বইমেলায় প্রকৃত শিশুতোষ বই কি মিলছে? 

বইমেলায় প্রকৃত শিশুতোষ বই কি মিলছে? 

শিশুদের বইয়ে বানান ভুল থাকা তো অমার্জনীয় অপরাধ। অথচ ভুল বানানের বইতে মেলা থইথই। তারপর রয়েছে লেখকের যত্নের অভাব। অনেক বিখ্যাত লেখক বড়দের জন্য লিখে খ্যাতি অর্জন করেছেন। ব্যস, সেই খ্যাতিকে পুঁজি করে ছোটদের জন্য লিখতে শুরু করলেন। প্রকাশকও ওই পুঁজিতেই বই প্রকাশ করলেন। অনেক অভিভাবক ওই খ্যাতির কারণেই খ্যাতিমান লেখকের বই কিনে দিচ্ছেন শিশুকে। কিন্তু বইয়ের মূল পাঠক সে বই থেকে আনন্দ নিতে পারছে না। বইয়ের প্রতি তার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এই অনাগ্রহ থেকে একসময় বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। তাহলে দোষটা কি পাঠকের?

শিশুতোষ বই নিয়ে হাপিত্যেশ করতে দেখা যায় প্রতি বইমেলাতেই। হাপিত্যেশের মূল কারণ হচ্ছে শিশুদের জন্য এত এত বই প্রকাশিত হচ্ছে, বইগুলো কি শিশুতোষ? এ বিষয় নিয়ে বিস্তর লেখাও হচ্ছে। কখনও কলাম, কখনও প্রতিবেদন।

বইমেলায় শিশুদের বইয়ের ভুবন একটু পর্যবেক্ষণ করা যাক।

এবার করোনাকালে অনুষ্ঠিত বইমেলার পরিসর বেড়েছে গত বছরের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ৫৪০টি প্রতিষ্ঠান পেয়েছে ৮৩৪টি স্টল। সঙ্গে প্যাভিলিয়ন আছে ৩৩টি। কিছু সরকারি ও গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান বাদে প্রায় প্রত্যেক প্রকাশনীর স্টলে শিশুদের বই আছে। অর্থাৎ বইমেলায় শিশুদের বইয়ের কমতি নেই। তার ওপর রয়েছে শিশু চত্বর। সেখানে স্টল রয়েছে ৯৭টি। ওখানে সবই শিশুদের বই। তার মানে বইমেলায় শিশুদের বইয়ের প্রাচুর্য অনেক। যদিও সব বই তালিকাভুক্ত হয় না। এই তালিকাভুক্ত না হওয়া বইয়ের মধ্যে শিশুদের জন্য প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা বেশি। কিন্তু সব বই কেন তালিকাভুক্ত হয় না। বিষয়টা নিয়ে গবেষণা হতে পারে।

সে যাহোক, শিশুতোষ জন্য প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু বই প্রকাশিত হচ্ছে মেলাকে ঘিরে।

শিশুতোষ বই বলতে একেবারে শিশুদের বই তো আছেই, কিশোর পাঠক উপযোগী বইকেও ধরা হয়। শিশু-কিশোরদের বইয়ের মধ্যে যে বিষয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি বই পাওয়া যায়, তা হচ্ছে ভূত-পেতনি বিষয়ক বই। তারপর রয়েছে রূপকথা, গোয়েন্দা, কল্পবিজ্ঞান, নীতিকথা ও শিক্ষামূলক, বিজ্ঞান ও মহাকাশ-বিষয়ক, প্রাণিবিষয়ক বই।

বিষয় বৈচিত্র্য কম নয়। তবে বেশিরভাগ শিশু তার নিজের পছন্দে বই কেনে না বা কিনতে পারে না। অভিভাবকরাই মূলত শিশুদের বই নির্বাচন করে দেন। কারণ বই কেনার টাকা দেন অভিভাবক। এখন প্রশ্ন হচ্ছে অভিভাবকরা কী বই বাছাই করছেন?

নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দেয়াটা মানবচরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যে অভিভাবক যে বিষয় পছন্দ করেন, তিনি ঠিক সেই বিষয়ের বই পছন্দ করেন তার শিশুর জন্য। আর এই সুযোগটা কাজে লাগান আমাদের শিশুগ্রন্থ প্রকাশকরা। তাদের বেশিরভাগই এমন বই প্রকাশ করেন, যেগুলোর লেখকস্বত্ব নেই। পয়সাঅলা প্রকাশকরা একটু বেশি টাকা খরচ করে জমকালো রঙিন ছবি দিয়ে ওসব বই সাজিয়ে তোলেন। যাতে শিশুরা আকৃষ্ট হয়। অভিভাবকরাও সেসব বইয়ের দিকে বেশি ঝোঁকেন। কারণ?

কারণ নস্টালজিয়া। ছোটবেলায় যেসব বই পড়ে তার বড় হয়েছেন, তারা চান তাদের সন্তানরাও সেসব বই পড়ুক। অথচ দুনিয়া কিন্তু বদলে গেছে অনেক। বড়রা তাদের ছোটবেলায় মোবাইল ফোন পাননি, প্রযুক্তির এত ব্যাপকতা উপভোগ করতে পারেননি। কিন্তু তাদের শিশুরা এসব পাচ্ছে ও উপভোগ করছে। বদলে গেছে জীবনধারা। আগে বিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনা, পোশাক-আশাক, সময়ানুবর্তিতা, নিয়মকানুনের এত কড়াকড়ি ছিল না। জিপিএ নিয়ে এত লড়াই ছিল না। অভিভাবকদের মধ্যে সন্তানদের নিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতাও ছিল না। কিন্তু বই নির্বাচনের বেলায় অভিভাবকরা সাধারণত এসব বিষয় ভাবেন না। তারা নস্টালজিয়াকেই প্রাধান্য দেন। অথচ ছোটবেলায় তারা বৃষ্টি হলেই মাঠে ফুটবল নিয়ে ছুটতেন। স্কুল পালানো ছিল অ্যাডভেঞ্চার। এ গাছে ও গাছে হানা দিয়ে ফলমূল খাওয়া ছিল আনন্দের বিষয়।

এখনকার শিশুরা কি এসব কিছু পায়? শহুরে শিশুদের কাছে এসব একেবারেই কল্পনা। গ্রামের শিশুরাও এখন এসব থেকে বঞ্চিত। বলা যায় পুরো দেশের শিশুরা এখন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে এত বেশি ব্যস্ত যে, এসব ভাবারও সময় তাদের নেই। করা তো দূরের কথা।

এখনকার অভিভাবকরা আরেকটা বিষয়কে খুব বেশি প্রাধান্য দেন। নীতিকথা ও শিক্ষামূলক গল্প। দুনিয়াজুড়ে নীতিকথামূলক গল্পের অভাব নেই। কাজেই এ ধরনের বইয়েরও অভাব নেই। কিন্তু স্কুলের পাঠ্যবইতে নীতিকথা, ঘরে-বাইরে সব জায়গায় নীতিকথা শুনতে শুনতে ত্যক্ত-বিরক্ত শিশুরা নীতিকথামূলক বইয়ে কতখানি আগ্রহ পাবে, সেটা কি আমরা ভেবেছি?

তাহলে শিশুদের জন্য বই বাছাই হবে কীভাবে?

আমি এক অভিভাবককে দারুণ এক কৌশলে বই বাছাই করতে দেখেছি তার সন্তানের জন্য। তিনি তার দু’ সন্তান নিয়ে মেলায় এসে বললেন, তোমরা বই বাছাই কর। তোমাদের নোটখাতায় পছন্দের বইয়ের নাম, লেখকের নাম ও প্রকাশনীর নাম লিখে রাখ।

ওরা বাবার কথামতো সেটাই করল। তারপর উনি প্রত্যেকটা স্টলে গিয়ে সন্তানদের বাছাই করা বইগুলো উলটে-পালটে দেখলেন, পড়লেন; এবং তার কাছে যেটা মানসম্মত মনে হয়েছে, তার শিশুর উপযোগী মনে হয়েছে, যেটা পাইরেটেড নয় সেটা কিনে দিলেন।

সন্তানদের জন্য ওই অভিভাবকের বই বাছাই করার প্রক্রিয়াটা দারুণ লেগেছিল।

আর এই বই বাছাই করতে গিয়ে সে অভিভাবক সেদিন অনেক কিছুই টের পেলেন। শিশুদের বইয়ের নামে রীতিমতো অসুস্থ প্রতিযোগিতা চলছে। একটা বইয়ের নাম দেখলেন ‘গলাকাটা দানো’। বইয়ের প্রচ্ছদ দেখেই তার গা গুলিয়ে উঠল। একটা দানোর কাটা মাথা ধরে আছে এক তরবারিঅলা মানুষ। দানোর শরীরবিচ্ছিন্ন মাথা থেকে টপটপ করে রক্ত পড়ছে। বই দেখে তিনি এতটাই চমকে গেলেন যে, বুঝে উঠতে পারলেন না এটা শিশু বা কিশোরদের বই হয় কী করে? আরেকটা বই দেখলেন নামি এক লেখকের। বইয়ের নাম ‘তমুক মামার গার্লফ্রেন্ড’। এটাও শিশুতোষ বই!

এরকম অবাক কিন্তু সব অভিভাবক হন না। কারণ সবাই ঠিক জানেন না, কোনটা তার শিশুর উপযোগী।

বইমেলায় গেলে প্রকাশকরা প্রায়ই বলেন, দিন দিন পাঠক কমে যাচ্ছে।

কথাটা মোটেও ভুল নয়। আগে প্রচুর বইপড়ুয়া চোখে পড়ত। এখন শোনাও যায় না। পাঠকের এত আকাল কেন?

পাঠকের আকালের কথা তুললেই সবাই চোখে আঙুল দিয়ে মোবাইল বা টেকনোলজিকে ইঙ্গিত করে। আসলেই কি তাই? পশ্চিমা বিশ্বে কিন্তু বইপড়ুয়াদের সংখ্যা কমেনি। বরং বেড়েছে। টেকনোলজি তো ওখান থেকেই আমদানি হয়। তাহলে?

আমাদের দেশে বই পড়ুয়ার সংখ্যা কেন কমে যাচ্ছে, মূল জায়গাটায় যাওয়া জরুরি। এর অনেক কারণ আছে। আমরা শিশুদের হাতে যে বই তুলে দেই, সে বই কতখানি সেই শিশুর বয়স, বুদ্ধি ও পড়ার গতির সঙ্গে মানানসই- সেটা না ভেবেই দেই। বিষয়টা এরকম অসুখ করেছে তো যেকোনো ওষুধ খাও।

শিশুদের বই দিতে হয় বয়স অনুযায়ী। তাহলে বইয়ের প্রতি শিশুর আগ্রহ জন্মায়। পড়া ও জানার প্রতি কৌতূহল তৈরি হয়। শিশুদের জন্য যারা বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত, সেটা লেখক কিংবা প্রকাশক-যিনিই হন না কেন, তাদেরকে প্রথমে বুঝতে হবে বইটা কোন বয়সি শিশুদের জন্য? বড়দের বই আর শিশু-কিশোরদের বইয়ে পার্থক্য আছে। বড়দের বইয়ে যেমন শব্দ, বাক্য, কাহিনি- এসবের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। কিন্তু শিশু-কিশোরদের বইয়ে এসব জরুরি বিষয় থাকতে হয়।

একটা বই হাতে নিলেই বোঝা যায়, ওই বইয়ের প্রতি কার যত্ন কতখানি। শিশুদের বইয়ে অতিরিক্ত যত্ন থাকতে হয়। যেমন অতিরিক্ত যত্ন করতে হয় শিশুদের বইয়ের বেলায়। বই হাতে নিয়ে একটু মাথা খাটালেই যেকোনো অভিভাবক বুঝতে পারবেন কোন বইতে যত্ন আছে, কোন বইতে নেই। প্রত্যেকটা শিশুতোষ বইতে যত্নবান থাকতে হয় লেখক, আঁকিয়ে, প্রকাশক-সবাইকে।

শিশুদের বইয়ে বানান ভুল থাকা তো অমার্জনীয় অপরাধ। অথচ ভুল বানানের বইতে মেলা থই থই। তারপর রয়েছে লেখকের যত্নের অভাব। অনেক বিখ্যাত লেখক বড়দের জন্য লিখে খ্যাতি অর্জন করেছেন। ব্যস, সেই খ্যাতিকে পুঁজি করে ছোটদের জন্য লিখতে শুরু করলেন। প্রকাশকও ওই পুঁজিতেই বই প্রকাশ করলেন। অনেক অভিভাবক ওই খ্যাতির কারণেই খ্যাতিমান লেখকের বই কিনে দিচ্ছেন শিশুকে। কিন্তু বইয়ের মূল পাঠক সে বই থেকে আনন্দ নিতে পারছে না। বইয়ের প্রতি তার আগ্রহ কমে যাচ্ছে। এই অনাগ্রহ থেকে একসময় বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। তাহলে দোষটা কি পাঠকের?

একদিন হুট করে সদ্য কৈশোরে পা দেয়া এক কিশোরকে গালিগালাজ করতে শুনলাম। কিন্তু আমি জানি ও বইপড়ুয়া। তাহলে বইপড়ুয়া কোনো মানুষ তো এমন হওয়ার কথা নয়। ঘটনা কী!

ঘটনা জানা গেল- ওই কিশোর ইদানিং এমন কিছু লেখকের বই পড়েছে, যেগুলোতে গালিগালাজ আছে। ওই বইগুলো শিশু-কিশোরদের জন্যই লেখা।

অনেক সময় এসব বিষয় লেখকের অবচেতন মনে ঢুকে পড়ে। লেখক নিজেও লেখার সময় সতর্ক থাকেন না তিনি আসলে কোন পাঠকদের জন্য লিখছেন। বইমেলার তাড়ায় আর প্রকাশকের চাপে তিনি কেবল লিখেছেন। আর সম্পাদনা? ওরে বাপরে! এত বড় লেখকদের বই সম্পাদনা করার কথা মুখে আনার সাহস আছে কার!

আরেকজন বিখ্যাত লেখক। খুবই জনপ্রিয় কিশোরদের কাছে। কিশোরদের জন্য লেখা তার বইয়ের এক জায়গায় আছে- টেলিভিশন থেকে একটা ভূত বেরিয়ে কিশোরীর চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল।

অনেক অভিভাবক শুধু লেখকের নাম দেখেই বই কিনে দেন। লেখা দেখেন না। আর সে কারণেই শিশু-কিশোরদের অনুপযোগী বই ঢুকে পড়ছে মেলায়। চলে যাচ্ছে ঘরে ঘরে।

এরকম আরও অনেক আছে। এসব নিয়ে কেউ ঘাঁটায় না।

আরেক ধরনের বইয়ের দেখা মেলে মেলায়। কাটপেস্ট ধরনের বই। এসব কাটপেস্ট বই বেশিরভাগই শিশু-কিশোরদের জন্য। ওসব বইতে বাক্য, বানান, শব্দ, বিষয়- কিছুই ঠিক থাকে না। ভুল তো পাতায় পাতায়। কেবল প্রচ্ছদটাই থাকে চকচকে। আর তাতেই বিক্রি হয়ে যায় ওসব বই।

আর এসব বই পড়ে পাঠক এক সময় বই-অনুরাগী না হয়ে বই-বিরাগী হতে বাধ্য।

তবে আশার কথা হচ্ছে কিছু প্রকাশক ও লেখক দায়িত্বটা নিয়েছেন। শিশুদের বয়স উপযোগী, চিন্তা-চেতনা উপযোগী ও নির্ভুল বই প্রকাশ করছেন। এদের সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই যাচ্ছে।

এবারের বইমেলা এমনিতেই অনেক ঝক্কির। মেলায় পাঠকের আনাগোনা নেই। শিশুদের জন্য শিশুচত্বর আছে ঠিকই, তবে সেটা নিতান্ত অবহেলায় এমনভাবে করা হয়েছে, শিশুদের বইমেলার প্রতিই আগ্রহ কতখানি জন্মাবে চিন্তার বিষয়।

শিশুদের বইমুখী করতে হলে কিন্তু অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। আর শিশুদের বইমুখী করতে না পারলে, জাতি কী করে বইমুখী হবে?

লেখক: শিশুসাহিত্যিক, সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন

মন্তব্য

মালেকা বেগম: নিভে গেল শিক্ষার প্রতিবাদী কণ্ঠ

মালেকা বেগম: নিভে গেল শিক্ষার প্রতিবাদী কণ্ঠ

মাধ্যমিক শিক্ষার কোথায়, কতটুকু অসঙ্গতি—এটা ভালো করেই জানতেন প্রতিবাদী ও প্রবীণ শিক্ষক নেতা মালেকা বেগম। তার সঙ্গে বেশিরভাগ কথায় হতো শিক্ষা বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে। উনি যেহেতু শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, সেহেতু শিক্ষার অনেক খবরাখবর রাখতেন। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি ছিলেন এক সময়।

‘ভাই, এই অন্যায় আর মানা যায় না। প্লিজ, কিছু লেখেন।’ সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক নেতা মালেকা বেগমের মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকে এই কথাটি কানে বাজছে।

ভাঙা গলায় বলা তার এই বাক্যটি বারবার মনে পড়ছে। করোনা কেড়ে নিয়েছে প্রতিবাদী ও প্রবীণ এই শিক্ষক নেতাকে।

মালেকা আপাকে কবে থেকে চিনি, মনে পড়ছে না। তবে ১৯৯৮ সাল থেকে ভালোভাবে চিনি। তখন জনকণ্ঠে প্রায়ই আসতেন। বেশিরভাগ সময় তিনি ঢাকার বাইরে শিক্ষকতা করেছেন। ঢাকার নারিন্দা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তখন প্রায়ই যোগাযোগ হতো। সর্বশেষ খুলনা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তবে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তিনি অবসরে যাওয়ার আগ পর্যন্ত।

মালেকা আপা ফোন করলেই তার প্রতিবাদী বক্তব্য শুনতে হতো। মাধ্যমিক শিক্ষার কোথায়, কতটুকু অসঙ্গতি—এটা তিনি ভালোই জানতেন। অনেক সময় ব্যস্ততার কারণে ফোন ধরতে পারতাম না। একদিন উনি কয়েকবার ফোন করেছিলেন। কোনো জরুরি কাজে ফোন ধরতে পারিনি।

পরে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ভাই, আপনি ফ্রি থাকেন কখন?’

বললাম, ‘বেশি রাতে’।

আপা বললেন, ‘বেশি রাত মানে কয়টা?’

বললাম, ‘রাত সাড়ে ১১ বা ১২টা’।

‘এত রাতে ফোন দেব?’

বললাম, ‘অনেকেই তো দেন। কারণ, অন্য সময় বেশি কথা বলার সুযোগ পাই না।’

এরপর থেকে উনি রাতেই ফোন করতেন। বেশিরভাগ ফোন শিক্ষা বিভাগের অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে। উনি যেহেতু শিক্ষক রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন, সেহেতু শিক্ষার অনেক খবরাখবর রাখতেন। সরকারি মাধ্যমিক শিক্ষক সমিতির একাংশের সভাপতি ছিলেন এক সময়।

একবার উনি নিজেই শিক্ষা বিভাগের রোষানলে পড়েছিলেন। ইতিহাসবিদ ও অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন ওনার পক্ষে জনকণ্ঠে একটি লেখা লিখেছিলেন। সেই লেখাটি সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন। আমিও প্রতিবেদন লিখেছিলাম ওনার ওপর অন্যায়ের চিত্র তুলে ধরে। এরপর তিনি রক্ষা পেয়েছিলেন।

সেই কৃতজ্ঞতা উনি অনেকবার প্রকাশ করেছেন। সর্বশেষ খুলনা জেলা স্কুলেও একটি ঝামেলায় পড়লেন। যেহেতু প্রতিবাদী কণ্ঠ ছিলেন, সেহেতু স্কুলে, শিক্ষা বিভাগে বা শিক্ষক রাজনীতিতে তার প্রতিপক্ষ ছিল।

সম্ভবত, ২০১৮ সালে উনি অবসরে গেলেন। খবরটি জানিয়ে তিনি বললেন, ‘এই আপা আর আপনাকে খবরাখবর দেবে না।’

বলেছিলাম, অবসরে গেলেও তো আপনার চোখ–কান বন্ধ হয়ে যাবে না। একদিন ঢাকায় আসেন কথা বলব। কিন্তু অবসরে যাওয়ার পর আর দেখা হয়নি। শুধু একদিন ফোন করে বললেন, ‘ভাই, কন দেখি আমি নাকি ভর্তির ক্ষেত্রে দুর্নীতি করছি। জীবনভর দুর্নীতি ঠেকালাম। শেষ সময়ে আমাকে ফাঁসাতে চাইছে। আমার পেনশন আটকে রেখেছে।’

বললাম, ‘ধৈর্য ধরেন, আপা। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

এরপর তদন্তে দেখা গলে, তার বিরুদ্ধে ভর্তি অনিয়মের অভিযোগ সঠিক ছিল না। বেশ কিছুদিন ভোগার পর উনি পেনশন পেলেন।

আজ মালেকা আপার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন। শিক্ষা বিষয়ে যখন সাংবাদিকতা করতাম, তখন আপনার অনেক সহায়তা পেয়েছি। যেখানেই অনিয়ম, দুর্নীতি দেখেছেন জানাতে দেরি করেননি। নিজের স্বার্থের চেয়ে শিক্ষার স্বার্থ বেশি দেখেছেন। খুলনা জেলা স্কুলের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন।

মাধ্যমিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন সেই ব্যস্ত সময়েও আপনার ফোন ধরতে হতো। স্কুলের ভালো ফল করার খবরটি আমাকে জানিয়ে যেন স্বস্তি পেতেন।

একবার আমার এক চাচাকে আপনার কাছে পাঠিয়েছিলাম। খুলনায় মালেকা বেগমের তখন অনেক নামডাক। ওই চাচা তো ভেবেছেন খুলনা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে দেখা করতে কত কাঠখড় পোড়াতে হবে। কিন্তু চাচা ফিরে এসে তো ভাতিজার প্রশংসায় পঞ্চমুখ। খুলনা জেলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আমাকে এতো স্নেহ করতে পারেন, এটা নাকি চাচার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছে।

ভালো থাকেন মালেকা আপা। খুলনায় শিক্ষকতা করলেও আপনার ছাত্ররা দেশে–বিদেশে ছড়িয়ে আছে। অসংখ্য শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও শিক্ষকদের মধ্যে আপনি বেঁচে থাকবেন। সাংবাদিক হিসেবে আমার কাছে বেঁচে থাকবেন শিক্ষা জগতের ‘প্রতিবাদী কণ্ঠ’ হিসেবে। হে আল্লাহ, মালেকা আপার জন্য বেহেশতে একটু জায়গা রেখো।

লেখক: সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন

করোনার ভয়াবহতা ও সহনশীলতা

করোনার ভয়াবহতা ও সহনশীলতা

সরকারের ব্যর্থতা যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে সে কারণে ক্ষোভ যত বাড়তে থাকে- ততই সরকার ও সরকারি দলে সহনশীলতা হ্রাস পায়। সমালোচনা বন্ধ করে দেয়া হয় যেনতেন প্রকারে। আমরা যেন ভুলতে বসেছি সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকদের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

করোনা সংক্রমণ প্রথম ধরা পড়ার পর ১৯ এপ্রিল ২০২১ পর্যন্ত একটি দিনও মৃত্যুর মিছিল থামেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনন্দিন ব্রিফিং বা বিজ্ঞপ্তিতে একটি দিনও দেশবাসীকে জানাতে পারল না ‘আজ একটিও মৃত্যু ঘটেনি-একজনও সংক্রমিত হয়নি করোনায়।’ বরং ঘটেছে, ঘটেই চলেছে সম্পূর্ণ বিপরীতটা। মৃত্যু ও সংক্রমণের মিছিল ঘরে ঘরে কান্নার ঢেউ বেড়েই চলেছে।

প্রথমদিকে সরকারপক্ষ থেকে বলা হলো গুজবে কান দেবেন না, করোনাকে শিগগিরই প্রতিহত করা হবে। একজন বাকপটু মন্ত্রী তো বলেই ফেললেন, করোনা নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। আওয়ামী লীগ করোনার চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী, আজ আর তিনি এ দাবি ভুলেও করেন না। এ ব্যাপারে মুখে তালা লাগিয়েছেন। এ দাবিটি যদি বাস্তবে সত্য হতো অর্থাৎ, সরকারের কোনো ব্যাপারে ত্রুটি অবহেলা বা ব্যর্থতা না থাকত কতই না আনন্দের হতো বিষয়টি। তখন কিন্তু কোনো মন্ত্রীর মুখ থেকে টেলিভিশনে মানুষ শুনত না বরং নিজেরাই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তা বলে বেড়াতেন অফিস আদালতে, হোটেলে-রেস্তোঁরায়, মাঠে ময়দানে, ক্লাব-লাইব্রেরিতে। তা ঘটে না দেখে সরকার বাস্তবে ক্ষুব্ধ এবং সে ক্ষোভ নানাজনের মুখ থেকে নানাভাবে প্রকাশিত হচ্ছে। এই পটভূমিতে যখন তাকিয়ে দেখি ২৪ ঘণ্টায় বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু এক শ ছাড়িয়েছে, তখন কী বলব? আমরা সেঞ্চুরিয়ান হওয়ার গৌরব অর্জন করেছি? অভিজ্ঞতায় বলে, সরকারের ব্যর্থতা যত বাড়ে, মানুষের মধ্যে সে কারণে ক্ষোভ যত বাড়তে থাকে- ততই সরকার ও সরকারি দলে সহনশীলতা হ্রাস পায়। সমালোচনা বন্ধ করে দেয়া হয় যেনতেন প্রকারে। আমরা যেন ভুলতে বসেছি সরকারের সমালোচনা করা নাগরিকদের সংবিধানস্বীকৃত মৌলিক অধিকার।

একটি জাতীয় দৈনিকে ১৬ এপ্রিলের সংখ্যায় প্রথম পৃষ্ঠায় ‘করোনায় ভয়ংকর এপ্রিল’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এপ্রিলের ১৫ দিনে মৃত্যু, ১০৩৯, ১৬ দিনে আক্রান্ত এক লাখ। এই প্রতিবেদনটিতে ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত তথ্য দেয়া হয়েছে, কিন্তু ১৬ এপ্রিলে মৃত্যুসংখ্যা লাফিয়ে ১০১-এ পৌঁছায় । ১৭ এপ্রিলেও তাই। তা হলে ১৬ দিনে মৃত্যু ঘটেছে ১১৪০। এপ্রিলের বাকি দিনগুলোতে কী দাঁড়াবে কে জানে!

ওই পত্রিকাতেই একই দিনে করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ার পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা আগেই জানিয়েছেন বাংলাদেশ এখন আফ্রিকান ভ্যারিয়েন্টের করোনায় আক্রান্ত। এই ভ্যারিরেন্টের লক্ষণগুলো হলো: এক. এই ভাইরাস অতি সংক্রমণশীল অর্থাৎ ছোঁয়াচে; দুই. একজন থেকে আর একজনে দ্রুত ছড়ায়; তিন. ছোঁয়াচে এই ধরনটি কোনো উপসর্গ ছাড়াই সরাসরি ফুসফুসে আক্রমণ করে; চার. এই ধরনটি বয়স্ক ও আগে থেকেই অসুস্থদের ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ এবং রোগের তীব্রতা বেশি হওয়ায় মৃত্যুর হারও বেশি।

অপর একটি জাতীয় দৈনিক ১৭ এপ্রিলে প্রকাশিত সংখ্যায় ‘সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার আরও বাড়তে পারে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে লিখেছে: ‘প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের ঊর্ধ্বমুখী সংক্রমণ ও মৃত্যুর মধ্যেই আরও আতঙ্কের খবর এসেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের করোনাভাইরাস ব্যবস্থাপনা কমিটি করোনার সংক্রমণ ও মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগজনক পূর্বাভাস দিয়েছে। করোনায় সংক্রমণ ও মৃত্যু আরও বাড়বে উল্লেখ করে পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, সংক্রমণের চলমান ধারা অব্যাহত থাকলে ও নমুনা পরীক্ষা ৩৫ হাজার বা তার বেশি হলে প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার করে কোভিড রোগী শনাক্ত হতে পারে এবং মৃত্যু হবে ১০০ জনের কাছাকাছি।

পূর্বাপর ঘটনাবলি সাজালে ছবিটা অবিকল সবার সামনে ভেসে উঠবে।

প্রথমদিকে নানা মহল থেকে অভিযোগ উঠেছিল করোনা চিকিৎসার জন্য পৃথক ওয়ার্ড করা হলো। কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালে (ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরে) তা করাও হলো। পাশাপাশি বের হলো স্বাস্থ্য খাতের বিরাজমান বিচিত্র দুর্নীতির ভয়াবহ সব ঘটনা। হাসপাতাল (বেসরকারি) আবিষ্কার হলো যেখানে করোনা পরীক্ষার ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও রোগী বা সন্দেহভাজনদের দিব্যি করোনা পরীক্ষা করে বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে রোগীর প্রয়োজন বা চাহিদা অনুযায়ী রিপোর্ট প্রদান। ঢাকা, চট্টগ্রামের কয়েকটি সরকারি হাসপাতালে করোনা টেস্টের ব্যবস্থা হলো- তাতে যে সংখ্যক লোকের পরীক্ষা সম্ভব হলো তা নেহায়েতই অনুল্লেখযোগ্য। ফলে আক্রান্ত মৃতের সংখ্যাও কম আসতে থাকল। ধীরে ধীরে টেস্টের সুযোগ নানা জেলায় সম্প্রসারিত হলেও সুদীর্ঘ ১৪ মাসের মধ্যেও সকল জেলা হাসপাতালে টেস্টিং ব্যবস্থা নেই। নমুনা নিয়ে পাঠানো হয় দূরবর্তী কোনো জেলায় টেস্ট করে ফলাফল জানানোর জন্য। এতে এক থেকে দুসপ্তাহ সময় লাগে।

করোনা চিকিৎসার অপরিহার্য আইসিইউ ও বাড়তি অক্সিজেনের ব্যবস্থা আজও ঢাকা চট্টগ্রাম, রাজশাহী, রংপুর, খুলনা, বরিশাল ও সিলেটের সরকারি হাসপাতালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু অত স্বল্পসংখ্যক রোগীর চাহিদা যেমন তখন মেটানো যায়নি- তেমনই আজও তা যাচ্ছে না। হ্যাঁ, বেড ও আইসিইউর সংখ্যা সম্প্রতি ওই হাসপাতালগুলোয় বাড়ানো হয়েছে, কিন্তু তা চাহিদার তুলনায় নগণ্য।

জেলা হাসপাতালগুলোর তো কথাই নেই। সেগুলোতে নেই করোনা রোগীর জন্য পৃথক ওয়ার্ড। করোনা চিকিৎসার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার নার্স স্বাস্থ্যকর্মী কিছু নেই। নেই আইসিইউ-সুবিধা। তাই দ্রুত সকল জেলা হাসপাতালে পৃথক যথেষ্টসংখ্যক শয্যা, পৃথক করোনা ওয়ার্ড, ডাক্তার নার্স প্রভৃতি এবং অন্তত ১০টি করে আইসিইউর ব্যবস্থা করা হোক, ব্যবস্থা করা হোক জেলা-উপজেলাপর্যায় পর্যন্ত। করা হোক করোনা টেস্টের ব্যবস্থাও। টেস্টিংয়ের জন্য যে ফি নির্ধারণ করা হয়েছে তা অবিলম্বে প্রত্যাহার করে প্রতিদিন অন্তত ৫০ হাজার লোকের করোনা টেস্টিংয়ের ব্যবস্থা করা হোক।

স্বাস্থ্য বিভাগের যাবতীয় দুর্নীতির বিচারও ত্বরান্বিত করা হোক।

লকডাউনের নামে (নরম ও কঠোর) যে প্রহসন দেখা গেল, বিশেষজ্ঞরাই তার অসারতা খোলামেলাভাবে উল্লেখ করেছেন। তাদের মতামত গ্রহণ করে অবিলম্বে নতুন করে সর্বাত্মক লকডাউন ঘোষণা করা হোক। কোনো প্রকার যানবাহন, বিমানের সাধারণ বা স্পেশাল ফ্লাইট, গার্মেন্টসহ সকল ছোটবড় শিল্পকারখানা ব্যাংক বন্ধ ঘোষণা করা হোক।

এর ফলে লাখ লাখ শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ, এমনকি, নিম্নমধ্যবিত্ত অসংখ্য পরিবার, যারা না খেয়ে থাকলেও কারো কাছে কিছু চাইতে পারেন না- আগামী ছয় মাস কমপক্ষে তাদের সবার জন্য যথেষ্ট পরিমাণ প্রণোদনা দিয়ে যেতেই হবে।

লেখক: রাজনীতিক-কলাম লেখক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক।

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন

করোনাকালে শিক্ষার বাস্তবতা

করোনাকালে শিক্ষার বাস্তবতা

আমাদের জন্য ভয়াবহ তথ্যটা হচ্ছে ২০২০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অসংখ্য শিশু ঝরে পড়েছে শুধু করোনাকালে অভাবের কারণে। সানেমের এক গবেষণায় বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে শতকরা ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে না। কারণ তাদের পরিবার কাজ হারাবে ও সংসারে অভাব বাড়বে।

সুলেখার কষ্টটা আমি কল্পনাও করতে পারছি না। গত বছরের আগস্টে ওর সঙ্গে আমার পরিচয়। সুলেখা বলেছিল, ‘আন্টি আমি কীভাবে আবার স্কুলে যেতে পারব বলো তো?’

আমি বলেছিলাম, মা, করোনা শেষ হয়ে গেলে আবার তোমাদের স্কুল খুলবে; তুমি আবার স্কুলে ফিরে যাবে।

উত্তরে সুলেখা কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল, ‘আন্টি আমার স্কুল একদম বন্ধ হয়ে গেছে। আমি নিজে দেখেছি স্কুলের টেবিল, চেয়ার, বোর্ড সব বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। দরজায় তালা লাগিয়ে টু-লেট ঝুলিয়ে দেয়া হয়েছে।

‘আর আমরাও গোড়ানের বাড়ি ছেড়ে বাড়ি চলে যাচ্ছি। কারণ বাবার চাকরিও চলে গেছে।’

আমার জীবনে এত কষ্টের অভিজ্ঞতা আর কখনও শুনেছি কি না, মনে করতে পারিনি।

আট বছরের ছোট নাতনি সেদিন করুণ স্বরে বলল, ‘নানু আমরা কি স্কুলে গিয়ে আর কখনো ক্লাস করতে পারব নাকি ঘরে বসে ক্লাস করতে করতেই বড় হয়ে যাব?

‘আমি এক ক্লাস থেকে আরেকটা ক্লাসে উঠে গেলাম ক্লাসরুম, টিচার আর বন্ধুদের সামনাসামনি না দেখেই।’

ওর এই অনুভূতির সঙ্গে ভীষণ রকমের কষ্ট জড়িয়ে আছে। ঘরের বন্দি জীবনের সঙ্গে যখন পড়াশোনার করার মতো আরেকটি ‘কঠিন’ বিষয় যোগ হয়, তখন একটি শিশুর জীবন কতটা কষ্টের হতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। শিশুকালে পড়াশোনা করাটা তখনই আনন্দময় হয়, যখন এর সঙ্গে স্কুল, স্কুলের মাঠ, পরীক্ষা, খেলাধুলা ও সহপাঠীদের সঙ্গে গল্প-গুজব করার বিষয়টি জড়িত থাকে।

অপরদিকে মেহেরুন্নেছা নামের ১৪-১৫ বছরের একটি মেয়ে গ্রাম থেকে মোটামুটি পালিয়েই খালার হাত ধরে শহরে আমার কাছে চলে এসেছে। ও গ্রামের সরকারি স্কুলে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত। স্কুল বন্ধ বলে পরিবার জোর করে বিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু ও বিয়ে করবে না বলে এখানে চলে এসেছে।

স্কুল খুললে চলে যাবে এই আশাতেই ছিল। কিন্তু নতুন করে করোনা শুরু হওয়াতে মেহেরুন্নেছা খুব দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়ে গেছে। সুলেখা, নয়নতারা ও মেহেরুন্নেছারা সবাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

মেহেরুন্নেছার দুশ্চিন্তার খুবই যুক্তিসংগত কারণ আছে। কারণ গত বছর দেশের এক কোটি ৯০ লাখ স্কুল শিক্ষার্থীর অধিকাংশই পড়াশোনার বাইরেই থেকে গেছে।

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যে এপ্রিল থেকে অক্টোবর পর্যন্ত সাত মাসে দেশের ২১টি জেলার ৮৪ উপজেলায় ১৩ হাজার ৮৮৬টি বাল্যবিয়ে হয়েছে। এর মধ্যে পাঁচ হাজার ৮৯ জন স্বীকার করেছে, করোনাকালে তারা অপ্রত্যাশিতভাবে গর্ভধারণ করেছে। এসবই গতবারের করোনাকালের দুঃসহ অভিজ্ঞতার চিত্র। তাহলে কি আমরা একই অবস্থা আবারও প্রত্যক্ষ করতে যাচ্ছি?

যেসব মেয়েরা বাল্যবিয়ের শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে শতকরা ৫০.৬ জনের বিয়ে হয়েছে ১৬-১৭ বছরের মধ্যে। শতকরা ৪৭.৭ জনের বিয়ে হয়েছে ১৩-১৫ বছরের মধ্যে। এমনকি শতকরা ১.৭ জনের বিয়ে হয়েছে ১০-১২ বছর বয়সে।

মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের করা ‘বাল্যবিয়ের অবস্থা দ্রুত বিশ্লেষণ: করোনাকাল ২০২০’ শীর্ষক এক জরিপ রিপোর্টে এই তথ্যগুলো উঠে এসেছে।

উল্লেখ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বাল্যবিয়ের হার। শতকরা ৫১ জন। বাল্যবিয়ের হার বেশি, বিশ্বের এ রকম ১০টা দেশের মধ্যে বাংলাদেশ আছে। করোনাকালে মেয়েশিশুরা যে কতটা অসহায় তা আবার প্রমাণিত হয়েছে। দ্বিতীয় দফা করোনা শুরু হওয়াতে আবার নতুন করে এসব প্রশ্ন বা আশঙ্কা আমাদের সামনে এসেছে।

পিছনে ফিরে দেখছি যে, ২০২০ সালে অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের অন্যতম বড় চিন্তা ছিল করোনার পরে স্কুল খুললে বাচ্চাদের হাফ ইয়ারলি পরীক্ষা হবে কি? হলে কবে হবে? সিলেবাস কী হবে? ঘরবন্দি অবস্থায় অনলাইনে পড়াশোনা করা কতটা সম্ভব? আবারও এই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।

প্রায় দুই কোটি শিক্ষার্থী পড়ছে প্রাথমিক স্কুল ও মাধ্যমিক স্কুলে। গত বছর সরকার ভেবেছিল ফাইনাল পরীক্ষা পিছিয়ে দেবে; সিলেবাস কমিয়ে দেবে। কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষার্থীরা কোনো পরীক্ষা দিতে পারেনি। গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি শিক্ষার্থী পড়াশোনাই করতে পারেনি।

গ্রামগঞ্জের প্রত্যন্ত এলাকায় বা শহরের বস্তিতে যে শিশুটি পড়ছে, যার স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা শেখা ছাড়া, শেখার আর কোনো উপায় নেই অথবা এমন অনেক ছাত্রছাত্রী আছে, যাদের অভিভাবকরা পড়তে পারেন না কিংবা তাদের পড়াশোনাতে সহায়তাও করতে পারেন না। তাদের অবস্থা খুবই করুণ হয়েছিল গত বছর।

দূরশিক্ষণ ক্লাসের ব্যবস্থা গত বছর সফল হয়নি। এই ব্যবস্থায় টিভি, রেডিও, মোবাইল ফোন, ইন্টারনেটের মাধ্যমে সর্বোচ্চসংখ্যক ছাত্র-ছাত্রীর কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা মোটামুটি মুখথুবড়ে পড়ে। কারণ বাংলাদেশে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীর ইন্টারনেট অ্যাকসেস নেই এবং ইন্টারনেট ডাটা কেনার সক্ষমতাও নেই বললেই চলে।

এ বিষয়ে ক্যাম্পেইন ফর পপুলার এডুকেশনের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী গত বছর সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকনোমিক মডেলিংয়ের (সানেম) একটি সেমিনারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘চর, হাওর ও চা বাগানের বাচ্চাদের স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট নেই। দেশের শতকরা ৪৪ ভাগ পরিবারের টেলিভিশনও নেই। তাহলে তারা কেমন করে অনলাইনে ক্লাস করবে?’

মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক অধিদপ্তর স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য মাধ্যমিক স্তরের যে পড়া প্রচার করতে শুরু করেছিল সরকারের অ্যাকসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পের সহায়তায়, যাতে মহামারিকালে বাচ্চারা পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে। এটা ছিল একটা সাময়িক সমাধান এবং ফলাফল একদমই আশানুরূপ হয়নি। আর আমাদের মতো দেশে এটা দীর্ঘমেয়াদি কোনো উপায় নয়।

আমাদের জন্য ভয়াবহ তথ্যটা হচ্ছে ২০২০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে অসংখ্য শিশু ঝরে পড়েছে শুধু করোনাকালে অভাবের কারণে। সানেমের এক গবেষণায় বলা হয়, ধারণা করা হচ্ছে শতকরা ৩০ জন ছাত্রছাত্রী আর বিদ্যালয়ে ফিরে আসবে না। কারণ তাদের পরিবার কাজ হারাবে ও সংসারে অভাব বাড়বে। (সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন)

আমরা দেখেছি অনলাইন শিক্ষাদান পদ্ধতি প্রযুক্তিগত দুষ্প্রাপ্যতা, প্রান্তিকতা ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে সফল হয়নি। আমরা খুঁজে বের করতে পারিনি কত পরিবার খুব খারাপ অবস্থায় রয়েছে, কাদের প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার নেই, কাদের হাতে টাকা নেই, কারা বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর বদলে কাজ করতে পাঠিয়েছে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম গত বছর করোনাকালে এক অনুষ্ঠানে বলেছিলেন, ‘আমাদের শিক্ষাবছর কমাতে হবে। ১০ মাস করে হিসাব করলে তিন বছরে এই ৬ মাস সময়টা অতিক্রম করা যাবে। সিলেবাসও কমাতে হবে ১০ ভাগ।

‘সময় নষ্ট কোনো চ্যালেঞ্জ নয়। আসল চ্যালেঞ্জ ঝরেপড়ার হার কমানো। আমি জানি না স্যার বা স্যারের মতো বিজ্ঞজনেরা এবার কী ভাবছেন?’

বিবিসির একটা খবর জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতকরা ৯৮ ভাগ হলেও শিশুরা মানসম্মত শিক্ষা পাচ্ছে না। বিশ্বব্যাংক বলেছে, প্রাথমিকের ৬৫ ভাগ শিক্ষার্থী বাংলাই পড়তে পারে না। ইংরেজি আর গণিতে অবস্থা এর চেয়েও দুর্বল। এদের অনেকে অক্ষরও চেনে না। শিক্ষকরা মনে করেন এই বাচ্চাগুলোকে বাসায় পড়ানোর মতো কেউ নেই।

এ ছাড়া শতকরা ৫০ ভাগ শিক্ষকের বছরের পর বছর কোনো প্রশিক্ষণও হয় না। ইউনেসকো বলেছে, বাংলাদেশে শিক্ষকদের এই ট্রেনিং পাওয়ার হার এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে কম। এই যদি হয় সাধারণ সময়ে শিশুদের শেখার অবস্থা, তাহলে করোনাকালে দূরশিক্ষণের মাধ্যমে তারা কতটা শিখবে আর পরীক্ষাই বা কীভাবে দিতে পারবে? আর নতুন করে আরেকটি করোনার ধাক্কা তারা পড়াশোনা ছাড়া কীভাবে পার করবে?

গতবারের অভিজ্ঞতা বলে যে, ইংরেজি মাধ্যমের সব ছাত্র-ছাত্রীর জন্য অনলাইনে পড়াশোনা করাটাও ছিল কঠিন। কারণ সবার বাসায় কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা স্মার্টফোন বাড়তি থাকে না।

ফোনের মাধ্যমে পরীক্ষাও দেয়া যায় না। এই অনলাইনে ক্লাস করতে গিয়ে নাস্তানাবুদ হয়েছেন প্রযুক্তি ব্যবহারে সিদ্ধহস্ত নন এমন অভিভাবকরা। তারা বেশ বিপাকেই পড়েছেন শিশুকে অনলাইন ক্লাস করাতে গিয়ে।

এরই মধ্যে অনলাইনে ছাত্র-ছাত্রীরা পরীক্ষা দিলেও সত্যিকার অর্থে খুবই নিরানন্দময় এই শিক্ষা গ্রহণ তেমন কোনো প্রভাব রাখতে পারেনি তাদের জীবনে। চীন, জাপান, আমেরিকার মতো ফাইভজি ব্যবহারকারী দেশগুলো এই পরিবর্তনকে খুব সহজেই গ্রহণ করতে পেরেছে। তাদের স্লোগান ছিল, ‘যেকোনো সময়, যেকোনো জায়গা থেকেই পড়াশোনা’। কিন্তু বাংলাদেশে তা সফল হয়নি, এবারও হবে বলে মনে হয় না।

লকডাউনের ফলে আমাদের শিশু-কিশোর, তরুণরা বছরের পর বছর পড়ালেখা ছাড়া থাকতে পারে না। এটি মানসিক বিকাশের জন্য অনুকূল নয়। করোনা হয়তো চলে যাবে একদিন। সামনের দিনগুলোতে অর্থনৈতিক অবস্থা মোকাবিলা করতে গিয়ে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়বে। সেসব বিষয় ভেবে নিয়েই আমাদের করণীয় ঠিক করতে হবে।

বাংলাদেশে প্রাইমারি থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত প্রায় পৌনে ছয় কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষাগ্রহণ করছে। এদের জীবনের ক্ষতি মানে দেশের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক খাতের ভয়াবহ ক্ষতি। এই ক্ষতি পরিমাপ করেই শিক্ষা বিষয়ে যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

আমরা আবার করোনাকালে প্রবেশ করেছি। গতবারে করোনাকালে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা যে ধাক্কা খেয়েছে, সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই আমরা আবার দ্বিতীয় ধাক্কায় পড়েছি।

করোনাকালে শিক্ষা ব্যবস্থা কীভাবে চলবে, এ নিয়ে আমাদের কোনো পরিকল্পনাও নেই। আমরা এ বছর যে উদ্যোগই নেই না কেন তাতে লক্ষ রাখতে হবে, যেন অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রী অন্তর্ভুক্ত হয় এবং সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র-ছাত্রীরা যেন বাদ না পড়ে। বিকল্প উপায়ে কী শিক্ষা দেয়া যায়, তা দেখতে হবে। যদি করোনা চলতেই থাকে তাহলে এ বছর কী হবে ছাত্র-ছাত্রীদের? আবারও কি সেই একই পথ পরিক্রমণ করতে হবে? সরকার, বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছেন?

লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন

সমর্থকদের পাশ কাটিয়ে সুপার লিগ নয়

সমর্থকদের পাশ কাটিয়ে সুপার লিগ নয়

ভক্তদের ক্ষোভটা বোঝা গেছে তাদের প্রতিক্রিয়াতেই। ইংল্যান্ডের ছয়টি ক্লাবের সমর্থকেরা ক্লাবের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছেন নানা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। কোনোটাতে লেখা ‘গরীবদের থেকে ছিনিয়ে ধনীদের জন্য’, কোনোটাতে ‘ধিক্কার তোমাদের’।

২০১২ সালে ম্যানচেস্টার সিটির ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা জয়ের পর একটি ভিডিও বেশ ভাইরাল হয়। ৪৪ বছর পর সিটির লিগ শিরোপা জয়ের ম্যাচ দেখে ফেরা এক ভক্তের সাক্ষাৎকার ছিল ওই ছোট ভিডিওতে।

ইতিহাদ স্টেডিয়াম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় বয়স্ক ওই সিটি সমর্থক বলেন, ‘আমার ৪৪ বছরের অপেক্ষা শেষ হলো। ১৯৬৮ সালে তাদেরকে শিরোপা জিততে দেখেছি। তাদেরকে আমি ৭৫ বছর যাবৎ সমর্থন করে আসছি। ছয় ফিট দুই ইঞ্চি লম্বা এক তরুণ ছিলাম। মাথা ভর্তি চুল ছিল আমার। দেখো এরা আমার কী অবস্থা করেছে (নিজের টাক মাথার দিকে ইঙ্গিত করে)!

ভাইরাল হয়ে পড়া সেই বৃদ্ধের নাম জানা যায়নি। জানার প্রয়োজনও নেই বোধহয়। যারা ফুটবলকে ভালোবাসেন তারা জানেন খেলাটার আবেগটাই এমন। দলের যে অবস্থাই থাকুক না কেনো ভক্তরা সমর্থন যুগিয়ে যান আজীবন।

ইউরোপে ফুটবল সংস্কৃতির দিকে তাকালে দেখা যাবে এই সমর্থন ও সমর্থকেরাই টিকিয়ে রেখেছে ফুটবল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম জুড়ে চলে আসে নির্দিষ্ট কোনো দলের সমর্থন। কেউ বা বাবাকে দেখেছেন সমর্থন করতে। কারও বা জন্ম ও বেড়ে ওঠা নির্দিষ্ট শহরে যেখানে ফুটবল ক্লাব হাতে গোনা। ছোটবেলা থেকে তাদেরই সমর্থন করে চলা।

শহর বা এলাকা ভিত্তিক সমর্থকেরাই মূল ভিত্তি ইউরোপিয়ান ফুটবলের। লিভারপুল, ম্যানচেস্টার, মাদ্রিদ, মিলান, বার্সেলোনা কিংবা মিউনিখ এই শহরগুলোর পরিচয় বিশ্বজুড়ে এখন তাদের ফুটবল ক্লাবগুলোকে দিয়েই।

এই সমর্থকদের কথা না ভেবেই বা কিছু ক্ষেত্রে পাশ কাটিয়েই যখন ইউরোপের সেরা ১২টি ক্লাব চুক্তি করে ফেলে বিদ্রোহী এক টুর্নামেন্টের তখন তা আলোচনা- সমালোচনার ঝড় তুলবে সেটাই স্বাভাবিক। নতুন সুপার লিগ যাত্রার প্রাক্কালে ফুটবল ফ্যানদের কথা ভেবেছে কি না ক্লাবগুলো সেই প্রশ্ন তুলেছেন খোদ ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী।

সুপার লিগে যোগ দেয়া ছয় ইংলিশ ক্লাবের সমালোচনা করে বরিস জনসন বলেন, ‘পরবর্তী কোনো পদক্ষেপ নেয়ার আগে ক্লাবগুলোকে তাদের সমর্থক ও ফুটবল কমিউনিটিকে জবাব দিতে হবে।’

ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পর এই পরিকল্পনার তীব্র নিন্দা করেছে খোদ ইউয়েফা। তাদের চেয়ারম্যান আলেক্সান্ডার সেফেরিনের কাছে এই পদক্ষেপ ভক্তদের মুখে থুথু দেয়ার সমান।

‘আমার মতে এই পরিকল্পনা সমর্থক ও পুরো সমাজের মুখে থুতু দেয়ার মতো। আমরা কোনোভাবেই খেলাটিকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যেতে দেবো না।’

ক্লাব ও ইউয়েফা দ্বন্দ্বের শুরুটা কোথায় সেটা জানতে কিছুটা পেছাতে হবে।

ইউরোপের সেরা ক্লাব নির্ধারণ করার জন্যে ১৯৫৫ সালে শুরু হয় ইউরোপিয়ান কাপ। তবে এতে অংশগ্রহণ ছিল সীমিত। শুধু মাত্র চ্যাম্পিয়নরাই এতে অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেতো। আর টুর্নামেন্ট নক-আউট হওয়ায় খুব বেশি ম্যাচ খেলারও সুযোগ পেতো না ক্লাবগুলো।

১৯৯২ সালে ইউয়েফা বদলায় টুর্নামেন্টের নাম। অ্যাপিয়ারেন্স ফি ও প্রাইজমানি বাড়লেও দলের সংখ্যা রয়ে যায় আটে। পরের বছর সংখ্যা দ্বিগুণ হলেও বড় ক্লাবগুলো নাখোশ ছিল তাতেও। মূলত তখন থেকেই শুরু হয় সুপার লিগের পরিকল্পনা।

সেটি ঠেকাতে ১৯৯৭-৯৮ সালে ইউয়েফা বর্ধিত কলেবরে আয়োজন করে চ্যাম্পিয়নস। ১৬ দল থেকে করা হয় ২৪ দলের টুর্নামেন্ট। তারও দুই বছর পর ১৯৯৯-২০০০ মৌসুমে শুরু হয় ৩২ দলের আসর। যা এখনও টিকে আছে।

ইউরোপের শীর্ষ ক্লাবগুলো বরাবরের দাবী ছিল বড় ক্লাবগুলো যেন লভ্যাংশ বেশি পায় যেহেতু তারাই টিভি রেটিং ও মাঠের দর্শককে বেশি আকর্ষণ করে। কিন্তু ইউয়েফা তাদের দাবিতে কান না দেয়ায় পরিকল্পনা করা হয় সুপার লিগের।

সুপার লিগে অংশ নিলে বাড়তি অর্থ সুবিধা পাবে দলগুলো এটা নিশ্চিত। ব্রিটিশ সংবাদ মাধ্যম টাইমসের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী আমেরিকান কোম্পানি জেপি মরগ্যান টুর্নামেন্টের জন্য বাজেট করেছে ছয় বিলিয়ন ডলার। আর ব্রিটিশ ব্রডকাস্টিং কোম্পানি ডিএজিএন দিচ্ছে সাড়ে তিন বিলিয়ন ডলার। প্রতিটি দল টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণের জন্য পাবে অন্তত ১২ কোটি ডলার। যেটি যেয়ে ঠেকতে পারে ৪৩ কোটি ডলারে।

এ ছাড়া লক্ষ্য করার মতো বিষয় ১২ ক্লাবের জোটের পাঁচটি ক্লাব আর্সেনাল, ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, টটেনহ্যাম হটস্পার, মিলান ও ইন্টারনাৎসিওনাল গত এক দশকে চ্যাম্পিয়নস লিগে নিয়মিত নয়। ঘরোয়া সাফল্যও কম পাচ্ছে এই দলগুলো।

বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মাঝারি মানের দল আর্সেনাল, যারা সবশেষ লিগ জিতেছে ২০০৪ সালে ও কখনই চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতেনি। তাদের জন্য চ্যাম্পিয়নস লিগের আশায় বসে না থেকে সুপার লিগে খেলার প্রস্তাবই ভালো।

কারণ, এই ১২টি ক্লাব সহ মোট ১৫টি ক্লাবকে করা হবে টুর্নামেন্টের স্থায়ী সদস্য। বাকি ৫টি ক্লাব নির্বাচন করা হবে ঘরোয়া লিগে পারফর্মেন্সের ভিত্তিতে। ফলে, আর্সেনাল বা টটেনহ্যামের মতো অসফল কিন্তু জনপ্রিয় দলগুলোর সামনে সুযোগ নিশ্চিত ভাবে ১২ কোটি ডলার বাগানোর। সঙ্গে প্রতি মৌসুমের অন্যান্য আয় তো থাকছেই!

পাশাপাশি রয়েছে টিভি রেটিং ও স্টেডিয়ামে দর্শক উপস্থিতির বিষয়ও। ১২টি বিশ্বের অন্যতম জিনপ্রিয় ক্লাব হওয়ার কারণে প্রায় সবসময়ই তাদের ম্যাচের রেটিং থাকে উচ্চ। তবে, যখন তারা নিচু সারির কোনো দলের বিপক্ষে খেলেন ও ওই একই সময়ে অন্য দেশের লিগে বড় কোনো খেলা হচ্ছে তখন রেটিং কমে যাবার সম্ভাবনা থাকে বৈকি!

উদাহরণ হিসবে বলা যায়, যদি লিগ ম্যাচে আর্সেনাল মুখোমুখি হয় ফুলহ্যামের আর অন্য চ্যানেলে যদি থাকে মিলান বনাম ইউভেন্তাস লড়াই, বৈশ্বিক বাজারে দ্বিতীয়টিরই চাহিদা বেশি থাকবে সন্দেহ নেই।

এ ছাড়া এই ১২টি ক্লাবের স্টেডিয়ামগুলোও বিরাট। অন্তত ৭০ হাজার ধারণক্ষমতা সম্পন্ন। বার্সেলোনার ক্যাম্প ন্যুয়ে ধরে প্রায় এক লাখ (৯৯ হাজার ৫০০)। এমন কোনো দল যখন চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলতে যায় বেলারুশের বাতে বরিসভের ১৩ হাজার ধারণক্ষমতার মাঠে, তখন টিকিট বিক্রি থেকে থেকে পাওয়া লভ্যাংশের পরিমাণ নিয়ে দুশ্চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক তাদের জন্যে।

মোটা দাগে এই সব বিষয়গুলোই চ্যাম্পিয়নস লিগে খেলার প্রতি অনাগ্রহ সৃষ্টি করে ক্লাবগুলোর মধ্যে। সুপার লিগ হলে প্রতি সপ্তাহেই থাকবে ব্লকবাস্টার সব ম্যাচ। স্পনসররা ঝাপিয়ে পড়বেন, দর্শকে টইটুম্বুর হয়ে থাকবে গ্যালারি এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।

তবে, এতো পরিকল্পনা ও অর্থকড়ির ঝনঝনানিতে ক্লাবগুলো ভুলে গেছে ফুটবলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশের কথা। সমর্থক। শুরুতে যেমনটা বলা হয়েছে, সেই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরের ভক্তদের কথা ভাবতে হবে ক্লাবগুলোকে সবার আগে। ভাবতে হবে তাদের সংস্কৃতি ও চিরকালীন অভ্যাসের কথা।

যে অভ্যাসে তারা প্রতি উইকেন্ডে ছেলে-মেয়ে-স্ত্রী-বান্ধবী-বন্ধুকে নিয়ে যান মাঠে। ম্যাচ শেষ দলের জয়ে একান থেকে ওকান হাসি নিয়ে ফেরেন, প্রতিপক্ষ সমর্থকদের দু’কথা শোনাতে শোনাতে। লোকাল ডার্বিগুলো এখনও সমর্থকদের দেয় ‘ব্র্যাগিং রাইটস’।

ইউয়েফা এরই মধ্যে কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। বলেছে সুপারলিগের দলগুলোকে তারা খেলতে দেবে না ঘরোয়া লিগ ও অন্য মহাদেশিয় আসরগুলোতে। নিষিদ্ধ হবেন ফুটবলাররা।

এই কারণেই ভক্তরা সুপার লিগ চাচ্ছেন না। তাদের ভয় ক্লাবগুলো ঘরোয়া ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে ও শুধুমাত্র খেলবে সুপারলিগে। নিষেধাজ্ঞার পরও থামবে না তাদের সেই নতুন ‘পয়সা বানানোর মেশিন’।

ভক্তদের ক্ষোভটা বোঝা গেছে তাদের প্রতিক্রিয়াতেই। ইংল্যান্ডের ছয়টি ক্লাবের সমর্থকেরা ক্লাবের সামনে ঝুলিয়ে দিয়েছেন নানা প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার। কোনোটাতে লেখা ‘গরীবদের থেকে ছিনিয়ে ধনীদের জন্য’, কোনোটাতে ‘ধিক্কার তোমাদের’।

সার্বজনীনতার কারণে ফুটবলকে ডাকা হয় দ্য বিউটিফুল গেইম। ভিয়া ফিয়োরিতার দিয়েগো মারাদোনা কিংবা আলজেরিয়ান ইমিগ্র্যান্ট জিনেদিন জিদান দোলা দেন ধনী গরীব নির্বিশেষে সকল সমর্থকের মনে। সুপার লিগ যদি জয় করতে পারে এই সমর্থকদের মন তাহলেই একমাত্র ইউয়েফার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেও সাফল্য পাওয়া সম্ভব।

আর যদি ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে যেয়ে শুধুমাত্র টিভি রেটিং, বিজ্ঞাপণ ও মার্চেন্ডাইসিং-এ মনোযোগী হয় নতুন এই লিগ তাহলে হয়তো পুরনো সমর্থকদের ভুলে নতুনদের আকর্ষণ করার পরিকল্পনা আঁটতে হবে ক্লাবগুলোকে।

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন

করোনায় সেনাবাহিনীর এক কল্যাণমুখী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

করোনায় সেনাবাহিনীর এক 
কল্যাণমুখী উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

উপরোক্ত কল্যাণমুখী কার্যক্রম একজন প্রকৃত সেনানায়কের জন্য ফরজ। তার ওপর ন্যস্ত এই দায়িত্ব অত্যন্ত পবিত্র। একবার ভেবে দেখেছেন কি কখনও যে, সামনে মৃত্যু অবধারিত জেনেও কেন একজন সৈনিক তার কমান্ডারের জন্য জীবন কোরবান করতে সামান্য দ্বিধা করে না?

বনানী সামরিক কবরস্থানে ২০০৮ সাল থেকেই সদ্য নবজাতিকা কন্যা বিয়োগের পর হতেই ঘন ঘন যাতায়ত শুরু হয়। ২০১৭ সালের ১০ম রমজান ৭ জুনে পিতৃবিয়োগের পর কবর জিয়ারত করতে প্রতি শুক্রবার বাদ আসর যাওয়া হয়। এর মাঝে ২০১৯-এর ১৯ সেপ্টেম্বর মা প্রয়াত হন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।

মায়ের কবর দেয়ার পরও বনানী সামরিক কবরস্থানে অনেক ফাঁকা জায়গা ছিল, বিশেষ করে দক্ষিণদিকে বনানী কবরস্থান দেয়াল বরাবর জায়গাটা পুরোটাই ছিল খালি।

এর মধ্যে ২০২০-এর মার্চ হতে বাংলাদেশ লক-ডাউনে চলে গেলে মৃত্যুর মিছিল হতে থাকে দীর্ঘায়িত, বিশেষ করে এপ্রিল ২০২১ অবধি দৈনিক মৃত্যুর সংখ্যা ১০০ অতিক্রম করল পর পর ৩ দিন। দেশে সর্বমোট করোনায় মৃত্যুর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে ১০,০০০ অতিক্রম করেছে। একটু অক্সিজেন এবং আইসিইউয়ের একটি বেড যেন সোনার হরিণ।

এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল হারালাম আমার এক কোর্সমেট মেজর শহীদুল্লাহ, পদাতিক বাহিনীর একজন অফিসার যে ১২ দিন ঢাকা সিএমএইচের আইসিইউতে জীবন মরণের সঙ্গে যুদ্ধ করে ক্লাস সেভেন ও এইট পড়ুয়া দুই মাসুম সন্তানকে রেখে ইন্তেকাল করেন। সদ্য এলপিআর শেষ করে প্রয়াত মেজর শহীদুল্লাহর সেনা ওয়েলফেয়ার পরিদপ্তরের পরিচালনাধীন একটি প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার কথা ছিল। প্রয়াত বন্ধু মেজর শহীদুল্লাহর দুই সন্তানই এবার রোজা রেখেছিল বাবার সঙ্গে ইফতার করবে এই আশায়। কিন্তু…

বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ২০২০ থেকে আজ অবধি এই করনায় বহু চাকরিরত, এলপিআরভুক্ত অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার, নন কমিশন্ড অফিসার, অন্যান্য পদবির কর্মকর্তা ও কর্মচারী ছোট ছোট সন্তান সন্তানাদি রেখেই পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন।

এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ড তথা সেনাবাহিনী প্রধান ও সকল ফর্মেশন কমান্ডার স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে নিম্মলিখিত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন:

১. মৃত ব্যক্তির পরিবারকে চাকরিরত অবস্হায় প্রাপ্ত রেশন-সুবিধা ন্যূনতম ৫ বছরের জন্য প্রদান করা হবে সংশ্লিষ্ট ফর্মেশনের উদ্যোগে।

২. মৃত ব্যক্তির পরিবারকে ন্যূনতম ৩ বছর সরকারি বাসস্হান ব্যবহার করতে দেয়া হবে।

৩. মৃত ব্যক্তির সন্তানাদির পড়াশোনার সকল খরচ সেনাবাহিনী পরিচালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মওকুফ করা হলো।

৪. মৃত ব্যক্তির স্ত্রী-স্বামীর যোগ্যতা অনুসারে সংশ্লিষ্ট ফর্মেশন কমান্ডারের দায়িত্বে তাদের সেনাসদরের এজিস শাখা পরিচালিত ট্রাস্ট ব্যাংক, সেনা কল্যাণ সংস্হা, বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি, বাংলাদেশ ডিজেল প্ল্যান্ট এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী পরিচালিত বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহের উদ্দেশ্যে চাকরির বন্দোবস্ত করতে সিদ্ধান্তে উপনীত হন।

উপরোক্ত কল্যাণমুখী কার্যক্রম একজন প্রকৃত সেনানায়কের জন্য ফরজ। তার ওপর ন্যস্ত এই দায়িত্ব অত্যন্ত পবিত্র। একবার ভেবে দেখেছেন কি কখনও যে, সামনে মৃত্যু অবধারিত জেনেও কেন একজন সৈনিক তার কমান্ডারের জন্য জীবন কোরবান করতে সামান্য দ্বিধা করে না?

উপরোক্ত কল্যাণমুখী কর্মকাণ্ডে যখন একজন সৈনিকের থাকে কমান্ডের ওপর অগাধ বিশ্বাস, তখন সেই সৈনিক দেশের জন্য রক্ত দিতে করে না বিন্দুমাত্র চিন্তা।

বাংলাদেশের সার্বিক মঙ্গল ও কল্যাণ কামনা করে দেশকে করোনা হতে মুক্তির পথ প্রদর্শন করবেন মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন।

লেখক: সাবেক সেনা কর্মকর্তা, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন

নির্মোহ এক শিক্ষককে প্রণতি

নির্মোহ এক শিক্ষককে প্রণতি

একজন শিক্ষক ও জ্ঞানতাপস কতটুকু পরিশ্রমী ও নির্মোহ হলে এত অল্প সময়ে জ্ঞানের রাজ্যে বিশাল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন, তার উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা তারেক শামসুর রেহমান। শিক্ষকতাকে ভালোবাসতেন, ছাত্র ও গবেষণা ফেলোদের সঙ্গে আন্তরিকতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ফলে তার অধীনে ভালো মানের গবেষক তৈরি হয়েছে।

বিশ্ব এক অস্থির সময় পার করছে। প্রতিনিয়ত চারদিকে মৃত্যুর সংবাদ। যা চারপাশকে আতঙ্কিত করছে এবং অনিশ্চয়তায় ঢেকে দিচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে এ পৃথিবীতে মানুষের আগমন এবং প্রস্থান এ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত খবর নয়। বরং যা একেবারেই চিরন্তন সত্য। প্রতিদিন খবরের কাগজে পরিচিত এবং অপরিচিত মানুষজনের মৃত্যু সংবাদ দেখতে পাই। বরেণ্য ও অগ্রগণ্য মানুষের চলে যাওয়া আমাদেরকে ভাবায় এবং কাঁদায়। তেমনি একজন যৌক্তিক বোধশক্তিসম্পন্ন মানবতাবাদী কলাম-লেখক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানের পৃথিবীর সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করে চলে যাওয়া সচেতন মানুষকে বেদনাহত করে।

এ ক্ষণজন্মা ব্যক্তিত্ব ১৯৫৩ সালের ৯ জুন পিরোজপুর জেলা সদরে পিতার কর্মস্থলের সরকারি বাসভবনে জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃকসূত্রে সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ জেলার নবীগঞ্জ উপজেলার পিটুয়া গ্রামের বাসিন্দা, যিনি কিনা কর্মগুণে আজ স্বমহিমায় খ্যাত। এ মহান শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ থেকে ১৯৭৪ সালে বিএসএস এবং ১৯৭৫ সালে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এমএমএস ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে জার্মানি থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সরকার ও রাজনীতি বিভাগের শিক্ষকতার মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা ঘটে। পরবর্তী সময়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এবং ওই বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্যও ছিলেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর নিয়ে তিনি ঢাকায় বসবাস করছিলেন।

এ মানুষটি শিক্ষকতার পাশাপাশি তার ক্ষুরধার লেখনী চিন্তাশক্তি দেশপ্রেম সততার চর্চায় এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছেন। কঠিন অধ্যবসায়ী মেধাবী এ লেখকের চিন্তার ক্ষেত্র ছিল প্রধানত আন্তর্জাতিক রাজনীতি, আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক এবং বৈদেশিকনীতি। মৃত্যু অবধি এ আঙিনায় তার সরব বিচরণ নানা কলামে, বইয়ে এবং টকশোর আলোচনায় নানাভাবে উঠে এসেছে।

যুক্তিবাদী বুদ্ধিজীবীর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে আগ্রহ এবং বিচরণ এতই বিস্তৃত যে সমসাময়িক বিশ্ব পরিস্থিতি এবং রাজনীতির হাল হকিকত সবকিছুই তার নখদর্পণে ছিল। তার লিখিত বিশ্ব রাজনীতির ১০০ বছর আন্তর্জাতিক রাজনীতি কোষ নয়া বিশ্বব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এসব বিষয়ে জ্ঞানপিপাসু এবং বিশ্লেষকদের জ্ঞানের বাতিঘর হিসেবে ভাস্বর হয়ে থাকবে।

তার লেখনীর অন্যতম বিশেষত্ব ছিল দেশপ্রেম; যার সরব উপস্থিতি দেখা যায় আন্তরাষ্ট্রীয় বিভিন্ন ইস্যুতে যৌক্তিক এবং নির্মোহ মতামত তুলে ধরার মাধ্যমে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বিশেষত তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা ফারাক্কা বাঁধ এবং টিপাইমুখ বাঁধ বিষয়ক তার তথ্যবহুল লেখনী নীতিনির্ধারকের সিদ্ধান্ত নিতে ও এগিয়ে যেতে সহায়ক ভূমিকা রেখেছে। এ শক্তিমান লেখক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকার ও রাজনীতি মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এসব বিষয়ে পুস্তক রচনা করে পাঠকদের মনে স্থান করে নিয়েছেন।

এ মানুষটি দেশ মাটি ও মানুষের প্রতি অগাধ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ধারণ করতেন। নির্মোহ সত্যকথনে সামান্যতম আপোস করতেন না। যার চরিত্রে তোষামোদি স্থান করতে পারেনি। তিনি সবসময় ভাবতেন এ দেশের সার্বভৌমত্ব বৈশ্বিক নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদার। যার ফলস্বরূপ তিনি রচনা করেছেন বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও রাজনীতি, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি ট্রানজিট ও গ্যাস রপ্তানি প্রসঙ্গ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও সমকালীন বিশ্ব বাংলাদেশের গণতন্ত্র এবং বাংলাদেশের রাজনীতির পঞ্চাশ বছর এবং করোনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতি বইটি প্রকাশের অপেক্ষায়। তুলনামূলক রাজনীতির বিষয়ে তার আলাদা নজর ছিল। যিনি সমসাময়িক ও আন্তর্জাতিক প্রসঙ্গে নিয়মিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক কাগজে কলাম লিখতেন। বিভিন্ন টকশোতে যৌক্তিক তথ্যবহুল আলোচক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

একজন শিক্ষক ও জ্ঞানতাপস কতটুকু পরিশ্রমী ও নির্মোহ হলে এত অল্প সময়ে জ্ঞানের রাজ্যে বিশাল অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারেন, তার উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা তারেক শামসুর রেহমান। শিক্ষকতাকে ভালোবাসতেন, ছাত্র ও গবেষণা ফেলোদের সঙ্গে আন্তরিকতা এবং সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের ফলে তার অধীনে ভালো মানের গবেষক তৈরি হয়েছে। যারা এ বিষয়ে অবদান রেখে চলেছেন। কোনো কাজ তিনি আগামীর জন্য ফেলে রাখতেন না। ফেলোদের উপর অর্পিত কার্যাবলি যথাযথ তদারকি করে ইতিবাচক মতামত দিতেন।

এ শিক্ষকের সান্নিধ্যে যারাই এসেছেন তার অমায়িক ব্যবহার দৃঢ়চেতা মানসিকতা এবং দেশপ্রেমে মুগ্ধ হয়েছেন। এ মানুষটির কোনো শত্রু ছিল না। কর্মবীর এ মেধাবীকে ভালোবাসতেন এবং শ্রদ্ধা করতেন তার অগণিত ছাত্র ও শুভার্থী। সবার মঙ্গল কামনাই ছিল যার ব্রত।

কিছুটা মেজাজি স্বভাবের এ মানুষটি কখনো অন্যায় ও অনিয়মের সঙ্গে আপস করেননি। সংসার জীবন ছিল অগোছালো, সর্বদা পড়ালেখায় ব্যস্ত মানুষটিকে শেষদিকে একাকিত্ব গ্রাস করে। যার কারণে প্রায়শই বলতে শোনা যেত, মহান প্রভু যেন তাকে সুস্থ অবস্থায় মৃত্যু দান করেন। আমৃত্যু লালিত এ বাসনা টুকু ও সৃষ্টিকর্তা পূরণ করেছেন। একজন শিক্ষকের কাজই তো নিরপেক্ষ থেকে কাজ করে যাওয়া। এ মহান শিক্ষক সারাজীবন এ কাজটি সুচারুভাবে করার প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন। জ্ঞান আহরণ জ্ঞানের চর্চা এবং জ্ঞান বিতরণ এ তিন ধারায় সমান পারদর্শী ছিলেন বলেই আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও সমসাময়িক রাজনীতি বিষয়ক ৫০-এর অধিক বই পাঠকের সামনে হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

বিনয়ী মার্জিত সদালাপী এ মানুষটি আজ আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তার রেখে যাওয়া সৃষ্টিশীল আকর যুগ যুগ ধরে জ্ঞানপিপাসুদের তৃষ্ণা নিবারণের প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করবে। এ মহান শিক্ষকের মাটি ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধ এবং তার লেখনী এগিয়ে চলার প্রেরণা।

লেখক: শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন

মহামারিতে রাষ্ট্রের দায় ও বৈশ্বিক রাজনীতি

মহামারিতে রাষ্ট্রের দায় ও বৈশ্বিক রাজনীতি

বাস্তবতা হলো সব মৃত্যুই সমান কিন্তু সব জীবন সমান নয়। করোনাকালে সেই সত্য নতুনভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। যার যতটুকু সামর্থ্য থাকে, তার ততটুকু সুরক্ষা। যার সামর্থ্য নেই, তার সুরক্ষার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সবাই সুরক্ষিত না হলে এককভাবে কেউ সুরক্ষিত হতে পারবে না। সুরক্ষা সবার জন্য, কেবল ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়। এখানে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। করোনাকে ঘিরে সমাজে বিভক্তি তীব্র হচ্ছে। বৈষম্য সাদা চোখে ধরা পড়ছে।

ইসরায়েলের জেরুজালেম হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইতিহাসবিদ ও দার্শনিক ইউভাল নোয়াহ হারারির মতে, রাষ্ট্র এক সময় নাগরিকের শরীরের ওপরের অংশ পরিবীক্ষণ করত, বোঝার চেষ্টা করত রাজনৈতিক মতবাদ, অভিব্যক্তি, চিন্তাচেতনা ও গতিবিধি।

করোনা রাষ্ট্রকে সুযোগ করে দিয়েছে নাগরিকের শরীরের অভ্যন্তরে অনুপ্রবেশের। রাষ্ট্র আজ সহজেই ব্যক্তির অভ্যন্তরে সংরক্ষিত শরীর সম্পর্কিত তথ্য পরিবীক্ষণ করতে পারছে। রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকের ওপর অংশের পরিবীক্ষণকে হারারি বলছেন ‘ওভারস্কিন’ মনিটরিং। করোনাকালে এ পরিবীক্ষণে বড় ধরনের পরিবর্তন এলো- রাষ্ট্র অবাধে নাগরিকের ‘আন্ডারস্কিন’ মনিটরিংয়ের অবারিত সুযোগ পেল।

অনেক আগেই ডেভিড আরনল্ড তার বিখ্যাত বই ‘কলোনাইজিং দ্য বডি’তে উল্লেখ করেন যে, প্রতিটি মহামারি কীভাবে ব্যক্তির শরীরে উপনিবেশের শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলে। কীভাবে আধিপত্যের শেকড় বিস্তৃত হয়। প্রতিটি মহামারি নতুন রাজনীতি, নতুন অর্থনীতি ও নতুন আধিপত্যের সোপান গাড়ে।

মহামারি মানে কেবল জীবন ও মৃত্যুর সমীকরণ নয়, এর পেছনে রয়েছে ক্ষমতা ও জ্ঞাননির্ভর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার প্রাণান্তর লড়াই। এটাও মহামারিকে ঘিরে এক ধরনের আধিপত্যবাদ।

করোনা ভ্যাকসিন আবিষ্কারের ঘোড়দৌড় দেখলে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ মুহূর্তে যে রাষ্ট্র যত দ্রুত ও নির্ভরযোগ্য ভ্যাকসিন সবাইকে সরবরাহ করতে পারবে সেই রাষ্ট্র নিশ্চিতভাবে বিশ্ববাসীর মনোজগতে আলাদা একটা জায়গা পেতে সক্ষম হবে, যা হবে নতুন আধিপত্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম উপায়।

করোনাকালে সমকালীন রাজনৈতিক প্রবণতা হলো ‘নলেজ সুপ্রিমিসি’ বা জ্ঞাননির্ভর আধিপত্য। ভ্যাকসিন ন্যাশনালিজম তার অন্যতম একটি দিক। করোনা ভ্যাকসিন হয়ে উঠছে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণের নতুন নিয়ামক।

করোনাকালে নাগরিকের শরীরের উপর ও অভ্যন্তরে জমে থাকা তথ্যের ওপর রাষ্ট্রের পুনর্নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এ মহামারি প্রতিটি নাগরিককে রাষ্ট্রের কাছে জিম্মি করে তুলেছে। নিকট ভবিষ্যতে এ থেকে মুক্তির কোনো আশা নেই। তাই মহামারি হয়ে উঠছে দাসত্ব ও বন্দিত্বের সহায়ক উপায়। মহামারি কেবল ব্যক্তি সংরক্ষণবাদকে উৎসাহিত করছে না, বরং রাষ্ট্রীয় সংরক্ষণবাদকে উৎসাহিত করে। নলেজ সুপ্রিমিসি দিয়ে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষায় ব্যস্ত ধনী ও উন্নত দেশগুলো। করোনার কারণে ক্ষতির মাত্রা সবার সমান নয়। যারা যত গরিব তারা ততবেশি ক্ষতিগ্রস্ত। যারা ধনী বা বিত্তবান তারা তত সুরক্ষিত বা উপকৃত। এ মহামারি জাতীয়তাবাদী ধারণাকে নতুন করে শক্তিশালী করে তুলছে।

মনে রাখতে হবে, মহামারি হলো রোগকেন্দ্রিক ও ওষুধ ও পণ্যের প্রসার। মোড়ে মোড়ে সুসজ্জিত ওষুধের দোকান, নতুন আউটলেট খোঁজার ধুম। দেখে মনে হবে, এ সমাজ কেবল জীবন আর মৃত্যুর পসরা সাজিয়ে বসেছে।

বাস্তবতা হলো সব মৃত্যুই সমান কিন্তু সব জীবন সমান নয়। করোনাকালে সেই সত্য নতুনভাবে প্রতিভাত হচ্ছে। যার যতটুকু সামর্থ্য থাকে, তার ততটুকু সুরক্ষা। যার সামর্থ্য নেই, তার সুরক্ষার প্রশ্নই আসে না। কিন্তু সবাই সুরক্ষিত না হলে এককভাবে কেউ সুরক্ষিত হতে পারবে না। সুরক্ষা সবার জন্য, কেবল ব্যক্তি বিশেষের জন্য নয়। এখানে বিভক্তির কোনো সুযোগ নেই। করোনাকে ঘিরে সমাজে বিভক্তি তীব্র হচ্ছে। বৈষম্য সাদা চোখে ধরা পড়ছে। করোনা ছড়ানোর অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘিষ্ঠদের দুষছেন। এক দেশের সরকার আরেক দেশকে দুষছে। এক ধর্মের মানুষ আরেক ধর্মের মানুষকে দুষছেন। একইসঙ্গে চলছে ভিকটিম ব্লেমিং বা ভুক্তভোগীদের দোষারোপ। মহামারি থেকে সুরক্ষা রাষ্ট্রকেই নিশ্চিত করতে হবে। জনগণকে সচেতন ও বাধ্য করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

আরেকটি দিক হলো, করোনাকালে যেসব সুরক্ষা উপকরণ পথে-ঘাটে বিক্রি হচ্ছে এবং তা হচ্ছে তুলনামূলক কম দামে, সেগুলো কি যথেষ্ট মানসম্মত? এগুলো কি করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষা দিতে পারবে?

মহামারিতে স্বাস্থ্যসুরক্ষা সামগ্রীর মান ও ত্রুটিপূর্ণ বাজারব্যবস্থা সহজেই চোখে পড়ছে। মানবিক এ বিপর্যয় করোনা সুরক্ষার উপকরণের মান সকল ক্ষেত্রে সমান নয়। বড় বড় শহরগুলোতে যেসব সুরক্ষার উপকরণগুলো পাওয়া যাচ্ছে আর প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে যে উপকরণগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর মানের ভেতর বিস্তর পার্থক্য রয়েছে। রয়েছে সহজলভ্যতার সংকট। আরও রয়েছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা। অথচ করোনা রোগের প্রভাবে নেই কোনো পার্থক্য। জাতীয় সীমাবদ্ধতা হলো সবার জন্য সমমানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সুরক্ষার উপকরণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

মহামারি নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধের বিষয়টিকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। আমরা জেনেছি, দুর্ভিক্ষে যারা বেশি লাভবান হয়েছে তাদের মধ্যে ডাক্তার শ্রেণি ছিল অন্যতম। করোনাকালে ওষুধ শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানের যেমন ফেসবুক, গুগল, জুম ও বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও অনলাইন কেনাকাটার সাইটগুলো অর্থের পাহাড় গড়ছে। করোনা হচ্ছে সিংহভাগ মানুষকে নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া এবং স্বল্পসংখ্যককে বিত্তশালী করার উপায়। করোনা বিশেষ শ্রেণির কাছে বিত্তবৈভব অর্জনের উপায় হয়ে ওঠছে।

করোনা মহামারির আরেকটি বিশেষ দিক রয়েছে প্যানিক বায়িং। জনগণ আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে জিনিসপত্র কেনার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। ফলে বাজারে সংকট তৈরি হচ্ছে। প্যানিক বায়িং জনগণের পকেট কাটার এক অভিনব কৌশল। মাঝেমধ্যেই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ উপকরণগুলোর কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে। যেমন, গত বছর এসময় ডেটলসহ বেশকিছু স্বাস্থ্য সুরক্ষা উপকরণ বাজার থেকে প্রায় উধাও হয়ে যায়। প্যানিক বায়িংয়ের পেছনে এক বড় ধরনের যোগসাজস কাজ করে। জনগণ জীবন বাঁচানোর তাগিতে অতিমূল্য দিয়ে কৃত্রিমভাবে সৃষ্ট দুষ্প্রাপ্য জিনিসপত্র কিনতে মরিয়া হয়ে ওঠে। নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বাজারের কাছে ব্যক্তি হয়ে পড়ছে অসহায়।

করোনাকালে নেমে এসেছে অনিশ্চিয়তার ঘন অন্ধকার। সঙ্গে এসেছে তথ্য এবং অপতথ্যের মিশেল। নেই কোনো স্বচ্ছ তথ্যব্যবস্থা। আইইডিসিআর-এর মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে কারোনা সংক্রমণের হার, সুস্থ ও মৃত্যের পরিসংখ্যান। কী পরিমাণ জাতীয় সুরক্ষা সামগ্রী রয়েছে এর কোনো জাতীয় হালনাগাদ তথ্য নেই। যেখানে তথ্য থাকে না, সেখানে শেকড় গেড়ে বসে গুজব। একদিকে অসুস্থতা, অপরদিকে তথ্যশূন্যতা ও গুজব মিলিয়ে এক ধরনের নতুন ‘পাবলিক সাইকি’।

এর একটি বিশেষ দিক হলো জন-অস্থিরতা। এই অস্থিরতাকে কেন্দ্র করে যে পাবলিক আচরণ তৈরি হচ্ছে, তার একটি বিশেষ দিক হলো পারস্পরিক আস্থাহীনতা। জনগণ তথ্য শূন্যতায় নিজেদের স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় অসহায় বোধ করছে। জনগণ জানে না করোনাকে ঘিরে আসলে কী হতে যাচ্ছে বা সামনের দিনগুলো কতটুকু অন্ধকারাচ্ছন্ন বা আলোকময়।

করোনাকালের চরম বাস্তবতা হচ্ছে অস্পষ্টতা। কেবল রাষ্ট্র পারে এ অস্পষ্টতা দূর করতে। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে, এ বিষয়ে রাষ্ট্রের রয়েছে ঢাক ঢাক গুড় গুড় অবস্থা। এটা যে কেবল বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ঘটছে তা নয়, এটি একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা। করোনা মহামারি প্রমাণ করছে, পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি কতটা ভঙ্গুর। রাষ্ট্র জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব দেয়নি।

বিপরীতে বেসরকারি উদ্যোগকে প্রণোদনা দিয়েছে। চারদিকে সুরম্য ও ঝকঝকে বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক। যারা মূলত, স্বাস্থসেবার নামে জনস্বাস্থ্য নিয়ে এক ধরনের বাণিজ্যবৃত্তিতে লিপ্ত হয়েছে। তাদের এত চড়া চিকিৎসাব্যয় ভাবা যায় না, যা স্বল্প আয়ের বা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। করোনাকালে বেসরকারি ও সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যয়ের পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ছে।

রোগব্যাধিকে ঘিরে যেসব বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিক গড়ে উঠেছে, সেগুলোর ওপর রাষ্ট্রের নজরদারির শৈথিল্য লক্ষ করা যায়। এর পেছনে রয়েছে বড় ধরনের রাজনীতি-অর্থনীতি। এসব প্রাইভেট ক্লিনিক ও হসপাতালের মালিকানার সঙ্গে রয়েছে রাজনীতির সংযোগ। ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, একদিকে ভঙ্গুর সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থা অপরদিকে বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতের উচ্চ চিকিৎসাব্যয়। এই দুয়ের চোরাগলিতে ঢুকে পড়েছে জনগণ। এই চোরাগলির সুড়ঙ্গ ক্রমশও দীর্ঘ হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি অন্ধকার জিইয়ে রাখে এবং তা আলোকায়নের উদ্যোগ না নেয়, তবে তা জনগণের জন্য চরম দুরাশার ব্যাপার হবে।

অন্ধকার পথে কোনো মুক্তি নেই। রাষ্ট্রের সামর্থ্য, প্রস্তুতি ও দক্ষতা নিয়ে জনগণ জানতে পারলে তাতে ক্ষতির চেয়ে লাভ বেশি। কিন্তু জনগণের সে জানার সুযোগ ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। ফলে জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক অস্পষ্ট হয়ে উঠছে। করোনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং সুরক্ষা উপকরণের সহজলভ্যতা ও স্বাস্থ্যসেবা। প্রতিটি মানুষের বাঁচার অধিকার রয়েছে। আর এ অধিকার সুরক্ষায় রাষ্ট্রের ভূমিকাই মুখ্য। নাগরিকের শরীর নিয়ন্ত্রণ নয়, নয় কোনো রাজনীতি। নাগরিকের জীবন সুরক্ষাই রাষ্ট্রের প্রধান বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।

লেখক: প্রাবন্ধিক, যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ।

আরও পড়ুন:
গুজবের কবলে বাংলাদেশের পুঁজিবাজার
বুদ্ধি, জ্ঞান-প্রজ্ঞা নিয়ে কিছু কথা
স্বাধীনতা বঙ্গবন্ধুর অমর কীর্তি
স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও দেশের সমৃদ্ধি
দীর্ঘজীবী হোক বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক

শেয়ার করুন