শ্রমিকের জীবন কি এতই ঠুনকো

শ্রমিকের জীবন কি এতই ঠুনকো

এমনিতেই করোনাকালে সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার ওপর বিদেশফেরত বেকার শ্রমিকরা চাপ বাড়াচ্ছে। তাদের নিয়ে না ভাবলে আগামীতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশফেরত শ্রমিকদের তিনি কর্মসংস্থান ও নগদ সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহৎ ও সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চয়ই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য সুসংবাদ।

যাদের শ্রম-ঘাম-রক্তে বড় অর্থনীতির ভিত রচিত হয়, বদলে গিয়ে ভাবমূর্তি বেড়ে যায় দেশের, সেই শ্রমিকদেরই কোনো দাম নেই যেন আমাদের কাছে। জলের দামেই বিক্রি হয় তাদের শ্রম-ঘাম-জীবন। নিয়োগকারী মালিকদের অবহেলা কিংবা দুর্ঘটনায় শ্রমিকদের মৃত্যু হলে পশুর দামের চেয়েও কম ধরা হয় তাদের লাশের দাম। অথচ যারা দেশকে লুটেপুটে খাওয়ার উৎসব করে দাম তাদেরই বেশি। দামি তারাই যারা ব্যাংক লুট করে ঋণখেলাপি হন, শেয়ারবাজার কেলেংকারিতে জড়িত থেকেও অর্থনীতির নায়ক হয়ে ওঠেন, দেশের অর্থপাচার করে বিদেশে সুরম্য বাড়ি বানান।

তারাই সম্মানিত যারা ক্ষমতার জোরে খুন-ধর্ষণ করে পার পেয়ে যান, সুইসব্যাংকে অর্থের পাহাড় গড়েন। এসব ‘দামি’ লোকদেরই সর্বত্র ফুল দিয়ে বরণ করা হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশে শোষিত-নিপীড়িতদেরই দাম পাওয়ার কথা ছিল। তাদেরই স্বীকৃতি পাওয়ার কথা ছিল জাতির অগ্রনায়ক, উন্নয়নের কারিগর হিসেবে।

দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে সস্তা শ্রমের বাংলাদেশে শ্রমিকদের শ্রম-ঘাম শোষণ করেই যে আমরা উন্নয়নশীল থেকে মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছি এটা আর অস্বীকার করার উপায় নেই। তৈরি পোশাকখাত, প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স এবং কৃষিখাতের শ্রমিকদের শ্রমের ওপর ভর করেই যে দেশে আজ প্রবৃদ্ধি আর মাথাপিছু সম্পদের স্ফীতি- সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাদের শ্রম শোষণ করেই গড়ে উঠছে আমাদের এই চোখ ধাঁধানো নগরগুলো। অথচ সেই শ্রমিকদেরই জীবনই সুতোয় বাঁধা, স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি তাদের নেই। জীবন যেন তাদের জল নিংড়ে নেয়া কাপড়ের মতোই।

অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত হয়েছেন শ্রমিকরাই। সবচেয়ে বেশি শোষণের শিকার হতে হয়েছে প্রান্তিক মানুষদের। ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা অবৈধপথে রাতারাতি ভাগ্য বদলে ফেলেছেন দেশের সবচেয়ে লোভী ও স্বার্থপররা। হঠাৎ আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়া লোকের সংখ্যাও বেড়েছে হু হু করে। শহরে শহরে তৈরি হয়েছে বিশাল চোখ ঝলসানো অট্টালিকাও।

গেল প্রায় দেড় দশকেই দেশে বিস্ময়করভাবে জন্ম হয়েছে অর্ধসহস্রাধিক নতুন ধনকুবের। শ্রমিকের শ্রম-ঘামে তিলোত্তমা হিসেবে গড়ে ওঠা শহরগুলোতে ভোগের উপচেপড়া পেয়ালায় চুমুক দিয়ে যাচ্ছেন নব্যধনীরা। অথচ গেল পঞ্চাশ বছরেও ভাগ্যের বদল হয়নি উন্নয়নের কারিগরদের। কেননা, প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে তাদের শ্রম-ঘামের অর্থ লুটে-পুটে খাচ্ছেন নব্যধনী, শিল্পপতি, ঋণখেলাপি, বেপরোয়া আমলা থেকে পাতি নেতা পর্যন্ত। শ্রমিকদের ভাগ্য যেন বানরের সেই পিঠা ভাগের গল্পের মতোই রয়ে গেল।

বাজারে প্রতিনিয়ত চাল-ডাল-নুন-তেলের দাম বাড়লেও শ্রমিকের শ্রমের দামের পারদ কিছুতেই ঊর্ধ্বমুখী হয় না। তৈরি পোশাক খাতের শ্রমিকদের জলের দামের শ্রমেই কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আসে দেশে, হু হু করে বাড়ে প্রবৃদ্ধি। প্রতিবছর বাজেটের আকারও দ্বিগুণ-তিনগুণ বাড়ে। অথচ শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই শিল্পপতি কিংবা সরকারের। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে দেয়া শ্রমিকদের জায়গা সমাজের সবচেয়ে পেছনের সারিতে। তাদের শ্রম-ঘামের উৎকট গন্ধ থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকেন শিল্পপতিরা। পথে-ঘাটে যেতে আসতে যে কেউ-ই যেন অধিকার রাখেন নারী শ্রমিকদের ধর্ষণ করার! ভবঘুরে কিংবা বখাটেদের নিত্যদিনের হয়রানি, যৌননিপীড়নের শিকার হতে হয় তাদের। আবার বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ে পথে নামলেই পুলিশের লাঠিপেটা নির্ধারণ করা থাকে তাদের জন্য। তারা যে দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির জ্বালানি সে কথা আমাদের আচরণে প্রকাশই পায় না।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে হাসেম ফুড কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতদের পরিবার বা স্বজনরা ঠিকঠাকমতো সরকারঘোষিত সহায়তা পেয়েছে কি না, দায়ীদের বিরুদ্ধে আর কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সর্বস্ব হারানোদের পরিণতি কী- এসব নিয়ে আমাদের আর ভাববার সময় নেই। শ্রমিকরাও দেয়ালে কপাল ঠুকে মালিকদের অবহেলাকে ভাগ্য বলেই মেনে নেয়। গণমাধ্যমও নতুন কোনো খবর কিংবা ঘটনার টানে দৃষ্টিরাখে অন্যখানে। গেল দশ বছরে তাজরিন, রানাপ্লাজা, নিমতলী ট্রাজেডিতে যে সংখ্যক শ্রমিক লাশে পরিণত হয়েছে তার দ্বিগুণ হয়েছে গেল এক বছরে চুড়িহাট্টা, এফআর টাওয়ার, কেরানীগঞ্জের প্লাস্টিক কারখানা আর গাজীপুরের ফ্যানের কারখানার অগ্নিকাণ্ডে। শ্রমিকদের জীবনের দাম দিতে জানলে এই পরিসংখ্যান পেতে হতো না আমাদের। এসব ঘটনাই প্রমাণ করে কারখানায় মালিকদের গিনিপিগে পরিণত হয়েছে শ্রমিকরা। এসব অবহেলা, উদাসীনতা, অপরাধ আর হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে কথা বলতে শ্রমিকরা রাস্তায় নামলেই পুলিশি নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আবারও গিনিপিগ হিসেবে ঠাঁই তাদের সেই কারাখানাতেই।

এভাবেই শ্রমিকদের মৃত্যুর মুখে রেখে বছর বছর কারখানার উন্নতি হয়, শাখা বাড়ে, উৎপাদন বাড়ে, রপ্তানি বাড়ে, মালিকদের বিলাসিতা বাড়ে, প্রবৃদ্ধি বাড়ে, সরকারের ভাবমূর্তি বাড়ে। শুধুই আটকে থাকে শ্রমিকের শ্রমের দাম। হাড়ভাঙা খাটুনিতে ভেঙে যায় শরীর, শিকার হতে হয় অপুষ্টির। এক পর্যায়ে দক্ষতাও কমতে থাকে। শেষ অবধি অদক্ষ হিসেবে চাকরিচ্যুতিও ঘটে। এটাই আমাদের জাতির কারিগর শ্রমিকদের জীবনের প্রকৃতচিত্র।

যে চিত্র মধ্যযুগকেও হার মানায়। যা দেখে আঁতকে ওঠেন বিদেশি ক্রেতারা। মজুরি বাড়ানোসহ কর্মপরিবেশ উন্নত করার তাগিদ দিয়ে যান তারা। মালিকরা ‘জি জি’ বলে রপ্তানি আদেশ বাড়িয়ে নেন। ক্রেতাদের চাপ বা অনুরোধে কারখানার কর্মপরিবেশের দৃশ্যমান কিছু উন্নতি হলেও শ্রমিকদের মজুরি আর বাড়ে না, পাল্টায় না জীবনমান, বাড়ে না জীবনের দাম। সরকারও ব্যস্ত থাকে প্রবৃদ্ধি নিয়ে।

বিভিন্ন কলকারাখানায় নিয়োজিত স্থায়ী শ্রমিক ও প্রবাসী শ্রমিকেদের পাশাপাশি দিনমজুর বা মৌসুমী শ্রমিকদের জীবন-জীবিকারও কোনো নিশ্চয়তা নেই। কাজ পেলে খাওয়া, না পেলে উপোস- এমন নীতিতেই চলে তাদের জীবন। করোনা বিপর্যয়ে এসব শ্রমিকের জীবন অনিশ্চিত অন্ধকারে ঢেকে গেছে। মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন তারা। অনেকেই জীবিকার সন্ধানে সরকারি বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে পথে নেমে হয়রানির শিকার হচ্ছেন।

অস্থায়ী শ্রমভিত্তিক এসব শ্রমিকের নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যানই নেই সরকারের কাছে। তথ্যভাণ্ডারের অভাবেই সরকারি সহায়তাও পৌঁছাচ্ছে না অনেকের কাছে। বেওয়ারিশ লাশের মতোই এদের জীবন হয়ে পড়েছে। একইভাবে বলা যায়, পোশাক খাতের মালিকরা সরকারি সহায়তা পেয়ে যেভাবে নিজেদের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে নিচ্ছেন শ্রমিকরা কি সেই সুফল পাচ্ছেন? এটা ভাবা জরুরি।

অপরদিকে, করোনা মহাবিপর্যয়ের মধ্যেও দফায় দফায় প্রবাসী আয়ের রেকর্ডের বন্যা বইয়ে দেয়া প্রবাসী শ্রমিকদেরও দাম নেই আমাদের কাছে। টাকা বানানোর মেশিন ছাড়া তাদের আর কিছুই ভাবতে পারি না। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে তারা বছরের পর বছর বিস্ময়কর রেমিট্যান্সের জোগান দেন। অথচ সমাজে তো বটেই জাতীয় জীবনেও তারা অবহেলার শিকার। ভিটেমাটি বিক্রি করে বিদেশ যাওয়ার সময়ই তাদের অনেকে দালাল কিংবা আদম ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারায়। বিমানবন্দরে নাজেহাল হওয়াসহ বিদেশে গিয়েও প্রতারণার শিকার হতে হয়। করোনাকালে দেশে ফিরে বাধ্যতামূলক কোয়ারেন্টাইনে রাখার সময়ে অপ্রীতিকর এক ঘটনার সময় রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের প্রতিক্রিয়া তাদের প্রতি সীমাহীন অবহেলারই প্রমাণ।

তথ্যমতে, করোনা মহামারি দুর্যোগে বিদেশে কাজ হারিয়ে দেড় বছরে দেশে ফিরেছেন পাঁচ লাখের বেশি শ্রমিক। বিদেশে সঞ্চিত সব সম্বল নিয়েই তারা ফিরে এসেছেন। এতে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স-প্রবাহ ফুলে ফেঁপে বার বার রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে। তবে তারা কাজ হারিয়ে দেশে ফিরে কী করছেন, সঞ্চয় শেষে তারা কীভাবে চলবেন, পরিবারকে কীভাবে সামাল দেবেন তা নিয়ে আমাদের কারো মাথাব্যথা নেই। এমনিতেই করোনাকালে সব ধরনের নিয়োগপ্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় ঘরে ঘরে বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। তার ওপর বিদেশফেরত বেকার শ্রমিকরা চাপ বাড়াচ্ছে।

তাদের নিয়ে না ভাবলে আগামীতে ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। তবে এমন পরিস্থিতিতে আশার কথা শুনিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিদেশফেরত শ্রমিকদের তিনি কর্মসংস্থান ও নগদ সহায়তার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর এই মহৎ ও সময় উপযোগী পদক্ষেপ নিশ্চয়ই রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের জন্য সুসংবাদ। তবে কথা হলো, শ্রমিক বা অসহায়দের জন্য বঙ্গবন্ধুকন্যার মন যেভাবে কাঁদে সেভাবে কি আমলা ও নেতাদের মন সাড়া দেয়? যদি শ্রমিকদের সহায়তা মাঝপথেই নাই হয়ে যায়! যেমনটি ঘটেছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বেলায়!

লেখক: কবি ও সাংবাদিক

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

মন্তব্য

ইকবাল যেন না হন জজ মিয়া

ইকবাল যেন না হন জজ মিয়া

ইকবাল যদি আসলেই অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি যে কেবল মাঠের অ্যাসাইনমেন্টই বাস্তবায়ন করেছেন এবং তার পেছনে যে বিরাট শক্তি রয়েছে— তাতে সন্দেহ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সাংবাদিকদের বলেছেন, কাজটি পরিকল্পনামাফিক করা হয়েছে। দুই থেকে তিনবার যাওয়া– আসার মধ্যে তিনি এই কর্মটি শেষ করেছেন। কাজেই এটি নির্দেশিত হয়ে কিংবা কারো প্ররোচনা ছাড়া এটি করেছেন বলে তারা এখনও মনে করেন না।

বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে হত্যার উদ্দেশ্যে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে তার সমাবেশে যে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়, সেই মামলার তদন্ত ভিন্নখাতে নিতে ২০০৫ সালের ৯ জুন নোয়াখালীর সেনবাগ থেকে ধরে আনা হয় জজ মিয়া নামে এক যুবককে। তাকে ১৭ দিন রিমান্ডে রেখে, ভয়ভীতি ও প্রলোভন দেখিয়ে তার কাছ থেকে একটি সাজানো জবানবন্দি আদায় করে সিআইডি। ২০০৫ সালের ২৬ জুন আদালতে দেয়া ওই কথিত স্বীকারোক্তিতে জজ মিয়া বলেছিলেন, তিনি আগে কখনও গ্রেনেড দেখেননি; গ্রেনেড ও বোমার মধ্যে পার্থক্য তিনি জানেন না।

পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে বড় ভাইদের নির্দেশে তিনি অন্যদের সঙ্গে গ্রেনেড হামলায় অংশ নিয়েছেন। ওই বড় ভাইয়েরা হচ্ছেন শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইন, জয়, মোল্লা মাসুদ, মুকুল প্রমুখ। তবে এই জবানবন্দির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন ওঠে। পরের বছর ২০০৬ সালের আগস্টে আসল ঘটনা ফাঁস করে দেন জজ মিয়ার ছোট বোন খোরশেদা বেগম। তিনি জানান, জজ মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর থেকে সিআইডি তার পরিবারকে মাসে মাসে ভরণপোষণের টাকা দিয়ে আসছে। জজ মিয়াকে গ্রেনেড হামলা মামলায় রাজসাক্ষী করতে সিআইডির প্রস্তাবের কথাও ফাঁস করে দেন তিনি।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে নতুন করে এই মামলার তদন্তের উদ্যোগ নেয়। তদন্ত শেষে ২০০৮ সালের ১১ জুন এ-সংক্রান্ত মামলা দুটির অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। অব্যাহতি দেয়া হয় জজ মিয়াকে।

রাষ্ট্র কীভাবে একটি বড় ঘটনাকে ভিন্নখাতে নিতে এবং আসল ঘটনা আড়াল করতে জনগণের করের পয়সায় পরিচালিত আইনশৃঙ্খলা ও গোয়েন্দা বাহিনীকে ব্যবহার করে— একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় এই জজ মিয়া নাটক তার একটি বড় কেস স্টাডি। এটি ওই সময়ে এত বেশি আলোচিত হয় যে, এখনও বিভিন্ন মামলার রেফারেন্স হিসেবে জজ মিয়া শব্দটি ব্যবহৃত হয়।

কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ পাওয়ার ইস্যুকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন স্থানে নারকীয় তাণ্ডবের পরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে জানানো হচ্ছে যে, যে লোক পূজামণ্ডপে কোরআন শরিফ রেখে এসেছিলেন, তার নাম ইকবাল। এরইমধ্যে তাকে গ্রেপ্তারের খবরও জানানো হয়েছে। যদিও ইকবালের পরিবার বলছে, ইকবাল ভবঘুরে, মানসিকভাবেও পুরোপুরি সুস্থ নন। কেউ কেউ বলছেন, ইকবাল ভবঘুরে হলেও আগে বিএনপি-জামায়াতের মিছিলে তাকে দেখা গেছে। তবে যে দাবিটি সবচেয়ে বেশি সামনে আসছে তা হলো, ইকবাল যেন বলির পাঁঠা বা আরেকজন জজ মিয়া না হন।

যেন এই ঘটনায় প্রত্যক্ষ পরোক্ষভাবে জড়িত প্রত্যেকে এবং এই ঘটনার পেছনে যদি দেশি-বিদেশি চক্রান্ত থেকে থাকে; যদি বড় কোনো গোষ্ঠী বা দল এমনকি কোনো রাষ্ট্রও জড়িত থাকে— সেই সত্যটা যেন বেরিয়ে আসে। যেন পুরো ঘটনাটি ইকবালকেন্দ্রিক না হয়। কারণ আপাতদৃষ্টিতে ইকবাল সম্পর্কে যতটুকু জানা যাচ্ছে তাতে মনে হচ্ছে, তিনি ধর্মীয় বা রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে এই কাজটি করেনননি। বরং নগদ কিছু টাকার বিনিময়ে হয়তো তাকে দিয়ে একটি মসজিদ থেকে কোরআন শরিফ নিয়ে পূজামণ্ডপে রাখা হয়েছে।

সিসি ক্যামেরার যে ছবি এরইমধ্যে গণমাধ্যমে দেখা গেছে, সেটি যদি সত্যি হয় এবং ইকবাল নামে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তিনিই যদি পূজামণ্ডপে কোরআন রেখে আসেন—তাহলে তার কাছ থেকে জানতে হবে তিনি কার নির্দেশে বা কার এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে গিয়েছিলেন? এখন চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, যাকে ধরা হয়েছে তিনি প্রকৃতই অপরাধী কি না; মূল অপরাধীদের ধরতে না পারা বা তাদের আড়াল করতে ইকবালকে সামনে আনা হচ্ছে কি না; জিজ্ঞাসাবাদে ইকবাল সঠিক তথ্য দেবেন কি না; যদি তিনি মানসিকভাবে পুরোপুরি সুস্থ না হন, তাহলে তার দেয়া তথ্য কতটুকু আমলযোগ্য হবে ইত্যাদি নিয়েও সংশয় রয়েছে।

কুমিল্লার এই ঘটনার পর থেকেই বলা হচ্ছিল যে, ওই পূজামণ্ডপের সিসি ক্যামেরা ছিল না। কিন্তু ঘটনার কয়েক দিন পরে জানা গেল যে, মন্দিরের আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে অপরাধীকে শনাক্ত করা হয়েছে। কিন্তু শুরু থেকেই এই ভিডিও ফুটেজের সত্যতা নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। সংশয় প্রকাশ করেছেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় কেউ কেউ এমনও লিখেছেন যে, মন্দির থেকে যখন লোকটি বের হয়ে আসছেন, তখন তিনি সাবলিল ভঙ্গিতে আসছেন এবং তার হাতে সাদা উজ্জ্বল একটা বইয়ের মতন। কিন্তু মণ্ডপ থেকে যে কোরআন শরিফ উদ্ধার করা হয়েছে, সেটির কাভার ছিলো সবুজ। আবার হনুমানের গদা নিয়ে হাঁটার সময় মনে হয়নি তিনি গোপন কোনো কাজ করছেন। এরকম আরও অনেক প্রশ্ন আছে এই সিসি ক্যামেরার ফুটেজ নিয়ে।

এখন কথা হচ্ছে, মানুষ কেন এই ফুটেজ নিয়ে সন্দেহ করছে বা এরকম ঘটনায় জনগণের একটি বিরাট অংশ কেন সংশয় প্রকাশ করে? করে এই কারণে যে, যখনই কোথাও বড় ধরনের সহিংসতার ঘটনা ঘটে, সেখানে অনেক সময়ই গণমাধ্যম সঠিক সময়ে সঠিক ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য জনগণকে দিতে ব্যর্থ হয়; অনেক সময় গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নানা বাহিনীর তরফে চাপ প্রয়োগ করা হয় আবার গণমাধ্যম নিজেও নানারকম সেলফ সেন্সরশিপ আরোপ করে তথ্য গোপন করে বা চেপে যায়। তখন সংগত কারণেই সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব ও অপতথ্য ডালপালা মেলে। ফলে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তরফে কোনো ফলোআপ দেয়া হয় বা অপরাধী সম্পর্কে কোনো তথ্য দেয়া হয়, তখন অনেক মানুষই সেগুলো সন্দেহের চোখে দেখে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলোর ব্যাপারে মানুষের আস্থার সংকটও এখানে বড় ভূমিকা পালন করে। বছরের পর বছর ধরেও অনেক আলোচিত ও চাঞ্চল্যকর ঘটনার কূলকিনারা না হওয়ায় এই সংকট আরও বেড়ে যায়। যেমন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি বা কুমিল্লায় কলেজছাত্রী সোহাগী জাহান তনুকে ধর্ষণের পরে হত্যার ঘটনা।

অনেক ঘটনা বা মামলাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার; রাজনীতি ও ভোটের মাঠে বিরোধীপক্ষ দমনের জন্য গ্রাউন্ড বা পরিস্থিতি সৃষ্টি করা; একপক্ষের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা খেয়ে অন্যপক্ষের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিয়ে দেয়া; বিচারিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপসহ নানা কারণে দেশের পুরো সিস্টেম নিয়ে জনমনে আস্থার সংকট রয়েছে। যে কারণে ইকবাল নামে একজন যুবককে কুমিল্লার ঘটনায় সামনে নিয়ে আসা হলো, সেই লোকটি প্রকৃত প্রস্তাবে অপরাধী হলেও সমাজের বিরাট অংশ এটিকে সন্দেহের চোখে দেখা শুরু করল। এটি খুবই বিপজ্জনক।

রাষ্ট্রে ন্যায়বিচার তথা সামাজিক সুবিচার নিশ্চিত করার একটি বড় শর্ত হলো- সেই বিচারব্যবস্থায় জনগণের পূর্ণ আস্থা থাকতে হবে। সেই রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি মানুষের অগাধ বিশ্বাস ও ভরসা থাকতে হবে। তারা যে প্রতিবেদন দেবে, সংবাদ সম্মেলনে যে তথ্য দেবে, মানুষের কাছে সেটি বিশ্বাসযোগ্য হতে হবে। কিন্তু এই বিশ্বাস ও আস্থা একদিনে তৈরি হয় না। এই বিশ্বাস ও আস্থা একদিনে নষ্ট হয়নি। জজ মিয়ার মতো নাটক এই দেশে হয়েছে বলেই এখন কুমিল্লার পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রেখে আসার অভিযোগে গ্রেপ্তার ইকবালের প্রসঙ্গেও অনেকে সেই একই শঙ্কা প্রকাশ করছেন।

মোদ্দা কথা, ইকবাল যদি আসলেই অপরাধী হয়ে থাকেন, তাহলে তিনি যে কেবল মাঠের অ্যাসাইনমেন্টই বাস্তবায়ন করেছেন এবং তার পেছনে যে বিরাট শক্তি রয়েছে— তাতে সন্দেহ নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালও সাংবাদিকদের বলেছেন, কাজটি পরিকল্পনামাফিক করা হয়েছে। দুই থেকে তিনবার যাওয়া– আসার মধ্যে তিনি এই কর্মটি শেষ করেছেন। কাজেই এটি নির্দেশিত হয়ে কিংবা কারো প্ররোচনা ছাড়া এটি করেছেন বলে তারা এখনও মনে করেন না।

বাস্তবতা হলো, যারাই এই ঘটনার পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন, তারা জানতেই যে এটি বড় ইস্যু হবে এবং এটা নিয়ে একটা বড় ধরনের সামাজিক ও ধর্মীয় সংকট সৃষ্টি করা হবে। হয়তো সেই সামাজিক ও ধর্মীয় সংকটকে পুঁজি কের কেউ কেউ তাদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও করে থাকতে পারেন। কিন্তু আসলেই কী ঘটেছিল, সেটি নিরপেক্ষ অনুসন্ধানের মধ্য দিয়ে বের করে আনার জন্য রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী ও গোয়েন্দা বাহিনীসহ পুরো সিস্টেমকে যেরকম দক্ষ, যোগ্য, পক্ষপাতমুক্ত হওয়া দরকার—সেখানেই বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নানারকম ষড়যন্ত্র থাকলেও সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করছে সাধারণ মানুষেরই বিরাট অংশ। যারা মিছিল নিয়ে মন্দিরে ভাঙচুর চালিয়েছে বা যারা রংপুরে জেলেপল্লিতে আগুন দিয়েছে, তাদের সবাই রাজনৈতিক কর্মী নন। এখানে অনেক সাধারণ মানুষও আছেন— যারা কথিত ধর্মীয় অনুভূতি থেকেই এই সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন। মানুষ হিসেবে আমাদের অসহিষ্ণুতার পারদ যে দিন দিন উপরে উঠছে; পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং ভিন্নমত-ভিন্ন আদর্শ ও বিশ্বাসের প্রতি সহনশীলতা যে দিন দিন কমছে, এ কথা অস্বীকারের সুযোগ নেই।

রাজনৈতিক অরাজনৈতিক নানা গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করবে; সরকারের বিরোধীপক্ষ সরকারকে বিপদে ফেলতে বা বিব্রত করতেই চাইবে। কিন্তু তাদের সেই চাওয়াটা সাধারণ মানুষই বাস্তবায়ন করে দিচ্ছে। সুতরাং একজন ইকবালকে ধরে তো কোনো লাভ নেই কিংবা এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সবাইকে ধরেও খুব বেশি লাভ হবে না— যদি সমাজের মানুষের মধ্যে যে কট্টরপন্থার বীজ ক্রমশ বাড়ছে— সেটি উপড়ে ফেলা না যায়।

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

সড়কের সুস্থতা ও জনপ্রতিনিধির দায়

সড়কের সুস্থতা ও জনপ্রতিনিধির দায়

যখন যে জেলায় যাত্রা বিরতি নিয়েছি, চা পানের জন্য কোনো টং বা রেস্তোরাঁয় বসেছি, তখন স্থানীয়দের কাছে জানতে চেয়েছি, রাস্তার এই সর্বনাশা হাল হলো কী করে? তাদের মতে, করোনাকালে রাস্তার মেরামত কাজ হয়নি। রাস্তা দিয়ে কত ওজনের মালবাহী ট্রাক চলবে জানার পরেও, সেই ওজন-সহায়ক রাস্তা তৈরি হয়নি। নিয়মিত পরিচর্যা অনুপস্থিত।

আমাদের জনপ্রতিনিধিরা সম্ভবত উড়াল যান ব্যবহার করেন। জমিনের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কম। সম্পর্ক প্রায় ছিন্ন, জনগণ বা ভোটারের সঙ্গে। তাই পথঘাটের সুস্থতার দিকে তাদের সুনজর কম। প্রায় সপ্তাহ খানেক পথে পথে ঘুরে বেড়ালাম উত্তর-দক্ষিণ, পশ্চিমের জনপদ। সুস্থ সড়ক খুব কমই উপভোগ করতে পেরেছি। মহাসড়ক, সড়ক সকলের একই হাল। হাড়হাড্ডি বেরিয়ে গেছে। তার মধ্য দিয়ে পথ চলতে গিয়ে, আমাদের কলকব্জাও এখন নড়বড়ে। পথের কোথাও কোথাও লেখা উন্নয়ন কাজ চলছে। কিন্তু কাজ চলার লক্ষণ দেখতে পাইনি। দুই লেনকে চারলেন করার কাজ কোথাও চলছে কোথাও চলছে না।

বাঘা-নাটোর সড়কের যে হাল মাস দুয়েক আগে দেখেছি এখনও তাই। কালভার্ট ও ছোট সেতু পুনর্নির্মাণ করতে গিয়ে এই সড়কটির জায়গায় জায়গায় অস্ত্রোপচার চলছে। ঈশ্বরদী, কুষ্টিয়া, ভেড়ামারা সড়কে বাহনের লম্ফঝম্ফ অসহনীয়। ঝিনাইদহ, মাগুরা, চুয়াডাঙ্গা, যশোর হয়ে খুলনা পৌঁছতে বিকল্প পথ খুঁজে নিয়েও কষ্টের উপশম হয়নি। খুলনার ভেতরকার রাস্তাও হাড়ের ব্যথা বাড়াল। বগুড়া, রংপুর, সৈয়দপুর, হিলি, নওগাঁ, রাজশাহীর সড়কের দেয়া বেদনা অমবস্যা-পূর্ণিমায় স্মৃতি জাগিয়ে যাবে হয়তো দীর্ঘদিন।

যখন যে জেলায় যাত্রা বিরতি নিয়েছি, চা পানের জন্য কোনো টং বা রেস্তোরাঁয় বসেছি, তখন স্থানীয়দের কাছে জানতে চেয়েছি, রাস্তার এই সর্বনাশা হাল হলো কী করে? তাদের মতে, করোনাকালে রাস্তার মেরামত কাজ হয়নি। রাস্তা দিয়ে কত ওজনের মালবাহী ট্রাক চলবে জানার পরেও, সেই ওজন-সহায়ক রাস্তা তৈরি হয়নি। নিয়মিত পরিচর্যা অনুপস্থিত। তাদের মতে, আগে সড়কের মেরামত কাজের দিকে জনপ্রতিনিধিদের সরাসরি নজর থাকত।

জনগণ তাদের কাছেই সড়ক নিয়ে আবদার অভিযোগ করতেন। কিন্তু এখন জনপ্রতিনিধিরা প্রকল্প তৈরি ও উদ্বোধনের পর সড়ক মহাসড়ক নিয়ে ভাবেন না। সড়ক বিভাগের মর্জিতেই সড়ক মহাসড়কের স্বাস্হ্যের ভালো-মন্দ নির্ভর করে। কারণ জনপ্রতিনিধিদের মনোনয়ন ও জিতে আসাও নির্ভরশীল টাকা ও বিভিন্ন নেতার সঙ্গে সম্পর্কের সুস্বাস্থ্যের ওপর। জনসন্তুষ্টি সেখানে কোনো ভূমিকা রাখছে না।

স্থানীয় মানুষের মতে, দেশে অবকাঠামো উন্নয়নে অর্থ বরাদ্দে অসচ্ছলতা নেই। দেশজুড়ে সড়ক, সেতু তৈরি হচ্ছে। সমস্যা হলো সেই নির্মাণ বা উন্নয়নের পরিচর্যা বা আদর নেই। না থাকার কারণ- জনগণের সঙ্গে জনপ্রতিনিধিদের দূরত্ব তৈরি হওয়া। জনপ্রতিনিধি ও জনগণ যখন রাজনীতির শুদ্ধতম অনুশীলনে ফিরবে, তখনই সম্ভব হবে সম্পর্কের নিবিড়তম দিনে ফেরা। তখন শুধু সড়ক নয়, জীবনের অন্যান্য যাত্রাও হবে উপভোগ্য।

লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

সৈয়দ আবুল মকসুদ: একজন দায়বদ্ধ ও সাদামনের মানুষ

সৈয়দ আবুল মকসুদ: একজন দায়বদ্ধ ও সাদামনের মানুষ

তিনি ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সত্যাগ্রহ শুরু করেন এবং বর্জন করেন পাশ্চাত্য পোশাক ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। ‘ইরাকে হামলার প্রতিবাদে’ এই সত্যাগ্রহ যতটা ঠিক ততটাই সেটা ছিল ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমি সংস্কৃতি, ভোগবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা এই চার অপশক্তির বিরুদ্ধে। এসময় তিনি বাংলাদেশের সমস্ত জেলায় প্রচারাভিযান চালান তার সত্যাগ্রহের সমর্থনে। আমৃত্যু তিনি এই পোশাক পরিধান করেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদের জন্ম ১৯৪৬ সালের ২৩ অক্টোবর মানিকগঞ্জ জেলার শিবালয় উপজেলার এলাচিপুর গ্রামে। মা সালেহা বেগম এবং বাবা সৈয়দ আবুল মাহমুদ (১৯০৫-১৯৮৮)। জন্মের দুই বছর পর ১৯৪৮ সালের ২০ নভেম্বর সন্তান জন্মদানের সময় জটিলতায় তার মা ইন্তেকাল করেন। তার মায়ের মৃত্যুর পর তার বিমাতা বেগম রোকেয়া আখতার তাকে সন্তানস্নেহে লালনপালন করেন।

ছেলেবেলা থেকেই সৈয়দ আবুল মকসুদ সাহিত্যিক আবহে বেড়ে ওঠেন। তার পিতা কাব্যচর্চা করতেন, রয়েছে তার দুটি বই- ভ্রমণকাহিনি ‘কাশ্মীর’ এবং কবিতাগ্রন্থ ‘পুষ্পমালিকা’।

সৈয়দ আবুল মকসুদের শিক্ষাজীবন শুরু নিজগৃহে তাদের গ্রামের নরসুন্দর লোকনাথ শীলের কাছে। তিনি তাকে ‘বর্ণবোধ’ ও ‘আদর্শলিপি’ পাঠ দিতেন। এরপর তিনি পড়েন তাদের ডাক্তার নিবারণচন্দ্র সাহার কাছে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তিনি একবারে ভর্তি হন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ঝিটকা আনন্দমোহন উচ্চ বিদ্যালয়ে। সেখান থেকে মাধ্যমিক পাসের পর ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক এবং সাংবাদিকতায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ নেন জার্মানির বার্লিনস্থ ‘ইন্টারন্যাশনাল ইনসটিটিউট ফর জার্নালিজম’ থেকে।

ছাত্রজীবনে আবুল মকসুদ ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের সক্রিয় কর্মী ও বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। একাত্তরের ২৫ মার্চের পরে মস্কোপন্থি ন্যাপের নেতা ক্যাপ্টেন (অব.) আবদুল হালিম চৌধুরীর গঠিত মুক্তিবাহিনীর সদস্য হিসেবে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখা ছাড়াও কলকাতা থেকে প্রকাশিত আবদুল মান্নান সম্পাদিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকায় প্রতিবেদন পাঠাতেন।

১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বরের পর বাংলাদেশ সরকারের ইনফরমেশন সেল-এ যোগদান করেন। বাহাত্তরের জানুয়ারি থেকে বার্তা সংস্থা বাংলাদেশ প্রেস ইন্টারন্যাশনালে (সাবেক পিপিআই) যোগ দেন, যা পরে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার সঙ্গে অঙ্গীভূত করা হয়। বাসস-এ ছিলেন বার্তা সম্পাদক ও উপপ্রধান বার্তা সম্পাদক হিসেবে।

সাংবাদিকতার দায়িত্ব পালনে তিনি ব্রিটেন, জার্মানি, ফ্রান্স, সুইজারল্যান্ড, ইরান, চিন, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, আমেরিকা, তুরস্ক, মালায়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড প্রভৃতি দেশ ভ্রমণ করেন। তার বন্ধু হুমায়ুন আজাদকে আহত করা নিয়ে প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি লেখার জন্য বিএনপি-জামায়াত সরকার থেকে লেখা বন্ধ করার নির্দেশ দেয়ায় প্রতিবাদে ২০০৪ সালের ৯ মার্চ তিনি বাসস থেকে পদত্যাগ করেন। এরপর চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত দৈনিক সুপ্রভাত বাংলাদেশ-এর তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক।

সৈয়দ আবুল মকসুদের সাহিত্যচর্চা শুরু স্কুলজীবন থেকে কবিতা লেখার মাধ্যমে। বাংলাদেশের সাহিত্য অঙ্গনে তার আবির্ভাব ষাটের দশকে। কবি আহমদ রফিক সম্পাদিত নাগরিক সাহিত্যপত্রিকায় সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। পরবর্তী সময়ে নিজেই প্রকাশ করেন সময় এবং আরও পরে সত্তরের দশকের শেষে অস্তিত্ব। প্রথম থেকেই তিনি কবিতা, গল্প, প্রবন্ধসহ সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রাখেন। তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ ভ্রমণকাহিনি জার্মানীর জার্নাল (১৯৭৯) যা প্রকাশের পর পরই পাঠকপ্রিয়তা পায়। তার প্রথম প্রকাশিত গবেষণা গ্রন্থ গোবিন্দচন্দ্র দাসের ঘর-গেরস্থালি (১৯৮১) এবং প্রথম কবিতার বই বিকেলবেলা (১৯৮১)।

একজন গবেষক হিসেবে সৈয়দ আবুল মকসুদ বহু মৌলিক আকরগ্রন্থের প্রণেতা- সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর জীবন ও সাহিত্য (১ম খণ্ড ১৯৮১ এবং ২য় খণ্ড ১৯৮৩), মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (১৯৯৪), পথিকৃৎ নারীবাদী খায়রন্নেসা খাতুন (১৯৯২), হরিশচন্দ্র মিত্র: ঢাকার সাহিত্য ও সাময়িকপত্রের পথিকৃৎ (১৯৯০) প্রভৃতি। তিনি শুধু মওলানা ভাসানীর পূর্ণাঙ্গ জীবনীই রচনা করেননি, মওলানার ওপর লিখেছেন পাঁচটি বই।

বাংলাদেশে মহাত্মা গান্ধী বিষয়ে গবেষণার পথিকৃৎ সৈয়দ আবুল মকসুদ। Gandhi, Nehru and Noakhali (২০০৪) এবং Gandhi Camp: A Chrinology of Noakhali Events 1947-49 (২০১৪) নোয়াখালীতে গান্ধীর কার্যক্রম সম্পর্কে নতুন দিক উন্মোচন করেছে। গান্ধী বিষয়ে তিনি আরও সম্পাদনা করেছেন Pyarelal's Unpublished Correspondence: The Noakhali Peace Mission of Mahatma Gandhi (২০০৬) এবং নোয়াখালী গান্ধী মিশন ডায়েরী (২০১১)। গান্ধী প্রচারিত চিন্তাচর্চা ও গবেষণার জন্য তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন মহাত্মা গান্ধী স্মারক সদন।

গবেষণায় আবুল মকসুদের আরেকটি অনন্য অবদান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বিষয়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা (২০১৬), স্যার ফিলিপ হার্টগ (২০১৬), সলিমুল্লাহ মুসলিম হল (২০১৯) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিষয়ে চর্চায় অবশ্যপাঠ্য হয়ে উঠেছে।

২০০৩ সালে আমেরিকার ইরাক আক্রমণের প্রতিবাদে তিনি ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সত্যাগ্রহ শুরু করেন এবং বর্জন করেন পাশ্চাত্য পোশাক ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতি। ‘ইরাকে হামলার প্রতিবাদে’ এই সত্যাগ্রহ যতটা ঠিক ততটাই সেটা ছিল ইঙ্গ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, পশ্চিমি সংস্কৃতি, ভোগবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা এই চার অপশক্তির বিরুদ্ধে। এসময় তিনি বাংলাদেশের সমস্ত জেলায় প্রচারাভিযান চালান তার সত্যাগ্রহের সমর্থনে। আমৃত্যু তিনি এই পোশাক পরিধান করেন।

সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন বাংলাদেশে পরিবেশ ও সামাজিক আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিত্ব ও মানবাধিকার কর্মী। বহু সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সমাজে নিগৃহীত জনগোষ্ঠী- নারী, সংখ্যালঘু, আদিবাসী- যেখানেই আক্রান্ত হয়েছে তিনি শুধু বলিষ্ঠ কণ্ঠে তার প্রতিবাদই করেননি, নিপীড়িত মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। একজন সক্রিয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে তিনি সমাজের সর্বস্তরে গৃহীত হন।

সাহিত্যচর্চা ছাড়াও সৈয়দ আবুল মকসুদ ছিলেন একজন জনপ্রিয় কলাম লেখক। বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তিনি নিয়মিত কলাম লিখেছেন। প্রথম আলো পত্রিকায় তার সহজিয়া কড়চা ছিল বাংলাদেশের ইতিহাসে জনপ্রিয় কলামগুলোর অন্যতম।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বিভিন্ন পদক ও সন্মানে ভূষিত হয়েছেন- সাহিত্যে সামগ্রিক অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৯৫), মহাত্মা গান্ধী স্মারক পুরস্কার (ভারত) (২০১৭), মওলানা ভাসানী জাতীয় পুরস্কার, ঋষিজ পুরস্কারসহ বিভিন্ন পদক।

২০২১ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় নিজবাড়িতে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

আলোকিত হোক মানবাত্মা

আলোকিত হোক মানবাত্মা

দেশে সরকারি দল আছে, বিরোধী দল আছে, আছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার সচেতন নাগরিক। সবকিছু থাকার পরও কেন আমরা ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা দিতে পারলাম না?

আসন্ন শীতে নদী-পুকুর, খাল-বিলের পানি শুকিয়ে মাছের আকাল পড়লে আহার জুটবে কী করে, মহামারিতে মুদি দোকানটিও চলে না ঠিকমতো, তাই সারাবছর দু'মুঠো অন্ন জোগাতে দিন-রাত নিরন্তর শ্রম দিয়েও কুলিয়ে উঠতে পারছে না, গেল দুর্গোৎসবে স্ত্রী-সন্তানকে একখানা নতুন কাপড় কিনে দেয়ার সামর্থ্য নিয়ে কয়েকবার ভাবতে হয় যে মানুষগুলোর। কুমিল্লায় কোন মণ্ডপে কী হলো তা নিয়ে তাদের ভাবার সুযোগ কোথায়? অথচ মণ্ডপে পবিত্র কোরআন শরিফ রাখার দায়ে রংপুরের পীরগঞ্জের নিরন্ন হতদরিদ্র জেলে পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে দেয়া হলো।
নোয়াখালীতে দুর্বৃত্তদের হামলায় নিহত যতন সাহার চার বছরের শিশুসন্তান আদিত্য সাহা কাঁদছে আর বলছে, ‘বাবা ফিরে এলে ভাত খাব। বাবা ফিরে না আসা পর্যন্ত কিছু খাব না।’ সে জানে না বাবা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না। এমন কত দীর্ঘশ্বাস আর বহন করবে বাংলাদেশ?
দেশে সরকারি দল আছে, বিরোধী দল আছে, আছে বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার সচেতন নাগরিক। সবকিছু থাকার পরও কেন আমরা ‘সংখ্যালঘু’দের নিরাপত্তা দিতে পারলাম না?
বর্তমান সরকারের মতো ক্ষমতাধর সরকার অতীতে আসেনি, ভবিষ্যতেও হয়তো আসবে না। প্রশাসন, গোয়েন্দা সংস্থা, বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর সরকারের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব থাকার পরও দুর্বৃত্তদের হাত থেকে সংখ্যালঘুদের রক্ষা করা যায়নি।
যে অন্যায় এক বা একাধিক মুসলিম করেছে, সে অন্যায়ের দায়ভার চাপিয়ে দিয়ে ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষগুলোকে সর্বস্বান্ত করে দেয়া হলো। তাদের অপরাধ তারা মুসলিম নয়, অন্য ধর্মের। যেকোনো ধর্মের কেউ অন্যায় করে থাকলে সেই ব্যক্তিই দায়ী, তাকে বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দেয়া হোক।

ব্যক্তির অন্যায় অপকর্মের দায় দলগতভাবে, সম্প্রদায়গতভাবে অন্যের ঘাড়ে পড়বে কেন? কিন্তু পড়েছে। নির্বিচারে নিরপরাধ মানুষের ওপর হামলা করা হয়েছে। রামুর ক্ষেত্রে, নাসিরনগরের ক্ষেত্রে, সুনামগঞ্জের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটেছে।

১৯৭৪ সালের আদমশুমারিতে ১৩.৫ শতাংশ হিন্দু থাকলেও কমতে কমতে ২০১১ সালের সর্বশেষ আদমশুমারিতে তা দাঁড়িয়েছে ৮.৫ শতাংশে। এই যে নিজভূমির মায়া ত্যাগ করে চলে যাচ্ছে হিন্দুরা, এমনি এমনি ঘটছে না। তাদের যেতে বাধ্য করা হচ্ছে। বৃহৎ রাজনৈতিক কারণ যেমন আছে, জায়গা জমি দখলের মতো স্থানীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কারণও রয়েছে।
‘সংখ্যালঘু’ মানুষ এতটা সাহসী হয়ে ওঠেনি ৯০ শতাংশেরও বেশি মুসলিমের দেশে তারা উসকানিমূলক কোনো কাজ করবে। অনেক আগে থেকেই এর বিপদ তারা জানেন।
চিত্রনাট্যের কাহিনি একই, শুধু মঞ্চায়নের আঙ্গিক ভিন্ন। ঘটনা সেই ধর্মের অবমাননা। ধর্মভিত্তিক কোনো বিষয়কে পুঁজি করে ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে, ভাইরাল করে, মাইকে ঘোষণা দিয়ে অথবা মুখে মুখে গুজব রটিয়ে উত্তেজনা তৈরি করা, তারপর সংঘবদ্ধ হয়ে পরিকল্পিত বা অপরিকল্পিতভাবে হামলা। লক্ষ্য একই- অন্যধর্মের মানুষ, বাড়িঘর, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উপাসনালয়।
২০১২ সালে ফেসবুককেন্দ্রিক পোস্টকে কেন্দ্র করে রামুতে বৌদ্ধমন্দির জ্বালিয়ে দেয়ার ঘটনার মধ্য দিয়ে এদেশে সাম্প্রদায়িক হামলার যে নতুন ধরন শুরু হয়েছিল, তা আর থেমে থাকেনি।
২০১৭ সালেও রংপুরের গঙ্গাচড়ায় এক হিন্দু যুবকের বিরুদ্ধে ছড়ানো গুজব ভাইরাল করে একটি চক্র। সে সময় এলাকায় মাইকিং করে হামলা হয়েছিল হিন্দুদের বাড়িঘরে।
এ বছরের ১৬ মার্চ হেফাজতের বিতর্কিত নেতা মামুনুল হককেন্দ্রিক পোস্টের জেরে গ্রেপ্তার হন সুনামগঞ্জের ঝুমন দাশ। তিনি লিখেছিলেন যে, মামুনুল হকের মূল উদ্দেশ্য দুই ধর্মের মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা। এই পোস্টকে আপত্তিকর ও ইসলামের সমালোচনা উল্লেখ করে নোয়াগাঁও গ্রামে কয়েক হাজার লোক লাঠিসোঁটাসহ মিছিল করে সংখ্যালঘুদের প্রায় ৯০টি বাড়িঘর ও মন্দিরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটায়।
এবারেও কুমিল্লার কোরআন শরিফ-সংক্রান্ত ঘটনার জেরে চাঁদপুর নোয়াখালীসহ একাধিক স্থানে সাম্প্রদায়িক হামলায় ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছেন। জ্বালিয়ে দেয়া হয় রংপুরের পীরগঞ্জে এক জেলেপল্লি।
ধর্ম ভূ-খণ্ডগত মৌলিক দূরত্ব ঘোচাতে পারে না, তা ১৯৪৭-এর অব্যবহিত পরেই বুঝতে পেরেছে এই উপমহাদেশের মানুষ। জিন্নাহ-নেহেরুর দ্বিজাতিতত্ত্ব এই অঞ্চলের মানুষের জীবন যাপনে শুধু প্রতিঘাতই তৈরি করেছে। ধর্মের ভিত্তিতে এদেশ ভাগ হয়নি, স্বাধীন হয়েছে ভাষা আর নিজস্ব স্বাতন্ত্র্যকে ঘিরে। সেই স্বাতন্ত্র্য ছিল বাঙালিত্ব। ঔপনিবেশিক আমল থেকে আমরা নিগৃহীত হতে হতে একটা পর্যায়ে বুঝতে পারলাম একক কোনো স্বাতন্ত্র্যের ভেতরই নিহিত রয়েছে আমাদের মুক্তি। তাই বায়ান্নোর হাত ধরে একাত্তরে এসে সেই মুক্তি নিশ্চিত হয়েছে।

একাত্তরে ধর্ম-বর্ণ, মত নির্বিশেষে মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তির সংগ্রামে। সেই মুক্তির ব্রত শুধু ভূ-খণ্ডের স্বাধীনতার নিমিত্তে ছিল না; ছিল অর্থনৈতিক মুক্তি, আত্মার মুক্তি, মতপ্রকাশের মুক্তি, জীবনাচরণের মুক্তি। তাই বাহাত্তরের সংবিধান রচিত হয়েছিল একাত্তরের অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে ধারণ করেই। জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা- এই চার মূলনীতিকে ব্রত হিসেবে নিয়েই দেশ পরিচালনায় অগ্রগামী হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু সরকার।
পঁচাত্তরের কলঙ্কজনক পটপরিবর্তনের পর পরই দৃশ্যপটে পরিবর্তন আসতে থাকল। চতুর সরকারগুলো একদিকে সংবিধানকে কাঁটাছেঁড়া করতে করতে ক্ষতবিক্ষত করেছে, অপরদিকে বিভিন্ন কৌশলে মানুষের চিন্তাধারায় মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে। যার মূল উপজীব্যই ছিল ধর্ম। বৈধ-অবৈধ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রধান অস্ত্র বানিয়ে ফেলল ধর্মকে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমের সমর্থন লাভের আশায় সংবিধানের মৌলিক নীতির পরিবর্তন এনে ধর্মকে সংবিধানে যুক্ত করে পুরো দেশকেই বিপন্ন করে ফেলল। কুটিল রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্য চতুর রাজনীতিবিদরা এমন একটি লোভনীয় বিষয়কে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে ফেলেছে এবং না বুঝেই সেই ফাঁদে পা দিয়েছে লাখ লাখ মানুষ। যতদিন এমনসব মানুষ রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রক থাকবে, ততদিন অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র কাঠামোর ভাবনা বিকশিত হবে না।
ধর্মনিরপেক্ষতার অপ ও ভুল ব্যাখ্যাকেই আঁকড়ে ধরে পড়ে আছে এদেশের বেশিরভাগই মানুষ, এর ভুল ব্যাখ্যা দখল করে আছে মানুষের মনোজগৎ। তার ওপর ভিত্তি করেই বিরামহীন ঘটে চলেছে ন্যক্কারজনক সব ঘটনা। ধর্মহীনতা নয়, বরং প্রতিটি মানুষ সম্মানের সঙ্গে নিজ নিজ ধর্মাচারণ করবে, ধর্ম পালন করবে- এটাই ধর্মনিরপেক্ষতা।

আমাদের দেশে সাম্প্রদায়িক মনোভাব দিন দিন বাড়ছে। এখন প্রকাশ্যে ভিন্নধর্মের মানুষদের প্রতি বিরূপ মনোভাব পোষণ করা হয়। নানাভাবে তাদের অপমান, অপদস্থ, বিদ্রূপ করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের কুৎসাও রটনা করা হয়। ধর্মীয় বিদ্বেষ থেকেই এদেশের সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে ঘটছে।
গত ৫০ বছরের ইতিহাসে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ, হোক সে ধর্মীয় কিংবা নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ের- ক্রমাগত হয়রানি হুমকি নির্যাতন ও হত্যার শিকার হয়ে আসছে।
শিক্ষা রুচি ও সংস্কৃতির বাস্তব অভিব্যক্তি ঘটে মানুষের আচরণে। এই আচরণ মানুষকে ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক কল্যাণকর সহাবস্থান তৈরিতে সহায়তা করে। আর একথা বলার অপেক্ষা রাখে না, ধর্মনিরপেক্ষ অসাম্প্রদায়িক চেতনাই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের উন্নতির সোপান। উন্নত রাষ্ট্রে ধর্মের প্রভাব একেবারেই গৌণ। ধর্ম যদি রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়ামক হিসেবে কাজ করে, তাহলে সেই রাষ্ট্র আর সুসভ্য থাকে না।

উন্নত সাংস্কৃতিক বিকাশে, আধুনিক সমাজ বিনির্মাণে এসবের আদৌ কোনো ভূমিকা নেই। বরং এসব বিতর্ক পেছনে ফেলে শিক্ষা-স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন, চিকিৎসা বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারের মাধ্যমে মানুষের প্রাণ বাঁচানোর মতো বিষয়গুলো এখন বড় চ্যালেঞ্জ। চলমান মহামারিকে বধ করেছে যে বিজ্ঞানীরা, নমস্য সেজন। মসজিদ মন্দির গীর্জা প্যাগোডা যার যার অন্তরে থাকুক, অন্ধকার ভেদ করে আলোকিত হোক মানবাত্মা, গভীর মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ হোক পৃথিবীর সব মানুষ।

লেখক: শিক্ষক-প্রাবন্ধিক

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বঙ্গবন্ধু

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বঙ্গবন্ধু

১৯৪৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স ছিল ছাব্বিশ বছর। তখন তিনি জাতির পিতা তো পরের কথা, বঙ্গবন্ধুও হননি। ছাব্বিশ বছরের এক তরুণ রাজনৈতিককর্মী। কিন্তু মানুষের প্রতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্য জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়েছিলেন তিনি। আজ তার হাতে তৈরি দল রাষ্ট্রক্ষমতায়। তার আদর্শে উজ্জীবিত লাখ লাখ তরুণ দেশের আনাচে কানাচে। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কারা নষ্ট করছে এটা সবাই জানে। কেন নষ্ট করছে সেটাও কারো অজানা নয়। সেদিকে না গিয়ে বরং তরুণরা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তুলে ধরতে পারে না?

চলতি সপ্তাহের গত কয়েকদিনে বাংলাদেশে বিভিন্ন জায়গায় অগ্নিসংযোগ ও হামলার ঘটনা ঘটেছে সত্তরটিরও বেশি। অনেকে ভেবেছিলেন পুজো শেষে হয়ত আর এটা থাকবে না। কিন্তু হায়! পুজো তো ছিল একটা ছুতো। নইলে প্রতিমা বিসর্জনের পর কিংবা পুজোর পরদিন পীরগঞ্জের আগুন ও হামলা হলো কেন? তাহলে প্রশ্ন, বাংলাদেশে কি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট হচ্ছে?

এ প্রশ্নের জবাব খোঁজার আগে পৌনে এক শতাব্দি আগে ঘটা দাঙ্গার ঘটনা সম্পর্কে জানা যাক। ১৯৪৬ সালের ২৯ জুলাই অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগ কাউন্সিলে ১৬ আগস্ট ‘ডাইরেক্ট অ্যাকশন ডে’ ঘোষণা করলেন মুহম্মদ আলী জিন্নাহ। কিন্তু কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার নেতারা বিবৃতি দিতে লাগলেন, এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধে।

দিনটি সুষ্ঠুভাবে পালনের জন্য ডাক পড়ল শেখ মুজিব ও তখনকার তরুণ কর্মীদের। নির্দেশ এল- মহল্লায় মহল্লায় গিয়ে বোঝাতে হবে যে, এই সংগ্রাম হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী তখন বাংলার প্রধানমন্ত্রী। তিনি ১৬ আগস্ট সরকারি ছুটি ঘোষণা করলেন। এতে আরও খেপে গেল কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা। তারা হিন্দু সম্প্রদায়কে বোঝাল এটা হিন্দুদের বিরুদ্ধেই। ১৬ আগস্ট সকাল থেকেই মুসলমানদের উপর হামলা শুরু করল হিন্দুরা।

মুজিব নিজে মহল্লায় মহল্লায় মাইকিং করে বুঝিয়েছেন, আজকের এই কর্মবিরতি হিন্দুদের বিরুদ্ধে নয়। তবু হিন্দু মহাসভা ও কংগ্রেসের সুবিধাভোগী রাজনীতিবিদরা হিন্দুদের খেপিয়ে তুলেছে। দাঙ্গা লাগিয়ে দিয়েছে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে।

দেখতে দেখতে পুরো কলকাতায় ছড়িয়ে পড়ল দাঙ্গা। হিন্দুপ্রধান এলাকায় মুসলমানদের উপর হামলা চালাল হিন্দুরা। আর মুসলিমপ্রধান এলাকায় হিন্দুদের উপর হামলা চালাল মুসলিমরা। একটাবারের জন্যও হিন্দুরা মুসলিমপ্রধান এলাকার হিন্দুদের কথা ভাবল না। আর দাঙ্গাবাজ মুসলিমরা ভাবল না হিন্দুপ্রধান এলাকার মুসলিমদের কথা। অজানা আক্রোশে ধর্মের দোহাই দিয়ে একে অপরের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। মুসলিমপ্রধান এলাকা থেকে কিছু হিন্দু পরিবারকে অনেক কষ্টে হিন্দুপ্রধান এলাকায় পাঠাতে পারলেন মুজিব। বেকার হোস্টেলের আশপাশে কিছু হিন্দু পরিবার ছিল, তাদের রক্ষা করলেন সুরেন ব্যানার্জি রোডে পাঠিয়ে দিয়ে। হিন্দুপ্রধান এলাকা থেকেও কিছু মুসলিমকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেন।

কলকাতা শহরে এখানে ওখানে লাশ পড়ে আছে। মহল্লার পর মহল্লা আগুনে পুড়ে গেছে। মানুষ মানুষকে এভাবে হত্যা করতে পারে!

রিফিউজিদের থাকার বন্দোবস্ত হয়েছে লেডি ব্র্যাবোর্ন কলেজে। দোতলায় মেয়েরা, নিচে পুরুষরা। উদ্ধারকাজ চালাতে গিয়ে কয়েক জায়গায় আক্রান্ত হয়েছেন মুজিব। আঘাত পাওয়া মানুষে হাসপাতালগুলো ভরা। ওদিকে হোস্টেলগুলোতে চাল, আটা ফুরিয়ে গেছে। লুট হওয়ার ভয়ে কেউ কেউ দোকান খুলল না। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে দেখা করলেন মুজিব। শহীদ সাহেব বললেন, ‘নবাবজাদা নসরুল্লাহকে ভার দিয়েছি, তার সাথে দেখা কর।’

কর্মীদের নিয়ে তার কাছে ছুটলেন মুজিব। নসরুল্লাহ মুজিবদের নিয়ে গেলেন সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। বললেন, ‘এখানে চাল রাখা আছে। নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা কর। আমাদের কাছে গাড়ি নেই। প্রায় সব গাড়ি মিলিটারিরা নিয়ে গেছে। তবে দেরি করলে পরে গাড়ির ব্যবস্থা করা যাবে।’

দেরি করার সুযোগ নেই। এখনই চাল নিয়ে না গেলে ছাত্রদের অনাহারে থাকতে হবে। শেষপর্যন্ত ঠেলাগাড়ি জোগাড় করে ফেললেন মুজিব। ঠেলাগাড়িতে চাল বোঝাই করা হলো। ওদিকে গাড়ি ঠেলার লোক নেই। শেখ মুজিব হাত লাগালেন ঠেলাগাড়িতে। তার সঙ্গে নূরুদ্দিন ও নূরুল হুদাও যোগ দিলেন।

তিনজন মিলে কোনো রকমে চাল বোঝাই ঠেলাগাড়ি ঠেলে বেকার হোস্টেল ও ইলিয়ট হোস্টেলে চাল পৌঁছে দিলেন। কারমাইকেল হোস্টেলেও চাল পৌঁছাতে হবে। ওখানে কী করে পৌঁছাবেন? একে তো অনেক দূর, তার ওপর ওখানে যেতে হলে হিন্দু মহল্লা পার হয়ে যেতে হবে। ঠেলাগাড়িতে করে ওখানে চাল পৌঁছানো একেবারেই অসম্ভব।

অনেক চেষ্টা করে একটা ফায়ার ব্রিগেডের গাড়ি জোগাড় করে আনলেন নূরুদ্দিন। ওই গাড়িতে করে কারমাইকেল হোস্টেলে চাল পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন মুজিব।

এই দাঙ্গায় মুজিব দেখেছেন, অনেক হিন্দু মুসলমানদের রক্ষা করতে গিয়ে বিপদে পড়েছেন। জীবনও হারিয়েছেন। আবার অনেক মুসলমান হিন্দু পাড়াপড়শিকে রক্ষা করতে গিয়েও জীবন দিয়েছেন। মুসলিম লীগ অফিসে অনেক হিন্দু ফোন করে জানিয়েছিলেন, তাদের বাড়িতে মুসলমানদের আশ্রয় দিয়েছেন। শিগগির এদের উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়ার অনুরোধ করেছেন। নইলে আশ্রয়দাতা হিন্দুরাও মরবে, আশ্রিত মুসলমানরাও মরবে।

ওদিকে আরেকদল লোককে দেখেছেন মুজিব। এরা দাঙ্গাহাঙ্গামার ধার ধারেনি। এরা শুধু দোকান ভেঙেছে। লুটপাট করেছে। এদেরই একজনকে বাধা দিতে গিয়ে বিপদেই পড়েছিলেন। তারা তাকে আক্রমণ করে বসেছিল।

দাঙ্গা নিয়ন্ত্রেণে আনতে কারফিউ জারি হয়। পার্ক সার্কাস ও বালিগঞ্জের মাঝে একটা মুসলমান বস্তি আছে। প্রত্যেক রাতেই সেখানে হিন্দুরা আক্রমণ করে। তাদের পাহারা দেয়ার ভার পড়েছে মুজিব এবং সিলেটের মোয়াজ্জেম হোসেন চৌধুরীর ওপর।

কলকাতায় শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে যেতে লাগলেন মুজিব। রাতদিন রিফিউজি সেন্টারে কাজ করতে লাগলেন কর্মীদের নিয়ে। কিছুদিনের মধ্যে দাঙ্গা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হয়। মুসলমানরা চলে যায় মুসলমান মহল্লায়। আর হিন্দুরা হিন্দু মহল্লায়।

ওদিকে কলকাতার দাঙ্গা বন্ধ হতে না হতেই নোয়াখালীতে দাঙ্গা শুরু হয়। ঢাকায় তখনও দাঙ্গা লেগে ছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় ভয়াবহ দাঙ্গা শুরু হলো বিহারে। বিহারের বিভিন্ন জেলায় পরিকল্পনা করে মুসলমানদের উপর আক্রমণ হয়েছিল। অনেক মানুষ মারা যায়। ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়। দাঙ্গা শুরু হওয়ার তিন দিন পরেই শেখ মুজিব রওনা হলেন পাটনায়। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী পাটনায় মুসলিম লীগ নেতাদের খবর পাঠালেন, যেকোনো ধরনের সাহায্য প্রয়োজন হলে বেঙ্গল সরকার দিতে রাজি আছে। বিহার সরকারকেও এটা জানিয়ে রেখেছিলেন।

বিহারে গিয়ে বিভিন্ন জায়গায় রিফিউজি ক্যাম্প খোলার ব্যবস্থা করলেন মুজিব। কিন্তু আহত ও উদ্বাস্তুদের সংখ্যা ছিল ধারণারও বাইরে। এদের সহায়তা করার জন্য কলকাতা থেকে অনেক ডাক্তার ও কর্মী এসে হাজির। বিহার থেকে উদ্বাস্তুদের নিয়ে রাখা হলো পাটনা, পাটনা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, নিগাহ, কান্দুলিয়ায়। নিগাহ ও কান্দুলিয়ায় ক্যাম্প খোলা হয়েছিল। এর মধ্যে কান্দুলিয়া ক্যাম্পটি ছিল বিশাল। প্রায় দশ হাজার লোক ধরার জায়গা ছিল। মুজিব এই ক্যাম্পের নাম দিলেন ‘হিজরতগঞ্জ’।

উদ্বাস্তুদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছিলেন বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তবে কর্মীদের জন্য আলাদা খাবারের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। মোহাজিরদের জন্য যা রান্না হতো, সেখান থেকেই কিছু খেয়ে নিতেন মুজিব। দোকানপাট কিছুই ছিল না। প্রতিদিনই শত শত লোক আসছে ক্যাম্পে। নতুন করে ময়রা ও মাধাইগয় ক্যাম্প খুলতে হলো। এ দু জায়গাতেই দশ হাজার উদ্বাস্তুর থাকার ব্যবস্থা করা হয়। তবে উদ্বাস্তুদের একবেলার বেশি খাবার রান্না করা সম্ভব ছিল না। মুজিবসহ কর্মীরাও একবেলাই খাবার খেতেন।

উদ্বাস্তু ক্যাম্পের কর্মী ব্যবস্থাপনা সুন্দরভাবে গড়ে তুলেছিলেন মুজিব। উদ্বাস্তুদের থেকেই সুপারিনটেনডেন্ট, অ্যাসিস্ট্যান্ট সুপারিনটেনডেন্ট, রেশন ইনচার্জ, দারোয়ান ও অন্যান্য কর্মী নিয়োগ দেয়া হলো। খাবার রান্না করার সমস্যার কারণে রেশন কার্ডের ব্যবস্থা করা হলো। প্রত্যেক পরিবারকে বিনা পয়সায় সাতদিনের চাল, জ্বালানি কাঠ, মরিচ, পিঁয়াজ দেয়া হতো। মাংস দেয়া হতো একদিন পর পর। মোহাজিররা এ বন্দোবস্তে খুশি হয়েছিল।

মুজিবের সঙ্গে যেসব কর্মী ছিলেন, খাবার ও ঘুমের অভাব এবং কাজের চাপে প্রায় সবাই অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেক অসুস্থ কর্মীকে কলকাতায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মুজিব। রয়ে গেলেন নিজে। টানা দেড়মাস অমানুষিক পরিশ্রমের কারণে তার শরীর ভেঙে গিয়েছিল। এসময় পূর্ব পরিচিতরা তাকে দেখে আশ্চর্য হন। তারপর অসুস্থ শরীর নিয়ে কলকাতায় হাজির হলেন মুজিব। বেকার হোস্টেলে ফিরে আরও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। জ্বর মোটেই ছাড়ছিল না। এতটাই কাবু হয়ে গিয়েছিলেন যে, ট্রপিক্যাল স্কুল অব মেডিসিন হাসপাতালের ইউরোপিয়ান ওয়ার্ডে পনেরো দিন চিকিৎসা নিতে হয়েছিল।

১৯৪৬ সালে শেখ মুজিবুর রহমানের বয়স ছিল ছাব্বিশ বছর। তখন তিনি জাতির পিতা তো পরের কথা, বঙ্গবন্ধুও হননি। ছাব্বিশ বছরের এক তরুণ রাজনৈতিককর্মী। কিন্তু মানুষের প্রতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা করার জন্য জীবনের ঝুঁকি পর্যন্ত নিয়েছিলেন তিনি। আজ তার হাতে তৈরি দল রাষ্ট্রক্ষমতায়। তার আদর্শে উজ্জীবিত লাখ লাখ তরুণ দেশের আনাচে কানাচে। দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কারা নষ্ট করছে এটা সবাই জানে। কেন নষ্ট করছে সেটাও কারো অজানা নয়। সেদিকে না গিয়ে বরং তরুণরা কি বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে তুলে ধরতে পারে না? সে সুযোগ তো তাদের রয়েছে।

বিশ্বাস করা যায়, তরুণরা সচেতন হলে এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনাশকারীদের উপস্থিতভাবে প্রতিরোধ করলেই তবে দেশে আর এরকম ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকবে না। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আশায় না থেকে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতাও তৈরি করতে পারে। তবেই তো মুজিব আদর্শের সৈনিক হওয়ার যোগ্যতা অর্জন করা যাবে। সে যোগ্যতা কি দেশের বর্তমান তরুণদের নেই?

আমার ব্যক্তিগত বিশ্বাস, আছে; এবং এই বিশ্বাসটাও আছে, এই ঘটনার কারণে দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি মোটেই বিনষ্ট হয়নি। এবং কোনোদিন হবেও না। জাতি-ধর্ম, বর্ণ-নির্বিশেষে আমরা সবাই বাঙালি। আমরা সবাই রক্তের বিনিময়ে পাওয়া বাংলাদেশের নাগরিক। গুটিকয়েক নষ্ট চরিত্রের মানুষের কারণে দেশের বিশাল জাতিগোষ্ঠীকে কোনোভাবেই বিচার করা ঠিক হবে না। কারণ দেশের বেশিরভাগ মানুষ নয়, প্রায় সবাই-ই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বিশ্বাস করে। দুনিয়ার অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর দিকে তাকালে কিংবা তাদের ইতিহাস ঘাটলেও দেখা যাবে- সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে বাঙালির ধারেকাছেও কেউ নেই। বাঙালির এই গর্বের ঐতিহ্য রক্ষা করার দায়িত্বটা কি আমাদের সবার নয়?

সহায়ক গ্রন্থ: অসমাপ্ত আত্মজীবনী-শেখ মুজিবুর রহমান

লেখক: শিশুসাহিত্যিক ও প্রবন্ধকার

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

জ্ঞানবৃক্ষ শীর্ণ হচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে

জ্ঞানবৃক্ষ শীর্ণ হচ্ছে প্রযুক্তির অপব্যবহারে

ধর্মীয় বিষয়ে অনেকেই একইভাবে ভাইরাল করাতে বিবেকের চর্চা করেন না। অথচ ফেক আইডি খুলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখে আসছেন তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, কুৎসা ও অপপ্রচার রটনা করে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের যাচাই বাছাই না করে কেউ কেউ মিথ্যা অপপ্রচারে অংশ নিয়ে থাকে।

আমরা যখন স্কুলের ছাত্র ছিলাম তখন স্কুল বিতর্কে শিক্ষকরা ‘বিজ্ঞানের আশীর্বাদ ও অভিশাপ’ এই শিরোনামে দুটি ভাগে আমাদেরকে ভাগ করে দিতেন। যাদের ভাগ্যে অভিশাপের কথা বলার বিষয় পড়ত তারা বেশ বেকায়দায় পড়ত। বিতর্কে নিজেদেরকে বিজয়ী করার জন্য তারা যুদ্ধ বিগ্রহ, মারণাস্ত্র, রাস্তাঘাটে যানবাহনের দুর্ঘটনা ইত্যাদিতে মানুষের হতাহতের বিষয়গুলোকে বিজ্ঞানের অভিশাপ হিসেবে চিহ্নিত করে বলার চেষ্টা করত। কিন্তু বুদ্ধিমান প্রতিপক্ষ যুক্তিতে বুঝিয়ে দিত যে, এতে বিজ্ঞানের দায় নেই, মানুষের স্বার্থগত দ্বন্দ্ব, অজ্ঞতা ইত্যাদিই দায়ী। সুতরাং বিজ্ঞানের ওপর দায় না চাপিয়ে মানুষকেই অধিকতর বিজ্ঞান সচেতন হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

বিজ্ঞানের উৎকর্ষের কারণেই গত কয়েক দশকে মানুষ বিজ্ঞানচর্চা করেই প্রযুক্তির বহুমুখী উদ্ভাবন ঘটিয়ে চলছে। একারণেই বলা হয়ে থাকে এখন প্রযুক্তির যুগ। প্রযুক্তি এখন মানুষের হাতে হাতে চলে এসেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার কে কীভাবে করবে সেটি তার জ্ঞান, সচেতনতা, চিন্তাভাবনা ইত্যাদির ওপর নির্ভর করে।

মানুষের জ্ঞান-বিজ্ঞান সচেতনতা, চিন্তাভাবনা, জীবনবোধ, বিশ্বকে দেখা, নিজেকে অধিকতর উন্নত জীবনের অধিকারী করা ইত্যাদি নির্ভর করে শিক্ষা-দীক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, তথ্য- প্রযুক্তি ইত্যাদি থেকে অর্জিত জ্ঞানের মাধ্যমে। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি অন্যতম একটি গুরত্বপূর্ণ বাহন- যা অনেক কিছুকে সহজে মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে পেতে সাহায্য করে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে বিজ্ঞান মানুষকে উন্নত জীবনযাপন-আর্থসামাজিক ব্যবস্থা, সুখশান্তি-মানবিক মূল্যবোধ ইত্যাদিতে জীবন গড়ার অপরিহার্য উপায় হিসেবে বিবেচিত।

বিজ্ঞানচিন্তা একদিকে মানুষকে উন্নত চিন্তার অধিকারী করে, অপরদিকে মানুষই প্রযুক্তির উদ্ভাবন ঘটিয়ে সবকিছুকে নিজেদের আয়ত্তে আনার সুযোগ সৃষ্টি করছে। তবে এক্ষেত্রে শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। যত উন্নতিই মানুষ লাভ করতে থাকুক না কেন, মানুষকে অতীত অর্জিত জ্ঞানভাণ্ডারের ওপর নির্ভর করে বর্তমান ও ভবিষ্যতের অজানা জ্ঞানবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, জীবনবোধ ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় অধিকতর উন্নত স্তরে যেতে হলে জ্ঞানবিজ্ঞানচর্চার মাধ্যমেই তা অর্জন করতে হবে।

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে অনেক কিছুই আমরা সাধারণ মানুষরাও ব্যবহার করছি। মোবাইল, ইন্টারনেট, ফেসবুক, ইউটিউব, টুইটার, ওয়াটসঅ্যাপ ইত্যাদি এখন সহজলভ্য হয়ে গেছে। এগুলোর মাধ্যমে অনেক কিছু জানা, শেখা, বোঝা, উপলব্ধি করা এবং জীবনকে সহজতর করা খুবই স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। সমাজের বিপুলসংখ্যক মানুষ খুব বেশি লেখাপড়া না জেনেও এসব প্রযুক্তি অনায়াসে ব্যবহার করতে শিখেছে। যারা ব্যক্তিগত জীবনকে নানা কাজে ও উদ্ভাবনী শক্তিতে উদ্ভাসিত করতে চায় তারা এসব প্রযুক্তিকে ব্যবহার করার মাধ্যমে অনেক কিছুই ঘরে বসে সাধন করতে পারে। বিশ্ব যেন এখন তার হাতের মুঠোয়। এই মানুষটি ইচ্ছে করলেই তথ্যপ্রযুক্তির ফেসবুক ব্যবহার করে অনেক কিছু জানতে ও শিখতে পারে। এটি তার জন্য আশীর্বাদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু বিপরীত চিত্রটিও ঘটছে অনেকের জীবনে যারা ফেসবুকে নিজেকে সারাদিন ডুবিয়ে রেখে শুধু নানা ধরনের অর্থহীন, জীবনের তাৎপর্যহীন বিষয়ের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রেখে ক্রমেই আসক্তিতে জড়িয়ে ফেলেছে।

নিজের জীবনের গুরত্বপূর্ণ কাজ ফেলে রেখে ফেসবুকে এটা ওটা দেখা, নানা রকম মন্তব্য জুড়ে দিয়ে নিজেকে জাহির করার চেষ্টা করা। কিন্তু একবারও ভাবেন না এর শেষ অর্জন তার ব্যক্তিগত জীবনে কী বয়ে নিয়ে আসবে? অনেক কিশোর, তরুণ এবং যুবক দীর্ঘদিন ফেসবুকে দিনের উল্লেখযোগ্য সময় কাটাতে গিয়ে একসময় তার ব্যক্তিজীবনের অর্জন, শেখা, গড়ে তোলা বিষয়াদির খাতা ফাঁকা হয়ে যায়। অথচ সে যদি এই প্রযুক্তিটিকেই নতুন তথ্য-উপাত্ত, জ্ঞানের আধার অনুসন্ধানে ব্যবহার করত তাহলে এই প্রযুক্তিটি তাকে অনেক বেশি মেধা, মনন ও চিন্তাশীলতায় সমৃদ্ধ করতে ভূমিকা রাখত। কিন্তু চিন্তাশীল মানুষ হয়ে ওঠার আগেই নতুন প্রযুক্তি হাতে নিয়ে কিশোর-তরুণ বা যুবকটি শেষপর্যন্ত প্রযুক্তির অভিশাপকে নিজের জীবনে যুক্ত করে ফেলে, আশীর্বাদ তার জন্য অধরাই থেকে যায়।

আমাদের দেশে এখন অসংখ্য শিশু-তরুণ বা যুবক এমনকি বয়স্ক ব্যক্তিও ফেসবুকে ছবি দেয়া, অন্যের লেখার ওপর স্থূল মন্তব্য করা, চটুল কথাবার্তা লিখে ফেসবুকে নিজেকে জাহির করা, বিজ্ঞান ও যুক্তির বিষয়কে না বুঝে যা খুশি তাই লিখে দেয়ার মধ্যে নিজেকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে। অনেকেই কী লেখে, কেন লেখে তাও খুব একটা স্পষ্ট নয়। ভুল বানান, বাক্যের ত্রুটি, চিন্তার বিচ্যুতি একেবারেই হাস্যকর পর্যায়ে তাকে নিয়ে যায়। এটিও অনেকে বুঝতে পারে না। এর মূল কারণ হচ্ছে যারা ফেসবুকে না বুঝে শুনে মন্তব্য লিখছে তাদের আসলে পড়াশোনার গণ্ডি কতটা সীমিত তাও তারা জানে না।

ফেসবুকে অনেকে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে যা খুশি তা লেখেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করতে খুবই উৎসাহী অনেককে দেখা যায়। রাজনীতি তারা কতটা পড়াশোনা করে বোঝেন, জানেন এবং লেখেন তাও তাদের মন্তব্য কিংবা লেখা পড়ে বুঝতে কষ্ট হয়। অনেকে আছেন কোনো কিছু যাচাই বাছাই না করেই লাইক ও কমেন্ট দিয়ে থাকেন। কে কোথা থেকে কী লিখল, লাইভে কী বলল, তার উদ্দেশ্য কী তা না জেনেই অনেকে হইহই রইরই করে ফেসবুকে ভাইরাল করিয়ে দেয়। এর ফলে সমাজের লাভ হবে না কি ক্ষতি হবে তার কোনো দায় দায়িত্ব তিনি বোধ করেন না। ধর্মীয় বিষয়ে অনেকেই একইভাবে ভাইরাল করাতে বিবেকের চর্চা করেন না। অথচ ফেক আইডি খুলে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠী সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি ইত্যাদি ক্ষেত্রে যারা অবদান রেখে আসছেন তাদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ, কুৎসা ও অপপ্রচার রটনা করে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের যাচাই বাছাই না করে কেউ কেউ মিথ্যা অপপ্রচারে অংশ নিয়ে থাকে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং আমাদের জাতীয় জীবনে যারা সীমাহীন কষ্ট ও দুর্ভোগ আমাদের জন্য বরণ করেছিলেন তাদের বিরুদ্ধেও কেউ কেউ নানা অপপ্রচার, বানোয়াট কথাবার্তা লিখে তরুণ প্রজন্মকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। দেশ ও বিদেশে বেশ কিছু গোষ্ঠী রয়েছে যারা ফেসবুকে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য, সংস্কৃতি-রাজনীতি, রাষ্ট্রের দর্শন, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়ে অনেক মিথ্যাচার ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে।

উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই একটি গোষ্ঠী সামাজিক এই মাধ্যমটিকে অপব্যবহার করছে। উঠতি অনেক তরুণ-তরুণী এসব অপপ্রচারের রহস্য ভেদ করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে পারছে না। তারা দারুণভাবে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এই বিভ্রান্তি শেষ পর্যন্ত তাদেরকে দিগভ্রান্তিতে ফেলে দিচ্ছে। অথচ এরা যদি ফেসবুকের এসব বানোয়াট যাচাই বাছাইহীন বিকৃত তথ্য-সংবলিত লেখালেখি না পড়ে, গুগল, উইকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া ইত্যাদি সার্চ করে নিজের অনুসন্ধিৎসু মনকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করত তাহলে তারা নিজেরাই লাভবান হতে পারত।

ফেসবুকে তাদের চটুল, মনগড়া, বানোয়াট, বিভ্রান্তিকর, ভুল বানান ও বাক্যে ভরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লেখা ও মন্তব্যে সময় না কাটিয়ে যদি প্রযুক্তির আসল মাধ্যমগুলো ব্যবহার করত তাহলেও তাদের জানা ও শেখার সুযোগ অনেক বেড়ে যেত। বুঝতে হবে ফেসবুক ভালো মানুষরাও যেমন ব্যবহার করে, খারাপ-অসৎ, অযোগ্য এবং প্রতারক মানুষরাও তাদের উদ্দেশ্য সিদ্ধির জন্য ব্যবহার করে থাকে।

সেকারণে ফেসবুককে এখন অনেকেই সাবধানতার সঙ্গে ব্যবহার করে থাকেন। কারণ এই প্রযুক্তিটি অপব্যবহারকারীদের কারণে দেশে দেশে সবচাইতে সমালোচিত মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনেক রাষ্ট্রই ফেসবুককে বেশ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার উদ্যোগ নিয়েছে কারণ নিয়ন্ত্রণহীন ফেসবুকের মাধ্যমে সভ্যতা বড় ধরনের সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এটি বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রগুলোও উপলব্ধি করতে পেরেছে।

অনেক উন্নত দেশের নাগরিকরা এখন আর ফেসবুকের সামনে বসতে উৎসাহী নন, অনেকে ব্যবহার ছেড়েও দিয়েছেন। কিন্তু আমাদের দেশে এ বছর ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৫ কোটিতে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি ফেসবুক ব্যবহার করে অনেকেই ধর্মীয় উন্মাদনা সৃষ্টির মাধ্যমে নানা অঘটন ঘটিয়েছে। তাতে মানুষের জীবন, সম্পদ ধ্বংস হয়েছে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির নানা ঘটনা ঘটেছে। অথচ ফেসবুকে প্রচারিত সব প্রচারণাই মিথ্যে ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে জানা যাচ্ছে। সুতরাং ফেসবুক ব্যবহারে আমাদেরকেও উন্নত দুনিয়ার মতো হিসেবি ও পরিণত বোধের পরিচয় দিতে হবে।

ফেসবুক যত বেশি মানুষই ব্যবহার করুক না কেন, নিজেকে সত্যিকার অর্থে শিক্ষিত, জ্ঞানী-গুণী ও সৃষ্টিশীল মানুষ করার জন্য বই পড়ার কোনো বিকল্প থাকতে পারে না। প্রাচীন যুগ থেকে মানুষ বই পড়েই চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী, জ্ঞানী-গুণী হওয়ার শিক্ষা লাভ করেছে। এখনও উন্নত দুনিয়ায় মানুষ বই কিনছে, পড়ছে এবং লিখছে। করোনার এই অতিমারিকালে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে বইপড়ার অভ্যাস বেড়েছে এমন পাঠকের সংখ্যা গণমাধ্যমে সংবাদ হয়ে এসেছে। ঘরে বসে ওরা ফেসবুক নিয়ে সময় কাটায়নি বরং নিজের পছন্দের বই পড়ে জানার আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে।

সাহিত্য না পড়ে কেউ কখনও ভাষাজ্ঞান, কল্পনাশক্তি, সমাজ সচেতনতা, মানব মনের নানা খুঁটিনাটি দিক সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারে না। ইতিহাস-সমাজ, দর্শন-অর্থনীতি, নৃ-বিজ্ঞান, জাতিতত্ত্ব-মনোবিজ্ঞান ইত্যাদি বিষয়ে মৌলিক বই না পড়ে কেউ কোনোদিন মানব সভ্যতার অর্জন, সমস্যা, সংকট ও উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়ার কোনো কারণ নেই। বিজ্ঞানের জটিল বই পড়ে মানুষ আজকের দুনিয়ার জটিল বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান দেয়ার চেষ্টা করছে। গবেষণা ও লেখালেখিতে উন্নত দুনিয়ার মানুষ আগের চাইতে বেশি মনোযোগী হচ্ছে। সেই তুলনায় আমরা ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছি।

আমাদের শিক্ষার্থীদের হাতে এখন আগের মতো সাহিত্য-দর্শন, ইতিহাস-সংস্কৃতি, সমাজ ও বিজ্ঞানবিষয়ক বই পুস্তক নেই। বই পড়ার অভ্যাস এখন আগের তুলনায় আমাদের সমাজে দ্রুতই কমে যেতে দেখা যাচ্ছে। জ্ঞানবিজ্ঞানের বই খুব একটা বিকোচ্ছে না। অথচ চটুল, হালকা, স্থূল নানা মনোরঞ্জন-বিষয়ক বই-পুস্তক চলছে বলে প্রকাশকরা বলে থাকেন। ধর্মের মৌলিক গ্রন্থ না পড়ে হালকা বই পড়ার প্রবণতা মোটেও সুখকর নয়।

মৌলিক গ্রন্থ পড়া ছাড়া কেউ কখনও চিন্তার গভীরে যাওয়ার যোগ্যতা অর্জন করতে পারে না। আমাদের শিক্ষার্থীদের মধ্যে মৌলিক কিংবা মৌল বই পড়ার পরিবর্তে নোটবই, গাইডবই পড়ার ঝোঁক প্রবলভাবে বিরাজ করছে। এমনকি সব ধরনের সরকারি চাকরির পরীক্ষার জন্য বাজারে নোটবই, গাইডবই দেদারসে বিক্রি হচ্ছে। বিসিএস পরীক্ষা দেয়ার আশায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রছাত্রীদের বড় অংশই গাইডবই সংগ্রহ বা খোঁজার চেষ্টা করে থাকে । তাদের মধ্যেও এখন মৌলিক বই পড়ার অভ্যাস কমে গেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরিতে বিসিএস পরীক্ষার্থীদের কর্নার যতটা সরগরম, মূল লাইব্রেরি ততটাই ছাত্রশূন্য হয়ে পড়েছে। বোঝাই যাচ্ছে আমাদের জাতীয় জীবনে মৌলিক বই পুস্তকের গুরত্ব অনেকটাই কমে গেছে। একুশের মেলায় প্রতিবছর কয়েক হাজার বই প্রকাশিত হয় বলে দাবি করা হয়। কিন্তু মৌলিক চিন্তাশীল, মননশীল বই প্রকাশের সংখ্যা হিসাবে নিলে কষ্ট পেতে হবে।

আমাদের সমাজে এখন মননশীল, চিন্তাশীল মৌলিক গ্রন্থ পড়ার পাঠকের সংখ্যা কমে গেছে। এটি বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। এখনই গোটা শিক্ষাব্যবস্থায় সবধরনের মৌলিক বই পড়ার প্রয়োজনীয়তা ও গুরত্বকে স্থান দিতে হবে। তাহলেই ফেসবুকের হালকা চটুল লেখা, স্কুল-কলেজের গাইডবই, নোটবই থেকে আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্ত করে আনা সম্ভব হবে।

লেখক: অধ্যাপক, গবেষক।

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন

ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

ইসলামে সাম্প্রদায়িকতার স্থান নেই

ইসলামে যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেয়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর কোনোভাবে ধর্মসম্মত হতে পারে না। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন- “কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব।” (আবু দাউদ)

কুমিল্লার পূজামণ্ডপে যে ব্যক্তি কোরআন শরিফ রাখে, তাকে শনাক্ত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর মাধ্যমে মন্দিরে কোরআন শরিফ রাখার যে গল্পটি প্রচারিত হয়- সেটি এবং এর পরবর্তী ঘটনাগুলো নিয়ে মোটামুটি সব পক্ষই এ উপসংহারে পৌঁছেছে যে, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সুকৌশলে কাজটি ঘটানো হয়। পূজা ছিল উপলক্ষ মাত্র। কিন্তু যে আগুন ১৩ অক্টোবর ফেসবুকের মাধ্যমে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সে আগুনই অন্তত ১৬ জেলায় হিন্দুদের বাড়ি ও প্রতিমা ভাঙচুরের ইন্ধন দিয়ে পুড়িয়ে গেছে রংপুরের পীরগঞ্জের হিন্দু সম্প্রদায়ের তিনটি গ্রামও।

এই সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কারণে এবার অনেক জায়গায় পূজার সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করা যায়নি, প্রতিমা বিসর্জনও হয়নি অনেক জায়গায়। মূলত, কুমিল্লার ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় পাঁচদিনের উৎসবের তাল কেটে যায় তৃতীয় দিনেই।

মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি দেশে- যে দেশটিকে এর স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ধর্মনিরপেক্ষ, অসাম্প্রদায়িক ও সব মানুষের দেশ হিসেবে গড়ে তোলেন, সেখানে এমন ঘটনা শুধু দুঃখজনকই নয়, দেশের মূল চেতনা আর নীতিরও পরিপন্থি। তবে একটু দেরিতে হলেও সরকারের পক্ষ থেকে নেয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ ইতোমধ্যে দৃশ্যমান হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন কঠোর বার্তা। কিন্তু তাতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের মনে যে ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে, হৃদয় থেকে যে রক্তক্ষরণ হয়েছে; তার কতটুকু উপশম হবে সে প্রশ্ন থেকেই যায়।

মুক্তিযুদ্ধের পর এদেশের হিন্দু সম্প্রদায় নতুন দেশে সমধিকার নিয়ে বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধে অন্য সম্প্রদায়ের তুলনায় তাদের ত্যাগও বেশি। কিন্তু এত দীর্ঘ সময় পরও আমাদের সামনে এখন একটি প্রশ্ন স্পষ্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, আসলে তাদেরকে এখনও এদেশের নাগরিক হিসেবে মেনে নিতে পারছি কি না?

পরিসংখ্যান বলছে, পাকিস্তান আমল তো বটেই, স্বাধীন বাংলাদেশেও অধিকাংশ সময় ‘সংখ্যালঘু’দের কাটাতে হয়েছে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে। রাজনৈতিক সহিংসতার সুযোগে একটি স্বার্থান্বেষী মহল ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে বার বার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে আসছে। অথচ এসব সাম্প্রদায়িক কাজ মহানবীর (সা.) এর নির্দেশনা ও ইসলামি শিক্ষার সম্পূর্ণ বিপরীত।

সুরা আনআমের ১০৮ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে-

“তারা আল্লাহকে বাদ দিয়ে যেসব দেবদেবীর পূজা-উপাসনা করে, তোমরা তাদের গালি দিও না। যাতে করে তারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহকে গালি দিয়ে না বসে।”

ইসলামে যেখানে অন্য ধর্মের দেবতাকে গালি দেয়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে, সেখানে মন্দির ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর কোনোভাবে ধর্মসম্মত হতে পারে না। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন-

“কোনো মুসলমান যদি ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের অধিকার ক্ষুণ্ণ করে কিংবা তাদের ওপর জুলুম করে, তবে কেয়ামতের দিন আমি মুহাম্মদ ওই মুসলমানের বিরুদ্ধে আল্লাহর আদালতে লড়াই করব।” (আবু দাউদ)

মূলত পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর থেকে তারা কার্যত দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকে পরিণত হয়েছে। এরপর সামরিক বা বেসামরিক লেবাসে জিয়া, এরশাদসহ যারাই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় এসেছে, তারা শুধু যে সংবিধানকে ধর্মীয় এবং সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে আবদ্ধ করেছিলেন তা নয়, মাইনরিটি ক্লিনজিং প্রক্রিয়াও ত্বরান্বিত করে গেছেন।

১৯৯০ ও ১৯৯২-এ এরশাদ ও বিএনপি আমলে রাষ্ট্রযন্ত্রের সহায়তায় সাম্প্রদায়িক সহিংসতা লাগিয়ে সংখ্যালঘুদের বহু ঘরবাড়ি ও মন্দির ভাঙা হয়েছে। ২০০১-এর নির্বাচনের পর ক্ষমতাসীন বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা সারা দেশে সংখ্যালঘুদের ওপর যে তাণ্ডব চালায়, স্বাধীনতার পর এটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ নির্যাতন। তখন পূর্ণিমা আর সীমাদের কান্নায় বাতাস ভারী হলেও অপরাধীরা শাস্তি পায়নি। গণহত্যা, অপহরণ, ধর্ষণ, জোর করে বিয়ে, ধর্মান্তরিত করা, চাঁদা আদায় ও সম্পত্তি দখল কোনোকিছুই যেন বাদ ছিল না সে সময়।

দেশে প্রায় দেড় কোটি লোক আছে হিন্দু সম্প্রদায়ের। পৃথিবীর অনেক দেশ আছে যেসব দেশের জনসংখ্যাই এর চেয়ে কম। এই বিরাট জনগোষ্ঠীর মেজরিটিই এখন জবরদস্তি ও পীড়নের শিকার। আগে আড়ালে-আবডালে বলা হলেও এখন মুখের সামনেই তাদের বলা হয় ‘মালাউন’। এটা পরিষ্কার যে, একাত্তরের পরাজিত শক্তি ‘সংখ্যালঘু’ হ্রাসকরণ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে দেশে একটি গণতন্ত্র ও সার্বভৌমত্বের সংকট তৈরি করতে চায়। কারণ, এরা ভাবছে, যদি ‘সংখ্যালঘু’দের তাড়িয়ে দেয়া যায় তাহলে বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র করাও সহজতর হবে।

প্রথম আলোর ২০১২-এর ২২ সেপ্টেম্বরের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়- দেশের জনসংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বাড়ছে না। ২০০১ ও ২০১১ সালের আদমশুমারির জেলাভিত্তিক তথ্য পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, ১৫টি জেলায় হিন্দু জনসংখ্যা কমে গেছে। জনসংখ্যাবিদদের মতে, এটি ‘মিসিং’ পপুলেশন বা ‘হারিয়ে যাওয়া মানুষ’। এরা কেন হারিয়ে গেল? কেন নীরবে দেশত্যাগ করার কারণে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারে অবিশ্বাস্য নেতিবাচক প্রভাব পড়ল তা নিয়ে কেউ কি ভেবেছে? একটা উদাহরণে কিছুটা স্পষ্ট হতে পারে।

এক পরিসংখ্যান জানাচ্ছে- বরিশাল বিভাগের কোনো জেলাতেই হিন্দুদের সংখ্যা বাড়েনি। বরিশাল, ভোলা, ঝালকাঠি, পিরোজপুর, পটুয়াখালী এবং বরগুনা; এই ছটি জেলায় ২০০১-এর আদমশুমারিতে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৮ লাখ ১৬ হাজার ৫১ জন। ২০১১-এর শুমারিতে এ সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ লাখ ৬২ হাজার ৪৭৯ জন। খুলনা বিভাগের বাগেরহাট, খুলনা, সাতক্ষীরা, নড়াইল ও কুষ্টিয়া; এ ৫ জেলায় হিন্দুদের সংখ্যা আগের চেয়ে কমেছে। উল্লেখ্য, ২০০১-এ বরিশাল ও খুলনা বিভাগেই সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে।

গত কবছর ধরে আমরা দেখছি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিতাড়ন ও উচ্ছেদে স্থানীয় রাজনৈতিক পরিচয়ধারী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী একযোগে কাজ করে। ২০১২ সালে রামুতে ট্রাকে করে লোক এসে বৌদ্ধমন্দিরে হামলা করে। নাসিরনগরে কয়েক ঘণ্টা ধরে হামলা করা হয় তা সবার জানা। আর সুনামগঞ্জের শাল্লায় তো মাইকিং করে লোক জড়ো করা হয়েছে। এসব ঘটনা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, দীর্ঘ প্রস্তুতি নিয়েই সংখ্যালঘুদের ওপর হামলাগুলো করা হচ্ছে।

আরেকটি ব্যাপার হলো, যত হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাই ঘটুক; পুলিশ আসে ঘটনার পরে। কুমিল্লায় পূজামণ্ডপে হামলা ও লুটপাটের পর পুলিশ এসেছে, একই অবস্থা রামুতেও হয়েছিল। আর পীরগঞ্জে আমরা দেখলাম, পুলিশ নিরাপত্তা দিতে গেল এক জায়গায়, কিন্তু অগ্নিসংযোগ হলো অন্য জায়গায়।

আমরা নিজেদের অসাম্প্রদায়িক দাবি করছি। অথচ কদিন ধরে ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর যে সন্ত্রাসী হামলা হলো, তাদের মন্দির ও পূজামণ্ডপে ভাঙচুর করা হলো- বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ করা হলো- সেসব ঘটনা সংখ্যাগুরুদের মনে কি খুব একটা দাগ কেটেছে? উল্টো রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীরা যেসব কথা বলছে, তাতে আক্রান্তের ওপর তাদের সহানুভূতি প্রকাশের চেয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লাভের চেষ্টাই বেশি দেখা গেছে।

এ কারণে হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদের সাধারণ সম্পাদক রানা দাশগুপ্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলেন- ‘রাজনৈতিক নেতাদের প্রতি আমাদের আস্থা নেই।’ কিন্তু এই অনাস্থা কি একদিনে তৈরি হয়েছে? ক্রমাগত আক্রান্ত হতে হতে তাদের পিঠ এখন দেয়ালে ঠেকে গেছে।

কোনো দেশের ‘সংখ্যালঘু’ নিরাপদ থাকবে কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে সেদেশের সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের মনমানসিকতার ওপর। বাংলাদেশের ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়ের মানুষ মাটি কামড়ে এদেশেই থাকতে চায়। তাদের তাড়িয়ে বা তাদের দেশ ছাড়তে বাধ্য করে বাংলাদেশ কি লাভবান হতে পারবে? বাংলাদেশ পাকিস্তানের মতো হোক সেটা আমরা কেউই চাই না।

দেশটিতে একদিকে যেমন সংখ্যালঘু নিঃস্বকরণ প্রক্রিয়া সফলতার সঙ্গে এগিয়ে চলেছে, একইভাবে সংখ্যাগুরুরাও নিজেদের মধ্যে মারামারি করছে। সেখানে শিয়ারা সুন্নিদের মারছে, সুন্নিরা শিয়াদের। আর সবাই মিলে হত্যা করছে মানবতাকে। বাংলাদেশেও যাতে সে পরিস্থিতির উদ্ভব না হয়, সেজন্য এখনই আমাদের সজাগ হওয়া উচিত।

পাশাপাশি ‘সংখ্যালঘু’ সম্প্রদায়কে সুরক্ষায় নারী নির্যাতন দমন আইনের মতো একটি বিশেষ আইন প্রণয়ন করা যেতে পারে। বর্তমানে যে আইনগুলো আছে, সেসব দিয়ে এ সমস্যা মোকাবিলা করা যাবে না। এ আইন প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত সন্ত্রাস দমন আইন, দ্রুত বিচার আইন ও বিশেষ ক্ষমতা আইনের প্রয়োগ ঘটানো যেতে পারে। ‘সংখ্যালঘু’দের পাশে দাঁড়ানো উচিত ‘সংখ্যালঘু’দের স্বার্থে নয়, সংখ্যাগুরুদের স্বার্থেও। কারণ, বহুত্ববাদের ধারণা থেকে রাষ্ট্র একবার সরে এলে সেটি ফিরিয়ে আনা শুধু কঠিনই হবে না বলা যায় অসম্ভব হয়ে যাবে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক

আরও পড়ুন:
ধ্বনিত হোক জীবনের স্পন্দন
বদ্ধবুদ্ধির ইতিহাসচর্চা ও ঐতিহ্য রক্ষার সংকট
তারুণ্যের রাজনৈতিক দল
ভূমধ্যসাগরে স্বপ্নের সলিল সমাধি 
ক্ষুধার রাজ্যে মুখেন্দ্রদের মুখচ্ছবির আধিক্য!

শেয়ার করুন