ধর্ষক কে বা কারা?

ধর্ষক কে বা কারা?

অনেকে মনে করেন, একজন তরুণ বা যুবকের ধর্ষক হয়ে ওঠার পেছনে তার পরিবারের বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ, পরিবারে যদি শৈশব থেকেই তাকে মানবিক মূল্যবোধ এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব এবং অপরাধের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে শেখানো না হয় বা তাকে যদি অপরাধের ইহকালীন ও পরকালীন (সব ধর্ম অনুযায়ী) শাস্তি সম্পর্কে অবহিত করা না হয়, তাহলে যেকোনো অপরাধ করার আগে এর সম্ভাব্য শাস্তি সম্পর্কে তার মনে ভয় তৈরি হবে না।

ঢাকার আশুলিয়ায় চলন্ত বাসে তরুণীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে যেদিন ছয় পরিবহনশ্রমিককে গ্রেপ্তার করল পুলিশ, সেদিনই নওগাঁর বদলগাছিতে ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে এক শিক্ষককে আটক করে পুলিশে দিয়েছে স্থানীয়রা।

প্রশ্ন হলো, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে সংশোধনী এনে ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড করা; ধর্ষণ মামলার অনেক আসামির বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার মতো ঘটনার পরেও কেন বাসের ভেতরে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ বা শিশুর ওপর পাশবিকতা বন্ধ হচ্ছে না?

যারা এসব অপরাধ করছে, তাদের কাছে আইনের ওই কঠোরতা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতার বার্তা কি পৌঁছেছে? নাকি তারা এসব পরোয়া করে না? নাকি যখন তারা ধর্ষণের সুযোগ পায়, তখন এসব আইনকানুন বা বন্দুকযুদ্ধের কথা তাদের মাথায় থাকে না?

স্মরণ করা যেতে পারে, ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান করে যেদিন (১৭ নভেম্বর ২০২০) জাতীয় সংসদে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করা হয়, এর দুই মাস না হতেই গত ৭ জানুয়ারি রাজধানীর কলাবাগানে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে এক তরুণকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর দুদিন পর ৯ জানুয়ারি বগুড়ায় ডিজে পার্টির এক শিল্পীকে ধর্ষণ ও তার ভাগনিকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে পুলিশ এক নারীসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।

প্রশ্ন হলো, কেন ওই তরুণ তার বন্ধুকে ধর্ষণ করল এবং কেনইবা খুন করল? এই তরুণ কীভাবে ধর্ষক ও খুনি হয়ে উঠল? এ রকম অপরাধী হয়ে ওঠার পেছনে তার পরিবারের ভূমিকাই বা কতটুকু? ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি যে মৃত্যুদণ্ড, তা কি তার জানা ছিল না? জানলে কেন সে ভয় পেল না?

সবশেষ ঘটনা দুটির দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। ঢাকার আশুলিয়ায় চলন্ত বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হওয়া এক তরুণীর মামলায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাদের বয়স ১৮ থেকে ৪০ বছর। তারা সবাই আবদুল্লাহপুর-বাইপাইল-নবীনগর মহাসড়কে মিনিবাস চালক।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার দিন সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ওই নারী মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ড থেকে নারায়ণগঞ্জে নিজের বাসায় ফেরার জন্য বাসে ওঠেন। রাত আটটার দিকে আশুলিয়ার নবীনগর বাসস্ট্যান্ডে তাকে নামিয়ে দেয়া হয়। এ সময় বাসের জন্য তিনি অপেক্ষা করতে থাকেন। রাত নটার দিকে নিউ গ্রামবাংলা পরিবহনের একটি মিনিবাসের চালকের সহকারী মনোয়ার ও সুপারভাইজার সাইফুল ইসলাম এসে টঙ্গী স্টেশন রোডের কথা বলে তার কাছে ৩৫ টাকা ভাড়া চান।

তিনি মিনিবাসে উঠলে গন্তব্যে যাওয়ার আগেই সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয়া হয়। চালক বাসটি নিয়ে আবার নবীনগরের দিকে রওনা হন। এ সময় বাসের জানালা ও দরজা আটকে বাসের চালক, সহকারীসহ ছয়জন ওই নারীকে ধর্ষণ করেন। টহল পুলিশ বাসটি থামিয়ে ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করে। এ সময় ওই ছয়জনকে আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

দ্বিতীয় ঘটনাটি ঘটে নওগাঁর বদলগাছিতে। সেখানে ৯ বছরের এক শিশুকে ধর্ষণের অভিযোগে তার শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আবু হাসান নামে ওই শিক্ষক তার বাড়িতে শিশুদের আরবি পড়াতেন। গ্রামের ৬-৭টি শিশু তার কাছে আরবি শিখত। ঘটনার দিন সকালে ভুক্তভোগী শিশুটি পড়তে যায়। এ সময় তাকে একা পেয়ে ধর্ষণ করেন শিক্ষক।

তিনি ঘটনাটি কাউকে না বলতে শিশুটিকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাড়ি পৌঁছে দেন। কিন্তু সন্তানের পোশাকে রক্ত দেখে শিশুটির মায়ের সন্দেহ হয়। তখন জিজ্ঞেস করলে শিশুটি তার মাকে ঘটনা খুলে বলে। শিশুটির মা গ্রামের লোকজনকে বিষয়টি জানিয়ে বিচার চান। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী আবু হাসানকে ধরে এনে গাছে বেঁধে রেখে থানা-পুলিশকে খবর দেয়।

এই দুটি ঘটনায় কয়েকটি বিষয় স্পষ্ট, যেমন: আশুলিয়া এলাকায় এর আগেও চলন্ত বাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে— যার সঙ্গে জড়িত ছিল পরিবহন শ্রমিকরা। তার মানে কি এই এলাকার সড়কটি ধর্ষকদের অভয়ারণ্য?

দ্বিতীয়ত, যখন তারা কাউকে এভাবে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করে তখন সেখানে বয়স নির্বিশেষে একটা ঐক্য রয়েছে। এই দলে ১৮ বছরের তরুণ থেকে শুরু করে ৪০ বছরের মাঝবয়সী লোকও রয়েছে। তৃতীয়ত, তাদের সবার পরিচয় পরিবহন শ্রমিক। প্রশ্ন হলো, পরিবহন শ্রমিকদের মধ্যে কেন এই ধর্ষণপ্রবণতা?

যেকোনো পেশার লোকই ধর্ষক হতে পারে। অর্থাৎ ধর্ষকের কোনো পরিচয় নেই। যখন সে এই কাজ করে, তখন তার পেশা, বয়স বা সামাজিক অবস্থান কোনো ভূমিকা রাখে না। বরং তার ভেতরের পাশবিকতাই প্রকাশিত হয়। তার মানে ধর্ষক হতে তার পরিচয় বা বয়সের চেয়েও বড় বিষয় হচ্ছে তার সংস্কৃতি ও বোধ—যে বোধ তাকে প্রচলিত আইনের প্রতি ভীত হওয়ার ক্ষেত্রেও বাধা দেয়।

এ যাবৎ যত লোককে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বা যাদের বিচার হয়েছে কিংবা বিচার চলছে—তাদের সবার জন্ম, বেড়ে ওঠা, পরিবারিক সংস্কৃতি, মূল্যবোধ এবং সর্বোপরি জীবন সম্পর্কে তাদের ভাবনাগুলোর মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করা গেলে দেখা যাবে, কোথাও না কোথাও সমস্যা রয়েছে।

অনেক সময় বলা হয়- সব পুরুষের ভেতরেই ধর্ষকামিতার বীজ লুকায়িত থাকে। সুযোগ পেলেই সে ধর্ষক হয়ে ওঠে। আসলে কি তাই? সম্ভবত না। কারণ এটি বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে যে, সমাজে এমন লোকের সংখ্যাই বেশি যারা সুযোগ পেলেও ধর্ষণের মতো অপরাধে যুক্ত হবেন না।

কারণ প্রথমত, তাদের মনে প্রচলিত আইন ও বিচার ব্যবস্থা নিয়ে ভয় আছে; দ্বিতীয়ত, এই কাজটি তার রুচি ও শিক্ষার সঙ্গে সংঘাতপূর্ণ; তৃতীয়ত, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাইকে সে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করে। সুতরাং, এটিই আশাবাদের বিষয় যে, সমাজের অধিকাংশ মানুষই ধর্ষক নন এবং সুযোগ পেলেও তারা ধর্ষণ করবেন না।

এখন প্রশ্ন হলো, সমাজের যে অতি ক্ষুদ্র অংশ ধর্ষণ করে বা ধর্ষক হয়ে ওঠে, তার পেছনে মোটা দাগে কী কী কারণ থাকতে পারে?

অনেকে মনে করেন, একজন তরুণ বা যুবকের ধর্ষক হয়ে ওঠার পেছনে তার পরিবারের বড় ভূমিকা রয়েছে। কারণ পরিবারে যদি শৈশব থেকেই তাকে মানবিক মূল্যবোধ এবং নারীর প্রতি শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব এবং অপরাধের বিষয়গুলো সুস্পষ্টভাবে শেখানো না হয় বা তাকে যদি অপরাধের ইহকালীন ও পরকালীন (সব ধর্ম অনুযায়ী) শাস্তি সম্পর্কে অবহিত করা না হয়, তাহলে যেকোনো অপরাধ করার আগে এর সম্ভাব্য শাস্তি সম্পর্কে তার মনে ভয় তৈরি হবে না।

রাজধানীর কলাবাগানে বন্ধুকে ধর্ষণের পর হত্যার অভিযোগে যে তরুণকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তার বিষয়ে গণমাধ্যমের খবর বলছে, দিহানের বাবা রাজশাহী জেলার অবসরপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার রাতুগ্রাম গ্রামে তার বাড়ি।

তিনি একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। এই বাড়ি ছাড়াও জেলার বাগমারা উপজেলার তাহেরপুরে তাদের আরও একটি বাড়ি আছে। রাজশাহী শহরেও আছে দুটি বাড়ি। ঢাকায়ও রয়েছে ফ্ল্যাট।

গণমাধ্যমের খবরে আরও জানা যাচ্ছে, দিহানের পরিবার ও তার বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধেও হত্যার অভিযোগ উঠেছিল। পারিবারিক কলহের জেরে তার স্ত্রীকে মুখে জোর করে বিষ ঢেলে হত্যার অভিযোগে মামলা হয়েছিল ওই বড় ভাইয়ের বিরুদ্ধে। মামলার সাক্ষীদের অভিযোগ, টাকার বিনিময়ে মামলাটি আপস করেছেন এ তরুণের বাবা।

এসব অভিযোগ সত্য হলে বোঝা যাচ্ছে, ওই তরুণ খুব ভালো কোনো পারিবারিক পরিবেশে বড় হননি। তার অবসরপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার বাবার যে সহায়সম্পত্তির বিবরণ পাওয়া যাচ্ছে, তা তার চাকরির বৈধ পয়সায় হওয়া সম্ভব নয়।

সুতরাং বাবা যদি অসৎ পথে উপার্জন করেন, সেই সন্তানের পক্ষে আদর্শবান, সৎ ও মানবিক হওয়া কঠিন। ওই তরুণের বাবা নিশ্চয়ই তাকে ধর্ষক হতে বলেননি। কিন্তু একজন ন্যায়পরায়ণ ও আদর্শবান মানুষ হিসেবে তিনি যে সন্তানকে গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়েছেন, সেটি এই ঘটনায় প্রমাণিত।

শুধু অবৈধ পথে উপার্জন করলেই যে সন্তান খারাপ হবে এমনটি নয়। অসৎ লোকের সন্তানও যেমন ভালো হতে পারে, তেমনি সৎ লোকের সন্তানও খারাপ হতে পারে। বিশেষ করে যারা সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেন না কিংবা ক্যারিয়ার ও সামাজিকতা সামাল দিতে দিতে যারা পরিবারের সন্তান কীভাবে বেড়ে উঠছে, কোথায় যাচ্ছে, কাদের সঙ্গে মিশছে- এসব খোঁজ নেয়ার সময় পান না, তাদের সন্তানও বখে যেতে পারে। ভেতরে ভেতরে ধর্ষক ও খুনি হয়ে উঠতে পারে।

অনেক সময় বলা হয়, দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি অপরাধের পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারে। সম্প্রতি বাগেরহাটে শিশু ধর্ষণের ঘটনার দুই সপ্তাহের মধ্যে রায় ঘোষণা করা হয়েছে। রায়ে একমাত্র আসামি আবদুল মান্নান সরদারকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে।

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে ধর্ষণের মামলায় এত দ্রুত সময়ে বিচারপ্রক্রিয়া শেষের নজির নেই বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আইনজীবীরা। যে কারণে তারা এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে মন্তব্য করেছেন। কিন্তু নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কঠোর করা, দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা এমনকি কখনও সখনো বিনা বিচারে আসামিকে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পরেও তো ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না।

তাছাড়া অপরাধীকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিলেই যে সেই অপরাধ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায় না, তারও অনেক উদাহরণ আছে। বন্দুকযুদ্ধের মতো বিচারবহির্ভূত হত্যার সপক্ষেও যে জনমত রয়েছে, তাতে এই প্রশ্নটিও এখন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই যে, বছরের পর বছর ধরেই বন্দুকযুদ্ধে মানুষ মারা হচ্ছে।

ধরা যাক বন্দুকযুদ্ধে নিহতদের অধিকাংশই বড় অপরাধী; কিন্তু তাই বলে সমাজ তো অপরাধমুক্ত হয়নি।

অনেকে মনে করেন, রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছাড়া ধর্ষণ বন্ধ হবে না। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকারের রাজনৈতিক কমিটমেন্ট আছে বলেই আইন কঠোর করা হয়েছে। তারপরও ধর্ষণ বন্ধ হচ্ছে না কেন? তার মানে কি অসুখের কারণ অনুসন্ধান না করে কেবল ওষুধের গুণগত মান বাড়ান হচ্ছে?

স্মরণ করা যেতে পারে, নোয়াখালীতে ঘরের ভেতরে ঢুকে একজন নারীকে বিবস্ত্র করে পিটিয়েছিল যারা, তারা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। সিলেটের এমসি কলেজের একটি আবাসিক হলে নিয়ে এক নারীকে গণধর্ষণ করেছিল যারা, তারাও ক্ষমতাবান।

শুধু রাজনৈতিক ক্ষমতাই নয়, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতাও এসব ধর্ষণের পেছনে ভূমিকা রাখে। সেইসঙ্গে রয়েছে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের পৌরুষের বহিঃপ্রকাশ। যেহেতু সে নিজেকে পুরুষ দাবি করে, ফলে সে এই পৌরুষের ক্ষমতাটি দেখাতে চায়। সেটি কখনও নিজের স্ত্রীর সঙ্গে; কখনও প্রতিবেশীর সঙ্গে; কখনও রাস্তাঘাটে, শপিং মলে, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কিংবা কোনও নিরিবিলি জায়গায়।

একজন পুরুষ যখন সামাজিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠে; যখন তার মধ্যে এই উপলব্ধি ক্রিয়াশীল হয় যে, একজন নারীকে বিবস্ত্র করে পেটালে কিংবা স্বামীর কাছ থেকে কেড়ে নিয়ে ধর্ষণ করলে অথবা প্রকাশ্য রাস্তায় একজন নারীকে নাজেহাল করলেও এই সমাজ ও রাষ্ট্রে তার সুরক্ষার নানারকম উপায় বিদ্যমান— তখন সে সাহসী হয়ে ওঠে। ধর্ষণ সব সময় শারীরিক না-ও হতে পারে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্ষণও হতে পারে।

অনেক সময় বলা হয়, নারীর একা রাতের বেলা বাইরে যাওয়া উচিত নয়। কারণ এতে করে তার ধর্ষণের শিকার হওয়ার শঙ্কা বেড়ে যাবে। আশুলিয়া এলাকায় এ পর্যন্ত যত নারী চলন্ত বাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, তাদের ক্ষেত্রে এই কথাটি আংশিক সত্য। কারণ দিনের বেলায়ও এই ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নারী ও শিশুরা ধর্ষিত হয় তাদের পরিচিতজনের দ্বারা। এমনকি পরিবারে।

অনেক সময় নারীর পোশাককেও ধর্ষণের জন্য দায়ী করা হয়। কিন্তু নিজেকে পুরোপুরি ঢেকে রাখেন, এমন নারী এবং নিষ্পাপ শিশুরাও ধর্ষিত হয়েছে। তাদের ক্ষেত্রে পোশাকের কোনো প্রসঙ্গ ছিল না। আরও নির্মম বাস্তবতা হলো, পরিবারে এবং পরিচিতজনের মধ্যে যেসব ধর্ষণের ঘটনা ঘটে, তার অনেক ঘটনাই জানাজানি হয় না, মামলা বা গ্রেপ্তার তো দূরে থাক।

প্রশ্ন হলো, ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তাররা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আদালতের কাছে দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে আসলে কী বলে বা তারা যা বলে, সেই কথাগুলো কি আমরা আসলেই জানতে পারি?

সুতরাং, ধর্ষককে গ্রেপ্তার এবং সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে তার উপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করা যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি আইন ও আইনপ্রয়োগকারীদের কঠোরতার পরেও কেন ধর্ষণের মতো অপরাধ বন্ধ হচ্ছে না— তা জানা। কেননা, নিয়মিত বিরতিতে এরকম অপরাধ সংঘটিত হচ্ছে মানেই হলো, সমাজের ভেতরে অপরাধের বীজ লুকিয়ে আছে— যার মূলোৎপাটনে ঘাটতি রয়েছে। কী করে সেই ঘাটতি পূরণ করা যাবে, সেটিই বরং মূল আলোচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন

মন্তব্য

ভূমিহীন-আশ্রয়হীনের আশ্রয় ও অগ্রযাত্রা

ভূমিহীন-আশ্রয়হীনের আশ্রয় ও অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশের আজকে অনেক সূচকে পরিবর্তনের যেসব স্বীকৃতি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে আমরা পাচ্ছি এর মূলে দেশকে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বস্তির জায়গায় নিয়ে আসার সরকারি দূরদর্শিতারই সাফল্য। বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার মর্যাদা লাভে যে স্বীকৃতি অর্জন করেছে এর মূলে দেশকে বিদ্যুতায়ন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশে কোনো গৃহহীন, আশ্রয়হীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষ থাকবে না- এমন ঘোষণা দেয়ার পর অনেকেই এটিকে বিশ্বাস করতে চাননি। না চাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে গৃহহীন, আশ্রয়হীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষের যে বিপুল সংখ্যা বাংলাদেশে বিরাজ করছে তা বাস্তবে রূপ দেয়ার জন্য যে অর্থনৈতিক সক্ষমতা আমাদের প্রয়োজন সেটি আগে ছিল না। তবে স্বপ্নচারী দূরদর্শী রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানুষকে তার লক্ষ্য ও গন্তব্য যত দূরেই হোক না কেন তা দেখাতে মোটেও পিছপা হন না।

যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশের ওপর দাঁড়িয়ে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সেই গন্তব্যের কথাই উচ্চারণ করেছিলেন। তিনি তার লক্ষ্য পূরণের জন্য প্রয়োজনীয় সময় পাননি। তার কন্যা শেখ হাসিনা দায়িত্বগ্রহণ করার পর এই লক্ষ্য পূরণে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি সেভাবেই গড়ে তুলছেন। এখন তিনি আশ্রয়ণ প্রকল্পের নামে সেই অসম্ভবপ্রায় কল্পনাকে বাস্তবে রূপ দিচ্ছেন। কীভাবে এটি সম্ভব হচ্ছে সেই বিষয়ই তুলে ধরছি।

বাংলাদেশের পরিবর্তনের ধারায় ২০০৯ সাল থেকে এগিয়ে চলছে। শেখ হাসিনার সরকার ২০০৮ সালের নির্বাচনের ইশতেহারে যে রূপকল্প উপস্থাপন করেছিল সেটি ছিল অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি মাত্র। কিন্তু দায়িত্বভার গ্রহণের পর সরকার জাতীয় অর্থনীতির কয়েকটি খাতের যুগান্তকারী পরিবর্তনে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল। ওইসব চ্যালেঞ্জ গ্রহণব্যতীত বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক পরিবর্তন, জনগণের জীবনের মান উন্নয়ন, সামাজিক স্থিতিশীলতা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আধুনিক প্রযুক্তি আত্মস্থ করার কোনো লক্ষ্যই পূরণ করার বাস্তব ভিত্তি তৈরি করা সম্ভব ছিল না।

সরকার বিশ্ব অভিজ্ঞতা থেকে উন্নয়নের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেয়ার আশু করণীয় ও পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন নিয়েই যাত্রা শুরু করে। সেই মুহূর্তে ২০০৯ সালের সরকারের সম্মুখে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে অগ্রাধিকার পেয়েছিল দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান করা। সেই লক্ষ্যেই সরকার দেশকে অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল করতে ছোট, মাঝারি ও মেগা বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে হাত দেয় । এছাড়া প্রতিবেশী দেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানিরও ব্যবস্থা করা হয় ফলে অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই অর্থনীতির সব ক্ষেত্রে বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট কেটে যেতে থাকে, অর্থনীতির চাকা সচল ও গতিময়তা লাভ করতে থাকে।

বর্তমানে বাংলাদেশ প্রায় ২৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন করেছে, যা ২০০৯ সালে ছিল মাত্র ৩২০০ মেগাওয়াট। বাংলাদেশের আজকে অনেক সূচকে পরিবর্তনের যেসব স্বীকৃতি দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক মহল থেকে আমরা পাচ্ছি এর মূলে দেশকে স্বল্প সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বস্তির জায়গায় নিয়ে আসার সরকারি দূরদর্শিতারই সাফল্য।

বাংলাদেশ এরই মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হওয়ার মর্যাদা লাভে যে স্বীকৃতি অর্জন করেছে এর মূলে দেশকে বিদ্যুতায়ন অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। উন্নয়নের এই গতিধারা সৃষ্টি করার ফলেই শেখ হাসিনার সরকার দেশে কিছু বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করার নজির স্থাপন করতে যাচ্ছে। বেশিরভাগ মেগাপ্রকল্পই নিজস্ব অর্থায়নে করা হচ্ছে।

২০০৯ সালের আগে বাংলাদেশের কেউই এত বিদ্যুৎ উৎপাদন, এত রেমিট্যান্স আহরণ, এত বড় মেগা প্রকল্প, এত বিশাল অঙ্কের বাজেট এবং এত দ্রুত তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির সহজলভ্যতা আশা করতে পারেনি। একই সঙ্গে গৃহহীন ও আশ্রয়হীন মানুষের জন্য এক খণ্ড ভূমি ও একটি পাকা বাড়ির ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের পক্ষে সম্ভব এটিও কেউ বিশ্বাস করতে পারেনি।

যদিও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে নোয়াখালীতে গৃহহীনদের জন্য গুচ্ছগ্রাম স্থাপন করতে গিয়ে দেশে আশ্রয়হীন পরিবারকে আশ্রয় দেয়ার স্বপ্নের কথা তখন ঘোষণা করেছিলেন। ১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের কথা ঘোষণা করার পাশাপাশি আশ্রয়ণ প্রকল্প নামে ভূমিহীনদের গৃহদানের কর্মসূচি গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া হতদ্ররিদ্র নারী, পুরুষ ও বিধবা ভাতা চালু করার মাধ্যমে তিনি সমাজের হতদরিদ্র ও অসহায় মানুষদের পাশে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা রাখার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।

এই উদ্যোগ পরবর্তী সরকারগুলো ততটা গুরত্বের সঙ্গে নেয়নি। কিন্তু শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে আবার ক্ষমতায় আসার পর দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্য হিসেবে সমাজের ওইসব পিছিয়ে পড়া মানুষের কর্মসংস্থান ও বাসস্থানের বিষয়টি গুরত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেন। এরই মধ্যে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বয়স্ক ও বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী শিশু ও মানুষের সুযোগ-সুবিধা ধীরে ধীরে প্রবর্তন ও বাড়ানো অব্যাহত রাখেন। বিশেষভাবে তিনি গুরত্ব দেন আশ্রয়ণ প্রকল্পের অধীন ভূমিহীন ও আশ্রয়হীন মানুষদের জীবনজীবিকা ও থাকার ব্যবস্থা করার মতো মানবতাবাদী কর্মসূচি গ্রহণের ওপর। স্বাধীনতার ৫০ বছর ও মুজিব জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে দেশে কোনো পরিবারই যেন ভূমিহীন ও গৃহহীন না থাকেন সেই লক্ষ্য পূরণের ঘোষণা তিনি প্রদান করেন। এটি তার আরেকটি মহা-মেগা প্রকল্প যা দেশ ও বিদেশে অনেকের কাছেই অকল্পনীয়, অভাবনীয় এবং বাস্তবায়নযোগ্য কি না- তা নিয়ে সন্দেহ ছিল।

কারণ বাংলাদেশে কত মানুষের ভূমি নেই, গৃহ নেই- তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। কিন্তু সবার মধ্যেই ধারণা আছে যে, এই দুই পর্যায়ের মানুষের সংখ্যা অগণিত। সুতরাং বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের পক্ষে এত মানুষের ভূমিসহ গৃহ ও বাসস্থানের ব্যবস্থা করা মোটের ওপর কল্পনাতীত।

কল্পনাতীত এই বিষয়টিই শেখ হাসিনা বাস্তবায়নে হাত দিয়েছেন। পৃথিবীর কোনো দেশেই এত বিপুলসংখ্যক মানুষকে গৃহদানের মাধ্যমে শুধু মাথাগোঁজার ঠাঁই করে দেয়নি, দারিদ্র্য থেকে গোটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে মুক্ত করে আনার এমন অভিনব উদ্যোগও কেউ নিতে পারেনি। শেখ হাসিনা এই প্রকল্প সমাপ্তির মাধ্যমে যেদিন সব মানুষকে আশ্রয়দানের ফলে আত্মকর্মসংস্থানে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ করে দেবেন সেদিনের পর থেকে বাংলাদেশে দরিদ্র শব্দটি শুধু বইয়ের পাতায় হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে, সমাজে অস্তিত্ব থাকবে না।

সরকারের আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছিল গত জানুয়ারিতে। ৬৬ হাজার ১৮৯টি গৃহহীন এবং ভূমিহীন পরিবারকে ২ শতক জমির ওপর একটি আধা-পাকা দুই কামরা, টয়লেট, রান্নাঘর ও বারান্দা সংবলিত একটি থাকার বাড়ি প্রদানের মাধ্যমে। এতে বাদ যায়নি তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও। তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যারাকের মতো ঘর স্থাপনের মাধ্যমে তাদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ রেখে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এর ফলে ভবঘুরে এই মানুষগুলো এখন শুধু মাথাগোঁজার ঠাঁই-ই পেল না, উৎপাদনের প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখারও সুযোগ পেয়েছে। অপরদিকে গৃহহীন, আশ্রয়হীন পরিবারগুলোও তাদের গৃহের চারপাশে তরিতরকারি, হাঁসমুরগি, গরুছাগল ইত্যাদি লালন-পালনের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ লাভ করেছে ও করতে যাচ্ছে। তাদের সন্তানরা লেখাপড়ার অনুকূল পরিবেশ লাভ করেছে। এসব গৃহহীন পরিবারের গৃহ নির্মাণে সরকার স্থানীয় প্রশাসন, প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা এবং জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতা গ্রহণ করেছে।

মাত্র ১ লাখ ৭১ হাজার টাকায় প্রতিটি গৃহ নির্মাণের যেই মিতব্যয়িতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে তাও নজিরবিহীন। তবে কোথাও কাজের নির্মাণের মান খারাপ হওয়ার অভিযোগ ওঠায় প্রকল্প-সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি দ্রুত সমাধানের কথা জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক্ষেত্রে যারা মানসম্মত গৃহস্থাপনে নজির স্থাপন করতে পেরেছেন তাদেরকে প্রশংসা এবং যারা ব্যর্থ হয়েছেন তাদেরকে তিরস্কারসহ শাস্তি প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন বলে গণমাধ্যমে জানা গেছে।

আশ্রয়ণ প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপ এরই মধ্যে কাজ শেষ করে এনেছে। ২০ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৩ হাজার ৪৩৪টি পরিবারের মধ্যে একই ধরনের গৃহ প্রদানের ব্যবস্থা করতে যাচ্ছেন। এবারের বাসস্থানগুলোর ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২ লাখ টাকা করে। মালামাল ক্রয় ও পরিবহণব্যয় আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়। ফলে আশা করা যাচ্ছে এবারের বাড়িগুলো মানের ভিত্তিতে আরেকটু উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এবারের বণ্টন করা বাসস্থানগুলোর ৭ হাজার ২৮০টি ঢাকা বিভাগ, ২ হাজার ৫১২টি ময়মনসিংহ বিভাগ, ১০ হাজার ৫৬২টি চট্টগ্রাম বিভাগ, ১২ হাজার ৩৯২টি রংপুর বিভাগ, ৭ হাজার ১৭২টি রাজশাহী বিভাগ, ৩ হাজার ৯১১টি খুলনা বিভাগ, ৭ হাজার ৬২৭টি বরিশাল বিভাগ এবং ১ হাজার ৯৭৯টি সিলেট বিভাগে। এই বছর ডিসেম্বর মাসের মধ্যে আরও ১ লাখ পরিবার অনুরূপভাবে আশ্রয় ও গৃহ পেতে যাচ্ছে। সেই প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে।

দেশে গৃহহীন ও আশ্রয়হীনদের এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধু রাষ্ট্রের অর্থ নয়, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদানও সাদরে গ্রহণ করছেন। এর মধ্যে অনেকেই অনুদানের অর্থ প্রদান করছেন। বিষয়টি আরও ব্যাপক প্রচার পেলে দেশ-বিদেশে অবস্থানগত সচ্ছল ব্যক্তিরা আশ্রয়ণ প্রকল্পে অবদান রাখার জন্য এগিয়ে আসবেন বলে ধারণা করা যাচ্ছে।

দেশে প্রতিবছর নদীভাঙনের ফলে অসংখ্য মানুষ বাড়িঘর-ভিটেমাটি হারাচ্ছে। সেসব মানুষের স্থায়ী আশ্রয় এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা দরকার। একই সঙ্গে নদীভাঙনের হাত থেকে আমাদের উর্বর জমি ও মানুষের বাড়িঘর ও নানা ধরনের স্থাপনা, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রক্ষায় বাঁধ নির্মাণও জরুরি।

সরকার নতুন করে জেগে ওঠা চরগুলোকে দখলদারমুক্ত রাখার জন্য সেনাবাহিনীর সহযোগিতা নিতে পারে। তাতে জেগে ওঠা চরগুলো মানুষের স্থায়ী আশ্রয়ণ প্রকল্পের জন্য বিবেচিত হতে পারে। এছাড়া ভূমিহীন ও আশ্রয়হীনের সংখ্যা যদি বেশি হয়, খাসজমির সংস্থান যদি না হয় তাহলে ভাসানচর অঞ্চলে থাকা কর্মসংস্থান, শিক্ষা, কারিগরি প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করে যদি আশ্রয়হীন ও কর্মহীনদের কাজে লাগানো যায় তাহলে আশ্রয়ণ প্রকল্প শুধু শেষই হবে না, আশ্রয়প্রাপ্ত মানুষ ও তাদের সন্তানরা দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার মতো দক্ষ জনসম্পদে পরিণত হওয়ার সুযোগ পাবে।

বাংলাদেশ ২০১৭ সালে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের লক্ষ্যমাত্রায় ১৫৭টি দেশের মধ্যে ১২০তম স্থানে অবস্থান করছিল। ২০২০ সাল থেকে বৈশ্বিক করোনা মহামারির দুর্যোগ সত্ত্বেও সম্প্রতি বাংলাদেশ ১০৯তম স্থানে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ গত ১২ বছরে মাথাপিছু আয় ৫০০ ডলার থেকে ২২০০ ডলারে উন্নীত করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েছে বলেই এসডিজি অর্জনে যেমন সফল হচ্ছে, একইভাবে মাথাপিছু আয় ৫ শতাংশের ওপরে এবং করোনা মোকাবিলায় শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করে এখন নিজস্ব শক্তিতে সর্বত্র চিকিৎসায় ঘুরে দাঁড়াতে অনেকটাই সক্ষম হচ্ছে। সেই অবস্থায় গৃহহীন, আশ্রয়হীন ও বাস্তুচ্যুত মানুষদের শুধু বসবাসের জায়গা ও গৃহপ্রদানই নয়, কর্মক্ষম জনশক্তিতে রূপান্তরিত করার যে উদ্যোগ সরকারপ্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা নিয়েছেন সেটিও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়েই তিনি নিয়েছেন। এটি শেষ হলে বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনে হতদরিদ্র মানুষের অবস্থান পরিবর্তিত হয়ে অপেক্ষাকৃত সম্পদের অধিকারী কর্মক্ষম উৎপাদনশীল শক্তি হিসেবে এরা এবং তাদের উত্তরসূরি অচিরেই আবির্ভূত হতে যাচ্ছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দরিদ্রপীড়িত দেশের গ্লানিকর অমর্যাদার জায়গা থেকে মুক্তির নতুন স্তরে উন্নীত হতে দেখা যাবে।

এই কাজটি একটি কল্যাণবাদী রাষ্ট্রের দর্শন। সেই দর্শন যে নেতা, তার দল ও সরকার ধারণ এবং বাস্তবায়ন করেন, তিনি, তার দল ও সরকার জনকল্যাণবাদী রাষ্ট্র নির্মাণের প্রবক্তা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে এই রাষ্ট্র নির্মাণের সূচনা করেছিলেন। শেখ হাসিনা এর বাস্তব প্রয়োগ ঘটাচ্ছেন। আমরা বাংলাদেশের এই বিশাল পরিবর্তনটি প্রত্যক্ষ করছি। প্রয়োজন সকল দেশপ্রেমিক মানুষের উপলব্ধি করা, এর সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করা।

লেখক: গবেষক, অধ্যাপক

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ও শেখ হাসিনার ভূমিকা

বিশ্ব শরণার্থী দিবস ও শেখ হাসিনার ভূমিকা

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংস হামলা চালায় সে দেশের সেনারা। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় নির্যাতিত রোহিঙ্গারা। এই জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল বাংলাদেশ। দেশের সীমান্ত খুলে দিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় দেয়া হয় মিয়ানমারের নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীকে। এ দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর নিজের চোখে দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার যান। তাদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন।

বিশ্ব শরণার্থী দিবস আজ। এবারের বিশ্ব শরণার্থী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হচ্ছে- ‘একসঙ্গে আরোগ্য হব, একসঙ্গে শিখব ও একসঙ্গে দীপ্ত হব (টুগেদার উই হিল, লার্ন অ্যান্ড শাইন)।’ দুনিয়াজুড়ে দিবসটি পালনের জন্য জাতিসংঘের একটি শরণার্থী সংস্থা রয়েছে- ইউএনএইচসিআর।

২০০০ সালের ৪ ডিসেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে ২০০১ সালের জুনের ২০ তারিখ থেকে প্রতিবছর আন্তর্জাতিক শরণার্থী দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। দিনটি বেছে নেয়ার ঐতিহাসিক পটভূমি আছে।

১৯৫১ সালে শরণার্থীদের অবস্থান নির্ণয়বিষয়ক একটি কনভেনশনের ৫০ বছর পূর্তি হয় ২০০১ সালে। যদিও ২০০০ সাল পর্যন্ত আফ্রিকান শরণার্থী দিবস নামে একটি দিবস কয়েকটি দেশে পালিত হতো। সেটিই এখন জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্ব শরণার্থী দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে বিশ্বজুড়ে।

এ প্রশ্নটি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসে যায়, শরণার্থী কারা? ১৯৫১ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী মর্যাদাবিষয়ক সম্মেলনে অনুচ্ছেদ-১-এ-তে শরণার্থীর সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে। কাউকে জাতিগত সহিংসতা, ধর্মীয় উন্মাদনা, জাতীয়তাবোধ, রাজনৈতিক আদর্শ, সমাজবদ্ধ জনগোষ্ঠীর সদস্য হওয়ায় নিজদেশের নাগরিক অধিকার থেকে সরিয়ে দেয়া হয়, ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয় এবং রাষ্ট্র তাকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হলেই সে শরণার্থী হিসেবে বিবেচিত হবে। এরপর ১৯৬৭ সালের সম্মেলনের খসড়া দলিলে শরণার্থীর এই সংজ্ঞাকে আরেকটু বিস্তৃত করা হয়।

আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকায় অনুষ্ঠিত আঞ্চলিক সম্মেলনে যুদ্ধ ও অন্যান্য সহিংসতায় আক্রান্ত ব্যক্তির নিজ দেশ ত্যাগ করাকেও শরণার্থী হিসেবে অভিহিত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

বিশ্বের মাথাব্যথার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে শরণার্থী। পৃথিবীতে এখন শরণার্থীর সংখ্যা ৮ কোটি ২০ লাখের বেশি। তার মানে বিশ্বের প্রতি ৯৫ জন নাগরিকের বিপরীতে একজন মানুষ শরণার্থী। করোনা মহামারির এই ক্রান্তিকালে মানুষের সীমিত চলাফেরার মধ্যেও গত এক বছরে বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১ কোটি ১২ লাখ মানুষ।

এ হিসাব দিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর। এর মধ্যে অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত হয়েছে। করোনাভাইরাসের বিধিনিষেধ শিথিল হয়ে গেলে পৃথিবীজুড়ে সংঘাত আরও বেড়ে যেতে পারে। ইউএনএইচসিআর আশঙ্কা প্রকাশ করেছে, বিশ্বের শরণার্থী মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ছাড়িয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।

বর্তমানে বিশ্বের শরণার্থী সংখ্যা আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এই বিশাল শরণার্থী জনগোষ্ঠীর অর্ধেকই শিশু। তবে উন্নত দেশগুলোতে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় পাওয়া মানুষের সংখ্যা কম। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিশ্বের প্রায় শতকরা ৮৫ ভাগ শরণার্থীর আশ্রয় মিলেছে উন্নয়নশীল দেশে।

স্বদেশ হারিয়ে দুই-তৃতীয়াংশই শরণার্থী হয়েছে মাত্র পাঁচটি দেশ থেকে। এর মধ্যে শীর্ষে রয়েছে সিরিয়া। বিগত ১০ বছরের গৃহযুদ্ধে দেশটির ১ কোটি ৩৫ লাখ মানুষ ঘরছাড়া। যা দেশটির মোট জনসংখ্যার অর্ধেক। বাকি চারটি দেশ হচ্ছে ভেনেজুয়েলা, আফগানিস্তান, দক্ষিণ সুদান ও মিয়ানমার। তবে এত সব নিরাশার মধ্যেও রয়েছে কিছু আশার কথা। ইউএনএইচসিআরের প্রতিবেদন অনুসারে জানা যায়, কিছু দেশ এই শরণার্থীদের আশ্রয় দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এ বছর ৬২ হাজার ৫০০ এবং ২০২২ সালে সোয়া লাখ শরণার্থীকে আশ্রয় দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কলম্বিয়া জানিয়েছে, ভেনেজুয়েলার ১০ লাখের বেশি শরণার্থীকে স্থায়ী মর্যাদা দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশটি।

শরণার্থী সংকট থেকে মুক্ত নয় বাংলাদেশও। বেশ কয়েক বছর ধরে রোহিঙ্গা শরণার্থী নিয়ে বেশ বিপাকেই আছি আমরা। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংস হামলা চালায় সে দেশের সেনারা। গ্রামের পর গ্রাম ধ্বংস করে দেয়। সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয় নির্যাতিত রোহিঙ্গারা।

এই জনগোষ্ঠীর ওপর হামলার প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল বাংলাদেশ। দেশের সীমান্ত খুলে দিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় দেয়া হয় মিয়ানমারের নির্যাতিত এই জনগোষ্ঠীকে। এ দেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ওই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর নিজের চোখে দুর্দশাগ্রস্ত রোহিঙ্গাদের দেখতে কক্সবাজার যান। তাদের প্রতি সমবেদনা জানান এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দেন। শুধু তা-ই নয়, বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া শরণার্থীদের জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তাৎক্ষণিকভাবে তাদের জন্য খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেন।

আগ্রহী বিদেশি সাহায্য সংস্থাগুলোকেও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে কাজ করার সুযোগ দেন। প্রধানমন্ত্রীর এই তাৎক্ষণিক মানবিক সিদ্ধান্ত পুরো বিশ্বের নজর কাড়ে এবং বিপুল প্রশংসিত হয়। তবে এখানেই থেমে থাকেননি প্রধানমন্ত্রী।

২০১৭ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তিনি পাঁচ দফা প্রস্তাবও করেন। তার এই প্রস্তাবনাগুলো ছিল অনতিবিলম্বে ও চিরতরে মিয়ানমারের সহিংসতা এবং জাতিগত নিধন নিঃশর্তে বন্ধ করা, দ্রুত মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের নিজস্ব অনুসন্ধানী দল পাঠানো, জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধানের লক্ষ্যে মিয়ানমারের ভেতর জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা, রাখাইন রাজ্য থেকে জোর করে তাড়িয়ে দেয়া সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজেদের বাড়িতে প্রত্যাবর্তন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা এবং কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালা নিঃশর্ত, পূর্ণ এবং দ্রুত বাস্তাবায়ন নিশ্চিত করা।

এরপর মিয়ানমারে রোহিঙ্গাসহ অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘুর ওপর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য ২০১৯ সালের ২৭ ডিসেম্বর নিন্দা প্রস্তাব পাস করে জাতিসংঘ। তবে জাতিসংঘে প্রস্তাব উত্থাপন করেই বসে থাকেনি বাংলাদেশ। রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাতে থাকে।

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর নিপীড়নমূলক আচরণ বন্ধে ২০১৯ সালের ১১ নভেম্বর গাম্বিয়ার মামলার পরিপ্রেক্ষিতে ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস (আইসিজে) ২৩ জানুয়ারি ২০২০ সালে একটি জরুরি ‘সামরিক পদক্ষেপ’ ঘোষণা দেয়। সব মিলিয়ে গত চার বছর ধরে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে সফলতার সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা মানবিক সহায়তা পেয়ে আসছে।

রোহিঙ্গাদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনে দুটি তারিখ ঘোষণা হলেও সেটা ব্যর্থ হয়। রাখাইন প্রদেশে প্রত্যাবাসন সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে মিয়ানমার ব্যর্থ হওয়ায় রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে অস্বীকৃতি জানায়। এর মধ্যেই করোনা মহামারির কবলে পড়ে যায় দুনিয়া। মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিবেশও বদলে যায়। নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে সামরিক সরকার এখন ক্ষমতায়। তবু থেমে নেই বাংলাদেশ। দেশের ভেতরে ও বাইরে সমানভাবে শরণার্থী রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই রোহিঙ্গাদের জন্য আরও উন্নত আবাসস্থল তৈরি করা হয়েছে ভাসানচরে। কিছু রোহিঙ্গাকে সেখানে স্থানান্তরও করা হয়েছে। প্রথমদিকে কেউ কেউ এ স্থানান্তরে আপত্তি জানালেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে এই স্থানান্তর প্রশংসিত হয়েছে। হবেই তো।

যেখানে সুদানের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ শরণার্থীই দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে। খাদ্য আর বাসস্থানের মতো অতি জরুরি দুটি মৌলিক অধিকার থেকেও তারা বঞ্চিত। ওদিকে সিরিয়া, ইরাকসহ কয়েকটি দেশ থেকে ইউরোপের ২৭টি উন্নত দেশও ১০ লাখ শরণার্থীর ঢল সামলাতে হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে। সেখানে বিপুল ঘনবসতির বাংলাদেশ ১২ লাখ শরণার্থীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান জুগিয়ে অনবরত চিকিৎসা ও শিক্ষাসেবা দিয়ে যাচ্ছে। সুপরিকল্পিত ও যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া এই অসাধ্য সাধন অসম্ভব। পাশাপাশি রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানে কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যেতে হচ্ছে দেশকে। তবে বাংলাদেশ কেবল রোহিঙ্গা নয়, বিশ্বের অন্যান্য শরণার্থী সমস্যার সমাধানও চায়।

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন

একুশ দফা-ছয় দফা ও স্বাধীনতা

একুশ দফা-ছয় দফা ও স্বাধীনতা

বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ছিল বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তি। তিনি নির্বাচনি প্রচারে ২১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল- এ কর্মসূচিকে জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না-ও থাকে, তাহলেও যেন ২১ দফা কর্মসূচি কেউ অস্বীকার করতে না পারে।

যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন ও ২১ দফা একসঙ্গে উচ্চারিত হয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ৭ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনে পাকিস্তান আন্দোলনে মুখ্য ভূমিকা রাখা দল মুসলিম লীগ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল। কয়েকটি দলের যুক্তফ্রন্টকে সে সময় হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর যুক্তফ্রন্ট হিসেবেও অভিহিত করা হতো। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক ব্রিটিশ আমলে একাধিকবার অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীও এ পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৪৬ সালে। এর আগে শেরেবাংলার মন্ত্রিসভাতেও তিনি ছিলেন।

১৯৩৮ সালে দুজনে এসেছিলেন গোপালগঞ্জে, যেখানে ১৮ বছর বয়সী মুজিবকে দেখে মুগ্ধ হন। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর টাঙ্গাইলের একটি আসন থেকে পূর্ববঙ্গ আইনসভার সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু মুসলিম লীগ সরকার নানা কূটকৌশল করে তার সদস্যপদ খারিজ করে দেয়। পরে আর কখনও তিনি পার্লামেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হননি। কিন্তু যেকোনো নির্বাচনের প্রচারকাজে তার অংশগ্রহণ অপরিহার্য বিবেচিত হতো। তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ, অনুপ্রাণিত করতে পারতেন।

যুক্তফ্রন্টের শরিক দলগুলোর প্রার্থীরা প্রত্যেকেই চেয়েছেন এই তিন জনপ্রিয় নেতা তাদের আসনে যেন প্রচারকাজের জন্য যান। সে সময় ৩৪ বছর বয়স্ক শেখ মুজিবকেও তারা চাইতেন নিজ নিজ এলাকায় বক্তা হিসেবে।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারির ঐতিহাসিক আন্দোলনের পর থেকে মুসলিম লীগের পায়ের নিচে মাটি ছিল না। তারা হয়ে পড়ে জনধিক্কৃত দল। আওয়ামী লীগ তখন দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে। তরুণ শেখ মুজিব বারবার সভা-সমাবেশ করছেন জেলা ও মহকুমাগুলোতে।

আওয়ামী লীগের কমিটি গঠনের পাশাপাশি ছাত্রলীগের সংগঠন শক্তিশালী করার প্রতিও তার নজর ছিল। ভাষা আন্দোলনের কারণে ছাত্রসমাজের ওপর জনগণের আস্থা ও মর্যাদা ছিল আকাশছোঁয়া। যুক্তফ্রন্টের পক্ষে নির্বাচনের প্রচারে তারা বড় ভূমিকা রাখবে, এটা বোঝা যাচ্ছিল।

মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে হক-ভাসানী-সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ, গণতন্ত্রী পার্টি, শেরেবাংলার কৃষক শ্রমিক পার্টি, নেজামে ইসলামী ও কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতি দল নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠনের জনদাবি ছিল। তবে নেজামে ইসলামীর নেতারা কমিউনিস্ট পার্টিকে যুক্তফ্রন্টে নেয়া চলবে না- এ শর্ত দিলেন এবং শেরেবাংলা দৃঢ়ভাবে তাদের পক্ষে দাঁড়ালেন।

মুসলিম লীগ নির্বাচনে হেরে যাবে, জনমনে এ ধারণা ছিল। এ দলের অনেক নেতাও সেটা বুঝতেন। তারা যুক্তফ্রন্টের বিভিন্ন দলে নাম লেখাতে শুরু করেন। বঙ্গবন্ধু আদর্শভিত্তিক ঐক্যের পক্ষে ছিলেন। কেবল মুসলিম লীগকে হারাতে হবে, এর মধ্যেই সীমিত থাকতে চাননি তিনি। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে লিখেছেন-

‘ক্ষমতায় যাওয়া যেতে পারে, তবে জনসাধারণের জন্য কিছু করা সম্ভব হবে না, আর এ ক্ষমতা বেশি দিন থাকবেও না। যেখানে আদর্শের মিল নাই, সেখানে ঐক্যও বেশি দিন থাকে না।’ [পৃষ্ঠা ২৫০]

তিনি আরও লিখেছেন-

‘আমি চেষ্টা করতে লাগলাম যাতে সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে যুক্তফ্রন্ট চলে। দুই দিন না যেতেই খেলা শুরু হল। নামও শুনি নাই এমন দলের আবির্ভাব হল।’ [পৃষ্ঠা ২৫২]

যুক্তফ্রন্টের কর্মসূচি নির্ধারিত হয় ২১ দফা। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে আরও জানাচ্ছেন-

‘আবুল মনসুর আহমদ বিচক্ষণ লোক সন্দেহ নাই। তিনি ব্যাপারটি বুঝতে পারলেন এবং তাড়াতাড়ি কফিলউদ্দিন চৌধুরীর সাহায্যে একুশ দফা প্রোগ্রামে দস্তখত করিয়ে নিলেন হক সাহেবকে দিয়ে। তাতে আওয়ামী লীগের স্বায়ত্তশাসন, বাংলা ভাষা রাষ্ট্রভাষা, রাজবন্দিদের মুক্তি এবং আরও কতকগুলি দাবি মেনে নেওয়া হল। আমরা যারা এ দেশের রাজনীতির সাথে জড়িত আছি তারা জানি, এই দস্তখতের কোনো অর্থ নাই অনেকের কাছে।’ [পৃষ্ঠা ২৫১]

বঙ্গবন্ধু ছাত্রজীবন থেকেই মহৎ কিছু লক্ষ্য সামনে রেখে রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনা করেছেন। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র সাড়ে চার মাসের মধ্যে তিনি ছাত্রলীগ গঠন করেন। সে সময় তার বয়স ২৮ বছরও পূর্ণ হয়নি। কিন্তু বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের ক্ষমতায় যারা বসেছে তারা পূর্ব বাংলাকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দমিয়ে রাখতে চাইছে। এমনকি মাতৃভাষার অধিকারও কেড়ে নিতে চায়। উর্দু চাপিয়ে দেয়া হলে চাকরি ও ব্যবসায় বাঙালিরা দারুণভাবে পিছিয়ে পড়বে।

২১ দফায় এসব দাবি স্থান পায়। কিন্তু শেরেবাংলার দল কৃষক শ্রমিক পার্টি এবং নেজামে ইসলামীর মতো দল কেবল ক্ষমতা চাইছিল- মুসলিম লীগের পরিবর্তে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা হলেই তারা খুশি। মন্ত্রী-এমপিরা প্রোটোকল সুবিধা পাবে, ব্যবসা করতে পারবে, লাইসেন্স-পারমিটে অগ্রাধিকার পাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর চিন্তায় ছিল বাঙালির আর্থসামাজিক মুক্তি। তিনি নির্বাচনি প্রচারে ২১ দফা কর্মসূচি বাস্তবায়নের ওপর জোর দিতে থাকেন। তার লক্ষ্য ছিল- এ কর্মসূচিকে জনগণের কর্মসূচিতে পরিণত করতে হবে। আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় না-ও থাকে, তাহলেও যেন ২১ দফা কর্মসূচি কেউ অস্বীকার করতে না পারে।

তিনি লিখেছেন-

‘কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল জানেন পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ স্বায়ত্তশাসনের জন্য জনমত সৃষ্টি করেছে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে যে অর্থনৈতিক বৈষম্য দিন দিন বেড়ে চলেছে- চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও মিলিটারিতে বাঙালিদের স্থান দেওয়া হচ্ছে না- এ সম্বন্ধে আওয়ালী লীগ সংখ্যাতত্ত্ব দিয়ে কতগুলি প্রচারপত্র ছাপিয়ে বিলি করেছে সমস্ত দেশে। সমস্ত পূর্ব বাংলায় গানের মারফতে গ্রাম্য লোক কবিরা প্রচারে নেমেছেন।’ [পৃষ্ঠা ২৫৮]

বঙ্গবন্ধুর আশঙ্কা যথার্থ প্রমাণিত হয়েছিল- যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠনের মাস দুয়েকের মধ্যেই তা ভেঙে দিয়ে গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। রাজনৈতিক তৎপরতা নিষিদ্ধ হয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক জনগণকে প্রতিবাদের ডাক দেননি। শত শত নেতা-কর্মী গ্রেপ্তার হন। মন্ত্রীদের মধ্যে গ্রেপ্তার কেবল কনিষ্ঠতম সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থে দুঃখ করে লিখেছেন-

‘অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনো দিন একসাথে দেশের কোনো কাজে নামতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।’ [পৃষ্ঠা ২৭৩]

পরের বছরগুলোতে তিনি স্বায়ত্তশাসনের দাবি নিয়ে আরও সোচ্চার হন। ১৯৫৬ সালের সেপ্টেম্বরে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগ নেতা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে মন্ত্রিসভা গঠিত হলে নতুন করে স্বায়ত্তশাসনের ইস্যু সামনে আসে।

১৯৫৭ সালের এপ্রিল মাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মহিউদ্দিন আহমদ ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তান আইনসভায় স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব পাস হয়। এ আলোচনায় অংশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু ‘পাকিস্তানে দুই অর্থনীতি’ বা টু ইকোনমি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এ সময় তিনি দলীয় সংগঠনের কাজে বেশি করে সময় দেয়ার জন্য আতাউর রহমানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন। দলের স্বার্থে মন্ত্রিত্ব ত্যাগ- এমন নজির পাকিস্তানে নেই, বিশ্বেও বিরল।

১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হয়। পরের বছর সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা। সর্বমহলে ধারণা ছিল নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী হবেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী। এটা ঠেকাতেই সামরিক শাসন জারি করা হয়।

এ ঘটনায় বঙ্গবন্ধু শিক্ষা নেন। তিনি ১৯৬৬ সালের ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে পাকিস্তানের ক্ষমতার দুর্গ শহর হিসেবে পরিচিত লাহোরে বসে স্বায়ত্তশাসনের ছয় দফা কর্মসূচি উত্থাপন করেন। সাবেক মুখ্যমন্ত্রী আতাউর রহমান খানকে এ কর্মসূচি উত্থাপনের জন্য বঙ্গবন্ধু অনুরোধ করলে তিনি বলেছিলেন, ‘মজিবর মিয়া, এ কর্মসূচি দিলে আমিও ফাঁসিতে ঝুলব, তোমাকেও লটকাবে।’

কিন্তু বঙ্গবন্ধু ছিলেন অদম্য। তার সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল স্বাধীন বাংলাদেশ। তিনি ২১ দফার ১৯ দফায় স্বায়ত্তশাসনের সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব থেকে মৌলিকভাবে সরে আসেন।

২১ দফায় ছিল- ঐতিহাসিক লাহোর সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা, বৈদেশিক সম্পর্ক এবং মুদ্রাব্যবস্থা ছাড়া অন্য সব বিষয়ে পূর্ব বাংলার স্বাধিকার প্রতিষ্ঠা। প্রতিরক্ষা বিষয়েও কেন্দ্রে যেমন থাকবে ‘নেভি হেডকোয়ার্টার্স’ এবং পূর্ববঙ্গকে অস্ত্রের ব্যাপারে স্বনির্ভর করার জন্য তেমনি পূর্ববঙ্গে হবে ‘অস্ত্র কারখানা’ প্রতিষ্ঠা। আনসারদের পুরোপুরি সৈনিকরূপে স্বীকৃতি।

ছয় দফায় বঙ্গবন্ধু অর্থ কেন্দ্রের হাত থেকে প্রদেশ বা রাজ্যের হাতে নিয়ে আসার কথা বলেন। তিনি বলেন, দুটি প্রদেশে পৃথক মুদ্রা থাকবে। অথবা এক মুদ্রা হবে, কিন্তু দুই প্রদেশে থাকবে দুটি রিজার্ভ ব্যাংক। এক প্রদেশ থেকে অন্য প্রদেশে মুদ্রা পাচার বন্ধ করা হবে। রাজস্ব ধার্য ও আদায়র ক্ষমতা থাকবে প্রদেশের হাতে। প্রতিটি প্রদেশ যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করবে তার নিয়ন্ত্রণ রাখার ব্যবস্থা তাদের হাতেই থাকবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক শান্তনু মজুমদার বলেছেন, ছয় দফা বলবৎ হলে পাকিস্তানে এমনকি শিথিল ফেডারেশনও অসম্ভব ছিল।

বঙ্গবন্ধু ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ছয় দফার প্রশ্নে গণভোট ঘোষণা করেন এবং জনগণ তাকে ম্যান্ডেট প্রদান করে। পাকিস্তানিরা এ ম্যান্ডেট মানতে অস্বীকার করে এবং গণহত্যা চাপিয়ে দেয়। কিন্তু বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং জনগণ তার কথামতো ‘যার যা আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করে’ স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করে।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা নিয়ে এখনই ভাবা জরুরি

করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।

গেল ১৫ মাস থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছুটি বাড়ছে দফায় দফায়। আবারও ছুটি বেড়েছে ৩০ জুন পর্যন্ত। এখনও বোঝা যাচ্ছে না, কবে নাগাদ প্রতিষ্ঠানের ফটক খুলবে। এই মহামারিতে অন্য সব প্রতিষ্ঠানের বিক্ষিপ্ত ক্ষতি হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে অপরিমেয়। দীর্ঘ সময় স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ থাকার কারণে বেসরকারি, প্রাইভেট স্কুল এবং কলেজগুলো মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে। এখানে কর্মরতরা প্রচুর আর্থিক ক্ষতির মুখে, শহর থেকে গ্রামে ছোটাছুটি করেও টিকে থাকতে পারছেন না। কেউ হয়েছেন ফলের দোকানদার, কেউ মুদি, কেউবা চায়ের দোকানদার, কেউ দিয়েছেন লন্ড্রি। কেউ আদি পেশা কৃষিতে ফিরে গেছেন।

আবার কেউবা বেঁচে আছেন অন্যের দাক্ষিণ্যে। বিপুলসংখ্যক মানুষের জীবনে অমানিশার কালো মেঘ জমেছে, আর্থিক দৈন্যে ছোট হতে হতে মিশে যেতে বসেছে মাটির সঙ্গে। তবে অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায়, রাষ্ট্র কারো দায় নেয়নি, পায়নি কেউ কোনো প্রণোদনা। করোনা পুরোপুরি বিনাশ হলেও কিছু প্রতিষ্ঠান আর কোনো দিনও আলোর মুখ দেখবে না বললে অত্যুক্তি হবে না।

অপরদিকে এই বন্ধ দীর্ঘায়িত হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতির মারাত্মক দিকটির সঙ্গে চার কোটি শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবনও ডুবে আছে অন্ধকারে, যা কোনো অর্থমূল্যেই শোধ হবে না।

ইউনিসেফের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি দিন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকা ১৪টি দেশের একটি বাংলাদেশ। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় বহুমাত্রিক প্রভাবে ছিন্নভিন্ন হতে বসেছে দেশের পুরো শিক্ষাব্যবস্থা। ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের জীবন থেকে একটি শিক্ষাবর্ষের পুরোটাই হারিয়ে গেছে। আরেকটি বর্ষও হারিয়ে যাওয়ার পথে। গবেষণায় এসেছে, শিক্ষার্থীদের একটি অংশ আর কখনোই পড়াশোনায় ফিরবে না। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের দুটি কারণ চিহ্নিত করা গেছে।

একটি কারণ দীর্ঘ শিখন বিরতির ফলে পাঠ না পারা ও বোঝার পরিস্থিতি এবং অপর সম্ভাব্যটি দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিপতিত হয়ে বাবা-মায়ের সঙ্গে কাজে ভিড়ে যাওয়া। বিশেষ করে মাধ্যমিকে ঝরে পড়াদের ক্ষেত্রে এটা বেশি ঘটতে পারে। আর ঝরে পড়া এসব শিক্ষার্থীর মেয়েশিশুদের বিয়ে হয়ে যেতে পারে। দেশে বাল্যবিবাহ, শিশুশ্রমের মতো বিষয়গুলো আগে থেকেই প্রকট ছিল, করোনার কারণে তা ব্যাপকভাবে বেড়ে যেতে পারে।

আবার বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে পড়াশোনা শেষ না হওয়ায় কর্মজীবনে প্রবেশ করতে না পেরে তীব্র হতাশায় ভুগছে অনেকেই।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, জনসংখ্যার বড় অংশকে গণটিকার আওতায় না আনা পর্যন্ত করোনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসবে না। সেটা দুই বছর পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। এখন প্রশ্ন হলো, মহামারি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে না আসা পর্যন্ত শিক্ষাক্ষেত্রে কী হবে?
কঠিন এ প্রশ্নের সহজ কোনো উত্তর জানা না থাকলে অবশ্যই উত্তর খুঁজে বের করতে হবে। শিক্ষার বহুমাত্রিক ক্ষতির সমাধানে আর সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। ক্ষতি যা হওয়ার তা আর কোনোক্রমেই বাড়তে দেয়া যায় না।
করোনার এই সময়ে শহরের শিক্ষার্থীরা অনলাইনে পড়াশোনার সীমিত সুযোগ পেলেও গ্রামের শিক্ষার্থীরা একেবারেই বঞ্চিত। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীই অনলাইনভিত্তিক কার্যক্রমে অংশ নেয়নি। আর আমাদের দেশে এই ভার্চুয়াল পড়াশোনা দিয়েও কাজের কাজ কিছুই হয় না।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় ঘরবন্দি শিক্ষার্থীদের শুধু যে পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে তা-ই নয়, পাশাপাশি শারীরিক এবং মানসিক বিকাশও বাধাপ্রাপ্ত হচ্ছে। ছোট থেকে বড় প্রায় সবাই ভার্চুয়াল জগতে আসক্ত হয়ে পড়ছে, আসক্ত হচ্ছে মাদকেও।

মনোযোগ হারাচ্ছে পড়াশোনায়। বিষণ্ণতা, একাকিত্ব, উদ্বেগ আর মানসিক চাপে শিক্ষার্থীরা হারিয়ে ফেলছে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা। এমনকি আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যা-প্রবণতার মতো মানসিক ব্যাধিও লক্ষ করা যাচ্ছে। অর্থনীতির চাকা চালু রাখার পাশাপাশি শিশু-কিশোর, তরুণ-তরুণীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, আচরণগত পরিবর্তনের কারণে মহামারি পরবর্তী জীবনেও খাপ খাইয়ে নিতে মারাত্মক অসুবিধার সৃষ্টি হবে।
শিক্ষার্থীদের সুস্থ স্বাভাবিক বিকাশে পরিবার এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উভয়েরই সমান দায়িত্ব এবং গুরুত্ব রয়েছে। বর্তমানে পরিবারের কাঁধে পুরো দায়িত্ব এসে পড়ায় পরিবারগুলো এককভাবে এই গুরুদায়িত্ব পালনে হোঁচট খাচ্ছে। শিক্ষার বহুমুখী ইতিবাচক দিকের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হলো সামাজিকীকরণ।

একটি শিশু সামাজিকভাবে গড়ে না উঠলে সে যত বড় বিদ্বানই হোক না কেন, সংকীর্ণতার ঘেরাটোপে বন্দি থাকবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এই সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সামাজিকীকরণের জায়গায় পরিবারগুলোও ব্যর্থ হচ্ছে। সবকিছু মিলিয়ে অতিরিক্ত চাপে পরিবারের বেশির ভাগ সদস্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

করোনা পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে তাকে সাথি করেই পথ চলতে হবে। সেটাই হবে নতুন স্বাভাবিক জীবন। ইতোমধ্যে অন্য খাতগুলো শুরু হয়েছে শুধু শিক্ষা খাত ছাড়া। হাটবাজার, অফিস-আদালত, ব্যবসা-বাণিজ্য, গণপরিবহন সবই খুলে দেয়া হয়েছে। বিয়েসহ সব ধরনের আনুষ্ঠানিকতাও বন্ধ নেই। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটছে না। ঝড় এলে উটপাখির মতো বালুতে মাথা না গুঁজে বরং ঝড়ের মোকাবিলা করাটাই যুক্তিযুক্ত।

অনির্দিষ্ট সময় ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ না রেখে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। করোনাকে সঙ্গে নিয়েই ঠিক করতে হবে কর্মপরিকল্পনা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পরিস্থিতি থেকে বের হতে হলে একসঙ্গে না খুলে বরং ধাপে ধাপে খুলতে হবে। যেসব এলাকায় সংক্রমণ নেই বা কম, সেসব এলাকায় পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করে প্রতিষ্ঠান খুলে দিয়ে গভীর পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আধুনিক সভ্যতার প্রধানতম ভিত্তি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা।

লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন

এসডিজি অর্জনে সাফল্য

এসডিজি অর্জনে সাফল্য

২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকেই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে।

খুন, নারী নির্যাতন, গুম, কোভিডে মৃত্যু, ঘুষ-দুর্নীতি, অনিয়ম ইত্যাদি নানা নেতিবাচক খবরের ভিড়ে হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো একটা খবর। জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে বিশ্বের যে তিনটি দেশ সবচেয়ে এগিয়ে আছে, এর মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সলিউশনস নেটওয়ার্কের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৫ জুন এ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যে এসডিজি অর্জনে বাংলাদেশের এই সাফল্যের খবর অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। এসডিজি অর্জনে এগিয়ে থাকা বাকি দুটি দেশ হলো আফগানিস্তান ও আইভরিকোস্ট। এর মধ্যে আফগানিস্তানের নাম থাকাটা একটা বিস্ময়।

যুদ্ধবিধ্বস্ত জঙ্গিকবলিত দেশটিতে দশকের পর দশক ধরে চলছে চরম নিরাপত্তা সংকট। জঙ্গিদের আত্মঘাতী বোমা হামলা এখনও দেশটির নিয়মিত দৃশ্য। এর মধ্যেও এসডিজি অর্জনে আফগানিস্তানের সাফল্য উন্নয়ন গবেষকদের কাছে যথেষ্ট বিস্ময়ের।

যাহোক, এসডিজির ক্ষেত্রে অগ্রগতির ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া কোভিড-১৯ মহামারির কারণে নির্ধারিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

২০১৫ সালে এসডিজি গৃহীত হওয়ার পর এই প্রথম এর সূচকের স্কোর আগের বছরের চেয়ে কমে গেছে। এর কারণ হলো কোভিড মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য এবং বেকারত্ব বেড়ে যাওয়া। বিশ্বের অপরাপর দেশের মতো বাংলাদেশও কোভিড মোকাবিলায় কঠিন সময় পার করছে। এর মধ্যেও বাংলাদেশ অনেক সামাজিক সূচকেই ইতিবাচক ধারা বজায় রেখেছে।

উল্লেখ্য, জাতিসংঘ ২০১৫ সালে এসডিজি গ্রহণ করে। এটি ১৫ বছর মেয়াদি। এর উদ্দেশ্য ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বে শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করা। সেই লক্ষ্যে ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। আর ১৬৯টি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে। জাতিসংঘ এর আগে সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) গ্রহণ করেছিল। এরপরই এসডিজি আসে। এসডিজির লক্ষ্যগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য দূর করা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সুস্বাস্থ্য, উন্নত শিক্ষা নিশ্চিত ও লিঙ্গবৈষম্য প্রতিরোধ অন্যতম।

এসডিজির এবারের সূচকে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ। গত বছর এ স্কোর ছিল ৬৩ দশমিক ২৬ শতাংশ। ২০১৫ সালে যখন এসডিজি গৃহীত হয়, তখন বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৫৯ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ। বিশ্বের ১৬৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে আছে।

এবারের তালিকায় সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে ফিনল্যান্ড। দেশটির স্কোর ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ। এর পরের চার দেশ হলো সুইডেন (৮৫.৬%), ডেনমার্ক (৮৪.৯%), জার্মানি (৮২.৫%) ও বেলজিয়াম (৮২.২%)। আর সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রের স্কোর ৩৮ দশমিক ২৭ শতাংশ। এর আগে আছে দক্ষিণ সুদান ও চাদ। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে এগিয়ে ৭০তম স্থানে আছে ভুটান। এরপর আছে মালদ্বীপ, শ্রীলঙ্কা ও নেপাল। এদের অবস্থান যথাক্রমে ৭৯, ৮৭ ও ৯৬তম।

সামাজিক বিভিন্ন অগ্রগতির সূচকে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দৃষ্টান্ত হয়ে উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের নিবিড় সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, ক্ষুদ্রঋণের ব্যবহার এবং দারিদ্র্য দূরীকরণে তার ভূমিকা, বৃক্ষরোপণ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সূচকের ইতিবাচক পরিবর্তন প্রভৃতি ক্ষেত্রে অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে। নোবেল বিজয়ী ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনের করা মন্তব্য এক্ষেত্রে প্রণিধানযোগ্য।

তার মতে, কিছু ক্ষেত্রে বিশ্বকে চমকে দেবার মতো সাফল্য আছে বাংলাদেশের। বিশেষত শিক্ষাসুবিধা, নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুহার ও জন্মহার কমানো, গরিব মানুষের জন্য শৌচাগার ও স্বাস্থ্যসুবিধা প্রদান এবং শিশুদের টিকাদান কার্যক্রম অন্যতম।

এমডিজির সব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে এখনও বহুপথ পাড়ি দিতে হবে। এসডিজি অর্জনের এখনও প্রধান দুর্বলতা তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রগতি বিচার-বিশ্লেষণ করার মতো প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত পর্যন্ত নেই। বৈষম্য দূরীকরণ, শান্তি ও ন্যায়বিচার, জলবায়ু রক্ষায় ভূমিকা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার মতো বিষয়গুলোতে বাংলাদেশের এখনও কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। মানুষের পুষ্টি পূরণে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জিত হয়নি।

দেশে এখনও পাঁচ বছরের কম বয়সী ৩১ শতাংশ শিশু খর্বকায়, ২২ শতাংশ পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুর ওজনস্বল্পতা রয়েছে। নগরে- দারিদ্র্য ও ঘনবসতি, পার্বত্য চট্টগ্রামে- দুর্গম এলাকা, খাদ্য ঘাটতি, ফসলি জমির অভাব, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক পার্থক্যের কারণে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন এবং পোশাক শিল্পে- নারীদের কঠোর পরিশ্রম ও অসচেতনতার কারণে পুষ্টি পরিস্থিতির তেমন কোনো উন্নত হয়নি।

এসডিজিতে ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নারীর মালিকানা স্থাপনের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। ভূমির ওপর নারীদের মালিকানা বা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে পরিবার ও জনগোষ্ঠীর খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা, পুষ্টিহীনতা দূরীকরণ ও টেকসই কৃষি ব্যবস্থার নিশ্চয়তা তৈরি হয়। ভূমি কেবল আয়ের উৎস নয়, এটা সামাজিক, সাংস্কৃতিক অধিকারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। বিষয়টা এখনও যথাযথ গুরুত্ব পায়নি।

নারীদের জন্য মানসম্মত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনও পিছিয়ে। গার্মেন্টস, কৃষি, ঘর-গৃহস্থালিসহ বিভিন্ন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের কর্মরত নারী শ্রমিকদের উপযুক্ত কাজের পরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরির ব্যবস্থা করতে হবে। আমাদের এমন একটি উন্নয়ন কৌশল দরকার যেখানে শ্রমিক, তার পরিবার ও ওই জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি মানসম্মত মজুরি নির্ধারণের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে করে একজন শ্রমিক সম্মানের সঙ্গে তার জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।

শান্তি ও ন্যায়বিচার বা ন্যায্যতার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পরেনি। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত না হওয়া, সুশাসনের ঘাটতি নারী অধিকার নিশ্চয়তার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। নারীর প্রতি সহিংসতাকে সুস্পষ্টভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন যা অন্যান্য উন্নয়ন ও অধিকারের অন্তরায় হিসেবে মনে করা হয়। সহিংসতার ফলে নারী এবং শিশু গৃহহীন, স্বাস্থ্যগত সমস্যা, নিরাপত্তাহীনতাসহ নানাবিধ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে।

এর জন্য সকল স্তরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এটা শুরু করতে হবে ঘর থেকে এবং সরকারি উচ্চপর্যায় পর্যন্ত তা বলবৎ থাকবে। তৃণমূল এবং জাতীয়পর্যায়ে নারীদের নেতৃত্ব ও অংশগ্রহণ হলো নারী অধিকার, জেন্ডার সমতা, টেকসই উন্নয়ন ও গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত।

মনে রাখা দরকার যে, এসডিজির লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে হলে সমাজের সর্বক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ এবং নেতৃত্ব প্রয়োজন। পদ্ধতিগতভাবে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ এসডিজি অর্জনেও সফল হবে।

বাংলাদেশের যেকোনো ভালো প্রস্তাব কার্যকর করার ক্ষেত্রে প্রশাসনিক দুর্বলতা রয়েছে। প্রশাসনিক দক্ষতার পাশাপাশি সুশাসনও দরকার। এসডিজির পরিকল্পনাগুলো কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সেটা একটা বড় ইস্যু। এর জন্য বিশ্ব অংশীদারত্ব প্রয়োজন।

সামর্থ্য ও সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে মধ্যম আয়ের দেশের মর্যাদা পেতে অনেক বেশি বিনিয়োগ, শক্ত-সমর্থ উন্নয়ন সহায়তা, পুঙ্খানুপুঙ্খ ও কার্যকর সংস্কারের উদ্যোগ প্রয়োজন এবং উন্নত ব্যবসার পরিবেশ, আর্থিক শৃঙ্খলা স্থাপন ও স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ সমুন্নত রাখতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের উন্নয়নের প্রধান চ্যালেঞ্জ হলো বেসরকারি বিনিয়োগের জন্য একটি সক্রিয় ও ক্রমাগত স্থিতিশীল পরিবেশ, সরকারি খাতের সুশাসন এবং সরকার ও বিচার বিভাগের দক্ষতা ও সততা শক্তিশালীকরণ, একটি দ্রুত বর্ধনশীল ও ক্রমবর্ধমান শহুরে শ্রমশক্তির কার্যকর ব্যবহার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেয়ার ও বিশ্বের দুর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে ঝুঁকি মোকাবিলার কার্যকরী ব্যবস্থাপনা।

সর্বোপরি, এসডিজি অর্জনে সফল হতে হলে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ ও রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে হবে। সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে। উন্নত দেশ হতে হলে ২৪ বছরের মধ্যে দেশের মোট আয় তিন ট্রিলিয়নে উন্নীত করতে হবে। অর্থনীতির আকার ১০ থেকে ২০ গুণ বাড়াতে হবে। যা মোটেও সহজ কাজ নয়।

একথা ঠিক যে, কোভিড-১৯ মহামারি সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে কিছুটা বাধাগ্রস্ত করছে। তবে আশার কথা হলো, সরকার এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় যথাযথ পরিকল্পনা ও কার্যক্রম হাতে নিচ্ছে। এসডিজি বাস্তবায়নে সরকারের যে রাজনৈতিক অঙ্গীকার তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রম আরও বেগবান হলে এসডিজি অর্জন অসম্ভব হবে না।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন

মডেল মসজিদ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা

মডেল মসজিদ ও শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা

মডেল মসজিদগুলোর সুযোগ-সুবিধা দেখলে সহজে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী একটি বিশুদ্ধ ও মানবিক জাতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করছেন, অটিজমের শিকার মানুষদের জন্য এসব মডেল মসজিদে বিশেষ সুবিধা থাকছে। অতিথিশালা থাকছে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসনও থাকছে। এ যে কত বড় উদারতা ও মহানুভবতা তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীন ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশে ইসলামের খেদমতে সর্বপ্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের জন্য তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করে যান। টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমার জন্য সুবিশাল প্রান্তর বরাদ্দ করেন বঙ্গবন্ধুই। আজকের বাংলাদেশের মুসলমানদের তাবলিগ জামাতের যে মূল কেন্দ্র কাকরাইল মসজিদ, সেটিও জাতির পিতার অবদান। পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার পরে প্রকৃত ইসলামি মূল্যবোধ থেকে সরে গিয়ে এ দেশের মাথার ওপর উগ্রবাদ জেঁকে বসে।

২১ বছর পর বঙ্গবন্ধুতনয়া শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। এরপর নানামুখী ষড়যন্ত্র তাকে কিছু সময়ের জন্য দেশসেবা থেকে দূরে রাখলেও ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে তিনি পুনরায় সরকার গঠন করেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গত ১৩ বছরে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব অগ্রগতি হয়েছে। পৃথিবীর অনেক শক্তিশালী দেশের চেয়েও এখন বাংলাদেশের জিডিপি ও এসডিজির অগ্রগতি ভালো।

বিভিন্ন অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় উন্নয়নের পাশাপাশি দেশরত্ন শেখ হাসিনা ধর্মীয় ও নৈতিক উন্নয়নের দিকেও নজর দিয়েছেন। পিতার দেখানো পথ ধরে তিনি জাতিগত সংস্কার ও আধুনিকায়নের উদ্যোগ নিয়েছেন। আর এই জন্যই দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর ইবাদতের জায়গার নির্মাণ শুধু নয়, সেটিকে মডেল হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।

চলমান মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সারা দেশের জেলা, উপজেলা, উপকূল, মহানগর ও বিভাগীয় শহরে সরকারিভাবে ৫৬০টি মডেল মসজিদের অনুমোদন দিয়েছেন। এসব মসজিদ নির্মাণে ৮ হাজার ৭২২ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন তিনি। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্মিত ৫০টি মডেল মসজিদ একযোগে উদ্বোধন করে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন সম্প্রতি।

বলার অপেক্ষা রাখে না, পরবর্তী মডেল মসজিদগুলো উদ্বোধনের সময়ে তিনি একযোগে এত মসজিদ উদ্বোধনের নিজের রেকর্ড নিজেই আবার ভাঙবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

ধর্ম মন্ত্রণালয়ের সূত্র জানায়, আধুনিক সুযোগ-সুবিধা-সংবলিত সুবিশাল এসব মডেল মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে নারী ও পুরুষদের পৃথক ওজু ও নামাজ আদায়ের সুবিধা, লাইব্রেরি, গবেষণাকেন্দ্র, ইসলামিক বই বিক্রয় কেন্দ্র, পবিত্র কোরআন হেফজ বিভাগ, শিশু শিক্ষা, অতিথিশালা, বিদেশি পর্যটকদের আবাসন, মৃতদেহ গোসলের ব্যবস্থা, হজযাত্রীদের নিবন্ধন ও অটিজম সেন্টার, প্রতিবন্ধী মুসল্লিদের টয়লেটসহ নামাজের পৃথক ব্যবস্থা, গণশিক্ষা কেন্দ্র, ইসলামি সাংস্কৃতিক কেন্দ্র থাকবে। এ ছাড়াও ইমাম-মুয়াজ্জিনের প্রশিক্ষণ-আবাসন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য অফিসের ব্যবস্থা এবং গাড়ি পার্কিং-সুবিধা রাখা হয়েছে।

মডেল মসজিদগুলোতে দ্বিনি দাওয়াত কার্যক্রম ও ইসলামি সংস্কৃতিচর্চার পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস, যৌতুক, নারীর প্রতি সহিংসতাসহ বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধি রোধে সচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

সারা দেশে এসব মসজিদে প্রতিদিন ৪ লাখ ৯৪ হাজার ২০০ জন পুরুষ এবং ৩১ হাজার ৪০০ নারী একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারবেন। একসঙ্গে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষ কোরআন তেলাওয়াত করতে পারবেন, ৬ হাজার ৮০০ জন ইসলামিক বিষয়ে গবেষণা করতে পারবেন, ৫৬ হাজার মানুষ দোয়া ও মোনাজাতে অংশ নিতে পারবেন এবং প্রতিবছর এখান থেকে ১৪ হাজার কোরআনে হাফেজ হবেন।

মডেল মসজিদগুলোর সুযোগ-সুবিধা দেখলে সহজে বোঝা যায়, প্রধানমন্ত্রী একটি বিশুদ্ধ ও মানবিক জাতি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছেন। নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিত করছেন, অটিজমের শিকার মানুষদের জন্য এসব মডেল মসজিদে বিশেষ সুবিধা থাকছে। অতিথিশালা থাকছে, বিদেশি পর্যটকদের জন্য আবাসনও থাকছে। এ যে কত বড় উদারতা ও মহানুভবতা তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেবে।

মুজিববর্ষ উপলক্ষে প্রথম পর্যায়ে ৫০টি মডেল মসজিদের উদ্বোধন করা হয়েছে গত ১০ জুন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী বলেন, “ইসলামের প্রচার ও প্রসারে ভূমিকা রাখার সঙ্গে সঙ্গে সন্ত্রাস ও নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে এসব মসজিদ ভূমিকা রাখবে।”

প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের গুরুত্ব খুবই অর্থবহ ও সুদূরপ্রসারী। তিনি ইসলাম ধর্মের প্রকৃত মর্মবাণী প্রতিটি মুসল্লির কাছে পৌঁছে দিতে চাচ্ছেন। আর একজন প্রকৃত মুসলমান কখনও নারীর প্রতি সহিংস হবেন না, জঙ্গিবাদে জড়াবেন না। আর এই লক্ষ্যেই তিনি ইসলামের প্রকৃত মর্মবাণী নিয়ে গবেষণার সুযোগ রেখেছেন এসব মসজিদে, ইমাম-মুয়াজ্জিনরা যাতে প্রকৃত ইসলামি শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মুসল্লিদের কাছে ইসলামের আসল বার্তা নিয়ে যেতে পারেন সেই ব্যবস্থাও রেখেছেন।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার দর্শন ও দূরদর্শিতা ফুটে উঠেছে এসব মডেল মসজিদে। তিনি যতদিন আছেন, ততদিন বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা কেউ ‘দাবায়ে’ রাখতে পারবে না। বাংলাদেশ একদিন বিশ্বের বুকে মডেল রাষ্ট্র হবে। শেখ হাসিনা দীর্ঘজীবী হোন।

লেখক: ছাত্রনেতা ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন

শেখ হাসিনা-ম্যাজিকে বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি

শেখ হাসিনা-ম্যাজিকে বদলে গেছে দেশের অর্থনীতি

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম রপ্তানিকারক ও ৩০তম আমদানিকারক দেশ। অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখতে এসে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেছিলেন, ‘শুধু বলার জন্য নয়, দারিদ্র্য বিমোচনে সত্যিই আজ বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল।

কিছুদিন আগে বিদেশি এক বন্ধু আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, তোমাদের দেশে এত উন্নয়ন হচ্ছে টাকা পাও কোথায়? পদ্মা সেতু, উড়াল সেতু, মেট্রোরেলসহ অনেক কিছুই তো হচ্ছে, যেটা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে আমরাও দেখতে পাই। তোমাদের উন্নয়নের ম্যাজিক কী? বন্ধুটির প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলাম, আমাদের ম্যাজিকের নাম শেখ হাসিনা।

হ্যাঁ, শেখ হাসিনা-ম্যাজিকেই গত এক যুগে বদলে গেছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মাথাপিছু আয়, নারীর ক্ষমতায়ন, গড় আয়ু বৃদ্ধি, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হ্রাসসহ বেশ কিছু সামাজিক সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি বিশ্ব নেতৃত্বকে চমকে দিয়েছে।

বিপুল খাদ্য ঘাটতির দেশটি আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতাই শুধু অর্জন করেনি, সাহায্যনির্ভর দেশটি খাদ্য রপ্তানি করার পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সময়োপযোগী কৃষিনীতির কারণে বাংলার কৃষকরা খাদ্যপণ্য উৎপাদনে জাদু দেখিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিতকে মজবুত করছে প্রধানত তিনটি খাত। কৃষি, তৈরি পোশাকশিল্প ও প্রবাসী ভাইদের পাঠানো রেমিট্যান্স। একসময়ের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ এখন সমৃদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশ এখন সারা বিশ্বে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে বিশ্বব্যাংক ১৯৭২ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর প্রথম রিপোর্ট প্রকাশ করে বলেছিল, ‘সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশের উন্নয়ন সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল হবে’।

অপরদিকে ইন্টারন্যাশনাল ইকোনমিক অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক প্রেসিডেন্ট অর্থনীতিবিদ অ্যাডওয়ার্ড অস্টিন রবিনসন ১৯৭৩ সালে ‘ইকোনমিক প্রসপ্রেক্টাস অব বাংলাদেশ’ নামে একটি গবেষণাগ্রন্থে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় মাত্র ৭০ ডলার। এই মাথাপিছু আয়ের বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে গরিব ১০টি দেশের একটি। ভালো মানের মাথাপিছু আয় ধরা হয় ৯০০ ডলার। সেটা অর্জন করতে বাংলাদেশ যদি ২ শতাংশ হারে মাথাপিছু আয় বাড়ায়, তাহলে লাগবে ১২৫ বছর, আর ৩ শতাংশ হারে আয় বাড়লে লেগে যাবে ৯০ বছর।

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণিত করে বাংলাদেশ দ্রুততম সময়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০ বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, যখনই আওয়ামী লীগ সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দিয়েছে, তখনই বাংলাদেশের অগ্রগতির গ্রাফটা ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। আর দেশরত্ন শেখ হাসিনার বিগত ১২ বছরের ধারাবাহিক নেতৃত্বের কারণে দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছে গেছে।

অর্থনীতির এই অর্জনের সরকারের নীতিনির্ধারণী ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর জন্য কৃষির আধুনিকায়ন করা, নতুন বীজ উদ্ভাবন, স্বল্পমূল্যে সার ও বীজ বিতরণ, সব কৃষিপণ্যের ভ্যাট প্রত্যাহার করাসহ প্রতিবছর প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা কৃষি খাতে ভর্তুকি দেয় সরকার। যার কারণে কৃষি ক্ষেত্রে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন।

অথচ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় কৃষিতে ভর্তুকি দেয়া তো দূরের কথা, সারের দাবিতে ১৮ কৃষককে জীবন দিতে হয়েছিল। ধান উৎপাদনের সঙ্গে সঙ্গে শাকসবজি, মাছ ও ফলফলাদি উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে দেশ। বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৫০ লাখ মেট্রিক টন। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুসারে, বাংলাদেশ সবজি, ধান ও আলু উৎপাদনে বিশ্বে যথাক্রমে ৩য়, ৪র্থ ও ৭ম। এ ছাড়াও মাছ, আম, পেয়ারা উৎপাদনে ৪র্থ, ৭ম ও ৮ম স্থানে রয়েছে। বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষির অবদান প্রায় ১৬.৬।

শিল্পকে বিকশিত করতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ করা। সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরই বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বিশেষ নজর দেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শেষ সময় ২০০৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ছিল ৩ হাজার ৩৭৮ মেগাওয়াট, উৎপাদন কেন্দ্র ছিল ৪২টি। বর্তমান সরকারের এক যুগে বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার মেগাওয়াট, উৎপাদন কেন্দ্র বেড়ে হয়েছে ১৪০টি।

সুবিধাভোগী জনসংখ্যা ২০০৫-০৬ সালের ৪৭ শতাংশ থেকে বেড়ে প্রায় শতভাগে উন্নীত হয়েছে। দেশ এখন বিদ্যুৎ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। ২০০৯ সালে যেখানে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ ছিল ১ হাজার ৭৪৪ মিলিয়ন ঘনফুট, যা বর্তমানে বেড়ে সরবরাহ ২ হাজার ৫২৫ মিলিয়ন ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। নতুন শিল্প-উদ্যোক্তাদের শুরু থেকে ১৫ বছরের জন্য কর মওকুফ, শিল্প স্থাপন এবং ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি, নির্মাণসামগ্রী ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কর মওকুফ করার ফলে নতুন শিল্প-কারখানা গড়ে উঠছে।

গ্রাম থেকে উপজেলা হয়ে জেলা পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের নেটওয়ার্কে নিয়ে আসা হয়েছে। সড়ক, সেতু, রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্টসহ অসংখ্য স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ঢাকা থেকে বিভাগীয় শহরগুলো ও ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গাসহ ৪৫৩ কিলোমিটার জাতীয় মহাসড়ক চার বা তদূর্ধ্ব লেনে উন্নীত করা হয়েছে, আবার কোথাও কাজ চলমান রয়েছে। যার কারণে শহর আর গ্রামের দূরত্ব কমে গেছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়ে, দারিদ্র্য কমে এসেছে। ২০০৬ সালে অতি দারিদ্রের হার ছিল ৪০ শতাংশ। যা বর্তমানে ২০ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হতদরিদ্রের হার ১০ শতাংশে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশে ২০০৯ সালে ৫ কোটি মানুষ চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাস করত। ২০১৮ সালের তথ্যমতে, চরম দারিদ্র্যসীমার মধ্যে আছে দেড় কোটির কিছু বেশি মানুষ। এই সময়ে জন্মহার কমে গিয়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ১৬ শতাংশে। ২০০৬ সালে বৈদেশিক বিনিয়োগ ছিল ৪৫ দশমিক ৬ কোটি ডলার। বর্তমানে ৩ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দশমিক ৩৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক ১০ ডলার। ২০০৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ৫৬০ মার্কিন ডলার। একযুগে যা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার। বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ লাখ ৮৮ হাজার ৮৭৩ টাকা। অবাক করার বিষয় হলো, করোনা মহামারির সময়ও বিগত বছর থেকে ৯ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় পাকিস্তান থেকে দ্বিগুণ এবং অতিসম্প্রতি ভারতকেও ছাড়িয়ে গেছে। ভারত থেকে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ২৮০ ডলার বেশি। অর্থাৎ বাংলাদেশের একজন নাগরিক ভারতের একজন নাগরিক থেকে ২৩ হাজার ৭৫৩ টাকা বেশি আয় করেন। অথচ ২০০৭ সালেও ভারতের মাথাপিছু আয় ছিল বাংলাদেশের মাথাপিছু আয়ের দ্বিগুণ।

বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে বিশ্বের অনেক দেশেই স্বাস্থ্য, খাদ্য ও অর্থনীতি— এই তিন খাতে বিপর্যয়ে পড়তে হয়েছিল। অনেকে বলেছিলেন, বাংলাদেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি নেমে আসবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়োপযোগী ও দূরদর্শী সিদ্ধান্তে আমাদের খাদ্য নিয়ে কোনো সমস্যায় পড়তে হয়নি।

স্বাস্থ্য ও অর্থনীতিতে কিছুটা চাপ পড়লেও খুব স্বল্প সময়ের মধ্যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে অর্থনীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, মহামারি সত্ত্বেও বাংলাদেশ জিডিপি প্রবৃদ্ধিতে বিশ্বে তৃতীয় এবং এশিয়ার মধ্যে প্রথম অবস্থানে থাকবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে।

স্বাধীনতার পর থেকে এতদিন পর্যন্ত স্বল্পোন্নত দেশের কাতারে অবস্থান করেছিল বাংলাদেশ। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতিসংঘের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি অর্জিত হয়েছে। স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) চূড়ান্ত সুপারিশ পেয়েছে বাংলাদেশ।

এর ফলে ২০২৪ সালে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ঘোষিত হবে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণে জাতিসংঘের তিনটি শর্ত ছিল- মাথাপিছু আয় কমপক্ষে ১২৩০ মার্কিন ডলারে রাখা, মানবসম্পদ সূচকে ৬৬ পয়েন্ট ও অর্থনীতির ভঙ্গুরতা সূচকে ৩২ বা নিচে আনা। এই তিনটি সূচক দিয়ে একটি দেশ উন্নয়নশীল দেশ হতে পারবে কি না- সেই যোগ্যতা নির্ধারণ করা হয়।

যেকোনো দুটি সূচকে যোগ্যতা অর্জন করতে হয় পরপর তিন বছর। ২০১৮ সাল থেকে বাংলাদেশ তিনটি শর্তই পূরণ করে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা লাভ করেছে। এখন লক্ষ্য ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশের কাতারে নিয়ে যাওয়া। এ লক্ষ্য পূরণের জন্য বেশ কিছু খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার। এর মধ্যে পোশাক খাতের বিশ্বব্যাপী বাজার সৃষ্টি করা, জাহাজ নির্মাণ, ওষুধ ও ওষুধের উপাদান, তথ্যপ্রযুক্তি, হালকা প্রকৌশল ও যানবাহন তৈরি, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, কৃষি ও কৃষিপণ্য আধুনিকীকরণসহ ৩২ খাতকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে সরকার।

রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা এবং দ্বিতীয় প্রেক্ষিত পরিকল্পনা ২০২১-৪১ প্রণয়ন করা হয়েছে। এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে এবং দারিদ্র্যের হার আরও কমে আসবে।

বাংলাদেশের বিস্ময়কর অর্থনৈতিক উত্থান এখন সারা বিশ্বে স্বীকৃত। প্রভাবশালী ম্যাগাজিন ‘ইকোনমিস্ট’-এর ২০২০ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬৬টি উদীয়মান সবল অর্থনীতির দেশের তালিকায় বাংলাদেশের স্থান নবম। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম’-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৪তম বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ।

বিখ্যাত সম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ‘গোল্ডম্যান স্যাকস’ ১১টি উদীয়মান দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ‘প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপার্স’-এর রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলাদেশ ২০৩০ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৯তম ও ২০৫০ সাল নাগাদ ২৩তম অর্থনীতির দেশে উন্নীত হবে। ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক লিগ টেবল’-২০২১ রিপোর্ট অনুসারে ২০৩৫ সাল নাগাদ ১৯৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্থান হবে ২৫তম।

বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ‘ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিভিউ-২০১৯’ শীর্ষক প্রতিবেদন অনুসারে বিশ্ব বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন ৪২তম রপ্তানিকারক ও ৩০তম আমদানিকারক দেশ। অগ্রসরমাণ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়, ওপরে আছে ভিয়েতনাম। বাংলাদেশের উন্নয়ন দেখতে এসে ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম বলেছিলেন, ‘শুধু বলার জন্য নয়, দারিদ্র্য বিমোচনে সত্যিই আজ বিশ্বে বাংলাদেশ রোল মডেল।

শেখ হাসিনার মতো সৎ-সাহসী এবং দূরদর্শী নেতৃত্বের কারণেই আজ বিশ্বের বুকে রোল মডেল হতে পেরেছে বাংলাদেশ। দক্ষতা, যোগ্যতা ও জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিকল্প কেবল শেখ হাসিনাই। বিগত এক যুগ রাষ্ট্র পরিচালনার নেতৃত্ব দিয়ে দেশকে নিয়ে গেছেন মর্যাদাশীল একটি অবস্থানে। বঙ্গবন্ধুকন্যার সুযোগ্য নেতৃত্বে উন্নত সমৃদ্ধ দেশের স্বপ্ন নিয়ে অদম্য গতিতে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ।

লেখক: সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ ও সাবেক ছাত্রনেতা।

আরও পড়ুন:
মঞ্জুর হত্যার বিচারহীনতার ৪০ বছর
শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা ও আর্থিক খাতে অগ্রগতি
মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে

শেয়ার করুন