গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?

গতির উন্মাদনায় কত প্রাণ ঝরবে?

বেশ কিছুদিন ধরেই ঢাকা শহর ও শহরতলিতে এমনকি গ্রাম মফস্বলেও এক শ্রেণির বাইকের আমদানি হয়েছে যার আরোহীরা হেলমেট সিগন্যাল আইনকানুন পুলিশ—কিছুরই তোয়াক্কা করে না। বিদ্যুৎগতিতে বাইক চালিয়ে দিনরাত শহর তোলপাড় করেই তাদের আনন্দ। দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা ঘটছে, মৃত্যুর পর মৃত্যু— কিন্তু এই বিদ্যুৎগতির বাইকের উৎপাত কমছে না! শুধু বাইকই নয়, সব যানই এখন দুরন্ত গতিতে ছুটে চলতে চায়। যেন উলকার গতিতে ছুটে চলাটাই জীবন, মৃত্যু কোনো ব্যাপারই নয়!

বাংলাদেশের সড়কগুলো এখন ভয়ংকর মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিনই ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনা। ‘একটি দুর্ঘটনা মানে সারা জীবনের কান্না’— এটা স্লোগান হিসেবে জনপ্রিয় হলেও এর মর্মবাণী কেউ উপলব্ধি করেছে বলে মনে হয় না। তা না হলে সবাই কেন যানবাহন নিয়ে তীব্র গতিতে ছুটে চলে?

সড়কগুলোতে প্রতিনিয়ত বিচিত্রসব যানের মধ্যে যেন গতির প্রতিযোগিতা চলে। কে কার আগে যেতে পারবে, কে কত দ্রুত পৌঁছতে পারবে। কীসের এত তাড়া? তাড়া না তাড়না? একের পর এক ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, তরতাজা প্রাণগুলো অকালে মর্মান্তিকভাবে ঝরে যাচ্ছে, কত বাবা-মা স্বজন-প্রিয়জনের কত স্বপ্ন কত আশা-আকাঙ্ক্ষা চুরমার হয়ে যাচ্ছে— তবু হুঁশ হচ্ছে না কারো!

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে এত প্রচার এত সভা সেমিনার অনুষ্ঠান রোড শো- পইপই করে এত বোঝানো এত টাকাপয়সা খরচ—সব বৃথা! কেউ শুনবে না বুঝবে না। রাস্তায় চলতে ফিরতে নিজেদের নিরাপত্তার কথাটাও ভাববে না মানুষ! লোকে বলে, প্রাণের মায়া নাকি সবচেয়ে বড় মায়া। এখন তো দেখে শুনে মনে হচ্ছে—প্রাণের মায়াটাও বোধহয় আর আগের মতো নেই।

এখন প্রাণের মায়া ছাপিয়ে উঠছে এক ধরনের তাড়না, উন্মাদনা। আর তার মোহে পড়ে প্রাণের মায়া জীবনের মূল্য সব তুচ্ছ হয়ে যাচ্ছে। বড় হয়ে উঠছে ঝড়ের বেগে উড়ে চলার সাময়িক রোমাঞ্চ, গতির উন্মাদনা। আর এই উন্মাদনার আনন্দ অনেক ক্ষেত্রেই শেষ হচ্ছে বুকফাটা বিলাপে। কিন্তু, তাতেও পরিস্থিতি বদলাচ্ছে কই? উদ্দাম গতির উত্তেজনা উপভোগ করতে গিয়ে মৃত্যুর ফাঁদে পড়ে একের পর এক জীবন তো হারিয়েই চলেছে।

করোনা মহামারির মতো সড়ক দুর্ঘটনা যেন মহামারির রূপ নিয়েছে। করোনা সংক্রমণ রোধে সরকার ঘোষিত লকডাউনের মধ্যেও থেমে নেই সড়ক দুর্ঘটনা। বিদায়ী মাস এপ্রিলের প্রায় পুরোটাই ছিল লকডাউনে।

এই এক মাসেও ৪৩২টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৬৮ নিহত ও ৫০৭ জন আহত হয়েছে। এ মাসেও প্রতিদিন সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্বব্যাংক, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বুয়েটের অ্যাকসিডেন্ট রিসার্স ইনস্টিটিউট প্রভৃতি সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে বছরে কমপক্ষে ১০-১২ হাজার মানুষ শুধু সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়।

এ তথ্য পিলে চমকে দেয়ার মতো। কারণ করোনা মহামারিতে আমাদের দেশে গত এক বছর দুই মাসে ১২ হাজার মানুষ মারা গেছে। যা সড়ক দুর্ঘটনায় প্রতি বছরই মারা যায়! অথচ এটা নিয়ে আমাদের প্রশাসন বা চালকদের তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।

বিভিন্ন পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, বিশ্বে সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে বাংলাদেশে। অথচ বাংলাদেশের মানুষ বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় সবচেয়ে কম গাড়ি ব্যবহার করে। সবচেয়ে কম গাড়ি ব্যবহার করেও সর্বাধিক মানুষ মারা যাচ্ছে সড়ক দুর্ঘটনায়। তারপরও আমাদের কোনো হুঁশ নেই।

এই ঢাকা নগরের জনাকীর্ণ রাজপথে প্রতিনিয়ত কত মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে, হাতপা খোয়াচ্ছে, তা নিয়ে কি খুব বেশি ভাবি আমরা? এ যেন ডালভাত। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই ঢাকার দুই কলেজশিক্ষার্থী সড়কে বাস চাপায় প্রাণ হারানোর পর শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে নিরাপদ সড়কের দাবিতে নজিরবিহীন আন্দোলন গড়ে ওঠে।

এর আগে রাজীব নামে এক কলেজছাত্র দুই বাসের রেষারেষিতে হাত হারালে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। এমন দু-একটা ঘটনা কদাচিৎ আলোড়ন তোলে, তারপর তা হারিয়ে যায় অন্য কোনো ইস্যুর অতলে। আমরা দেখি, বুঝি, উপলব্ধি করি, তারপর মুখ ঘুরিয়ে ফেলি। সামনে কত ঘটনা, কত সমস্যা, একটা নিয়ে পড়ে কে থাকে?

বিভিন্ন সংস্থা কিংবা ব্যক্তিপর্যায় থেকে বহুবার সড়ক দুর্ঘটনার কারণ, প্রতিকারের উপায় নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার পরও এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ পরিলক্ষিত হয়নি। যান চালকদের বিরুদ্ধে একটু কড়াকড়ি করলেই সব কিছু অচল করে দেয়া হয়।

সরকারও নতজানু আজ পরিবহন-সন্ত্রাসীদের কাছে! নিয়ম-নীতি-আইন-সব তুচ্ছ। স্বেচ্ছাচারিতা, হাত-পা-শরীর ক্ষতবিক্ষত হওয়া আর মৃত্যুই যেন শেষ কথা! এটাই কি আমাদের একমাত্র ভবিতব্য? কোথায় নিদান? কোথায় এই দুর্ঘটনা ঠেকানোর উদ্যোগ?

১৯৮৯ সালে দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু মতিঝিলের আনন্দ ভবন কমিউনিটি সেন্টারের সামনে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। ১৯৯১ সালে তার স্ত্রী রওশন আরা আর্থিক ক্ষতিপূরণ চেয়ে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের বিরুদ্ধে মামলা করেন।

২৫ বছর পর ২০১৪ সালের ২০ জুলাই সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর পরিবারকে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নিম্ন আদালতের রায় বহাল রেখে রায় দেন আপিল বিভাগ। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কাউকে ক্ষতিপূরণ দিয়ে রায় ঘোষণা দেশে এটিই প্রথম। ভাবা হয়েছিল, আদালতের এই রায়ের পর পরিস্থিতি বদলাবে। সরকার উদ্যোগী হবে। চালকরা সতর্ক হবে! কিন্তু কোথায় কী?

আইনকেও এখন ঠুঁটোজগন্নাথ বানিয়ে রাখা হয়েছে। আর তা ছাড়া সবাই তো আর মামলা লড়ে না, ক্ষতিপূরণও পায় না। ক্ষতিপূরণ পেলেইবা কী? টাকা-পয়সা দিয়ে কি জীবনের ক্ষতিপূরণ হয়?

প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বেপরোয়া গতির মাশুল গুনতে হচ্ছে সাধারণ মানুষজনকে। নিরাপত্তার প্রাথমিক শর্তগুলো উপেক্ষা করাতেও কত যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে তা বলে শেষ করা যাবে না। বেশ কিছুদিন ধরেই ঢাকা শহর ও শহরতলিতে এমনকি গ্রাম মফস্বলেও এক শ্রেণির বাইকের আমদানি হয়েছে যার আরোহীরা হেলমেট সিগন্যাল আইনকানুন পুলিশ—কিছুরই তোয়াক্কা করে না।

বিদ্যুৎগতিতে বাইক চালিয়ে দিনরাত শহর তোলপাড় করেই তাদের আনন্দ। দুর্ঘটনার পর দুর্ঘটনা ঘটছে, মৃত্যুর পর মৃত্যু— কিন্তু এই বিদ্যুৎগতির বাইকের উৎপাত কমছে না! শুধু বাইকই নয়, সব যানই এখন দুরন্ত গতিতে ছুটে চলতে চায়। যেন উলকার গতিতে ছুটে চলাটাই জীবন, মৃত্যু কোনো ব্যাপারই নয়!

সেই ছোটবেলায় পড়েছিলাম, গতিই জীবন স্থিতিই মৃত্যু। তাই চরৈবেতি চরৈবেতি। সেই মন্ত্রেই যেন দীক্ষা নিয়েছে আজকের সব বয়সের সব শ্রেণি-পেশার নারীপুরুষ! উদ্দাম উল্লাসময় গতির দীক্ষা! অবশ্যই সকলে নয় কিন্তু অনেকেই। তবে, চরৈবেতি মানে তো আজ কেবল এগিয়ে চলা নয়, সবাইকে টপকে, সব রেকর্ড তছনছ করে জীবন বাজি রেখে প্রাণের মায়া তুচ্ছ করে ছুটে চলা! আর সেই গতির আনন্দে মাতোয়ারা নেশায় বুঁদ জীবনগুলো তাৎক্ষণিক আবেগের আতিশয্যে রটেকগতির উন্মাদনায় ভুলেই যাচ্ছে—বাইকের চাকা দুটোকে অভিজ্ঞজনেরা কেন বলেন ‘শয়তানের চাকা’, কেন রাস্তায় গাড়ি চালাতে এত বিধিনিষেধ আরোপ করে রেখেছে সরকার।

আসলে, সব যেন কেমন বেপরোয়া, বেহিসেবি, লাউড হয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। সে রাজনীতিই হোক কি জীবনযাপন—সর্বত্র সবসময় একটা যেন হইহই-চইচই হুল্লোড়-হুড়োহুড়ির প্রবণতা। আর কী আশ্চর্য, এই প্রবণতার এমন সব নির্মম নিষ্ঠুর পরিণতি দেখেও বেখেয়াল জনতা। বেখেয়াল কর্তৃপক্ষ! দেখেশুনে মনে হয়, ভাবনচিন্তার কোনো অবসরই যেন আর অবশিষ্ট নেই আমাদের জীবনে!

কিন্তু, গতির উন্মাদনায় এভাবে আর কত প্রাণ খোয়াব আমরা? কত মানুষের, কত প্রতিভার এমন অপমৃত্যু দেখব? আইন আছে, পুলিশ আছে। তা সত্ত্বেও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে যেন সব কেমন ঢিলেঢালা, অগোছালো! একটা দুর্ঘটনা ঘটলে কিছুদিন একটু কড়াকড়ি, তারপর যে-কে-সেই।

বিশ্বব্যাপী সড়ক দুর্ঘটনার বিষয়টি নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা ও পরিসংখ্যানের আলোকে গতিকেই সড়ক দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বড় বড় শহর এবং পথচারীবহুল এলাকাগুলোয় যানবাহনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার করার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ।

২০২০ সালে এ সংক্রান্ত স্টকহোম ঘোষণায় বিশ্বব্যাপী যেসব সড়কে লোক সমাগম বেশি হয়, যেখানে পথচারী ও যানবাহন একইসঙ্গে চলাচল করে এমন সড়কে পথচারীদের ঝুঁকির কথা বিবেচনায় রেখে গতিসীমা সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটার বাধ্যতামূলক করেছে। আমাদের দেশে এখন এটা প্রতিটি শহর ও শহরতলিসহ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বাধ্যতামূলক করার সময় এসেছে।

কারণ মানুষের নিরাপত্তা সবার আগে। সড়ককে অবশ্যই পরিণত করতে হবে মানুষের নিরাপদ চলাচলের জন্য, জীবনের জন্য, প্রাণ রক্ষার জন্য। তা না হয়ে গতির উন্মাদনায় যদি আমরা সড়কে প্রাণকেই প্রতিনিয়ত বিসর্জন দিতে বাধ্য হই, তাহলে আর কীসের রাষ্ট্র, কীসের আইন, কীসের সড়ক?

লেখক: প্রবন্ধকার, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

মন্তব্য

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

আমার জীবনে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ

বঙ্গবন্ধু ছোটকে বড় করতেন। থানার নেতাকে জেলার নেতা, জেলার নেতাকে জাতীয় নেতা করে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ হয়েছেন। কোনো এলাকায় সফর করলে সেখানকার নেতাকে বড় করে তুলে ধরতেন। ছোটকে বড় করে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টায় তার মহত্ত্ব বোঝা যায়। এটাই বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আজ দেশের মানুষ আমাকে চেনে, সম্মান করে। এর কোনোটাই আমি পেতাম না, যদি আওয়ামী লীগের সদস্য না হতাম। অর্থাৎ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগে যোগদান করে জেলে বসে আমি সাংগঠনিক সম্পাদক হয়ে ১৪ বছর দায়িত্ব পালন করেছি, ১৮ বছর প্রেসিডিয়াম মেম্বার, মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ- এর সবই আমার জীবনের অর্জন। আমি গ্রামের সাধারণ পরিবারের ছেলে। একজন নেতা অন্যকে নেতা করে বড় করতে পারেন, এটাই আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে শিখেছি।

মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বপ্রদানকারী দল আওয়ামী লীগের ৭২তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শামসুল হক ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবসহ আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠাতাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে রোজ গার্ডেনে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা দলের আত্মপ্রকাশের দিন হিসেবে ইতিহাস থেকে ২৩ জুন তারিখটি বেছে নেন। কারণ ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার লাল সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন, ‘এই পাকিস্তান বাঙালীদের জন্য হয়নি। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্তা বাঙালীদেরই হতে হবে।’ প্রতিষ্ঠার পর মহান ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহত্তর মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদানের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে ‘আওয়ামী লীগ’, ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘বাংলাদেশ’ গভীরভাবে সম্পর্কযুক্ত ও সমার্থক হয়েছে।

আমার জীবনে আওয়ামী লীগের প্রতি আকর্ষণ ছাত্রজীবন থেকে। ’৫৭ সালে বঙ্গবন্ধুকে প্রথম দেখি। একটি উপনির্বাচন উপলক্ষে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে তিনি ভোলায় গিয়েছিলেন। লক্ষাধিক লোকের বিশাল জনসভায় তার সুন্দর বক্তৃতায় মুগ্ধ হয়ে ভাবি যদি কোনোদিন রাজনীতি করি তবে এই মহান নেতার আদর্শের রাজনীতি করব। আমার ভাবনা সফল হয়েছে।

’৬০ সাল থেকে ছাত্রলীগ করি। ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে আমার ডিপার্টমেন্ট সোয়্যাল সায়েন্সের ভিপি, যে হলে থাকি সেই ইকবাল হলের (বর্তমান শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হল) নির্বাচিত ভিপি, তারপর ডাকসু’র ভিপি এবং সর্বদলীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হিসেবে ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণ করি। বঙ্গবন্ধু আমাকে খুব স্নেহ করতেন।

ইকবাল হল ইলেকশনে আমি ভিপি প্রার্থী। বঙ্গবন্ধু তখনও গ্রেপ্তার হননি। ইলেকশনের খরচ হিসেবে বঙ্গবন্ধু আমাকে ২০০ টাকা দিয়ে বললেন, ‘জিতবি তো।’ বললাম, আপনি দোয়া করলে জিততে পারব। এই ২০০ টাকা দিয়ে আমরা নিজহাতে পোস্টার লিখে প্রচার করেছি এবং দীর্ঘদিন পর ইকবাল হলে পূর্ণ প্যানেলে জয়লাভ করে ভিপি নির্বাচিত হয়েছি। হলের ভিপি থাকাকালে ৬ দফা আন্দোলন করি। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করার পর ৭ জুন আমরা সর্বাত্মক হরতাল পালন করি। বঙ্গবন্ধু কারাগারে বন্দি। সফল হরতাল ও সংগ্রামের সাফল্যে কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে জুন মাসের ৫, ৬, ৭, ৮ তারিখে নিজের অনুভূতি তিনি বিস্তারিত লিখেছেন।

ছাত্রলীগ করেছি বলেই আমি ডাকসু’র ভিপি হয়েছি। ডাকসুর ভিপি হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুর চিঠি পেয়েছি। জেলখানা থেকে চিঠিতে লিখেছেন, ‘ স্নেহের তোফায়েল, আমার দোয়া ও আদর নিস। আজ তুই ডাকসুর ভিপি হয়েছিস আমি ভীষণ খুশী। আমি মনে করি এবারের এই ডাকসু বাংলার গণমানুষের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিবে এবং সেই নেতৃত্বের পুরোভাগে থাকবি তুই। ইতি, -মুজিব ভাই।’ স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে ’৬৯-এর অগ্নিঝরা দিনগুলোর কথা।

৪ জানুয়ারি ৬ দফাকে অন্তর্ভুক্ত করে আমরা ১১ দফা প্রণয়ন করি। ১৭ জানুয়ারি আন্দোলন শুরু করি এবং ১৮ ও ১৯ তারিখ তা তীব্রতর হয় এবং ২০ তারিখ আসাদ গুলিবিদ্ধ হলে আমার এবং ছাত্রলীগের সেক্রেটারি খালেদ মোহাম্মদ আলীর হাতের ওপর আসাদ শহীদ হন। আমরা যখন মেডিক্যাল কলেজে আসাদকে নিয়ে যাই, তখন একজন শহীদের নিঃশ্বাস নিজের কানে শুনতে পাই। আসাদের লাশ শহীদ মিনারে রেখে শপথ নেই ‘এই রক্ত বৃথা যেতে দেবো না।’ সেই রক্ত আমরা বৃথা যেতে দেইনি। সেই রক্তের সিঁড়ি বেয়ে ২৪ তারিখ গণ-অভ্যুত্থান হয়। শহিদ হন মতিউর, মকবুল, রুস্তম, আলমগীর। দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে। পল্টন ময়দানে লাখ লাখ লোকের সামনে ৯ ফেব্রুয়ারির শপথ দিবসে স্লোগান তুলেছিলাম, ‘শপথ নিলাম শপথ নিলাম মুজিব তোমায় মুক্ত করবো, শপথ নিলাম শপথ নিলাম মা-গো তোমায় মুক্ত করবো।’

’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু মুক্তি লাভ করেন এবং ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলা মাকে হানাদার মুক্ত করে স্লোগানের ২য় অংশ বাস্তবায়িত হয়েছে। ২৩ ফেব্রুয়ারি বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কারামুক্ত নেতার গণসংবর্ধনা সভার সভাপতি হিসেবে বলেছিলাম, যে নেতা তার জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে। সেই প্রিয় নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করলাম। ১০ রাখ লোক ২০ লাখ হাত তুলে সমর্থন করল। তখন ঘোষণা করি এবার বক্তৃতা করবেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান’।

আমার জীবনে ২৩ ফেব্রুয়ারি এক ঐতিহাসিক দিন। এদিন থেকেই বঙ্গবন্ধু আমাকে কাছে রাখেন, আদর করেন। সকালে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে যেতাম। তিনি যেখানে যেতেন সেখানে যেতাম। যেখানে আমার উপস্থিত থাকার কথা না, সেখানে আমি উপস্থিত থাকিনি দূরে বসেছি। বঙ্গবন্ধু জাতীয় নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। জীবনে কখনও ভাবিনি ২৬ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন পাব! বঙ্গবন্ধু একদিন কাছে ডেকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, ‘তুই ভোলা যা, জনসভা কর। আমি তোকে ভোলাতে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন দেবো।’

’৭০-এর ১৭ এপ্রিল বিভিন্ন জায়গায় সভা করে বাবার সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছি। আমার বাবা অসুস্থ ছিলেন। যখন বললাম, বাবা, বঙ্গবন্ধু আমাকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে মনোনয়ন দেবেন। বাবা প্রথমে অবাক হলেন, তারপর বুকে টেনে প্রাণভরে দোয়া করলেন। এরপর দলের নির্বাচনি প্রচারাভিযানের জন্য আমাকে চট্টগ্রামে মীরেরশ্বরাইয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। লক্ষাধিক লোকের বিশাল জনসভা। সেদিন ২৫ এপ্রিল, খবর পাই আমার বাবা আর নেই।

বঙ্গবন্ধু চট্টগ্রামের শীর্ষ নেতা আজিজ ভাইকে ফোন করে জানান, ‘তোফায়েলের বাবা আর নাই। তোফায়েল যেন আজই গ্রামের বাড়ি চলে যায়।’ তখন আক্তারুজ্জামান চৌধুরীর ছোট ভাই- যিনি মুক্তিযুদ্ধে শহিদ হয়েছেন-তার গাড়িতে করে চাঁদপুর পৌঁছে দেন। সেখান থেকে ২৬ এপ্রিল ভোলা পৌঁছাই। বাবার কবর আগেই দেয়া হয়ে গেছে।

তারপর ’৭০-এর নির্বাচনের আগে যখন ১২ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাস হলো বঙ্গবন্ধু ছুটে গেলেন। আমকে আদর করলেন, বুকে জড়িয়ে চুমু খেলেন। কারণ আর্তের সেবায় আমার কার্যকলাপে তিনি সন্তুষ্ট হন। রাস্তায় লাশ, নদীতে লাশ ভাসছে। বললেন, ‘আমি আর থাকতে পারবো না। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। আমাকে তাড়াতাড়ি ঢাকা পাঠিয়ে দাও।’ ঢাকা ফিরে হোটেল শাহবাগে দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা বাঙ্গালীরা ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসে অর্ধাহারে-অনাহারে মৃত্যুবরণ করি। এটা আর চলতে দিবো না।’ সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেছিল, ‘ডু ইউ মিনস ইন্ডিপেনডেন্স?’ উত্তর দিয়েছিলেন, ‘নট ইয়েট।’ ঘূর্ণিঝড়ের পর তিনি সারা বাংলাদেশ সফর করেন। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আমার নির্বাচন স্থগিত হলে আমাকে সফরসঙ্গী করেন। প্রতিটি জনসভায় বঙ্গবন্ধুর আগে বক্তৃতা করতাম।

বঙ্গবন্ধু সংক্ষিপ্ত বক্তৃতায় বলতেন, ‘ভাইয়েরা আমার, আমি যদি আপনাদের জন্য আমার জীবনের যৌবন পাকিস্তানের কারাগারে কাটাতে পারি। আমি যদি বারবার আপনাদের জন্য ফাঁসির মঞ্চে যেতে পারি। আমি কি আপনাদের কাছে একটা ভোট চাইতে পারি না!’ মানুষ দুই হাত উত্তোলন করে বলতেন, ‘হ্যাঁ, আপনি চাইতে পারেন।’ তখন বঙ্গবন্ধু স্লোগান দিতেন ‘জয় বাংলা’! বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে লাখ লাখ মানুষ স্লোগান দিত ‘জয় বাংলা’!

ঘূর্ণিঝড়-জলোচ্ছ্বাসের পরে এবং ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের পরে আমরা যে অসহায়, বিচ্ছিন্ন এবং অনিরাপদ ছিলাম- এসব কথা বলে বঙ্গবন্ধু বাংলার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করেন। নির্বাচনের দিন বঙ্গবন্ধু ভোট প্রদান করে পুরানা পল্টনে আওয়ামী লীগ অফিসে এলে সাংবাদিকরা জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘আপনি কতটি আসন পাবেন?’

বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি অবাক হবো যদি দুটি আসনে হেরে যাই।’ ঠিক দুটি আসনেই আমরা হেরেছিলাম। একটি নুরুল আমীন আরেকটি রাজা ত্রিদিব রায়। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে থেকে দেখেছি পার্লামেন্টারি পার্টির মিটিং।

যার যেখানে যোগ্য স্থান তাকে সেখানে বসিয়েছেন। যেটা বঙ্গবন্ধুর চিরাচরিত অভ্যাস। যেমন ’৬৬-এর সম্মেলনে তিনি হন দলের প্রেসিডেন্ট, তাজউদ্দীন ভাই সাধারণ সম্পাদক এবং মিজান চৌধুরী সাংগঠনিক সম্পাদক। সেদিন প্রথমে বঙ্গবন্ধু ও পরে তাজউদ্দীন ভাই গ্রেপ্তার হন। এরপর মিজান চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক হন। তিনি গ্রেপ্তার হলে প্রচার সম্পাদক আবদুল মোমীন ভারপ্রাপ্ত হন, পরে তিনিও গ্রেপ্তার হন। বঙ্গবন্ধু এভাবে সাজিয়ে-গুছিয়ে পরিকল্পনা করে আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ’৭০-এর নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। নির্বাচনের আগে বঙ্গবন্ধু বলতেন, ‘এই নির্বাচন ৬ দফার পক্ষে গণভোট।’

’৭১-এর ৩ জানুয়ারি নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ৬ দফা সমুন্নত রাখার শপথ গ্রহণ করান বঙ্গবন্ধু। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রশ্নে ইয়াহিয়া খান তখন নানামুখী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। ১ মার্চ জাতীয় পরিষদের পূর্বঘোষিত ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত করা হলে দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে। লাখ লাখ লোক রাজপথে নেমে আসে। শুরু হয় ১ দফা তথা স্বাধীনতার সংগ্রাম।

’৭১-এর ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক বক্তৃতায় নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করেন। বঙ্গবন্ধুর ডাকে এবং আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে হাতিয়ার তুলে নিয়ে প্রিয় মাতৃভূমির বীর সন্তানেরা মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীন করে।

’৭২-এর ৮ জানুয়ারি যেদিন বঙ্গবন্ধুর মুক্তি সংবাদ পেলাম, সেদিন সারা দেশে আনন্দের বন্যা বয়ে গেল। ১০ জানুয়ারি তিনি স্বজনহারানোর বেদনা নিয়ে স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করলে আমাদের স্বাধীনতা পূর্ণতা পায়। ১২ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্বভার গ্রহণ করে দেশে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং ১৪ জানুয়ারি আমাকে প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় তার রাজনৈতিক সচিব নিয়োগ দেন।

দেশ স্বাধীনের পর শূন্য হাতে যাত্রা শুরু করেন। সবকিছু ধ্বংসপ্রাপ্ত। স্বল্প সময়ে তিনি যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনঃস্থাপন করেন। বঙ্গবন্ধুর একক প্রচেষ্টায় ভারতীয় সেনাবাহিনী ’৭২-এর ১২ মার্চ বাংলাদেশ ত্যাগ করে। ’৭২-এর ৭-৮ এপ্রিল আওয়ামী লীগের কাউন্সিলে বঙ্গবন্ধু পুনরায় সভাপতি ও জিল্লুর রহমান সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। এই সম্মেলনে আমি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সর্বকনিষ্ঠ সদস্য নির্বাচিত হই।

প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর মাত্র ১০ মাসের মধ্যে ’৭২-এর ৪ নভেম্বর বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান প্রণয়ন করেন। ’৭৩-এর ৭ মার্চ জাতীয় সংসদের সফল নির্বাচন সম্পন্ন করে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেন। বাংলাদেশ বিশ্বের ১১৬টি দেশের স্বীকৃতি ও ‘কমনওয়েলথ অব নেশনস্’, ‘জোটনিরপেক্ষ আন্দোলন’, ‘ইসলামিক সম্মেলন সংস্থা’ ও ‘জাতিসংঘ’-সহ বহু আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ লাভ করে। মনে পড়ে, বঙ্গবন্ধুর সফরসঙ্গী হয়ে বিদেশ সফরের দিনগুলোর কথা। প্রতিটি সম্মেলন ও অধিবেশনে বঙ্গবন্ধু ছিলেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

’৭২-এর ৬ ফেব্রুয়ারি প্রতিবেশী ভারতের কলকাতার ব্রিগেড ময়দানে ২০ লক্ষাধিক মানুষের জনসমুদ্রে অসাধারণ বক্তৃতা করেন। ১ মার্চ সোভিয়েত ইউনিয়ন সফর করেন। মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সোভিয়েত ইউনিয়ন আমাদের সার্বিক সমর্থন জুগিয়েছিল। ’৭৩-এর ৩ আগস্ট কানাডার রাজধানী অটোয়াতে ৩২টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানের অংশগ্রহণে কমনওয়েলথ সম্মেলনে আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু।

’৭৩-এর ৯ সেপ্টেম্বর আলজেরিয়ায় অনুষ্ঠিত জোটনিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘বিশ্ব আজ দু’ভাগে বিভক্ত। শোষক আর শোষিত। আমি শোষিতের পক্ষে।’ ’৭৩-এর ৯ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু জাপান সফরে যান। জাপান সফরের মধ্য দিয়ে যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা হয় তা আজও অটুট রয়েছে। ’৭৪-এর ১৮, ১৯ ও ২০ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে দলীয় গঠনতন্ত্রের বিধান অনুযায়ী বঙ্গবন্ধু সভাপতির পদ ত্যাগ করেন, তার স্থানে নির্বাচিত হন জাতীয় নেতা এএইচএম কামারুজ্জামান। ’৭৪-এর ২২ ফেব্রুয়ারি ওআইসি সম্মেলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধুর জন্য সম্মেলন একদিন স্থগিত ছিল। ’৭৪-এর ২৫ সেপ্টেম্বর, জাতিসংঘে মাতৃভাষা বাংলায় বক্তৃতা করে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। এরপর জাতিসংঘের মহাসচিব কুর্ট ওয়াল্ডহেইমের সঙ্গে বৈঠক করেন।

১ অক্টোবর ওয়াশিংটনে হোয়াইট হাউসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরার পথে ৬ দিনের সফরে ’৭৪-এর ৩ অক্টোবর ইরাকের রাজধানী বাগদাদ পৌঁছান। ’৭৫-এর ২৯ এপ্রিল থেকে ৬ মে জ্যামাইকার কিংস্টনে কমনওয়েলথ শীর্ষ সম্মেলনে তার সরব উপস্থিতি সকলকে মুগ্ধ করে।

আজ যে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপিত হয়েছে, তারও ভিত্তি স্থাপিত হয়েছে ’৭৫-এ বেতবুনিয়া ভূ-উপগ্রহ কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ গড়ার জন্য বঙ্গবন্ধু মাত্র সাড়ে তিনবছর সময় পেয়েছেন। যে মুহূর্তে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে স্বাভাবিক করেন, অর্থনৈতিক মুক্তির লক্ষ্যে দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি দেন, ঠিক তখনই ঘাতকের নির্মম বুলেটে একাত্তরের পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। ওই সময় তার দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা প্রবাসে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর আমাকে প্রথমে গৃহবন্দি পরে ময়মনসিংহ তারপর কুষ্টিয়া কারাগারে প্রেরণ করা হয়। স্বৈরশাসনের কালে আমাকে গ্রেপ্তার করে রাখা হয় সিলেট জেলে। আবার গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা জেলে। এরপর আবার গ্রেপ্তার করে রাখা হয় রাজশাহী জেলে। এরপর গ্রেপ্তার করে বরিশাল কারাগারে। পুনরায় গ্রেপ্তার করে প্রথমে কাশিমপুর ও পরে রাখা হয় কুষ্টিয়া কারাগারে। আমাকে সর্বমোট ৭ বার গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বাইরে যারা ছিলেন তারা ব্যাপকভাবে সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন করেছেন। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ৩ বছর পর ’৭৮-এর ১২ এপ্রিল কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করি। বেরুবার পরই হরতাল ও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করি।

যেদিন ’৭০-এর ২ জুন আওয়ামী লীগে যোগদান করি, সেদিন বঙ্গবন্ধু, তাজউদ্দীন ভাইসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। দলে যোগদানের পর বঙ্গবন্ধু আমাকে নিয়ে কিছু কথা বলেছিলেন। সেদিন বঙ্গবন্ধু আমি যা না তার থেকেও বেশি বলে অনেক উচ্চতায় আমাকে তুলে ধরেছিলেন।

বঙ্গবন্ধু ছোটকে বড় করতেন। থানার নেতাকে জেলার নেতা, জেলার নেতাকে জাতীয় নেতা করে তিনি ‘বঙ্গবন্ধু’ ও ‘জাতির পিতা’ হয়েছেন। কোনো এলাকায় সফর করলে সেখানকার নেতাকে বড় করে তুলে ধরতেন। ছোটকে বড় করে তুলে ধরার এই প্রচেষ্টায় তার মহত্ত্ব বোঝা যায়। এটাই বঙ্গবন্ধুর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আজ দেশের মানুষ আমাকে চেনে, সম্মান করে। এর কোনোটাই আমি পেতাম না, যদি আওয়ামী লীগের সদস্য না হতাম। অর্থাৎ ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগে যোগদান করে জেলে বসে আমি সাংগঠনিক সম্পাদক হয়ে ১৪ বছর দায়িত্ব পালন করেছি, ১৮ বছর প্রেসিডিয়াম মেম্বার, মুজিব বাহিনীর অন্যতম অধিনায়ক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে সক্রিয় অংশগ্রহণ- এর সবই আমার জীবনের অর্জন। আমি গ্রামের সাধারণ পরিবারের ছেলে। একজন নেতা অন্যকে নেতা করে বড় করতে পারেন, এটাই আমি বঙ্গবন্ধুর কাছ থেকে শিখেছি। বঙ্গবন্ধুর স্নেহ এবং আদর যদি না পেতাম, যদি আওয়ামী লীগ না করতাম তবে এই অবস্থানে আসতে পারতাম না। জীবনে এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কিছু নেই। বঙ্গবন্ধুর প্রতি, বঙ্গবন্ধুর পরিবারের প্রতি এবং বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা আমাদের বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ভালোবাসা জানাই। আওয়ামী লীগের শীর্ষ জাতীয় চার নেতার সান্নিধ্য ও স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছি; তাদের আদেশ-নির্দেশ পালন করেছি। আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পেরে আমি নিজকে ধন্য মনে করি।

বঙ্গবন্ধু সারাজীবন রাজনীতি করেছেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য। তিনি আমাদের একটি স্বাধীন দেশ দিয়েছেন। ’৮১ সালে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার হাতে আমরা আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়েছিলাম। সেই পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা-সততা-দক্ষতার সঙ্গে তিনি ৪০ বছর আওয়ামী লীগকে পরিচালনা করছেন। আজ বাংলাদেশকে তিনি অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। নিজেও আন্তর্জাতিক বিশ্বে মর্যাদাশালী নেতা হয়েছেন। করোনাকালে তার গৃহীত পদক্ষেপে দেশ-বিদেশের মানুষ সন্তুষ্ট। আমরা বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধুর অসমাপ্ত স্বপ্ন-বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করার মহতীকর্ম-প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই সমাপ্ত হবে।

লেখক: আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

গণপরিবহনে নৈরাজ্যের শিকার সাধারণ মানুষ

গণপরিবহনে নৈরাজ্যের শিকার সাধারণ মানুষ

যেভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বেপরোয়া আচরণ করেন, তাতে বোঝাই যায় যে, তাদের শেকড় কত গভীরে। সড়কের নিরাপত্তায় আইন কঠোর করা হলে তারা পুরো দেশ অচল করে দেন। বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে কোনো বাসের চালক গ্রেপ্তার হলে বা তার শাস্তি হলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা খোদ রাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তারা এটা করতে পারেন কারণ তাদের সেই ক্ষমতা রয়েছে অথবা তা দেয়া হয়েছে।

রাজধানীর পঙ্গু হাসপাতালের সামনে থেকে বাসে উঠলাম। নামব গুলশান ১ নম্বর গোলচত্বরে। আগে ভাড়া ছিল ২০ টাকা। কন্ডাকটর নিলেন ৩০ টাকা। কারণ ভাড়া বেড়েছে দেড় গুণ। কিন্তু যে যুক্তিতে দেড় গুণ ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, সেটি দৃশ্যমান নয়। অর্থাৎ প্রতি সিটে একজন যাত্রী বসবেন, কেউ দাঁড়িয়ে যাবেন না— এমন যুক্তিতে দেড় গুণ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে। কিন্তু প্রতি সিটেই যাত্রী বসেছেন। অনেকে দাঁড়িয়েও যাচ্ছেন। তাহলে ভাড়া কেন দ্বিগুণ? সদুত্তর নেই।

বাস্তবতা হলো, রাজধানীর অনেক রুটেই মানুষের চাহিদার তুলনায় পাবলিক বাসের সংখ্যা কম। ফলে বাসের হেলপাররা যাত্রী তুলতে না চাইলেও বা এক সিটে একজনের বেশি যাত্রী বসাতে না চাইলেও যাত্রীরা সেটি মানতে চান না। কারণ সবারই তাড়া আছে। সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য তারা অনেক সময় হেলপারকে ঠেলেই বাসে উঠে যান।

করোনা কিংবা স্বাস্থ্যবিধি অধিকাংশ যাত্রীর কাছেই মুখ্য নয়। সুতরাং, যাত্রীরাই যেখানে শারীরিক দূরত্ব মানতে চাইছেন না বা এক সিটে একজনের বেশি বসানো যাবে না বা দাঁড়িয়ে লোক নেয়া যাবে না— এই সিদ্ধান্ত কার্যকর রাখা যাচ্ছে না, তখন আর বাড়তি ভাড়া কেন? গণমাধ্যমের খবর বলছে, বেসরকারি কোম্পানিগুলোর পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠান বিআরটিসির বাসেও নিয়মের কোনো বালাই নেই। অর্থাৎ যাত্রী বহন করা হচ্ছে স্বাভাবিক সময়ের মতো। কিন্তু বর্ধিত ভাড়ায়। এ নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে কন্ডাকটরদের বাহাস এখন নিত্য ঘটনায় পরিণত হয়েছে।

আবার শুধু বেসরকারি মালিকানাধীন বাস, লঞ্চ, সিএনজি অটোরিকশা বা লেগুনা-ই নয়, দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এই নৈরাজ্য থেকে মুক্ত নন।

১৮ জুন নিউজপোর্টাল নিউজবাংলার একটি খবরে বলা হয়েছে, করোনার কারণে দেড় বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ব্যবস্থা বন্ধ থাকলেও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নেয়া হচ্ছে পরিবহন ফি। এমনকি বন্ধ হলের ‘সিট ভাড়া’ হিসেবে দুই বছরের ফি জমা দিতেও বলা হয়েছে শিক্ষার্থীদের। গাড়িতে না চড়েও ভাড়া গোনার বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে রেগে যান বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দীন। তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির ভাড়া কে দেবে, তুমি দিবা?’

যদিও কোষাধ্যক্ষের বক্তব্যের সঙ্গে মিল নেই বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন ম্যানেজার আতাউর রহমানের বক্তব্যে। তিনি জানান, বিআরটিসির সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চুক্তি বাস হিসেবে নয়, বরং ট্রিপ হিসেবে। অর্থাৎ যত ট্রিপ বাস চলবে, সে অনুযায়ী টাকা। ট্রিপ না দিলে টাকা নেই। তার মানে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধের কারণে যেহেতু বাসের ট্রিপ বন্ধ, সেহেতু শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরিবহন ফি আদায় করাটা অন্যায়। টাকার অঙ্ক যা-ই হোক, এটি অন্যায্য এবং বড় পরিসরে দেখলে এটিও একধরনের নৈরাজ্য।

গণপরিবহন নিয়ে প্রতিদিন মানুষের যত অভিযোগ, ক্ষোভ আর সীমাহীন দুর্ভোগের কথা গণমাধ্যমে আসে; যেভাবে প্রশাসনের নাকের ডগায় বসে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা বেপরোয়া আচরণ করেন, তাতে বোঝাই যায় যে, তাদের শেকড় কত গভীরে। সড়কের নিরাপত্তায় আইন কঠোর করা হলে তারা পুরো দেশ অচল করে দেন।

বেপরোয়া গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যার অভিযোগে কোনো বাসের চালক গ্রেপ্তার হলে বা তার শাস্তি হলে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা খোদ রাষ্ট্রকেই চ্যালেঞ্জ করেন। তারা এটা করতে পারেন কারণ তাদের সেই ক্ষমতা রয়েছে অথবা তা দেয়া হয়েছে।

কারণ বিভিন্ন সময়ে এই পরিবহন শ্রমিকদেরই কাজে লাগানোর প্রয়োজন পড়ে। সুতরাং, কোনো একটি গোষ্ঠী কীভাবে ক্ষমতাবান হয় এবং তাদের কেন শক্তিশালী করা হয়— সেই প্রশ্নের উত্তরও আমাদের জানা থাকতে হবে। অন্যথায় গণপরিবহনের নৈরাজ্য নিয়ে কথা বলা বৃথা।

রাজধানীর পাবলিক বাসে অতিরিক্ত ভাড়া এবং যাত্রী হয়রানির বাইরেও এই খাতে নৈরাজ্যের একটি বড় কারণ একই রুটে বিভিন্ন কোম্পানির গাড়ির মধ্যে এমনকি একই রুটে অভিন্ন কোম্পানির গাড়ির মধ্যেও ভয়াবহ প্রতিযোগিতা। ওভারটেকিং শুধু নয়, বরং গাড়ির ভেতরে অনেক যাত্রী থাকা সত্ত্বেও দ্রুতগতিতে গিয়ে সচেতনভাবে অন্য বাসের পাশে লাগিয়ে দেয়া; ঝরঝর করে জানালার কাচ ভেঙে পড়ার মতো দৃশ্যও এখন নিয়মিত।

চালকরা যখন এ রকম রেসে নামেন, তখন তাদের বিবেচনায় হয়তো একটিবারের জন্যও এটি আসে না যে, গাড়ির ভেতরে বসে বা দাঁড়িয়ে অন্তত ৫০ জন মানুষ, যাদের মধ্যে বৃদ্ধ, নারী, শিশু এমনকি অসুস্থ মানুষও থাকতে পারেন। এই ঘটনাগুলো যে মানুষের মধ্যে একধরনের ট্রমার জন্ম দিতে পারে, জানালার কাচ ভেঙে যে মানুষ ‍গুরুতর‌ভাবে আহত হতে পারে, সেই বিবেচনাবোধটুকুও তাদের মধ্যে কাজ করে না।

প্রশ্ন হলো, অনেক সংগঠন যাত্রী নিরাপত্তার কথা বলে বিভিন্ন মানববন্ধন বা আন্দোলন-সংগ্রাম অথবা সংবাদ সম্মেলন করলেও গণপরিবহনের শ্রমিকদের তারা কি কখনও মানবিক করার উদ্যোগ নিয়েছে? তারা কি কখনও চালকদের এই বার্তাটি দিয়েছে যে, আপনার সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে গাড়ির ভেতরে থাকা এতগুলো মানুষের জীবন?

আপনি যদি অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নামেন, তাহলে এতগুলো লোকের প্রাণসংহার হতে পারে? আপনার কোনো বন্ধু বা আত্মীয়ই হয়তো অন্য কোনো গাড়িতে থাকতে পারেন এবং এ রকম অসুস্থ প্রতিযোগিতার কারণে তিনিও নিহত বা আহত হতে পারেন? রাষ্ট্র কি কখনও এই চালক-হেলপার বা সুপারভাইজারদের মোটিভেট করার উদ্যোগ নিয়েছে? কোটি কোটি টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার, চার লেন, আট লেনের সড়ক নির্মাণে রাষ্ট্রের যত আগ্রহ, তার সিকিভাগও কি গণপরিবহনের চালকদের মানবিক করার কাজে আছে?

অনুসন্ধানে দেখা যাবে, সড়কে মৃত্যুর যে মিছিল এর পেছনে প্রধানত দায়ী চালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এবং সেই প্রতিযোগিতার কারণে তাদের মধ্যে ক্রিয়াশীল অমানবিকতা। কেন তাদেরকে অন্য বাসের সঙ্গে এ রকম প্রতিযোগিতায় নামতে হয়; কেন তাদের জন্য মাসিক বেতন নির্ধারণ করা যায় না; কেন মালিকদের সঙ্গে তাদের সম্পর্কটি আস্থা ও বিশ্বাসের ওপরে দাঁড়ায় না— এসব প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া না গেলে গণপরিবহনের নৈরাজ্য নিয়ে কথা বলা বৃথা।

সড়কপথে চাঁদাবাজিরও ভিকটিম সাধারণ মানুষ। কারণ বাসমালিক-শ্রমিকদের ঘাটে ঘাটে চাঁদা দিতে হয়। সেই চাঁদার টাকা তারা যাত্রীদের মাধ্যমেই উশুল করেন। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তখন সেই দলের নেতারাই মূলত পরিবহন খাতের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করে। তবে অনেক সময় শোনা যায়, পরিবহন খাতের চাঁদার ভাগবাঁটোয়ারা শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ক্ষমতাসীন দলের নেতা ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মধ্যেই নয়, বরং অন্য অনেক দলের মধ্যেও বণ্টন করা হয়। অর্থাৎ এখানে একটি সর্বজনীন ঐক্য রয়েছে।

কারা এই চাঁদাবাজি করে? গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, একশ্রেণির পরিবহনশ্রমিক, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, পুলিশ ও ক্ষমতাসীন মহলের আশীর্বাদপুষ্টদের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এই চক্র। এতদিন পরিবহন সেক্টরে গাড়ির মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে সিংহভাগ চাঁদাবাজি হলেও এখন সড়ক, মহাসড়ক, টার্মিনাল ও স্ট্যান্ডে নানা নামে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গ্রুপও প্রকাশ্যে চাঁদাবাজি করছে। এ ছাড়া হাইওয়ে পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ ও থানা পুলিশের একাংশও চাঁদাবাজিতে জড়িত বলে অভিযোগ আছে।

সড়কপথে সবচেয়ে বেশি চাঁদাবাজির শিকার হয় পণ্যবাহী ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান। ফসলের দাম কৃষকের পর্যায় থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত যে কয়েক গুণ বেড়ে যায়, তারও মূল কারণ এই চাঁদাবাজি। কারণ যে পটল কৃষকের কাছ থেকে কেনা হয়েছে ১০ টাকা কেজি, খুচরা বাজারে গিয়ে তার দাম ৪০ থেকে ৫০ টাকা। মাঝখানের এই ৩০ থেকে ৪০ টাকা মূলত চাঁদা এবং অন্যান্য খরচ। তার মানে সড়ক পরিবহনে এই চাঁদাবাজি না থাকলে নিত্যপণ্যের দাম অনেক কম হতো।

গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও অমানবিকতার আরেকটি বড় অনুষঙ্গ সিটিং সার্ভিস এবং মহিলা সিট—যার প্রধান ভিকটিম নারীরা। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেখা যাবে, সকালে এবং সন্ধ্যায় কাঙ্ক্ষিত বাসে উঠতে নারীদের দীর্ঘ সময়ের অপেক্ষা। মহিলা সিট নামে যে কটি আসন নির্ধারিত, অনেক সময় তাও খালি থাকে না। পুরুষেরাই বসে থাকেন। অনেক পুরুষ অন্য যাত্রীদের দ্বারা ভর্ৎসনার শিকার হলেও মহিলা সিটে নির্লজ্জের মতো বসে থাকেন।

বরং পাল্টা প্রশ্ন করেন, পুরুষের সিটে কেন নারীরা বসেন? আবার মহিলা সিট নামে যে অত্যন্ত অসম্মানজনক আসনগুলো রাখা হয় চালকের বাঁ পাশে একটি বেঞ্চের মতো জায়গায়, এর সামনেই থাকে ইঞ্জিন এবং ইঞ্জিন থেকে অনবরত বের হতে থাকে গরম বাষ্প। ফলে নারীদের শুধু বাসে ওঠা কিংবা আসন খালি থাকাই নয়, বরং মহিলা সিট নামে এই অদ্ভুত আইডিয়াটি এত বছর পরেও কীভাবে টিকে আছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা দরকার।

নারী-শিশু-বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য গণপরিবহনে কিছু আসন নির্ধারিত রাখাটাই যৌক্তিক— কিন্তু সেই আসনগুলো ইঞ্জিনের পাশে যেখান থেকে গরম বাষ্প বের হয়, সেখানে একটা বেঞ্চি তৈরি করে কেন বানাতে হবে এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে এসে আমরা যখন নানা সূচকে নারীর অগ্রযাত্রার গল্প বলি, তখন কী করে এরকম একটি অসম্মানজনক ব্যবস্থা টিকে থাকে— সেই প্রশ্নটি এখন শুধু পরিবহন মালিকদের কাছেই নয়, বরং রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের কাছেও করার সময় এসেছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

‘এ আমার এ তোমার পাপ’

‘এ আমার এ তোমার পাপ’

হাজার হাজার কিশোর অপরাধী হয়ে গেল কীভাবে? তাদের বাবা-মা, বড় ভাই, মুরব্বি বলে কি কেউ নেই? একটি শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম দায়িত্ব তার পরিবারের, তারপর সমাজের, তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, তারপর রাষ্ট্রের। প্রথম কেউ দায়িত্ব পালন না করে পুরো দায় রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে দিলে তো কাজ হবে না।

পত্রিকার পাতা খুললেই চোখে পড়ে কিশোর অপরাধের নানান খবর। সেভেন স্টার, ফাইভ স্টার, মাফিয়া গ্যাং, রক কিং গ্যাং, ০০৭, রবিনহুড, মাইরালা, কোপায়া দে, ভালগার গ্রুপ, ডিসকো বয়েস, বিগবস- নানান বাহারি নামের গ্যাং। এগুলো নিছক নাম নয়, ভয়ংকর সব গ্রুপ। এসব গ্রুপের সদস্যরা বেশিরভাগেরই বয়স ১২ থেকে ১৮।

ইভটিজিং, মাদক ব্যবহার, মাদক ব্যবসা, ছিনতাই, অপহরণ, ধর্ষণ, এমনকি খুন- সব ধরনের অপরাধেই এরা জড়িয়ে যাচ্ছে। পুলিশের তালিকা অনুযায়ী রাজধানীতে এখন ৭৮টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যার সদস্য সংখ্যা দুই হাজারেরও বেশি।

আর সারা দেশে কিশোর গ্যাংয়ের তালিকা হিসাব করলে সংখ্যাটা ভয়ংকর হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশের এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের নাম এই কিশোর গ্যাং। কারণ কিশোর অপরাধীদের দমন করার জন্য আইনের স্বাভাবিক প্রয়োগ করা যায় না।

মানুষের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা সৃষ্টির আদিকাল থেকেই আছে। কিশোর অপরাধ আগেও ছিল, এখনও আছে, চেষ্টা করলে হয়ত কমানো যাবে, তবে ভবিষ্যতেও কিশোর অপরাধ থাকবে। বাংলাদেশে নতুন করে কিশোর অপরাধ বিষয়টি আলোচনায় আসে ২০১৭ সালে উত্তরায় আদনান হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। আর ২০১৯ সালে বরগুনায় নয়ন বন্ডের নেতৃত্বাধীন ০০৭ গ্যাং প্রকাশ্যে কুপিয়ে রিফাত শরীফকে হত্যার পর কিশোর অপরাধ নিয়ে নতুন করে ভাবনা শুরু হয়। ইদানীং আবার কিশোর অপরাধের প্রবণতা বেড়েছে।

‘কিশোর’ শব্দটির সঙ্গে ‘অপরাধ’ শব্দটি জুড়ে দিতে গিয়ে আমার নিজেকেই অপরাধী মনে হচ্ছে। শিশুরা তো পৃথিবীতে আসে নিষ্পাপ হিসেবে। তারপর তারা আস্তে আস্তে বেড়ে ওঠে। কেউ আস্তে আস্তে অপরাধে জড়ায়। কিন্তু অন্তত ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত তো তাদের পরিবারের কঠোর অনুশাসনে থাকার কথা। তাহলে তারা কীভাবে অপরাধী হয়ে ওঠে?

একদিনে নিশ্চয়ই তারা খুনি হয়ে যায় না। প্রথমে সিগারেট, তারপর মাদক, তারপর ইভটিজিং, তারপর ছিনতাই- এভাবে ধীরে ধীরে হাত পাকিয়ে তারা বড় অপরাধী হয়ে ওঠে। কিন্তু অপরাধী হয়ে ওঠার এই প্রক্রিয়াটার সময় তার চারপাশের লোকজন কোথায় থাকে? আমার বয়স এখন ৫২।

এখনও আমি কিছু বলতে গেলে বা ফেসবুকে লিখতে গেলে সাবধান থাকি, মুরব্বি কেউ দেখে ফেললো না তো! এখনও গ্রামে গেলে বন্ধুবান্ধবদের পাল্লায় পড়ে কালেভদ্রে সিগারেট খেলে তাই লুকিয়ে খাই। তাহলে এই হাজার হাজার কিশোর অপরাধী হয়ে গেল কীভাবে? তাদের বাবা-মা, বড় ভাই, মুরব্বি বলে কি কেউ নেই? একটি শিশুকে পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার প্রথম দায়িত্ব তার পরিবারের, তারপর সমাজের, তারপর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের, তারপর রাষ্ট্রের। প্রথম কেউ দায়িত্ব পালন না করে পুরো দায় রাষ্ট্রের কাঁধে চাপিয়ে দিলে তো কাজ হবে না।

কদিন আগে একটি কিশোর গ্যাংয়ের পাঁচ সদস্যকে আটক করার পর একটি পত্রিকার পক্ষ থেকে তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সবার পরিবারেরই দাবি, তার ছেলে এমন কাজ করতেই পারে না। এই যে অস্বীকার প্রবণতা, এটাতেই মূল সমস্যা।

আপনার সন্তানকে দেখে রাখার প্রথম দায়িত্ব কিন্তু আপনারই। বাংলাদেশের কিশোর অপরাধীদের বেশিরভাগই নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। সামাজিক অবস্থানের কারণে নিম্নবিত্ত পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরনের বঞ্চনার বোধ তৈরি হতে পারে। কিন্তু সমাজে বৈষম্য আছে, থাকবে। বঞ্চনার শোধ তো অপরাধ দিয়ে হতে পারে না। তবে সব কিশোর অপরাধী তো নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান নয়।

মধ্যবিত্ত, মধ্য উচ্চ মধ্যবিত্ত, এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানরাও অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের অনেকের মোটর সাইকেল, এমনকি গাড়িও রয়েছে। মোটর সাইকেল বা গাড়ি তো নিম্নবিত্তের পরিবারের কারো পক্ষে কেনা সম্ভব নয়। তাহলে কোনো বাবা-মা তার ১৮ বছরের নিচের সন্তানকে গাড়ি বা মোটর সাইকেল কিনে দিয়েছেন এবং তা অবাধে ব্যবহার করে অপরাধ করার সুযোগ দিয়েছেন!

বাবা-মা দুজনেই চাকরি করেন, এমন পরিবার তাদের সন্তানকে নিজেদের অনুপস্থিতির দায় অর্থ দিয়ে পুষিয়ে দিতে চান। কিন্তু আমাদের বুঝতে হবে ভালোবাসার অভাব অর্থ দিয়ে পূরণ করা যায় না। অনেক সময় বাবা-মার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেলে সেই পরিবারের সন্তান উচ্ছন্নে যেতে পারে। ছাড়াছাড়ি হলেও বাবা বা মা কাউকে না কাউকে তো সন্তানের দায়িত্ব নিতেই হবে।

১৩ থেকে ১৮ এই বয়সটা খুব বিপজ্জনক। ইংরেজিতে যেটাকে টিনএজ বলে, বাংলায় বলে বয়ঃসন্ধি। এই সময়টা শিশু-কিশোররা স্বপ্নের জগতে বাস করে। তারা অ্যাডভেঞ্চার ভালোবাসে। অনেকসময় শুধু অ্যাডভেঞ্চারের লোভে তারা অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। তাই এই সময়টা তাদের প্রতি বাড়তি মনোযোগ দিতে হবে। বাড়তি তো দূরের কথা, আমরা আসলে তাদের প্রতি কোনো মনোযোগই দেই না। আসলে বয়ঃসন্ধিকালটা বিপজ্জনক। এই সময়টা কিশোরররা কিছু না কিছু করার জন্য তড়পাতে থাকে।

সমস্যা হলো এখন আমাদের কিশোরদের সামনে কোনো লক্ষ্য নেই, কোনো রাজনীতি নেই, কোনো সংস্কৃতি নেই। তাই তড়পাতে থাকা কিশোররা হয় জঙ্গি, নয় জড়িয়ে পড়ে অপরাধে। কিছু না কিছু করার জন্য তড়পাতে থাকা কিশোরদের সামনে ভালো কোনো লক্ষ্য দিতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধ, সামাজিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় মূল্যবোধকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরতে হবে। নানারকম সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বা খেলাধুলায় তাদের ব্যস্ত রাখতে হবে। সারাক্ষণ কম্পিউটারে ব্যস্ত থাকলে তারা কোনো না কোনো ফাঁদে পড়ে যেতে পারে।

পরিবার যখন ব্যর্থ হয়, সমাজ যখন ব্যর্থ হয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যখন ব্যর্থ হয়; তখন দায় চাপে রাষ্ট্রের কাঁধে। কেউ যখন অপরাধী হয়েই যায়, তখন পুলিশের কাজ তাদের আইনের হাতে তুলে দেয়া। কিন্তু কিশোর অপরাধীদের সঙ্গে পুলিশ সাধারণ অপরাধীদের মতো আচরণ করতে পারে না, পারা উচিতও নয়।

কিশোর অপরাধীরা অপরাধ করে বড়দের মতো, কিন্তু তাদের সঙ্গে আচরণ করতে হয় কিশোরদের মতো। তাদের হাতকড়া পরানো যায় না। সাজা হলেও তাদের সাধারণ কারাগারে না রেখে কিশোর সংশোধনাগারে রাখতে হয়। বাংলাদেশে কিশোর সংশোধনাগার আছে তিনটি, এর মধ্যে একটি কিশোরীদের জন্য। কিন্তু এই সংশোধনাগারের পরিবেশ এতই বাজে সেখানে সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। বরং তারা সেখানে কিশোর অপরাধী হিসেবে ঢুকে পাকা অপরাধী হিসেবে বের হয়।

একজন শিশু বা কিশোর যখন অপরাধী হয়, তখন আমি আসলে তাদের অপরাধ দেখি না। আমি দেখি আমাদের দায়, আমাদের সবার দায়। যে শিশু, যে কিশোর জাতির ভবিষ্যৎ, তাকে কেন আমরা অপরাধী হতে দিলাম? সে হয়তো না বুঝে বয়সের আবেগে, অ্যাডভেঞ্চারের লোভে শুরুতে একটা ছোট অপরাধ করেছে। আমরা নজর দেইনি বলে সে অপরাধে জড়িয়েছে। কিশোরদের অপরাধে জড়ানো আমাদের জাতীয় ক্ষতি।

তার যে আগ্রহ, উত্তেজনা সেটা যদি সমাজ বদলানোর কাজে ব্যবহার করা যেত, সামাজিক কাজে, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে, খেলাধুলায় তাদের ব্যস্ত রাখা যেত; তাহলে জাতির লাভ হতো। বড়দের সময় না থাকার দায় ছোটদের ঘাড়ে চাপিয়ে তাদের অপরাধী বানালে সমস্যার সমাধান হবে না। নিজের স্বার্থে, জাতির স্বার্খে; আমার সন্তানকে আমারই দেখে রাখতে হবে; সে যেন জাতির সম্পদ হয়, অপরাধী না হয়।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

কদমতলীর হত্যা ও পারিবারিক-সামাজিক জটিলতা

কদমতলীর হত্যা ও পারিবারিক-সামাজিক জটিলতা

কোনো অপরাধী থাকে সাইকোপ্যাথ, অন্য অপরাধীরা সেটা না-ও হতে পারে। সমাজে অপরাধ থাকবে, কিছু মানুষ মন্দ কাজ করবে কিন্তু সমাজের শিক্ষিত ও নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের বুঝতে হবে কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে? বাবা-মা, বোন হত্যার পেছনে পরকীয়ার যুক্তি খোঁজার চেষ্টা না করে, অপরাধী কেন এ রকম একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটাল, সেটা খুঁজে বের করা উচিত। পারিবারিক হিংসা, পারিবারিক বন্ধন নষ্ট হয়ে যাওয়া, উগ্র জীবনযাপন, মাদক-অসৎ সঙ্গ, ভালোবাসাহীনতা নাকি মনোবৈকল্য?

এই কিছুদিন আগের ঘটনা, যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের একটি বাড়ি থেকে ছয় বাংলাদেশির লাশ উদ্ধার করার কথা জেনে অনেকেই স্তব্ধ হয়ে যায়। ‘বিষণ্নতা থেকেই’ পরিবারটির দুই ভাই তাদের মা-বাবা, নানি ও একমাত্র বোনকে হত্যার পর নিজেরাও আত্মহত্যা করেছে বলে পুলিশের ধারণা। ১৯ বছরের যমজ দুই ভাই পরিকল্পনা করে পরিবারের সবাইকে হত্যা করেন।

আমাদের রাজধানীর কদমতলীতে মা-বাবা ও বোনকে হত্যার দায় স্বীকার করেছেন পরিবারটির আরেক মেয়ে মেহজাবিন ইসলাম। ৯৯৯-এ ফোন করে মেহজাবিন বলেন, ‘তিনজনকে খুন করেছি। এখনই পুলিশ পাঠান।

‘যদি পুলিশ না আসে, তবে আরও দুজনকে খুন করব।’ পুলিশ জানায়, পরিবারের সদস্যদের প্রতি প্রচণ্ড ক্ষোভ ছিল তার। স্বামী আর মেয়েকেও ঘুমের ওষুধ দিয়ে অচেতন করেছিলেন। যত ঘৃণা বা রাগ থাকুক, পবিবারের সবাইকে হত্যা করা এবং এরপর নিজেই পুলিশকে ফোন করা কোনোভাবেই স্বাভাবিক নয়।

এর আগেও আমরা দেখেছি মা তার সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন। বাবা পরিবারের সবাইকে হত্যা করে নিজেও মারা গেছেন। এগুলো অস্বাভাবিক ঘটনা। মানুষ যখন সবাইকে হত্যা করে নিজে ‘মৃত্যুকে বরণ করে’ নেয়ার জন্য তৈরি হয়, তখন ধরেই নিতে হবে, তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ বা ভয়াবহ রকমের ডিপ্রেশনের শিকার। পরিবেশ-পরিস্থিতি, মানসিক অসুস্থতা তাকে এমন আসুরিক শক্তি দেয় যে, সে পরিবারের প্রিয় সদস্যদের বিনা দ্বিধায় হত্যা করার মতো জঘন্য অপরাধ ঘটিয়ে ফেলতে পারে।

সম্প্রতি পত্রিকায় অনেক ঘটনা উঠে আসছে, যেখানে কেউ হত্যা করছে এমন সব কাছের মানুষদের, যাদের সঙ্গে তাদের যেকোনো কারণে বিবাদ বাধছে। হত্যা নতুন কিছু নয় এবং মানবসমাজে হত্যা সব সময়ে হয়েছে এবং কমবেশি সব সমাজেই বিদ্যমান। কিন্তু বর্তমানে যেটা বিশেষভাবে চোখে পড়ছে, সেটা হলো তুচ্ছ করণে হত্যাকাণ্ড এবং বিশেষ করে নিকটজনদের হত্যা করা।

কদমতলীর এই হত্যাকাণ্ড মানুষের আকস্মিক ক্ষোভের থেকে ঘটিয়ে ফেলা ঘটনা ছিল না। ছয় মাস আগে থেকে পরিকল্পনা করে এই ত্রয়ী হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

পত্রিকায় দেখলাম অভিযুক্ত অপরাধী বলেছে সে ‘ক্রাইম পেট্রোল’ দেখে হত্যা করার এই উপায় বের করেছে। এর মানে হচ্ছে, অপরাধী মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল যে, সে হত্যা করবে, কিন্তু কীভাবে করবে সেই উপায়টা খুঁজে বের করেছে এই সিরিজ দেখে। অপরাধজগতের ওপর নির্মিত এই সিরিজের অনেক দর্শক। অনেক ভাষায় এর ডাবিং হয়।

অনেকেই বলেন, এই সিরিজ দেখলে বোঝা যায় অপরাধের গতিপ্রকৃতি এবং পুলিশ কতভাবে বা কৌশল করে অপরাধী ধরতে পারে। অথচ আমাদের আলোচ্য অভিযুক্ত অপরাধী তার মনোজগতের অস্থিরতা থেকে হত্যার উপায় অনুসন্ধান করেছেন। কাজেই একটি পরিবারের সন্তান, বাবা-মা, ভাইবোন এমনকি পরিবারে নিযুক্ত সাপোর্ট স্টাফের মন কীভাবে কাজ করছে, সেটাই আমাদের লক্ষ রাখতে হবে।

এই ধরনের কয়েকটি ঘটনা ঘটার পরও আশ্চর্যজনক দিক হচ্ছে বাবা, মা ও বোন হত্যার এই ঘটনার যে ভয়াবহতা, সেটা বোঝার ক্ষমতা যেন আমাদের সমাজ হারিয়ে ফেলেছে। অনেকে এই হত্যাকে জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে এই বলে যে পরকীয়াই এই হত্যাকাণ্ডের কারণ এবং এ কথাও লেখা হচ্ছে যে, ভিকটিমের মা মন্দ নারী ছিল, সে রাজনৈতিক নেতাদের নারী সরবরাহ করত এবং বাবা আরেকটা বিয়ে করেছে।

এত ভয়ংকর হত্যাকাণ্ডের পেছনে এসব কারণ খোঁজা মানে, অপরাধীর মানসিক অবস্থাকে বিচারে না আনা। একই পরিস্থিতিতে ভিন্ন ভিন্ন অপরাধীর দৃষ্টিভঙ্গি, চিন্তা ও আচরণ ভিন্ন রকম হবে। কোনো অপরাধী থাকে সাইকোপ্যাথ, অন্য অপরাধীরা সেটা না-ও হতে পারে।

সমাজে অপরাধ থাকবে, কিছু মানুষ মন্দ কাজ করবে কিন্তু সমাজের শিক্ষিত ও নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদের বুঝতে হবে কেন এ ধরনের ঘটনা ঘটেই যাচ্ছে? বাবা-মা, বোন হত্যার পেছনে পরকীয়ার যুক্তি খোঁজার চেষ্টা না করে, অপরাধী কেন এ রকম একটি ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ঘটাল, সেটা খুঁজে বের করা উচিত। পারিবারিক হিংসা, পারিবারিক বন্ধন নষ্ট হয়ে যাওয়া, উগ্র জীবনযাপন, মাদক-অসৎ সঙ্গ, ভালোবাসাহীনতা নাকি মনোবৈকল্য?

২০১৭ সালের নারায়ণগঞ্জ হত্যাকাণ্ডের রায়ে ফাঁসি ঘোষণা হওয়ার পরও ‘আসামিরা নির্বিকার ও পরিপাটি’ ছিল। খবরের বর্ণনায় বলা হয়েছে, ২৬ আসামির মধ্যে মাত্র দুজন রায় শুনে কেঁদেছেন। বাকিদের চেহারা ছিল ভাবলেশহীন। আদালতকক্ষে আসার সময় তাদের কারও কারও মুখে চাপাহাসিও ছিল। কীভাবে সম্ভব মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়ার পরও মুখে হাসি টেনে রাখা।

এদের সংশ্লিষ্টতার খবর যতই প্রকাশ পাচ্ছিল, ততই মনে হচ্ছিল এরা তো কেউ দাগী অপরাধী, খুনি বা ডাকাত নয়। অপরাধী ধরাই এদের কাজ, অপরাধ করা নয়। তাহলে কীভাবে এতটা পৈশাচিক উপায়ে এই কাজ তারা করল? কোনো মানুষ হঠাৎ করে এই ধরনের অপরাধ ঘটাতে পারে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানাচ্ছে, ২০৩০ সাল নাগাদ পৃথিবীতে রোগের বোঝার হিসাবের বা ডিজিজ বার্ডেনের এক নম্বর কারণ হবে বিষণ্নতা। আর সে সময় বছরে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ আত্মহত্যাজনিত কারণে মৃত্যুর শিকার হবে। আধুনিক পৃথিবীর জন্য এ এক ভয়ংকর ভবিষ্যদ্বাণী।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কয়েক যুগ আগে ‘স্বাস্থ্য’-এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছিল ‘কেবল নীরোগ থাকাটাই স্বাস্থ্য নয় বরং শারীরিক, মানসিক, আত্মিক ও সামাজিকভাবে ভালো থাকার নামই স্বাস্থ্য।’ আমাদের অসচেতনতার ফলে ‘স্বাস্থ্য’ শব্দটি সীমাবদ্ধ হয়ে আছে শুধু ‘শারীরিক’ অংশটুকুর মধ্যে। আর তাই বাংলাদেশসহ অনেক দেশেই মানসিক সমস্যা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

২০১৫ সালে ঐশী নামে ১৭ বছরের একটি মেয়ে তার বাবা-মাকে হত্যা করে দুই দিন লাশ ফেলে রেখেছিল। কারণ, ঐশীর পুলিশ কর্মকর্তা বাবা মেয়ের হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে তাকে ঘরবন্দি করেছিল, কারণ মেয়ে অসৎসঙ্গে পড়ে মাদক ধরেছিল। এই রাগে সে বাবা-মাকে হত্যা করে।

জীবনের চাপ-অত্যাচার, নিপীড়ন-অন্যায়, অবিচার-ব্যর্থতা সব মানুষ সমানভাবে গ্রহণ করতে পারে না। বিশেষ করে শিশুদের ওপর ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের নেতিবাচক প্রভাব, তাদের ডিপ্রেশন বা হতাশার মুখে এনে দাঁড় করিয়ে দেয়। এমনকি কোনো কোনো সময় এই অবস্থার জের শিশুকে সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।

যেমন কোনো মা যদি সন্তান ধারণকালে ক্ষতিকর মানসিক চাপ থেকে বিষণ্নতা বা উদ্বেগে ভুগে থাকেন, তাহলে তার যে শিশু জন্ম নেবে সে জিনগতভাবে বিষণ্নতা বা উদ্বেগে আক্রান্ত হবার ঝুঁকি নিয়ে জন্ম নিতে পারে। তার মানে ওই শিশুর ক্ষেত্রে পুরো জীবন ও তার পরবর্তী প্রজন্মকে পাল্টে দেবে।

আমাদের এই সমাজ এখন এতটাই অস্থির, এতটাই ছলচাতুরীপূর্ণ, লোভ-লালসা ও শঠতাপূর্ণ যে অনেক মানুষ ঠিকমতো বুঝতেই পারে না যে, কোন চিন্তা, কোন আচরণ সুস্থ আর কোন চিন্তা, কোন আচরণ অসুস্থ। আর সেই কারণে পরিবারের শিশুরাও কোনটা শিখবে আর কোনটা বর্জন করবে সেই মূল্যবোধ তৈরি করাতে পারছেন না অভিভাবক।

ফলে মানসিক অসুস্থতার ভয়াবহ পরিবেশ তৈরি হচ্ছে এবং সেটা থেকে মুক্ত হওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে যাচ্ছে। মনোবিকারগ্রস্ত সমাজ এমন একটা সমাজ যা মানুষকে, পরিবার ও সমাজ এমনকি দেশের উন্নয়নকে বিলীন করে দিতে পারে।

সাধারণত নিজের মধ্যে ঘটে যাওয়া অস্বস্তি বা অসহ্যতা কাটানোর জন্য স্বাভাবিক মানুষ চিন্তা করে, পড়াশোনা করে, গবেষণা করে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করে।

আবার অস্থির সমাজে এমনও দেখা যায় এগুলোকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন বিকৃত পথেও মানুষ অস্বস্তি বা অসহ্যতা থেকে মুক্ত হওয়ার উপায় খোঁজে। কিন্তু এই বিকৃত পথগুলো অনুসরণের ফল হলো বাস্তবতা, সামাজিক সহাবস্থান, পারিবারিক বন্ধন থেকে ক্রমেই সরে আসা। তখন মানুষ যেকোনো ধরনের অপরাধ করে, মাদক গ্রহণ করে মনের অস্বস্তি দূর করার চেষ্টা করে। সবকিছুই তাদের মনে হয় হালকা ধারণা। জীবন তাদের কাছে হয়ে যায় এমন কাল্পনিক, যেখানে সবকিছুই সম্ভব কিন্তু কোনো কিছুই যেন বাস্তব বা নিরেট নয়।

বর্তমানে আমাদের অনেকের মধ্যেই এমন একটা অক্ষমতা ভর করেছে যে, আমরা আবেগপ্রবণ, জ্ঞানহীন, গোঁয়ার ও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছি। লোভী, স্বার্থপর, ইন্দ্রিয়পরায়ণ ও অপরিচ্ছন্ন চিন্তার এই সমাজ এমন এক মানসিক পরিবেশ তৈরি করছে, যেখানে একটি শিশু বেড়ে উঠছে বিকৃত পথে, অসুস্থ পারিবারিক পরিবেশে। একজন অপরাধী কেন অপরাধ করছে, সেটা তার বর্তমান অবস্থা দিয়ে নয়, বিচার করতে হয় তার শিশু ও কৈশোরকালীন পরিবেশ ও শিক্ষা দিয়ে।

শিশু যদি নিয়মিত খেলাধুলা বা শরীরচর্চা না করে, বাবা-মায়ের মনোযোগ না পায়, পড়াশোনা করার সুযোগ না পায় এবং সামাজিক ও বুদ্ধিগত বিষয়ে অংশগ্রহণ না করে বা তার আশেপাশের পরিবেশ নিয়ে না ভাবে অথবা সামাজিক চিন্তায় যথেষ্ট পরিমাণে জড়িত না থাকে, তাহলে শিশু-কিশোরের মনোজগত নষ্ট হতে বাধ্য। এখন আমাদের সমাজে তাই ঘটছে। এর সঙ্গে জ্ঞান বুদ্ধি কল্যাণ ও সততা থেকে দূরে থেকে হীনতা, স্বার্থপরতা, লোভ আর কূপমণ্ডূকতার পারিবারিক সংস্কৃতিও জিনগতভাবে অক্ষম প্রজন্ম তৈরি করছে।

মানসিক স্বাস্থ্য অর্থ কেবল মানসিক রোগ নয়, বরং মনের যত্ন নেয়া, নিজের সক্ষমতা আর দুর্বলতা বুঝতে পারা। মনকে বাদ দিয়ে শরীর নয়। সবাইকে সচেষ্ট হতে হবে মানসিক স্বাস্থ্য চাঙা রাখার জন্য ও মনে কোনো রোগ না হলেও মনের যত্ন নেয়ার জন্য। তা না হলে এধরনের হত্যা ও আত্মহত্যামূলক ঘটনা বাড়তেই থাকবে।

লেখক: যোগাযোগকর্মী, সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

বাল্যবিবাহের ছোবলে ব্যাহত নারীর অগ্রযাত্রা

বাল্যবিবাহের ছোবলে ব্যাহত নারীর অগ্রযাত্রা

বাল্যবিবাহ রোধ করতে গেলে আমাদের ভাবতে হবে সেসব পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আনার দিকেও। কোন কোন কারণে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বাড়ছে, সে কারণগুলো খুঁজে বের করে সঠিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর প্রতিকারে সঠিক ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে এখনই। মূলত দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যৌন হয়রানি, অশিক্ষা এসব কারণেই বাল্যবিবাহের মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে।

আধুনিক সভ্যতার এ সময়ে এসেও বাংলাদেশের আনাচকানাচ থেকে বাল্যবিবাহের খবর পাওয়া যায়। সম্প্রতি বরিশালের আগৈলঝড়ায় অষ্টম শ্রেণির এক ছাত্রীর বিবাহ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হবার স্বপ্ন নিয়ে চলা বাংলাদেশে এমন সংবাদ বড্ড বেমানান। বাল্যবিবাহ এমন একটি প্রথা, যা দীর্ঘদিন নারীকে কেন্দ্র করে সমাজে চলমান মূল্যবোধ ও অসমতাকে প্রকাশ করে চলেছে; যদিও বাল্যবিবাহ কেবল নারীর একার জন্য প্রযোজ্য নয়। এর অন্তর্ভুক্ত আছে পুরুষরাও। তবে যেহেতু সংখ্যায় কম তাই আমরা পুরুষদের বাল্যবিবাহের চেয়ে নারীর ক্ষেত্রে ঘটে যাওয়া ঘটনাকেই প্রাধান্য দিই বেশি। বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় পরিবারগুলো তাদের কন্যাসন্তানকে পারিবারিক বোঝা হিসেবেই গণ্য করে থাকে। জাতিসংঘের হিসাব বলে বাংলাদেশে ৫০ ভাগ নারীর বিবাহ হয় ১৮ বছরের আগে যদিও বিগত বছরগুলোতে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হয়েছে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী, পুরুষের ক্ষেত্রে বিবাহের বয়স বলা হয়েছে ২১ এবং নারীর ক্ষেত্রে তা ১৮। জানা যায়, বাল্যবিবাহ বন্ধে যে সফলতা পেয়েছিল বাংলাদেশ সেটি এখন হুমকির সম্মুখীন।

বাংলাদেশ বর্তমানে ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড সুবিধার আওতায় আছে, যেখানে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৫ ভাগ তরুণ। এই তরুণদের ওপর নির্ভর করেই নেয়া হচ্ছে বেশির ভাগ উন্নয়ন পরিকল্পনা। ৬৫ ভাগ জনসংখ্যার অর্ধেক হচ্ছে নারী। তাই জাতীয় উন্নয়নের হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত আছে এই নারীসমাজের উন্নয়নও। ইতোমধ্যেই বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যুহার হ্রাসসহ আরও কিছু মানব উন্নয়ন সূচকে বিশ্বের দরবারে উদাহরণ তৈরি করেছে। কিন্তু বিপদের কথা হচ্ছে করোনা কেড়ে নিয়ে যাচ্ছে এমন অনেক অর্জন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ আজ প্রায় দেড় বছর। পরিবারের আয় কমেছে অনেকের। সমাজে বিরাজমান নারী নির্যাতনের হার বেড়েছে কয়েক গুণ।

প্রায় প্রতিদিন আমরা ধর্ষণসহ নানা রকম নারী নির্যাতনের সংবাদ পাই। ক্রমবর্ধমান নারী নির্যাতন থেকে তৈরি হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তার অভাব। এমনিতেই আমাদের সমাজে নারীর নিরাপত্তা নিয়ে সব সময় শঙ্কায় থাকে তার মধ্যে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া সামাজিক অস্থিরতাও বাল্যবিবাহের পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করছে। সংসারের বোঝা মনে করা কন্যাসন্তান একটু বড় হলেই তাকে নিয়ে বেড়ে যায় ভাবনাচিন্তা। সদ্যযৌবনা কন্যাসন্তানটিকে কেমন করে আগলে রাখবে এ নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

সাম্প্রতিক এক পরিসংখ্যান বলছে করোনাকালে যত বিবাহ হয়েছে, এর প্রায় ৭০ ভাগ বিবাহ হয়েছে বাল্যবিবাহ। এই পরিসংখ্যান যদি সঠিক চিত্র তুলে ধরে তাহলে আগামীর বাংলাদেশের চিত্র হবে ভয়াবহ। কারণ, বাল্যবিবাহ নারীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে, অপ্রাপ্ত বয়সে বিবাহর ফলে নারীরা অপুষ্টিজনিত সমস্যায় ভোগে। কেবল নারী নয়, তার গর্ভে জন্ম নেয়া শিশুটিও অপুষ্টির শিকার হচ্ছে। এতে করে নারী ও শিশুমৃত্যুর হার বেড়ে যাবার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে। আর এর প্রভাব সরাসরি পড়বে আমাদের উন্নত দেশ হবার স্বপ্নের মাঝে কারণ টেকসই উন্নয়নের অন্যতম শর্ত হচ্ছে বাল্যবিবাহ রোধ ও শিশু নির্যাতন রোধ। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, করোনাকালে বাল্যবিবাহের কারণে নারীর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ। করোনাকালে আয় উপার্জনহীন হয়েছে বহু পরিবার। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত অনেক পরিবার আজ আর্থিকভাবে চরম অনিশ্চয়তার মাঝে বাস করছে।

বাল্যবিবাহ রোধ করতে গেলে আমাদেরকে ভাবতে হবে সেসব পরিবারগুলোর আর্থিক সক্ষমতা আনার দিকেও। কোন কোন কারণে বাল্যবিবাহের সংখ্যা বাড়ছে সে কারণগুলো খুঁজে বের করে সঠিক বিশ্লেষণ করে এর প্রতিকারে সঠিক ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে এখনি। মূলত দারিদ্র্য, সামাজিক নিরাপত্তার অভাব, যৌন হয়রানি, অশিক্ষা এসব কারণেই বাল্যবিবাহর মতো ঘটনা বেড়ে যাচ্ছে।

করোনাকালে বন্ধ রয়েছে শিশুদের টিকা প্রদান কার্যক্রম। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের অগ্রগতি সম্পর্কেও কোনো তথ্য নেই। গ্রামে গ্রামে যে ধরনের সচেতনতামূলক কর্মসূচি প্রচলিত ছিল করোনার কারণে সেগুলো সবই বন্ধ আছে। স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো ব্যস্ত আছে করোনা মোকাবিলায় সরকারের গৃহীত বিভিন্ন কর্মসূচির সঠিক বাস্তবায়নে। এমতাবস্থায় বেড়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রকার হয়রানিমূলক কার্যক্রম।

বাল্যবিবাহ রোধে সবচেয়ে বেশি যে কর্মপরিকল্পনা দরকার সেটি হচ্ছে সামাজিক সচেতনতাকে জাগিয়ে তোলা। কন্যাসন্তান সংসারে বোঝা নয়, সেও পারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়ে সংসারের হাল ধরতে এই বিশ্বাসকে জাগ্রত করতে হবে। নারী নির্যাতনের মতো ঘটনাগুলোর বিচার নিশ্চিত করতে হবে দ্রুত। নারীর সামাজিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় সরকারকে ভাবতে হবে আরও নানাদিক দিয়ে। স্থানীয় প্রশাসনকে সচল করে এলাকায় এলাকায় নারী হয়রানিকে মোকাবিলা করতে হবে যাতে করে পরিবারগুলো তাদের কন্যাসন্তানকে নিয়ে ভয়ে না থাকে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ বলেই মেয়েকে বিবাহ দিয়ে বোঝা হালকা করতে হবে এমন ধারণাকে দূর করতে নারী শিক্ষার গুরুত্বকে সামনে আনতে হবে। বাল্যবিবাহ নিরোধে যে আইন করা হয়েছে সেটি নিয়েও প্রচারণা বাড়াতে হবে আরও অনেক। বর্তমানে বেশিরভাগ পরিবারের অভিভাবকরাই আইনের দিকটি সম্পর্কে সচেতন নয়, যে কারণে বাল্যবিবাহ দিতে ভয় পাচ্ছে না।

স্থানীয় প্রশাসনের মাঝেও আনতে হবে সচেতনতা। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে আরও অনেক বেশি কার্যকর ভূমিকা রাখতে এগিয়ে আসতে হবে। স্থানীয়ভাবে যেসব সংগঠন কাজ করছে তাদের সবার সঙ্গে মিলে একটি জাতীয় পরিকল্পনা ঘোষণা করার এখনি সময়। সেই পরিকল্পনাকে অগ্রাধিকার দিয়ে কাজে নেমে না পড়লে সামনে কী হবে তা বলা মুশকিল।

লেখক: প্রাবন্ধিক, কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

বজ্রপাতে আর অসহায় ভাবার সুযোগ নেই

বজ্রপাতে আর অসহায় ভাবার সুযোগ নেই

বাংলাদেশে বজ্রপাতের ওপর তেমন কোনো গবেষণা নেই। তবে ইউরোপ, জাপান ও আমেরিকায় এ বিষয়টি নিয়ে বড় গবেষণা চলছে। আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অন্য যেকোনো দুর্যোগের চেয়ে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও এর ঝুঁকি কমাতে দৃশ্যমান উদ্যোগ কম। বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাথমিক পর্যায়ে সারা দেশে তালগাছের ৫০ লাখ চারা রোপণের উদ্যোগ নিলেও এটি খুব একটি কার্যকর নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

সম্প্রতি বাংলাদেশসহ পৃথিবীজুড়ে বজ্রপাতে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বর্গকিলোমিটারে অন্তত ৪০টি বজ্রপাত হয় বলে আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে এসেছে। পৃথিবীর বজ্রপাতপ্রবণ অঞ্চলের একটি বাংলাদেশ।

এই অস্বাভাবিকতার কারণ হচ্ছে, বায়ুমণ্ডলে কালো মেঘ বেড়ে যাওয়া। কালো মেঘ সৃষ্টির পেছনে বাতাসে নাইট্রোজেন ও সালফারের পরিমাণ বাড়াকেই দায়ী করছেন বিজ্ঞানীরা। জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পৃথিবীতে প্রতি মিনিটে ৮০ লাখ বজ্রপাত সৃষ্টি হয়। উন্নত দেশগুলোতেও একসময় বজ্রপাতে অনেক মানুষের মৃত্যু হতো। কিন্তু তারা বজ্রনিরোধক খুঁটি বা পোল স্থাপন করা, মানুষকে সচেতন করার মধ্য দিয়ে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে এনেছে। তবে তার আগে বৈজ্ঞানিক তথ্যভিত্তিক ব্যবস্থাপনা ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাভিত্তিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছে উন্নত দেশগুলো।

এতে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের দেশগুলোসহ পূর্ব এশিয়ায় বজ্রপাতে হতাহতের সংখ্যা বহুলাংশে কমেছে। যদিও বজ্রপাত সম্পর্কে অনেক কল্পকাহিনি প্রচলিত, বিজ্ঞানের কল্যাণে বজ্রপাতের কারণ পরিষ্কার হয়েছে। সহজ ভাষায় বায়ুমণ্ডলে ধনাত্মক ও ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক চার্জের গঠন ও পৃথকীকরণে বজ্রপাত সংঘটিত হয়। সারা বছরের হিসাবে পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত সংঘটিত হয় ভেনেজুয়েলার মারাকাইবো হ্র্রদে। অপরদিকে আফ্রিকার কঙ্গো অববাহিকার অবস্থান দ্বিতীয়।

বজ্রপাত একটি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বর্তমানে এর ব্যাপকতা জনজীবনকে ভাবিয়ে তুলছে এবং ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে এখন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ কিংবা ডাটাবেইজ সৃষ্টিতে কর্তৃপক্ষ তৎপর। সরকারি পর্যায়ে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়, বিভিন্ন এনজিও, গণমাধ্যম কর্তৃক প্রদত্ত তথ্যে দেখা যায়, বিগত পাঁচ বছরে সারা দেশে বজ্রপাতে প্রায় তিন হাজারের বেশি মানুষের প্রাণ গেছে এবং ২০১১ সালের পর থেকে এর প্রবণতা ক্রমাগতভাবেই বেড়ে চলছে।

যেমন, ২০১৫ সালে ৯৯ জন, ২০১৬ সালে ৩৫১ জন ও ২০১৭ সালে ২৬২ আর ২০১৮ এপ্রিল পর্যন্ত ৫৭ জনের মৃত্যু, ২০২১ সালের মে পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু ও চার শতাধিক আহত হওয়ার খবর রয়েছে; যা গ্রামাঞ্চলে ফসলের মাঠ, পুকুরের পাড় ও হাওরে বেশি সংঘটিত হচ্ছে। বজ্রপাতে বাংলাদেশে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২৫০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, বুয়েট, দুর্যোগ ফোরাম, গণমাধ্যমসহ একাধিক তথ্যমতে, বজ্রপাতে ২০১০ থেকে ২০১৯ সালের ৮ এপ্রিল পর্যন্ত ২ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেছে। এত বেশি মৃত্যুহারের জন্য মানুষের অসচেতনতাকেই দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা।

তারা বলছেন, বজ্রপাত সম্পর্কে দেশের প্রান্তিক ও নিরক্ষর জনসাধারণের সঠিক ধারণা না থাকার দরুন মৃত্যুহার বেশি। ঝড়-বৃষ্টি, বজ্রপাতের সময়ও এ দেশের লোকজন খোলা জায়গায় কাজ করে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের কৃষক ও জেলে সম্প্রদায়।

দেশি-বিদেশি গবেষণা বলছে, দেশে গত কয়েক বছরে কালবৈশাখীর পাশাপাশি বজ্রপাত বেড়েছে। বজ্রপাতে মৃত্যু নিয়ে একক কোনো কারণ চিহ্নিত করতে পারছেন না বিশেষজ্ঞরা। অনেকটাই ধারণানির্ভর তথ্যে তারা মনে করছেন, তাপমাত্রা ও বাতাসে সিসার পরিমাণ বৃদ্ধি, জনজীবনে ধাতব পদার্থের ব্যবহারের আধিক্য, মোবাইল ফোন ব্যবহার ও এর টাওয়ারের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া, বনভূমি বা গ্রামাঞ্চলে উঁচু গাছের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস, জলাভূমি ভরাট ও নদী শুকিয়ে যাওয়া ইত্যাদি বজ্রপাত বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। আর এসবের সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের সম্পর্ক আছে।

বিশ্বখ্যাত সায়েন্স পত্রিকার নিবন্ধে ১ ডিগ্রি তাপমাত্রা বেড়ে গেলে বজ্রপাতের আশঙ্কা ১২ শতাংশ বেড়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আবহাওয়া-সম্পর্কিত দ্বিতীয় বৃহত্তম ঘাতক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বজ্রপাত। প্রযুক্তির ব্যবহার করে বজ্রপাতে মৃত্যু কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা যেতে পারে, তবে সচেতনতা এবং সতর্কতার কোনো বিকল্প নেই। এখনই এই দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ প্রয়োজন।

বজ্রপাতের প্রকোপ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায় হিসেবে প্রথমত, দেশের বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলো শনাক্ত করতে হবে আবহাওয়া জরিপের ভিত্তিতে। দ্বিতীয়ত, বর্তমানে গণমাধ্যমের বদৌলতে আমরা যেসব তথ্য পাই তা থেকে দেখা যায়, দেশের ১৪টি জেলা বজ্রপাতের ঝুঁকির আওতায় রয়েছে, এর মধ্যে সুনামগঞ্জের নাম ওপরের দিকে রয়েছে।

তাই এলাকার মানুষকে এই বার্তাটি দেয়ার দায়িত্ব কার? অবশ্যই সরকারের; তবে স্থানীয়ভাবে কর্মরত সামাজিক সংগঠনগুলোর দায়িত্বও কম নয়। যেহেতু মার্চ থেকে মে পর্যন্ত এই বজ্রপাতের প্রকোপ বেশি, তাই বিভিন্নভাবে প্রচার, সতর্কীকরণ, সামাজিক সভা ও মাইকিং করা যেতে পারে।

যেসব বিষয় এতে স্থান পাবে তা হলো, বজ্রপাতের সময় পাকা ভবনের নিচে আশ্রয় নেয়া, উঁচু গাছপালা ও বিদ্যুতের খুঁটি থেকে দূরে থাকা, বাড়ির জানালা থেকে দূরে থাকা, ধাতব বস্তু স্পর্শ না করা, বিদ্যুৎ-চালিত যন্ত্র থেকে দূরে থাকা, গাড়ির ভেতরে না থাকা, পানি থেকে দূরে থাকা, বজ্রপাতের আশঙ্কা দেখা দিলে নিচু হয়ে বসা, রাবারের জুতা ব্যবহার করা, বজ্রপাতজনিত আহত ব্যক্তিদের দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা ইত্যাদি।

জলবায়ু পরিবর্তন, বনভূমির পরিমাণ হ্রাস, বড় গাছ কাটা ও বৈদ্যুতিক বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ব্যবহার বাড়ার কারণে বজ্রপাত ও ক্ষয়ক্ষতি দুটিই বেড়েছে। একটি দেশের আয়তনের এক-চতুর্থাংশ বনভূমি থাকা প্রয়োজন, কিন্তু আমাদের দেশে সামাজিক বনভূমির পরিমাণ হিসাবে আনলেও তা কোনোভাবেই ২৫ শতাংশ হয় না। তাই প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য বনভূমির পরিমাণ বাড়াতে হবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে সদ্ব্যবহারের মাধ্যমে সখ্য গড়ে তুলতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রে বজ্রপাতে আগে বছরে ৪০০ থেকে ৪৫০ জন নিহত হতো, সেখানে এখন মারা যায় ২০ থেকে ৪০ জন। গত বছর নিহত হয়েছে মাত্র ১৬ জন।

গবেষকরা বলছেন, নগরায়ণের কারণে এটা সম্ভব হয়েছে। আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক বেশি মানুষ নগরে থাকছে। বিদ্যুতের লম্বা খুঁটি মানুষের উচ্চতার অনেক ওপরে থাকায় আর খুঁটির সঙ্গে আর্থিংয়ের ব্যবস্থা বজ্রপাত থেকে মানুষের জীবনহানি রোধ করে।

ক্ষয়ক্ষতি হয় বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির। বড় গাছ ধ্বংস করে ফেলার কারণে আমাদের গ্রামাঞ্চল অরক্ষিত হয়ে পড়ছে। গ্রামে আগের জমিদার বাড়ির ছাদে, মন্দিরের চূড়ায় কিংবা মসজিদের মিনারে যে ত্রিশূল বা চাঁদ-তারা দিয়ে আর্থিং করা থাকত, সেটাও বজ্রপাতের প্রাণহানি থেকে মানুষকে রক্ষা করত।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের হাওরাঞ্চল (সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া), সাতক্ষীরা-যশোরের বিল অঞ্চল আর উত্তরের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও দিনাজপুর অঞ্চলে বজ্রপাতে প্রাণহানির ঘটনা বেশি ঘটে। আর গত বছর প্রায় ৫৭ শতাংশ মানুষই মারা যান মাঠে অথবা জলাধারে (নদী-খাল, বিল) কাজ করার সময়। এসব অঞ্চলে মুঠোফোনের টাওয়ার লাইটেনিং এরস্টোর লাগিয়ে বজ্রপাতের ঝুঁকি কমানো যায়। মুঠোফোন কোম্পানিগুলো তাদের দায়িত্বের অংশ হিসেবে কাজটি করতে পারে। পল্লী বিদ্যুৎ ও সীমান্তরক্ষীদের সব স্থাপনায় কমবেশি এটি ব্যবহৃত হচ্ছে।

বজ্রপাত থেকে বাঁচতে সচেতনতার বিকল্প নেই। সতর্ক হলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো যেতে পারে। দুঃখজনক সত্যটি হলো, বাংলাদেশে বজ্রপাতের ওপর তেমন কোনো গবেষণা নেই। তবে ইউরোপ, জাপান ও আমেরিকায় এ বিষয়টি নিয়ে বড় গবেষণা চলছে।

আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে, অন্য যেকোনো দুর্যোগের চেয়ে বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যুহার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করলেও এর ঝুঁকি কমাতে দৃশ্যমান উদ্যোগ কম। বজ্রপাতের ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রাথমিক পর্যায়ে সারা দেশে তালগাছের ৫০ লাখ চারা রোপণের উদ্যোগ নিলেও এটিও খুব একটি কার্যকর নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর, বুয়েট, দুর্যোগ ফোরাম, গণমাধ্যমের তথ্য ও একাধিক স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার হিসাবমতে, গত ছয় বছরে সারা দেশে বজ্রপাতে সাড়ে ৩ হাজারেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। বজ্রপাতের এমন প্রবণতাই বলে দিচ্ছে প্রকৃতি কতটা রুষ্ট হয়ে উঠছে। মানুষের অধিক চাহিদা আর লোভে প্রাকৃতিক পরিবেশ বিনষ্টের খেসারত হিসেবে প্রকৃতির প্রতিশোধ কি বজ্রপাত? সে বিষয় নিয়ে এখন ভেবে দেখার সময় এসেছে।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক ও সাবেক উপমহাপরিচালক, বাংলাদেশ আনসার ও ভিডিপি

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন

নারীর মর্যাদা সুরক্ষায় প্রত্যাশা

নারীর মর্যাদা সুরক্ষায় প্রত্যাশা

উঠতি বয়সী মেয়েরা দ্রুত জনপ্রিয় হতে গিয়ে অপরাধের শিকার হচ্ছে। যেমন টিকটক, লাইকির মতো ভিডিও বা লাইভ অ্যাপে দ্রুত তারকা হওয়ার ইচ্ছা থাকে কম বয়সী অনেক ছেলেমেয়ের। লাখ লাখ ফলোয়ার বা লাইকের আশায় অনেকেই এসব মাধ্যমে মগ্ন হয়ে পড়ে। আর এর সুযোগ নেয় অপরাধীরা। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা নারীদের স্বাবলম্বী দেখতে চাচ্ছি কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

পরিবারে মেয়ে মানেই ঝামেলা; মেয়ে মানেই দুশ্চিন্তা- এমন ধারণা পরিবার এবং সমাজে বহুকাল ধরেই প্রচলিত। মা, দাদি, চাচি ,ফুফু, মামিদের প্রতি একরকম নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে শুনতে বড় হয় একটি কন্যাশিশু। তার মনেও ‘মেয়েছেলে’ বা ‘মেয়েমানুষ’-এর প্রতি এবং একই সঙ্গে মেয়ে হিসেবে নিজের প্রতি হীনম্মন্যতা বোধ জন্ম নেয়। নারীর প্রতি সম্মানের একটা ‘মানদণ্ড’ তৈরি হয়ে যায়। তাছাড়া পরিবারে ছেলেসন্তানের তুলনায় কন্যা হিসেবে নিত্যদিনের বৈষম্যমূলক আচরণে একরকম ভবিতব্য বলেই ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়।

ছোট থেকেই এটা করবে না, সেটা করা বারণ, কারণ তুমি মেয়ে- এ রকম বিধিনিষেধের বেড়াজালে কঠোর পরিবেশে বড় হতে হয় একটি মেয়েশিশুকে। প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরে তাদের জানা বা বোঝার সুযোগ খুব সীমিত। তবে পরিবার বা আশপাশের পরিবেশে থেকে সামাজিক বিভিন্ন ঘটনাবলি থেকে মেয়েশিশুদের মধ্যে মানুষ সম্পর্কে একটা সহজাত ধারণা জন্মলাভ করে।

অল্প বয়সেই সে বুঝতে পারে কে তার প্রতি স্নেহের দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে, কে তার প্রতি কু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। কে তাকে ভালোবাসে আর কে তাকে হিংসা করে। এভাবেই কোনটা ভালো বা কোনটা খারাপ সেসব বিষয়ে তার মনে একটা নিজস্ব ধারণা জন্ম নেয়। অনেক ক্ষেত্রে সেটা পরিপূর্ণ না-ও হতে পারে।

নারীকে ইতিবাচকভাবে দেখতে চাইলে শিক্ষা বা কর্মক্ষেত্রে তাদের সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং ঠিকভাবে গড়ে উঠতে দিতে হবে। পরিবারের উচিত তার শিশুকে ছোট থেকেই নানান বিষয় নিয়ে আলোচনা ও পরিবারের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে কিছু বিষয়ে শিশু বা নারীর মতামতকে গুরুত্ব দেয়া। পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্রীয় ভালোমন্দ বিষয়গুলো বয়সভেদে বোঝানোর দায়িত্ব পরিবারের। নয়তো নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা মেয়েরা যখন হঠাৎ হাতে প্রযুক্তি পায়, স্বাধীনভাবে চলাফেরার সুযোগ পায় তখন ভালোমন্দ না বুঝেই নানা ধরনের ফাঁদে পড়ে, তৈরি হয় জটিল পরিস্থিতি।

অনিরাপত্তা নারীর জীবনের উন্নতিতে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

বাড়িতে, চলতি পথে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অফিসে এমনকি অনলাইনে নারীরা নানানভাবে নির্যাতিত বা প্রতারণার শিকার হয়। এখন নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার অন্যতম মাধ্যম হয়েছে ইন্টারনেট দুনিয়া। অনলাইন জগৎ যেমন দূরকে হাতের মুঠোয় এনেছে, তেমনি এর মাধ্যমে অপরাধও বেড়েছে অনেক। এর ফাঁদে পড়ে কিশোরী বা উঠতি বয়সী মেয়েরা দ্রুত জনপ্রিয় হতে গিয়ে অপরাধের শিকার হচ্ছে।

যেমন টিকটক, লাইকির মতো ভিডিও বা লাইভ অ্যাপে দ্রুত তারকা হওয়ার ইচ্ছা থাকে কম বয়সী অনেক ছেলেমেয়ের। লাখ লাখ ফলোয়ার বা লাইকের আশায় অনেকেই এসব মাধ্যমে মগ্ন হয়ে পড়ে। আর এর সুযোগ নেয় অপরাধীরা। প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা নারীদের স্বাবলম্বী দেখতে চাচ্ছি কিন্তু তাদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করতে বেগ পেতে হচ্ছে।

প্রায় প্রতিদিনই গণমাধ্যমে নানা প্রান্ত থেকে ধর্ষণ আর নারী নিগ্রহের খবর আসছে। ধর্ষণ, নির্যাতন বা হয়রানি, যে রকমই হোক না কেন, নারীদের প্রতি এই আচরণ সরাসরি মানবিক মর্যাদার লঙ্ঘন। যা ব্যক্তিগত আঘাত বা যন্ত্রণা সহ্য করে বেঁচে থাকতে হয়। সম্প্রতি কিছু নারী ধর্ষণ ও নিগ্রহের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় অভিযুক্ত অপরাধীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, আবার তনু হত্যার মতো ঘটনায় তাদের নিষ্ক্রিয়তা মানুষকে হতাশ করেছে।

ইউনিসেফের এক জরিপে জানা যায়, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী ১০ থেকে ১৭ বছর বয়সীদের ৩২ শতাংশ শিশু অনলাইন সহিংসতা, অনলাইনে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও ডিজিটাল উৎপীড়নের শিকার হওয়ার মতো বিপদের মুখে রয়েছে। সেখানে ৬৩ শতাংশ ছেলে এবং ৪৮ শতাংশ মেয়ে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। এ ছাড়া বলা হয়, ব্যবহারকারীদের মধ্যে ৭০ শতাংশ ছেলে ও ৪৪ শতাংশ মেয়ে অনলাইনে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্বের অনুরোধ গ্রহণ করে।

কোভিড-১৯ আমাদের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। দেশের স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, বেকারত্ব, বিশৃঙ্খলা, নারী-শিশু নির্যাতন, বাল্যবিবাহ সব ক্ষেত্রেই একটা অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যদিও গত বছর বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের মূল প্রতিপাদ্য বিষয় নির্ধারণ করা হয় ‘কোভিড-১৯ প্রতিরোধ করি: নারী ও কিশোরীদের সুস্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিত করি’।

স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে নারী ও কিশোরীদের অধিকতর সুরক্ষা দেয়া যায়, তা নিয়ে ভাবনা ও যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়। কিন্তু বর্তমানে যেসব ঘটনা ঘটছে তাতে কি মনে হয় আদৌ এটা আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি? সামাজিক প্রেক্ষাপটে যে ধরনের খবর পাওয়া যাচ্ছে তাতে নারী ও কিশোরীরা রয়েছে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টে পৌঁছানো এবং আন্তর্জাতিক জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সম্মেলনের (আইসিপিডি) প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের ভিত্তিমূলে তিনটি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এগুলো হলো অধিকার ও পছন্দ, সমতা ও জীবনের গুণগত উন্নয়ন।

এগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো মাতৃমৃত্যুর হার, যৌন সহিংসতা, নারী নির্যাতন ও বাল্যবিবাহের হার কমিয়ে শূন্যে নামানো। যদিও বাস্তবে এর চিত্র অন্যরকম। করোনাকালে বাল্যবিবাহের হার বেড়ে গেছে। আর এর অন্যতম কারণ অর্থনৈতিক টানাপোড়েনের সময়ে মেয়েশিশুকে বাড়তি বোঝা মনে করে অনেক পরিবার।

এদিকে, জাতিসংঘে এ বছরে নারী দিবসের স্লোগান ছিল ‘করোনা বিশ্বে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধ করি, সমতা অর্জনে নারী নেতৃত্ব নিশ্চিত করি’। এই স্লোগানের সঙ্গে মিল রেখে বাংলাদেশ সরকার ‘করোনাকালে নারী নেতৃত্ব, গড়বে নতুন সমতার বিশ্ব’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে দিবসটি পালন করে।

নারীর প্রতি সমতার চ্যালেঞ্জ এখন সবখানেই। পরিবার-সমাজ, সম্পদ-দক্ষতা, উচ্চশিক্ষা-জীবিকা, রাজনৈতিক ক্ষমতা, অবস্থানগত ক্ষেত্রগুলোতে বাংলাদেশের নারীরা অনেকটাই এগিয়েছে। তবে পুরুষের তুলনায় এ সংখ্যা বেশ পিছিয়ে। নারী-পুরুষের সমান সুযোগ, অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা এখনও সমাজের বড় চ্যালেঞ্জ।

নারীদের শিক্ষায় অগ্রগতি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। সরকারের শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৯ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রাথমিক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্রীর হার প্রায় ৫১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকেও প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ছাত্রী। তবে উচ্চশিক্ষায় এখনও ঝরে পড়ার হার বেশি।

সমাজ বা রাষ্ট্রে দু-চার জায়গায় নারীদের ভালো অবস্থান হয়নি তা বলা যাবে না। নারীরা কিন্তু এগিয়ে আসছেন, নেতৃত্ব দিচ্ছেন। যদিও নারীর উন্নয়ন, নারীর ক্ষমতায়ন, নারীর সম-অধিকার-সমমর্যাদা প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার বিভিন্ন আইন-নীতি, কৌশল প্রণয়ন করেছে এবং তা বাস্তবায়ন করছে।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
বিদেশের হাতছানিতে মেধাশূন্য হতে চলেছে দেশ
পিবিআইর সাফল্য, প্রত্যাশা ও শঙ্কা
রাষ্ট্রহারা দুখী ফিলিস্তিনিদের কান্না
বয়কট এবং একটি বিজ্ঞাপনের মর্মাহত প্রতিক্রিয়া
করোনার ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট: সংক্রমণ কমাতে আগাম সতর্কতা জরুরি

শেয়ার করুন