরা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াকে শান্তি, স্বাধীন এবং নিরপেক্ষ এলাকায় পরিণত করার প্রতিও সমর্থন জানাই।

আমরা বিশ্বাস করি যে, সমবেত উন্নয়নশীল দেশসমূহ শান্তির স্বার্থকে দৃঢ় সমর্থন করে। জাতীয় স্বাধীনতা রক্ষা এবং শান্তি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য বিশ্বের বিপুল সংখ্যাগুরু জনগণের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির কথা তাঁহারা প্রকাশ করিয়াছেন।

মানবজাতির অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শান্তি অত্যন্ত জরুরি এবং তাহা সমগ্র বিশ্বের নর-নারীর গভীর আকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন ঘটাইবে। এবং ন্যায়ের উপর প্রতিষ্ঠিত শান্তিই দীর্ঘস্থায়ী হইতে পারে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের অঙ্গীকার প্রমাণের জন্য উপমহাদেশে আপস মীমাংসার পদ্ধতিকে আমরা জোরদার করিয়াছি। আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস, বাংলাদেশের অভ্যুদয় বস্তুতপক্ষে এই উপমহাদেশে শান্তি কাঠামো এবং স্থায়িত্ব প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে অবদান সৃষ্টি করিবে। ইহা ছাড়া আমাদের জনগণের মঙ্গলের স্বার্থেই অতীতের সংঘর্ষ ও বিরোধিতার পরিবর্তে মৈত্রী ও সহযোগিতার সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করিতে হইবে।”...

(সূত্র: বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান: জীবন ও রাজনীতি ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৮৬-৬৮৭, বাংলা একাডেমি, সম্পাদক: মোনায়েম সরকার।)

কেবল যুদ্ধ বিরতিতেই যে শান্তি প্রতিষ্ঠা হয় না, এটা এখন সর্বজনস্বীকৃত। শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য অনেকগুলো উপাদান নিশ্চিত করতে হয়।

জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৮৩ সালে গঠিত হয় ‘পাথওয়ে টু পিস’ (সংক্ষেপে পিটিপি) নামে পিস ম্যাসেঞ্জার অর্গানাইজেশন বা শান্তির দূতিয়ালি সংগঠন। এই সংগঠনের গবেষকরা ২৫ বছরের নিরন্তর গবেষণা করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আটটি বিষয় নির্দিষ্ট করেছেন। তাদের মতে, এই আটটি বিষয়ের সঙ্গে যদি পৃথিবীর প্রত্যেক মানুষের সংযোগ ঘটানো যায় ও মানানো যায়, তাহলে দুনিয়াও শান্তিপূর্ণ হয়ে উঠবে। যদিও দুনিয়ায় নানা জাতের, নানা চিন্তার, নানা ধর্মের, নানা পরিচয়ের, নানা বয়সের, নানা বর্ণের ও নানান লিঙ্গের মানুষ, তবু এই আটটি বিষয় প্রত্যেক সম্প্রদায় বা সোসাইটির জন্য সমান প্রযোজ্য। এর নাম দেয়া হয়েছে ‘পিস হুইল’ বা শান্তির চাকা।

শান্তির চাকার আটটি বিষয় হচ্ছে- ১. সরকার, আইন, নিরাপত্তা, ২. শিক্ষা, মিডিয়া, ৩. অর্থনীতি,ব্যবসা ৪. স্বাস্থ্য সম্পর্ক ৫. বিজ্ঞান প্রযুক্তি ৬. ধর্ম, আত্মিক শিক্ষা, ৭. পরিবেশ, বাসস্থান এবং ৮. সংস্কৃতি।

প্রতিবছর আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবসের একটি থিম ঠিক করা হয়। ২০২১ সালে আর্ন্তজাতিক শান্তি দিবসের থিম ঠিক করা হয়েছে- রিকভারিং বেটার ফর অ্যান একুয়াটেবল অ্যান্ড সাসটেইনেবল ওয়ার্ল্ড বা ন্যায়সংগত ও টেকসই পৃথিবীর জন্য আরও উত্তম পুনরুদ্ধার।

কোভিড-১৯ মহামারির ক্ষত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে পৃথিবী। কীভাবে পৃথিবীর মানুষ আগের অবস্থায় ফিরে যেতে পারে, সে চেষ্টা আমাদের সবার মধ্যে। আমরা সবাই মিলে সৃজনশীলতা দিয়ে যার যার অবস্থান থেকে সবাই সবাইকে সহযোগিতা করব। একটি সহনশীল পৃথিবী পুনর্নির্মাণ করব। যে পৃথিবী হবে আরও সাম্য, থাকবে ন্যায়বিচার, হবে ন্যায়নিষ্ঠ, শুদ্ধ, টেকসই এবং স্বাস্থ্যসম্মত।

এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত হিসাবে পৃথিবীর প্রায় ৬৭ কোটি মানুষ টিকা নিয়েছেন বা নেয়ার জন্য নিবন্ধিত হয়েছেন। কিন্তু পৃথিবীর এক শয়েরও বেশি দেশে তখন অবধি এক ডোজ টিকাও পৌঁছেনি। ওই সব টিকাহীন দেশের মানুষ স্বাস্থ্যসেবার বৈষম্যের শিকার। তাদের কারণে পৃথিবীর সব মানুষই কিন্তু স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছেন। কারণ করোনা একটি ভয়ংকর সংক্রামক রোগ। যেকোনো বৈষম্য শান্তি বিঘ্নিত করে। আর সেটাই উপলব্ধি করেছেন বঙ্গবন্ধুকন্যা ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

জাতিসংঘ অধিবেশনে যোগ দেয়ার জন্য বাংলার প্রধানমন্ত্রী এখন জাতিসংঘের সদরদপ্তর নিউইয়র্কে। করোনা ভাইরাসের টিকার মেধাস্বত্ব উঠিয়ে এর ন্যায্যতাভিত্তিক বণ্টনের বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে তিনি জোর দেবেন বলে জানা গেছে। এর পাশাপাশি রোহিঙ্গা সমস্যা, জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যু, একীভূত অর্থনৈতিক উন্নয়ন, বিশ্ব শান্তি, নিরাপদ অভিবাসন, ফিলিস্তিন ও জোর করে বাস্তুচ্যুত করা মিয়ানমারের নাগরিকদের সংকট ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা সম্পর্কিত বিষয়গুলোও তার ভাষণে গুরুত্ব পাবে বলে জানা গেছে।

শান্তি প্রতিষ্ঠায় পিস হুইলের যে আটটি বিষয়কে চিহ্নিত করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিন্তু সে বিষয়গুলোকেই তার ভাষণের প্রতিপাদ্য হিসেবে নিয়েছেন। এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক শান্তি দিবসের থিমটাও তার ভাষণের প্রধান বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু যে অবদান রেখেছিলেন ও শান্তির ললিত বাণী শুনিয়েছিলেন, তার পথ ধরে তার কন্যাও আজ বর্তমান বিশ্ব উপযোগী শান্তির ললিত বাণী শোনাচ্ছেন। বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখছেন। আশা করা যায়, শান্তি প্রতিষ্ঠায় তার এই ভূমিকা ‘ব্যর্থ পরিহাস’ হবে না। এবারের জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্রতিপাদ্য বিষয়ও হচ্ছে ‘আশা।’ বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় শেখ হাসিনার হাত ধরে বাংলাদেশের নাম আরও উজ্জ্বল হবে- সে আশাও তো আমরা করতেই পারি।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

কাতারের অর্থ ও মধ্যস্থতায় ধরাশায়ী আরববিশ্ব

কাতারের অর্থ ও মধ্যস্থতায় ধরাশায়ী আরববিশ্ব

ইরান ও তুরস্কের উত্তেজনা প্রশমনে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চেষ্টা চলছে। এসব অসহ্য লাগছে প্রতিবেশী সৌদি ও তার মিত্রদের। কারণ সৌদির অবস্থান তেহরান ও আঙ্কারার বিরুদ্ধে। কিন্তু উপায় নেই সৌদি জোটের। ট্রাম্প প্রশাসন যতটা মাথায় তুলেছিল সৌদি জোটকে, বাইডেন প্রশাসন তার বিপরীত। ইরান-তুরস্কের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন ফিরলে বেকায়দায় পড়বে সৌদি। তাই কমাস আগে তুরস্কের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাদ্যসহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে রিয়াদ। ইরান ইস্যুতে থাকছে নমনীয়।

কাতারের রাজধানী দোহায় ২০২০-এর ৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় মার্কিন সমর্থিত আফগান সরকারের সঙ্গে তালেবানের শান্তি বৈঠক। দিন পাঁচেক পর আবার বৈঠক হবে বলে ঘোষণা করেন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কথা ছিল গুয়ানতানামো কারাগার থেকে ৬ জন তালেবান বন্দিকে সঙ্গে নিয়ে বৈঠকে যোগ দেবেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রধান সচিব। কিন্তু কূটনৈতিক দোহা ১৬ সেপ্টেম্বরের আলোচনা ফলপ্রসূ করতে বৈঠকে হাজির করায় স্বয়ং মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইকেল রিচার্ড পম্পেওকে। পরে সে বৈঠক চলে টানা ৪ দিন।

মার্কিনদের পক্ষে বৈঠকের কূটনৈতিক দায়িত্বপ্রাপ্ত হন আফগানবিষয়ক মার্কিন বিশেষ দূত জালমে খলিলজাদ। আগে তিনি ছিলেন সাবেক রাষ্ট্রপতি জর্জ বুশের অধীনস্থ জাতিসংঘে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। ২০০৪ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আফগানিস্তান এবং ২০০৫ থেকে ২০০৭ পর্যন্ত ইরাকের রাষ্ট্রদূত থাকার পাশাপাশি যুক্ত ছিলেন বারাক ওবামা প্রশাসনের সঙ্গেও।

খলিলজাদকে আফগান উদ্ধার ও তালেবানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের নায়ক বলা হলেও মার্কিন জনগণ বরাবরই তার ভূমিকা সন্দেহের চোখে দেখেছে। যদিও এসবের পেছনে কাতারের সূক্ষ্ম হাত রয়েছে বলে মনে করে অনেকে। সম্প্রতি নিজেকে মধ্যস্থতাকারী দেশ হিসেবে তুলে ধরলেও একটা সময় কূটনৈতিক সংকটে টালমাটাল ছিল পৃথিবীর ছোট অথচ মাথাপিছু আয়ে এক নম্বর দেশ কাতার।

আকস্মিকভাবে ২০১৭ সালে উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাহরাইন, ইয়েমেন ও আফ্রিকার মুসলিম দেশ মিসর জোটবদ্ধ হয়ে কাতারের সঙ্গে সকল ধরনের কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করে। শুরু হয় বিশ্বজুড়ে হইচই। নৃত্যের সঙ্গে পা মিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র মালদ্বীপ।

আকাশ ও নদীপথের সম্পর্ক বন্ধের পাশাপাশি ছিন্ন করে কূটনৈতিক সম্পর্ক, বন্ধ করে মিডিয়া সম্প্রচার। কাতার পড়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যসংকটে। এই অবস্থায় দোহার দিকে হাত বাড়ায় তেহরান ও আঙ্কারা। পরে সবকিছু স্বাভাবিক হলেও ততদিনে বিশ্ব-কূটনৈতিক ময়দানে দক্ষ খেলোয়াড় হয়ে ওঠে ছাব্বিশ লাখ জনসংখ্যার দেশটি। দূতিয়ালিতে ভূমিকা রাখে মধ্যপ্রাচ্যসহ এশিয়া এবং আফ্রিকার দেশগুলোর শান্তিচুক্তিতে।

আফগানিস্তানের তালেবান ইস্যু এখনও তরতাজা। প্রথমে মার্কিনরা ওমানের মাসকটে বসার আহ্বান জানায় তালেবানদের। তালেবানরা ভাবল সেখানে তাদের অনুকূল পরিবেশ এবং নিরপেক্ষ অবস্থান নেই। এমন সময় আসে দোহায় বসার আহ্বান। সেই সমঝোতার ভিত্তিতেই আফগানিস্তান ছাড়ে মার্কিনরা।

শুধু তাই নয়, নিরপেক্ষ শান্তি স্থাপনকারী হিসেবে সুদান সংকট নিরসন, লেবানন এবং ইয়েমেনেও ত্রাতার ভূমিকায় ছিল কাতার। বছরের পর বছর এসব পক্ষের বৈঠক আয়োজনে বিপুল অর্থ ও সময় খরচ করছে দোহা দপ্তর। এরপরও সমঝোতার সপক্ষে দাঁড়ানোর চেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন আরব অঞ্চলে কনিষ্ঠতম শাসক এবং কাতারের নতুন আমির শেখ তামিম বিন হামাদ বিন খলিফা আল থানি।

বর্তমানে কাতার চাইছে আমেরিকা-ইরানের মধ্যকার পরমাণু চুক্তির বিষয় আলোচনার টেবিলে এনে সমঝোতায় পৌঁছাতে। এটি সম্ভব হলে, মধ্যপ্রাচ্য আসবে এক ছাতার নিচে, আর পশ্চিমা বিশ্বের মাস্তানি নেমে যাবে অর্ধেকে। কাতার এর আগে চাচ্ছে তুরস্ক, সৌদি এবং ইরানের কূটনৈতিক ঐক্য।

ইতিমধ্যে সে প্রচেষ্টা হাতে নিয়ে দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন কাতার পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আব্দুল রহমান আল থানি। ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে দূরত্ব বাড়ালেও বাইডেন চাচ্ছে কমাতে। এ বিষয়ে এখনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি তেহরান ও ওয়াশিংটন। তবুও বসে নেই কাতার পররাষ্ট্র দপ্তর।

দুই দেশের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমনের জন্য রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চলছে। এসব অসহ্য লাগছে প্রতিবেশী সৌদি ও তার মিত্রদের। কারণ সৌদির অবস্থান তেহরান ও আঙ্কারার বিরুদ্ধে। কিন্তু উপায় নেই সৌদি জোটের। ট্রাম্প প্রশাসন যতটা মাথায় তুলেছিল সৌদি জোটকে, বাইডেন প্রশাসন তার বিপরীত। ইরান-তুরস্কের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন ফিরলে বেকায়দায় পড়বে সৌদি। তাই কমাস আগে তুরস্কের প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় খাদ্যসহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়িয়েছে রিয়াদ। ইরান ইস্যুতে থাকছে নমনীয়।

মধ্যপ্রাচ্যে আর্তুগ্রুলের সৈনিকরা উসমানীয়দের সোনালি সময় ফেরাতে চাইছে তুরস্ক। অপর দিকে ইরান অপ্রতিরোধ্য। চারপাশে মার্কিন চব্বিশটি ঘাঁটি থাকার পরও আধুনিক সব অস্ত্র বানানোর প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে ধর্মগুরু খামেনির নির্দেশে। ইব্রাহিম রাইসি সরকার সৌদির সঙ্গে বসতে রাজি হলেও আগে চাচ্ছে মার্কিনদের সঙ্গে সমঝোতা। তেহরান জানে, মার্কিন-সৌদি সম্পর্ক বেশ পুরোনো। মার্কিনদের কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করতে চায় রিয়াদ। সেই রিয়াদের সঙ্গে বসলে আধিপত্য ভাগাভাগি হয়ে যেতে পারে।

পারমাণবিক শক্তির অধিকারী ইরান তা চাইবে কেন? এদিকে ইরান-তুরস্কের সঙ্গে আগে থেকে সুসম্পর্ক রয়েছে আধুনিক অস্ত্র ও অর্থে প্রভাবশালী মস্কো ও বেইজিংয়ের। তাই কাতার চাচ্ছে সম্পর্ক এবং অর্থের জোরে সবার ওপর ছড়ি ঘুরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের আসন পাকাপোক্ত করতে।

৪৪১৬ বর্গমাইলের কাতারের অর্থনৈতিক অবস্থান গত বিশ বছর ধরে মাথাপিছু আয়ের হিসাবে শীর্ষে। বিশ্বের প্রায় ৪০টির অধিক দেশে উপসাগরীয় এই ক্ষুদ্র দেশটির বিনিয়োগ রয়েছে ৩৩৫ বিলিয়ন ডলার। সভরেন ওয়েলথ ফান্ড ইনস্টিটিউটের হিসাবে কাতার বিশ্বের ১৪তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। কাতারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও রাজপরিবারের সদস্য শেখ হামাদ বিন জসিম বিন জাবর আল থানি জার্মানির ডয়েচ ব্যাংকে বিনিয়োগ করেন ১.৮৫ বিলিয়ন ডলার। কাতার ২০১১ সালে কিনে নেয় স্পোর্ট ইনভেস্টমেন্টস প্যারিস সেইন্ট-জারমেই (পিএসজি) ফুটবল ক্লাব। যে দলে খেলেন গ্রহের সবচেয়ে দামি ফুটবল তারকা লিওনেল মেসি এবং নেইমার, এমবাপ্পেরা। বড় অঙ্কের বিনিয়োগ করেন জার্মানির বায়ার্ন মিউনিখ নামক ফুটবল ক্লাবটিতেও। তাই দুদেশের মধ্যকার খেলায় জিতে যায় কাতার।

২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দাকালে বারক্লেইসও ক্রেডিট সুইস গ্রুপে বিনিয়োগ করে কয়েক বিলিয়ন ডলার। ২০১২ সালে প্রায় ৭০০ মিলিয়ন ডলার দিয়ে ‘পারমিরা অ্যাডভাইজর্স’ নামের একটি কোম্পানির কাছ থেকে বিলাসবহুল ইতালীয় ফ্যাশন হাউস ভ্যালেন্তিনো ফ্যাশন গ্রুপ কিনে নেয়। এর ৩ বছর পর পশ্চিম ইউরোপের জনপ্রিয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর এল কোর্ট ইংলেসের ১০ শতাংশ মালিকানা কেনে। যুক্তরাজ্যে কাতারের বিনিয়োগ প্রায় ৩৫ বিলিয়ন ডলার। অধিকাংশ বিনিয়োগ বিলাসবহুল আবাসিক এলাকাগুলোতে। ২০১৫ সালে কাতারের একটি কোম্পানি লন্ডনের ক্যানারি ইর্ফ নামের একটি এলাকাও কিনে নেয়। এ ছাড়া লন্ডনে রয়েছে কাতারের অসংখ্য বিনিয়োগ।

রাশিয়ার তেল কোম্পানিতেও কাতারের বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে। গত বছর জুলাইয়ে রাশিয়ার সেইন্ট পিটার্সবার্গ বিমানবন্দরের ২৪.৯ শতাংশ এবং ডিসেম্বরে জায়ান্ট তেল কোম্পানি রোজনেক্টের সঙ্গে ১১ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি সম্পন্ন হয়। রাশিয়ান ডাইরেক্ট ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডে দেয় ২ বিলিয়ন ডলার। কাতারের নজর যায় যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। ২০১৫ সালে নিউ ইয়র্কে অফিস খোলে দেশটি। ২০২০ সালে সে দেশের তেল খাতে ৩৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। হলিউডের সিনেমাশিল্পেও রয়েছে দোহার বিনিয়োগ।

কাতারভিত্তিক বিইন মিডিয়া গ্রুপ গত বছর ক্যালিফোর্নিয়াভিত্তিক কোম্পানি মিরাম্যাক্স কিনে নেয়। ২০১৬ সালে প্রধানত যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেস শহরে কিউআইএ চতুর্থ বৃহৎ বিনিয়োগকারীর অবস্থানে ছিল। গত বছর এম্পায়ার স্টেট রিয়েলিটি ট্রাস্ট ইনকর্পোরেশনের ১০ শতাংশ মালিকানা কিনে নেয় কাতার। এ ছাড়া ৮.৬ বিলিয়ন ডলারের মিশ্র মালিকানা রয়েছে ব্রুকফিল্ড প্রোপার্টি পার্টনার্সের।

কাতারের নজর ফিরে এশিয়ার দিকে। হংকং, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও তাইওয়ানের সঙ্গে কাতারের ব্যবসায়িক সম্পর্ক প্রসারিত হচ্ছে। আগামী ৬ বছরে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে অফিস বানাতে চাইছে বেইজিং ও নয়াদিল্লিতে। অর্থ বিনিয়োগের পাশাপাশি পারস্য উপসাগরের দেশটি বৈশ্বিক রাজনীতিতেও ক্রমাগত ভূমিকা রাখছে। ইসরায়েলকে উৎখাত করতে ফিলিস্তিনের হামাসকে অর্থ ও অস্ত্রের জোগান দেয় দেশটি।

সৌদি জোট যেসব দাবিতে কাতারকে একঘরে করার চেষ্টা করছে- তার একটি হলো হামাসকে অর্থসহায়তা বন্ধ করা। না হয় আরবদের সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে ইসরায়েলের বন্ধুত্ব, সমস্যায় পড়বে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক। উত্তেজনা আরও চরম আকার ধারণ করে মিসরের ইসলামপন্থি দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে সমর্থন দেয়ায়। যে দলটির তালেবান ও আল-কায়েদা সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে, সুসম্পর্ক ইরানের সঙ্গেও।

কাতারের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের, তিউনিসিয়ার আন্না হাদা মুভমেন্ট ও লিবিয়ার বিভিন্ন ইসলামপন্থি রাজনৈতিক দলকে এবং তুরস্কের একে পার্টিসহ বিশ্বের বিভিন্ন ইসলামি দলের দিকে সমর্থনের অভিযোগও আছে । তাদের এমন সমর্থনে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক দেশগুলো পড়ছে হুমকির মুখে।

ইরানের সঙ্গে বাইডেন প্রশাসন সমঝোতায় বসলে সুবিধা হবে কাতারেরও। কারণ ইরাক সরকার ও নিরাপত্তা বাহিনীসহ সব ক্ষেত্রে ইরানের ব্যাপক প্রভাব। ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীরা থাকে তেহরানের ছত্রছায়ায়। লেবানন-সিরিয়ায়ও আছে তাদের শক্ত অবস্থান। তালেবান রাষ্ট্র আফগানিস্তান ইরানের অনুকরণে গঠন করছে সরকার। পাকিস্তান, চীন, রাশিয়া, তুরস্কের সঙ্গে ভাই ভাই সম্পর্ক। বৈশ্বিক এই বলয় ভাঙতে গেলে ইরানের সঙ্গে বোঝাপড়া ছাড়া কোনো বিকল্প নেই আমেরিকার হাতে।

কাতার কূটনীতিবিদরা জানে এমন মধ্যস্থতার প্রস্তাব দিয়ে আমেরিকা এবং বাকি উপসাগরীয় দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বোঝাপড়ার যেকোনো উদ্যোগে তাদের পরিপূর্ণ সমর্থন থাকার বার্তাই দিচ্ছে। আর এটা বাস্তবায়িত হলে ভেঙে পড়বে সৌদি জোট। মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক রাজনীতিতে প্রভাবশালী হয়ে উঠবে আমেরিকার কৌশলগত মিত্র দেশ কাতার। তাছাড়া আমেরিকা-ইরান সমঝোতায় মধ্যস্থতা করতে পারলে এশিয়ায় বাড়বে কাতারের মান-মর্যাদা।

লেখক: কলাম লেখক

শেয়ার করুন