মাস্কে মুখ ঢাকা, লিপস্টিক দিয়ে কী হবে

মাস্কে মুখ ঢাকা, লিপস্টিক দিয়ে কী হবে

করোনাকালে মেয়েদের প্রসাধনের ধরন পাল্টে গেছে। লিপস্টিক দিচ্ছেন না অনেকে। তার বদলে চোখের প্রসাধনের চাহিদা বেড়েছে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে মুখে মুখে মাস্ক। এই মাস্ক ঠোঁট ও নাকের অংশ ঢেকে রাখে। ফলে মেয়েদের প্রসাধনের একটি প্রধান উপকরণ লিপস্টিকের চাহিদা কমে গেছে। বেড়েছে চোখের প্রসাধন, যেমন আই-লাইনার, মাসকারা ইত্যাদি।

লিপস্টিকের কেনা-বেচা নিয়ে কথা হয় রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ব্যবহারকারী ও বিক্রেতাদের সাথে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার কথা হয় চলচ্চিত্র নির্মাতা অপরাজিতা সংগীতার সাথে। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি খুবই লিপস্টিক ফ্রিক মানুষ। এমন না একটা লিপস্টিক শেষ হওয়ায় পরে আরেকটা কেনা হয়। আমার আলমারিতে লিপস্টিকের জন্যই আলাদা একটা কর্ণার আছে। এখনও ২৫/৩০টা লিপস্টিক স্টকে আছে। তাও দেখা যেত শখের বশে, ড্রেস ম্যাচ করে অনেক সময় কোনো কারণ ছাড়াই কেনা হত।’

গত সাত আট মাসে একটা লিপস্টিকও কেনননি সংগীতা। কারণ বাজারেই যাওয়া হয় না। তার ওপরে মাস্কের কারণে ব্যবহার কম।

তিনি বলেন, ‘একটা জিনিস যদি দেখাই না যায়, তাহলে পরে কী লাভ? তার উপরে মাস্কের কারণে লিপস্টিক মাস্কের সঙ্গে লেপ্টে যায়, যা খুবই বিব্রতকর।’

কুড়িল এলাকায় কথা হয় অত্রি এথেনার সাথে। তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি বাসার নিচে নামলেও লিপস্টিক দিয়ে যেতাম। এখন মাস্ক দিতে হয়, কখন আবার জরিমানা করে। আর মাস্কের নিচে লিপস্টিক অস্বস্তিকর।’

তবে অনেকেই বলছেন, কেনা কম হলেও ব্যবহার একই আছে। লিপস্টিক ছাড়া নিজেকে চিন্তা করতে পারেন না অনেকে।

অত্রি বলেন, ‘শুরুর দিকে বেশি বদার করতো, মাস্কে একদম লেগে যেত। কারণ আমি ম্যাট লিপস্টিক পছন্দ করি না, সিল্কি ফিনিশিং পছন্দ করি। সেক্ষেত্রে আমার বেশি অসুবিধা হত। দেখতাম, মাস্ক খুলেছি ঠোঁটে মুখে লেগে গেছে। এখন লিপস্টিক আর মাস্ক মানিয়ে নিয়েছি।’

করোনায় আয় কম, লিপস্টিক কেনাও কম

রাজধানীর খিলক্ষেত এলাকায় কথা হয় কাজী আশফারুন্নাহার রিয়া ও আমেনা শিফার সঙ্গে।

রিয়া নিউজবাংলাকে বলেন, ‘যেহেতু মাস্কই পরে থাকতে হবে, দেখাই যাবে না লিপস্টিক, তাই লিপস্টিক দেয়া হয় না। তার উপরে শীত চলে আসছে, ম্যাট লিপস্টিক দেয়া যায় না। গ্লসিটাই দিতে হবে। মাস্কের সাথে গ্লসি আরও স্যুট করে না। সব মিলিয়ে খুব রেয়ার দিই।’

রিয়া বলেন, ‘সবচেয়ে বড় কথা, বাইরেই বের হই না। ভার্সিটি অফ, হাতখরচ নাই। আবার এখন তো অটো পাস দিয়ে দিচ্ছে, স্টুডেন্ট যা ছিল সেগুলোই নাই। স্টুডেন্ট পড়িয়ে বাড়তি ইনকাম থেকেই শখের জিনিস কেনা হতো। বিশেষ করে লিপস্টিক।’

আমেনা শিফা নিজের আয় থেকে একটি বড় বাজেট রাখেন লিপস্টিকের জন্য। গত বছরই চীন থেকে অর্ডারে কিনেছেন বিভিন্ন শেডের এক সেট লিপস্টিক। করোনার সময়ে চাকরি হারিয়েছেন তিনি।

তিনি বলেন, ‘গত সাত আট মাসে মাত্র একটা লিপস্টিক কিনেছি। গতবছরই টুকটাক কেনা ছিল, আবার এক সেট নিয়ে এসেছি বাইরে থেকে। এবার আর সেটার উপায় নাই।’

লিপস্টিকের চাহিদা মেটানো হচ্ছে মাস্কে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসিতে মাস্ক পরে বসে আছেন অপরাজীতা সংগীতা। কাস্টমাইজড মাস্কটিতে মূলত একটি নারীর ঠোঁটে টকটকে লাল রঙের লিপস্টিকের চিত্র।

তিনি নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ঘর থেকে বের হলেই লিপস্টিক দেয়া লাগে আমার। এখন একটু অসুবিধা হয় মাস্কের কারণে। তারপরেও মাঝেমধ্যে দিই। নয়ত মনে হয়, কী যেন নেই। মাঝেমধ্যে পরলেও সেটা তো মাস্কের কারণে ঢেকেই থাকে, দেখা যায় না। দিনশেষে ঐ কি যেন নেই। অনলাইনে দেখলাম এরকম লিপস্টিক-দেয়া মাস্ক। নিয়ে নিলাম। দুধের সাধ ঘোলে মিটানো।’

সামনে পারিবারিক একটি অনুষ্ঠান উপলক্ষে কাজিনরা মিলে ড্রেসের সাথে ম্যাচিং মাস্ক কিনতে যাচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘সাধারণত ড্রেসের সাথে ম্যাচিং করেই লিপস্টিক নিই পার্টি প্রোগ্রামের জন্য বিশেষ করে। কিন্তু মাস্ক যেহেতু পরতে হবে, সেক্ষেত্রে আমরা কাজিনরা চিন্তা করলাম কেননা আমরা পার্টি মাস্ক নিব। জামদানি ডিজাইনসহ নানান রকম পার্টি মাস্ক পাওয়া যায় এখন।’

সব অনুষ্ঠান ঘরোয়া

কথা বলতে চাইলে মাস্ক খুলে তড়িঘড়ি করে লিপস্টিক দিয়ে নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঐশী ঐশ্বর্য্য। বলেন, ‘আসলে লিপস্টিক ছাড়া আমার মনে হয় কি যেন নেই, একরকম শূণ্যতা মনে হয়। তবে মাস্কের জন্যই যত ঝামেলা। মাস্কের ভেতরটা সাদা থাকে, লিপস্টিক লেগে একদম একাকার হয়ে যায়। আবার লিপস্টিক ছাড়া চলেও না। তাই ব্যাগে ক্যারি করি।’

লিপস্টিক কেনা কমে যাওয়ার আরেকটি কারণ তুলে ধরেন ঐশী। তিনি বলেন, ‘সবমিলিয়ে এখন পার্টি প্রোগ্রাম, গেট টুগেদার বিয়ে কোনোকিছুতেই অ্যাটেন্ড করা হয় না। আবার ঘরোয়াভাবে করায় ক্লোজ ছাড়া কাউকে দাওয়াতও দেয়া হয় না। মানে ঘরের লোক আর অল্প কিছু আত্মীয়স্বজন। আগে তো ক্যাম্পাসের বড় ভাই-আপুরা বিয়ে করলেও দাওয়াত পেতাম।’

আমেনা শিফা নামে এক তরুণী বলেন, ‘বিয়ের অনুষ্ঠান বন্ধ নেই। কিন্তু ট্রেন্ড হয়ে গেছে, “ঘরোয়া অনুষ্ঠানের”। দাওয়াত যেখানে পাওয়ার কথা, সেখানেও পাচ্ছি না।’

সরবরাহ নেই, দাম বেশি

আমেনা শিফা জানান, আগে তিনি অনলাইন গ্রুপগুলোতে রিভিউ দেখে ভালো লাগলে লিপস্টিকের অর্ডার দিতেন। এখন অনলাইনে এগুলোর দাম বেড়ে গেছে। সরবরাহকারীরা বলছেন, বাইরে থেকে পণ্য আনার খরচ বেড়ে গেছে।

অপরাজিতা সংগীতা বলেন, ‘অনলাইন থেকে মূলত আমি বাইরের ব্র্যান্ডের লিপস্টিক কিনতাম। এখন দাম বাড়িয়েছে। দেখা যাচ্ছে ১২শ টাকার লিপস্টিক এখন ২২শ টাকায় বিক্রি করছে।’

মনোযোগ চোখের প্রসাধনীতে

অপরাজিতা সংগীতা জানান, যারা আগে চোখের প্রসাধনের ব্যাপারে অমনোযোগী ছিলেন, তাদের এখন মনোযোগ চলে গেছে কাজল আর আইলাইনারের দিকে।

তিনি বলেন, ‘আমার লিপস্টিকের প্রতি যে আগ্রহ ছিল, তা খানিকটকা কাজলের দিকে চলে গেছে। মুখ যেহেতু ঢাকাই থাকে, সেক্ষেত্রে নিজেকে ভালো বা সুন্দর দেখানোর যে বিষয়টা সেটা চোখের সাজুগুজোতে ট্রান্সফার হয়েছে। তাছাড়া আগে আমি শাড়ির সাথেই কেবল টিপ পরতাম, এখন এমনিতেও পরছি।’

ক্রেতার চাহিদার কথা ভেবে প্রসাধন প্রস্তুতকারী সংস্থাগুলিও জোর দিচ্ছে আই-লাইনার, মাসকারা অথবা আই-শ্যাডোয়।

ঢাকা নিউ মার্কেট, যমুনা ফিউচার পার্ক ও ধানমন্ডি এলাকার প্রসাধনী দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, দোকানিরা লিপস্টিকের তুলনায় চোখের প্রসাধনী, যেমন মাসকারা, কাজল, আইলাইনার বিক্রিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন বেশি।

নিউ মার্কেটের অলিভ জুয়েলারির বিক্রেতা আসিফ খন্দকার বলেন, ‘মেয়েরা তো সাজগোজ করে নিজেরে লুকায় রাখার জন্য না। কিন্তু মাস্কে মুখ ঢাইকা থাকে। আমাদের মনে হইলো তখন তারা চোখের জিনিস বেশি কিনবে। হইছেও তাই। গত কয়েকমাসে আমি মাসকারা আর কাজল বিক্রি করছি বেশি। লিপস্টিকের বেচা কম।’

ভারতীয় অলঙ্কার বিক্রেতা সোবহান মিয়া বলেন, ‘আমরা লিপস্টিক আনতেছিও কম। লটের মাল ফেরতও দিছি। ফেরত দিয়া সেই টাকায় আইলাইনার নিছি। এখন এগুলা চলে বেশি। লিপস্টিকের জন্য ডাকাডাকি করলে মেয়েরা বলে, মাস্ক পিন্দি, লিপস্টিক দিমু কই।’

যমুনা ফিউচার পার্কের ফ্যাশন হাবের মালিক রব মিয়া জানান, প্রসাধনী আমদানি করা হয় চাহিদা বুঝে। করোনায় লিপস্টিকের চাহিদা কম, খালি চোখেই বোঝা যায়। তাই তিনি চোখের প্রসাধনী দিয়ে দোকানের সম্মুখভাগ সাজিয়েছেন।

সারা বিশ্বে লিপস্টিক বিক্রি কমেছে

টুইন টাওয়ার হামলার পরপরের কথা। আমেরিকায় তখন মন্দা চলছে। মানুষ ঘর থেকে বের হয় কম। এরই মধ্যে বিখ্যাত প্রসাধন কোম্পানি এস্টি লডারের চেয়ারম্যান লিওনার্দ লডার ঘোষণা দিলেন, এই মন্দা কিচ্ছুটি করতে পারেনি তার লিপস্টিক ব্যবসায়। বরং মন্দায় তার দামি লিপস্টিক বিক্রি আরও বেড়েছে।

এস্টি লডার কোনো যেনতেন ব্র্যান্ড নয়। তাদের একেকটি লিপস্টিকের দাম শুরুই হয় ১০ ডলার বা ১২ ডলারে। মন্দার কালেও তাদের লিপস্টিকের বিক্রি কমেনি। কিন্তু এবার করোনায় এস্টির সেই গর্বে আঘাত লেগেছে। সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তাদের প্রসাধনসামগ্রী বিক্রি কমেছে ৬১ শতাংশ। এর মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থা লিপস্টিকের। একই অবস্থা অন্যান্য বড় ব্র্যান্ডেরও। কর্মী ছাঁটাই, আউটলেট বন্ধ করেও ঠেকাতে পারছে না ক্ষতি।

এস্টি লডারের ওয়েবসাইটে ঢুকে দেখা যায়, সকল পণ্যের উপরেই ছাড় দেয়া রয়েছে।

শেয়ার করুন

মন্তব্য