গণহত্যা ও গণতান্ত্রিক বিশ্ব

যা হোক, ২০০৯ সালে তামিল এই গণহত্যা ঘটলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন তাদের তদন্ত রিপোর্ট গত ২৭ জানুয়ারি প্রকাশ করেছে। ৪৭ সদস্যের এই তদন্ত কমিশন তাদের ওই রিপোর্টে উচ্চপদস্থ জেনারেল (যারা গণহত্যায় জড়িত ছিলেন) তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাসহ অনেক কিছু সুপারিশ করেছে। তাছাড়া ওই তদন্ত রিপোর্টে বলা হচ্ছে, কমপক্ষে ৪০ হাজার তামিলকে হত্যা করা হয় ২০০৯ সালে।

একবিংশ শতাব্দীর সব থেকে বড় গণহত্যা শ্রীলংকার তামিল গণহত্যা। যে সকল উদ্দেশ্য নিয়ে কোনো হত্যাকাণ্ড ঘটালে সেটা গণহত্যার পর্যায়ে পড়ে, তামিল গণহত্যায় তা স্পষ্ট। এখানে সুস্পষ্টভাবে শ্রীলংকার এই হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা হয়েছে।

শ্রীলংকায় বর্তমানের বৌদ্ধ ধর্মীয়বাদ ও সিংহলী ন্যাশনালিজমের জোরে বাস্তবে কোনো সংখ্যালঘু ধর্মীয় শ্রেণি সেখানে নিরাপদ বোধ করছে না। যেমন এবারের এই কোভিডে সেখানে প্রথম দোষারোপ করা হয়েছে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের। বলা হয়েছে, তারা স্বাস্থ্যবিধি মানছে না বলে শ্রীলংকায় কোভিড-১৯ ছড়াচ্ছে। তারা সরকারের বিধিকে লঙ্ঘন করে এক জায়গায় সমবেত হচ্ছে। শুধু তাই নয়, কোভিডে শ্রীলংকায় যে সকল মুসলিম মারা গিয়েছিল, তাদের শবদেহকে কবর দেবার বদলে আগুনে পোড়ানো হয়েছিল।

এর থেকে স্পষ্ট, শ্রীলংকায় কোনো ধর্মীয় সংখ্যালঘুই নিরাপদ নয়। ধর্মীয়, বর্ণভিত্তিক বা অনান্য সংখ্যালঘুরা কম বেশি সব দেশেই একটা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। কিন্তু শ্রীলংকায় এর মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে। এবং ২০০৯ সালে সেখানে যেভাবে সেনাসদস্য নামিয়ে শুধু বিদ্রোহী তামিল নয়, সাধারণ তামিলদের হত্যা করা হয়, তা ছিল মূলত একবিংশ শতাব্দীর সব থেকে বড় গণহত্যা।

বিবিসির সাংবাদিক ফ্রান্সিস হ্যারিসন এ নিয়ে গবেষণামূলক বই লিখেছেন। তিনি তার বই স্টিল কাউন্টিং দ্য ডেড এ যে-সকল বর্ণনা দিয়েছেন, তা পড়ে কোনো পাঠকের পক্ষে চোখের পানি ধরে রাখা সম্ভব নয়। ফ্রান্সিস আমাদের বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলংকায় দীর্ঘদিন সাংবাদিকতা করেছেন। তাই দক্ষিণ এশিয়া তার পরিচিত। এ কারণে তিনি অনেক কষ্ট করে তার বইতে অনেক তথ্যের সমাবেশ ঘটাতে পেরেছেন।

তারপরও ব্যক্তিগত আলোচনায় ফ্রান্সির বলেছেন, শ্রীলংকার সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের মধ্যে থেকে তিনি খুব কম অংশই তুলে আনতে পেরেছেন ওই গণহত্যার। অনেক কথা তাকে জানতে হয়েছে যে সমস্ত শ্রীলংকান তামিল পালিয়ে অস্ট্রেলিয়া বা অনান্য দেশে গেছেন, তাদের কাছ থেকে।

তামিল এই গণহত্যা নিয়ে প্রায়ই লেখেন গাজালক্ষ্মী প্রেমাশিবম। তিনি তার ব্লগে নানান তথ্য ও শ্রীলংকার অসঙ্গতি তুলে ধরেন। তার বই ন্যান অস্ট্রেলিয়ানেও এ নিয়ে অনেক কথা আছে। তবে সত্যি অর্থে একবিংশ শতাব্দীর এই বিশাল গণহত্যাটি অনেকটা লোকচক্ষুর অন্তরালেই আছে, ওইভাবে পৃথিবীতে প্রচার পায়নি। তাছাড়া এর পেছনে শুধু ধর্মীয় বিদ্বেষ ও শ্রীলংকার তামিলদের বিদ্রোহই মূল কারণ কিনা তাও কিন্তু পরিষ্কার নয়। তামিলদের ওইভাবে হত্যা করার পেছনের রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার মতো কোনো পোর্ট নির্মাণের বিষয় আছে কিনা, বিদেশেী কোনো রাষ্ট্রের স্বার্থ আছে কিনা, তাও এখনও অবধি পরিষ্কার নয়। কারণ, তামিল গণহত্যাকারী রাজাপাকসে গোটাবায়ে ও সে সময়ের প্রেসিডেন্ট রাজাপাকসে দুই ভাই এখন দেশের ক্ষমতায়। একজন প্রেসিডেন্সি ও একজন পার্লামেন্ট নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ আছে, দুজনের নির্বাচনে বড় অর্থনীতির দেশ চায়নার অনেক অর্থ ব্যয় হয়েছিল। এবং দুজনেই চীনপন্থি। তবে বর্তমানে হাম্বানটোটা পোর্টের কারণে জনমতের চাপে তাদেরকে অনেকখানি ভারতমুখী হতে হয়েছে।

যা হোক, ২০০৯ সালে তামিল এই গণহত্যা ঘটলেও জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন তাদের তদন্ত রিপোর্ট গত ২৭ জানুয়ারি প্রকাশ করেছে। ৪৭ সদস্যের এই তদন্ত কমিশন তাদের ওই রিপোর্টে উচ্চপদস্থ জেনারেল (যারা গণহত্যায় জড়িত ছিলেন) তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞাসহ অনেক কিছু সুপারিশ করেছে। তাছাড়া ওই তদন্ত রিপোর্টে বলা হচ্ছে, কমপক্ষে ৪০ হাজার তামিলকে হত্যা করা হয় ২০০৯ সালে।

তদন্ত কমিশন অনেক পরে তদন্ত করেছে। তাই স্বাভাবিকই তারা সব তথ্য পায়নি। যে কারণে ফ্রান্সিসের ও গাজালক্ষ্মীর হিসাব অনুযায়ী এখানে সংখ্যা কম। বিশেষ করে ফ্রান্সিস কাজটি করেছিলেন ২০০৯ থেকে ২০১১ এর ভেতর। তাই তিনি অনেক বেশি তথ্য জোগাড় করতে পেরেছিলেন।

তারপরেও শ্রীলংকার এই তামিল গণহত্যা নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশন রিপোর্ট দিয়েছে। এবং অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তারা এখানে নিয়ে আসতে পেরেছেন। জাতিসংঘের হিউম্যান রাইট কমিশন এমন সময়ে এই তদন্ত রিপোর্টটি দিয়েছেন, যখন সামনে অর্থাৎ আগামী ২২ ফেব্রুয়ারি থেকে ১৯ মার্চ অবধি জাতিসংঘের হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের অধিবেশন। এবারের এ অধিবেশন গত চার বছরের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে। কারণ, গত চার বছর আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প অনেকখানি পঙ্গু করে রেখেছিল এ কমিশনগুলোকে। কারণ, ডনাল্ড ট্রাম্প আমেরিকাকে এই কাউন্সিল থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এদিকে এবার আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিলিনকেন বলেছেন, আমেরিকা অবজারভার হিসেবে আবার এই কাউন্সিলে থাকবে। এবং বাইডেন প্রশাসনের পররাষ্ট্রনীতি হচ্ছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষা এবং বৈষম্য দূর করা। তাই স্বাভাবিকভাবে আশা করা যায়, এবারের জাতিসংঘ হিউম্যান রাইটস কাউন্সিলের অধিবেশনে শ্রীলংকার গণহত্যার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে উঠবে। এ বিষয়ে কিছু সিদ্ধান্ত আসতে পারে। পাশাপাশি সে দেশে এখনও যে সব ধরনের ধর্মীয় সংখ্যালঘু বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছেম সে বিষয়টিও গুরুত্ব পাবে।

জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের শ্রীলংকার তামিল হত্যার ওই তদন্ত রিপোর্টে অনেকগুলো সুপারিশ এসেছে। তার ভেতর ওই সকল গণহত্যাকারীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত এবং তাদের ভ্রমণের ওপর নিষেধাজ্ঞার সুপারিশ করা হয়েছে। এই গণহত্যার আরো তথ্য সংগ্রহ করে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেবার সুপারিশ করেছে।

শ্রীলংকার গণহত্যা যেমন একবিংশ শতাব্দীর সব থেকে বড় গণহত্যা, বাংলাদেশের ১৯৭১ সালের গণহত্যা ছিল বিংশ শতাব্দীর সর্বশেষ বড় গণহত্যা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বাংলাদেশের গণহত্যাই সব থেকে বড় গণহত্যা। বাংলাদেশ সরকার এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত মাত্র কয়েকজনের বিচার করতে সমর্থ হয়েছে। তাও বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর। কিন্তু তারপরেও এই গণহত্যাকারীদের অনুসারীরা এখনও দেশের ভেতর খুবই বড় আকারে সক্রিয়। তাছাড়া গোটা পৃথিবী জুড়ে এদের অনুসারীরা ভ্রমণ করছে। এমনকি বিপুল অর্থ ব্যয় করছে বাংলাদেশের মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্যে ধর্মের নামে, যেহেতু এই সরকার কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচার করেছে, তাই এ সরকারকে উৎখাত করার জন্যে। এর সঙ্গে বিদেশী কিছু রাষ্ট্রও সহায়তা করছে।

শ্রীলংকার গণহত্যার তদন্ত কমিশনের সুপারিশকে লক্ষ্য করে বাংলাদেশ সরকার তাই এ মুহূর্তে কয়েকটি পদক্ষেপ নিতে পারে, যাতে এই গণহত্যাকারী ও তাদের অনুসারীদের তৎপরতা কিছুটা হলেও কমবে। প্রথমত, অবিলম্বে যে সকল যুদ্ধাপরাধী বিচারে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে, তাদের সকল সম্পত্তি জব্দ করতে হবে। পাশাপাশি তাদের অনুসারী যারা আছে বা যারা তাদের পক্ষে কথা বলে, তাদের সব ধরনের বিদেশ যাওয়া নিষিদ্ধ করে তাদের পাসপোর্ট জব্দ করতে হবে। এছাড়া জাতিসংঘের কাছে ও পাশাপাশি সকল দেশের কাছে আবেদন রাখতে হবে তারা যেন তাদের দেশে যে সকল যুদ্ধাপরাধী ও তাদের সমর্থক আশ্রয় নিয়েছে, তাদেরকে অবিলম্বে বাংলাদেশে বিচারের জন্যে ফেরত পাঠায়। যাদের সাজা হয়ে গেছে তাদের সাজার জন্যে যেন বাংলাদেশে পাঠায়। এছাড়া তারাও যেন বাংলাদেশ সরকার যাদেরকে যুদ্ধাপরাধী ও তাদের অনুসারী হিসেবে চিহ্নিত করছে, তাদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় ওই সব দেশে প্রবেশের। যে সকল দেশ এখনও বাংলাদেশের এই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তাদের অর্থসহ নানান ধরনের সাহায্য দিচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে জাতিসংঘসহ গণতান্ত্রিক দেশগুলোকে একটি সম্মিলিত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যদিকে মিডিয়ার যে প্রতিষ্ঠানগুলো এই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে প্রচার চালাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে যাতে গণতান্ত্রিক বিশ্ব ও জাতিসংঘ অবস্থান নেয়, সে লক্ষ্যে বাংলাদেশের কূটনীতি জোরদার করতে হবে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

অর্থনৈতিক মন্দায় কৃষিই রক্ষাকবচ

সারা বিশ্বই প্রধানমন্ত্রীকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব আর্থ’ বলে জানে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করেই তিনি বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে যে বিপ্লব এনেছেন তা বিশ্ববাসী জানে। বাংলাদেশ সারা বিশ্বে দশম বৃহত্তম ফসল উৎপাদক- ধানে তৃতীয়, সবজিতে তৃতীয়, মাছে দ্বিতীয় এবং আমে সপ্তম। বছরে ৭২ ধরনের ফল ফলে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ গড়ে ৮৫ গ্রাম ফল খেতে পারে। কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্রুত সফলতা অর্জন করছে। সরকারের ইতিবাচক প্রণোদনামূলক নীতির কারণেই সম্ভব হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে চলছে করোনা সুনামি। সর্বত্রই জীবন ও জীবিকা হুমকির মুখে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার দুটিকেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এই সংকটের মোকাবিলা করছেন। আমাদের জাতির পিতা ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ সভায় দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, নানা দুর্ভোগেও তার দেশবাসী কাবু হবে না। বরং ‘বেঁচে থাকার লড়াইয়ে নিজেদের ইচ্ছাশক্তির জোরেই জয়ী হবে শেষ পর্যন্ত।’ সেই একই রকম আস্থার সঙ্গে বঙ্গবন্ধুকন্যা চলমান বিশ্ব সংকট মোকাবিলায় জনগণের অজেয় প্রাণশক্তির ওপর ভরসা রেখে এগিয়ে যাচ্ছেন। আর এই ভরসার কেন্দ্রে রয়েছে আমাদের গ্রামীণ অর্থনীতি, বিশেষ করে কৃষির অভূতপূর্ব শক্তিমত্তা।

সারা বিশ্ব যখন করোনাকালে মহামন্দায় ভীতসন্ত্রস্ত, তখন আমাদের চাঙা কৃষি তার আশার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে চলেছে। তবে খাদ্যশস্যেও উৎপাদন তথা সরবরাহই খাদ্য নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়। মানুষের হাতে ওই খাদ্য কেনার মতো সক্ষমতাও থাকতে হবে। সে কারণেই বাজেটে মানুষের কাছে খাবার ও অর্থ পৌঁছানোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা বরাদ্দ যথেষ্ট বাড়ানো হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নিজে প্রতিটি জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা ও স্থানীয় সরকারপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলে বিপন্ন মানুষের কাছে সরকারি সহযোগিতা ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে কি না তার খোঁজখবর নিয়েছেন। গার্মেন্টশ্রমিকদের বেতন নিশ্চিত করেছেন। অনানুষ্ঠানিক খাতের হঠাৎ আয়-রোজগার হারানো মানুষের কাছে নগদ সহায়তা ও খাদ্য সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে কৃষক, খুদে ও মাঝারি উদ্যোক্তাসহ হঠাৎ বেকার হয়ে যাওয়া মানুষের জন্য বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছেন। উদ্দেশ্য, গ্রামীণ অর্থনীতিতে যেন ভোগ বাড়ে। ভোগ বাড়লেই স্থানীয় চাহিদাও বাড়বে। আর চাহিদা বাড়লে ধীরে ধীরে ব্যবসা-বাণিজ্য আড়মোড়া ভেঙে উঠে দাঁড়াবে। অর্থনীতি ফের স্থিতিশীল হবে। আর এভাবেই কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। তবে এই বিরাট কর্মযজ্ঞ সামাল দেওয়া শুধু একা সরকারের পক্ষে সম্ভব নয়। ব্যক্তি খাত, অসরকারি প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন তথা কমিউনিটিকে এগিয়ে আসতে হবে। আর এই সংকটকালে ভালো উদ্যোক্তা, সমাজের সচ্ছল মানুষ এবং নানা মাত্রিক সংগঠন এগিয়ে এসেছে। বিশেষ করে তরুণসমাজের সক্রিয়তা চোখে পড়ার মতো। এত কিছু সত্ত্বেও শহরের কম আয়ের মানুষের আয়-রোজগার বেশ খানিকটা চ্যালেঞ্জের মুখেই পড়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি খাতে কর্মরত অনেকেরই কাজের সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। ছোটখাটো উদ্যোক্তা ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীরা সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছেন। অনেকে বাড়িভাড়া দিতে পারছেন না। কম আয়ের বাড়ির মালিকদেরও তাই অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়তে হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রীর শক্তিশালী নেতৃত্বে দেশের অর্থনীতি তরতর করে এগিয়ে যাচ্ছে। এ বছর আমরা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ নানা সূচকে অভাবনীয় অগ্রগতির আশা করেছিলাম। কিন্তু করোনাভাইরাস আমাদের সেই চলার গতি হঠাৎ থমকে দিয়েছে। আমাদের সব পরিকল্পনা ও কৌশল উলটে দিয়েছে। তবু আমরা আশা করছি, আমাদের দূরদর্শী প্রধানমন্ত্রী আপৎকালীন, স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার পরিকল্পনা হাতে নিয়ে জীবন ও জীবিকা উভয় খাতকেই সংরক্ষণ করবেন।

নিঃসন্দেহে তার সরকারের প্রথম লক্ষ্য এখন অদৃশ্য এই ভাইরাসকে পরাজিত করা। সেজন্য স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে মানুষের করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়েছে। টিকাদান কর্মসূচি চলছে।

আমাদের অর্থনীতির এই শক্ত ভিত্তি একদিনে তৈরি হয়নি। গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে প্রধানমন্ত্রী কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নে বিশেষ জোর দিয়েছেন। আমার স্পষ্ট মনে আছে, ২০০৯ সালে সরকার গঠন করার সঙ্গে সঙ্গে কৃষির দিকে তিনি মনোযোগ দেন। শপথগ্রহণের পর পরই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে তার কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চৌধুরী সারের দাম ব্যাপক হারে কমিয়ে দেন। আর কৃষিতে ভর্তুকি (আসলে বিনিয়োগ) দিতে তার সরকার কখনও কার্পণ্য করেনি। এর পাশাপাশি সরকার অনেক বছর থেকেই জলবায়ু-সহিষ্ণু কৃষির উন্নয়নে গবেষণা ও সম্প্রসারণ খাতে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। গত এক দশকে ১০৯টি জলবায়ু-সহিষ্ণু বীজ উদ্ভাবন করেছেন বাংলাদেশের কৃষিবিজ্ঞানীরা।

এসবই সম্ভব হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তন ঠেকাতে তৎপর প্রধানমন্ত্রীর নীতি সমর্থনের কারণে। সারা বিশ্বই প্রধানমন্ত্রীকে ‘চ্যাম্পিয়ন অব আর্থ’ বলে জানে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা করেই তিনি বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনে যে বিপ্লব এনেছেন তা বিশ্ববাসী জানে। বাংলাদেশ সারা বিশ্বে দশম বৃহত্তম ফসল উৎপাদক- ধানে তৃতীয়, সবজিতে তৃতীয়, মাছে দ্বিতীয় এবং আমে সপ্তম। বছরে ৭২ ধরনের ফল ফলে বাংলাদেশে। বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষ গড়ে ৮৫ গ্রাম ফল খেতে পারে।

কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্রুত সফলতা অর্জন করছে। সরকারের ইতিবাচক প্রণোদনামূলক নীতির কারণেই সম্ভব হচ্ছে। কৃষকদের জন্য এক কোটিরও বেশি ১০ টাকার ব্যাংক হিসাব, দুই কোটিরও বেশি কৃষি উপকরণ কার্ড, সাত কোটিরও বেশি মোবাইল ব্যাংক হিসাব, প্রত্যেক কৃষকের ঘরে বিদ্যুৎ, ১৫ হাজারেরও বেশি সৌর সেচ প্লান্টসহ নানা ধরনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে শেখ হাসিনার সরকার। ৩ হাজার ৮ ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার অর্থনৈতিক ডিজিটাল হাব তৈরির কাজ করছে সরকার। এসব ইউনিয়নে এখন হাইস্পিড ইন্টারনেট কানেকশন আছে। গ্রামীণ ডাকঘরগুলো এখন মোবাইল ব্যাংকের এজেন্ট, ই-কমার্স কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে। দেশের তথ্য বাতায়নকে তথ্যসেবায় রূপান্তরের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে এসডিজি পূরণের অংশ হিসেবে প্রধানমন্ত্রী কাউকে গৃহহীন রাখবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং তা বাস্তবায়নও করছেন। সুন্দরবন সংরক্ষণে বাংলাদেশ সরকার তৎপর বলেই সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্পান ততটা ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি। জলবায়ু-সহিষ্ণু বায়োডাইভারসিটি প্লাস কৃষি উৎপাদনে প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন রয়েছে বলেই কৃষিবিজ্ঞানীরা খুব তৎপর। আর সেজন্যই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বাংলাদেশের সম্ভাবনা অনেকটাই বেশি। তবে হঠাৎ করে কোভিড-১৯ এসে আমাদের অর্জন অনেকটাই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। তবে এ সংকট কেটে গেলে আমরা দ্রুতই অর্থনীতির পুনরুদ্ধার নিশ্চিত করতে পারব বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

কৃষিপণ্যের বাজারজাতকরণের চ্যালেঞ্জগুলো এখনও বিদ্যমান। বড় পাইকারি বাজারের সঙ্গে সারা দেশের ছোট ও খুচরা বাজারের পুনঃসংযোগ নিশ্চিত করার পাশাপাশি ডিজিটাল ই-বাণিজ্যের প্রসার এখন সময়ের দাবি। পরিবহন চালু হলেও কৃষির সরবরাহ চেইন এখনও পুরো সক্রিয় হয়ে ওঠেনি। তাই দূরের কৃষক সবজি, মাছ, মুরগি, গরু ও দুধের উপযুক্ত দাম পাচ্ছেন না।

ভাগ্যিস, প্রধানমন্ত্রী ডিজিটাল বাংলাদেশ অভিযান শুরু করেছিলেন। তাই এই সংকটকালে ‘ফুড ফর নেশনস’, ‘পাইকার ডট সেল’সহ অসংখ্য ই-কমার্স সাইট গড়ে উঠেছে। উদ্ভাবনীমূলক তরুণদের স্টার্টআপগুলো কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে দারুণ ভূমিকা রাখছে। মাঠপর্যায়ে আমাদের প্রশাসনের তরুণ কর্মকর্তাদের অনেকেই সহনীয় পর্যায়ে এমন স্টার্টআপ গড়ে তুলতে উৎসাহ দিচ্ছেন।

অপরদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় ফারমার্স মার্কেট সচল রেখেছে। কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগও বেশ তৎপর। বীজ ও চারা, ফসলের নানা সমস্যার বিষয়ে তারা সর্বক্ষণ পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। আর তথ্য বাতায়নকে রূপান্তর করে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারগুলোকে ‘ইকোনমিক হাবে’ পরিণত করতে পারলে তো কথা-ই নেই।

রবীন্দ্রনাথ বলেছেন-

“আমাদের বাঁচিবার উপায় আমাদের নিজেদের শক্তিকে সর্বতোভাবে জাগ্রত করা।”

সময় এসেছে তেমন সামাজিক জাগরণের। সরকার তার সাধ্যমতো করছে। সমাজকেও সচেষ্ট হতে হবে।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও অধ্যাপক, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর।

শেয়ার করুন

বইমেলা ২০২১ : ভিন্ন রূপ-বৈচিত্র্যে

একুশের চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালি সংস্কৃতিকে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা সাহসী হয়েছি, এগিয়ে গেছি ধারাবাহিকভাবে নানা রক্তাক্ত ধাপ পেরিয়ে স্বাধিকারের সিঁড়ি; এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে আমাদের জাতির পিতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো পথে অর্জন করেছি স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাঙালির প্রথম জাতিরাষ্ট্র স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

অনেকটা দেখতে দেখতেই ভাষার মাস ফেব্রয়ারি চলে গেল কালের খরচা খাতায়। এবারে গতানুগতিক নিয়মে ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা হয়নি, এ কথা সবার জানা। করোনা মহামারি একুশে বইমেলার দীর্ঘকালের নিয়মকে ব্যত্যয় ঘটিয়েছে। মহামারির কাছে আমরা যে কতটা অসহায় তা বাস্তবে দেখতে পাচ্ছি। অনেক স্বাভাবিক নিয়ম, যাপিত জীবন এবং ঐতিহ্যেরও ছন্দপতন ঘটিয়েছে এ মহামারি। বাংলা একাডেমি আয়োজিত বইমেলার স্বাভাবিক নিয়মেও ঘটল এর ব্যতিক্রম।

বইমেলা এখন বাঙালি সংস্কৃতির মূলধারায় মিশে গিয়ে এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বাংলা একাডেমির বইমেলার নাম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’ থেকে পরিবর্তন হয়ে ‘অমর একুশে বইমেলা’ হয়েছে।

এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায়, বাঙালির বহমান সংস্কৃতির সম্ভবত সবচেয়ে অন্যতম বড় আয়োজন এটি। বিশ্বের আর কোথাও মাসব্যাপী এমন বইমেলা হয় কি না, জানা নেই। একে আমরা প্রাণের মেলা বলি। মনে কতটা গভীরে স্থান করে নিলে এমন অভিধায় অভিহিত করা যায়, তা সহজেই অনুমেয়। শুধু তাই নয়, এটি আমাদের সাহিত্য উদযাপনও বটে।

প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ বইমেলাতে যান, স্টল থেকে স্টলে ঘোরেন, পছন্দের বই কেনেন অথবা বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে কেবল সময় কাটাতে যান; বান্ধবের বন্ধন দৃঢ় করার উৎসও এই বইমেলা। যে বন্ধু বা আত্মীয়র সঙ্গে কালেভদ্রে হয়তো দেখা বা কথা হয়, এখানে তাকে নির্মল পরিবেশে পাওয়া যায়, শক্ত হয় হৃদ্যতার ভিত্তি। এ জন্য এর আরেক নাম মিলনমেলা।

এ কথা অনস্বীকার্য যে, বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্প প্রধানত বইমেলাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। গত বছর চার হাজারের বেশি নতুন বই লেখক-প্রকাশক উপহার দিয়েছেন বইমেলায়। এ সংখ্যাটা আশাজাগানিয়া। প্রতিবছরই এ সংখ্যা বাড়ছে। স্টলের সংখ্যাও বাড়ছে ক্রমাগত। প্রকাশকরা মেলা উপলক্ষে বই প্রকাশ করতে আগ্রহী হন এর একটা বড় কারণ এই যে, মেলায় নগদ বিক্রি হয় বলে দ্রুত বিনিয়োগের টাকাটাও ঘরে ফিরে আসে। প্রকাশকরা আশান্বিত ও উৎসাহিত হন।

পাঠকের একটা বড় সুবিধা হচ্ছে সব প্রধান লেখক-প্রকাশকের বই মেলাতে পাওয়া যায়। এমনকি তাদের সাক্ষাৎ অথবা অটোগ্রাফও পান। সময় হলে আলাপচারিতার মাধ্যমে লেখক-পাঠক সরাসরি একটি হার্দ্য পরিবেশ ও স্মৃতি সৃষ্টির সুযোগ পান। অন্য সময়ে কোনো বইয়ের দোকানে বিভিন্ন লেখকের এত বিচিত্র বই মেলে না।

বইমেলা একটি সাংস্কৃতিক উৎসব। মেলার মাধ্যমে একদিকে আমাদের সাহিত্য-আয়নায় ছবির মতো পরিস্ফুট হয়। অপরদিকে, নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয় বইমেলাকে কেন্দ্র করে। মহান একুশের ভাষা আন্দোলন ও শহিদ স্মরণে আয়োজিত হয় পথনাটকসহ নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। পুরো মাসই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে মুখরিত থাকে। তবে এ বছর করোনা মহামারির কারণে ব্যতিক্রম। সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

একুশের চেতনা আমাদের মনে করিয়ে দেয়- বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন বাঙালি সংস্কৃতিকে একটা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে। মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আমরা সাহসী হয়েছি, এগিয়ে গেছি ধারাবাহিকভাবে নানা রক্তাক্ত ধাপ পেরিয়ে স্বাধিকারের সিঁড়ি; এবং চূড়ান্তপর্যায়ে আমাদের জাতির পিতা, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দেখানো পথে অর্জন করেছি স্বাধীনতা। প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাঙালির প্রথম জাতিরাষ্ট্র স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ।

গতবারের বইমেলা একটা ভিন্ন তাৎপর্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হয়। ২০২০-এর ১৭ মার্চ পর্যন্ত ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী। ওই দিন থেকে ২০২১-এর ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত মুজিববর্ষের সময় বাড়ানো হয়েছে। যা এখন চলমান। মুজিববর্ষের প্রাক্কালে সংগত কারণে বইমেলাকে উৎসর্গ করা হয়েছিল জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে। বাংলা একাডেমি পরিকল্পনা করে মুজিববর্ষে বঙ্গবন্ধু প্রসঙ্গে ১০০টি বই প্রকাশ করার।

এবারের বইমেলা করোনা মহামারির কারণে চিরাচরিত রূপ-বৈচিত্র্যের একটু ব্যতিক্রম হবে বৈকি। কেননা, ভাষার মাস বলে অভিহিত ফেব্রুয়ারিতে এবার বইমেলা হলো না। ১৮ মার্চ থেকে ১৪ এপ্রিল অর্থাৎ বাঙালির আরেক জাতীয় উৎসব ১ বৈশাখ পর্যন্ত এ মেলা চলবে। মাঝখানে যুক্ত হবে মহান স্বাধীনতা দিবস ২৬ মার্চ। এটাও এক সুখকর বার্তা আমাদের জন্য। দুই প্রধান সংস্কৃতির মিলন বা সংযোগ ঘটবে একসঙ্গে। যা বাঙালির জীবনে বিরল ঘটনা। এর মধ্যে মুজিব শতবরর্ষেরও সংযোগ ঘটবে বৈকি। এই ত্রিমুখী আনন্দ বা উৎসব আমাদেরকে শুধু আন্দোলিত করবে না, চেতনার ঘরে জ্বালাবে নতুন বাতি।

আমাদের আন্তরিক চাওয়া বইমেলা সফল হোক। অন্যদিকে বইমেলা থেকে করোনার সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে কি না সে আশঙ্কাও রয়েছে। বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করলে মেলার মাঠে দর্শনার্থী নিয়ন্ত্রণ করা এক সুকঠিন কাজ। সেদিকে কর্তৃপক্ষের সতর্ক দৃষ্টি রাখা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রয়োজন সবার নিজ নিজ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা।

বঙ্গবন্ধুকে কেন্দ্র করে গতবারের মেলায় বাংলা একাডেমি প্রকাশ করেছে প্রতিদিন একটি করে বই। আর সেই বইকে কেন্দ্র করেই সেমিনারে আলোচনা হয়েছে। গত বছর ২ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধনী দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান জন্মশতবর্ষ গ্রন্থমালার প্রথম বই বঙ্গবন্ধুর ‘আমার দেখা নয়াচীন’-এর মোড়ক উন্মোচন করেছিলেন বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

ওই বইয়ে বিবৃত হয় ১৯৫২ সালের ২ থেকে ১২ অক্টোবর চীনের পিকিং বর্তমানের বেইজিং নগরীতে অনুষ্ঠিত এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলন। তরুণ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান রাজনৈতিক প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে সম্মেলন উপলক্ষে চীন সফর করেন। পূর্ব পাকিস্তান থেকে শেখ মুজিব ছাড়াও আর যে চার জন গিয়েছিলেন তারা হচ্ছেন- আতাউর রহমান খান, তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ও ইউসুফ হাসান। সেখানে তিনি মাতৃভাষা বাংলায় ভাষণ দিয়ে বাংলা ভাষার মর্যাদা বহির্বিশ্বে সমুন্নত করেন।

সুখপাঠ্য এ ভ্রমণকাহিনিতে ফুটে উঠেছে বঙ্গবন্ধুর সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী মনোভাব ও অসাম্প্রদায়িক ভাবাদর্শ। নিজের দেশকে উন্নয়নের প্রত্যয়ও তার লেখায় ফুটে উঠেছে। আশ্চর্য এক গভীর অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে তিনি বিপ্লবোত্তর গণচীনের সমাজ ও শাসন ব্যবস্থা অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ করেছেন। শান্তি সম্মেলনে যোগদানের বিষয়ে গ্রন্থের শুরুতেই তিনি লিখেছেন-

“দুনিয়ায় আজ যারাই শান্তি চায়, তাদের শান্তি সম্মেলনে আমরা যোগদান করতে রাজি। রাশিয়া হউক, আমেরিকা হউক, ব্রিটেন হউক, চীন হউক যে-ই শান্তির জন্য সংগ্রাম করবে তাদের সাথে সহস্র কণ্ঠে আওয়াজ তুলতে আমরা রাজি আছি, আমরা শান্তি চাই।”

স্বাধীন বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি প্রণয়নে বঙ্গবন্ধু তার এই আদর্শকেই গ্রহণ করেছেন।

ফিরে আসি বইমেলা প্রসঙ্গে। প্রতিবছর এত বই প্রকাশিত হয়, কিন্তু সুসম্পাদিত ও নির্ভুল বইয়ের সংখ্যা কম। বেশিরভাগ প্রকাশকেরই কোনো সম্পাদক নেই, বানান ও বাক্য সংশোধনেও তেমন যত্নবান নন অনেকেই। প্রকাশকদের কাছে প্রত্যাশা থাকবে, তারা সংখ্যা নয়, মানসম্পন্ন বই প্রকাশের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব দেবেন।

একটি প্রাসঙ্গিক বাস্তবতার কারণ তুলতেই হচ্ছে, বাংলাদেশে সাধারণভাবে বইয়ের দাম একটু বেশি। এর একটা বড় কারণ বই বিক্রেতাদের উচ্চহারে কমিশন প্রদান- যা ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ হয়ে থাকে। প্রকাশকরা মিলে যদি কমিশনকে একটা যুক্তিসংগত অংকে স্থির করেন, তবে বইয়ের বাজারে একটা শৃঙ্খলা ও পেশাদারত্ব আসবে বলে মনে করি।

দুটি অজনপ্রিয় প্রসঙ্গ উল্লেখ করে লেখাটা শেষ করতে চাই। আমরা কি বইমেলায় প্রবেশের জন্যে পাঁচ বা দশ টাকার টিকেটের ব্যবস্থা করতে পারি না? তাতে যে টাকা আসবে, তা বইমেলার অবকাঠামোর উন্নয়নে ব্যয় করা যাবে।

আরেকটি হলো, বইমেলার আয়োজন করা বাংলা একাডেমির প্রধান কাজ নয়। অথচ এ আয়োজনে একাডেমির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অন্তত তিন মাস ব্যস্ত থাকতে হয়। এ সময় তারা প্রতিষ্ঠানের অন্য কাজ করার সময় পান না।

আশার কথা এই যে, প্রকাশকরা বেশ সংগঠিত। তারা মেলার আয়োজন করলে বেশি সুবিধা ও ভালো হয়, বাংলা একাডেমি সহযোগিতা করতে পারে। কবছর ধরেই বিষয়টা আলোচিত হচ্ছে, কিন্তু বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধাই হচ্ছে না।

আমাদের প্রত্যাশা- বইমেলা আরও সুন্দর হবে, পেশাদার হবে। বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিকে বিশ্বের সামনে সুচারুভাবে তুলে ধরবে এ বইমেলা। প্রাণের বইমেলা সবাইকে আরও বই পড়তে উৎসাহিত করবে। বইমেলা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্য আমাদের চেতনার ঘরে দায়বদ্ধতা বাড়াবে- এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাম্মানিক সভাপতি, ইন্টারন্যাশনাল থিয়েটার ইনস্টিটিউট (আইটিআই)।

শেয়ার করুন

স্বাধীনতার ৫০ বছর, মহামারি ও রাজনীতি

একটি বড় সময় ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনার নেতৃত্ব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের হাতে ছিল না। সে কারণে রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সুবিধাবাদ, উগ্র মতাদর্শিক হঠকারিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জলাঞ্জলির মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্র-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, এবং ব্যাপক মানুষের মনোজগতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা সেই রাজনৈতিক আদর্শবান, মেধাবী ও নিষ্ঠাবানদের আর খুঁজে পাই না।

মহান স্বাধীনতার ৫০ বছর এবার উদযাপিত হতে যাচ্ছে। এমন একটি ঐতিহাসিক সময় জাতির জীবনে আর কখনও আসবে না। ৫০ বছরে আমাদের অর্জনসমূহ যেমন দেখার সুযোগ ঘটছে, আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশানুরূপ সাফল্য অর্জন করতে পারিনি; সেগুলো আমাদেরকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

মার্চ থেকে সরকার এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, পেশাজীবী সংগঠন স্বাধীনতার ৫০ বছরপূর্তি উপলক্ষে কী ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে তা হয়তো দেখতে পাব। মোটাদাগে বাংলাদেশ ৫০ বছরে আর্থ-সামাজিকভাবে ভালো একটি অর্জনের জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছে। একসময় পৃথিবীর অনেক দেশ বাংলাদেশকে হতদরিদ্র বলে আখ্যায়িত করত। এখন এই দেশটিই মধ্যম আয়ের দেশে পদার্পণ করার কৃতিত্ব অর্জন করেছে।

সর্বশেষ সংবাদ হচ্ছে, জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা দিয়েছে। তবে যেটি দেখা ও বোঝার বিষয়, তা হচ্ছে ভিশনারি-মিশনারি রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেছে, উন্নয়ন ও মানবকল্যাণের ধারণা বাস্তবায়নে কাজ করেছে, তখনই বাংলাদেশ অগ্রগতির চাকা দ্রুত ঘোরাতে পেরেছে। তবে দুঃখজনক অভিজ্ঞতা হচ্ছে, একটি বড় সময় ধরে বাংলাদেশ রাষ্ট্রপরিচালনার নেতৃত্ব দেশপ্রেমিক রাজনৈতিক দলের হাতে ছিল না। সে কারণে রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। আদর্শহীনতা, সাম্প্রদায়িকতা, সুবিধাবাদ, উগ্র মতাদর্শিক হঠকারিতা এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের জলাঞ্জলির মতো বিষয়গুলো রাষ্ট্র-রাজনীতি, সমাজ-সংস্কৃতি, এবং ব্যাপক মানুষের মনোজগতে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এর ফলে আমরা সেই রাজনৈতিক আদর্শবান, মেধাবী ও নিষ্ঠাবানদের আর খুঁজে পাই না।

বাংলাদেশ ৫০ বছরে অর্থনৈতিক জিডিপিতে প্রশংসনীয় প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। কিন্তু সেই তুলনায় রাজনীতির গুণগত প্রবৃদ্ধি আমাদেরকে আশাহত করে। এই ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার জন্য রাজনৈতিক দলগুলো ৫০ বছর পূর্তির আনুষ্ঠানিকতায় কতখানি ভেবে দেখবে কিংবা প্রস্তুতি নেবে সেটি দেখার বিষয়। তবে সাম্প্রদায়িকতা ও জঙ্গিবাদের একটি বড় ধরনের বিস্তারের সময় পৃথিবীব্যাপী পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমরাও এর ভয়ানক প্রভাব থেকে মুক্ত নই। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক গণতন্ত্রের ভাবাদর্শ যদি চর্চায় স্থান না পায়, তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আগামীর দিনগুলোতে কতটা প্রতিষ্ঠিত থাকবে তা বলা কঠিন। সে ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন গভীর সংকটে পড়তে পারে। এর নজির পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, ইয়েমেন, নাইজার, সুদান, নাইজেরিয়াসহ বেশ কিছু দেশ এখন ভয়ানক সংকটে রয়েছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে ওইসব শক্তির আদর্শগত মিল অনেক ক্ষেত্রেই লক্ষ করা যায়।

সুতরাং স্বাধীনতার ৫০ বছরে দাঁড়িয়ে আমাদেরকে পেছনের এই অপশক্তির উৎসমূলকে যেমন চিহ্নিত করতে হবে, একইভাবে সামনের বছরগুলোতে অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের ধারার রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতিতে নিষ্ঠাবান, দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতেই হবে।

স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির এই সময়ে বৈশ্বিক মহামারি করোনা সংক্রমণের সংকট আমাদেরকে মোকাবিলা করতে হয়েছে। একই সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দেখা দিয়েছিল। তারপরও দেশে খাদ্যঘাটতি না থাকায় তখন সংকটটা মোকাবিলা করা গেছে , দেশে করোনা চিকিৎসায় শূন্য থেকে অন্তত আক্রান্তদের চিকিৎসা দেয়ার মতো হাসপাতাল, চিকিৎসক, নার্স, টেকনিশিয়ান তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। এছাড়া প্রাকৃতিক কিছু অনুকূল আবহাওয়াগত পরিবেশ থাকায় মহামারিটি ইউরোপ, আমেরিকার মতো এখানে ব্যাপকভাবে ছড়ায়নি। করোনায় আমাদের মৃত্যু সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও অনেক মুল্যবান মানুষকে আমাদের হারাতে হয়েছে।

এছাড়াও করোনার ধাক্কা আমাদেরও জিডিপিতে নেতিবাচকভাবে কিছুটা হলেও পড়েছে। সবচাইতে বড় ক্ষতিকর প্রভাব পড়েছে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর। এমনিতেই শিক্ষার মান নিয়ে আমাদের যথেষ্ট রকম অতৃপ্তি রয়েছে, তার ওপর এক বছর হতে চলল করোনার কারণে শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা ফিরতে পারছে না।

অনলাইন মাধ্যম হিসেবে আমাদের দেশে খুব একটা বিস্তার লাভ করতে পারেনি। ফলে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য আরও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকগণ এই অবস্থায় অস্থির হয়ে উঠেছেন। এর কিছু বহিঃপ্রকাশ সম্প্রতি রাস্তায় আন্দোলনে দেখা গেছে। তবে বাংলাদেশে টিকাগ্রহণের উদ্যোগটি বিশ্বের অনেক দেশের চাইতেও আগে শুরু করতে পারার কারণে আশা করা যাচ্ছে দু-তিন মাসের মধ্যেই করোনার সংক্রমণের রাশ টেনে ধরা সম্ভব হতে পারে। এরই মধ্যে শিক্ষা মন্ত্রণালয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার একটি প্রটোকল ঘোষণা করেছে। ফলে দু-তিন মাস পরে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যবিধি মেনে লেখাপড়ার পরিবেশ আবার ফিরে আনার চেষ্টা হবে- সেটি যেন কোনো অবস্থাতেই ব্যাহত না হয়, তা সকল মহলকে মনে রাখতে হবে। এমনিতেই গত এক বছরে করোনার কারণে যে সংকটের ঢেউ লেগেছে তাতে অনেকেই আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, নানা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। এই সংকট অতিক্রম করার চ্যালেঞ্জ ব্যক্তি ও রাষ্ট্রীয়পর্যায়ে নেয়ার চেষ্টা হচ্ছে। তবে বৈশ্বিক এই সংকট আমাদের এখানে নানা ধরনের অপরাধপ্রবণতার সঙ্গে কর্মহারাদের অনেককেই যুক্ত হতে দেখা গেছে। এর সঙ্গে রয়েছে নানা ধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, জোর-জবরদস্তি এবং প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা। ফলে সমাজজীবনে অস্থিরতার লক্ষণ বহুমাত্রিক হয়ে উঠছে। এটিকে মোকাবিলা করার জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। প্রতি মুহূর্তই নতুন অঘটন ঘটছে।

অপরদিকে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেও চলছে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ। ক্ষমতাশীন সরকারের রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগে ২০১৯ সালে যে শুদ্ধি অভিযান শুরু হয়েছিল সেটি এখন খুব একটা শোনা ও দেখা যাচ্ছে না। দলের অভ্যন্তরে নানা ধরনের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর অপতৎপরতাও মাঝেমধ্যে প্রকাশিত হয়।

সম্প্রতি নোয়াখালি অঞ্চলে আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিয়ে দেশব্যাপী যে তোলপাড় লক্ষ্ করা গেছে তা দলকে কতটা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে সেটি দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ কেন আগে থেকে রাশ টেনে ধরতে পারেননি সেই প্রশ্ন সকল মহলেই ঘুরপাক খাচ্ছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দেশের অন্যত্র দৃশ্যমান না হলেও জেলা-উপজেলাগুলোতে গ্রুপিং, বিভাজন, এবং স্থানীয় নির্বাচনকেন্দ্রিক নানা ধরনের বিরোধ প্রকাশ্য হয়েছে। বেশ কজন নিহতও হয়েছেন। সুতরাং, ক্ষমতাশীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে এখন যা চলছে তা দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার ভাবমূর্তিকে সাধারণ পর্যায়ে ক্ষুণ্ন করছে।

অপরদিকে, সরকার উৎখাতের নানা ধরনের হুংকার ও আলামত দেশে-বিদেশে বসে অনেকেই দিচ্ছেন। সেসব প্রচার-প্রচারণা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে কতখানি প্রচার পাচ্ছে তা দেখার বিষয়। স্বাধীনতার ৫০ বছরের এই সময়ে সরকারের বিরুদ্ধে একটি মহল উৎখাত ও ষড়যন্ত্রের যে প্রস্তুতি ও আহ্বানের কথা বলছে, তা গুরুত্বের সঙ্গে নিতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যারা জীবন উৎসর্গ করেছেন, তারা আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না, কিন্তু তাদের আত্মাহুতিকে আমরা সবাই মুখে শ্রদ্ধা করি, তাদের জীবন উৎসর্গের পেছনে যেসব মহৎ উদ্দেশ্য ছিল সেগুলোকে কতটা স্মরণ ও শ্রদ্ধা করছি সেটি ভেবে দেখার বিষয়।

লেখক : অধ্যাপক, গবেষক, সমাজচিন্তক

শেয়ার করুন

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যু নেই

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর ১৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে ধর্মান্ধ চরমপন্থি গোষ্ঠী তাদের তৎপরতা বন্ধ করেনি। বরং নানা পথ অনুসরণ করে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে চলেছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা ছিল এ অপতৎপরতারই অংশ। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কিছু সফলতা অর্জন করেছে। তবে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। এ গোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের কাজের উপযুক্ত স্থান মনে করছে এবং সেটা প্রকাশ্যেই বলছে।

হুমায়ুন আজাদ শ্রেণিকক্ষে ছাত্রছাত্রীদের মনের কোণে আলো ফেলতে পারতেন, চেতনার অলিন্দে লাল-নীল দীপাবলি জ্বালিয়ে দিতেন- এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্রছাত্রীরা প্রিয় শিক্ষককে স্মরণ করেন। তিনি শিক্ষার্থীদের মনে প্রশ্ন জাগিয়ে দিতেন। একইসঙ্গে দিয়েছেন উত্তরের দিকনির্দেশনা।

তিনি ‘ভালো থেকো’ কবিতায় লিখেছেন-

“ভালো থেকো ফুল, মিষ্টি বকুল, ভালো থেকো।

ভালো থেকো ধান, ভাটিয়ালি গান, ভালো থেকো।

ভালো থেকো মেঘ, মিটিমিটি তারা।

ভালো থেকো পাখি, সবুজ পাতারা।

ভালো থেকো।”

সবার ভালো তিনি চেয়েছেন। দেশের ভালো চেয়েছেন। এ কারণেই তিনি ধর্মান্ধ অপশক্তির টার্গেটে পরিণত হয়েছেন। তাকে মাত্র ৫৬ বছর বয়সে কেড়ে নিয়েছে এই গোষ্ঠী।

২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার পর তিনি একুশের গ্রন্থমেলা থেকে বের হয়ে ফুটপাত ধরে হাঁটছিলেন। এ সময়েই তার ওপর ভয়ংকর হামলা হয়। কয়েক মাস পর জার্মানিতে তার মৃত্যু হয়। হামলার ধরন দেখে সহজেই ধারণা করা যায়- জেমএমবি কিংবা এ ধরনের কোনো ধর্মান্ধ ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী রয়েছে এর পেছনে। মৃত্যুর কিছুদিন আগে তিনি ‘পাক সার জমিন সাদ বাদ’ উপন্যাস লিখেছিলেন। এতে ধর্মের নামে যারা ভণ্ডামি করে, তাদের মুখোশ উন্মোচন করা হয়। তাকে প্রাণে মারার হুমকি দেয়া হয়। কিন্তু তিনি ছিলেন নির্ভীক। বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে কিংবা পরিচিত-অপরিচিত সব স্থানে যেতেন অসম সাহসে। একুশের বইমেলায় দেখেছি ‘আগামী প্রকাশনীর’ স্টলে ‘নারী’, ‘ছাপ্পান্নো হাজার বর্গমাইল’, ‘আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম’, ‘সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে’- নিজের এসব বই পাঠকের হাতে তুলে দিচ্ছেন অটোগ্রাফসহ। তার বই কেনার জন্য বইয়ের স্টলের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যেত।

এসব পছন্দ হয়নি সেই অপশক্তির, যারা ধর্মের নামে অধর্মের কাজ করে, ব্যবসা করে, মানুষকে কষ্ট ও যন্ত্রণা দেয়। তারা তাকে যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু দিতে চেয়েছে। উন্মত্ত ঘাতকেরা তাকে অনেকটা প্রকাশ্যেই আক্রমণ করেছে। পিস্তল বা রিভলবারের গুলিতেও তারা আঘাত হানতে পারত, নিভৃত কোনো স্থানে। কিন্তু তাতে লেখককে যথেষ্ট যন্ত্রণা দেওয়া হয় না, মানুষকে সন্ত্রস্ত করা হয় না। এ কারণে প্রকাশ্যে চাপাতি দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। তিনি রক্তাক্ত হয়ে ছটফট করেছেন। বেঁচে থাকার আকুতি করেছেন। ঘাতকেরা বুক ফুলিয়ে চলে গেছে নির্ভয়ে, নিরাপদে আশ্রয়ে। তারা জানত, ক্ষমতাসীন খালেদা জিয়া সরকারের দিক থেকে কোনো ভয় নেই। বাংলাদেশে এ ধরনের অপশক্তির উত্থান ঘটছে- সেটা এ সরকার বিশ্বাস করতে রাজি ছিল না। রাজশাহীর বাগমারায় শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাইয়ের জেএমবি প্রকাশ্যে দাপট দেখাচ্ছে, মানুষ হত্যা করছে, ‘ইসলামি হুকুমত কায়েমের’ কথা বলছে- কিন্তু খালেদা জিয়ার মন্ত্রিসভার প্রভাবশালী সদস্য মতিউর রহমান নিজামী বলছেন- সব বানোয়াট, মিডিয়ার কল্পকাহিনি। ২৭ ফেব্রুয়ারি হামলার পরদিন ঢাকার বাসাবো এলাকায় বিএনপির জনসভা ছিল, যেখানে বক্তব্য রেখেছেন খালেদা জিয়া। তিনি বলেন- ‘বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলার জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী। আজ ২৮ ফেব্রুয়ারি তারা দেশব্যাপী হরতাল ডেকেছে। এই হরতাল সফল করার জন্য তাদের একটা ইস্যু দরকার। এ জন্যই পরিকল্পিতভাবে এ হামলা চালানো হয়েছে।’ [যুগান্তর, ২৯ ফেব্রুয়ারি, ২০০৪]

হুমায়ুন আজাদের চিকিৎসা চলে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে, সিএমইচ-এ। জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের নেতা ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সরকারি বাধার কারণে তাকে সেখানে দেখতে যেতে পারেননি।

কয়েক মাস পর ২০০৪ সালেরই ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আরও নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে- শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের গোটা কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এবং রাজধানী ঢাকার কয়েক হাজার কর্মী-সমর্থক সমবেত হয়েছিলেন একটি সমাবেশে। সেখানে চারদিক থেকে একযোগে গ্রেনেড হামলা চলে। শেখ হাসিনা স্প্লিন্টারের আঘাত পেয়েও বেঁচে যান। কিন্তু মহিলা নেত্রী আইভি রহমানসহ ২৪ জন মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। ওবায়দুল কাদের, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়াসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের অনেকে আহত হন। এ হামলার পরিকল্পনা হয়েছিল তারেক রহমানের উপস্থিতিতে, কুখ্যাত ‘হাওয়া ভবনে’। অভিযান পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েছিল মুফতি হান্নানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ‘হুজি’। একটি রাজনৈতিক দলের সব নেতাকে একযোগে হত্যা করার ভয়ংকর এই অপরাধের পরও সে সময়ে ক্ষমতায় থাকা বিএনপি নেতৃত্বের টনক নড়েনি। তারা এই হামলার দায়ভার চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করেছে আওয়ামী লীগের ওপর।

হুমায়ুন আজাদের হত্যাচেষ্টার এক মাস যেতে না যেতেই ১ এপ্রিল চট্টগ্রামের একটি সরকারি মালিকানাধীন সার কারখানার জেটিতে ১০ ট্রাক অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র খালাস করার সময় ধরা পড়ে। এ জেটি ছিল শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে, যে মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর গণহত্যার সহযোগী কুখ্যাত আলবদর বাহিনীর কমান্ডার মতিউর রহমান নিজামী। এসব অস্ত্র ভারত সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত আসামের এক গোষ্ঠীর জন্য একটি দেশ থেকে চোরাইপথে আনা হয়েছিল। সে সময়ের বাংলাদেশ সরকার ছিল এই ‘ভয়ংকর খেলার’ অংশীদার।

২০০৪ সালের ২১ আগস্টের অপরাধের রেশ কাটতে না কাটতেই ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট শায়খ আবদুর রহমানের সন্ত্রাসী গোষ্ঠী জেএমবি দেশের প্রায় ৫০০ স্থানে একযোগে বোমা হামলা চালায়। এ হামলার দায়ও আওয়ামী লীগের ওপর চাপানোর অপচেষ্টা চলে। সারা দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশ যায়- আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তার কর। ঢাকায় বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী মিছিল-সমাবেশ করে বলতে থাকে- ‘এ কাজ আওয়ামী লীগের।’ কিন্তু অপরাধ এত প্রকাশ্যে ঘটেছে এবং হামলা পরিচালনাকারী জেএমবি নিজেদের কৃতিত্ব প্রচারে এত ব্যাকুল হয়ে পড়ে যে আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেপ্তারের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা ছাড়া কোনো উপায় খালেদা জিয়ার ছিল না।

এরপর বিএনপির শাসনামলে ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরও কয়েকটি হামলা চালায়। তারা রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের অভিলাষ ব্যক্ত করে প্রকাশ্যে লিফলেট বিতরণ করতে থাকে। সংবাদপত্রে সাক্ষাৎকার প্রদান করে। দেশের ভেতর থেকে ও বাইরের কয়েকটি দেশ ভয়ংকর চরমপন্থী গোষ্ঠীর উত্থানের ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতে ইসলামীর সরকারের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

হুমায়ুন আজাদের মৃত্যুর পর ১৭ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এ সময়ে ধর্মান্ধ চরমপন্থী গোষ্ঠী তাদের তৎপরতা বন্ধ করেনি। বরং নানা পথ অনুসরণ করে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির বিরুদ্ধে এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা চিরতরে বন্ধ করে দেওয়ার লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করে চলেছে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজানে আত্মঘাতী হামলা চালিয়ে নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ পরিচালনা ছিল এ অপতৎপরতারই অংশ। আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এ গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে কিছু সফলতা অর্জন করেছে। তবে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। এ গোষ্ঠী বাংলাদেশকে তাদের কাজের উপযুক্ত স্থান মনে করছে এবং সেটা প্রকাশ্যেই বলছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর একের পর এক আঘাত করার পরও তারা প্রকাশ্য সমাবেশ করে জন্মশতবর্ষে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাস্কর্য ভেঙে বুড়িগঙ্গায় নিক্ষেপের ঔদ্ধত্য দেখাতে পারে। অতএব, কেবল সাবধান ও সতর্ক থাকা নয়, এ অপশক্তির বিরুদ্ধে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তিনি আমাদের সবার ভালো থাকার জন্য কাজ করে গেছেন। তার মৃত্যু নেই।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলাম লেখক ও সাংবাদিকতায় একুশে পুরস্কারপ্রাপ্ত

শেয়ার করুন

খুলে যাক স্কুল-কলেজ

অচিরেই ক্লাস, পরীক্ষা চালু হোক। জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের মতামত শুনুন। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সরকার আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল, করোনাকালেও তা প্রমাণিত। কিন্তু অতিসতর্কতার ফলে সামাজিক অস্থিরতা কাম্য নয়।

করোনা মহামারিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রেখে শিক্ষা ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার্থীদের সামাল দেয়ার যেসব বিকল্প উদ্যোগ তা প্রায় সবাই মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সবকিছু যখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে এসেছে, তখন শিক্ষা কর্তৃপক্ষের অনেক কিছুই আর মেনে নিতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। এর ফলে তারা রাস্তায় নেমেছেন, কেউবা চান পরীক্ষা দিতে, কেউ কেউ ফিরতে চান শ্রেণিকক্ষে।

প্রায় এক বছর আলাপ-আলোচনা করে, বিজ্ঞজনের পরামর্শ নিয়ে এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করে বার্ষিক ও পাবলিক পরীক্ষা বিষয়ে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত কার্যকর করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। এসব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও বাস্তবতার কারণে বা বিকল্প না থাকায় অনেকেই তা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া এখন সবকিছুই করোনাপূর্ব অবস্থায় ফিরে এসেছে। তাই ক্লাস পরীক্ষা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব যত দেখানো হচ্ছে, ততই বাড়ছে ক্ষোভ ও অস্থিরতা।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করার ক্ষেত্রেও সরকার সময়োচিত পদক্ষেপ নিয়েছিল। ৮ মার্চ দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয় ১৭ মার্চ। যদিও ওই সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের জন্য জনমত সৃষ্টি হয়েছিল, মূল ধারার গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধের পক্ষেই অবস্থান নেয়। এর ফলে সরকারের জন্য সিদ্ধান্ত নেয়াটা হয়তো সহজ হয়েছিল।

এখনও কিন্তু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়ার প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দেওয়ার দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। ঢাকা ছাড়াও পরীক্ষা ​দেয়ার আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন জেলায় বেশ কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।

পরিস্থিতি​ পর্যালোচনা করে বলা যায়, শিক্ষা কর্তৃপক্ষের নানা সিদ্ধান্তহীনতা, অস্পষ্ট বক্তব্য এবং কথার সঙ্গে বাস্তবের মিল না থাকাসহ নানা কারণে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর মধ্যে অস্থি​রতা ছড়িয়েছে। এটা যে ইচ্ছাকৃত তা নয়, তবে কোটি কোটি শিক্ষার্থী নিয়ে সরকারের যে বিভাগ কাজ করে, সেখানে আরও বেশি সতর্কতা ও শৃঙ্খলা কাম্য। শিক্ষা নিয়ে একটি বক্তব্য, মন্তব্য বা সিদ্ধান্ত দ্রুতগতিতে ছড়িয়ে পড়ে দেশের সর্বত্র। এ নিয়ে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া হয় ব্যাপক।

দীর্ঘ সময় ধরে স্কুল বন্ধ থাকায় স্কুল প্রাঙ্গণে শিশুদের এমন উচ্ছ্বাস স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। ছবি: নিউজবাংলা

গত সোমবার শিক্ষামন্ত্রী দীপু মনি সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সময় ঘোষণা করেছেন ২৪ মে। এতে অনেকেই বিস্মিত হয়েছেন। কারণ গত মাস দুয়েকের যে আলোচনা তাতে মার্চে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলবে, এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। এই ধারণা পেয়ে শিক্ষক, শিক্ষার্থীরাও প্রস্তুত হয়েছেন। কিন্তু প্রায় তিন মাস পর বিশ্ববিদ্যালয় খোলার বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর আকস্মিক ঘোষণায় শিক্ষার্থীদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়েছেন। আবার স্কুল-কলেজ খোলার সিদ্ধান্ত বিষয়ে সভা ডাকা হয়েছে ২৭ ফেব্রুয়ারি, শনিবার। তিন মাস পরে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত দিয়ে স্কুল-কলেজ ১ মার্চ থেকে খোলা হবে কি না, সেই আলোচনা চলছে চারদিকে।

শিক্ষার্থীদের যে আন্দোলন চলছে, তা মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে চলমান তিনটি বড় পরীক্ষা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত ঘিরে। গত সোমবার যারা শিক্ষামন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন ফলো করেছেন, তাদের অনেকেরই মন্তব্য হচ্ছে, শিক্ষামন্ত্রী বাছবিচার ছাড়াই তাৎ​ক্ষণিক এই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। সংবাদ সম্মেলনের শেষ ভাগে একজন সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, সব বিশ্ববিদ্যালয় খুলবে ২৪ মে, কিন্তু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে তো পরীক্ষা চলছে। এর জবাবে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ওই পরীক্ষাও বন্ধ থাকবে।

এরপর দেশজুড়ে অস্থি​রতা ছড়াতে থাকে। সোমবার রাত ৯টার দিকে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, পরীক্ষা যথারীতি চলবে। আবার রাত সাড়ে ৯টায় পৃথক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়েছে।

কী অদ্ভূত কাণ্ড! শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমতি বা অনাপত্তি নিয়েই জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা শুরু করেছিল যা কয়েক সপ্তাহ ধরে চলছে। এই পরীক্ষা শুরুর প্রেক্ষাপট কিন্তু ভিন্ন।

মূলত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে তিনটি পরীক্ষা চলছিল, এসব পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সাড়ে ৫ লাখ ছাত্র-ছাত্রী। এর মধ্যে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে স্নাতক সম্মান ফাইনাল পরীক্ষা, যেখানে পরীক্ষার্থী ২ লাখ ২৬ হাজার। এই পরীক্ষার্থীরা আসলেই হতভাগা। তাদের পাঁচটি পরীক্ষা হওয়ার পর গত বছরের ১৭ মার্চ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা হয়। বাকি ছিল দুটি পরীক্ষা। এই দুটি পরীক্ষা ও ভাইবা নিয়ে তাদের বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ করে দিতে চাইছিল জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু সেই সুখ ওদের কপালে সইল না। করোনার আগে পাঁচটিসহ সাম্প্রতিক সময়ে সবকটি পরীক্ষা শেষ হলো। কিন্তু বাকি রয়ে​ গেল মৌখিক পরীক্ষা। এই পরীক্ষার জন্য যদি তাদের তিন মাস অপেক্ষা করতে হয়, তাহলে ফল প্রকাশেও লাগবে আরও তিন-চার মাস সময়। তাহলে বছর প্রায় শেষ হয়ে আসবে। অথচ গত বছরের জুনে তাদের স্নাতক সম্মান পরীক্ষার ফল প্রকাশ হওয়ার কথা ছিল।

পরীক্ষা চালু রাখার দাবিতে সম্প্রতি রাজধানীর নীলক্ষেত মোড় অবরোধ করে আন্দোলনে নামে সাত কলেজের শিক্ষার্থীরা। ছবি: নিউজবাংলা

আবার স্নাত​কোত্তর চূড়ান্ত পরীক্ষাও শুরু হয়ে​ছিল। তাদের পাঁচটি পরীক্ষা শেষ হয়েছে, দুটি বাকি আছে। মৌখিক পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল ২৭ ফেব্রুয়ারি। এরাও আটকে গেল। এই স্তরে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি দ্বিতীয় বর্ষের পরীক্ষাও শুরু করেছিল। গত ১৭ ফেব্রুয়ারি এই পরীক্ষা শুরু হয়, শেষ হওয়ার কথা ছিল ২৩ মার্চ। তারাও আটকে গেল।

এই তিনটি পরীক্ষা শুরু করলেও পাইপলাইনে ছিল আরও চারটি বড় পরীক্ষা। কথা ছিল আগের তিনটি স্তরের পরীক্ষা শেষ হলেই পরের চারটি স্তরের পরীক্ষা শুরু হবে। কিন্তু সরকার চলমান পরীক্ষাগুলো স্থগিত করে দেয়ায় সেশনজট আরও বেড়ে যাবে।

আসলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ও দৃশ্যমান কাজ পরীক্ষা নেয়া ও ফল প্রকাশ করা। বছরে প্রায় ২০০ পরীক্ষা নেয় এই বিশ্ববিদ্যালয়। এর অধীনে কলেজগুলোতে শিক্ষার্থীসংখ্যা প্রায় ২৮ লাখ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়া শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্য। তাদের লক্ষ্য থাকে পড়াশোনা শেষ করে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার যুদ্ধে নেমে পড়া, হতদরিদ্র মা-বাবার মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করা।

যাই হোক, সরকারের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়ে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় চলমান পরীক্ষাগুলো স্থগিত করলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বেলায় কিন্তু ভিন্ন ঘটনা ঘটেছে, যা একই যাত্রায় দুই ফলের মতো। অধিভুক্ত সাতটি কলেজের বিষয়ে কিন্তু ভিন্ন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপ​ক্ষ। এর কারণ, শিক্ষার্থীদের রাস্তা বন্ধ করে আন্দোলন। যেহেতু আন্দোলনের মুখে সাত কলেজের স্থগিত করা পরীক্ষা চালু হয়েছে, সেহেতু এবার মাঠে নেমেছেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের আটক করা হয়েছে, আবার ছেড়েও দেয়া হয়েছে। ​আগামী রোববার পর্যন্ত চূড়ান্ত সময় দিয়েছেন আন্দোলনকারীরা।

এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে, তিন মাস পরে বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্তটি অযৌক্তিক হয়েছে। তার মানে ধারণা করা হচ্ছে, অন্যান্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও হয়তো ওই সময়ে খুলবে। সরকারের এই অতিসতর্কতা অনেকেরই পছন্দ হয়নি।

দেশে করোনায় মৃতের সংখ্যা এখন প্রতিদিন পাঁচ-সাতের কাছাকাছি। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পুরোদমে চলছে। রাস্তাঘাটে মানুষের ভিড়ে চলা দায়, সড়কে যানজট লেগে​ই থাকছে। এই দৃশ্য দেখে কষ্টে থাকা শিক্ষার্থীরা আর চুপ থাকতে পারছেন না। অনেকের টিউশনি ছুটে গেছে। হল বন্ধ থাকায় ঢাকায় এসে অবস্থান করার সুযোগ নেই। সেশনজট হাতছানি দিচ্ছে। কবে পরীক্ষা হবে, কবে ফল প্রকাশ হবে, সেই অনিশ্চয়তা ভর করেছে। করোনায় অভিভাবকদের অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন। করোনায় অভিভাবকহারা সন্তানের সামনে এখন শুধুই অন্ধকার।

পরীক্ষা চালু রাখার বিষয়ে আন্দোলন করে যাচ্ছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও। ছবি: নিউজবাংলা

করোনা প্রত্যেক পরিবারের ওপর কমবেশি কালো থাবা বসিয়েছে। প্রচণ্ড ঝড়ে লন্ডভন্ড হওয়ার পর গাছপালা যেমন উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, অসংখ্যা পরিবারের অবস্থা ঠিক তেমনই। এর মধ্যে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থী থাকা পরিবারগুলোতে অস্থিরতা চলছে। এসব শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শ্রেণিক​ক্ষে আনা জরুরি।

গত প্রায় এক বছরে মোবাইল ফোন, ট্যাব ও ল্যাপটপে শিক্ষার্থীর আসক্তি​ কতটা বেড়েছে তা চারপাশে তাকালেই টের পাওয়া যায়। চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, দেশে চশমাওয়ালার সংখ্যা অস্বাভাবিক বেড়েছে, শিক্ষার্থীদের অনেকেরই চোখের দৃষ্টিশক্তি ক্রমাগত লোপ পাচ্ছে। দিনভর এমনকি গভীর রাত পর্যন্ত এসব গ্যাজেট হচ্ছে শিক্ষার্থীর নিত্যসঙ্গী। অনেক মা-বাবাই এমন পরিস্থিতিতে অসহায়। সারা দিন মোবাইল ফোন বা ট্যাব হাতে সন্তান কী করছে, কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে, তার মনমানসিকতায় কী প্রভাব ফেলছে, এসব নিয়ে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তার অন্ত নেই।

এই প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হোক। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলা ও শিক্ষার্থীদের তা মানতে উদ্বুদ্ধ করা বা প্রয়োজনে বাধ্য করার দায়িত্বটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। কোনো শিক্ষার্থী অসুস্থ হলে অভিভাবকের উচিত তাকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে না পাঠানো, শিক্ষকের দায়িত্ব তাকে বুঝিয়ে বাসায় বা বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া। মাস্ক ব্যবহার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখা এবং শরীরের তাপমাত্রা দেখাসহ কিছু স্বাস্থ্যবিধি ​মেনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান চালু করলে শিক্ষাবিদ, অভিভাবক থেকে শুরু করে আমজনতারও আপত্তি থাকবে না। গত দেড়-দুই মাসে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলা যাবে না, এমন মতামত কিন্তু কেউ দেননি। অতএব, জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণের মতামত শুনুন। শিক্ষার্থীদের বিষয়ে সরকার আন্তরিক ও সহানুভূতিশীল, করোনাকালেও তা প্রমাণিত। কিন্তু অতি সতর্কতার ফলে সামাজিক অস্থিরতা কাম্য নয়।

শরিফুজ্জামান পিন্টু, সাংবাদিক

শেয়ার করুন

ঘাতক বিষয়ে কিছু কথা

একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের সময়মতো বিচার করা হয়নি বলে তারাই দেশের রাজ–কার্যাবলির সঙ্গেও যুক্ত হতে পেরেছিল একদা। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এসেছিল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের দলের দুই ঘাতক এ দেশের মন্ত্রীও হয়েছিল। একে বিজয়ের পরাজয় বলে মনে হয়েছিল অনেকের কাছেই। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে আবার আশার আলো জ্বলে উঠেছিল মানুষের মনে। একাত্তরের ঘাতকদের মধ্যে যারা ছিল পালের গোদা, তাদের অনেকেরই বিচার হয়েছে।

এ কথা এখন অনেকেই বলে থাকেন, বাংলাদেশ হচ্ছে পৃথিবীর একমাত্র দেশ, যে দেশে স্বাধীনতার পক্ষের শক্তি আর বিপক্ষের শক্তি আছে। কথাটা খুবই সত্য ও ভয়ংকর। যে জাতি তার বীরদের শ্রদ্ধা করে না, সরকার পরিবর্তন হলেই বীর পরিবর্তন হয়; সে জাতির মতো অভাগা জাতি আর একটিও নেই। এ ধরনের অভাগা জাতি তার ভাগ্য পরিবর্তন করবে কীসের ওপর ভর করে? এ রকম হিংসা আর শত্রুতা নিয়ে কি দেশ গড়া যায়?

একই সঙ্গে এ কথাও তো বলতে হয় যে, ১৯৭১ সালে যে যুদ্ধের আপাত সমাপ্তি ঘটেছিল, সে যুদ্ধ আসলে চলমান এবং সেই চলমান বিষয়ই ধীরে ধীরে পরাজিত ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদকেই আবার প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে এই দেশে। আমাদের মাথার সামনের দিকে মনে হয় চোখ নেই, চোখ পিছনে; তাই কোনদিকে কীভাবে চলছি, সে ব্যাপারে আমাদের মনে প্রশ্নেরও উদয় হয় না। ফল হয় একটাই, দ্রুত পশ্চাৎপদ ভাবনার মধ্যে নিজেদের ভাসিয়ে দিয়ে এক মহা সংকটের জন্য অপেক্ষা করা।

যে মূলমন্ত্র নিয়ে এ দেশে একদা মুক্তির সংগ্রাম হয়েছিল, সে মূলমন্ত্রগুলো জাতির সমবেত মস্তিষ্ক থেকে সমূলে বিলুপ্ত হওয়ার পথে। শুধু প্রচারণা বা প্রচার দিয়ে তো আর সত্য প্রতিষ্ঠিত করা যায় না, প্রতিষ্ঠার জন্য চাই সত্যিকার গভীরতা ও সত্য। মিথ্যাকে বা অর্ধমিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রকাশ করলে অধঃপাতে যাওয়া ছাড়া তো আর কিছুই থাকতে পারে না। তাই যারা অপরাধ করেছে, তাদের অপরাধগুলোকে তথ্যভিত্তিক করা, মানুষকে জানানো, কোন অপরাধের জন্য তাকে আমরা দোষী বলছি। তাদের ঘৃণ্য আদর্শের জন্য পৃথিবীজুড়ে যদি নাৎসি ও ফ্যাসিস্টদের অপরাধের কথা এখনও বলা হয়ে থাকে, তাহলে আমাদের এই ঘাতকেরা আর কতকাল তাদের নিষ্পাপ চেহারা নিয়ে দেশবাসীর মায়া অর্জন করে যাবে? আমি কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, ‘আহা রে! কতদিন আগের কথা! ওদের ক্ষমা করে দিলেই তো হয়!’

ক্ষমা করে দিলে আসলে হয় না। মানুষকে খুন করা, তার ভিটেমাটি পুড়িয়ে দেওয়া, তাকে জাতিগতভাবে ঘৃণার শিকারে পরিণত করার সঙ্গে যারা যুক্ত ছিল, তাদের জন্য জিরো টলারেন্সই একমাত্র সত্য। তা পালন করতে না পারলে পরবর্তীকালের নৃশংসতাগুলোও ক্ষমার আওতায় পড়ে যাবে।

এখানেই একটা কথা পরিষ্কার করে বলি, যেকোনো সরকারের সময় যেকোনো মানবতাবিরোধী কাজেরই বিচার হওয়া উচিত। জবাবদিহি না থাকলে রাষ্ট্র তার চরিত্র হারায়। না চাইলেও ফ্যাসিবাদ এসে জায়গা করে নেয় দেশের শ্বাস–প্রশ্বাসে। এ কারণেই আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া আদি পাপের বিচার জরুরি।

স্বাধীনতার পর কী করলে কী হতো, সে বিতর্কে এখন আর লাভ নেই। বরং এখনও যা অবশিষ্ট আছে, তা নিয়ে কীভাবে এগিয়ে যাওয়া যায়, সেটাই বিবেচনায় আনা উচিত।

যে সত্য আমরা জানি, তা নিয়েও কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। একাত্তরের ঘাতক ও দালালদের সময়মতো বিচার করা হয়নি বলে তারাই দেশের রাজ–কার্যাবলির সঙ্গেও যুক্ত হতে পেরেছিল একদা। বিএনপির সঙ্গে জোট করে ক্ষমতায় এসেছিল জামায়াতে ইসলামী এবং তাদের দলের দুই ঘাতক এ দেশের মন্ত্রীও হয়েছিল। একে বিজয়ের পরাজয় বলে মনে হয়েছিল অনেকের কাছেই। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হলে আবার আশার আলো জ্বলে উঠেছিল মানুষের মনে। একাত্তরের ঘাতকদের মধ্যে যারা ছিল পালের গোদা, তাদের অনেকেরই বিচার হয়েছে। এদের একটা অংশ অবশ্য বিচারকাজ শুরু হওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করেছে, ফলে তারা তাদের কৃতকর্মের শাস্তি না পেয়েই পৃথিবী ছাড়তে পেরেছে।

দুর্ভাগা বাংলাদেশের কথাই বললাম। এবার সেই দুর্ভাগ্য যে আরও অনেকের জন্য প্রযোজ্য, সে কথা না বললে এই আলোচনাটি থেকে যে প্রশ্নটি উঠে আসবে, তা নিয়ে বিতর্ক করার মতো রসদ পাওয়া যাবে না।

২.

ঘাতকদের বিচারের ব্যাপারে আমরা প্রায়ই একটা উদাহরণ দিয়ে এসেছি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অপকর্মের সঙ্গে যুক্ত নাৎসি আর ফ্যাসিস্টদের ব্যাপারে পৃথিবীর যেকোনো দেশে জিরো টলারেন্স দেখানো হয়। আমরা বলে এসেছি, ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের কথা, টোকিও ট্রায়ালের কথা। সেসব অভিজ্ঞতা সঙ্গে নিয়েই চলেছে আমাদের ঘাতকদের বিচারকাজ। কিন্তু একটি দিক রয়ে গেছে আমাদের চোখের আড়ালে। সত্যিই কি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে লাখ লাখ মানুষের হত্যাকারী নাৎসি ও ফ্যাসিস্ট সদস্যদের ঘৃণার চোখেই দেখা হয়েছে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়ার অঙ্গীকার কি বাস্তবায়িত হয়েছে?

আমরা যুক্তরাষ্ট্রের কথা বলতে পারি। যুক্তরাষ্ট্রেও নাৎসিদের ব্যাপারে জিরো টলারেন্স দেখানোর কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সেখানে নাৎসিদের একটি অংশ মার্কিন অনুমতি নিয়েই সে দেশে ঢুকেছে, বহাল তবিয়তে সেখানে করে খাচ্ছে। ফলে নাৎসিদের ব্যাপারে যে সতর্ক ও ক্ষমাহীন দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলা হয়, সেটা একটা চক্ষুধোলাই কি না, কে জানে।

এখন আমরা দেখতে পাচ্ছি, স্বার্থের কারণে নাৎসিদের ব্যাপারেও চোখ বন্ধ করে থাকে যুক্তরাষ্ট্র। এত যে হম্বিতম্বি, তারপরও পেশাদার, বুদ্ধিদীপ্ত নাৎসিদের নাগরিকত্ব দিয়ে কাজে লাগিয়েছে তারা। সম্প্রতি নাৎসিদের নির্যাতন শিবিরের রক্ষী ফ্রিডরিখ কার্ল বারগারকে যুক্তরাষ্ট্র–ছাড়া করার পর অনেকেই সরকারকে বাহবা দিয়েছে। অনৈতিকভাবে এই নাৎসিদের তোষণ করার বদলে দেশছাড়া করার এই প্রক্রিয়া যেন চলতে থাকে, সে আশা পোষণ করছে মার্কিন নাগরিকদের সচেতন অংশটি। মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল মন্টি উইলকিনসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রশংসা করে বলেছেন, ‘আমেরিকা নৃশংস নাৎসিদের পালানোর জায়গা হতে পারে না।’

৩.

ঘটনাটি কী করে ঘটল?

এর সহজ উত্তর হলো, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরই পৃথিবী মার্কিনি ও সোভিয়েতদের মধ্যে যে ঠান্ডা যুদ্ধ দেখেছে। এই ঠান্ডা যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য মার্কিনিরা অবাধে মানবতাবিরোধী অপরাধীদের মার্কিন দেশে অবাধে প্রবেশের ব্যবস্থা করে দিয়েছে।

এ কথা অস্বীকার করা যাবে না, জার্মান বাহিনীকে পরাজিত করার ক্ষেত্রে যারা মুখ্য ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র অন্যতম। হিটলারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ৪ লাখ মার্কিনি নিহত হয়েছে। এই বিষণ্ন ও শোকাহত ঘটনাবলির পর যা হওয়া উচিত ছিল, তা না হয়ে বরং নাৎসি তোষণ শুরু হলো যুক্তরাষ্ট্রে। নাৎসিদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠল দেশটি।

কয়েকটি বিষয়ের উল্লেখ করলে কথাগুলো বোঝা সহজ হবে।

নাৎসি ও এসএস বাহিনীতে যারা ছিল, যারা নির্যাতন শিবিরগুলো পাহারায় ছিল, যারা নির্যাতনে অংশ নিয়েছে, এমনকি নাৎসি সরকারে ছিল, তাদের অনেকেই আশ্রয় পেয়েছে এই দেশটিতে। শুধু আশ্রয় দিয়েই ক্ষান্ত হয়নি মার্কিনিরা, তাদের যেন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে না হয়, সে ব্যবস্থাও করেছে।

এ কারণেই কেউ কেউ প্রশ্ন করেছে, ১৬১৯ সালে আফ্রিকা থেকে ক্রীতদাস বানিয়ে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষদের এই দেশে নিয়ে আসা থেকে শুরু করে যে অন্যায় করা হয়েছে, সেগুলোর কাছে পৌঁছাতে হলে ১৯৪৫ সালের মধ্য দিয়ে যেতে হবে। নইলে সত্যের নাগাল পাওয়া দুরূহ হয়ে উঠবে।

এ কথা তো এখন আর অজানা নেই যে, তৃতীয় রাইখের ১২০ জন বিজ্ঞানীকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছিল যুক্তরাষ্ট্র। অপারেশন পেপারক্লিপ নামে তা পরিচিত ছিল। এই নাৎসি বিজ্ঞানীরা কাজ করেছিল নাসায়। এদের মধ্যে ফন ব্রাউনের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হয়।

যখন মার্কিনিরা চাঁদে অবতরণ করল, তখন ফন ব্রাউন আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা হয়ে উঠল সুপারস্টার। পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত সবাই তাদের তারিফ করতে শুরু করল।

এ কথা ভাবলে ভুল হবে যে, ফন ব্রাউন আর তার সাঙ্গপাঙ্গরা মূলত অ্যাবসেন্ট মাইন্ডেড প্রফেসর এবং তারা প্রত্যেকেই রাজনীতির বলি। কখনওই না। তারা মহানন্দে হিটলারের হাতে তুলে দিয়েছিল রকেট, যা দিয়ে লন্ডনের শান্তিকামী মানুষদের হত্যা করেছিল নাৎসিরা। ধ্বংস করে দিয়েছিল বাড়ির পর বাড়ি, শহরের পর শহর। নির্যাতন শিবিরের বন্দিদের বাধ্য করা হয়েছিল এই রকেট বানানোর জন্য। সাক্ষী আছে, যারা বলেছে ফন ব্রাউন সেসব কারখানায় যেতেন। সেসব কারখানায় বন্দিদের অমানুষিকভাবে পেটানো হতো এবং ক্রীতদাসের মতোই তাদের সঙ্গে ব্যবহার করা হতো। ফন ব্রাউন নিজেও বলেছেন, এসব বন্দির ইচ্ছার বিরুদ্ধে রকেট বানাতে বাধ্য করা হতো।

এই বিজ্ঞানীরা ছিলেন নাৎসি, কিন্তু মার্কিন সরকারের মাথায় ছিল মহাশূন্যের যুদ্ধে জয়ী হতে হবে তাদের। অন্যদিকে ব্রিটেন আর সোভিয়েত ইউনিয়নও তৃতীয় রাইখ থেকে কখনও কখনও পিস্তলের মুখেও বিজ্ঞানীদের তুলে এনেছে।

ইউক্রেনের দালাল ইয়ারোস্লাভ স্তেৎস্কো নাৎসিদের স্বাগত জানিয়ে কত ইহুদিকে হত্যা করেছে, এর হিসাব নেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে স্তেৎস্কো লিখেছিলেন, জার্মানির আদলে ইউক্রেনের ইহুদিদের হত্যা করার অঙ্গীকারের কথা। তিনি পালিয়ে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রে, সেখানে ওয়াশিংটনের উচ্চশ্রেণির রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গেই ছিল তার দহরম মহরম। রোনাল্ড রিগ্যান ও জর্জ বুশ (সিনিয়র) তার মধ্যে দেখেছিলেন একজন তুখোড় কমিউনিস্ট–বিরোধীকে, আর তাতেই তারা ছিলেন আহ্লাদিত।

কমিউনিজমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার অভিপ্রায়েই পশ্চিমারা নাৎসিদের এতটা প্রশ্রয় দিয়েছে।

৪.

এতগুলো কথা বললাম হতাশা থেকে। রাজনীতির কারণে পৃথিবীর সর্বত্রই নৃশংস লোকেরা পার পেয়ে যায়। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ করে যদি কেউ পার পেয়ে যায়, তাহলে শান্তির সব হিসাব–নিকাশই পাল্টে যায়।

এ কারণেই যেকোনো অপরাধীকে আগে তার অপরাধী পরিচয়েই দেখতে হবে। সে কোন দল করে, সেটা দেখার দরকার নেই। বিচার বিভাগ কাজ করবে নিজের মতো। শাসক দল যেন কোনোভাবেই বিচার বিভাগের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু পৃথিবীর সর্বত্রই এখন উগ্রবাদ আবার ঘনীভূত হচ্ছে। ক্ষমতায় থাকার জন্য ছলেবলেকৌশলে কী না করে যাচ্ছে শাসক দলগুলো! এই গভীর অসুখ থেকে বের হয়ে আসতে হলে আইনের শাসন খুব দরকারি।

এই মুহূর্তে সেটা পৃথিবীর আনাচ–কানাচে খুঁজে দেখলেও খুব একটা মিলছে না।

ঘাতকদের নিজের ছায়ায় রাখলে তা দৈত্য হয়ে ঘাড় মটকাবার জন্য প্রস্তুত হবেই।

লেখক: গবেষক, কলাম লেখক-সাংবাদিক

শেয়ার করুন

টিকায় বদলাচ্ছে প্রচলিত প্রেক্ষাপট

করোনায় ইউরোপ-আমেরিকার শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোও যেখানে নাকানি-চুবানি খেয়েছে; অর্থনীতির বারোটা বেজেছে—সেখানে তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি যথেষ্ট কম। এর প্রধান কারণ সরকারের, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা এবং তার দৃঢ়চেতা মনোবল। প্রথম দফাতেই বাংলাদেশ যে করোনার টিকা পেল, সেখানেও ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকাই মুখ্য।

২৩ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার সকালে করোনার টিকা নিতে যাই রাজধানীর শ্যামলিতে জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে, যেটি মূলত পঙ্গু হাসপাতাল নামেই পরিচিত। আগে যেখানটায় আউটডোর ছিল, সেই জায়গাটি এখন টিকাকেন্দ্র। পরিপাটি। গোছানো। পরিচ্ছন্ন। কোনো ভিড় নেই। অনেকগুলো বুথ। ফলে টিকা নিতে যাওয়া মানুষের অপেক্ষায়ও দীর্ঘ নয়।

কেন্দ্রে ঢুকতেই শরীরের তাপমাত্রা মাপার পরে স্বেচ্ছাসেবক টিকা কার্ড পরীক্ষা করে পাঠিয়ে দেন নির্দিষ্ট বুথে। সেখানে আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে কক্ষের ভেতরে গিয়ে টিকা গ্রহণ। সব মিলিয়ে ১০ থেকে ১৫ মিনিট। এরপর নার্সের পরামর্শ অনুযায়ী ৩০ মিনিট অপেক্ষা—যদি কোনো জটিলতা বা অসুস্থতা দেখা দেয়! যদিও টিকা নেয়ার পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়া বা জটিলতার সম্মুখীন হওয়ার কথা এখনও সেভাবে শোনা যায়নি।

যারা কাজ করছেন, তারা রেড ক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবী এবং এই কাজের জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তাদের আচরণ সুন্দর। মার্জিত। সব মিলিয়ে সরকারি হাসপাতালের সেবা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে সাধারণ ধারণা বা কমন পারসেপশন ও অভিজ্ঞতা—তার সঙ্গে করোনার টিকা ব্যবস্থাপনার এই চিত্র একেবারেই ভিন্ন। ফলে প্রশ্ন হলো, হাসপাতালটির এই জায়গাটিতে কিছুদিন আগেও যে আউটডোর ছিল, সেখানে কেন এমন পরিচ্ছন্নতা, এমন সুন্দর সেবা, কর্মীদের এমন আন্তরিকতা ছিল না? টিকাকেন্দ্রে যারা কাজ করছেন, তারা তো অন্য কোনো গ্রহ থেকে আসেননি। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? টিকাকেন্দ্রের এই ব্যবস্থাপনা দেশের পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে কেন প্রতিনিধিত্ব করে না?

এর মূল কারণ করোনার টিকাব্যবস্থাপনাটি সরকারের অগ্রাধিকার কর্মসূচি এবং যেহেতু করোনা একটি বৈশ্বিক মহামারি, ফলে এই সংকট বাংলাদেশ কীভাবে মোকাবিলা করছে, তার দিকে পুরো বিশ্বের নজর রয়েছে। দ্বিতীয়ত, করোনার শুরু থেকেই এর ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানারকম তর্ক-বিতর্ক এবং রাজনীতির মাঠ ঘোলা হয়েছে। অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগেরও শেষ নেই। ফলে করোনা ব্যবস্থাপনার কোথাও ন্যূনতম কোনো ত্রুটি থাকলে সেটি সরকারের বিরোধীপক্ষের জন্য যে বড় ইস্যু হবে—সরকার সেটি জানে। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে টিকা ব্যবস্থাপনায় সরকারের সর্বোচ্চ মহলের দৃষ্টি রয়েছে।

অস্বীকার করার উপায় নেই, প্রথম দফায় বিশ্বের হাতে গোণা যে কটি দেশ করোনার টিকা পেয়েছে, বাংলাদেশ সেই সামান্য সংখ্যক দেশের একটি। নিশ্চয়ই এটি বর্তমান সরকারের একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য। টিকা নিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে এখনও জনমনে যে কিছুটা অনাস্থা রয়ে গেছে, তার মূল কারণ টিকা নিয়ে প্রচারের চেয়ে অপপ্রচার বেশি হয়েছে। অনেকে এটিকে রাজনৈতিক ইস্যুও করতে চেয়েছেন। ফলে শত ভাগ মানুষ এখনও এই টিকার ব্যাপারে আস্থাবান নন। সেই বাস্তবতা মাথায় রেখেও এ কথা বলা যায়, করোনায় ইউরোপ-আমেরিকার শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোও যেখানে নাকানি-চুবানি খেয়েছে; অর্থনীতির বারোটা বেজেছে—সেখানে তুলনামূলক বিচারে বাংলাদেশে প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষতি যথেষ্ট কম। এর প্রধান কারণ সরকারের, আরও সুনির্দিষ্ট করে বললে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা এবং তার দৃঢ়চেতা মনোবল। প্রথম দফাতেই বাংলাদেশ যে করোনার টিকা পেল, সেখানেও ব্যক্তিগত এবং রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে শেখ হাসিনার ভূমিকাই মুখ্য। বিশ্বকেও এটি দেখানোর প্রয়োজন ছিল যে, বাংলাদেশ করোনার টিকা শুধু আগে পেয়েছে তাই নয়, বরং একটি সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে নাগরিকদের টিকা প্রয়োগের সক্ষমতাও বাংলাদেশের রয়েছে।

সুতরাং, যে দেশ এরকম একটি প্যানডেমিক বা অতিমারির ব্যবস্থাপনায় উদাহরণ সৃষ্টি করতে পারে, সেই দেশের হাসপাতালে গিয়ে মানুষ সেবা পাবে না; হয়রানির শিকার হবে; দালালের খপ্পরে পড়ে জানমাল খোয়াবে; জনগণের করের পয়সায় কেনা ওষুধ লুটপাট হয়ে যাবে; বালিশকাণ্ড ঘটবে—তা মেনে নেয়া যায় না। যে দেশ করোনার টিকাব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে রাতারাতি হাসপাতালের একটি অংশের চেহারা বদলে দিতে পারে, সেই দেশ নিশ্চয়ই হাসপাতালের অন্যান্য অংশেও একইরকম পরিবর্তন আনতে পারে।

আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে নাগরিকদের ক্ষোভ ও প্রশ্নের শেষ নেই। স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দী ধরে আমরা স্বাস্থ্য বা চিকিৎসাব্যবস্থার নামে কী গড়ে তুলেছি, সেটি করোনার মতো একটি অণুজীব এসে সবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ঘুরতে ঘুরতে মরে যাওয়ার একাধিক ঘটনা সংবাদ শিরোনাম হয়েছে।

করোনার প্রকোপ শুরুর পর থেকেই দাবি উঠছিল স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। হয়েছেও তাই। অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বেড়েছে। ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা বাজেটের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২৯ হাজার ২৭৪ কোটি টাকা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বরাদ্দকৃত অর্থ কোথায় কীভাবে খরচ হয়, সেটির খবর কি সাধারণ মানুষ জানে? বড় কোনো অনিয়ম দুর্নীতির খবর সংবাদমাধ্যমে না আসার আগে সেসব চোখের আড়ালেই থাকে। সাহেদ-সাবরিনার মতো কিছু লোক ধরা পড়েছেন। কিন্তু তারা কীভাবে অন্যায় করলেন, কাদের যোগসাজসে করলেন, কারা প্রশ্রয় দিয়েছেন—তার সঠিক ও নির্মোহ তদন্ত হয়েছে? শুধু সাহেদ-সাবরিনার নাম জানা গেছে। নাম না জানা এরকম মাফিয়ার সংখ্যা নেহাত কম নয়। তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই রাষ্ট্রের অনেক ‍গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিও রয়েছেন। ধরা না পড়ার আগপর্যন্ত তারা সাধু।

গত অর্ধ শতাব্দীতে যারা সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বড় বড় পদে ছিলেন, তারা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়নে আসলে কী করেছেন; বেসরকারি খাতে যে বড় বড় হাসপাতালের অনুমোদন দেওয়া হলো, সেগুলো হাসপাতাল না কসাইখানা—কী হিসেবে গড়ে উঠলো, রাষ্ট্র সেটি কোনোদিন খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করেছে? নাকি ঠিকাদারের তালিকা অনুযায়ী সরকারি হাসপাতালের কোটি কোটি টাকার কেনাকাটা এবং সেই টাকার ভাগ নেয়া আর সুন্দর সুন্দর ভবন নির্মাণকেই আমরা স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন হিসেবে ধরে নিয়েছি?

এতসব প্রশ্নের মধ্যে করোনার টিকাকেন্দ্র ব্যবস্থাপনার মতো ঘটনাগুলো আমাদের আশাবাদী করে। সেই আশাবাদে ভর করেই দেশবাসীর প্রত্যাশা, টিকাকেন্দ্রের মতোই বদলে যাবে দেশের সকল সরকারি হাসপাতালের জরুরি ও বহিঃবিভাগ, অপারেশন থিয়েটার, বেড ও কেবিনের চিত্র। রেডক্রিসেন্টের স্বেচ্ছাসেবকদের মতোই আন্তরিকভাবে সেবা দেবেন জনগণের করের পয়সায় বেতন হওয়া হাসপাতালের ডাক্তার, নার্সসহ সংশ্লিষ্ট সবাই। যদিও কাজটি খুব সহজ নয়। বছরের পর বছর ধরে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় যে অনিয়ম ও দুর্নীতির দুষ্টচক্র গড়ে উঠেছে, যে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বীজ এখন বিশাল বৃক্ষে পরিণত হয়েছে, তার শেকড় একদিনে উপড়ে ফেলা যাবে না। কিন্তু করোনার টিকাব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়ে যে পরির্তনটি দৃশ্যমান হলো, সেটিকে পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থায় পরিবর্তনের একটি শুভসূচনা হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

ad-close 103.jpg