মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো

মাদকাসক্তি: যে অন্ধকার শুষে নেয় জীবনের আলো

মনে হচ্ছে, সময়টা ভয়াবহ নৃশংসতার কাল। করোনাভাইরাস প্যানডামিকে তছনছ হয়ে গেছে পৃথিবী। মৃত্যু আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে। অর্থনীতি ধসে পড়ছে। মানুষের মাঝে তীব্র হাহাকার বিরাজমান। চারদিকে অন্ধকার চেপে বসেছে। অনিশ্চিত জীবন আর অন্ধকার ভবিষ্যতে ঘরবন্দি মানুষের নিত্যদিনের আরও নানান জটিলতায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে মানসিক স্বাস্থ্যের।

মাদক এমনই এক নেশা, যার কাছে সংসার-সমাজ, পরিবার-সন্তান এমনকি নিজের জীবনও তুচ্ছ হয়ে যায়। সম্প্রতি ভয়ংকর মাদক এলএসডি (লাইসার্জিক অ্যাসিড ডাই-থ্যালামাইড) গ্রহণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র হাফিজের মর্মান্তিক মৃত্যু আবারও মাদকের সর্বনাশা কঠিন সত্যটাকে সামনে নিয়ে এসেছে। মাদকের উন্মত্ত নেশায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যাচ্ছে একেকটা জীবন, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে একেকটা পরিবার।

মাদকের সহজলভ্যতা আর মূল্যবোধের অবক্ষয়ই মাদকাসক্ত হওয়ার প্রধান কারণ। তবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, হতাশা, অসম্মান, প্রত্যাখ্যানের অপমানবোধ, অশিক্ষা, তথাকথিত যোগ্য হয়ে উঠতে না পারা, সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ার মতো কারণ যেমন আছে, তেমনি অতিরিক্ত বিত্ত-বৈভব, ক্ষমতা, অসৎসঙ্গ, চারিত্রিক দৃঢ়তা না থাকা, সন্তানের প্রতি অভিভাবকের উদাসীনতা, প্রয়োজনের অধিক অর্থের জোগান দেয়া, ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রতি প্রবল ঝোঁকও মাদকাসক্ত হওয়ার জন্য দায়ী। তা ছাড়া নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি তীব্র আগ্রহ থেকেও একজন মানুষ পা বাড়ায় অন্ধকার জগতে। যে অন্ধকারের উৎস হতে সহজে আর আলো উৎসারিত হতে পারে না।

পৃথিবীতে প্রতিটি মানুষের চিন্তা-চেতনা ভাবনার জগতে ভিন্নতা রয়েছে। তবে ভাবনায় ভিন্নতা থাকলেও সাধারণভাবে সহজ-সরল স্বাভাবিক জীবনই সবার কাম্য। কে চায় জীবনকে দুর্বোধ্য-দুঃসহ করতে। তবু কিছু মানুষ তাদের জীবনকে জটিল থেকে জটিলতর করে ফেলে। তাদের মনকে হয়তো অন্য কিছু প্রবলভাবে আলোড়িত করে।
মানুষের চিন্তায় জটিলতা আছে, হৃদয়ে গভীর গোপন হাহাকার আছে, সীমাহীন শূন্যতার উপাখ্যান আছে। তবে দুঃখ-কষ্ট, ব্যথা-শোক, আনন্দ এসব কিছু ভোগ-উপভোগ, ধারণ বা প্রত্যাখ্যান করার ক্ষমতা সবারই একরকম নয়। এই বিষয়গুলোর সঙ্গে বিত্ত-বৈভব বা দরিদ্রতারও খুব একটা প্রত্যক্ষ সংযোগ নেই। ‘অসীম কালসাগরে ভুবন ভেসে চলেছে। অমৃতভবন কোথা আছে তাহা কে জানে।’

আসলে কেউই বলতে পারে না অমৃতসুখ কোথায় আছে। একজন ব্যক্তিমানুষের কিসে যে অভাব, তা সে নিজেই অনেক সময় জানে না, বুঝতে পারে না। অন্যেরা বুঝবে কী করে?
জীবনের নাট্যমঞ্চে প্রতিটি মানুষ নিরন্তর অভিনয় করে যাচ্ছে। ভালো থাকার অভিনয়, ভালো রাখার অভিনয়। তাই হৃদয়ের গহিনের সেই ক্ষরণটা কারও চোখে পড়ে না। কেউ জানে না, মুখোশের অন্তরালের মানুষটার ভেতর কতটা ফাঁকা, কতটা শূন্য। অর্থ-বিত্ত, প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রাচুর্যের ভেতরেও কিসের তাড়নায় এমন কাজ করতে পারে!

প্রতিনিয়ত কত মানুষ ক্ষয়ে যাচ্ছে, নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিটি মানুষের জীবন এক একটি আলেখ্য, নিজের কাছে মূল্যবান। দুর্ঘটনা ঘটে গেলে, বলতে শোনা যায়, আহা, হাসিখুশি মানুষটার মনে কিসের এত দুঃখ ছিল? এই প্রশ্নটা যদি সেই মানুষটাকে কেউ জিজ্ঞেস করত! একটু মায়া-মমতা ভালোবাসা নিয়ে মাথায় হাত রাখত! আসলে কেউই জানে না কার ভেতরটা কতটা ফাঁকা।
এসব কিছুতে পরিবারের দায় সর্বাগ্রে। সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে মিশছে, কোথায় যাচ্ছে, তার বন্ধু কারা এবং সর্বোপরি তার আচরণগত সমস্যাগুলো পরিবারেরই চোখে পড়ার কথা সবার আগে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নিলে মাদকের ব্যাপকতার রাশটা টেনে ধরা কিছুটা সহজ হয়। কিন্তু সামাজিক নিগ্রহের ভয়ে বেশির ভাগ মানুষই ঘটনাগুলো ধামাচাপা দেয়। ফলে প্রায়শই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।
সামগ্রিকভাবে নিজের দায়িত্বকে এড়িয়ে যেতে পারি কিন্তু নিজেকে আড়াল করার সুযোগ নেই। কারণ এ সমাজের মানুষ হিসেবে সামাজিক অবক্ষয়ের দায় প্রতিটি ব্যক্তিকেই নিতে হবে। সচ্ছল কিংবা অসচ্ছল পরিবারের এই সন্তানগুলোকে কারা কীভাবে মাদকের হাতছানিতে ভুলিয়ে নিয়ে গেল, তাদের রক্ষা করতে না পারার দায় আমাদের নিজেদেরও নিতে হবে।
দেশে মাদকদ্রব্যের অবৈধ অর্থনীতির আকার এখন বেশ বড়৷ টাকার অঙ্কে প্রায় এক লাখ কোটি, যা আমাদের জাতীয় বাজেটের এক পঞ্চমাংশ। পাঁচ হাজারের বেশি মাদকের বড় ব্যবসায়ী আছে। সরকারের তালিকায় শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ১৪১ জন, যাদের প্রায় সবাই প্রভাবশালী। মাদকের ক্যারিয়ার বা খুচরা বিক্রেতা আছে কয়েক হাজার৷ কোনো কোনো মাদকসেবী আবার একই সঙ্গে খুচরা বিক্রেতাও। দেশে মাদকাসক্তের সংখ্যা ৭৫ লাখ পেরিয়ে গেছে এবং সংখ্যাটা ভয়াবহভাবে বাড়ছে।
দেশের শহর-বন্দর, নগর-গ্রাম সবখানেই বিস্তার ঘটেছে মাদকের ৷ ঢাকাসহ বড় শহরের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মাদকসেবী এবং ব্যবসায়ীদের বড় কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে৷
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রধান তিনটি কারণে বাংলাদেশে মাদক ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে৷ এক. চাহিদার সঙ্গে পর্যাপ্ত জোগান, দুই. মানসিকভাবে বিষাদগ্রস্ত ও কৌতূহল এবং তিন. হিরোইজম ৷ সব ধরনের অপরাধের উৎসমূল মাদক।
মাদকের চাহিদা আছে, তাই সরবরাহও আছে৷ আর এই সরবরাহ বন্ধ করতে না পারলে এর ব্যবহার বন্ধ করা যাবে না৷ সরবরাহ বন্ধের দায়িত্ব সরকারের। সরকার তার দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিয়ে কোনোভাবেই সরবরাহ বন্ধ করতে পারছে না৷ সরবরাহ বন্ধ করা না গেলে, সমাজ ও পরিবার দায়িত্ব পালন করলেও মাদক ব্যবসায়ীরা তাদের ব্যবসার স্বার্থেই এর চাহিদা তৈরির জন্য যা যা করা প্রয়োজন, তাই করবে৷
দেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে কাজ করে মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর৷ তাছাড়া পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি এবং কোস্টগার্ড মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং মাদকের বিরুদ্ধে অভিযানে কাজ করে৷
তাদের মতে, মাদকের চাহিদা বন্ধ করা গেলে জোগান থাকলেও কোনো লাভ হবে না। কেউ মাদক না কিনলে সাপ্লাই চেইন এমনিতে ভেঙে যাবে। মাদকের বিরুদ্ধে তীব্রভাবে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে না পারলে এর ব্যাপকতা থেকে নিস্তার পাওয়া সহজ হবে না।
আমাদের শহরগুলোতে খেলার মাঠ নেই, ফ্ল্যাট বাড়িতে একাকী মোবাইলে বুঁদ হয়ে থাকে আমাদের সন্তানেরা। আগের মতো সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের জায়গাটা বড়ই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। একাকিত্ব আর নিঃসঙ্গতার ভেতর সময় কাটাতে যেয়ে ছেলেমেয়েরা নানা ধরনের ফ্যান্টাসি আইডিয়া থেকেই মাদকের সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলছে। তবে হাফিজের সঙ্গে এসব কোনোকিছুই যায় না। ও সংস্কৃতিবান একজন মানুষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গন তার পদচারণায় মুখরিত ছিল। মূকাভিনয় করত, গান গাইত, খেলাধুলা করত, গিটার বাজাত।

গ্রামের সবুজ প্রকৃতির মাঝে যার বেড়ে ওঠা, তার কেন এলএসডির মতো মাদকের ঘ্রাণ নেবার সাধ হলো? নেহায়েত কৌতূহলের বসেই যদি দুর্ঘটনাটা ঘটে; তাহলে তার মতো আধুনিক শিক্ষিত ছেলে এলএসডি-র মতো মাদকের ভয়ংকর প্রতিক্রিয়া না জেনেই কী ঘটনাটি ঘটিয়ে ফেলল? এই প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে?
মনে হচ্ছে সময়টা ভয়াবহ নৃশংসতার কাল। করোনাভাইরাস প্যানডেমিকে তছনছ হয়ে গেছে পৃথিবী। মৃত্যু আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। অর্থনীতি ধসে পড়ছে। মানুষের মাঝে তীব্র হাহাকার বিরাজমান। চারদিকে অন্ধকার চেপে বসেছে। অনিশ্চিত জীবন আর অন্ধকার ভবিষ্যতে ঘরবন্দি মানুষের নিত্যদিনের আরও নানান জটিলতায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে মানসিক স্বাস্থ্যের।
তাই কথা বলতে হবে একে অপরের সঙ্গে, বার বার, অনেকবার। প্রিয়জনের পাশে বা সঙ্গে থাকাই শুধু নয়, যেতে হবে অন্তরের গভীরে। কাছের মানুষটির মন খারাপ থাকলে শুনতে হবে, জানতে হবে সমস্যা কোথায়? জানার চেষ্টা করতে হবে কার মনের নদীতে কী ঢেউ বইছে।

বুকের পাঁজরে জড়িয়ে নিতে হবে শক্ত করে। সাহস, শক্তি আর অভয় দিয়ে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে। বোঝাতে হবে, সাফল্য একটি আপেক্ষিক শব্দ। চূড়ান্ত বিচারে নিজের হৃদয়ের অন্তহীন গহ্বরে পরিতৃপ্তির সঙ্গে জীবন কাটানোই সাফল্য; ধন-মান, বিত্ত-বৈভব সেখানে খুবই নগণ্য। নিজের জীবন নিজের। বেঁচে থাকার জন্য কোনোকিছুই অপরিহার্য নয়। সময়ই অতি প্রবল দুঃখ এবং সুখের ওপর প্রলেপ বুলিয়ে দেয়। প্রয়োজন শুধু সেই খারাপ সময়টুকু অতিক্রম করা।
যত কষ্টই হোক, মাদক বা মৃত্যুতে কোনো সমাধান নেই। সৃষ্টির অপরূপ নিদর্শন এই জীবন অন্যের কাছে নয়, নিজের কাছেই মহামূল্যবান। তাই নিজের জীবনের আলো দিয়ে মনের অন্ধকার দূর করতে হবে। আঁধারের পাতা উল্টিয়ে নিজেকেই টেনে আনতে হবে আলো ঝলমলে পৃথিবীতে, নিতে হবে আনন্দময় জীবনের স্বাদ।
লেখক: প্রাবন্ধিক, শিক্ষক

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন

মন্তব্য

পাকিস্তানের কাশ্মীর বধ, নাকি উগ্রবাদের জন্ম

পাকিস্তানের কাশ্মীর বধ, 
নাকি উগ্রবাদের জন্ম

সম্প্রতি ইমরান খান বলেছেন, ‘তালিবানরা জঙ্গি নয়, সাধারণ নাগরিক’। তার এই মন্তব্যের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ইস্যু নিয়ে জঙ্গিদের শান্ত রাখতে দেশটি তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এই তালেবান গোষ্ঠী জঙ্গিদের কারণে পাকিস্তানেও বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইমরান খান তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এর মূল কারণ চীন।

জম্মু ও কাশ্মীরের বিষয়টি কিছুতেই ভুলতে পারছে না পাকিস্তান। বিগত ৭৩ বছর ধরে কাশ্মীর ইস্যুতে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো এবং উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে কাশ্মীরে লেলিয়ে দেয়ার অভিযোগ রয়েছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। কিছু ক্ষেত্রে জম্মু-কাশ্মীরে জীবিত উদ্ধার হওয়া জঙ্গিরা তাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে পাকিস্তানের নামও নিয়েছে। কিন্তু তারপরও কাশ্মীরে যেকোনো অস্থিরতার জন্য ভারতকে দায়ী করে আসছে দেশটি।

স্বাধীন কাশ্মীর রাষ্ট্রে যুদ্ধবহর নিয়ে হামলা চালিয়ে প্রথম এই অঞ্চলের স্বাধীনতা হরণ করে পাকিস্তান। এরপর তারা তাদের দখল করা কাশ্মীর অঞ্চলের নাম দেয় ‘আজাদ কাশ্মীর’ অর্থাৎ স্বাধীন কাশ্মীর। কিন্তু পাকিস্তানের দখল করা সেই আজাদ কাশ্মীরের মানুষ আজ স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করছে। তাদের ন্যূনতম অধিকার আদায়ের জন্য রক্ত ঝরাচ্ছে। গত একমাসে আজাদ কাশ্মীরে বিভিন্ন আন্দোলনে তিনজনের বেশি তরুণের নিহতের খবর পাওয়া গেছে। কোনো জঙ্গি গোষ্ঠী নয়, বরং পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চালিয়েছে এই হত্যাকাণ্ড। এই অঞ্চলের মানুষের ন্যূনতম অধিকার এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি পাকিস্তান।

২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কাশ্মীর নিয়ে ভারতের সংবিধানে বিশেষ ধারা ‘৩৭০’ বিলোপ করা হয়। এরপর থেকে এই অঞ্চলের উন্নয়নে মনোযোগ দেয় ভারত। কিন্তু এই ৫ আগস্টকে ঘিরে অপপ্রচারের বিশেষ প্রকল্প হাতে নিয়েছে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যকে দেয়া বিশেষ মর্যাদা বাতিলের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে ওই দিনকে ‘নিপীড়ন দিবস’ হিসেবে পালন করার জন্যে জনমত গঠনে বিশ্বব্যাপী পাকিস্তানের বিদেশি মিশনগুলোতে এক বিশেষ বার্তা পাঠিয়েছে তারা। আধুনিক ডিজিটাল মিডিয়াকে ব্যবহার করে ভারতের বিরুদ্ধে জনমত গঠন করতে বলা হয়েছে সেখানে। দিনটি সফলভাবে পালন করতে ‘ইন্টারন্যাশনাল কোয়ালিশন রেড ফর কাশ্মীর’ নামে একটি সংগঠনও গড়ে তোলা হয়েছে। রেড ফর কাশ্মীর-এর পেছনে মূলত কাজ করছে ‘স্ট্যান্ড উইথ কাশ্মীর’ নামে একটি সংগঠন।

১৯৪৭ সালে জম্মু ও কাশ্মীর রাজ্যে পাকিস্তান হামলা চালানোর আগে এই ইস্যুতে ভুয়া তথ্য প্রচারের জন্য সংগঠনটি গড়ে তোলা হয়। এই সংগঠন উগ্র ওয়াহাবি মতবাদ প্রচারে মধ্যপ্রাচ্যের কিছু দেশ থেকে ব্যাপক অর্থ সহায়তা পেয়ে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

কথিত নিপীড়ন দিবস পালনের জন্য বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা ভারতীয় মিশনগুলোর সামনে মোমবাতি প্রজ্বলন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারে সেসব প্রচার করে ভাইরাল করার পরিকল্পনাও করা হয়েছে। এ জন্যে একাধিক টুইটার অ্যাকাউন্ট, ফেসবুক পেজ ও একটি নতুন ই-মেইলও খুলেছে সংগঠনটি। ৫ আগস্টে ভারতবিরোধী ওই প্রচারের জন্যে ইংরেজি এবং রোমান ভাষায় অন্তত ২০টি স্লোগান পাকিস্তানি বিদেশি মিশনে পাঠিয়েছে সংস্থাগুলো। এরমধ্যে রয়েছে ‘যম-ই-ইস্তেহসাল’, সংগ্রামী কাশ্মীরীদের সঙ্গে একাত্মতা দেখানোর দিন', 'কাশ্মীরের ভবিষ্যৎ পাকিস্তানের সঙ্গে ও ‘কাশ্মীর হচ্ছে পাকিস্তানের ঘাড়ের শিরা’-এমন বেশ কিছু স্লোগান।

লন্ডনে ৫ আগস্টের কর্মসূচি সফল করতে কূটনৈতিক লাগেজে করে পাকিস্তানি বিদেশি মিশনে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের চিরকুট, পোস্টার, প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার পৌঁছে দেয়া হয়েছে।

গত ২৬ জুলাই পাকিস্তানের স্থানীয় নির্বাচনের পর দিন পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের নীলম উপত্যকার শারদা এলাকায় ‘পয়েন্ট-জিরো’ রেঞ্জে আধাসামরিক বাহিনীর গুলিতে এক যুবক নিহত হয়। এ সময় পুলিশ জওয়ানসহ ২৫ জনেরও বেশি আহত হয়। এর আগে গত ২১ জুন টরেন্টো থেকে বাবার শেষকৃত্যে যোগ দিতে পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে এসে হত্যার শিকার হন গোলাম আব্বাস নামে এক যুবক। তিনি ভারতীয় কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল (জম্মু ও কাশ্মীর)-এ মুসলিম ও হিন্দুদের মধ্যে আন্ত-বিশ্বাস ও সম্প্রীতি প্রচারে কাজ করতেন।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সন্ত্রাসী কার্যক্রমের জন্য গত জুন মাসে সন্ত্রাসী কার্যকলাপে অর্থ জোগানের ওপর নজরদারি চালানো সংগঠন ফিন্যান্সিয়াল অ্যাকশন টাস্ক ফোর্স (এফএটিএফ) আবারও দেশটিকে ধূসর তালিকাতে রেখেছে।

গত ২৫ জুন প্যারিসে অবস্থিত সংস্থাটির পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, রাষ্ট্রসংঘের ঘোষিত জঙ্গি হাফিজ সইদ, মাসুদ আজহারের মতো কুখ্যাত সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না নেয়ার ফলে পাকিস্তানকে ধূসর তালিকাতেই রাখার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

২০১৮ সালের জুনে সন্ত্রাসে আর্থিক মদদ দেয়া ও আর্থিক দুর্নীতি রোধে যে ২৭টি শর্ত পাকিস্তানকে পূরণ করতে বলা হয়েছিল, তার মধ্যে অন্যতম ছিল জঙ্গি সংগঠন লস্কর-ই-তইবার কুখ্যাত জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া যা পাকিস্তান পূরণ করতে পারেনি।

লক্ষণীয় বিষয় হলো, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত সাম্প্রতিক খবরগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পাকিস্তানের কূটনীতিকরা শুধু সমাজবিরোধী কাজের সঙ্গেই লিপ্ত নন বরং তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা ও সন্ত্রাসবাদী মনোভাবও প্রবল।

২০১৫ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তান হাইকমিশনের দ্বিতীয় সচিব ফারিনা আশরাদের বিরুদ্ধে জঙ্গিবাদে সম্পৃক্ততার বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়ায় তাকে প্রত্যাহার করা হয়। একই বছর ঢাকায় জাল নোট ব্যবহারের দায়ে আটক করা হয় পাকিস্তান হাইকমিশনের সহকারী ভিসা কর্মকর্তা মাজহার খানকে। এছাড়া কলম্বোর পাকিস্তান হাইকমিশনের ভাইস চ্যান্সেলর আমির জুবায়ের সিদ্দিকী সন্দেহভাজন জঙ্গি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে ভারতের জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। পরে ২০২০ সালে নয়াদিল্লিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের দুই কূটনীতিককে সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়া ও গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়।

২০০১ সালে নেপালের কাঠমন্ডুতে পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রথম সচিব মোহাম্মদ আরশাদ সিমাকে ১৬ কেজি আরডিএক্সসহ গ্রেপ্তার করা হয়। এছাড়া ২০১৪ সালে কলম্বোতে পাক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা কর্নেল শাহরিয়ার বাটকে হাইকমিশনের কার্যক্রমে নিয়মিত নজর রাখার অভিযোগে তাকে ওই দেশ থেকে প্রত্যাহার করা হয়। পর্যালোচনা করলে আরও দেখা যায়, বিভিন্ন দেশে পাকিস্তানের দূতাবাসগুলোকে যেসব কূটনীতিকরা নিযুক্ত রয়েছেন তাদের বেশিরভাগই এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত।

২০১৮ সালের মে থেকে ওয়াশিংটনের কিছু জায়গায় পাকিস্তানি কূটনীতিকদের আনাগোনা বন্ধ ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্র। জাতিসংঘে পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিনিধি মুনির আকরামের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ তোলেন তার স্ত্রী। ২০১৪ দেশটির আরও দুই কূটনীতিকের বিরুদ্ধে অপহরণ ও ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে যুক্তরাজ্যে। এদিকে গত বছরের মে মাসে মানবপাচারের অভিযোগে জিম্বাবুয়ের হারারেতে গ্রেপ্তার হন পাকিস্তানি কূটনীতিক ওয়াকাস আহমেদ।

সম্প্রতি ইমরান খান বলেছেন, ‘তালিবানরা জঙ্গি নয়, সাধারণ নাগরিক’। তার এই মন্তব্যের একটি বিশেষ কারণ রয়েছে। পাকিস্তানের একমাত্র বন্ধু চীন আফগানিস্তানে তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। চীনের উইঘুর মুসলিমদের ওপর নির্যাতন ইস্যু নিয়ে জঙ্গিদের শান্ত রাখতে দেশটি তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এই তালেবান গোষ্ঠী জঙ্গিদের কারণে পাকিস্তানেও বেশ কয়েকবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছে। কিন্তু তারপরও ইমরান খান তালেবানদের সমর্থন দিচ্ছে। এর মূল কারণ চীন।

পাকিস্তানের করিডর ব্যবহার করে তালেবানরা যে সন্ত্রাসী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে তাতে পাকিস্তানের সরকার এবং ইসলামি মৌলবাদী শক্তিগুলোর পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। এমনকি তালেবানদের উগ্রবাদী আচরণকে সমর্থন জুগিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে যাচ্ছে পাকিস্তানের বিভিন্ন মৌলবাদী গোষ্ঠী। আফগানিস্তানকে তালেবানদের ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করে ২০০১ ও সমসাময়িক সময়ে যেভাবে এশিয়া অঞ্চলে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসের রাজনীতির চর্চা করা হয়েছে তা আবারও পুনঃস্থাপন করতে চাচ্ছে পাকিস্তান, চীন ও তালেবান গোষ্ঠী।

পাকিস্তানের অভ্যন্তরে স্বাধীনতা ও ন্যায্য অধিকারের দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বেলুচিস্তান, সিন্ধু এবং পাকিস্তানের দখল করা কাশ্মীরের সাধারণ মানুষ। আর এই দাবিকে প্রতিহত করতে সামরিক বাহিনী, আধা-সামরিক বাহিনী এবং জঙ্গিদের ব্যবহার করছে পাকিস্তান। নিজদেশে স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারা দেশটি আলোচনা করছে ভারতের কাশ্মীর নিয়ে!

গত দুবছরে কাশ্মীরের মানুষ পেয়েছেন নিজেদের জীবনের নিরাপত্তা। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নিয়েছে দেশটির সরকার। পর্যটন ও হর্টিকালচার (বাগান পালন) নির্ভর উন্নয়নে মিলছে সহযোগিতা। কর্মসংস্থান ও আয় বাড়াতে এ দুটি ক্ষেত্রকেই গুরুত্ব দিচ্ছে ভারত সরকার। আপেল, আখরোট, চেরি, নাশপাতি এবং ফুল চাষে সরকারি সহায়তায় স্থানীয়রা তাদের রোজগার তিন চার গুণ বাড়াতে সক্ষম হয়েছেন। উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি হিমঘর নির্মাণ প্রক্রিয়াকরণ, উড়োজাহাজে ফসল দেশের অন্যত্র পরিবহনের সুবিধাও পাচ্ছে চাষীরা। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বাজার পেতেও সুবিধা হচ্ছে তাদের।

তৃণমূল স্তরে মানুষের চাহিদা মেটাতে জেলা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে তহবিল সরাসরি পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মানুষের কল্যাণে প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারছেন। কাশ্মীর উপত্যকার সঙ্গে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের দ্রুত রেল যোগাযোগ স্থাপনে সরকার ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ করেছে। বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ব্যাপক উন্নতি হচ্ছে। কোভিড মোকাবিলায় জম্মু ও শ্রীনগরে গড়ে উঠেছে দুটি ৫০০ শয্যার হাসপাতাল। কেন্দ্রশাসিত জম্মু ও কাশ্মীরে দুটি অল ইন্ডিয়া ইন্সটিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স বা এইমস-এর মতো হাসপাতাল, ৭টি মেডিক্যাল কলেজ, একটি ক্যানসার হাসপাতাল, একটি হাড় চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান এবং একটি শিশু হাসপাতাল হচ্ছে। স্মার্ট সিটি প্রকল্পে নতুন রাস্তাঘাট নির্মাণ ছাড়াও মেট্রো রেল চালানোরও পরিকল্পনা রয়েছে। তথ্য ও প্রযুক্তির উন্নয়নে গড়ে উঠছে আইটি হাব। গত সাত দশকের তুলনায় মাত্র দুবছরেই ব্যাপক উন্নয়নের স্বাদ পাচ্ছে কাশ্মীর।

জম্মু ও কাশ্মীরে উন্নয়নের পাশাপাশি দীর্ঘ বঞ্চনারও অবসান ঘটেছে। সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে ৩৭০ ধারা বিলোপ করে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের নাগরিকদের মতো সমান অধিকার ভোগ করছে সেখানকার মানুষ। নয় শতাধিক আইনি সুবিধা দেশের বাকি অংশের মতোই কাশ্মীরের মানুষও এখন ভোগ করছেন। তফশিলভুক্ত জাতি ও উপজাতি, অন্যান্য পিছিয়ে পরা সম্প্রদায়ের মানুষ, শিশু, সংখ্যালঘু, বনবাসী সম্প্রদায়ের লোকজন পাচ্ছেন সাংবিধানিক সুযোগ-সুবিধা। শিক্ষার অধিকার জম্মু ও কাশ্মীরেও প্রতিষ্ঠিত। কাশ্মীরি নারীরা ভিন রাজ্যের বাসিন্দাদের বিয়ে করলে তাদের স্বামী বা সন্তানরাও উপত্যকার স্থায়ী বাসিন্দার মর্যাদা পাচ্ছে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে শরণার্থী হয়ে আসা মানুষগুলোকে ৩৭০ ধারা বিলোপের পর মিলেছে নাগরিকত্ব।

৩৭০ ধারা বিলোপের পর ভারতের বাকি অংশের সঙ্গে জম্মু ও কাশ্মীরের মানসিক দূরত্ব আরও কমেছে। কাশ্মীরি বা মুসলিমদের কাছেও বড় হয়ে উঠেছে ভারতীয় পরিচিতি। তারা সব ক্ষেত্রে এখন নিজেদের অধিকার অর্জন করেছে। স্বাধীন নাগরিক হিসেবে সেখানে ভোটাধিকার থেকে শুরু করে সকল সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিতের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পক্ষান্তরে কতটা স্বাধীনতা উপভোগ করছে ‘আজাদ কাশ্মীর’-এর সাধারণ মানুষ?

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি

বাঙালি জাতির ক্রান্তিলগ্নে প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে জান্তার হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারপতি চৌধুরী কাজ করার তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দেন। এই সিদ্ধান্ত তার পরিবারের সদস্যবর্গ এবং তার নিজের জীবনের জন্যও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তখনও তিনি জানতেন না বাঙালি জাতির মুক্তির কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু কোথায়।

২ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম সাংবিধানিক রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর ৩৪তম মৃত্যুবার্ষিকী। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন। তিনি রাজনীতিবিদ বা জনপ্রতিনিধি ছিলেন না। রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতাযুদ্ধে অনন্যসাধারণ ভূমিকা পালন করে রাতারাতি তিনি জাতীয় বীরে পরিণত হন। নিরীহ, নির্বিবাদী, নিরহংকারী, সজ্জন পণ্ডিত মানুষটি একাত্তরে মাতৃভূমির মুক্তির যুদ্ধে অমিত বিক্রম আপসহীন যোদ্ধায় পরিণত হয়েছিলেন। তিনি বাংলাদেশের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অংশ। তাকে বাদ দিয়ে স্বাধীনতার ইতিহাস লেখা যাবে না।

এই ইতিহাস সৃষ্টির অনেকখানি ভার তিনি নিজের হাতে তুলে নিয়েছিলেন। কেউ তাকে উদ্বুদ্ধ করেনি। শুধুমাত্র দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে, কর্তব্যবোধে পরিচালিত হয়ে পাকিস্তানের নৃশংস বর্বরতায় ক্ষুব্ধ হয়ে স্বেচ্ছায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এই দায়িত্ব তিনি নিয়েছিলেন।

১৯৮৭ সালের ২ আগস্ট তিনি লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। ৫ আগস্ট তার মরদেহ ঢাকায় পৌঁছে। তার তিরোধানে বিশ্ববরেণ্য বেশ কয়েকজন রাষ্ট্রনায়ক ও রাষ্ট্রপ্রধান, জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব পেরেজ দ্য কুয়েলার, রাণী এলিজাবেথ, তার প্রিন্স ফিলিপ প্রমুখ বিশ্ব নেতৃবৃন্দ শোকবার্তা পাঠান।

স্বৈরাচার এরশাদ তখন রাষ্ট্রক্ষমতায়। বিচাপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর মরদেহ ঢাকায় আসার পর রাষ্ট্রপতি এরশাদ মরহুমের বাসায় গিয়েছিলেন। স্বৈরশাসক এরশাদকে জীবনে ওই একবারই কাছ থেকে দেখেছিলাম। শেষ পর্যন্ত এরশাদ মরহুমের জানাজায় অংশ নেন এবং বিমানবন্দরে গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়। হিথরো এয়ারপোর্টে স্বয়ং রানীর গার্ড রেজিমেন্ট একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মরদেহের প্রতি যেমন গার্ড অব অনার দেয়া হয়, তেমনিভাবে তার কফিন বিমানে তুলে দিয়েছে।

ক্ষমতার প্রতি আবু সাঈদ চৌধুরীর কোনো মোহ ছিল না। ড. কামাল হোসেন লিখেছেন, ১০ জানুয়ারি পাকিস্তান থেকে স্বদেশে আসার পর ১১ তারিখ বিচারপতি চৌধুরীকে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বাসভবনে তাকে দেখা করতে বলা হলো। বিচারপতি চৌধুরী ও ব্যারিস্টার আমির-উল ইসলামকে নিয়ে ড. কামাল সেখানে গিয়ে দেখেন বঙ্গবন্ধুও উপস্থিত আছেন। তাজউদ্দীন সাহেব তাদেরকে একান্তে ডেকে নিয়ে বলেন, ‘আমরা পার্লামেন্টারি কাঠামোতে আসতে চাই, তোমরা এ ব্যাপারে সাংবিধানিক উপদেশ দাও।’

সেই বাসভবনে তাঁদের রচিত প্রভিশনাল কনস্টিটিউশন অব বাংলাদেশ অর্ডার, ১৯৭২-এ রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐদিনই স্বাক্ষর দিলেন।

স্বাক্ষর দেবার পরই বঙ্গবন্ধু ড. কামালকে এক কোনে ডেকে নিয়ে জাস্টিস চৌধুরী সম্পর্কে বললেন, প্রেসিডেন্ট তো উনিই হতে পারেন। বিচারপতি চৌধুরী এই প্রস্তাবের জন্য তৈরি ছিলেন না। তাকে বলা হলে তিনি নম্র স্বরে বললেন, ‘দেশ স্বাধীন হয়েছে। কিন্তু আমাকে প্রেসিডেন্ট হতে হবে আমি কখনও তা ভাবিনি।’

কিন্তু তিনি আপত্তি করতে পারলেন না। কারণ, বঙ্গবন্ধুকে তিনি খুবই শ্রদ্ধা করতেন। এখনও ভাবি, প্রেসিডেন্ট পদ তিনি চাননি। অবস্থার চাপেই তাকে প্রেসিডেন্ট হতে হয়েছিল।

২৫ মার্চ মধ্য রাতে পাকিস্তান সামরিক জান্তা নিরীহ নিরস্ত্র বাঙালির সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ঐ রাতে শুধু ঢাকা শহরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকসহ অজস্র নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হয়। ২৬ মার্চ সকালে বিবিসির খবরে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর বর্বর হত্যাকাণ্ডের ভাসা ভাসা খবর প্রচারিত হয়। বিবিসির খবর শুনে বিচলিত বিচারপতি চৌধুরী মানবাধিকার কমিশনের সভায় উপস্থিত হয়ে ঢাকায় হত্যাকাণ্ড সম্পর্কিত বিবিসির খবরের কথা জানান। ঢাকায় গণহত্যার খবর শুনে বিচারপতি চৌধুরী ২৭ মার্চ শনিবার পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেন।

মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বিশ্ব জনমত গঠনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী লন্ডনে সদরদপ্তর স্থাপন করে প্রবাসী মুজিবনগর সরকারের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে সমগ্র বিশ্ব ছুটে বেড়িয়ে সম্পন্ন করেছেন এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। স্বাধীনতাবিরোধী চক্র ও তাদের দোসরদের প্রাণনাশের হুমকির মুখে অবিচলিত, শান্ত এই কর্মবীর সাহসের সাথে মাতৃভূমির মুক্তির লক্ষ্যে বিরামহীনভাবে কাজ করে গেছেন।

একাত্তরে যুদ্ধ চলাকালে বিশ্বের শক্তিশালী কিছু দেশ পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের আপস-মীমাংসার চেষ্টা চালায়। দেশ ও জাতির ওই সংকটের সময় বিচারপতি চৌধুরীর অবিস্মরণীয় উক্তি ছিল, ‘লন্ডনের রাস্তায় আমার শবদেহ পড়ে থাকবে, তবু পাকিস্তানের সাথে আপস করে দেশে ফিরব না।’

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বর্বর সামরিক জান্তা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর সশস্ত্র যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়। জেনেভায় অবস্থানরত বিচারপতি চৌধুরী এবারও দেশ ও জাতির জন্য কাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব করেননি। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি দস্যুদের দ্বারা বাঙালি হত্যাযজ্ঞের খবর পরের দিন সকালে বিবিসির সংবাদে তিনি অবহিত হন। কিছুক্ষণের মধ্যে মানবাধিকার কমিশনের সভায় উপস্থিত হয়ে বিচারপতি চৌধুরী বাংলার মানুষের হত্যার কথা জানান। জেনেভা থেকে অতি দ্রুত লন্ডন ফিরে ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে ঢাকা থেকে প্রেরিত টেলেক্স পড়ে কালরাতের খবরাখবর তিনি জানতে পারেন। ক্ষোভে, দুঃখে, যন্ত্রণায়, অপমানে বিচারপতি চৌধুরী ব্রিটিশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের প্রধান ইয়ান সাদারল্যান্ডকে বললেন, ‘এই মুহূর্ত থেকে পাকিস্তান সরকারের সাথে আমার আর কোনো সম্পর্ক রইল না। আমি দেশ থেকে দেশান্তরে যাব আর পাকিস্তানি সৈন্যদের নিষ্ঠুরতা-নির্মমতার কথা বিশ্ববাসীকে জানাব।’

বাঙালি জাতির ঐ ক্রান্তিলগ্নে এভাবে প্রকাশ্যে পাকিস্তান সরকারের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে জান্তার হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে বিচারপতি চৌধুরী কাজ করার তরিৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দেন।

এই সিদ্ধান্ত তার পরিবারের সদস্যবর্গ এবং তার নিজের জীবনের জন্যও ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ তখনও তিনি জানতেন না বাঙালি জাতির মুক্তির কাণ্ডারি বঙ্গবন্ধু কোথায়। বাংলাদেশ সরকার তখনও গঠিত হয়নি। প্রথম সারির নেতারা নিহত, গ্রেপ্তার নাকি আত্মগোপনে, কিছুই তার জানা ছিল না। জাতির ঐ সংকটময় মুহূর্তে বিচারপতি চৌধুরীর দেশের পক্ষে কাজ করার ওই সরব ঘোষণা শুধু ঐতিহাসিক বললেই দায়িত্ব শেষ হবে না, এটা ছিল পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল। শুধুমাত্র এই একটি সিদ্ধান্তের জন্য বাঙালি জাতির ইতিহাসে তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মাত্র এক দিন পর ২৭ মার্চ শনিবার ছুটির দিনে খোদ লন্ডন শহরে ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গিয়ে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী একজন বীরের মতো পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। আবু সাঈদ চৌধুরীর ওই বীরোচিত ঘোষণা শুধু লন্ডন বা আমেরিকায় অবস্থানরত বাঙালিদের নয়, বাংলাদেশের জনগণসহ সমগ্র বিশ্বে বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত বাঙালি সন্তানদের স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে।

ঐতিহাসিকরা একদিন লিখবেন, ‘২৬ মার্চের পর পর বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ঘোষণা, বঙ্গবন্ধুর অবস্থান, ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সারা বাংলায় গণহত্যা, আওয়ামী শীর্ষ নেতাদের প্রস্তুতি সম্পর্কে দেশ-বিদেশের মানুষ যখন কিছুই জানতে পারছিল না, তখন একজন বাঙালি শিক্ষাবিদ আবু সাঈদ পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণার পর ব্রিটেনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড হিউমের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। এরপর তিনি কমনওয়েলথ সচিবালয় সাধারণ সম্পাদক আর্নল্ড স্মিথের সাথে দেখা করে ঢাকায় গণহত্যা বন্ধ এবং বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জন্য চেষ্টা করতে অনুরোধ জানান।’

১০ এপ্রিল পররাষ্ট্রমন্ত্রী লর্ড হিউমের সাথে আবু সাঈদ চৌধুরীর সাক্ষাৎ হয়। লর্ড হিউম তাকে দেখেই বলেন, ‘পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সঙ্গে কথা বলেছেন। চিন্তার কারণ নেই।’

বিচারপতি চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর জীবন বাঁচানোর জন্য চেষ্টার অনুরোধ জানান। হিউম বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট খবর আছে। শেখ মুজিব ভালোই আছেন।’

ঐদিনই ১০ এপ্রিল ৪টার সময় বিচারপতি চৌধুরী বিবিসিতে যান। মি. পিটারগিল তার একক সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি পাকিস্তানিদের গণহত্যাসহ পাকিস্তানের সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার কথা বিস্তারিত বলেন। বিবিসির দুজন সাংবাদিক সিরাজুর রহমান এবং শ্যামল লোধ বিচারপতি চৌধুরীর বক্তব্য নেন এবং প্রচার করেন। বিবিসি তখন সকাল-বিকাল বাংলাদেশের খবর বিশেষভাবে প্রচার করত। এভাবে বিচারপতি চৌধুরী ২৫ মার্চের পর থেকে লন্ডনে দ্বারে দ্বারে ঘুরে ঘুরে আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনকে চাঙ্গা করে তোলেন।

এভাবে মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতার অবস্থান না জেনে এবং যুদ্ধকালীন সরকার গঠিত হওয়ার আগেই লন্ডনে মুক্তিসংগ্রামের পক্ষে কাজ শুরু করে দিয়ে বিচারপতি চৌধুরী দেশ-বিদেশে অবস্থানরত বাংলার মানুষকে উজ্জীবিত করেন। যুক্তরাজ্যে নানা দলমতে বিভক্ত বাঙালিদের তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। মূলত তিনি ছিলেন বহির্বিশ্বে বাঙালিদের ঐক্যের প্রতীক। ইউরোপ ও আমেরিকার বাঙালি সমাজকে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার মন্ত্রে তিনি ঐক্যবদ্ধ করেন। ২৩ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার বিচারপতি চৌধুরীকে বিদেশে বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করে।

বিচারপতি চৌধুরী বঙ্গবন্ধুকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন ও শ্রদ্ধা করতেন। ১৯৮৫ সালে বাংলাবার্তা সম্পাদক মোহাম্মদ শাহজাহানের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে তার মূল্যায়ন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু নিয়মতান্ত্রিকভাবে বাঙালিদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতম আঘাতের ফলে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

৭১-এর বঙ্গবন্ধু কোনো ব্যক্তি নন, বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক, তার নামেই স্বাধীনতা সংগ্রাম পরিচালিত হয়েছে। কোনো ব্যক্তির নাম যখন প্রেরণার উৎস হয়, তখন তিনি ইতিহাসে স্থায়ী মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হন।... বঙ্গবন্ধু আমাদের মধ্যে স্বাদেশিকতা, স্বাজাত্যবোধ জাগিয়েছেন, সর্বোপরি এনে দিয়েছেন স্বাধীনতা।’

আবু সাঈদ চৌধুরী আজীবন গণতন্ত্রের একনিষ্ঠ পূজারী ছিলেন। আশির দশকে জীবনের শেষ কয়েক বছর তিনি গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা জোরের সাথে বলেছেন। স্বৈরশাসকরা ঐ সময় বঙ্গবন্ধুর অবদান শুধু অস্বীকারই করেনি, বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার জন্য যা যা দরকার তার সবই করে। নানা ব্যস্ততার মধ্যেও বহু সভা-সমিতিতে প্রধান অতিথি, প্রধান বক্তা, সভাপতি, সম্বর্ধিত ব্যক্তিত্ব বিভিন্ন ভূমিকায় যোগ দিয়ে বিচারপতি চৌধুরী তার সুললিত ভাষায় বঙ্গবন্ধুর গৌরবোজ্জ্বল অবদানের কথা জাতির সামনে তুলে ধরেন। স্বৈরশাসকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে যেভাবে তিনি ইতিহাসের মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর অবদানের কথা, মুক্তিযুদ্ধের কথা, গণতন্ত্রের কথা বলেছেন, তা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।

আবু সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যুর পর দৈনিক ইত্তেফাক সম্পাদকীয়তে লেখে: ‘হয়তো তাঁর অপেক্ষা অনেক পণ্ডিত লোককে ভবিষ্যতে আমরা পাইব, হয়তো অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি বিজ্ঞ আইনজ্ঞ কিংবা দূরদর্শী রাজনীতিকেরও আবির্ভাব ঘটবে, এদেশে। কিন্তু একই সঙ্গে এতগুলো উজ্জ্বল গুণের অধিকারী এবং চরিত্রবান, ব্যক্তিত্বমণ্ডিত, সজ্জন, নির্লোভ আর একজন আবু সাঈদ চৌধুরীর জন্য আমাদের কতকাল অপেক্ষা করতে হবে কে জানে।’ (সোমবার, ১৭ শ্রাবণ ১৩৯৪)।

দৈনিক সংবাদ (১৮ শ্রাবণ ১৩৯৪) সম্পাদকীয়তে লেখা হয়: ‘আবু সাঈদ চৌধুরীর কর্মজীবন পর্যালোচনা করে তাকে সার্থকভাবেই দার্শনিক-রাজনীতিক হিসেবে অভিহিত করা চলে।’

দৈনিক বাংলা লেখে:, ‘বিচারপতি চৌধুরী তার কর্মে আর কৃতিত্বের মাধ্যমে অমরত্বে উপনীত হয়েছেন।’

একজন পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা এম সাদিক নামে লেখেন: ‘বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের স্বপ্নময় বরেণ্য মনীষী আবু সাঈদ চৌধুরীর তিরোধান নক্ষত্রের পতনের মতো। কিন্তু তিনি জেগে রবেন প্রতিটি বাঙালির চোখের তারায়।’ (স্মৃতিসত্তায় আবু সাঈদ চৌধুরী, পৃ. ৩৮)।

আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম একজন নায়ক জাতীয় বীর আবু সাঈদ চৌধুরীর মৃত্যু নেই। বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে চিরকাল তিনি অমর হয়ে থাকবেন। মৃত্যুদিবসে স্যারের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।

লেখক: বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন

করোনায় মানসিক চাপ দূরে রাখা জরুরি

করোনায় মানসিক চাপ দূরে রাখা জরুরি

একাধিক গবেষণা বলছে, করোনায় সংক্রমিত মানুষের প্রতি পাঁচজনের একজনের মধ্যে করোনার সঙ্গে মানসিক সমস্যা যেমন- বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, সাইকোসিস ইত্যাদি দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার করোনায় আক্রান্ত নন এমন ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ উদ্বিগ্নতা, বিষণ্নতা, আতঙ্ক সৃষ্টির হার সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি করোনা থেকে সেরে উঠলেও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি থেকে যায়।

প্রায় দেড় বছর ধরে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্বজুড়ে আক্রান্ত হয়েছে ১৯ কোটি ৩৫ লাখ ২৯ হাজার ২৭৯ জন। মৃত্যু হয়েছে ৪১ লাখ ৫৪ হাজার ২৭৬ জনের ও সুস্থ হয়েছেন ১৭ কোটি ৫৮ লাখ ১৮ হাজার ৮ জন। এ হিসাব লেখাটি প্রকাশের দিন পর‌্যন্ত বাড়বে বৈ কমবে বলে মনে হয় না। বাংলাদেশের হিসাবের বেলায়ও এমনটা বলা যায়।

কোভিড-১৯ একটি ভাইরাসজনিত রোগ কিন্তু এ রোগটির ব্যাপ্তি এতই বেশি যে, তা শারীরিক স্বাস্থ্যের বিপন্নতাকে অতিক্রম করে মানসিক, সামাজিক আর অর্থনৈতিকভাবেও আমাদের বিপর্যস্ত করে ফেলছে।

এই সংকট ও সমস্যার সমাধান হওয়ার আশু কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কঠিন এই বাস্তবতায় কী হবে এই কঠিন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। করোনার কারণে চাকরিচ্যুত হয়েছেন শতকরা ৩৬ জন। তিন শতাংশ মানুষের চাকরি থাকা সত্ত্বেও তারা বেতন-ভাতা পান না ঠিকমতো। এদের বেশির ভাগই মধ্যবিত্ত। তাহলে সংকট উত্তরণের কী উপায়?

করোনা সংক্রমণজনিত এ সংকটকালে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সার্বিক সুরক্ষা ও জীবন-জীবিকা নির্বাহের জন্য উন্নয়ন কার্যক্রম ও জনবান্ধব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে সরকার। এ সকল পদক্ষেপ প্রায় স্থবির হয়ে পড়া অর্থনীতির চাকা চলমান রাখতে কিছুটা হলেও অবদান রাখছে।

মহামারির কারণে বর্তমান বাংলাদেশের সমাজচিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। করোনার করাল থাবায় অর্থনীতির স্বাভাবিক চাকা আপন গতিতে ঘুরতে পারছে না। সচলতার পরিবর্তে প্রবল হয়ে উঠছে স্থবিরতা। অসংখ্য মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েছে। অনিশ্চয়তার প্রহর ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। দিশেহারা হয়ে অনেক মানুষ গ্রামে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন ও এখনও হচ্ছেন। সেখানেও কি শান্তি আছে, বসবাসের নিশ্চয়তা আছে? কর্মসংস্থানের সুযোগ-সুবিধা কি আছে? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায় না।

পেশাজীবীদের জীবিকা এখন অনেকটাই অনিশ্চিত। বেসরকারি অফিস প্রতিষ্ঠানে বেতন-ভাতা অনিয়মিত। কাজ করলেও বেতন-ভাতা মিলছে না। পোশাক খাতের কর্মীরা বরাবরের মতোই সংকটের মুখে। অনেক কারখানা ইতোমধ্যেই বন্ধ হয়েছে বা বন্ধ হবার পথে। প্রবাসী শ্রমিকেরা প্রতিনিয়ত কাজ হারিয়ে বেকার হয়ে যাচ্ছেন। কোথাও আশার আলো নেই। পেশা বদলের প্রতিযোগিতা এখন নিয়মিত বিষয়। চাকরিহারা কেউ কেউ ক্ষুদ্র ব্যবসার দিকে ঝুঁকছেন সেখানেও কি সুবিধা পাচ্ছেন?

জীবনযুদ্ধের এক কঠিন সময় যাচ্ছে এখন। বিভিন্ন গবেষণায় প্রকাশিত খবরে দেখা যায় বিভিন্ন সেক্টরে কাজে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৮২ লাখ। করোনার বিষাক্ত ছোবলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন ৩ কোটি ৬০ লাখ মানুষ। পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক ও আশঙ্কার, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত কর্মহীন লোকের সংখ্যা ২৬ লাখ। এই সংকট শুধু বাংলাদেশেরই নয়, গোটা বিশ্বেরই। আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা আইএলওর সর্বশেষ রিপোর্টে যে তথ্য পাওয়া যায় তাতে তো সংকট আরও বাড়বে। আইএলও বলেছে, করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী ৩৪ কোটি মানুষ কাজ হারাতে পারেন। বিপর্যস্ত দেশগুলোর তালিকায় রয়েছে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশও।

করোনা সংকটে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ থাকায় শিক্ষক-শিক্ষার্থী উভয়েই বিপদগ্রস্ত। এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ আর্থিক অংশ সরকারই দেয়, তবে অনেক শিক্ষক-কর্মচারী আবার সরকারি সুবিধা পান না। কিন্তু বেশি সমস্যায় আছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন না নিলে তারা শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন দিতে পারে না। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ফি আদায় করার যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন থাকছে। তাই শিক্ষক-কর্মচারীরা বিপদেই আছেন।

করোনাকালে বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষই মানসিক চাপের মাঝে রয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৩৪ দশমিক ৯ শতাংশ যুব ও যুব নারী বিাভন্ন প্রকার মানসিক চাপে রয়েছেন। এ ধরনের মানসিক অস্থিরতায় ভুগে ৭০ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ শারীরিকভাবে নিজের ক্ষতি করছেন। মানসিক বিভিন্ন চাপের ফলে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করে এমন সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ‘আঁচল ফাউন্ডেশনে’র জরিপে এমনটি উঠে এসেছে। করোনাকালে এত বেশিসংখ্যক আত্মহত্যার ঘটনা উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। মূলত মানসিক স্বাস্থ্য-সংক্রান্ত বিভিন্ন সমস্যা, আত্মহত্যার কারণ চিহ্নিত করা এবং তার সমাধানের উপায় খুঁজে বের করার জন্যই অনেকে কাজ করছেন।

২০২০ সালের মার্চ থেকে ২০২১-এর ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশে মোট ১৪ হাজার ৪৩৬টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। ৩২২টি আত্মহত্যার কেসস্টাডির প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের ৪৯ শতাংশেরই বয়স ২০ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আর এর ৫৭ শতাংশই নারী।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, তরুণদের মধ্যে অধিকাংশই মানসিক বিষণ্নতায় ভোগেন। অধিকাংশ সময় মন খারাপ থাকা, পছন্দের কাজ থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলা। অস্বাভাবিক কম বা বেশি ঘুম হওয়া, কাজে মনোযোগ হারিয়ে ফেলা, নিজেকে নিয়ে নেতিবাচক চিন্তা করা, সবকিছুতে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা। এ সমস্যাগুলো তীব্র আকার ধারণ করলে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে যায় বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। তাদের মানসিক অস্থিরতার বিষয়ে কারো সঙ্গে খোলামেলা কথা বলতে না পারাই মূল কারণ।

মন খারাপ হলে বা বিষণ্ন হলে বন্ধুদের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে এবং বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তা শেয়ার করেন। অধিকাংশই দৈনিক স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করেন যা মানসিকভাবে তাদের বিপর্যস্ত করে তুলছে। অনেকেই দৈনিক ৬ ঘণ্টার বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সময় ব্যয় করেন। তাদের মানসিক স্বাস্থ্য তাদের দৈনন্দিন কাজগুলোকে বাধাগ্রস্ত করেও বলে উল্লেখ করেন। এর মধ্যে ৯১ দশমিক ৪ শতাংশই কখনও মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেননি।

করোনাকালে তরুণ ও যুবকরা যে মানসিক চাপজনিত সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হচ্ছেন সেগুলো হচ্ছে- পড়াশোনা ও কাজে মনোযোগ হারানো, মেজাজ খিটখিটে হয়ে যাওয়া, একাকী অনুভব করা, অনাগ্রহ সত্ত্বেও পরিবার থেকে বিয়ের চাপ, আর্থিক সমস্যা, অতিরিক্ত চিন্তা করা, মোবাইল-আসক্তি, আচরণগত সমস্যা, চাকরির অভাব, কাজের সুযোগ না পাওয়া, সেশনজট, অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং পরিবারের সদস্যদের মৃত্যু ইত্যাদি তরুণ ও যুবকদের মানসিক চাপ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

একাধিক গবেষণা বলছে, করোনায় সংক্রমিত মানুষের প্রতি পাঁচজনের একজনের মধ্যে করোনার সঙ্গে মানসিক সমস্যা যেমন- বিষণ্নতা, উদ্বিগ্নতা, সাইকোসিস ইত্যাদি দেখা দেয় বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। আবার করোনায় আক্রান্ত নন এমন ব্যক্তি এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ উদ্বিগ্নতা, বিষণ্নতা, আতঙ্ক সৃষ্টির হার সাধারণ সময়ের চেয়ে বহুগুণ বেড়ে যায় বলে জানাচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি করোনা থেকে সেরে উঠলেও মানসিক সমস্যার ঝুঁকি থেকে যায়।

সাধারণ সময়ের চেয়ে কোভিডকালে মানসিক সমস্যা বাংলাদেশেও বেড়েছে। করোনা সংক্রমণের আতঙ্ক, চিকিৎসা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা, মরে যাবার ভয়, অর্থনৈতিক বিপর্যস্ততা, চাকরি হারিয়ে বেকারত্ব, এমনকি করোনা নিয়ে ভ্রান্ত- নেতিবাচক সামাজিক বৈষম্যের কারণে বাড়ছে মানসিক সংকট। আর করোনা চিকিৎসায় নিয়োজিত সকল পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ যা তাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এমনকি করোনাকালে বিশ্বজুড়ে বেড়ে গেছে পারিবারিক সহিংসতা ও লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতা।

সংক্রমিত হয়ে মৃত্যু, সংক্রমিত হলে চিকিৎসা নিয়ে আতঙ্ক, পরিবারের সদস্যদের সংক্রমণের ভয়, আইসোলেশনে থাকার সময় একাকিত্ব মনের ওপর চাপ বাড়ায়, পরিবার সদসস্যের মৃত্যুর আতঙ্ক, গণমাধ্যমে ভীতিকর সংবাদ, স্বাস্থ্যবিধি না মানা এসব কারণে ঘুমের সমস্যা, ঘুম না আসা, বার বার ঘুম না হওয়ার কারণে। এ কারণে মন খারাপ থাকা, অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা, অস্থিরবোধ করা, আতঙ্কিত হয়ে মৃত্যুভয়ে ভীত হওয়া।

মনে রাখা দরকার, এই সংকটময় মুহূর্তে আতঙ্কিত হওয়া, মানসিক চাপে পড়া বা হতাশবোধ করাই স্বাভাবিক। পুরো বিশ্ব একটি অস্বাভাবিক পরিস্থিতির মুখোমুখী। আতঙ্কিত হয়ে গেলে কিন্তু তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে, সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যাবে; করোনা আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে আতঙ্ক আর মানসিক চাপ তার করোনাকে আরও জটিল করে তুলবে। তাই সকলকে মানসিক চাপ মোকাবিলায় দক্ষতা বাড়াতে হবে।

এ অবস্থা থেকে উত্তরণের উপায় হতে পারে পরিবারের সঙ্গে কোয়ালিটি সময় দেয়া, সুশৃঙ্খল জীবন যাপন করা, রুটিন বিষয়গুলো, যেমন ঘুম, ঠিক সময়ে খাবার, বাড়িতে হালকা ব্যায়াম ইত্যাদি বন্ধ না করা। সুষম আর নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ, পর্যাপ্ত পানি পান, সময়মতো ঘুমানো, হালকা ব্যায়াম করা, ঘরের কাজে সবাই মিলে অংশ নেয়া এবং যেকোনো নেশা এড়িয়ে চলা।

এই সময়ে সকলকেই সামাজিক বিভিন্ন কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত। এক্ষেত্রে সমাজের উন্নয়নে কাজ করছে এমন সংগঠনগুলোর এগিয়ে আসা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সকলকেই ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করা উচিত। বর্তমানে ঘরে বসেই অনলাইনে অনেক ধরনের আয় করার সুযোগ আছে এবং সোর্স রয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের এই অলস সময়ে যুবকদেরসহ কর্মক্ষম সবার মেধাকে কাজে লাগিয়ে এই প্ল্যাটফরমগুলো সচল করা যেতে পারে। সবাইকে সঙ্গে নিয়ে এই পরিস্থিতির মোকাবিলায় এক সঙ্গে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগকে কাজ লাগাতে হবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন

লুকোচুরির লকডাউন!

লুকোচুরির লকডাউন!

প্রশ্ন হলো ১৪ দিনের লকডাউনও যদি সরকার ঠিকমতো পালন না করাতে পারে তাহলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই ব্রেক তো আর আনা সম্ভব হলো না। তাহলে এই কদিনের অদ্ভুত এক লুকোচুরি খেলার কি দরকার ছিল?

১ আগস্ট থেকে সব গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি খুলে দেয়া হলো। তার মানে হলো দেশের প্রায় সাড়ে চার হাজার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, ৮ শ’ ফেব্রিকস ইন্ডাস্ট্রি, প্রায় সাড়ে ৪ শ’ ইয়ার্ন ম্যানুফ্যাকচারিং ফ্যাক্টরি, প্রায় ২৫০টি ডাইং ফ্যাক্টরি, এছাড়া দুহাজারের কাছাকাছি ওয়াশিং ও অ্যাক্সেসরিজ ফ্যাক্টরি ও এর সঙ্গে সম্পৃক্ত অন্যান্য অফিস ও কারখানায় কর্মরত লোক মিলিয়ে ঢাকা ও এর আশপাশে কোটির বেশি লোক ঘরের বাইরে বেরিয়ে যাবে। আর কারখানাগুলো চললে এর আশপাশের খাবার দোকান, মুদি দোকান, চায়ের স্টল কোনোটাই বন্ধ করা সম্ভব হবে না। এখন থাকল বাকি ৫০ লাখ দোকান ব্যবসায়ী। এরাও মনে হয় না ধৈর্য ধরে বসে থাকতে পারবে!

এক তারিখ থেকে গণপরিবহন না চললে সবাই ছোট ছোট গাড়িতে গাদাগাদি করে যাতায়াত করবে, রাস্তায় লোকে লোকারণ্য থাকবে, রিকশাভ্যান, বাইকে শেয়ার রাইড কোনোকিছুই আটকানো যাবে না। ফেরির সেই গিজ গিজ করা লোকের ভিড়ের ছবিও আমরা কাল থেকে দেখব। এর মধ্যে এখন ঢাকার বাইরের বেশিরভাগ করোনা রোগীই এখন ঢাকার চারদিকের হাসপাতালে ছড়ানো। এর অর্থ দাঁড়ালো স্বাস্থ্যবিধি মানানোর কোনো পথই আর খোলা থাকল না।

আমার প্রশ্ন হলো ১৪ দিনের লকডাউনও যদি সরকার ঠিকমতো পালন না করাতে পারে তাহলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সেই ব্রেক তো আর আনা সম্ভব হলো না। তাহলে এই কদিনের অদ্ভুত এক লুকোচুরি খেলার কি দরকার ছিল? এই কদিন সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ করাটা তো তাহলে কোনো কাজেই এল না।

এছাড়া নৈতিকতার দিক দিয়ে বিচার করলে শুধু গার্মেন্টসের মালিকরাই কি এদেশের নাগরিক? আর অন্য ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী, দোকান মালিক, পরিবহন মালিক, রেস্তোরাঁ মালিক এরা কি দেশের নাগরিক না? এদের জীবিকা আটকে দিয়ে, বেঁচে থাকার দায়িত্ব কি সরকার নিয়েছে?

সরকারের এই অবিমৃষ্যকারী ও হঠকারী সিদ্ধান্ত করোনায় মৃত্যুর মিছিলকে আরও প্রলম্বিতই করবে। এখন করোনার বিষয়ে সরকারের একমাত্র কাজ হবে প্রতিদিনের সংক্রমণ ও মৃত্যুর পরিসংখ্যান নিয়ন্ত্রণ করা ও কমিয়ে দেখানো।

ইতিহাস বলে যে, যেকোনো মহামারি বাড়তে বাড়তে একসময় চূড়ায় ওঠে আর তারপর ধীরে ধীরে তা কমতে থাকে। তারপর একপর্যায় একদম কমে গিয়ে মানবগোষ্ঠীর জন্য সহনীয় হয়ে আসে। মানুষ যদি মহামারির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা না-ও নেয় তাহলে এরকমই হয়।

আমরাও এসব লকডাউনের ভাওতাবাজির ওপর নির্ভর না করে বিধাতা আর প্রকৃতির ওপর সব ছেড়ে দিয়ে শুধু মাস্ক পরে, জীবাণুনাশক ব্যবহার করে, হাত ধুয়ে আর সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের রক্ষা করি; দেখবেন সরকার একদিন বুক ফুলিয়ে বিশ্বকে বলবে অত্যন্ত সুদক্ষ হাতে বাংলাদেশ মহামারি নিয়ন্ত্রণ করেছে। আমাদের স্বাস্থ্য বিভাগ বলবে, করোনা নিয়ন্ত্রণে আমরা বিশ্বের রোল মডেল।

লেখক: সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন

মুনাফার কাছে জীবন তুচ্ছ!

মুনাফার কাছে জীবন তুচ্ছ!

মালিক দেখছে উৎপাদন, অর্ডার, মুনাফা। সরকার দেখছে রপ্তানি আয়। একদিকে ৩৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়, অপরদিকে ৪০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। অর্ডার বাতিল হলে আর পাওয়া যাবে না, মুনাফা হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু শ্রমিক তো যথেষ্টই আছে। আর শ্রমিক দেখছে তার চাকরি। এটা না থাকলে সে বাঁচবে কীভাবে? করোনার চাইতে ক্ষুধার যন্ত্রণা যে বেশি! তাই সে ঝুঁকি নিতে পরোয়া করে না। ফলে মুনাফার জন্য এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেল।

শ্রমিকের জীবন নিয়ে এক অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা হলো আবার। ঢাকায় প্রবেশ করার প্রতিটি পথেই মানুষ আর মানুষ। লঞ্চে, ফেরিতে তিলধারণের ঠাঁই নেই। বাসে দ্বিগুণ তিনগুণ ভাড়া। মানুষ উঠে পড়েছে ট্রাক, কাভার্ডভ্যানে। আসছে রিকশাভ্যান, ইজি বাইক, সিএনজি-চালিত অটোরিশায়। কী এক অজানা আতঙ্কে মানুষ ছুটে আসছে ঢাকা, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, নারায়ণগঞ্জের দিকে।

টাকা বেশি লাগে লাগুক, যত কষ্টই হোক তাদেরকে আসতেই হবে। কোথায় স্বাস্থ্যবিধি আর কোথায় শারীরিক দূরত্ব! জীবন বাঁচাতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জীবিকার তাগিদে মানুষ আসছে। কিন্তু তাদেরকে আনছে যারা তারা কেন এই সিদ্ধান্ত নিল? ব্যবসা, মুনাফা, টাকা এই শব্দগুলো যে কত শক্তিশালী তা মানুষ দেখছে এবং বুঝছে বার বার। ক্ষমতা যে আসলে টাকার ক্ষমতা, টাকাওয়ালারা সেটা বুঝিয়ে দিচ্ছে ভালোভাবেই।

করোনার সংক্রমণ ক্রমাগত বাড়ছে, গ্রাম এবং শহরের পার্থক্য আর নেই বললেই চলে। মৃত্যুর সংখ্যাও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞদের কপালে দুশ্চিন্তার ছাপ। হাসপাতালে ঠাঁই নেই, অক্সিজেন নেই, আইসিইউ বেড খালি নেই। যে স্বাস্থ্যমন্ত্রী এতদিন স্বাস্থ্য খাতে সক্ষমতার বিবরণ দিতেন এখন তিনি বলছেন সংক্রমণ আরও বাড়লে করার আর কিছুই থাকবে না। কষ্টকর মৃত্যুই যেন শেষ পরিণতি। বাঁচতে হলে ঘরে থাকুন!

এ যাবৎকালের সবচেয়ে কড়া লকডাউন চলছে। রাস্তায় সামরিক বাহিনীও আছে মানুষকে ঠেকাতে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত সমস্ত ধরনের গাড়ি চলাচল বন্ধ। এ পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা এল গার্মেন্টসসহ রপ্তানিমুখী কারখানা ১ আগস্ট থেকে চালু করা হবে।

ঘোষণা তো এমনি এমনি আসেনি! মালিকদের পক্ষ থেকে প্রথমে আবদার, তারপর দাবি এরপর মৃদু হুমকির মুখে চলমান কঠোর ও সর্বাত্মক লকডাউন এবং বিধিনিষেধের মধ্যেই তৈরি পোশাকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানা রোববার খুলে দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। পোশাক কারখানার মালিক তথা রপ্তানিকারকদের মুখে এখন তৃপ্তির হাসি সঙ্গে একটু গর্বের ঝিলিক। মুখের ভাষায় না হলেও ভাবে প্রকাশিত হচ্ছে তাদের মনের কথা। বলেছিলাম না আমাদের কথা সরকারকে শুনতেই হবে।

রোববার সকাল ছয়টা থেকে পোশাকসহ সব রপ্তানিমুখী শিল্পকারখানাকে বিধিনিষেধের আওতামুক্ত ঘোষণা করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ শুক্রবার বিকেলে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। বৃহস্পতিবার ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি মো. জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে একদল ব্যবসায়ী মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সঙ্গে বৈঠক করে যত দ্রুত সম্ভব শিল্পকারখানা খুলে দেয়ার অনুরোধ জানান। তাদের অনুরোধ ফেলতে পারেনি সরকার।

এর আগে শ্রম প্রতিমন্ত্রী আবেদন জানিয়েছিলেন, যেন মালিকরা কারখানা লে-অফ না করেন। তিনি কিন্তু বলেননি যে বেআইনি লে-অফ করলে শ্রম আইন অনুযায়ী শাস্তি পেতে হবে। বরং শ্রমিকদেরকে ভয়ের ইঙ্গিত দেখালেন। এখন সিদ্ধান্ত নাও, করোনার ভয় না কাজ হারানোর ভয় কোনটা বড়? সব জটিলতার অবসান ঘটিয়ে শেষে রপ্তানিমুখী সব শিল্পকারখানা খুলে দেয়ার ঘোষণা দিল সরকার। যাক! শ্রম প্রতিমন্ত্রী বেঁচে গেলেন লে-অফ জনিত দুশ্চিন্তা থেকে আর মালিক নেতারা দেখালেন তাদের ক্ষমতা। কিন্তু শ্রমিকেরা? এই চলমান বিধিনিষেধে শ্রমিকেরা দূর দূরান্ত থেকে কীভাবে কর্মস্থলে আসবেন তার কোনো ব্যবস্থা করা হবে কি না তা বলা হয়নি।

করোনা সংক্রমণের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী ২৩ জুলাই থেকে জারি করা কঠোরতম বিধিনিষেধের মধ্যে গত ২৭ জুলাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সভাপতিত্বে সরকারের উচ্চপর্যায়ের এক সভায় হয়। তাতে সিদ্ধান্ত হয়, চলমান বিধিনিষেধে শিল্পকারখানা খোলার জন্য ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে অনুরোধ থাকলেও তা গ্রহণ করা যাচ্ছে না। তার মানে ৫ আগস্ট পর্যন্ত পোশাকসহ অন্যান্য শিল্পকারখানা বন্ধই থাকছে। কিন্তু ৩০ জুলাই সিদ্ধান্ত হলো ১ আগস্ট থেকে কারখানা খুলছে।

ঈদের ছুটি এবং ৫ আগস্ট পর্যন্ত কঠোর লকডাউনের ঘোষণায় ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ থেকে মানুষ কীভাবে যে গ্রামের দিকে ছুটেছে তা যমুনা সেতুতে গাড়ির ভিড়, সদরঘাটে লঞ্চে যাত্রীর ভিড়, দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে মানুষ আর গাড়ির ভিড় দেখে বুঝা গেছে। এরা কারা? কেন এরা ঈদ এলে বাড়ির দিকে ছোটে? এরকম কথা বলেন অনেকেই। তারা কি ভেবেছিলেন যখন সব বন্ধ তখন এই মানুষগুলো থাকবে কীভাবে?

এই মানুষগুলো বাড়ি গিয়েছিল স্বজনের প্রতি মায়ার টানে আর খরচ বাঁচাতে। কারণ কারখানা বন্ধ এখানে থেকে কী করবে? এখন আবার হুড়মুড় করে আসছে, কারণ না এলে চাকরি থাকবে না। তাই সে আসছে তিনগুণ চারগুণ বেশি খরচ, অবর্ণনীয় কষ্ট আর সময় ব্যয় করে। কোথায় থাকবে স্বাস্থ্যবিধি আর কোথায় কী? এসব দেখে অনেকেই হয়তো বলবে- বুঝলেন, আসলে বাঙালি কথা শোনে না, নিয়ম মানে না। কিন্তু যারা ঘন ঘন নিয়ম পালটান, বাধ্য করেন শ্রমজীবী মানুষদেরকে তাদের হুকুম মানতে, তাদের কি কোনো দায় নেই?

মালিক দেখছে উৎপাদন, অর্ডার, মুনাফা। সরকার দেখছে রপ্তানি আয়। একদিকে ৩৪ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়, অপরদিকে ৪০ লাখ গার্মেন্টস শ্রমিক। অর্ডার বাতিল হলে আর পাওয়া যাবে না, মুনাফা হাতছাড়া হয়ে যাবে। কিন্তু শ্রমিক তো যথেষ্টই আছে। আর শ্রমিক দেখছে তার চাকরি। এটা না থাকলে সে বাঁচবে কীভাবে? করোনার চাইতে ক্ষুধার যন্ত্রণা যে বেশি! তাই সে ঝুঁকি নিতে পরোয়া করে না। ফলে মুনাফার জন্য এক মানবিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়ে গেল।

হুকুম তামিল করতে এক পায়ে খাড়া হয়ে থাকা মানুষটিও যখন ঘন ঘন সিদ্ধান্ত পাল্টানোর সঙ্গে তাল মেলাতে পারে না আর সে কারণে শাস্তির মুখোমুখি হয় তখন তার একটিমাত্র জবাব থাকে, এত কিছু কেমনে সামলাই বলেন, আমিও তো মানুষ! কিন্তু চাকরি বাঁচানোর জন্যে গার্মেন্টস শ্রমিকরা বলছে, করোনা ফরনা বাদ দেন, আমরা কি মানুষ যে আমাদের করোনা হবে?

আর সরকার কিংবা মালিক! তারা তো বলেন, শ্রমিকরাই আমাদের শক্তি। তারা পরিশ্রম করে বলেই উৎপাদন হয়, রপ্তানি বাড়ে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু ঘোষণা দিলেন ১ আগস্ট থেকে কারখানা চলবে, শ্রমিকদের আসার জন্য কোনো ব্যবস্থা কি করলেন? শ্রমিকরা এলে করোনা টেস্ট করা, সংক্রমিতদের আইসোলেশনের ব্যবস্থা করা, চিকিৎসার দায়িত্ব নেয়া, মৃত্যুবরণ করলে সরকারি কর্মচারীদের মতো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করা, করোনাকালীন কাজে ঝুঁকিভাতা দেয়া, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য বিভাগের গাইড লাইন অনুযায়ী সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে শ্রমিকদেরকে কাজে যোগদান করতে বললে তবুও বুঝা যেত শ্রমিকদের প্রতি কিছুটা দায় পালন করেছেন। কিন্তু মালিকদের মনোভাবটা তো এরকম যে, এরা হলো সস্তা মানুষের দেশের শ্রমিক। তাদের আবার কষ্ট!

কষ্ট করার অভ্যাস আছে ওদের। ওরা ঠিকই চলে আসবে। আসলেই, আসবেই তো। না-হলে চাকরি যে থাকবে না। ত্রিপলঢাকা মালবাহী ট্রাকে করে আসছে নারী শ্রমিকেরা। একজন গরমে, অন্ধকারে হাঁসফাঁস করতে করতে বলছে, ত্রিপলটা একটু তুলে ধরুন। একটু আলো আর বাতাস আসুক! অসহায় মুখটা বের করে বাইরে তাকিয়ে থাকার এই ছবি যেন দেশের শ্রমিকের জীবনের প্রতীক। জীবনে একটু আলো আর বাতাসের জন্য আর কত অন্ধকারে থাকতে হবে শ্রমিকদের?

লেখক: রাজনীতিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন

বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ-দর্শন

বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ-দর্শন

বঙ্গবন্ধু কোনো খণ্ডিত সত্ত্বা নন। তিনি অখণ্ড। এ অখণ্ডতা বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগের মূল রসায়ন। এ সমগ্রতা থেকে উৎসারিত মুক্তির বার্তা। বঙ্গবন্ধুর ভাষা খুব স্পষ্ট। বুলেটের মতো তীব্র ও তীক্ষ্ন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের যোগাযোগ দর্শন কী ছিল? কী মৌল যোগাযোগ নীতি তিনি অনুসরণ করতেন? অনুসৃত নীতিগুলো কী তার সহজাত বৈশিষ্ট্য ছিল? নাকি চর্চার মধ্য দিয়ে তিনি তা রপ্ত করেছেন?

বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের বহুমাত্রিকতা নিয়ে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে। ৭ মার্চের ভাষণের ওপর যোগাযোগ পরিপ্রেক্ষিত থেকে বেশ কিছু মূল্যায়নও হয়েছে। কিন্তু সার্বিকভাবে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগ-দর্শন নিয়ে কোনো কাজ হয়েছে বলে জানা নেই।

বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, কারাগারের রোজনামচা, ভাষণ, স্মৃতিকথা ও অভিজ্ঞতামূলক লেখা ও সাক্ষাৎকারে তার যোগাযোগ-দর্শনের সন্ধান মেলে।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন এক অনন্য সংযোগ ফসল। বঙ্গবন্ধুর সেই সংযোগ বা যোগাযোগের পাটাতন নির্মিত হয় শৈশবে। তৈরি হয় সংবেদী মন যা রূপ পায় আবেগের মুগ্ধ বিন্যাস। তিনি খুব শৈশবে এক দরিদ্র বন্ধুকে নিজের জামা খুলে দিয়েছিলেন। এটি ছিল একটি বারতা। উদারতা আর দিগন্তপ্রসারী মনের প্রতিবিম্ব। যে প্রতিবিম্ব দিয়ে এদেশে ঘর ভরে আলো এসেছিল।

গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে পড়াশোনাকালে বাড়ি বাড়ি ঘুরে মুষ্টিচাল সংগ্রহ এবং তা বাজারে বিক্রি করে গরিব ছাত্রদের লেখাপড়া চালানোর পরার্থবোধ আরেকটি নজির। সাম্প্রদায়িক বৈরিতার শিকার এক বন্ধুকে উদ্ধার করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জেলে যেতে হয়। তার ১৪ বছর বয়সে জেলে যাওয়ার অভিজ্ঞতা হয়। মায়ের বুকের দুধের কাঁচা ঘ্রাণ দূর হওয়ার আগেই তিনি প্রতিবাদ আর প্রতিরোধের শপথ নিয়েছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর সংবেদী মন গড়ে উঠেছে টুঙ্গিপাড়ার প্রাণ-প্রকৃতি, খাল-নদী, অবারিত জলরাশি, সামাজিক সম্পর্ক ও পারিবারিক ধর্মীয় মূল্যবোধের সমন্বয়ে। সেই সময়ের টুঙ্গিপাড়া বিস্তৃত জলরাশির আধার। তিনি শৈশবে বাড়িসংলগ্ন বাঘিয়ার খালে গোসল করতেন, সঙ্গে থাকতেন সমবয়সীরা। খালপাড়ে থাকা হিজল গাছের ডাল থেকে পানিতে ঝাঁপ দিতেন। খালের স্রোতে, হিজল গাছ এবং সমবয়সীদের নিয়ে গড়ে উঠেছিল এক বিশেষ সখ্য। বঙ্গবন্ধুর শৈশবের মনোকাঠামো গঠনের এগুলোই অন্যতম কারক।

যুগপৎভাবে, মধুমতি নদীর রুপালি ঢেউ। ঘাটে বাঁধা বজরা নৌকা। নানা মানুষের আসা-যাওয়া। হরেকরমকের মাছ। সবগুলোর আলাদা আলাদা চরিত্র। সবগুলোর আঁচড় পড়ছে বঙ্গবন্ধুর কোমল হৃদয়ে। শৈশবে কেবল একটি সংবেদী মন গঠন হয়নি তার গন্তব্যও স্থির হয় কল্যাণবোধে যাকে ঘিরে মূলত জাতির পিতার সংযোগ ও সংযুক্তি।

বৃহৎপ্রাণ, প্রকৃতি ও মানবিক সম্পর্কের প্রতিসরণ ঘটেছে বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে, যা একটি পলল ও উর্বর মনোভূমি তৈরি করেছে। এ মনোভূমে রোপিত হয়েছে একটি দেশের মানচিত্র। মনের গভীর স্তর থেকে সে বীজ অঙ্কুরিত হয়েছে জীবনের ঊষালগ্নে।

বঙ্গবন্ধুর মন এক বৃহৎ চেতনার দ্যোতক। আর তা হলো একটি স্বতন্ত্র পরিচয়, একটি মানচিত্র ও একটি স্বাধীন ভূখণ্ড। এ ত্রিভূজাকৃতির আকাঙ্ক্ষাকে ঘিরে বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগের দর্শন নির্মিত। একদিকে কতগুলো চূড়ান্ত আকাঙ্ক্ষা অন্যদিকে সেগুলো অর্জনের জন্য কার্যকর সংযোগ। বঙ্গবন্ধু স্বপ্নের ভিত রচনাকারী এবং একই সঙ্গে সে স্বপ্ন অর্জনের পথনির্দেশকও বটে। আর নিশানাভেদী তীর ছুড়তে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে তার অনন্য যোগাযোগকলা।

বঙ্গবন্ধুর সংবেদী মনের সঙ্গে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও সংযুক্তি ঘটছে দারুণভাবে। তিনি ১৮ বছর বয়সে এ কে ফজলুল হক ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সঙ্গে সম্মুখ সাক্ষাতের সুযোগ পান। তিনি সোহরাওয়ার্দীর অনুরক্ত হয়ে ওঠেন। এ আরেক বৃহৎ সংযুক্তি। বঙ্গবন্ধু ছিলেন সংযোগপ্রবণ অর্থাৎ যুক্ত হতে ভালোবাসতেন।

তার চেতনার পরিস্ফুটনে দরকার ছিল আরেক বৃহৎ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে সংযোগ, যা ঘটেছে বেশ সফলতার সঙ্গে। বেঙ্গল কমিউনিকেশনে গুরু-চ্যালা রিলেশনস একটি বিশেষ ব্যাপার। এখানে অন্য অনেক সাধনার মতো রাজনৈতিক সাধনাও গুরুমুখী। বঙ্গবন্ধু একজন গুরু পেয়েছিলেন, পেয়েছিলেন এগিয়ে যাওয়ার আশ্রয়।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকূশলতা চলেছে বন্ধুর পথ মাড়িয়ে। মানুষের অধিকারের প্রশ্নে তিনি আপসহীন। এ আপসহীনতা জনসাধারণ সহজে গ্রহণ করেছে। বঙ্গবন্ধুকে তারা আস্থার প্রতীক হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেছে। বঙ্গবন্ধু নানা পরীক্ষার মধ্য দিয়ে পর্যায়ক্রমে মানুষের মন জয় করেছেন। মানুষের মনোজগতের আকাঙ্ক্ষা অনুসন্ধান করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগের মূল আধেয় মানুষ। তিনি মানুষপাঠে এক পারঙ্গম রাজনৈতিক নেতা। বঙ্গবন্ধু মানুষ পড়ে পড়ে সামনে এগিয়েছেন। মানুষের প্রতি এ একান্ত মনোযোগ ও বিশেষ দক্ষতা তাকে রাজনৈতিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করেছে।

তিনি মানুষের সঙ্গে মিশতে পছন্দ করতেন। মানুষের নিকটতম নেতা বঙ্গবন্ধু। তিনি যাকে একবার দেখতেন তার চেহারা ভুলতেন না, নামও ভুলতেন না। কারো নাম ধরে ডাকার মধ্যে যে নৈকট্যবোধ তৈরি হয় তিনি তা দারুণভাবে রপ্ত করেছিলেন।

মাঠ-ঘাটের সাধারণ নেতাকর্মীদের তিনি যখন নাম ধরে ডাকতেন, ‘তুই’ বা ‘তোরা’ তখন নৈকট্যের স্থিতি খুব গভীর হতো। সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে ইমপাওয়ারমেন্ট ফিলিং কাজ করত। তারা অনুভব করতেন নেতার মনে নিজেদের বসত রয়েছে। এভাবে তিনি লক্ষ-কোটি মানুষের অন্তঃপুরে বসত গাড়তে সক্ষম হয়েছিলেন, যা তার রাজনৈতিক যোগাযোগের নেটওয়ার্ককে কালোত্তীর্ণ করে তোলে।

তিনি ছিলেন নিরহংকার ও নিঃস্বার্থ। বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিত্বের স্পর্শে মানুষ আশ্রয় পেতেন, শীতল ছায়া অনুভব করতেন। বঙ্গবন্ধুর দ্যুতিময় ও দৃঢ় ব্যক্তিত্ব যোগাযোগ-দর্শনের ঘোরতর আবেশ তৈরি করেছিল। তার সম্মোহনী ক্ষমতা ছিল। তিনি সম্মোহন করতে পারতেন।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক তৎপরতা দেশের জনগণ সেগুলো গভীর মনোযোগে প্রত্যক্ষ করেছে। পরীক্ষিত নেতার যে ধারণা সে মানে তিনি অনেক আগেই উত্তীর্ণ হয়েছেন। অর্থাৎ নানা রকম চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তিনি বেঙ্গল পলিটিক্যাল কমিউকেশনে স্বতন্ত্র চরিত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে যান।

বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগের নৈতিক ভিত্তি ছিল সহমর্মিতাবোধ। তিনি সহমর্মিতার পরশে সকলকে আপন করে নিতে পারতেন। তিনি ধনী-নির্ধন, সমমত, ভিন্নমত সবাইকে ধারণ করতেন। তিনি ছিলেন গ্রহণোউন্মুক্ত ও সমন্বয়বাদী নেতা। তিনি সংকোচন নীতি পছন্দ করতেন না। বঙ্গবন্ধু মানবিক গুণের আধার। তিনি যেমন বৃহৎ-এ মনোযোগ দিতেন তেমনি ক্ষুদ্রেও নিমগ্ন থাকতেন। খবরের কাগজ পরিবীক্ষণে তার সমর্থনে পাওয়া কয়েকটি টুকরো স্মৃতি তুলে ধরা হলো-

এক. বিয়ের উপহার

“ ১৯৭৪ সালের ১ মার্চ আমি বিয়ে করি। ফেব্রুয়ারি মাসের কোনো একদিন তারিখ মনে নেই। দুপুর বেলায় বঙ্গবন্ধু যখন খেতে বসলেন তখন বিয়ের কথা জানিয়ে বঙ্গবন্ধুকে দাওয়াত দিই। অবশ্য আমার সহকারী কন্ট্রোলার হাসানুজ্জামানের কথামতো বঙ্গবন্ধুকে দাওয়াত দেয়া হয়। সহকারী কন্ট্রোলার যখন বিয়ের প্রসঙ্গ তুলে বঙ্গবন্ধুকে দাওয়াত দিচ্ছিলেন আমি তখন ওই রুমের দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছি। বিয়ের কথা শুনে আমাকে ডাক দিলেন। জানতে চাইলেন কোথায় বিয়ে করছি? বউ কী করে? কতটুকু পড়াশোনা করেছে, শ্বশুর কী করে, এমন অনেক প্রশ্ন? উত্তর দেয়ার পর বঙ্গবন্ধু তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা তোফায়েল আহমেদকে ডেকে বললেন, ওকে এক হাজার টাকা দিয়ে দে। আর আমাকে বললেন, তোর বউকে একটা বেনারশি শাড়ি আর একটা ঘড়ি কিনে দিস এ টাকায়। বঙ্গবন্ধুর দেয়া টাকা দিয়ে স্ত্রীকে লালপাড়ের একটি হলুদ শাড়ি কিনে দিয়েছিলাম। এই হলো বঙ্গবন্ধু।...বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসায় রকমফের দেখিনি”- বঙ্গবন্ধুর মাহনুভবতা ও ব্যক্তিত্বের কাছে সবাই ছিল ম্রিয়মাণ; (মুহাম্মদ মোশারফ হোসেন: গণভবেনের সাবেক স্টোরকিপার; সূত্র: ১৫ আগস্ট ২০২০; বণিক বার্তা)

খ. কৈ মাছের মাথা

“খাবার সময় গেলে মুখের দিকে তাকিয়ে প্রথম প্রশ্ন: ‘তুমি খেয়েছ?’ আমরা সরাসরি ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। সফলতার ভাগ কম। তিনি কিছু সময় মুখের দিক তাকিয়ে বলতেন, ‘তোমার মুখ শুকনো দেখা যাচ্ছে, খাও, পরে কাজ।’ নিজ হাতে প্লেট এগিয়ে দিয়ে ভাত-মাছ উঠিয়ে দিতেন। কৈ মাছ ও মাছের মাথা নিত্যদিনের ম্যেনু। দেশের প্রধানমন্ত্রীর সামনে কৈ মাছ খাওয়া দুষ্কর। পরিবেশ সহজ করার জন্য তিনি হয়তো বলতেন: ‘তোমরা মাছ খাওয়া শেখোনি, দেখো এভাবে খেতে হয়।’ কৈ মাছের কাঁটা সরিয়ে বা মাছের মাথা হাত দিয়ে ভেঙে কীভাবে মুখে পুরতে হয় দেখিয়ে দিতেন।” (বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি: ড. মসিউর রহমান: বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিব; সূত্র: ১৫ আগস্ট ২০২০; বণিক বার্তা)

গ. সাতাশ হাজার টাকা

“১৯৭৪ সালের অক্টোবর মাসে আমি চলে গেলাম ফ্রান্সে। যাওয়ার আগে শেষ যেদিন তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল, সেদিন তার চোখে জল দেখেছিলাম। চুয়াত্তরের বন্যার ত্রাণ তহবিলে দেওয়ার জন্য আমি ছবি এঁকে, বিক্রি করে সাতাশ হাজার টাকার একটা চেক নিয়ে গিয়েছিলাম বঙ্গবন্ধুর কাছে। চারদিকে সমস্যা। সামাল দেওয়া যাচ্ছে না দেশের দুর্নীতি। সেই চেক হাতে নিয়ে তিনি সেদিন কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চশমাটা খুলে আমাকে বললেন, ‘এই টাকা। কী হবে এটা দিয়ে আমার! এটা তুই তোর বাবাকে দিয়ে দে। তোর বাবাকে কিছুই তো দিতে পারলাম না।’ আমি বললাম, না কাকা। আমি এটা মানুষের জন্য করেছি। তখন সেদিন এই এক বড় মানুষকে দেখলাম আমার মাথায় হাত দিয়ে কেঁদে ফেললেন। বললেন, ‘বেঁচে থাক’। আমি বেঁচে আছি। শুধু তাকেই এই বাংলার মাটিতে বেঁচে থাকতে দিলো না ওরা।” (সাক্ষাৎকার: শিল্পী শাহাবুদ্দিন আহমেদ; বঙ্গবন্ধু, আমাদের ভিত্তির স্থপতি; ১৫ আগস্ট ২০২০; দৈনিক সমকাল)

ঘ. খরগোশ

“১৯৭৩ বা ’৭৪ সালে বঙ্গবন্ধু একবার আমাদের হেয়ার রোডের বাসায় এসেছিলেন। আমার বাবা তখন অর্থমন্ত্রী। আমার ভাই সোহেল অনেক ছোট। বঙ্গবন্ধু তাকে দেখে বললেন, ‘সোহেল, তোমার কী পছন্দ বলো তো? কী চাও তুমি?’ তখন সোহেল বলল, ‘আমার খরগোশ চাই।’ বঙ্গবন্ধুর কথাটা মনে ছিল। তারপর ১৯৭৫ সালে হঠাৎ একদিন বঙ্গবন্ধু আম্মাকে ফোন করে বললেন, ‘সোহেলের তো খরগোশ খুব পছন্দ। ওর জন্য খরগোশ পাঠাচ্ছি।’ পরে বঙ্গবন্ধু সুন্দর একটা কাঠের খাঁচায় দুইটা খরগোশ পাঠিয়েছিলেন। সেই খরগোশ দুইটাকে নিয়ে খুবই আনন্দ করতাম। ওদের আমরা গাজর ও কচি ঘাস খাওয়াতাম। আমার বাবাও পরম যত্ন নিয়ে খরগোশগুলোর দেখাশোনা করতেন। এটা যে তার মুজিব ভাইয়ের উপহার।” (সাক্ষাৎকার: সিমিন হোসেন রিমি এখনও মাথার ওপর বঙ্গবন্ধুর হাতের স্পর্শ অনুভব করি; ১৫ আগস্ট ২০২০; দৈনিক সমকাল)

বঙ্গবন্ধু হলেন মেঘনা নদীর মোহনা। যমুনা নদী যেমন গোয়ালন্দে পদ্মার সঙ্গে মিশে পদ্মা নাম ধারণ করে চাঁদপুরে মেঘনার সঙ্গে মিশে মেঘনা নাম নিয়ে বঙ্গোপসাগরে পড়েছে। বঙ্গবন্ধু ঠিক তাই।

বাঙালির হাজার বছরের ইতিহাসে প্রবহমান শত ধারার সম্মিলন। শতধারার সমাবেশ ঘটেছে বঙ্গবন্ধুর হৃদয়ে। বঙ্গবন্ধু বহুত্ব ও সমন্বয়বাদী নেতা। বৈচিত্র্য তার হৃদয়ের বাতিঘর।

বঙ্গবন্ধু কোনো খণ্ডিত সত্ত্বা নন। তিনি অখণ্ড। এ অখণ্ডতা বঙ্গবন্ধুর যোগাযোগের মূল রসায়ন। এ সমগ্রতা থেকে উৎসারিত মুক্তির বার্তা। বঙ্গবন্ধুর ভাষা খুব স্পষ্ট। বুলেটের মতো তীব্র ও তীক্ষ্ন।

কেবল তাই নয়, তিনি ঐতিহাসিক ঘটনার সঙ্গে সময়ের সন্ধি নিপুণ দক্ষতায় বেঁধেছেন। সময় পরিপ্রেক্ষিতে ক্লিক করেছেন, জ্বলে উঠেছেন। আর জাতিকে উপহার দিয়েছেন বাংলাদেশ নামের লাল-সবুজের এক বর্ণিল ছবি। ৭ মার্চ ১৯৭১ যা ধ্বনিত হয়েছে প্রতিটি বাঙালি মননে।

তার যোগাযোগের কেন্দ্রীয় বিষয়-কল্যাণ ও অধিকারবোধ, সংগ্রামী চেতনা, স্বাধীন-সার্বভৌম দেশ গঠন এবং সমৃদ্ধতায় ভরে দেয়া (সোনার বাংলা)। চূড়ান্তভাবে, জনগণের অর্থনৈতিক-সামাজিক ও রাজনৈতিক মুক্তি। তার পদচারণা সাজানো সিঁড়ির মতো।

মানব সভ্যতার ইতিহাসে মানুষই সবসময় যোগাযোগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। বঙ্গবন্ধুর নিজেই মাধ্যম, নিজেই বার্তা। ব্যক্তিগত, দ্বিত্বয়, ও গণযোগাযোগে বঙ্গবন্ধুর নৈপুণ্য ইতিহাস-উত্তীর্ণ। বঙ্গবন্ধুকে যোগাযোগের পরিপ্রেক্ষিত থেকে দেখলে তিনি বহুমাত্রিক যোগাযোগের আধার বেঙ্গল পলিটিক্যাল কমিউনিকেশনে এক শীর্ষ ব্যক্তিত্ব। অধ্যাপক রেহমান সোবহান যাঁকে বলেছেন ‘আকাশী মানুষ’ অর্থাৎ আকাশের সমান উঁচু। পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন গবেষণায় বঙ্গবন্ধু এক অনন্য যোগাযোগ মডেল।

লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও সমাজ বিশ্লেষক

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন

শ্রমিকের জীবন কি এতই ঠুনকো

শ্রমিকের জীবন কি এতই ঠুনকো

এমনিতেই করোনাকালে সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার ওপর বিদেশফেরত বেকার শ্রমিকরা চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের নিয়ে না ভাবলে আগামীতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশফেরত শ্রমিকদের তিনি কর্মসংস্থান ও নগদ সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহৎ ও সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চয়ই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য সুসংবাদ।

যাদের শ্রম-ঘাম-রক্তে বড় অর্থনীতির ভিত রচিত হয়, বদলে গিয়ে ভাবমূর্তি বেড়ে যায় দেশের, সেই শ্রমিকদেরই কোনো দাম নেই যেন আমাদের কাছে। জলের দামেই বিক্রি হয় তাদের শ্রম-ঘাম-জীবন। নিয়োগকারী মালিকদের অবহেলা কিংবা দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু হলে পশুর দামের চেয়েও কম ধরা হয় তাদের লাশের দাম। অথচ যারা দেশকে লুটেপুটে খাওয়ার উৎসব করে দাম তাদেরই বেশি। দামি তারাই যারা ব্যাংক লুট করে ঋণখেলাপি হন, শেয়ারবাজার কেলেংকারিতে জড়িত থেকেও অর্থনীতির নায়ক হয়ে ওঠেন, দেশের অর্থপাচার করে বিদেশে সুরম্য বাড়ি বানান।

তারাই সম্মানিত যারা ক্ষমতার জোরে খুন-ধর্ষণ করে পার পেয়ে যান, সুইসব্যাংকে অর্থের পাহাড় গড়েন। এসব ‘দামি’ লোকদেরই সর্বত্র ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশে শোষিত-নিপীড়িতদেরই দাম পাওয়ার কথা ছিল। তাদেরই স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল জাতির অগ্রনায়ক, উন্নয়নের কারিগর হিসেবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সস্তা শ্রমের বাংলাদেশে শ্রমিকদের শ্রম-ঘাম শোষণ করেই যে আমরা উন্নয়নশীল থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি এটা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তৈরি পোশাকখাত, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং কৃষিখাতের শ্রমিকদের শ্রমের ওপর ভর করেই যে দেশে আজ প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু সম্পদের স্ফীতি- সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাদের শ্রম শোষণ করেই গড়ে উঠছে আমাদের এই চোখ ধাঁধানো নগরগুলো। অথচ সেই শ্রমিকদেরই জীবনই সুতোয় বাঁধা, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি তাদের নেই। জীবন যেন তাদের জল নিংড়ে নেয়া কাপড়ের মতোই।

অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন শ্রমিকরাই। সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হতে হয়েছে প্রান্তিক মানুষদের। ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অবৈধপথে রাতারাতি ভাগ্য বদলে ফেলেছেন দেশের সবচেয়ে লোভী ও স্বার্থপররা। হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া লোকের সংখ্যাও বেড়েছে হু হু করে। শহরে শহরে তৈরি হয়েছে বিশাল চোখ ঝলসানো অট্টালিকাও।

গেল প্রায় দেড় দশকেই দেশে বিস্ময়করভাবে জন্ম হয়েছে অর্ধসহস্রাধিক নতুন ধনকুবের। শ্রমিকের শ্রম-ঘামে তিলোত্তমা হিসেবে গড়ে ওঠা শহরগুলোতে ভোগের উপচেপড়া পেয়ালায় চুমুক দিয়ে যাচ্ছেন নব্যধনীরা। অথচ গেল পঞ্চাশ বছরেও ভাগ্যের বদল হয়নি উন্নয়নের কারিগরদের। কেননা, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তাদের শ্রম-ঘামের অর্থ লুটে-পুটে খাচ্ছেন নব্যধনী, শিল্পপতি, ঋণখেলাপি, বেপরোয়া আমলা থেকে পাতি নেতা পর্যন্ত। শ্রমিকদের ভাগ্য যেন বানরের সেই পিঠা ভাগের গল্পের মতোই রয়ে গেল।

বাজারে প্রতিনিয়ত চাল-ডাল-নুন-তেলের দাম বাড়লেও শ্রমিকের শ্রমের দামের পারদ কিছুতেই ঊর্ধ্বমুখী হয় না। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জলের দামের শ্রমেই কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে দেশে, হু হু করে বাড়ে প্রবৃদ্ধি। প্রতিবছর বাজেটের আকারও দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়ে। অথচ শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই শিল্পপতি কিংবা সরকারের। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়া শ্রমিকদের জায়গা সমাজের সবচেয়ে পেছনের সারিতে। তাদের শ্রম-ঘামের উৎকট গন্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকেন শিল্পপতিরা। পথে-ঘাটে যেতে আসতে যে কেউ-ই যেন অধিকার রাখেন নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ করার! ভবঘুরে কিংবা বখাটেদের নিত্যদিনের হয়রানি, যৌননিপীড়নের শিকার হতে হয় তাদের। আবার বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ে পথে নামলেই পুলিশের লাঠিপেটা নির্ধারণ করা থাকে তাদের জন্য। তারা যে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জ্বালানি সে কথা আমাদের আচরণে প্রকাশই পায় না।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পরিবার বা স্বজনরা ঠিকঠাকমতো সরকারঘোষিত সহায়তা পেয়েছে কি না, দায়ীদের বিরুদ্ধে আর কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সর্বস্ব হারানোদের পরিণতি কী- এসব নিয়ে আমাদের আর ভাববার সময় নেই। শ্রমিকরাও দেয়ালে কপাল ঠুকে মালিকদের অবহেলাকে ভাগ্য বলেই মেনে নেয়। গণমাধ্যমও নতুন কোনো খবর কিংবা ঘটনার টানে দৃষ্টিরাখে অন্যখানে। গেল দশ বছরে তাজরিন, রানাপ্লাজা, নিমতলী ট্রাজেডিতে যে সংখ্যক শ্রমিক লাশে পরিণত হয়েছে তার দ্বিগুণ হয়েছে গেল এক বছরে চুড়িহাট্টা, এফআর টাওয়ার, কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানা আর গাজীপুরের ফ্যানের কারখানার অগ্নিকাণ্ডে। শ্রমিকদের জীবনের দাম দিতে জানলে এই পরিসংখ্যান পেতে হতো না আমাদের। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে কারখানায় মালিকদের গিনিপিগে পরিণত হয়েছে শ্রমিকরা। এসব অবহেলা, উদাসীনতা, অপরাধ আর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলতে শ্রমিকরা রাস্তায় নামলেই পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আবারও গিনিপিগ হিসেবে ঠাঁই তাদের সেই কারাখানাতেই।

এভাবেই শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে রেখে বছর বছর কারখানার উন্নতি হয়, শাখা বাড়ে, উৎপাদন বাড়ে, রপ্তানি বাড়ে, মালিকদের বিলাসিতা বাড়ে, প্রবৃদ্ধি বাড়ে, সরকারের ভাবমূর্তি বাড়ে। শুধুই আটকে থাকে শ্রমিকের শ্রমের দাম। হাড়ভাঙা খাটুনিতে ভেঙে যায় শরীর, শিকার হতে হয় অপুষ্টির। এক পর্যায়ে দক্ষতাও কমতে থাকে। শেষ অবধি অদক্ষ হিসেবে চাকরিচ্যুতিও ঘটে। এটাই আমাদের জাতির কারিগর শ্রমিকদের জীবনের প্রকৃতচিত্র।

যে চিত্র মধ্যযুগকেও হার মানায়। যা দেখে আঁতকে ওঠেন বিদেশি ক্রেতারা। মজুরি বাড়ানোসহ কর্মপরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়ে যান তারা। মালিকরা ‘জি জি’ বলে রপ্তানি আদেশ বাড়িয়ে নেন। ক্রেতাদের চাপ বা অনুরোধে কারখানার কর্মপরিবেশের দৃশ্যমান কিছু উন্নতি হলেও শ্রমিকদের মজুরি আর বাড়ে না, পাল্টায় না জীবনমান, বাড়ে না জীবনের দাম। সরকারও ব্যস্ত থাকে প্রবৃদ্ধি নিয়ে।

বিভিন্ন কলকারাখানায় নিয়োজিত স্থায়ী শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকেদের পাশাপাশি দিনমজুর বা মৌসুমী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজ পেলে খাওয়া, না পেলে উপোস- এমন নীতিতেই চলে তাদের জীবন। করোনা বিপর্যয়ে এসব শ্রমিকের জীবন অনিশ্চিত অন্ধকারে ঢেকে গেছে। মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। অনেকেই জীবিকার সন্ধানে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পথে নেমে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

অস্থায়ী শ্রমভিত্তিক এসব শ্রমিকের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানই নেই সরকারের কাছে। তথ্যভাণ্ডারের অভাবেই সরকারি সহায়তাও পৌঁছাচ্ছে না অনেকের কাছে। বেওয়ারিশ লাশের মতোই এদের জীবন হয়ে পড়েছে। একইভাবে বলা যায়, পোশাক খাতের মালিকরা সরকারি সহায়তা পেয়ে যেভাবে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিচ্ছেন শ্রমিকরা কি সেই সুফল পাচ্ছেন? এটা ভাবা জরুরি।

অপরদিকে, করোনা মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও দফায় দফায় প্রবাসী আয়ের রেকর্ডের বন্যা বইয়ে দেয়া প্রবাসী শ্রমিকদেরও দাম নেই আমাদের কাছে। টাকা বানানোর মেশিন ছাড়া তাদের আর কিছুই ভাবতে পারি না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা বছরের পর বছর বিস্ময়কর রেমিট্যান্সের জোগান দেন। অথচ সমাজে তো বটেই জাতীয় জীবনেও তারা অবহেলার শিকার। ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার সময়ই তাদের অনেকে দালাল কিংবা আদম ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারায়। বিমানবন্দরে নাজেহাল হওয়াসহ বিদেশে গিয়েও প্রতারণার শিকার হতে হয়। করোনাকালে দেশে ফিরে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখার সময়ে অপ্রীতিকর এক ঘটনার সময় রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের প্রতিক্রিয়া তাদের প্রতি সীমাহীন অবহেলারই প্রমাণ।

তথ্যমতে, করোনা মহামারি দুর্যোগে বিদেশে কাজ হারিয়ে দেড় বছরে দেশে ফিরেছেন পাঁচ লাখের বেশি শ্রমিক। বিদেশে সঞ্চিত সব সম্বল নিয়েই তারা ফিরে এসেছেন। এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স-প্রবাহ ফুলে ফেঁপে বার বার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তবে তারা কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে কী করছেন, সঞ্চয় শেষে তারা কীভাবে চলবেন, পরিবারকে কীভাবে সামাল দেবেন তা নিয়ে আমাদের কারো মাথাব্যথা নেই। এমনিতেই করোনাকালে সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার ওপর বিদেশফেরত বেকার শ্রমিকরা চাপ বাড়াচ্ছে।

তাদের নিয়ে না ভাবলে আগামীতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশফেরত শ্রমিকদের তিনি কর্মসংস্থান ও নগদ সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহৎ ও সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চয়ই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য সুসংবাদ। তবে কথা হলো, শ্রমিক বা অসহায়দের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যার মন যেভাবে কাঁদে সেভাবে কি আমলা ও নেতাদের মন সাড়া দেয়? যদি শ্রমিকদের সহায়তা মাঝপথেই নাই হয়ে যায়! যেমনটি ঘটেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেলায়!

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
কিশোর অপরাধ: আইন ও প্রতিকার
প্রতিক্রিয়াশীলতার দীর্ঘ ছায়ার নিচে
আউয়াল-পাপুলের দায় ও অধঃপতিত রাজনীতি
জিয়া হত্যার বিচারে পরিবার ও বিএনপি নীরব কেন
সাংবাদিকতার লাভ-ক্ষতি!

শেয়ার করুন