× হোম জাতীয় রাজধানী সারা দেশ অনুসন্ধান বিশেষ রাজনীতি আইন-অপরাধ ফলোআপ কৃষি বিজ্ঞান চাকরি-ক্যারিয়ার প্রযুক্তি উদ্যোগ আয়োজন ফোরাম অন্যান্য ঐতিহ্য বিনোদন সাহিত্য ইভেন্ট শিল্প উৎসব ধর্ম ট্রেন্ড রূপচর্চা টিপস ফুড অ্যান্ড ট্রাভেল সোশ্যাল মিডিয়া বিচিত্র সিটিজেন জার্নালিজম ব্যাংক পুঁজিবাজার বিমা বাজার অন্যান্য ট্রান্সজেন্ডার নারী পুরুষ নির্বাচন রেস অন্যান্য স্বপ্ন বাজেট আরব বিশ্ব পরিবেশ কী-কেন ১৫ আগস্ট আফগানিস্তান বিশ্লেষণ ইন্টারভিউ মুজিব শতবর্ষ ভিডিও ক্রিকেট প্রবাসী দক্ষিণ এশিয়া আমেরিকা ইউরোপ সিনেমা নাটক মিউজিক শোবিজ অন্যান্য ক্যাম্পাস পরীক্ষা শিক্ষক গবেষণা অন্যান্য কোভিড ১৯ শারীরিক স্বাস্থ্য মানসিক স্বাস্থ্য যৌনতা-প্রজনন অন্যান্য উদ্ভাবন আফ্রিকা ফুটবল ভাষান্তর অন্যান্য ব্লকচেইন অন্যান্য পডকাস্ট আমাদের সম্পর্কে যোগাযোগ প্রাইভেসি পলিসি

বিশ্লেষণ
সাংবাদিক কি প্রতিপক্ষ?
hear-news
player
google_news print-icon

সাংবাদিক কি প্রতিপক্ষ?

সাংবাদিক-কি-প্রতিপক্ষ?
কারা সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ বা শত্রু ভাবে? উত্তর সহজ, যারা নিজেদের অন্যায় আড়াল করতে চায়, যারা অপরাধী- তারাই সাংবাদিককে ভয় পায় বা প্রতিপক্ষ ভাবে। কারণ, একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন পুলিশ, একজন ঠিকাদার, একজন অন্য যেকোনো পেশার মানুষ যখন অন্যায় করে, সেই অন্যায়টি একজন অন্য পেশার মানুষ দেখে ফেললে বা জেনে গেলে সেটি যত না ঝুঁকি তৈরি করে, একজন সৎ সাংবাদিক জেনে গেলে সেই ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়। কারণ, একজন সৎ সাংবাদিককে টাকা দিয়ে কেনা যায় না।

সম্ভবত ইতিহাসের সবচেয়ে খারাপ সময় পার করছেন দেশের সাংবাদিকরা, তথা পুরো গণমাধ্যম। সমালোচনার তিরবিদ্ধ করছে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত এই খাতকে। যে সাংবাদিকদের বলা হয় জাতির বিবেক, তাদের বিবেক নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে। যে গণমাধ্যমকর্মীরা রাষ্ট্রের নানা শ্রেণিপেশার মানুষ ও প্রতিষ্ঠানের অন্যায় ও অনিয়ম অনুসন্ধান করে বের করে আনেন, তাদের কর্মকাণ্ডই এখন প্রশ্নের মুখে। সোশ্যাল মিডিয়ায় চোখ রাখলে মনে হবে, রাষ্ট্রের সব অংশের মানুষই বুঝি এখন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ। আসলে কি তাই? সাংবাদিকরা কি সবার প্রতিপক্ষ?

ঘটনার সূত্রপাত দেশের একটি বড় শিল্প গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ‘বান্ধবী’র মৃত্যু নিয়ে। বলা হচ্ছে, এটি আত্মহত্যা এবং আত্মহত্যার প্ররোচনা দেয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে। কিন্তু সমালোচনার সূত্রপাত এই ঘটনার সংবাদ প্রকাশ ও প্রচার নিয়ে।

সাংবাদিকতার প্রাথমিক পাঠেই বলা আছে যে, ভিকটিমের ছবি প্রকাশ করা যাবে না। প্রয়োজন হলে ছবি ব্লার বা ঝাপসা করে দিতে হবে। কিন্তু এই ঘটনায় দেখা গেল উলটো কাণ্ড। দেশের দুটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে ভিকটিম তরুণীর ছবিটা স্পষ্ট থাকলেও অভিযুক্তর ছবিটা ব্লার। যা প্রশ্নের মুখে ফেলেছে পুরো সাংবাদিকতাকে। সাংবাদিকতার নীতি-নৈতিকতাকে। এরপর শুরু হয় ওই এমডির বান্ধবীর বিরুদ্ধে কথিত অসুন্ধানী সাংবাদিকতা। দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদ চ্যানেলের অনলাইনের কয়েকটি শিরোনাম এরকম: ১. মুনিয়ার চার প্রেমিক! ২. লাখ টাকার ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন তরুণী, ৩. অভিনেতা বাপ্পীর সঙ্গে গভীর প্রেম ছিল মুনিয়ার, ৪. মুনিয়ার ডায়েরিতে কী আছে? ৫. উনি আমাকে ভোগ করেছেন, বিয়ে করবেন না, ৬. মুনিয়ার মৃত্যু, অডিও ক্লিপ ভাইরাল। কদিন পরে এই দৌড়ে নামে কয়েকটি সংবাদপত্রও— যার মধ্যে দুয়েকটি দায়িত্বশীল সংবাদপত্রও রয়েছে।

গণমাধ্যমের একরকম আচরণের তীব্র সমালোচনা শুরু হয় সোশ্যাল মিডিয়ায়। শুধু অ্যাকাডেমিক সমালোচনা নয়, অকথ্য ভাষায় গালাগাল এবং সামগ্রিকভাবে পুরো সাংবাদিকতা নিয়েই প্রশ্ন তোলা হয়। সাংবাদিকদের প্রতি যারা নানা কারণে বিরূপ, তারাও সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষোদ্গারের এই সুযোগটি কাজে লাগান।

করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে গণমাধ্যম ও সাংবাদিকরা কতটা জিম্মি— এই ঘটনায় সেটি সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষকে এটা বোঝানো সম্ভব নয় যে, সাংবাদিকদের কতগুলো পক্ষের সঙ্গে আপস বা লড়াই করে টিকে থাকতে হয়। এসব পক্ষের মধ্যে রয়েছে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক, বিজ্ঞাপনদাতা বড় বড় প্রতিষ্ঠান, সরকার, ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল, উগ্রবাদী বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠন, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত সাংবাদিকদেরই বিভিন্ন সংগঠন। ফলে যখনই কোনো একটি সংবাদ কোনো গোষ্ঠীর বিপক্ষে যায়, তারাই গণমাধ্যমকে শত্রু বিবেচনা করে এবং ব্যবস্থা নিতে উদ্যত হয়।

সেটি কখনও বিজ্ঞাপন বন্ধ করে; কখনও সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের রিপোর্টার ও সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে; কখনও রিপোর্টারকে শারীরিকভাবে আক্রমণ করে; কখনও বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীকে দিয়ে ভয়-ভীতি দেখিয়ে; কখনও মোটা অংকের পয়সা দিয়ে সাংবাদিকদের কিনে নিয়ে; এমনকি কখনও নিবন্ধন বাতিল বা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে।

পৃথিবীর আর কোনো পেশার মানুষকে এতগুলো পক্ষের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকতে হয় না। অথচ এই পক্ষগুলোই গণমাধ্যমের মূল অংশীজন বা স্টেকহোল্ডার। কিন্তু অনেক সময়ই এসব অংশীজন প্রতিপক্ষে পরিণত হয় এবং গণমাধ্যমকে তার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়। তার ওপর সাংবাদিকদের বিরাট অংশেরই চাকরির নিশ্চয়তা নেই। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে পেশাদারত্ব গড়ে ওঠেনি। সুতরাং, এত সব সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করতে হয় যে গোষ্ঠীকে, তাদের কাছ থেকে সব সময় নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতা প্রত্যাশা করা কতটুকু সমীচীন—তাও ভেবে দেখা দরকার।

এত সব সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গণমাধ্যম সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদটিই পরিবেশন করবে, মানুষের এটিই প্রত্যাশা। কিন্তু গণমাধ্যম সব সময় সেটি পারে না। আবার সব সংবাদেরই যেহেতু পক্ষ-বিপক্ষ আছে, ফলে একটি খবর যখন কারও পক্ষে যায়, সেটি কারও বিপক্ষেও যেতে পারে। যখনই কারও বিপক্ষে যায়, তখনই তিনি গণমাধ্যমকে শত্রু বিবেচনা করেন। সাংবাদিকদের সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠ কোনো ব্যক্তিও মুহূর্তেই গণমাধ্যমকে শত্রু ভাবা শুরু করতে পারেন, যদি তার স্বার্থের বিরুদ্ধে কোনো সংবাদ পরিবেশিত হয়।

ধর্মভিত্তিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ডাকা হরতালে নারায়ণগঞ্জের মৌচাক, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম এলাকাসহ বিভিন্ন স্থানে তথ্য সংগ্রহ ও ছবি তোলার সময় বেশ কজন সাংবাদিক লাঞ্ছিত হন। টেলিভিশনের গাড়িও জ্বালিয়ে দেয়া হয়। শুধু তাই নয়, একজন রিপোর্টারের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে ‘কলেমা’ পাঠ করানো হয়েছে বলেও গণমাধ্যমের খবর বেরিয়েছে। হেফাজতে ইসলামের দাবি, গণমাধ্যম ‘সঠিক সংবাদ’ প্রচার করে না, তাই এই আক্রমণ।

প্রত্যক্ষদর্শী ও আহত সাংবাদিকরা বলেছেন, ‘ছবি তুলবি না’ বলেই তাদের ওপর হামলা করা হয়। তবে শুধু হেফাজতে ইসলামই নয়, সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধেও। তার মানে হলো, কোনো একটি পক্ষ যখন সাংবাদিকদের কারণে নিজেদের অন্যায় কাজটি অবাধে করতে পারে না বা করলেও সেটি সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাওয়ার ভয় থাকে, তখনই তারা সাংবাদিককে প্রতিপক্ষ ভাবে। এখানে লড়াইটা তখন আর সাংবাদিক বনাম হামলাকারী নয়- বরং লড়াইটা যখন সাদা-কালোর, লড়াইটা তখন শুভ-অশুভর।

স্মরণ করা যেতে পারে, ২০১৮ সালে সড়কে নিরাপত্তার দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সংবাদ কাভার করতে গিয়ে বেশ কজন সাংবাদিক নির্মম মারধরের শিকার হন। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর হামলা চালায় হেলমেটপরা একদল লোক। তাদের কারো কারো পরিচয়ও তখন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। সায়েন্স ল্যাব, সিটি কলেজ, ধানমন্ডি ২ নম্বর ও জিগাতলা এলাকায় সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়ে ক্যামেরা ও মোবাইল ছিনিয়ে নেয়া হয়। কারো কারো ক্যামেরা ভেঙে ফেলা হয়। তাদের দিকে ইট-পাটকেল ছোড়া হয়। হুমকি-ধমকি দিয়ে দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়ার পাশাপাশি ছবি তুললে পেটানো হবে বলে শাসানো হয়।

সবশেষ নোয়াখালীতে এক সাংবাদিক খুন হয়েছেন। গণমাধ্যমের খবর বলছে, সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে কাদের মির্জার ‘মিথ্যাচারের’ প্রতিবাদে গত ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চাপরাশিরহাট বাজারে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি বিকেল পাঁচটায় বাজারসংলগ্ন তার বাড়ি থেকে বের হয়ে চাপরাশিরহাট মধ্যম বাজারে গেলে কাদের মির্জার অনুসারীরা মিছিলে হামলা চালায়। এ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ ও গোলাগুলি চলাকালে কর্তব্যরত দৈনিক বাংলাদেশ সমাচার পত্রিকার নোয়াখালী প্রতিনিধি বুরহান উদ্দিন গুলিবিদ্ধ হন। পরের দিন রাত পৌনে ১১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।

এখানে সাংবাদিক কারও প্রতিপক্ষ ছিলেন না। কিন্তু দুপক্ষের রেষারেষিতে প্রাণ গেছে। অর্থাৎ সাংবাদিকরা একদিকে নানা গোষ্ঠীর প্রতিপক্ষ, অন্যদিকে বিবদমান গোষ্ঠীর ক্রসফায়ারেও পড়েন। কিন্তু এ যাবত যত সাংবাদিক নিহত হয়েছেন, তার বিচারের বাণী নীরবে-নিভৃতে কাঁদে।

যে সাংবাদিকরা সব অন্যায়ের বিচারের কথা লেখেন, সেই সাংবাদিকদের নিহত হওয়া বা তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হলেও তাদের পাশে কেউ থাকে না। বরং সুযোগ পেলেই গালাগালি আর বিষোদ্গারের ডালি খুলে বসে। যে সাংবাদিকরা পোশাক ও পরিবহন শ্রমিকসহ নানা পেশার মানুষের বেতন বৈষম্য ও মানবাধিকারের কথা লেখেন, প্রচার করেন, সেই সাংবাদিকদের নিজেদের বেতনের দাবিতেই রাজপথে দাঁড়াতে হয়। তাদের পাশে অন্য পেশার মানুষ এসে দাঁড়ায় না। যার সবশেষ উদাহরণ দৈনিক জনকণ্ঠ। নিয়মিত বিরতিতে বড় বড় প্রতিষ্ঠান থেকেও সাংবাদিকদের চাকরিচ্যুত করা হয়। সবশেষ মাসের বেতনও অনেকে পান না। কিন্তু এসব বঞ্চনার গল্পগুলো আড়ালেই থেকে যায়।

সাংবাদিকরা যুগে যুগেই ক্ষমতাসীন এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের প্রতিপক্ষ হিসেবে আক্রমণের শিকার হয়েছে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে একটা সময় পর্যন্ত আন্ডারগ্রাউন্ড রাজনৈতিক দল বিশেষ করে সর্বহারা পার্টির লোকদের বড় টার্গেট ছিলেন সাংবাদিকরা। সেই আতঙ্ক কেটে গেলেও এখন সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ ভাবে অন্যান্য ক্ষমতাবান গোষ্ঠী, যেমন বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন। খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর শ্রমিকরা মাঝেমধ্যেই আন্দোলনে নামেন।

সাংবাদিকরা তাদের সেই আন্দোলনের খবর দেন। টেলিভিশনগুলো সরাসরি সম্প্রচার করে। পাটশ্রমিকদের প্রতি সাংবাদিকরা বরাবরই সংবেদনশীল। অথচ এই শ্রমিকরাই সাংবাদিকদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল করেন বলে অভিযোগ আছে। অপরদিকে শ্রমিকদের অভিযোগ, সাংবাদিকরা তাদের খবর যথাযথভাবে পরিবেশন করেন না। বাস্তবতা হলো, শ্রমিকদের সবচেয়ে বড় বন্ধু এই সাংবাদিকরাই। কিন্তু শ্রমিকরা তাদেরকেই প্রতিপক্ষ ভাবেন। পরিবহন শ্রমিকরাও মাঝেমধ্যে নানা দাবিতে রাস্তায় নামেন। সাংবাদিকরা নিরপেক্ষ অবস্থানে থেকে সেই খবর প্রকাশ ও প্রচার করলেও সাংবাদিকরা বিভিন্ন সময়ে পরিবহন শ্রমিকদের হামলার শিকার হন।

কারা সাংবাদিকদের প্রতিপক্ষ বা শত্রু ভাবে? উত্তর সহজ, যারা নিজেদের অন্যায় আড়াল করতে চায়, যারা অপরাধী- তারাই সাংবাদিককে ভয় পায় বা প্রতিপক্ষ ভাবে। কারণ একজন সরকারি কর্মকর্তা, একজন পুলিশ, একজন ঠিকাদার, একজন অন্য যেকোনো পেশার মানুষ যখন অন্যায় করেন, সেই অন্যায়টি একজন অন্য পেশার মানুষ দেখে ফেললে বা জেনে গেলে সেটি যত না ঝুঁকি তৈরি করে, একজন সৎ সাংবাদিক জেনে গেলে সেই ঝুঁকির মাত্রা বেড়ে যায়। কারণ একজন সৎ সাংবাদিককে টাকা দিয়ে কেনা যায় না। ফলে তিনি অন্যায়টি প্রকাশ ও প্রচার করবেন। অপরাধীদের ভয় এখানেই।

এটা ওপেন সিক্রেট যে, পুলিশ বা অন্য যেকোনো পেশার অসৎ লোকেরা সাংবাদিক ছাড়া কাউকেই ভয় পায় না বা তোয়াজ করে না। ফলে সুযোগ পেলেই তারা সাংবাদিকের ওপর চড়াও হয়। ক্ষমতাবানরা জানে, তাদের অন্যায় কাজগুলো দেশের মানুষ শুধু এই সাংবাদিকদের কারণেই জানতে পারে। না হলে দেশ বহু আগেই লুটপাট করে খেয়ে ফেলত তারা। কিন্তু যেহেতু তারা এই অবাধ লুটপাট করতে পারে না শুধু গণমাধ্যমের ভয়ে, তাই গণমাধ্যমই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ; শত্রু।

নির্মম বাস্তবতা হলো, একজন রাজনৈতিক নেতা যখন বিপদে পড়েন, তিনি প্রথম ফোনটা করেন তার ঘনিষ্ঠ কোনো সাংবাদিককে। একজন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আইনজীবী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী- প্রত্যেকেই বিপদে পড়লে প্রথম ফোনটা সাংবাদিককে করেন। তাদের ধারণা বা বিশ্বাস, সাংবাদিকরা তাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে না পারলেও অন্তত উদ্ধারের পথ বাতলে দেবেন। অথচ এই লোকগুলোই সুযোগ পেলে সকাল-সন্ধ্যায় সাংবাদিকের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেন। কিন্তু সাংবাদিক যখন রাস্তায় মার খান, সাংবাদিককে যখন রাজনৈতিক দলের ক্যাডাররা পেটায়, সাংবাদিককে যখন পুলিশ পেটায়, সাংবাদিককে যখন আন্দোলনকারী এবং আন্দোলনবিরোধীরা পেটায়—তখন সাংবাদিক কাকে ফোন করবে? সাংবাদিক কার কাছে বিচার চাইবে?

মুদ্রার অন্যপিঠও আছে। সাংবাদিকতার নামে ব্ল্যাকমেইলিং, চাঁদাবাজি, চাঁদাবাজি করতে গিয়ে গণধোলাইয়ের শিকার হওয়া, করপোরেট স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া, ভুইফোঁড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল, আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা, কথিত অনলাইন টিভি ইত্যাদি প্লাটফর্ম ব্যবহার করে সাংবাদিকতার নামে নানারকম ধান্দাবাজির কারণে পুরো গণমাধ্যমই এখন প্রশ্নের মুখে। যে কারণে যখনই গণমাধ্যমের নেতিবাচক কোনো খবর গণমাধ্যমে আসে বা সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে যায়, মানুষের রাগ-ক্ষোভ বিস্ফোরিত হয়। যে গণমাধ্যম তাদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ, সেবের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার শুরু হয়। অনেকে সাংবাদিকদের প্রতি অতীতের কোনো ঘটনায় ক্ষুব্ধ বা ঈর্ষান্বিত থাকলে তিনিও সেই বিষোদ্গার ও গালাগালির মিছিলে শামিল হন।

বাংলাদেশের গণমাধ্যম কতটুকু স্বাধীন ও নিরপেক্ষ, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এ কথা বোধ হয় কেউই অস্বীকার করবেন না যে, এই সীমিত স্বাধীনতা ও নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও গণমাধ্যমই দেশকে টিকিয়ে রেখেছে। কারণ চারপাশে এত বেশি খারাপ লোকের আধিপত্য যে, তারা কেবল ক্যামেরাগুলোকেই ভয় পায়। না হলে বহু আগেই সবকিছু পেটের ভেতরে নিয়ে যেত। যেহেতু সবকিছু পেটের ভেতরে নিয়ে হজম করার পথে প্রধান অন্তরায় গণমাধ্যম, অতএব তারাই শত্রু, তারাই প্রতিপক্ষ।

রাষ্ট্রও জানে তার সব কার্যক্রমে নজর রাখে গণমাধ্যম। ফলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনের মতো গণমাধ্যমকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে পিটিয়ে বা মামলা দিয়ে শায়েস্তা করা না গেলেও রাষ্ট্র এমন পরিস্থিতি তৈরি করে রাখতে চায়, যাতে গণমাধ্যম নিজেই নিজের অস্তিত্ব নিয়ে সংকটে পড়ে এবং সেই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই করতে গিয়ে অন্যদিকে নজর দেয়ার সুযোগ না পায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ঘুষ: সমাজের ক্ষয় ও ক্ষরণ
রাষ্ট্রক্ষমতা দখলে ‘বদর যুদ্ধের’ ডাক ও কিছু জিজ্ঞাসা
উত্তাল তরঙ্গে বঙ্গবন্ধুর দর্শনই আশার তরী
করোনায় অন্ধকারে পথ হাতড়াচ্ছি?
কিছু কোমলহৃদয় কেন ‘সুন্দর ভুবনে বাঁচিবারে’ চায় না?

মন্তব্য

আরও পড়ুন

বিশ্লেষণ
Safe nutritious food and reality

নিরাপদ পুষ্টিকর খাদ্য ও বাস্তবতা

নিরাপদ পুষ্টিকর খাদ্য ও বাস্তবতা
নিরাপদ খাদ্য হলো মানসম্মত, ভেজালমুক্ত ও সঠিক গুণাগুণসমৃদ্ধ খাবার। অথচ আমাদের এখানে যেনতেনভাবে পেট ভরলেই তাকে খাবার হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। গড়পড়তা মানুষ মনে করে খাবার খেলেই হলো। পুষ্টি কী আর নিরাপদ খাদ্য কী- এসব বিষয় নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। খাদ্যের গুণাগুণ তো দূরের কথা, সেটি কতটা নিরাপদ তা নিয়েও বেশির ভাগেরই কোনো ভাবনা নেই।

‘সু-স্বাস্থ্যের মূলনীতি, নিরাপদ খাদ্য ও স্বাস্থ্যবিধি’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস। ২০১৮ সাল থেকে প্রতি বছর ২ ফেব্রুয়ারি দিবসটি উপলক্ষে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ দেশব্যাপী নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। ব্যতিক্রম হয়নি এবারও।

দিবসটি পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো, স্বাস্থ্যসম্মত ও পুষ্টিকর খাদ্য সম্পর্কে সবার মাঝে সচেতনতা জাগিয়ে তোলা। প্রশ্ন উঠতেই পারে, বিগত ৫ বছর ধরে ঘটা করে দিনটি পালনের মধ্যেই আমাদের তৎপরতা সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে কী না। মানুষ পুষ্টিকর সুষম খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কে কতটা সচেতন হয়েছে সে প্রশ্নও অবান্তর নয়।

সুষম ও নিরাপদ খাবার মানুষকে সুস্থ-স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে সাহায্য করে। তেমনি আবার অনিরাপদ খাদ্য মৃত্যুর কারণ হতে পারে। আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এমন একটি ধারণা প্রচলিত যে খাবার খাওয়ার মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পেট ভরা।

নিরাপদ খাদ্য হলো মানসম্মত, ভেজালমুক্ত ও সঠিক গুণাগুণসমৃদ্ধ খাবার। অথচ আমাদের এখানে যেনতেনভাবে পেট ভরলেই তাকে খাবার হিসেবে আখ্যা দেয়া হয়। গড়পড়তা মানুষ মনে করে খাবার খেলেই হলো। পুষ্টি কী আর নিরাপদ খাদ্য কী- এসব বিষয় নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। খাদ্যের গুণাগুণ তো দূরের কথা, সেটি কতটা নিরাপদ তা নিয়েও বেশির ভাগেরই কোনো ভাবনা নেই।

আবার অনেকে মনে করেন, নামিদামি খাবার মানেই তা পুষ্টিকর। কম দামের খাবারও যে অনেক নামিদামি খাবারের চেয়ে বেশি পুষ্টিকর হতে পারে সে বিষয়টি আমাদের অনেকেরই অজানা। খাবার কেনা বা গ্রহণ করার সময় দাম যাচাই না করে সেটির গুণাগুণ ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করাটা অপরিহার্য।

নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে আমরা এখনও উদাসীন। আমরা অনেকেই সময় বাঁচাতে সহজলভ্য, আকর্ষণীয় ও রেডিমেড খাবারে আসক্ত হয়ে পড়ছি। গরমে বাইরে বের হলে প্রবল তৃষ্ণায় অনেকেই ভিড় জমান রাস্তার পাশের লেবুর শরবত, ফলের জ্যুস, রং-বেরঙের পানীয় শরবতের দোকানের সামনে। অথচ সেগুলোতে ব্যবহৃত বরফের বেশিরভাগই জীবাণুযুক্ত সরবরাহ লাইনের পানি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়। আবার মিষ্টি স্বাদ আনতে ক্ষতিকর স্যাকারিন এবং আকর্ষণীয় করতে ব্যবহার করা হয় টেক্সটাইলের বিভিন্ন রং ও কেমিক্যাল।

রাজধানী ঢাকাসহ দেশের ছোট-বড় শহরগুলোর অলি-গলিতে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন ভাজা-পোড়া খাবারের দোকান। পিছিয়ে নেই টক-ঝাল মেশানো চটপটির পসরাও। এসব খাবার দেখতে খুবই আকর্ষণীয়, লোভনীয়। কিন্তু এই খাবারগুলোর বেশিরভাগই তৈরি করা হয় পচা-বাসি সামগ্রী ব্যবহার করে। ভাজার ক্ষেত্রে একই তেল বার বার ব্যবহার করা হয়, যেখানে তৈরি হয় ট্র্যান্স ফ্যাট।

অনিরাপদ দূষিত পানিতে নানা উপাদান মিশিয়ে তৈরি করা হয় টক পানি। অলি-গলিতে গড়ে উঠেছে ফাস্টফুডের দোকান, ছোট ছোট ফুডকোর্ট। এগুলো ফুটপাতের একটি অংশ হয়ে উঠেছে। সেসব দোকানে চলছে কম দামে নানা ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের রমরমা বেচাকেনা।

খাবার সুস্বাদু ও আকর্ষণীয় করে তুলতে এসবে ব্যবহার করা হচ্ছে স্বাদ বর্ধক নানা উপাদান- টেস্টিং সল্ট, নানা ধরনের সস ও ক্যাচাপ। বর্তমানে খাবারের স্বাদ বাড়াতে মাত্রাতিরিক্ত হারে মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট ব্যবহার করা হচ্ছে।

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অনেকের বাসায় সকালে কিংবা বিকেলের নাস্তার টেবিলে থাকছে পাউরুটি ও নানা ধরনের বেকারি আইটেম। গবেষণায় দেখা গেছে, এসব খাদ্যপণ্যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর পটাশিয়াম ব্রোমাইড ও ট্রান্সফ্যাটের উপস্থিতি থাকে।

আমরা পুষ্টিবিদেরা সব সময়ই খাদ্য তালিকায় দেশীয় মৌসুমি ফলমূল ও শাকসবজি রাখতে বলি। নির্দিষ্ট মৌসুমের ফলমূল ও শাকসবজিতে ক্ষতিকর উপাদানের পরিমাণ তুলনামূলক কম থাকে। তবে নির্দিষ্ট মৌসুম ছাড়া এবং দেশের বাইরে থেকে আমদানি করা নামি-দামি বিভিন্ন ফলমূল ও শাকসবজি সংরক্ষণের জন্য ফরমালিন জাতীয় বিভিন্ন রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। এসব স্বাস্থ্যে জন্য ক্ষতিকর।

খাবারে উপরোক্ত বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক উপাদান ও দূষিত পদার্থ মেশানোর ফলে খাবার অনিরাপদ ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। এসব অনিরাপদ খাদ্য গ্রহণের ফলে শরীরে সহজে বার্ধক্য আসছে, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে, হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে, কিডনি বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এভাবে শরীরে নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

অনিরাপদ খাদ্য রোগের জন্ম দেয়, অপুষ্টিকর খাদ্যে স্বাস্থ্যহানি ঘটে। একইসঙ্গে প্রজনন ক্ষমতা হ্রাস করে, অসুস্থ ও দুর্বল সন্তানের জন্ম দেয়। শিশু বয়স থেকে এসব ভেজাল ও অপুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণের প্রতিক্রিয়ায় প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পরও শারীরিক ও মানসিক দুর্বলতা নিত্যসঙ্গী হয়ে ওঠে।

দুর্বল স্বাস্থ্যের জনগোষ্ঠী দিয়ে সুস্থ, সবল ও কর্মঠ জাতি গঠন সম্ভব হয় না। দেশে অনিরাপদ ও অপুষ্টিকর খাদ্যের রমরমা বাণিজ্যে এক কথায় দেশ ও জাতি হুমকির মুখে পড়ছে।

বিশ্বব্যাপী প্রতি দশজনের মধ্যে একজন খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত। নিরাপদ খাদ্য যেমন সুস্বাস্থ্যের উৎস, তেমনই অনিরাপদ খাদ্য অনেক রোগের কারণ। সেজন্য সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হতে হলে রোগমুক্ত বা রোগের জটিলতামুক্ত থাকতে হবে। আর সেজন্য খাদ্য নিবার্চনের আগে সেটা কতটুকু নিরাপদ ও পুষ্টিকর তা অবশ্যই যাচাই করে নিতে হবে।

লেখক: পুষ্টিবিদ, ফরাজী হাসপাতাল বারিধারা ও লা মানো ডার্মা অ্যান্ড লেজার মেডিক্যাল।

আরও পড়ুন:
আগে বাড়িতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করুন: মন্ত্রী

মন্তব্য

বিশ্লেষণ
Bangabandhus homecoming in memory

স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

স্মৃতিতে বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন
যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নে বাঙালি জাতি যখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তখন পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুরু হয় অন্ধকার থেকে আলোর পথে জাতির যাত্রা।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ৯ মাস আটক থাকার পর পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠ থেকে মুক্তি পেয়ে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। এর আগে ৩ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক গনমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হলো- বিশ্বনেতাদের অব্যাহত চাপে এবং মিত্রবাহিনীর কাছে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণের কারণে পাকিস্তান সরকার বাধ্য হয়ে বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সদ্য প্রসূত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার পরিসমাপ্তি হয়েও যেন শেষ হয় না। ৭ জানুয়ারি ভোর রাতে অর্থাৎ ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি আমরা জানতে পারলাম জাতির পিতা মুক্তি পেয়ে পাকিস্তান থেকে উড়োজাহাজে সকাল সাড়ে ৬টায় ইংল্যান্ডের রাজধানী লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে পৌঁছে গেছেন। তখনই আমরা আনন্দ মিছিলে নেমে পড়ি।

বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর প্রথমেই তার স্বপ্নের বাংলাদেশে আসতে চেয়েছিলেন। কিন্তু জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সেটা সম্ভব ছিল না। সম্ভব ছিল না পাকিস্তানের উড়োজাহাজে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের আকাশসীমা ব্যবহার করা।

পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে তৃতীয় দেশ হিসেবে ইরান অথবা তুরস্ককে বেছে নেয়ার প্রস্তাব দেয়া হলে বঙ্গবন্ধু তা নাকচ করে দেন। এরপর তাকে লন্ডন হয়ে দেশে পাঠানোর প্রস্তাব দেয়া হয়। কারণ বাংলাদেশের পর ওই সময় সবচেয়ে বেশি বাঙালি বসবাস করতেন ব্রিটেনে।

ব্রিটেনে বাঙালি প্রবাসীদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ছিল আত্মিক যোগাযোগ। ১৯৫৬ সাল থেকেই তার বিলেতে যাতায়াত ছিল। তাই তিনি বেছে নিয়েছিলেন লন্ডনকে।

তবে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির খবর তার ইচ্ছা অনুযায়ী পাকিস্তান সরকার প্রচার করেনি। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, আমি নিজেই বিশ্বকে জানাতে চাই আমার মুক্তির বার্তা। লন্ডনে বঙ্গবন্ধু মাত্র একদিন যাত্রাবিরতি করেন।

বঙ্গবন্ধু মুক্ত হয়ে লন্ডনে আসছেন- ৮ জানুয়ারি বিবিসির মর্নিং সার্ভিসে এমন খবর পরিবেশন করা হয়। সকাল ৭টায় বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসে প্রচারিত খবরে বলা হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান বিমানযোগে লন্ডনে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই বিমানটি লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।

একই দিন রয়টার্স শিরোনাম করে, ‘লন্ডনে শেখ মুজিব’।

৮ তারিখ বিকাল ৫টায় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার এডওয়ার্ড হিথ-এর আমন্ত্রণে এক বৈঠকে মিলিত হন বঙ্গবন্ধু। উল্লেখ্য যে, ব্রিটেন তখনও বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার প্রায় এক মাস পর ১৯৭২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ব্রিটেন বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

সানডে টাইমস ৯ জানুয়ারি ‘ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী স্যার এডওয়ার্ড হিথের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বৈঠক’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করে। ওই দিন বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর দেয়া বিমান বাহিনীর বিশেষ বিমানটি হিথ্রো বিমানবন্দর ছাড়ার পর বিবিসি ঘোষণা দেয়- বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের উদ্দেশে যাত্রা করেছেন।

বঙ্গবন্ধু স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের আগে ভারতে যাত্রাবিরতি করেন ওইদিন সকালে। ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ভিভি গিরি, প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী, ভারতের মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান এবং অন্য অতিথিবৃন্দ বিমানবন্দরে উপস্থিত হন।

ভারতের জনগণ উষ্ণ সংবর্ধনা দেন স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। অকৃপণ সহযোগিতার জন্য বঙ্গবন্ধু ভারতের নেতৃবৃন্দ ও জনগণের প্রতি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাতে ভোলেননি।

১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বেলা ১টা ৪১ মিনিটে বঙ্গবন্ধু তার সারা জীবনের লালিত স্বপ্নের স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার তেজগাঁও পুরাতন বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। এটা ১৬ ডিসেম্বর বিজয় অর্জনের ২৩তম দিন।

প্রিয় নেতাকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানানোর জন্য বিমানবন্দরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিলাম আমরা। ওইদিন লাখ লাখ মানুষ আনন্দে আত্মহারা হয়ে ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে উষ্ণ প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানায়। সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য, যা লিখে প্রকাশ করা যায় না।

মানুষের ঢল নেমেছিল পুরো ঢাকা শহরে। কানায় কানায় পূর্ণ রেসকোর্স ময়দান। এখানে ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে বিকেল ৫টায় বঙ্গবন্ধু অশ্রুসিক্ত আবেগভরা কণ্ঠে বাঙালি জাতির প্রতি তার কৃতজ্ঞতা জানান।

মুক্তিযুদ্ধে যারা জীবন দিয়েছেন, যারা সম্ভ্রম হারিয়েছেন ও নির্যাতিত হয়েছেন তাদের প্রতি গভীরভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এদেশের কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র-জনতাসহ সব স্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশকে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে প্রদত্ত বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ছিল আবেগঘন। আনন্দ ও বেদনার অশ্রু তার দুই চোখ বেয়ে নেমেছিল অঝোরে। প্রিয় নেতাকে কাছে পেয়ে বাংলার সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চোখেও নেমেছিল অঝোর অশ্রুধারা। একইসঙ্গে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল বাংলার আকাশ-বাতাস।

জাতির পিতা তার ভাষণে আবেগতাড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘যে মাটিকে আমি এত ভালোবাসি, যে মানুষকে আমি এত ভালোবাসি, যে জাতিকে আমি এত ভালোবাসি, আমি জানতাম না সে বাংলায় ফিরে যেতে পারব কিনা। আজ আমি বাংলায় ফিরে এসেছি বাংলার ভাইদের কাছে, মায়েদের কাছে, বোনদের কাছে। বাংলা আমার স্বাধীন, বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।’

সবাইকে দেশ গড়ার কাজে নিয়োজিত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আজ থেকে আমার অনুরোধ, আমার আদেশ, আমার হুকুম ভাই হিসেবে; নেতা বা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, প্রেসিডেন্ট হিসেবে নয়। আমি তোমাদের ভাই, তোমরা আমার ভাই।

‘এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি বাংলার মানুষ পেটভরে ভাত না পায়, যদি বাংলার মা-বোনেরা কাপড় না পায়। এই স্বাধীনতা আমার পূর্ণ হবে না যদি এদেশের যুবকরা চাকরি না পায়।

‘মুক্তিবাহিনী, ছাত্র সমাজ, তোমাদের মোবারকবাদ জানাই তোমরা গেরিলা হয়েছ, তোমরা রক্ত দিয়েছ। রক্ত বৃথা যাবে না, রক্ত বৃথা যায় না।’

স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বলেন, ‘আমাকে আপনারা পেয়েছেন, আমি এসেছি। জানতাম না আমার ফাঁসির হুকুম হয়েছে। আমার সেলের পাশে আমার কবর খোঁড়া হয়েছিল। আমি প্রস্তুত হয়েছিলাম। বলেছিলাম- আমি বাঙালি, আমি মানুষ, আমি মুসলমান। মুসলমান একবার মরে, দুইবার মরে না।

‘আমি বলেছিলাম- আমার মৃত্যু যদি আসে হাসতে হাসতে যাব। আমার বাঙালি জাতিকে অপমান করে যাব না। তোমাদের কাছে ক্ষমা চাইব না। যাবার সময় বলে যাবো- জয় বাংলা, স্বাধীন বাংলা, বাঙালি আমার জাতি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলার মাটি আমার স্থান।’

সব গণমাধ্যমে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করা হয়েছিল- ‘অন্ধকার থেকে আলোর পথে যাত্রা’ হিসেবে।

দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ-তিতিক্ষা, আন্দোলন ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে ১৯৪৭ সাল থেকে শুরু করে আমাদের মাতৃভাষা বাংলাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার স্বীকৃতির জন্য ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে পাকিস্তানি স্বৈরশাসক বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করে। যার ফলশ্রুতিতে ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে।

১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালে ৬ দফার ভিত্তিতে স্বাধিকার আন্দোলন, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ১৯৬৯ সালে বঙ্গবন্ধুকে কারামুক্তির জন্য গনঅভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পরও বাঙালির মুক্তির সনদ ৬ দফা ও ছাত্র সমাজের ১১ দফার ভিত্তিতে শাসনতন্ত্র প্রস্তুত করে দেশ পরিচালনার জন্য বঙ্গবন্ধুকে ক্ষমতায় বসতে দেয়া হয়নি।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু পরিষ্কারভাবে জাতির সামনে ব্যাখ্যা করেছেন পাকিস্তানি সামরিক শাসকদের ষড়যন্ত্রের কথা। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ, ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণা, সশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ৩০ লাখ বাঙালির আত্মত্যাগ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাঙালি জাতির সবচেয়ে বড় অর্জন সদ্য স্বাধীন সার্বভৌম যুদ্ধবিধস্ত এক বাংলাদেশ।

দেশকে এগিয়ে নেয়ার প্রশ্নে বাঙালি জাতি যখন কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি তখন পাকিস্তানের বন্দিদশা থেকে মুক্তি পেয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

বঙ্গবন্ধুর স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস সারা পৃথিবীর গণমাধ্যমে বিশ্বের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে সম্প্রচার করা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী বিমানটি তেজগাঁও বিমানবন্দরে অবতরণের দৃশ্য বর্ণনায় এনবিসি টেলিভিশনের ভাষ্যকার ‘আজ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হলো’ বলে উল্লেখ করেন। প্রতিবেদনে বঙ্গবন্ধুকে ‘বাংলাদেশের জর্জ ওয়াশিংটন’ হিসেবে উল্লেখ করা হয় এবং জাতির পিতাকে জনগণের স্বাগত জানানোকে বিশ্বের সবচেয়ে আবেগঘন ঘটনা হিসেবে অভিহিত করা হয়। একইসঙ্গে পাকিস্তানের পক্ষে আগত যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর ৭ম নৌবহর বঙ্গোপসাগর ত্যাগের খবরটিও প্রতিবেদনে গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধের পুরো ৯টি মাস বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের স্বৈরশাসকরা পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে রেখেছিল। বঙ্গবন্ধু তার রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কারাগারে কাটিয়েছেন। তিনি কখনও কারাগারকে ভয় পাননি। ১৬ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন বাংলাদেশে রূপান্তরিত হওয়ার পর পাকিস্তান সরকার স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে কারাগার থেকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। ‌এরপর তিনি বীর বাঙালির বীর নেতা হিসেবে বীরের বেশে তার স্বাধীন বাংলায় প্রত্যাবর্তন করেন।

একটি দেশের একজন রাজনৈতিক নেতা এতটা জনপ্রিয় হযন কেমন করে তা একটি বিস্ময়! যিনি পুরো ৯ মাস দেশেই ছিলেন না, তারপরও শুধু তার নামের ওপর ভিত্তি করে বীর বাঙালি আত্মবিশ্বাসে দেশকে স্বাধীনতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে আসে।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে বঙ্গবন্ধু নির্মমভাবে সপরিবারে নিহত না হলে এখন যেভাবে তার সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, তার অনেক আগেই বাংলাদেশ মালয়েশিয়া কিংবা সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশে পরিণত হতো।

১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহেনা দেশের বাইরে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। পরবর্তী সরকারগুলো জাতির পিতার দুই কন্যাকে দেশে আসতে না দেয়ার প্রেক্ষাপটে বঙ্গবন্ধুর মতো চ্যালেঞ্জ নিয়েই ১৯৮১ সালের ১৭ মে শেখ হাসিনা স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন।

ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্রের শেষ নেই। বঙ্গবন্ধু-কন্যা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে শুরু হলো ঘরে-বাইরে নতুন ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সফল আন্দোলনে পতন হলো সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের।

দেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হলো ১৯৯১ সালের জাতীয় নির্বাচন। শুরু হলো নতুন ষড়যন্ত্র। শেখ হাসিনাকে ক্ষমতায় বসতে দেবে না ষড়যন্ত্রকারীরা। নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচন করে শেখ হাসিনাকে হারিয়ে দিলো ষড়যন্ত্রকারীর। ভোট বেশি পেয়েও আসন কম পাওয়ায় জাতির পিতার কন্যা ক্ষমতায় বসতে না পারায় বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত বাংলাদেশ গড়ার কাজ ১০ বছর পিছিয়ে গেল। অন্যথায় ১০ বছর আগেই শেখ হাসিনার অক্লান্ত পরিশ্রম ও সুদৃঢ় নেতৃত্বে আজকের ডিজিটাল বাংলাদেশ পরিপূর্ণ উন্নত দেশে রূপান্তরিত হয়ে জাতির পিতার সোনার বাংলায় পরিণত হতো। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার সরকারি কৌঁসুলি।

মন্তব্য

বিশ্লেষণ
Black chapter of history 14 December 71

ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৪ ডিসেম্বর ৭১

ইতিহাসের কালো অধ্যায় ১৪ ডিসেম্বর ৭১
১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে স্বজনের মৃতদেহ শনাক্ত করেন। অনেকের দেহে আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারও কারও শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। যা থেকে হত্যার আগে তাদের নির্যাতন করা হয়েছিল সে তথ্যও বের হয়ে আসে।

১৪ ডিসেম্বর শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস। পৃথিবীর ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বাঙালি বুদ্ধিজীবী নিধন ইতিহাসে নৃশংস ও বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ। জাতি যখন বিজয়ের খুব কাছে সে সময় পাকিস্তানি বাহিনীর সহযোগিতায় রাজাকার, আলবদর, আল শামস বাহিনী দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হত্যা করে।

পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশনা ও মদতে একশ্রেণির দালাল এই হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে। পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের নিশ্চিহ্ন করার এই নীলনকশা প্রণয়ন করেন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী। পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্র সহায়তা নিয়ে তাদেরই ছত্রছায়ায় আধাসামরিক বাহিনী আলবদরের ক্যাডাররা এই বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত করে।

বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত সংখ্যা আজ পর্যন্ত গণনা করা হয়নি। ১৯৭২ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক গ্রন্থ থেকে জানা যায়, এদের মধ্যে ৯৯১ জন ছিলেন শিক্ষাবিদ, ৪৯ জন চিকিৎসক, ৪২ জন আইনজীবী এবং ১৬ জন সাহিত্যিক, শিল্পী ও প্রকৌশলী।

বুদ্ধিজীবী নিধনের এ তালিকায় ঢাকা বিভাগে ২০২ জন শিক্ষক ও ১০ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। চট্টগ্রাম বিভাগে ২২৪ জন শিক্ষক ও ১০ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। খুলনা বিভাগে ২৮০ জন শিক্ষক ও ছয়জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। রাজশাহী বিভাগে ২৬২ জন শিক্ষক ও ১৫ জন আইনজীবীকে হত্যা করা হয়। তবে এ তালিকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নাম ছিল না।

১৪ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে। এ কাজে বাংলাদেশিদের মধ্যে রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনীর সদস্যরা তাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল।

বাংলাদেশে স্বাধীনতা যুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সঙ্গে রাজাকার, আল বদর, আল শামস বাহিনী বাংলাদেশের অসংখ্য শিক্ষাবিদ, গবেষক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, সাংবাদিক, কবি ও সাহিত্যিকদের চোখ বেঁধে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে তাদের নির্যাতনের পর হত্যা করে। স্বাধীন বাংলাদেশকে মেধাশূন্য করতে পরিকল্পিতভাবে এ হত্যাযজ্ঞ সংগঠিত হয়। পরবর্তীতে ঢাকার মিরপুর, রায়েরবাজারসহ বিভিন্ন স্থানে গণকবরে তাদের মৃতদেহ পাওয়া যায়।

১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর নিকট আত্মীয়রা মিরপুর ও রাজারবাগ বধ্যভূমিতে স্বজনের মৃতদেহ শনাক্ত করেন। অনেকের দেহে আঘাতের চিহ্ন, চোখ, হাত-পা বাঁধা, কারও কারও শরীরে একাধিক গুলি, অনেককে হত্যা করা হয়েছিল ধারালো অস্ত্র দিয়ে জবাই করে। যা থেকে হত্যার আগে তাদের নির্যাতন করা হয়েছিল সে তথ্যও বের হয়ে আসে। অনেকের লাশ শনাক্তও করা যায়নি, পাওয়া যায়নি বহু লাশ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ৭০-এর নির্বাচন হতে শুরু করে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের বিজয় অর্জন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে বাঙালি জাতিকে উজ্জীবিত করার জন্য এ দেশের কবি, সাহিত্যিক, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীত শিল্পী, চলচ্চিত্রকারসহ বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম। বিশ্ববাসীসহ সারা বাংলার জনগণ মনে করে নিরস্ত্র বাঙালিকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় জাগ্রত করার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি এ দেশের বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নির্মম হত্যাযজ্ঞের ও জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তারের পর মুক্তিযুদ্ধের কার্যক্রম সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য মুজিবনগর সরকার গঠন, বিভিন্ন এলাকাকে বিভিন্ন সেক্টরে ভাগ করে সেক্টর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব প্রদান তাছাড়া সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ব্যক্তিদের দায়িত্ব প্রদান করে মুক্তিযুদ্ধে বাঙালিদের ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য উজ্জীবিত করার জন্যও বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

বীর বাঙালির সাহস ও মেধার কাছে যখন একে একে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ক্যাম্প, আস্তানা নিশ্চিহ্ন হতে লাগলো, একে একে পরাস্ত হয়ে যখন আত্মসমর্পণ করতে লাগল, তখনই বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়ের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে এ দেশের রাজাকারদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় বাংলাদেশকে চিরদিনের জন্য মেধা শূন্য দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার অপচেষ্টায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে।

বুদ্ধিজীবী হত্যাকারী ওই সব রাজাকারদের বাঙালি জাতি কোনো দিন ক্ষমা করবে না বা করতে পারে না। ১৪ ডিসেম্বর সহ ১৯৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে নিহত সব শহীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। বাংলার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রুহের মাগফেরাত কামনা করা আমাদের সবার কর্তব্য ও দায়িত্ব, ত্রিশ লাখ অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে আজ আমরা খোলা আকাশের নিচে নির্মল বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিতে পারি, ত্রিশ লাখ শহীদের নিঃস্বার্থ জীবনের বিনিময়ে আজ আমরা সফলতার স্বপ্ন দেখি, আজ আমরা স্বাধীন বাংলাদেশের নাগরিক।

লেখক: নিরাপত্তা বিশ্লেষক, লেখক ও কলামিস্ট, পরিচালক, পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগ এবং প্রকল্প পরিচালক, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিব বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জামালপুর।

আরও পড়ুন:
চলে গেলেন শহীদুল্লা কায়সার-জহির রায়হানের বোন নাফিসা
‘অসাম্প্রদায়িক দেশ গড়লেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা’

মন্তব্য

বিশ্লেষণ
Armed forces are our pride

সশস্ত্রবাহিনী আমাদের গর্ব

সশস্ত্রবাহিনী আমাদের গর্ব

হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মহান স্বাধীনতার স্থপতি। আর স্বাধীনতা জাতীয় জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ২৩ বছর (১৯৪৮-১৯৭১) বাঙালি জাতিকে স্বাধিকার আদায়ে উদ্বুদ্ধ এবং প্রস্তুত করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ রাতে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ।

মুক্তিযুদ্ধের বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে ১৯৭১ সালের এই দিনে অর্থাৎ ২১ নভেম্বর আমাদের সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্যগণ সম্মিলিতভাবে দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সমন্বিত আক্রমণ সূচনা করেন। এর ফলে আমাদের বিজয় ত্বরান্বিত হয়। জাতির ইতিহাসে তাই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম।

বঙ্গবন্ধু ছিলেন রাষ্ট্রনায়ক। তিনি জানতেন, একটা দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় শুধু সশস্ত্র বাহিনী নয়, বৃহত্তর জনগণ ও সেনাবাহিনীর মধ্যে একাত্মতা অপরিহার্য। সে জন্যই বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার সেনাবাহিনী হবে জনগণের সেনাবাহিনী। দুয়ের মধ্যে কোনো দূরত্ব থাকবে না।’

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) এক ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ডাক দেন। রেসকোর্সের জনসমুদ্রে বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ ঐতিহাসিক এ ভাষণে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতিকে মুক্তির আহ্বান জানিয়ে ঘোষণা করেন, ‘রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাল্লাহ।’ তিনি নির্দেশ দেন ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো, যার যা কিছু আছে তাই নিয়েই শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।’

বঙ্গবন্ধুর ডাকে উত্তাল হয়ে ওঠে সারা দেশ। মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালি জাতির এই জাগরণে ভীত ইয়াহিয়া খান সামরিক আইন জারি করেন, শুরু করেন অত্যাচার, নির্যাতন, খুন।

২৫ মার্চ পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাংলাদেশে নির্বিচারে গণহত্যা শুরু করে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ মার্চ মধ্যরাতে অর্থাৎ ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে অর্থাৎ ১২টা ২০ মিনিটে ইপিআরের ওয়্যারলেস এবং টেলিগ্রামের মাধ্যমে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।

১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর দিনটি আমাদের কাছে একটি আবেগের নাম। কারণ ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাসের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছিল আজকের স্বাধীনতা। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণকে প্রতিহত ও পরাজিত করা কখনোই সম্ভব হতো না, যদি না সঠিক রণকৌশল অবলম্বন করা হতো। আর সে কৌশলের অন্যতম একটি ছিল ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর তিন বাহিনীর সম্মিলিত আক্রমণ।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায় এই দিনটি। দীর্ঘ ৯ মাস পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার পর বাংলাদেশ ভারতের সাহায্য নেয়। এরপর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। খুব তাড়াতাড়ি ভারত-বাংলাদেশের সম্মিলিত যৌথ বাহিনী পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে পরাজিত করতে সক্ষম হয়।

১৯৭১ সালের মার্চ মাসে ঢাকা শহরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম বীজ বপন হয় ৭ মার্চের ভাষণ এবং ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। বাংলার মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠে পরাধীন বাংলাকে মুক্ত করার জন্য। মুক্তিযুদ্ধে অগণিত মানুষ তাদের প্রাণ বিসর্জন দেয় দেশকে পাকিস্তান থেকে মুক্ত করার জন্য। বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়।

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধু গ্রেপ্তার হওয়ার পর হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা শুরু হলে সর্বপ্রথম সশস্ত্র বিদ্রোহ ঘোষণা করেন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঁচটি ইউনিট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ ও অন্য অনেক বাঙালি সদস্য। এগিয়ে আসেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে কর্মরত বাঙালি নাবিক ও নৌ অফিসার, সেনা ও বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা। তাদের সঙ্গে যোগ দেয় সর্বস্তরের মুক্তিপাগল হাজার হাজার কৃষক, শ্রমিক, ছাত্র, যুবক। মুক্তিসংগ্রাম রূপ ধারণ করে সশস্ত্র সংগ্রামের।

এ ক্রান্তিলগ্নে পাকিস্তানি শাসকদের স্বপ্ন নস্যাৎ ও তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য প্রয়োজন দেখা দেয় একটি সুসংগঠিত সশস্ত্র বাহিনীর নেতৃত্বে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করার।

২৫ মার্চের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন ছিল ৪ এপ্রিল এবং ঐতিহাসিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান ছিল তেলিয়াপাড়া। এটি সিলেট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার (বর্তমানে জেলা) মাধবপুর থানার অন্তর্গত। এটাই ছিল মুক্তিযুদ্ধের টার্নিং পয়েন্ট। এখানে মুক্তিযুদ্ধের সর্বপ্রথম বৈঠক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। দেশকে স্বাধীন করার লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে আসেন কর্নেল মুহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানী এবং পাকিস্তান সামরিক বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি অফিসাররা।

১৭ এপ্রিল ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি, সৈয়দ নজরুল ইসলাম উপরাষ্ট্রপতি এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী করে মেহেরপুরের মুজিবনগরে ‘বাংলাদেশের প্রথম সরকার’ গঠিত হয়। সশস্ত্র বাহিনীতে কর্মরত বাঙালি সদস্য, ইপিআর, পুলিশ, আনসারসহ ছাত্র, শ্রমিক, জনতা তথা বীর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে।

সর্বাধিক কার্যকরী এবং নিয়মতান্ত্রিক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য সামরিক নেতৃত্বের প্রয়োজন বোধ করে সরকার এবং এ লক্ষ্যে কার্যকর অবকাঠামো গঠন করতে কর্নেল এমএজি ওসমানীকে (পরবর্তীকালে জেনারেল) কেবিনেট মিনিস্টারের মর্যাদাসহ বাংলাদেশ ফোর্সেসের প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব দেয়া হয়। এ ছাড়া কর্নেল (অব) এম এ রবকে বাংলাদেশ ফোর্সেসের চিফ অব স্টাফ এবং গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে ডেপুটি চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্তি দেয়া হয়।

কর্নেল ওসমানী মুক্তিবাহিনীর সকল বিচ্ছিন্ন সংগঠনকে কেন্দ্রীয় কমান্ডের আওতায় নিয়ে আসেন এবং ফোর্সেস সদর দফতর থেকে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে অপারেশনাল নির্দেশনা প্রণয়ন করেন। এ বিরাট বাহিনীকে সাহায্য, সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, জনবল সংগ্রহ এবং সাধারণ জনগণকে দেখাশোনা করার জন্য ১৯৭০-এর নির্বাচনে নির্বাচিত বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের নেতৃত্বে সাব সেক্টর-ক্যাম্প পরিচালিত হয়।

এই স্বাধীনতা অর্জনের যুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী।

সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী ও নৌবাহিনী একত্র হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। যেসব বাংলাদেশি আগে পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে চাকরি করেছিলেন, তারাও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে যুক্ত হন স্বাধীনতা সংগ্রামে। দেশটিকে ১১টি সেক্টর বিভক্ত করে এই স্বাধীনতা সংগ্রামে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, কৃষক-শ্রমিক-জনতা এবং সেনাবাহিনী একত্র হয়ে কাজ করে। মুক্তিযুদ্ধের সম্মিলিত প্রয়াস শুরু হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর আজকের এই দিনে।

স্থল সেনাদের পাশাপাশি নৌ সেনাদেরও শক্তিশালী করে তুলেছিল বাংলাদেশ। বিএনএস পদ্মা ও পলাশ নামের দুটি যুদ্ধ জাহাজ ছিল। এই দুটি যুদ্ধ জাহাজের মাধ্যমে তারা পাকিস্তান থেকে সেনাদের জন্য আসা অস্ত্র ও র‌্যাশন আটকাতে চট্টগ্রাম ও মোংলা এই দুটি প্রধান বন্দরকে কব্জা করতে সক্ষম হয়েছিল।

১৯৭১ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের বিমানবাহিনী গড়ে তোলা হয়। যেসব বাঙালি বায়ুসেনা যুদ্ধের আগে পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাদের এই বাহিনীতে যুক্ত করা হয়। অনেকেই ভলান্টারি অবসরপ্রাপ্ত হিসেবে তৎকালীন বায়ু সেনার সঙ্গে যুক্ত হন, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন। তারাই বাংলাদেশের সর্বপ্রথম বিমানবাহিনী প্রস্তুত করেন। সম্মিলিত বাহিনীর সব কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭১ সালের ২১ নভেম্বর আজকের এই দিনে। তাইতো দিনটিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করার জন্যই পালন করা হয় আর্মড ফোর্সেস ডে বা সশস্ত্র বাহিনী দিবস।

আক্রমণের সম্মিলিত ফলশ্রুতিতে ভারতীয় মিত্র বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত যৌথ কমান্ডের নেতৃত্বে ৩ ডিসেম্বর চূড়ান্ত অভিযানের মাধ্যমে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীকে সম্পূর্ণ পরাস্ত করে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বিকেলে আত্মসমর্পণে বাধ্য করা হয়। এই বিজয় ছিল ১৯৭১ এর ২১ নভেম্বর বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী এবং আপামর জনসাধারণ একযোগে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যে সমন্বিত আক্রমণ, তারই ফসল।

আমাদের সেনাবাহিনীর জন্ম হয়েছে যুদ্ধক্ষেত্র, মুক্তিযুদ্ধের সময়, যে যুদ্ধটি ছিল জনযুদ্ধ। সে যুদ্ধের মহানায়ক ও সুপ্রিম কমান্ডার ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আজকে যারা সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে রয়েছেন, তারা সবাই মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী প্রজন্ম।

বঙ্গবন্ধুর সাহসী এবং দূরদর্শী নেতৃত্বে ভারতীয় মিত্র বাহিনী আমাদের মুক্তিযুদ্ধ শেষে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ১৭ মার্চ ১৯৭২ সালের মধ্যেই বাংলাদেশ থেকে ভারতে ফিরে যায়, যা ইতিহাসে বিরল। বিশ্বে যুদ্ধের ইতিহাসে মিত্রবাহিনী অধিকৃত অঞ্চল থেকে ফেরত আসে না কখনো। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মিত্রবাহিনী নিয়মতান্ত্রিকভাবে ফেরত যায়। এমনকি রাশিয়ান বাহিনীও ফিরে গিয়েছিল। আমাদের মুক্তি সংগ্রাম ছাড়াও যুদ্ধপরবর্তী দেশ গঠনে, স্বাধীনতা এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং বিদেশে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে এই সশস্ত্র বাহিনীর ভূমিকা আমাদের দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে বারবার।

শত প্রতিকূলতা, অর্থনৈতিক সংকট, যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগড়ার পর পরই বঙ্গবন্ধু তার জীবনের আকাঙ্ক্ষা, সেনাবাহিনীর মর্যাদার প্রতীক বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রথম ব্যাচের অফিসারদের প্রশিক্ষণ সমাপনী কুচকাওয়াজে বঙ্গবন্ধু স্বয়ং হাজির হয়ে তার মনের কথা ক্যাডেটদের কাছে জাতির পিতার অবস্থান থেকে ব্যক্ত করেন। ক্যাডেটদের উদ্দেশে বঙ্গবন্ধুর সেই অমূল্য ভাষণের কিছু অংশ এখানে তুলে ধরছি। বঙ্গবন্ধু ভাষণে বলেছিলেন:

‘আজ সত্যিই গর্বে আমার বুক ভরে যায়। বাংলাদেশের মালিক আজ বাংলাদেশের জনসাধারণ। সে জন্যই সম্ভব হয়েছে আজ আমার নিজের মাটিতে একাডেমি করা। আমি আশা করি, ইনশা আল্লাহ এমন দিন আসবে, এই একাডেমির নাম শুধু দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় নয়, সমস্ত দুনিয়াতে সম্মান অর্জন করবে।’

এ কথার মাধ্যমে বোঝা যায়, সেনাবাহিনী নিয়ে বঙ্গবন্ধুর দীর্ঘ পরিকল্পনা ছিল এবং ভবিষ্যতে তিনি একটা মর্যাদাপূর্ণ সেনাবাহিনী গড়ে তোলার লক্ষ্যে মিলিটারি একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। বঙ্গবন্ধু আবেগের সঙ্গে বলেন:

‘পাকিস্তানিরা মনে করত বাঙালিরা কাপুরুষ, বাঙালিরা যুদ্ধ করতে জানে না। পাকিস্তানি সৈন্যরা বাংলাদেশের মাটিতে দেখে গেছে কেমন করে বাঙালিরা যুদ্ধ করতে পারে।’

ভাষণের শেষাংশে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন:

‘মনে রেখো, তোমাদের মধ্যে যেন পাকিস্তানের মেন্টালিটি না আসে। তোমরা পাকিস্তানের সৈনিক নও, তোমরা বাংলাদেশের সৈনিক।’ বঙ্গবন্ধুর ভাষণ আজও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর জন্য সমানভাবে প্রাসঙ্গিক ও গুরুত্বপূর্ণ।

দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য আমাদের সুশিক্ষিত, পেশাদার ও শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনীর কোনো বিকল্প নেই। শুধু স্বাধীনতাযুদ্ধ ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমই নয়, সশস্ত্র বাহিনী দেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম রক্ষা করে দেশের অখণ্ড সার্বভৌমত্ব রক্ষা করেছে। দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রমে সশস্ত্র বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আজ অনস্বীকার্য। জাতির প্রয়োজনে যে কোনো কঠিন দায়িত্ব পালনে সশস্ত্র বাহিনীর নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা অনন্য।

বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কল্যাণে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা ছাড়াও দেশের অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক উন্নয়ন, ছিন্নমূল মানুষের জন্য বাসস্থান তৈরি করা এবং অন্যান্য জনকল্যাণমুখী কাজে প্রতিনিয়ত সশস্ত্র বাহিনী নিবেদিতপ্রাণ। ছবিসহ ভোটার তালিকা, জাতীয় পরিচয়পত্র, মেশিন রিডেবল পাসপোর্টসহ জাতীয় মহাসড়ক নির্মাণ, ফ্লাইওভার, আন্ডারপাস নির্মাণে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের ভূমিকা অত্যন্ত গৌরবজনক। আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সুসজ্জিত আমাদের পেশাদার সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে স্থান করে নিয়েছে।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বাহিনীতে প্রথম স্থানে অবস্থানকারী সশস্ত্র বাহিনীর মাধ্যমে বাংলাদেশকে আজ চিনতে পেরেছে সারা বিশ্বের মানুষ। শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এ মুহূর্তে বাংলাদেশের সদস্য সংখ্যা বিশ্বের সর্বোচ্চ। জাতীয় উন্নয়নে সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল অবদান আজ সর্বজনস্বীকৃত। এটি এমনি এক বাহিনী যার প্রতি এ দেশের জনগণের রয়েছে অগাধ আস্থা, বিশ্বাস ও ভালবাসা।

১৯৭১ সালে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী দেশের সর্বস্তরের জনসাধারণের সঙ্গে যেভাবে একীভূত হয়েছিল, সেই ঐতিহাসিক সুসম্পর্ক আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি উদ্দীপক হিসাবেই কাজ করবে। এ দিবসকে ভিত্তি করে দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সৃষ্টি হতে পারে জাতীয় ঐকমত্য।

লেখক: যুগ্ম সম্পাদক, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে)

আরও পড়ুন:
চিরদিন বেঁচে থাকবে তুমি প্রিয়
জিয়ার কারফিউ গণতন্ত্র থেকে খালেদা-তারেকের লাঠি-রডতন্ত্র
দুর্দিনের সহযাত্রী পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়
স্বার্থপরতার রাজনীতিতে উপেক্ষিত দেশপ্রেম!
নারী ‍ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে সবাইকেই

মন্তব্য

বিশ্লেষণ
Jail Murder Bangabandhus beloved Kamaruzzaman

জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য একজন কামারুজ্জামান

জেল হত্যা: বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য একজন কামারুজ্জামান
প্রতি বছর ৩ নভেম্বর ফেরে! শোকার্ত অনুভবে বাবার ওই দুই মায়াবী চোখের মাঝে দৃষ্টি দিলেই প্রদীপ ভাসে। যে প্রদীপের শক্তি আমাকে বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করতে তাগিদ দেয়। আমার পরিবারে সেই রক্ত, যে রক্ত বেঈমানি করতে জানে না।

‘দেশপ্রেমিক রাজনীতিকেরা সবসময় দেশের জন্য মৃত লাশ হতে প্রস্তুত থাকে, কিন্তু কখনোই হত্যার আদেশ দিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে রাখার বন্দোবস্তে যায় না’- এমন উক্তিকে ধারণ করেই ৫১ বছরের বাংলাদেশকে যে কেউ একবার দেখে নিতে পারেন তৃতীয় চোখ দিয়ে।

একদিকে বঙ্গবন্ধু ও জাতীয় চার নেতার নিথর দেহ পড়ে থাকা এবং তা সে লাল সবুজের বাংলাদেশের জন্যই। অন্যদিকে প্রতিবিপ্লবকারীদের হত্যা করার উৎসবে শাসকশ্রেণি হয়ে পড়ার অযাচিত প্রেক্ষাপট… কষ্ট তাই পাই।

আজও ভুলিনি, ভুলতে পারব না। মৃত্যুর আগের দিন পর্যন্ত জাতির জনক, আমার বাবা এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও পিতৃতুল্য তিন চাচা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ ও মনসুর আলীর পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়ার এমন নৃশংস কু-উদ্যোগের জবাব দিতে ইচ্ছে করে। মনকে স্বান্তনা দেয়ার অযুতবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হলো। বাঙালির ভাষা ললাটে ধূসর অস্ত্রের আমদানিতে জাতি নির্বাক হয়ে যখন সবকিছু অবলোকন করছে, ঠিক একই ধারাবাহিকতায় পঁচাত্তরের ৩ নভেম্বরের প্রথম প্রহরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে চার জাতীয় নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এ এইচ এম কামারুজ্জামানকে হত্যা করা হয়।

অনভিপ্রেত এবং অতি অবশ্যই মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়ে এমন পৈশাচিক হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসেই বিরল। সারা পৃথিবীর রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের মধ্যে এমন কালো অধ্যায়ের জন্ম নেয়া নিয়ে উন্নত দেশগুলো বা সংস্থাগুলোর কথিত মানবাধিকার চাইবার দাবি নিয়মিত সংস্কৃতির অংশও হতে পারেনি।

৩ নভেম্বর, ১৯৭৫। উপলক্ষতাড়িত ট্র্যাজিক দিবস হিসেবে আমরা কেউ কেউ জেলহত্যা ইস্যু নিয়ে কলম ধরছি। অভিমানের উচ্ছ্বাসে রাজনৈতিক ধারাভাষ্য দিয়ে ইতিহাস সংকলনের একটা চেষ্টা!

আমি কী লিখব? সন্তান হিসাবে কী বলব? বঙ্গবন্ধু ও তার তনয়ার আদর্শের সৈনিক হিসেবে রাজনৈতিকভাবে কী লিখব? ফলত, জানা নেই।

আমার স্মৃতির পাতায় জেল হত্যা এক বেদনাবিধুর ঘটনা। আমার বাবা এ এইচ এম কামারুজ্জামান যেদিন শহীদ হলেন, আমি ও আমার ছোট ভাই স্বপন তখন কলকাতায় রামকৃষ্ণ মিশন স্কুলে লেখাপড়া করছি। বাবার মৃতদেহটি দেখার কোনো সুযোগ আমরা পাইনি।

বাবা ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের এক অতন্ত্র সৈনিক। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ তার জীবনভাবনার মূল সোপান ছিল। সারাটা জীবন তিনি সেই আদর্শ ভাবনাকে অবিচল নিষ্ঠা এবং সাধনায় ব্রত হয়ে পালন করে গেছেন। নিমগ্ন থেকেছেন সত্য ও নীতির পথে। বঙ্গবন্ধুর নিঃস্বার্থ সহযোদ্ধা হিসেবে আপস করেননি ১৫ আগস্টের হত্যাকারী খুনীচক্রের সঙ্গে। শুধু আমার বাবা নন, অন্য তিন জাতীয় নেতাও ছিলেন একই রকমের ইস্পাতসম মনোবলের অধিকারী।

মায়ের কাছে শুনেছি, সেদিনের নিকষ কালো তিমির রাত্রি করে ঢাকার রাজপথে ছুটে চলা একটি জলপাই রঙের জিপ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে দাঁড়িয়ে গেল। লাফিয়ে নামল কয়েকজন কালো পোশাক পরা অস্ত্রধারী। কারারক্ষীদের গেট খোলার নির্দেশ দিলো তারা।

কারারক্ষীরা শীর্ষ নির্দেশ ছাড়া গেট খুলবেন না। অগত্যা বঙ্গভবনে ফোন করল খুনিরা। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে যে নির্দেশ এসেছিল সেটা আমাদের সবার জানা। বঙ্গভবনের নির্দেশ পেয়ে গেট খুলে দিলো কারারক্ষীরা।

ভেতরে ঢুকে তাদের আবদার অনুযায়ী জাতীয় চারনেতা তাজউদ্দিন আহমদ, ক্যাপ্টেন মনসুর আলী, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, আমার বাবা এইচ এম কামারুজ্জামানকে ১নং সেলে একসঙ্গে জড়ো করার আদেশ দেয়া হলো। অস্ত্রের মুখে বাধ্য হয়ে কারারক্ষীরা সে নির্দেশ পালন করলেন। খুনি মোসলেম বাহিনী সেই ১নং সেলে ব্রাশফায়ারে নিভিয়ে দিলো জাতির সূর্য সন্তানদের জীবন প্রদীপ। সেকেন্ডের ব্যবধানে হারিয়ে গেল বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধুর অন্যতম চার নেতার প্রাণ স্পন্দন।

বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের জন্য ও ইতিহাসের সঙ্গে যাদের নিবিড় সম্পর্ক, সেই গুণী মানুষগুলো হারিয়ে গেলেও হারায়নি তাদের অমর কৃতিত্ব ও অসীম অবদান। তারা গণমানুষের অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও সমর্থন পেয়েছিলেন বলেই আজও আমরা তাদের সন্তান হিসেবে মানুষের কাছে পৌঁছুতে পেরেছি।

দেশবাসী অবগত আছেন, আল্লাহর অশেষ রহমত, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার অশেষ স্নেহ ও নির্দেশনায় এবং প্রিয় রাজশাহীবাসী ভালোবাসায় আমি রাজশাহী সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হয়েছি। দেশের শ্রেষ্ঠ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলির সদস্য হতে পেরেছি। জাতির পিতা ও আমার বাবার রেখে যাওয়া কাজগুলো সমাধান করার প্রয়াসে দেশসেবায় আত্মনিয়োগের সুযোগ পেয়েছি।

বাবার অনেক স্বপ্ন ছিলো রাজশাহীকে নিয়ে। তিনি যখনই সুযোগ পেয়েছেন রাজশাহীর কথা জাতীয় পর্যায়ে পেশ করে এর উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন। রাজশাহীতে খেলাধুলার পরিবেশ তৈরির জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। তিনি জানতেন, খেলাধুলার মাধ্যমে গড়ে উঠবে সুস্থ ও সুন্দর যুব সমাজ। তিনি বেশ কিছুদিন রাজশাহী জেলা ক্রীড়া সমিতির সম্পাদকের দায়িত্বও পালন করেন।

বাবা বেশ ধর্মভীরু ছিলেন। ছোটবেলায় তাকে নিয়মিত নামাজ আদায় ও পবিত্র কোরআন শরিফ তিলাওয়াত করতে দেখেছি। তিনি এত দ্রুত কোরআন তিলাওয়াত করতেন যে, তাকে কোরআনের হাফেজ বলে মনে হতো।

পরের দিকে, বিশেষ করে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে দেশের জন্য তিনি অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। ফলে তাকে আমরা বাসায় তেমন দেখতে পেতাম না। যতক্ষণ বাসায় থাকতেন সর্বক্ষণ নেতা-কর্মীদের দ্বারা সন্নিবেষ্টিত হয়ে থাকতেন। এর ফলে আমরা তেমন বাবার সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেতাম না। আমরা সব ভাই-বোনই বেশ মিস করতাম তাকে। এজন্য আমাদের মাঝে মাঝে রাগও হতো।

বাবা অত্যন্ত নরম স্বভাবের মানুষ ছিলেন। তাই বলে আমরা তাকে ভয় পেতাম না, এমন নয়। তার চোখের দিকে তাকানোর সাহস আমাদের ছিল না। কোনো অপরাধ করলে শুধু নাম ধরে ডাকলেই আমাদের অবস্থা খারাপ হয়ে যেত।

বাবার বড় এবং ছোটমেয়ে উভয়েই খুব প্রিয় ছিল। বড় আপা পলিকে বাবা বেশি ভালবাসতেন। মায়ের সংস্পর্শেই আমরা বড় হয়েছি। আমার মায়ের ছিল অসীম ধৈর্য। তিনি বাবার রাজনৈতিক সঙ্গীদের যথেষ্ট সম্মান করতেন। মায়ের ওই উদারতা ও সহায়তা না থাকলে বাবার পক্ষে অত বড় নেতা হওয়া হয়ত সম্ভব ছিল না।

প্রচলিত একটি কথা আছে, প্রত্যেক সফল পুরুষের পেছনে কোনো না কোনোভাবে একজন নারীর অবদান আছে। এ কথাটা আমার মায়ের ক্ষেত্রে দারুণভাবে প্রযোজ্য বলে আমাদের মনে হয়। বিশেষ করে স্বাধীনতার নয় মাস ছোট ছোট ছেলে-মেয়েসহ তিনি যে কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে দিন কাটিয়েছেন সেটা সম্ভব না হলে বাবার পক্ষে মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখা সম্ভব হতো কিনা বলা মুশকিল। বলাবাহুল্য, বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুননেসাও ছিলেন অসীম ধর্যের অধিকারী। তিনিও আজীবন বঙ্গবন্ধুর সব কাজের প্রেরণা ছিলেন।

বাবা ১৯৫৬ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ১৯৬২ সালে তিনি প্রথম নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। তার প্রথম নির্বাচনে অংশগ্রহণ ও তার বাবা আবদুল হামিদের সঙ্গে রাজনীতি নিয়ে এক চমকপ্রদ ঘটনার কথা আমরা শুনেছি। ওই ঘটনাটি তখনকার দিনের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে আজও অনুসরণীয় আদর্শ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বলে রাখা জরুরি যে, আমার দাদা আবদুল হামিদ রাজশাহী অঞ্চল থেকে দীর্ঘদিন মুসলিম লীগের প্রার্থী হিসেবে আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে আসছিলেন। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে তার ছেলে কামারুজ্জামান নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চাইলে আবদুল হামিদ নির্বাচন থেকে নাম প্রত্যাহার করে নেন।

বাবা জানতেন পিতা প্রতিদ্বন্দ্বী হলে তার পক্ষে নির্বাচনে জয়লাভ কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই তিনি মায়ের কাছে আবদার করলেন, বাপজানকে বুঝিয়ে যেন নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে চেষ্টা করেন! অগত্যা আবদুল হামিদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ালেন।

নির্বাচনি এলাকা সফরে গিয়ে ভিন্ন চিত্র প্রত্যক্ষ করলেন আমার বাবা। এলাকার মুরুব্বিদের বক্তব্য হলো, দীর্ঘদিন মুসলিম লীগের প্রতি সমর্থন করতে অভ্যস্ত বিধায় তারা হারিকেন (মুসলিম লীগের নির্বাচনি প্রতীক) ছাড়া অন্য কোনো মার্কায় ভোট দিতে পারবেন না। আবদুল হামিদের নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য বাবাকে দায়ী মনে করে তারা তাকে সমর্থন দেয়া থেকে বেঁকে বসলেন।

অবস্থা বেগতিক দেখে বাবা বহু চেষ্টা করে অন্তত একটা জায়গায় রফা করতে সমর্থ হলেন যে, আবদুল হামিদ সাহেব যদি এলাকায় এসে তার পক্ষে ভোট চান, তাহলে তারা বাবাকে ভোট দেয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

এমন একটি পরিস্থিতিতে বাবা তার বাপজানের কাছে কথাটা বলতে সাহস না পেয়ে মায়ের কাছে বায়না ধরলেন, পিতা যেন তার পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে অংশগ্রহণ করেন। কিন্তু আবদুল হামিদের কাছে কথাটা বলতেই তিনি প্রচণ্ড রেগে গেলেন। একটা দলের সভাপতি হয়ে তিনি অন্য দলের প্রার্থীর পক্ষে প্রচারে অংশ নিতে পারবেন না, সে যেই হোক, এটা তার সাফ কথা।

বাবা হতাশ হয়ে এক রকম প্রচার বন্ধ করে দিয়ে বাড়িতে বসে রইলেন। পিতার সহযোগিতা ছাড়া নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়া কিছুতেই সম্ভব নয় এটা তিনি বুঝতে পারছিলেন। সুতরাং মাঠে গিয়ে লাভ কী? তাই তিনি জানিয়ে দেন পিতা তার পক্ষে কাজ না করলে তিনি আর নির্বাচন করবেন না।

এভাবেই কিছুদিন চলে গেল। সত্যি সত্যিই ছেলে নির্বাচনি কাজে অংশগ্রহণে বিরত থাকায় পিতা আবদুল হামিদ নিজেই চিন্তায় পড়ে গেলেন। ছেলের জীবনের প্রথম নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কায় তিনি নিজেও বিচলিত হয়ে পড়লেন। অগত্যা রাজশাহী জেলার মুসলিম লীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক নাটোরের মধু চৌধুরীকে ডেকে তিনি তার হাতে দলের সভাপতি ও সাধারণ সদস্য পদ থেকে পদত্যাগের আবেদনপত্র দুটি ধরিয়ে ঘটনা খুলে বললেন। এরপর পুত্রের পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে নেমে তাকে বিজয়ী করতে সক্ষম হলেন।

বাবার সেই বিজয় প্রথম হলেও আর কখনও তিনি কোনো নির্বাচনে পরাজিত হননি। তবে দাদা আবদুল হামিদের এ রাজনৈতিক নৈতিকতার ঘটনা সব সময়ের জন্যই বিরল দৃষ্টান্ত তাতে সন্দেহ নেই। বিশেষ করে আজকের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এ ঘটনা শিক্ষার বার্তা বয়ে আনতে পারে। সেই অসাধারণ ব্যক্তিত্ব আমার দাদা আবদুল হামিদের সুযোগ্য সন্তান এ এইচ এম কামারুজ্জামান ও তার নাতিদীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আজও জাতীয় নেতার আসনে রয়েছেন।

আমার বাবা তার আদর্শভিত্তিক নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির কারণে ১৯৬২ থেকে ১৯৭৫ এই ১৩ বছরের মধ্যে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনেই কখনও পরাজিত হননি। এটা সম্ভব হয়েছিলো তার অসাধারণ কর্মদক্ষতা, গণমুখী সাংগঠনিক তৎপরতা আর চূড়ান্ত রাজনৈতিক সততার কারণে।

এরই ফলে তিনি রাজশাহীবাসীকে আওয়ামী লীগের পতাকাতলে সামিল করতে পেরেছিলেন। তার এই দক্ষতা ও যোগ্যতাই তাকে তৎকালীন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতির মতো দলের সর্বোচ্চ পদে সমাসীন করেছিল।

৩ নভেম্বর সকালেই বাবার মৃত্যু সংবাদ জানতে পারেন আমাদের মা। মা অত্যন্ত ভেঙে পড়েন। অনেক চড়াই উৎরাই পার হয়ে যে মানুষটি কখনও আশাহত হননি সেই মানুষটি বাবার মৃত্যু সংবাদে মুষড়ে পড়েছিলেন! এ সময় রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী আর আত্মীয়-স্বজনে ভরে যায় আমাদের বাড়ি।

মা চাচ্ছিলেন বাবার লাশটা রাজশাহীতে এনে পারিবারিক গোরস্থানে দাফন করতে। কিন্তু খুনিরা তাতে বাধ সাধে। মা তার সিদ্ধান্তে অটল ছিলেন। বাধ্য হয়ে বাবার মৃতদেহ রাজশাহীতে আনার অনুমতি দেয় ঘাতকচক্র। তবে বাবার লাশ কাউকে দেখতে দেয়া হয়নি। এই হৃদয়বিদারক ঘটনার করুণ বেদনা ও দহন সহ্য করেই আমার মা এবং আমরা জীবনসংগ্রাম করেছি।

মায়ের কাছে শুনেছি, বাবার রক্তমাখা লাশটার বুকের ওপর চালচাপা দেয়া ছিল। মুখটা দেখে মনে হয়, কী নিদারুণ কষ্টে তার জীবন প্রদীপ নিভিয়ে দেয়া হয়েছে। কী অপরাধ ছিল বাবার, যার জন্য তাকে হত্যা করা হলো? এর জবাব কে দেবে? কারও কাছে আছে?

মাত্র ৫২ বছরের জীবনে তিনি অর্ধেকটাই কাটিয়েছেন আন্দোলন আর সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে। স্বাধীনতা যুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে অন্যান্য জাতীয় নেতাসহ বাংলাদেশকে স্বাধীন করার কাজে তিনি জীবন উৎসর্গ করেছেন। নিজের স্ত্রী-সন্তানের দিকে তাকাবার ফুরসৎ পাননি, সেই মানুষটাকে হত্যা করা হলো! কেন করা হলো, তা বলার সময়ও হয়েছে।

বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর আমার বাবাসহ অপরাপর তিন নেতা বেঁচে থাকলে সবকিছু রাজনৈতিক অপশক্তির ইচ্ছায় হতে পারত না। কারণ জাতীয় ওই চার নেতার দেশ ও দল পরিচালনা করার ক্ষমতা ছিল।

একবার কি এই প্রজন্ম চিন্তা করতে পারে, শেখ হাসিনা যদি আমার বাবাদেরকেও ১৯৮১ সালের পরে পেয়ে যেতেন, আওয়ামী লীগকে কী রোধ করা যেত? সামরিক শাসকেরা যত্রতত্র ক্ষমতার মসনদে বসতে পারত? ক্ষমতার বিরাজনীতিকরণ হতে পারত? গণতন্ত্রের জায়গায় স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হতে পারত?

জিয়া নামের এক শাসককে কী বলা যায়? ঘাতক, নাকি স্বৈরাচার? হ্যাঁ কিংবা না ভোটের প্রচলনের মাধ্যমে কে গণতান্ত্রিক আবহে স্বৈরতন্ত্রকে পরিচিত করে তুলেছিলেন? আমার বাবারা বেঁচে থাকলে মোশতাক- জিয়া-এরশাদদের কথিত শাসন চলত না এই বাংলায়।

এদিকে ১৯৮১ সালের ১৯ মে বঙ্গবন্ধুকন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা তার প্রিয় জন্মভূমিতে ফিরে এসে তার পিতা বঙ্গবন্ধুসহ ১৫ আগস্টের শহীদদের খুনিদের বিচারের সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় চার নেতা হত্যার বিচারের দাবিতেও সোচ্চার ছিলেন। তার শাসনামলে বিচার হয়েছে। জাতি কলংকমুক্ত হয়েছে।

১৯৮১ সালের ১৯ মে থেকেই জননেত্রী শেখ হাসিনা চার জাতীয় নেতার পরিবারের সদস্যদের অতি আপনজনের মতো আগলে রেখেছেন। বড় বোনের স্নেহ দিয়ে তিনি আমাদের নির্মাণে সদা সহযোগিতা করে চলেছেন। আমরা তার কাছে কৃতজ্ঞ। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে তিনি দিনরাত কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। আমি মহান আল্লাহর দরবারে তার সুস্থতা কামনা করি। তিনি বেঁচে থাকলেই বাংলাদেশ অপ্রতিরোধ্য হয়ে বিশ্বকে জানান দিতে পারবে, আমরা এগিয়ে যাচ্ছি! এগিয়ে যেতেই হবে।

প্রতি বছর ৩ নভেম্বর ফেরে! শোকার্ত অনুভবে বাবার ওই দুই মায়াবী চোখের মাঝে দৃষ্টি দিলেই প্রদীপ ভাসে। যে প্রদীপের শক্তি আমাকে বাংলাদেশের জন্য রাজনীতি করতে তাগিদ দেয়। আমার পরিবারে সেই রক্ত, যে রক্ত বেঈমানি করতে জানে না।

বাবা বঙ্গবন্ধুর জন্য আনুগত্যের ঘড়্গ নিয়ে দেশপ্রেমকে স্বাগত জানিয়ে জীবনই দিয়ে গেছেন। আমি তারই কন্যা শেখ হাসিনার ভাই হিসাবে তার জন্য জীবন সঁপে দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছি। বাবার সৎ আত্মা আমার পিছু নেয়। তাগিদ রেখে বলেন, ‘তুমি এগিয়ে যাও। বাংলাদেশের জন্য, আওয়ামী লীগের জন্য সেরাটা দাও।‘

এক ফালি চাঁদের দিকে তাকিয়ে থাকি প্রায়শই। বাবার চিরপ্রস্থানকে মেনে নিতে পারিনি, পারব না। উইনস্টন চার্চিলের বিখ্যাত মতবাদ আমার অহোরাত্রগুলোকে অনুসন্ধানী ও সত্যান্বেষী করে বলে, ‘যখন ভিতরে কোনো শত্রু থাকে না, তখন বাইরের শত্রুরা তোমাকে আঘাত করতে পারে না।‘

জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু! জয় শেখ হাসিনা! বাংলাদেশ চিরজীবী হোক।

লেখক: সভাপতিমণ্ডলির সদস্য, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও মেয়র, রাজশাহী সিটি করপোরেশন।

আরও পড়ুন:
জেলহত্যা দিবসের স্মৃতিকথা
জিয়া ছিলেন মোশতাকের ডান হাত: প্রধানমন্ত্রী
চার নেতার ১০ খুনির সাজা কার্যকর হয়নি এখনও
জেল হত্যার অনেক রহস্য উন্মোচন হয়নি: কাদের
ইতিহাসবিরোধী ভয়াল কালরাত

মন্তব্য

বিশ্লেষণ
Let the prison murder mystery be fully revealed

জেল হত্যা রহস্যের পূর্ণ উন্মোচন হোক

জেল হত্যা রহস্যের পূর্ণ উন্মোচন হোক
৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কোনো কোনো অংশগ্রহণকারী ও সমর্থক পরে প্রচার করেছেন, তারা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও জাতির পিতাকে হত্যার বদলা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ দাবি ভিত্তিহীন বলেই মনে হয়।

১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জেল হত্যাকাণ্ডের পর সুদীর্ঘ ৪৭টি বছর পেরিয়ে গেছে। কিন্তু কারাগারের নিরাপত্তা হেফাজতে চার জাতীয় নেতাকে কীভাবে কেন হত্যা করা হয়েছিল, কারা এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটিয়েছিল, এর কুশীলব ও পেছনের সূত্রধর কারা ছিল- এসব রহস্যের আজও সুস্পষ্ট কিনারা হয়নি।

স্মরণ করা যেতে পারে, স্বাধীনতার বিপক্ষ শক্তির মদদে কিছু বিপথগামী সেনা সদস্য ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে আকস্মিক অভ্যুত্থানে জাতির পিতা, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে।

একই রাতে স্ত্রী-সন্তানসহ হত্যা করা হয় বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার পানিসম্পদ মন্ত্রী আবদুর রব সেরনিয়াবাত এবং ভাগ্নে ও বাকশালের অন্যতম সম্পাদক শেখ ফজলুল হক মণিকে।

এটা সুস্পষ্ট, জাতির পিতা ও তার বংশধারা নিশ্চিহ্ন করে দেয়াই ছিল অভ্যুত্থানকারীদের মূল লক্ষ্য। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা এ সময় বিদেশে অবস্থান করায় প্রাণে বেঁচে যাওয়ায় খুনিদের সুদূরপ্রসারী অসদুদ্দেশ্য শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায়।

বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার আটদিন পর ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার হন তার দক্ষিণহস্ততুল্য চার শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দিন আহমদ, মুহাম্মদ মনসুর আলি ও আবুল হাসনাত মোহাম্মদ কামারুজ্জামান।

সৈয়দ নজরুল ইসলাম ১৯৭১-এর ২৫ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানি সামরিক জান্তা গ্রেপ্তার করার পর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সে বছরের ১৭ এপ্রিল গঠিত মুজিবনগর সরকারে তিনি উপ-রাষ্ট্রপতি হন এবং শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতা লাভের পর বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রিপরিষদে তিনি শিল্পমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি বাকশালের ভাইস-চেয়ারম্যান হন।

তাজউদ্দীন আহমদ মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন এবং মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদে তিনি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

মুহাম্মদ মনসুর আলী মুজিবনগর সরকারের অর্থমন্ত্রী ছিলেন। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু সরকারের স্বরাষ্ট্র ও যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বঙ্গবন্ধু বাকশাল প্রতিষ্ঠার পর তিনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী পদে অধিষ্ঠিত হন।

এ এইচ এম কামারুজ্জামান মুজিবনগর সরকারের স্বরাষ্ট্র, কৃষি এবং ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। স্বাধীনতার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠিত সরকারেও একই দায়িত্ব পেয়েছিলেন। ১৯৭৪ সালে তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন।

তখনকার পরিস্থিতিতে তাদের গ্রেপ্তার হওয়াটা অবধারিতই ছিল। কারণ কোনো প্রলোভনেই তারা যে অভ্যুত্থানকারীদের সঙ্গে হাত মেলাবেন না সেটা সবাই জানত। অথচ তখন দলের দ্বিতীয় সারির নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ খুনিদের সঙ্গে আঁতাত করেন এবং তার নেতৃত্বে একটি সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে।

খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভার সব সদস্যই ছিলেন হত্যাকারীদের সঙ্গে হাত মেলানো আওয়ামী লীগার এবং এটা ছিল একটা আধা-সামরিক সরকার। অভ্যুত্থানকারী মেজর-ক্যাপ্টেনরাই এ সরকারের ওপর ছড়ি ঘোরাত। এ সরকারের পেছনে সেনা সমর্থন থাকলেও, বঙ্গভবনের ওপর তাদের পুরোপুরি কর্তৃত্ব ছিল না। সে সময়ে বঙ্গভবন পাহারার দায়িত্বে ছিল ৪৬ ব্রিগেডের দুটি কোম্পানি, যার নেতৃত্বে ছিলেন কর্নেল শাফায়াত জামিল।

২৪ আগস্ট তখনকার সেনাপ্রধান কে এম শফিউল্লাহকে সরিয়ে জিয়াউর রহমানকে তার স্থলাভিষিক্ত করা হয়। তখনকার চিফ অফ জেনারেল স্টাফ (সিজিএস) খালেদ মোশাররফ আগের পদেই বহাল থেকে যান। কিন্তু ১৫ আগস্ট হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী ৮০ দিনের মাথায় সিজিএস খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত হয় এক পাল্টা অভ্যুত্থান। শাফায়াত জামিল তার ব্রিগেড নিয়ে ২ নভেম্বর মধ্যরাতেই অভ্যুত্থান শুরু করে দেন।

৩ নভেম্বর অভ্যুত্থানের কোনো কোনো অংশগ্রহণকারী ও সমর্থক পরে প্রচার করেছেন, তারা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থান ও জাতির পিতাকে হত্যার বদলা নিতে চেয়েছিলেন। কিন্তু এ দাবি ভিত্তিহীন বলেই মনে হয়। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছিল। ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের আগের অবস্থায় ফিরে যেতে চাইলে মুজিবপন্থি একটি রাজনৈতিক সরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে পারতেন। এ জন্য তারা জেলবন্দি চার শীর্ষ নেতাকে বের করে এনে তাদের হাতে এ সরকার গঠনের ভার দিতে পারতেন। কিন্তু চার নেতার কথা তাদের দূরতম চিন্তা বা পরিকল্পনাতেও ছিল, এমন মনে করার কোনো প্রমাণ তখন দেখা যায়নি।

হত্যাকাণ্ডের পরবর্তী পুরো একদিনেরও বেশি সময় কেটে যাওয়ার পরই কেবল তারা জানতে পারেন, চার নেতা জেলখানার ভেতরে নিহত হয়েছেন। জানার পরও এ নিয়ে তাদের কোনো মাথাব্যথা বা উচ্চবাচ্য করতে দেখা যায়নি।

প্রশ্ন উঠতেই পারে, তাদেরকে দিয়ে যদি সরকার গঠন করার সদিচ্ছা থাকত, তাহলে তো প্রথম কাজটিই হওয়া উচিত ছিল তাদের নিরাপত্তার সুব্যবস্থা করা এবং তাদেরকে বঙ্গভবনে আনার উদ্যোগ নেয়া। সে রকম কিছুই কিন্তু তখন দেখা যায়নি। বরং স্বজনরা দোয়েল চত্বরের কাছে তিন নেতার মাজার প্রাঙ্গণে চার নেতাকে কবরস্থ করার উদ্যোগ নিলে তাদের সে অনুমতিও দেয়া হয়নি।

লক্ষণীয়, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানকারীরা ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের খলনায়কদের ৩ নভেম্বর রাতেই নিরাপদে দেশত্যাগের সুযোগ দেয়। এর কারণ হিসাবে বলা হয়, গৃহযুদ্ধ বাধুক সেটা তারা চায়নি। দুই পক্ষের মধ্যে এই আপস-মীমাংসায় মধ্যস্থতা করেছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপতি খোন্দকার মোশতাক, তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল (অব.) এম এ জি ওসমানী এবং চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফ মেজর জেনারেল খলিলুর রহমান।

এর ঠিক দুদিন পর ৫ নভেম্বরই মোশতাককে ক্ষমতাচ্যুত করে সামরিক অভ্যুত্থানকারীরা। এভাবে চিরকালের জন্য ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হন বাংলার ইতিহাসের দ্বিতীয় মীরজাফর খন্দকার মোশতাক।

তারপরও একটা জিজ্ঞাসা থেকেই যায়, চার নেতাকে কেন খুন করা হয়েছিল। তারা তখন কারাবন্দি ছিলেন, ৩ নভেম্বরের পাল্টা অভ্যুত্থানকারীদের পরিকল্পনায়ও তারা ছিলেন না। তাহলে কেন হঠাৎ করে তাদের হত্যা করা হল? এর পেছনে কি অন্য কোনো মহলের অন্য কোনো পরিকল্পনা ছিল?

স্মরণ করা যেতে পারে, পাল্টা অভ্যুত্থানের পরদিন ৪ নভেম্বর ঢাকায় বাকশালের ছাত্রসংগঠনের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধুর ছবি নিয়ে একটি শোকমিছিল বের করা হয়েছিল। খালেদ মোশাররফের মা এবং ভাইও সে মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। মিছিলের আয়োজকেরা কিন্তু তখনও জানতেন না, এর আগেই জেলের ভেতরে চার নেতাকে মেরে ফেলা হয়েছে। তাহলে কেন, কিসের ভরসায় তারা এমন মিছিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন?

আরেকটি জিজ্ঞাস্য হল, পাল্টা অভ্যুত্থানকারীরা জেলহত্যার আশঙ্কা বা পরিকল্পনার কথা কি আগেভাগে কিছুমাত্র টের পাননি? ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থান দুটি ঘটিয়েছিল সেনাবাহিনীর মধ্যস্তরের কর্মকর্তাদের দুটি গ্রুপ। তাদের পারস্পরিক সম্পর্কে তেমন কোনো দ্বন্দ্ব বা মতবিরোধের কথা জানা যায়নি। হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা হিসেবে মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের দিকে আঙুল তোলা হলেও সংশ্লিষ্ট আরও অনেককেই সন্দেহের বাইরে রাখা যায় না।

জেলহত্যার বিচার শুরু হয় হত্যাকাণ্ডের ২৯ বছর পর ২০০৪ সালে খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের শাসনামলে। ওই বছরের ২০ অক্টোবর দেয়া আদালতের রায়ে তিনজন পলাতক সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড, ১২ সেনা কর্মকর্তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়া হয়। তবে অভিযুক্ত বিএনপির চারজন সিনিয়র নেতাসহ পাঁচজনকে বেকসুর খালাস দেয়া হয়।

আরও চার বছর পর ২০০৮ সালের ২৮ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারের শাসনামলে হাইকোর্ট জেলহত্যা মামলায় অভিযুক্ত ছয়জন সামরিক কর্মকর্তাকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেয়। তবে তাদের মধ্যে চারজন সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহরিয়ার রশীদ খান, বজলুল হুদা এবং এ কে এম মহিউদ্দীন আহমেদকে বঙ্গবন্ধু হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে ২০১০ সালে ফাঁসিকাঠে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়।

খালাসপ্রাপ্তদের সর্বোচ্চ শাস্তির আবেদন জানিয়ে রাষ্ট্রপক্ষ সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে, যার চূড়ান্ত রায় এখনও পাওয়া যায়নি।

বাংলাদেশের জাতীয় ইতিহাসে গভীরতম শোক ও কলঙ্কের মসীলিপ্ত দুটি দিন হলো ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস এবং ৩ নভেম্বর জেলহত্যা দিবস। পাকিস্তানপন্থি স্বাধীনতাবিরোধী সামরিক-বেসামরিক চক্র এ দুই দিনে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদাতা বঙ্গবন্ধুকে, তার রক্তসম্পর্কিতদেরকে এবং তার প্রধান সহায়ক চার নেতাকে হত্যা করার মধ্য দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদকে সমূলে বিনাশ করতে চেয়েছিল।

এ দুই দিনে তারা আমাদের শিরদাঁড়ায় যে মারণ আঘাত হেনেছিল, তার জের এখনও আমরা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এরপর দীর্ঘ দুই দশক ধরে তারা আমাদের অবনত করে রেখেছিল, রাজাকার-আলবদরদের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করেছিল, খুনিদের পুনর্বাসিত করেছিল, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি করে তাদের বিচারের পথ বন্ধ করে দিয়েছিল।

বঙ্গবন্ধু-কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে জাতি আজ ফিনিক্স পাখির মতো পুনরায় ভষ্মস্তূপ থেকে মাথা তুলে দাঁড়াচ্ছে। কিন্তু খুনিদের অপচ্ছায়া এখনও বাংলার ভাগ্যাকাশ থেকে সম্পূর্ণ দূরীভূত হয়নি। এখনও জাতীয় পতাকা বার বার খামচে ধরতে চায় পুরনো শকুনেরা। ১৯৭৫ সালের দুটি তারিখ ১৫ আগস্ট ও ৩ নভেম্বর এখনও আমাদের চেতনায় কালো ছায়া বিস্তার করে থাকে।

আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী খুনিদের আর খুনের মদদদাতাদের মধ্যে যাদের পরিচয় এখনও জনসমক্ষে উদ্ঘাটিত হয়নি, তাদের প্রত্যেককে খুঁজে বের করে শাস্তির আওতায় এনে জাতির ভবিষ্যতকে শঙ্কামুক্ত ও বিবেককে ভারমুক্ত করুন।

১৫ আগস্ট আর ৩ নভেম্বরের মতো ভয়াল দিনের মুখোমুখি জাতিকে আর কখনও যেন হতে না হয়, তা যেকোনো মূল্যে নিশ্চিত করার মাধ্যমে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে সভ্য জাতি হিসাবে বিশ্ব সমাজে আমাদের উঁচু মাথা অনাগত দিনগুলোতে আরও উঁচু করতে হবে।

লেখক: কলামিস্ট, শিক্ষাবিদ, গবেষক, ফোকলোরিস্ট; অধ্যাপক, ইংরেজি বিভাগ ও সাবেক উপ-উপাচার্য, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

আরও পড়ুন:
‘চার নেতাকে আড়ালে রেখে সোনার বাংলা গড়তে পারব না’
জেল হত্যার ছক কষেছিলেন যারা
চার নেতার স্মৃতি জাদুঘর খুলবে আগামী বছর
বিচার শেষ হলেও পূর্ণতা পায়নি ৪৬ বছরে
জেলহত্যা দিবসের স্মৃতিকথা

মন্তব্য

বিশ্লেষণ
Transport owners are scared because of BNPs arson attacks

বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকরা ভীতসন্ত্রস্ত

বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকরা ভীতসন্ত্রস্ত
বিএনপির এই অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকসহ সাধারণ মানুষ আতংকিত। এ কারণে আজ যখন বিএনপি আন্দোলনের নামে আবার মাঠে নেমেছে, তখন লঞ্চ মালিক, বাস মালিক, ট্রেনের চালক, মালবাহী ট্রাকের মালিক সবাই আতংকিত। সে জন্য তারা তাদের পরিবহন বন্ধ রাখছে।

বিএনপি-জামায়াত নির্বাচন প্রতিহত করার নামে দেশে অসংখ্য মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে। হাজার হাজার নারী-শিশু বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসের শিকার হয়েছিল। বিএনপি ট্রেনে আগুন দিয়েছে, গাড়িতে আগুন দিয়েছে, আগুন দিয়েছে লঞ্চে, চলন্ত বাসে। আর সে আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়েছিল অসংখ্য মানুষ। এমনকি রোগীবাহী এম্বুলেন্সেও আগুন দেয়া হয়েছে।

বিএনপির এই অগ্নিসন্ত্রাসের কারণে পরিবহন মালিকসহ সাধারণ মানুষ আতংকিত। এ কারণে আজ যখন বিএনপি আন্দোলনের নামে আবার মাঠে নেমেছে, তখন লঞ্চ মালিক, বাস মালিক, ট্রেনের চালক, মালবাহী ট্রাকের মালিক সবাই আতংকিত। সে জন্য তারা তাদের পরিবহন বন্ধ রাখছে। বিএনপির সন্ত্রাসকে তারা তাদের পরিবহন ব্যবসার প্রধান অন্তরায় মনে করছে। অগ্নি সন্ত্রাসের জন্য মানুষ বিএনপিকে মানবতার শত্রু মনে করছে। বিএনপিকে তারা কোনোভাবেই বিশ্বাস করতে পারছে না। বিএনপি আজ এক আতঙ্কের নাম।

পরিবহন ব্যবসায়ীরা বিএনপির আন্দোলনে চরম ভীতসন্ত্রস্ত। তারা জানে তাদের মালিকানাধীন পরিবহন হামলার শিকার হলে তাদের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তারা পথে বসবে। তারা এও জানে, এই অগ্নি সন্ত্রাসে শুধু সম্পদ নয়, মানুষের জীবনও বিপন্ন হবে।

সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারী ও শিশুরা সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে। গণপরিবহন ক্ষতিগ্রস্ত হলে এই খাতে জড়িত লক্ষ লক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী এবং তাদের পরিবার পথে বসবে। সার্বিকভাবে দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্তসহ সকলেই সংকটের সম্মুখীন হবে। বিএনপির সন্ত্রাসের আশঙ্কার কারণে পরিবহনের মালিক ও শ্রমিকরা তাদের পরিবহন রাস্তায় নামাতে ভয় পায়। তারা অনাকাঙ্খিত যে কোনো পরিস্থিতি এড়িয়ে দেশের পরিবহন খাতকে নিরাপদ রাখতে চান। পরিবহন মালিকরা বিএনপির আন্দোলনের সময় যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি থেকে রক্ষাসহ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবহন বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

বিএনপির অগ্নিসন্ত্রাসে দগ্ধ মানুষের আর্তনাদ এখনও শোনা যায়। অগ্নিদগ্ধ মানুষের কান্না আজও থামছে না। অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত মানুষের পরিবারের আর্তনাদ এখনো থামছে না। আমরা কি ভুলে গেছি সেই ভয়ংকর দিনগুলোর কথা? ২০১৩ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত বিএনপি যখন সারা দেশে পেট্রল বোমা, অগ্নিসন্ত্রাস চালিয়েছিল, মানবতা তখন ডুকরে ডুকরে কেঁদেছিল। সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোর কথা কি আমরা ভুলে গেছি? অগ্নিদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে কাতড়ানো নারী শিশুর কথা, অগ্নিদগ্ধ মানুষগুলোকে বাঁচানোর জন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার প্রাণান্তকর চেষ্টার কথা কি আমরা ভুলে গেছি? এই অগ্নি সন্ত্রাসের সাক্ষী হয়ে আছে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিট। এটি আজ ইতিহাসের সাক্ষী।

লেখক: আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক

আরও পড়ুন:
গণসমাবেশ শেষ, তবু আ.লীগ-পুলিশের তাণ্ডব থামেনি: খুলনা বিএনপি
বিএনপির সমাবেশের পর ২ মামলা, আসামি ৪২৯
‘খুলনায় বিএনপির বক্তব্য রাষ্ট্রদ্রোহী’
নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মতোই বিচার হবে কাদের-হাছানদের: রিজভী
খুলনায় পুলিশ-বিএনপি সংঘর্ষের মামলায় আসামি ১৭০

মন্তব্য

p
উপরে