শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

শারদীয় দুর্গাপূজা ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি

মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রচারণায় ধ্বংসযজ্ঞ চলানোর প্রচেষ্টা রয়েছে এখনো। তবে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হয়েছেন; তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সব ধর্মের মানুষ। ধর্মীয় বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা আমাদের মতো অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য সত্যিই উদ্বেগজনক ঘটনা।

বিজয়া দশমীর মাধ্যমে শেষ হচ্ছে এবারের শারদীয় দুর্গোৎসব। করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্যে এবারের দুর্গা পূজা আয়োজনে ছিল স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার তাগিদ। ফলে বাঙালি হিন্দুদের সবচেয়ে বড় দুর্গোৎসবের মাত্রা ছিল কিছুটা সীমিত।

যদিও বর্তমান সরকার অসাম্প্রদায়িক চেতনা বিস্তার ও সম্প্রীতি রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে তবু থেমে নেই নানা অপতৎপরতা। অবশ্য এদেশের সংবিধানের মৌল চেতনাকে সমুন্নত রাখতে বদ্ধপরিকর সচেতন জনগোষ্ঠী।

এসবের ভেতরই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে দেখা গেছে, দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই সারা দেশে দুর্গোৎসব উদযাপন করেছে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা।

২.

সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশের কথা বলতে হলে আমাদের দেশে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনাগুলোও উল্লেখ করতে হবে। সেখান থেকেই পরিত্রাণের উপায় অন্বেষণ করতে হবে।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে যে সহিংসতা শুরু হয়েছিল তার ভয়ঙ্কর রূপটি শেষ হয় নির্বাচনোত্তর হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর নির্মম আঘাতের মধ্য দিয়ে।

সে সময় গ্রামের পর গ্রামের অমুসলিম জনগোষ্ঠী আক্রান্ত হয়েছে। বীভৎস অত্যাচার আর লুটপাটের শিকার হয়েছে সাধারণ সহজ-সরল নারী-পুরুষ।

আহত ও নিহতের সংখ্যা দিয়ে সেই নিপীড়ন বিবেচনা না করে বরং ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অস্তিত্ব সংকটের বাস্তবতা পর্যালোচনা করা দরকার। কারণ, আমরা কথায় কথায় বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে থাকি। কিন্তু অত্যাচার থেকে মুক্ত করা সম্ভব হয় না সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে।

এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও নির্মম সব ঘটনা ঘটেছে এ দেশে। যদিও তা ২০০১-এর নির্বাচনোত্তর বিএনপি-জামাতের ব্যাপক হত্যা ও সহিংসতার মতো ছিল না।

২০১২ সালে কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম জেলার বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর ওপর আক্রমণের পর সংবাদপত্র লিখেছিল, দেশ ও জাতির জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায় রচিত হলো। বৌদ্ধ সম্প্রদায় যে এদেশেরই ভূমিসন্তান; অনেক আগে থেকেই বসতি এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করে আসছে; তারও অনুপুঙ্খ পর্যালোচনা উপস্থাপন করে তাদের ওপর জঘন্য হামলার নিন্দা ও বিচারের দাবি জানানো হয়েছিল সে সময়।

অতীতে সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিক এবং সাপ্তাহিকসহ অনেক ইলেক্ট্রনিক ও অনলাইন সংবাদ মাধ্যম একাত্ম হয়েছে। কেবল হিন্দু বা বৌদ্ধ সম্প্রদায় নয় খ্রিস্টান সম্প্রদায়ও আজকের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে হুমকির সম্মুখীন হয়েছে।

এমনকি অতীতে বরিশালের ব্যাপ্টিস্ট চার্চের ভূ-সম্পত্তি দখলের সংবাদ প্রকাশ করে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে সংবাদপত্রই; যদিও সেই দখল প্রচেষ্টার কোনো সুরাহা হয়নি আজও। সেই ঘটনার সঙ্গে আওয়ামী সমর্থিত দখলবাজ নেতা-কর্মীরা জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

মিডিয়ার ইতিবাচক ভূমিকা অনেক সময় নেতিবাচকে পরিণত হয় ক্ষমতাসীনের দাপটে; আবার সরকার সমর্থিত মিডিয়ার ভিন্ন অর্থাৎ সংখ্যালঘুর বিপক্ষে অবস্থানের আচরণও লক্ষ করা গেছে অতীতে।

২০০১ সালে নির্বাচনোত্তর সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের সময় তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের মদদপুষ্ট কয়েকটি পত্রিকার নেতিবাচক আচরণ সবার স্মরণে আছে নিশ্চয়। সেসব পত্রিকার নেতিবাচক আচরণ বাদ দিলে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে মিডিয়ার যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সে সময় দেখেছিলাম তাও ছিল গণতন্ত্র ও মানবতার পক্ষের শক্তির জাগরণের অবদান হিসেবে তাৎপর্যবহ।

তবে বিস্ময়কর হচ্ছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও ২০০১ সালের নির্বাচনোত্তর তাণ্ডবের মতো সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাস হয়েছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৪ সালের অক্টোবর পর্যন্ত দেশে এক হাজার ৬৯৯টি মন্দির ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ৩০২ জন হত্যা এবং ৩৯২ জন ধর্ষণের শিকার হন।

দিনাজপুরের চিরিরবন্দরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর জঘন্যতম হামলা হয়েছে। তার আগে ২০১২ সালের ফেব্রুয়ারির ৯ ও ১০ তারিখে চট্টগ্রামের হাটহাজারির হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা এবং অগ্নিসংযোগ আর সাতক্ষীরার মতো ঘটনা যেন রাজনৈতিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

২০১৩ সালের ৩১ মার্চ থেকে ১ এপ্রিল সাতক্ষীরার অগ্নিসংযোগ ও তাণ্ডবের ঘটনায় ছিল জামায়াতের প্রত্যক্ষ ইন্ধন। স্থানীয় একটি পত্রিকায় উস্কানিমূলক খবর প্রকাশের পর কালীগঞ্জের ঘর-বাড়িতে যে আগুন জ্বলেছে, তাতে একইসঙ্গে পুড়েছে হিন্দু ও মুসলমানের পবিত্র গ্রন্থ। ধর্মীয় মৌলবাদীরা সুযোগের সন্ধানে রয়েছে; তারই স্পষ্ট আলামত দেখা গেছে সেখানকার ঘটনায়। স্কুলের ছাত্রদের অভিনীত একটি নাটক কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি পত্রিকার উস্কানি ধর্মান্ধ রাজনীতির সংস্কৃতির পরিপূরক হয়ে উঠেছিল।

আবার নিষিদ্ধ ঘোষিত ধর্মভিত্তিক গোপন সংগঠনের কার্যক্রম যে থেমে নেই তারও দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে নানান ঘটনা থেকে; যেখানে তারা নিজেদের মধ্যেই বিরোধে লিপ্ত হয়েছে। এসব ঘটনার বিরুদ্ধেও সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে।

আগে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মানুষ হত্যা ও নারী ধর্ষণ মুখ্য ঘটনা ছিল। কিন্তু কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলায় ২০১২ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর শনিবার দিবাগত রাতের পরিস্থিতি ও হামলার ধরন পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, হামলাকারীদের মূল লক্ষ্য দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলা।

দেশের সাধারণ মানুষের জীবনে উন্নতি ঘটেছে; সামাজিক ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধি পেয়েছে। এসবকেই ধ্বংস করতে চায় মৌলবাদী জনগোষ্ঠী। অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের সাজার হাত থেকে রক্ষার জন্য স্বাধীনতার শত্রুরা অপপ্রচার এবং ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার অপচেষ্টায় মরিয়া হয়ে উঠেছিল একসময়।

রামু উপজেলার বৌদ্ধ পাড়ার উত্তম বড়ুয়া উপলক্ষ মাত্র। কারণ একই অভিযোগে আরেক দল দুষ্কৃতকারী চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কোলাগাঁও ইউনিয়নের লাখেরা এলাকায় হিন্দুদের একটি মন্দির ও ৪টি বৌদ্ধ উপাসনালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করে। পূর্ণিমা উপলক্ষে সেখানে বৌদ্ধ ধর্মীয় অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল।

অন্যদিকে কক্সবাজারের উখিয়ার একটি বৌদ্ধ বিহারেও একইদিন সন্ধ্যায় হামলা চালানো হয়েছে। তবে রামুর বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকায় এ হামলা হয়েছে বেশি। বর্তমান সরকারের গত আমলে (২০০৯ থেকে ২০১৮) খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটিতে বড় ধরনের সংঘাতের ঘটনা ঘটেছে। সবশেষ ২০১৩ সালে সংঘটিত হয় রাঙ্গামাটি জেলাশহরের সরকারি কলেজে। ঘটনাটি ঘিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে; হাঙ্গামায় দুই পক্ষের শ'খানেক আহত হয়।

২০১০ সালে রাঙ্গামাটির ৩৬ নম্বর ইউনিয়ন সাজেকে বাঙালি-পাহাড়ি সংঘাতে নিহত হয়েছিল বেশ কয়েকজন। তোলপাড় সৃষ্টি করা সেই ঘটনার পিছনেও মৌলবাদীদের ইন্ধন ছিল। ২০১১ সালে খাগড়াছড়ির বড়পিলাকে বাঙালি-পাহাড়িদের মধ্যে যে সংঘাত হয় তাতেও হতাহতের ঘটনা ঘটে। অর্থাৎ নিশ্চিতভাবে বলা চলে পরিকল্পিতভাবে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের টার্গেট করে হামলা চালানো হয়েছে।

কেউ কেউ বিষয়টিকে ইসলামবিরোধী চলচ্চিত্রের প্রতিবাদের সঙ্গে এক করে পর্যবেক্ষণ করছেন। মুসলিমদের সঙ্গে হিন্দু ও বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করে ফায়দা লুটচ্ছে কেউ কেউ। এখনো নয়াদিগন্ত, ইনকিলাবের মতো সংবাদপত্র সংবাদ পরিবেশনায় পার্বত্য এলাকায় খ্রিস্টান মিশনারিদের ধর্মপ্রচারকে আক্রমণ করে বৌদ্ধদের সঙ্গে খ্রিস্টানদের দাঙ্গা সৃষ্টির উসকানি দিচ্ছে।

মৌলবাদী ও জঙ্গিগোষ্ঠীর প্রচারণায় ধ্বংসযজ্ঞ চলানোর প্রচেষ্টা রয়েছে এখনো। তবে ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে যারা সোচ্চার হয়েছেন; তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সব ধর্মের মানুষ। ধর্মীয় বিষয়ে গুজব ছড়িয়ে অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা আমাদের মতো অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের জন্য সত্যিই উদ্বেগজনক ঘটনা।

সুখের বিষয় শেখ হাসিনার সরকার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের ঘটনার পর পরই অবিলম্বে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় এমন কোনো কর্মকাণ্ড সরকার বরদাশত করবে না বলেও প্রধানমন্ত্রী পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন।

তবে আমাদের মধ্যে প্রশ্ন থেকে যায় যে, যদি বলা হয় সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ‘পরিকল্পিতভাবে’ এই ঘটনা ঘটিয়েছে তাহলে গোয়েন্দা সংস্থা ও তৃণমূল প্রশাসন জনগণের জানমাল রক্ষার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ হওয়ার আগে এবং মন্ত্রীদের কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের আগেই কৃতিত্ব নিতে পারত পুলিশবাহিনীসহ অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা।

সম্প্রীতি রক্ষায় ‘ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের বিকল্প নেই’বলা হচ্ছে বারবার। সাম্প্রদায়িক সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এই ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ হতে হবে দল-মত নির্বিশেষ মানুষের দ্বারা; তাহলে বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্যে জাতি-ধর্ম-বর্ণ সম্মিলিতভাবে বেঁচে থাকার প্রয়াস সফল ও সার্থক হয়ে উঠবে।

মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বঙ্গবন্ধু আর আমাদের বাঙালি সংস্কৃতির যা কিছু প্রাণিত সম্পদ তার জন্য দরদ ঢেলে আকাঙ্ক্ষার মেঘ হয়ে ঝরে পড়া দেশ আমাদের বাংলাদেশ। অথচ দাঙ্গা ও সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পাল্টে যায় তার রূপ।

৩.

সর্বধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখা কঠিন কাজ। যারা আমাদের ধর্মীয় সম্প্রীতি নষ্ট করছে তারা দেশ জাতি ও সব ধর্মের শত্রু। সবাই মিলে ঐক্যবদ্ধভাবে এই শত্রুদের মোকাবেলা করতে হবে। কারণ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার যত ঘটনা বাংলাদেশে ঘটেছে কোনোটির সঙ্গেই ধর্ম নয়, রাজনীতি জড়িত। কোনো ঘটনারই আজ পর্যন্ত বিচার হয়নি।

তবে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশ। কেবল রাজনৈতিক কারণে বিএনপি-জামায়াত জোট আমলে জঙ্গি রাষ্ট্র বলা হয়েছিল একে। যারা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। যারা ধর্ম সম্পর্কে কম জানেন তারাই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করেন। নিজেদের স্বার্থেই আমাদের সবাইকে সম্প্রীতি রক্ষায় কাজ করতে হবে।

বাংলাদেশ সাংবিধানিকভাবে অসাম্প্রদায়িক। আর সম্প্রীতি বজায় রাখতে হলে আমাদের সব ধর্মের মানুষের সঙ্গে মিশতে হবে, জানতে হবে। সেই প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে এদেশের সব মুসলমান-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধকে।

(বিশ্লেষণ বিভাগে প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব)

ড. মিল্টন বিশ্বাস: লেখক, কবি, কলামিস্ট; সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ প্রগতিশীল কলামিস্ট ফোরাম; নির্বাহী কমিটির সদস্য, সম্প্রীতি বাংলাদেশ এবং অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

শেয়ার করুন

মন্তব্য

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূচনা লগ্ন ও অনুচ্চারিত কিছু কথা

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের সূচনা লগ্ন ও
অনুচ্চারিত কিছু কথা

পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) সীমান্ত রেখায় ভারতীয় ভূখণ্ডে ভারত স্বাভাবিক কারণেই সৈন্য ও সমরাস্ত্র সমাবেশ করেছিল। সম্ভবত ভারতের দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর উদ্দেশ্যে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তান আচমকা বিমান হামলা করে। বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পাকিস্তান বিমান হামলা করে। পাকিস্তানের মিরেজ-৩ বিমানগুলো পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে। এতে রানওয়ের কিছুটা ক্ষতি সাধিত হয়। এরপর বিমান হামলায় পাঞ্জাবের অমৃতসরের রানওয়েরও ক্ষতিসাধিত হয় তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা মেরামত করা সম্ভব হয়।

মুক্তিযুদ্ধের একটি নিষ্পত্তিমূলক পরিণতি অর্থাৎ চূড়ান্ত বিজয়ের পথে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অন্তরালে রাজনৈতিক কারণ কিছুটা ভূমিকা রাখলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ব্যক্তিগত সহানূভূতি ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ছিল নির্যাতিত নিপীড়িত বাঙালির প্রতি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে তিনি মূল্য দিয়েছিলেন। ফলে প্রায় এককোটি শরণার্থীর ভার তিনি অবলীলায় গ্রহণ করেছিলেন। তিনি পাশে পেয়েছিলেন সমমনা রাজনৈতিক সহকর্মী ও সামাজিক সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেককে। কিছু বিরুদ্ধ চিন্তার রাজনৈতিক ঘরানার মানুষের প্রতিরোধের মুখোমুখি হলেও নিজ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও চারিত্রিক দৃঢ়তা নিয়েই ইন্দিরা গান্ধী তার লক্ষ্যে এগিয়েছিলেন।

ভারত মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ও অস্ত্র সহায়তা করে গেরিলা যোদ্ধাদের এগিয়ে দিয়েছিল। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযোদ্ধারা অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে নভেম্বরের মধ্যে কোণঠাসা করে ফেলেছিল পকিস্তানি বাহিনীকে। কিন্তু এ সত্যটিও মানতে হবে পাকিস্তানি বাহিনীর মতো একটি প্রশিক্ষিত বাহিনীকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করতে হলে সম্মুখযুদ্ধের বিকল্প ছিল না। ট্যাঙ্ক-কামান, মর্টারসহ ভারী অস্ত্র ও বিমান বাহিনীর সমর্থন ছাড়া এই যুদ্ধের নিষ্পত্তি এতটা অল্প সময়ে সম্ভব ছিল না।

এই সত্য মেনে একাত্তরের শেষদিকে এসে মুক্তিপ্রত্যাশী বাঙালির চাওয়া ছিল ভারতীয় বাহিনী সরাসরি আমাদের পাশে থেকে সাহায্য করুক। বিষয়টি নিয়ে সেসময়ের স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গভীরভাবে ভেবেছে। যুদ্ধে ভারত সরাসরি অংশ নিলে এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে এসব নিয়েও ভাবতে হয়েছে।

এমন একটি বাস্তবতায় ২৬ অক্টোবর থেকে ছাব্বিশ দিন ইন্দিরা গান্ধী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপ সফর করেন। এসময়ে তিনি বিশ্ববাসীকে বোঝাতে চেষ্টা করেছিলেন যে, বাস্তব কারণেই পূর্ব পাকিস্তানে ভারতের সামরিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন রয়েছে। বিশ্ব নেতৃবৃন্দ অনেকেই এতদিন আশা করেছিলেন পাকিস্তান একটি রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যাবে। কিন্তু ক্রমে সে আশা ফিকে হয়ে যাচ্ছিল। অবস্থা যে পর্যায়ে চলে গিয়েছে তাতে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে তার সঙ্গে কোনো আপস করতে হলে সেনা-শাসকদের ক্ষমতা ত্যাগ করে আসতে হবে। কিন্তু সে পথে হাঁটবে না ইয়াহিয়া খানের প্রশাসন।

কিন্তু ভারতের মতো একটি বিদেশি রাষ্ট্রের সৈন্যরা সরাসরি যুদ্ধে অংশ নিয়ে দেশ স্বাধীন করায় ভূমিকা রাখলে এর পরবর্তী প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে সে আশঙ্কাও করছিলেন অনেকে। কিন্তু এই আশঙ্কা থেকে সকলকে মুক্ত করেছিলেন দুইপক্ষের নেতৃবৃন্দ। বঙ্গবন্ধুর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদ এবং ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী স্বাক্ষরিত একটি দলিল তৈরি করা হয়েছিল। তাতে ছিল বেশ কয়েকটি শর্ত।

একটি শর্তে ছিল ১৯৭১-এর ২৫ মার্চের পর যারা ভারতে প্রবেশ করেছে স্বাধীন দেশে শুধু তারাই ফেরত আসবে। অন্য আরেক শর্তে ছিল বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি ছাড়া কোনো ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে ঢুকতে পারবে না এবং বাংলাদেশ সরকার যতদিন চাইবে শুধু ততদিনই ভারতীয় সৈন্য বাংলাদেশে থাকতে পারবে। বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর চাপ ভারতের মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়ছিল।

ফলে ভারতও চাইছিল বাংলাদেশ সংকটের দ্রুত নিষ্পত্তি হোক। যা হয়তো ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করেছিল। এ প্রসঙ্গে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপর ৫ ডিসেম্বর অ্যান্থনি মাসকারেনহাস-এর লেখা লন্ডন সানডে টাইমসে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ থেকে যৌক্তিক বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে দেশে ভয়াবহ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। অথচ বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলো নীরবতার ভূমিকা পালন করছে। মাসকারেনহাস লিখেছেন-

“সত্যি কথা হলো, ভারত অনিচ্ছাকৃতভাবে যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য হচ্ছে, কারণ উদ্বাস্তু সমস্যা সমাধানের আর কোনো বিকল্প নেই। আটমাস ধরে বিশ্বের কাছে সাহায্য চেয়ে ব্যর্থ হতে হয়েছে। যে ১১ মিলিয়ন পূর্ব পাকিস্তানি শরণার্থী সীমান্ত অতিক্রম করে আশ্রয় নিয়েছে তাদের ভরণপোষণ ও খাদ্যদ্রব্য সরবরাহ করার জন্য ভারত আর্থিক সাহায্য চেয়েছে। এছাড়া শরণার্থীরা যাতে পূর্ব পাকিস্তানে নিরাপদ আশ্রয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে যেতে পারে সে লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থার ব্যবস্থা গ্রহণের আশা ভারতের ছিল।

এছাড়াও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন যে, ‘কোনো অবস্থাতেই শরণার্থীদের ভারতে স্থায়ীভাবে থাকতে দেয়া হবে না।’ ইন্দিরা গান্ধীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ সফর আশানুরূপ ফল দেয়নি। আগামী মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ ১২ মাসে উদ্বাস্তুদের ভরণপোষণে খরচ হবে ৩৯০ মিলিয়ন পাউন্ড। এখন পর্যন্ত যে পরিমাণ সাহায্যের আশ্বাস পাওয়া গিয়েছে তা মাত্র ১০৩ মিলিয়ন পাউন্ড। এর মধ্যে ভারত হাতে পেয়েছে মাত্র ৩০ মিলিয়ন পাউন্ড।

পাকিস্তানের প্রতি রাজনৈতিক চাপ প্রয়োগের ভারতীয় অনুরোধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া ছিল হতাশাব্যঞ্জক। নিউইয়র্ক টাইমসের মতে, ভারত আপসের দিকে না গিয়ে বরং যুদ্ধের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। একজন ভারতীয় মুখপাত্রের মতে, “আমরা সাহায্য প্রার্থনা করে যা পেয়েছি তা শুধু ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা ধরনের উপদেশ।” ...

পূর্ব পাকিস্তান সমস্যা ভারতের অর্থনীতিকে প্রভাবিত করছে। জিনিসপত্রের মূল্য অনবরত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বৃদ্ধি পাচ্ছে বেকারের সংখ্যা। ছয় মাস আগে দিল্লিতে রাস্তার পাশে মাদ্রাজি দুটি দোসা ও দুটি ইডলি এবং দুকাপ চা কফি তিন টাকায় (২৫ পেনি) পাওয়া যেত, এখন তা সাড়ে আট টাকা।...উদ্বাস্তুদের সাহায্যার্থে যে ট্যাক্স বসানো হয়েছে তা এখন সবাইকে আক্রান্ত করছে। কারণ প্রতিটি ভারতীয়কে একটি চিঠি লেখার জন্য ৫ পয়সা করে উদ্বাস্তু কর দিতে হয়।

১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধে যত টাকা খরচ হয়েছিল বর্তমানে শরণার্থীদের জন্য ভারতের তার চেয়ে বেশি খরচ করতে হচ্ছে। সুতরাং উদ্বাস্তুদের আর্থিক সাহায্য করার বদলে যুদ্ধ করাই শ্রেয়।...

কয়েকজন ব্যক্তি যেমন সম্পাদক, ব্যবসায়ী, সরকারি কর্মকর্তাসহ দিল্লিতে যার সঙ্গেই আলাপ করি, তারা সবাই একবাক্যেই বলেন, ২৪ বছর ধরে ভারত-পাকিস্তানের বোঝা টানছে। এখন চিরতরে সব সমস্যা সমাধানের সময় এসেছে। পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের সমস্যা, এবং ভারতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সাহায্য প্রদানে ব্যর্থতা ও জাতিসংঘের অকার্যকারিতা ভারতকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।”

এর মধ্যে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার ব্যাপারে ভারতের অভ্যন্তরে সরকারের উপর চাপ ছিল। মার্চ থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি নানা সংগঠন থেকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার প্রশ্নটি উঠে আসে। বিশেষ করে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন, বুদ্ধিজীবীদের নানা সংগঠন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিক্ষক সমিতি এবং রাজ্য বিধানসভাগুলোও স্বীকৃতির পক্ষে দাবি উত্থাপন করে।

বাংলাদেশকে অর্থাৎ মুক্তিবাহিনীকে সরাসরি সাহায্যের জন্য এই স্বীকৃতিরও প্রয়োজন ছিল। তাছাড়া পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধাবস্থা তৈরি না হলে বাংলাদেশে ভারতীয় সৈন্য প্রবেশ করা বৈধতা পাবে না। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে এসব প্রশ্ন সামনে চলে আসে। কিন্তু শেষপর্যন্ত যুদ্ধ ঘোষণার প্রথম প্রত্যক্ষ কারণ ঘটিয়ে দিল পাকিস্তান।

ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ এর আগেও দুবার সংঘটিত হয়েছিল। তবে এই তৃতীয় যুদ্ধের প্রেক্ষাপটটিই ছিল আলাদা। পাকিস্তান বাঙালির স্বায়ত্বশাসনের দাবির প্রতি সম্মান দেখায়নি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর ক্ষমতা হস্তান্তর না করে গণহত্যা চালিয়ে পাকিস্তানি শাসক বাঙালির ওপর মুক্তিযুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছিল। মে-র মধ্যেই পাকিস্তানি বাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে তাদের কর্তৃত্ব হারিয়ে ফেলতে থাকে।

এর মধ্যে আগস্টে ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে ২০ বছরব্যাপী শান্তি চুক্তি স্বাক্ষর করে। চুক্তি অনুসারে প্রত্যেক দেশ অপর দেশের জাতীয় নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে পারস্পরিক সহযোগিতার করার অঙ্গীকার করে। পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশের) সীমান্ত রেখায় ভারতীয় ভূখণ্ডে ভারত স্বাভাবিক কারণেই সৈন্য ও সমরাস্ত্র সমাবেশ করেছিল। সম্ভবত ভারতের দৃষ্টি অন্যত্র সরানোর উদ্দেশ্যে ৩ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তান আচমকা বিমান হামলা করে।

বিকেল সাড়ে পাঁচটায় পাকিস্তান বিমান হামলা করে। পাকিস্তানের মিরেজ-৩ বিমানগুলো পাঠানকোট বিমানঘাঁটিতে। এতে রানওয়ের কিছুটা ক্ষতি সাধিত হয়। এরপর বিমান হামলায় পাঞ্জাবের অমৃতসরের রানওয়েরও ক্ষতিসাধিত হয় তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তা মেরামত করা সম্ভব হয়। এ সময়ই ভারত সিদ্ধান্ত নেয় ওই রাতেই তারা পাকিস্তানে বিমান আক্রমণ করবে।

সামান্য বিরতির পরে পাকিস্তানের দুটি বি-৫৭ বিমান বোমা ফেলে হরিয়ানার আম্বালাতে। এই হামলায় সামান্যই ক্ষতি হয়েছিল। তবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় রাজস্থানের উত্তারলাই এবং পাঞ্জাবের হালওয়ারা বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানি বোমা বর্ষণে। এছাড়াও পাকিস্তানি বোমারু বিমান হামলা করে কাশ্মিরের উধামপুরে, জয়সালমির ও জোধপুরে। এভাবে প্রায় ১২টি বিমানঘাঁটিতে পাকিস্তানি বিমান হামলা পরিচালিত হয়। নিক্ষিপ্ত বোমার সংখ্যা ছিল ১৮৩টি।

ওই রাতেই ইন্দিরা গান্ধি ভারতীয় রেডিওতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন। সেখানে যৌক্তিক কারণ দেখিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরদিন ভারতীয় বিমান বাহিনী আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। আগে থেকেই যুদ্ধকৌশল নির্ধারিত ছিল ভারতের।

ভারতীয় বিমান বাহিনী পশ্চিম পাকিস্তানের নানা বিমানঘাঁটি ছাড়াও একযোগে বিমান হামলা চালিয়ে বোমাবর্ষণে ঢাকার কুর্মিটোলা বিমানবন্দর অকেজো করে দেয়। লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিংয়ের ওপর পূর্ব পাকিস্তানে আক্রমণের প্রধান দায়িত্ব ছিল। তিনি ৮, ২৩ এবং ৫৭ ডিভিশন নিয়ে আক্রমণ পরিকল্পনা করেন। ভারতের পশ্চিম সীমান্তেও যুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে।

ঢাকায় ভারতীয় বিমান হামলায় রানওয়ে পুরোপুরি অকেজো হয়ে যায়। ফলে এখানেই পাকিস্তানি বাহিনীর পতনের সুর স্পষ্ট হয়ে বাজতে থাকে। ঢাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণ তীব্র হতে থাকে। ভারতের নানা সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় মিত্র বাহিনী প্রবেশ করতে থাকে। মুক্তি ও মিত্র বাহিনীর তীব্র আক্রমণে কোণঠাসা হয়ে পড়ে পাকিস্তানি বাহিনী। বিজয়ের ক্ষণগণনা করতে থাকে সাধারণ মানুষ।

লেখক: অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন

এ স্বপ্ন অলীক নয়

এ স্বপ্ন অলীক নয়

প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আমাদের না আছে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না আছে পারিবারিক-সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভালো পরিবেশ। মেধা বিকশিত করার জন্যও নেই ভালো কারিগর। মানুষ গড়ার এই কারিগর শিক্ষকরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত, কুটিল রাজনীতিতে লিপ্ত।

যুক্তরাষ্ট্রের সাময়িকী ফোর্বসের ‘থার্টি আন্ডার থার্টি’-তে জায়গা করে নিয়েছেন বাংলাদেশের বাসিমা ইসলাম। গেল বুধবার এ তালিকা প্রকাশ করেছে সাময়িকীটি। ফোর্বস প্রতিবছর ২০টি ক্যাটাগরিতে ৩০ জন করে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে, যাদের বয়স ৩০ বছরের নিচে।

এ ক্যাটাগরিগুলোর একটি বিজ্ঞান, যেখানে স্থান পাওয়া বাসিমা বোস্টনের ওয়েস্টার পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কম্পিউটার ও তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগে যোগ দিতে যাচ্ছেন। তার ছোট একটি প্রোফাইলও প্রকাশ করেছে ফোর্বস। এতে লেখা রয়েছে, তিনি ব্যাটারি ছাড়া ইন্টারনেট ব্যবহারযোগ্য ডিভাইস ‘ইন্টারনেট অব থিংস’ (আইওটি) তৈরিতে কাজ করছেন।

এক সাক্ষাৎকারে বাসিমা বলেছেন, তার উদ্ভাবিত ডিভাইসটি বিশ্বব্যাপী ইলেক্ট্রনিক্স জগতে পরিবর্তন আনবে। পৃথিবীতে দৈনিক প্রায় ৮৭ লাখ ডিভাইসে ব্যাটারি পরিবর্তন হয়। এই বিপুল পরিমাণ ব্যাটারি তৈরি ও রিসাইক্লিংয়ে ব্যাপক খরচের পাশাপাশি পরিবেশে এর মারাত্মক প্রভাব পড়ছে। যার সমাধান হতে পারে আইওটি।

এটি ব্যবহার করে বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অন্যান্য দেশে চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। বাসিমার লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে এক বিলিয়ন আইওটি ডিভাইস তৈরি করা। দেশের ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজ এবং বুয়েট থেকে পড়াশোনা করা বাসিমা ইউনিভার্সিটি অব নর্থ ক্যারোলাইনা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে সদ্যই নিয়োগ পেয়েছেন ৩৭ বছর বয়সি ভারতীয় বংশোদ্ভূত পরাগ আগরওয়াল। ২০০৫ সালে মুম্বাই আইআইটি থেকে ব‍্যাচেলর শেষ করে, সে বছরই আমেরিকার স্ট‍্যানফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে যান পিএইচডি করতে। ২০১১ সালে টুইটারে যোগ দেয়ার আগে তিনি এটি অ্যান্ড টি ল্যাব, ইয়াহু এবং মাইক্রোসফটে কাজ করেন। ২০১৭ সালে টুইটারের প্রধান প্রযুক্তি কর্মকর্তা (সিটিও) পদেও বসানো হয় তাকে।

ভারতীয়দের মধ্যে আরও আছেন মাইক্রোসফটের মতো বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) সত্য নাদেলা, গুগলের সিইও সুন্দর পিচাই, অ্যাডোবির সিইও শান্তনু নারায়ণ এবং মাস্টারকার্ডের নির্বাহী চেয়ারম্যান অজয়পাল সিং বাঙ্গা।
সারা বিশ্বে আমাদের বাসিমার মতো হাতেগোনা দুয়েকজন থাকলেও ভারতের সংখ্যাটা অনেক বড় এবং তারা ততধিক বড় পদে মাথা উঁচু করে কাজ করছেন সম্মান, সম্ভ্রম আর বিনয়ের সঙ্গে।

বিশ্বায়নের কালে ছোট হয়ে আসছে পৃথিবী, এগিয়েও যাচ্ছে। আর এগিয়ে যাওয়ার এ সময়ে আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশের ছেলেমেয়েরা মেধা দিয়ে, নিজের যোগ্যতা দিয়ে, শ্রম দিয়ে জায়গা করে নিচ্ছে পৃথিবীর শীর্ষস্থানগুলোতে। সেইসঙ্গে আর্থিক দিকটিও পরিপূর্ণ হয়ে উঠছে। পরাগ আগরওয়ালের আনুষঙ্গিক সুবিধার বাইরের বার্ষিক ১০ লাখ ডলার বেতন, শুধুই তার কাজের স্বীকৃতি।

প্রযুক্তির উৎকর্ষতার সঙ্গে চাহিদার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন রয়েছে। প্রযুক্তি এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চাহিদা বাড়ছে, সেটাই স্বাভাবিক। নিত্যনতুন ডিভাইস, ইলেকট্রনিক পণ্য, দামি বা ফ্যাশনেবল পোশাক, বাড়ি, গাড়ি, দামি ফার্নিচার, আরও কতকিছুই এখন আমাদের চাহিদার তালিকায়।

নিজের জীবন নিয়ে উচ্চাশা দোষের কিছু নয়। প্রতিটি মানুষের আকাশছোঁয়ার স্বপ্ন থাকে। মেধা আর কঠোর শ্রম দিয়ে সে স্বপ্ন পূরণের সফলতার আনন্দময় গল্পও থাকে, ঠিক বাসিমা ইসলাম, পরাগ আগরওয়াল, সুন্দর পিচাই, সত্য নাদেলাদের মতো।

বিষয়টি হলো কষ্টসাধ্য, দুর্গম পথে হাঁটতে আমাদের বড়ই অনীহা। আমরা তড়তড় করে উপরে ওঠার জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছি সহজতর পথ। খ্যাতি-মোহ, অর্থ-বিত্ত সবকিছু নিমিষেই হাতের মুঠোয় পেতে মরিয়া। ছেলেমেয়েদের বেশিরভাগই শ্রম-মেধা দিয়ে সময়ক্ষেপণ করে প্রতিষ্ঠা পাওয়াকে সময়ের অপচয় মনে করে।

অন্যদিকে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য আমাদের না আছে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, না আছে পারিবারিক-সামাজিক, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভালো পরিবেশ। মেধা বিকশিত করার জন্যও নেই ভালো কারিগর। মানুষ গড়ার এই কারিগর শিক্ষকরা নানা দলে-উপদলে বিভক্ত, কুটিল রাজনীতিতে লিপ্ত। রাজনৈতিক পদ-পদবি পাওয়াকেই শিক্ষকতার সর্বোচ্চ প্রাপ্তি মনে করেন।

নিজের ঘর থেকে যে নৈতিক শিক্ষার শুরু, সেখানেও সমস্যা। পিতামাতা অভিভাবকেরা নিজেরাই গোলক ধাঁধায় ভোগেন। কেবলই অর্থনৈতিক নিশ্চয়তাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে যোগ্য মানুষ করে গড়ে তোলার পরিবর্তে বেশি অর্থ উপার্জন করার ভাবনাটাকেই প্রাধান্য দেন। তাই সন্তানদের সঠিক পথে পরিচালনা করাটা তাদের জন্যও সহজ হয় না।

আরও একটি বিষয় লক্ষ্যণীয়। আমাদের দেশে যেখানে সেখানে দেখা যাওয়া বিপুলসংখ্যক মানহীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হচ্ছে ততধিক মানহীন শিক্ষার্থী। পরবর্তী সময়ে যারা বেকার হিসেবে দুঃসহ জীবন শুরু করে। এই বেকারত্বের বাঁধন ছিন্ন করা বেশিরভাগ ছেলেমেয়ের পক্ষেই সম্ভব হয়ে ওঠে না। যে স্বচ্ছলতার সুখস্বপ্ন নিয়ে তারা পড়তে এসেছিল, পড়া শেষ করে কিছুদিনের ভেতরই তাদের মোহভঙ্গ হয়, আশাহত হয়। অথচ সঠিক দিক নির্দেশনার মাধ্যমে কৌশল অবলম্বন করে বিপুলসংখ্যক ছেলেমেয়েকে বেকারত্বের গ্লানি থেকে কিছুটা হলেও মুক্ত করা সম্ভব।

এ ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর অধিক মাত্রায় জোর দিয়ে টেকনিক্যাল এক্সপার্ট তৈরি করা গেলে দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের মাধ্যমে বেকারত্ব অনেকটাই কমে আসবে নিশ্চিত। ভারত যে মহাকাশ গবেষণা, পরমাণু শক্তি গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, ক‍েমিক‍্যাল অ্যান্ড বায়োকেমিক‍্যাল গবেষণা অনেক ক্ষেত্রে অভাবনীয় সফলতা দেখাচ্ছে, তার মূলে হলো তাদের উচ্চমানের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এখান থেকে শিক্ষা নিয়েই ছেলেমেয়েরা সাফল্যের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত করতে পারছে। যতই দিন যেতে থাকবে ভারত এর সুফল ভোগ করতে থাকবে পূর্ণমাত্রায়।

ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে পড়াশোনা শেষ করে কেউ বিদেশে ক্যারিয়ার গড়ে, কেউ দেশেই গড়ে। অনেকেই সেই শিক্ষা কাজে লাগিয়ে উদ্যোক্তা হয়ে ওঠে, তৈরি হয় বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠান।

দেশে আর্থিক সমস্যা আছে, থাকবে। ভারতেরও আছে। এখনও ভারতে বিপুলসংখ্যক মানুষ একবেলা মাত্র খেতে পায়, চিকিৎসার অভাবে মারা যায় অসংখ্য মানুষ, আকাশের নিচে রাত কাটায়, স্যানিটেশন নেই, আরও আরও অনেক কিছু নেই। কিন্তু উচ্চশিক্ষায় ছাড় দেয়নি ভারত। তুখোড় ছাত্রদের শানিত করবার সব ধরনের ব্যবস্থা করে রেখেছে।

তাই উন্নতমানের কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মানবিক গুণ যোগ করে যদি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায়, তবে তা হবে জ্ঞানের ভাণ্ডার, অর্থেরও ভাণ্ডার। তাহলে আমরা লোভ লালসাহীন, উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন মানবিক এক দেশ দেখব, যেখানে অর্থনীতির সুষম বণ্টন হবে, দুর্নীতির মাত্রা আর দারিদ্র্য কমে যাবে। মানসম্পন্ন আধুনিক সভ্যতার সোপান রচিত হবে।

লেখক: শিক্ষক, প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন

সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব কার

সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব কার

নানা ঘটনায়, নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নেন। সম্প্রতি খোদ জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য যিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত, তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে তারা বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছেন। যে রাষ্ট্রে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা সরকারি প্রণোদনা পান, সেই পরিবহন মালিকরা কী করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকার করেন— তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা বাসে যে হাফ ভাড়া দেয়, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।

সমাজের প্রভাবশালী ব্যক্তি, অভিনেতা এমনকি পুলিশের গাড়ি আটকে দিয়ে কাগজপত্র এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করছে যারা, তাদের বয়স ২০-এর বেশি নয়। অর্থাৎ অধিকাংশই কিশোর-তরুণ। বিভিন্ন স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী। এই দৃশ্যগুলো প্রথম দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালের আগস্টে। তার সোয়া তিন বছর পরে আবারও সেই একই দৃশ্যের অবতারণা।

স্কুল-কলেজের ইউনিফর্ম পরে শিক্ষার্থীরা নেমে এসেছে রাস্তায়। তারা সড়ক অবরোধ করে, সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে দিয়ে সড়কে নৈরাজ্য বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ করছে। বাসে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার দাবি করছে। বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো বন্ধ এবং সিটি করপোরেশনের ময়লার গাড়ির ধাক্কায় তাদের সহপাঠী নিহতের বিচার দাবি করছে। শুধু তাই নয়, সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে, তারা একটি পুলিশ ভ্যান আটকে পুলিশের সঙ্গে তর্ক করছে, কারণ ওই গাড়ির লাইসেন্স নেই। একজন পুলিশ কর্মকর্তা তখন তাদের বলছেন, এই গাড়িটির বিরুদ্ধেও মামলা দেয়া হবে।

দৃশ্যগুলো সিনেমায় হলে আরও ভালো হতো। বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত নয়। এই দৃশ্যগুলোর ভেতরে রোমান্টিসিজম আছে। উত্তেজনা আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়ার উপাদান আছে। কিন্তু সেই সঙ্গে সঙ্গে কিছু প্রশ্নও আছে যে, আমরা আমাদের সন্তানদের ঠিক এভাবে রাস্তায় দেখতে চাই কি না?

যদি উত্তর হয় ‘না’, তাহলে পাল্টা প্রশ্ন আসবে, কেন সড়কের নৈরাজ্য ঠেকাতে তাদের রাস্তায় নামতে হলো? সড়কে নৈরাজ্য ঠেকানোর দায়িত্ব রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠানের, তারা কী করছে? তারা কি নিজেদের দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ বলেই এখন এই তরুণদের ক্লাস বাদ দিয়ে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে হচ্ছে? এই অনাকাঙ্ক্ষিত দৃশ্যটির অবতারণা হলো কাদের ব্যর্থতার কারণে?

২০১৮ সালের কিছু দৃশ্য মনে করা যেতে পারে, পুলিশ প্রটোকলে মন্ত্রীর গাড়ি। সাদা গাড়ির ভেতরে একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা থামিয়ে দিল। তারা জানতে পারল খোদ মন্ত্রীর গাড়ির চালকেরই লাইসেন্স নেই, অথবা লাইসেন্স সঙ্গে নেই। শিক্ষার্থীদের দাবির মুখে মন্ত্রী মহোদয় সাদা গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। পেছনে থাকা কালো রঙের আরেকটি গাড়িতে উঠে রওনা হলেন।

একইরকম অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন দেশের ছাত্র-আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, উনসত্তুরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম নায়ক তোফায়েল আহমেদ। তার গাড়িটি উল্টো পথে যাচ্ছিলে। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আটকে দেয়। যদিও তোফায়েল আহমেদ গাড়ি থেকে নেমে শিক্ষার্থীদের বলেছিলেন, তিনি তাদের সঙ্গে কথা বলার জন্যই উল্টো পথে এসেছেন।

ওই বছরও পুলিশ তাদের নিজের বাহিনীর গাড়ির বিরুদ্ধেই মামলা দিয়েছিল। ছাত্ররা তখন সরকারের অন্য আরও অনেক প্রতিষ্ঠান এমনকি গণমাধ্যমের গাড়ি আটকে দেয় এবং গাড়ির ফিটনেস ও চালকের লাইসেন্স না থাকলে সেই গাড়ির বিরুদ্ধে মামলা দিতে বাধ্য করে। কিছু গাড়ি ভাঙচুরও করা হয়। ওই বছর তারা রাস্তায় নেমেছিল সড়কে তাদের দুই সহপাঠীর নির্মম মৃত্যুর প্রতিবাদ জানাতে।

সেই প্রতিবাদের আগুন ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওই প্রতিবাদের তিন বছর পরে তাদেরকে আবার কেন একই দাবিতে রাস্তায় নামতে হলো? ২০১৮ সালে তারা প্ল্যাকার্ডে লিখেছিলো: ‘রাষ্ট্রের মেরামত চলছে; সাময়িক অসুবিধার জন্য দুঃখিত।’ কিন্তু রাষ্ট্রের মেরামত যে ঠিকমতো হয়নি, তার প্রমাণ হলো একইরকমের প্ল্যাকার্ড নিয়ে সেই কিশোর-তরুণরা আবারও রাস্তায়।

এবারের ঘটনার পেছনে শুধু সড়কে সহপাঠীর নিহত হওয়ার ঘটনাই নয়, বরং গহণপরিহনে হাফ ভাড়ার দাবিটিও যুক্ত হয়েছে। লিটারে তেল ও ডিজেলের দাম ১৫ টাকা বাড়ানোর ফলে বাস ও লঞ্চে ভাড়া বাড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার সিদ্ধান্ত জানার পরেই এ নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া আসে সমাজের নানা স্তর থেকে। তার মধ্যেই ঢাকা দক্ষিণ সিটির একটি ময়লার গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ যায় একজন শিক্ষার্থীর— যা এই ক্ষোভের আগুনে ঘি ঢালে।

শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে গণপরিবহন, বিশেষ করে বাসের মালিকরা দাবি করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই গরিব। পরিবহন ব্যবসায়ীরা গরিব— এই কথার ভেতরে যতটা না বাস্তবতা আছে, তার চেয়ে বেশি আছে রসিকতা। ফলে সেই রসিকতার উৎস সন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন- দুদক। এরইমধ্যে একজন পরিবহন মালিকের ব্যাপারে তথ্য বেরিয়ে এসেছে যে, তিনি ব্যবসা শুরু করেছিলেন একটা বাস দিয়ে। এখন তার বাসের সংখ্যা আড়াইশ। আড়াই শ বাসের মালিকও এই দেশে গরিব!

এসব রসিকতাও অনেক প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। যেমন, এক লিটার তেলে একটি বাস কত দূর যায়? একটি বাসে কতজন যাত্রী থাকেন এবং এক লিটার তেলের দাম যদি আগের চেয়ে ১৫ টাকা বেশি হয় তাহলে প্রতি যাত্রীর কাছ থেকে ১৫ টাকার কত শতাংশ বাড়তি হিসাবে সর্বোচ্চ কত টাকা বাড়তি আদায় করা সংগত? এসব প্রশ্নের কোনো সদুত্তর পাওয়া যাবে না। উপরন্তু, রাজধানীসহ বড় শহরগুলোয় যেসব বাস চলে, তার সবগুলো তো তেল বা ডিজেলে চলে না। সিএনজিতে চলে যেসব বাস, তারাও কেন বাড়তি ভাড়া নেবে? আর শিক্ষার্থীরা তাদের আইডি কার্ড দেখিয়ে তো বছরের পর বছর ধরে হাফ ভাড়া দিয়েই আসছিলেন, তাহলে নতুন করে তাদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া না নেয়ার সিদ্ধান্তটি কেন হলো?

নানা ঘটনায়, নানা অজুহাতে পরিবহন মালিকরা সরকারের কাছ থেকে প্রণোদনা নেন। সম্প্রতি খোদ জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্য যিনি পরিবহন ব্যবসার সঙ্গেও যুক্ত, তিনি নিজেও স্বীকার করেছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে তারা বিভিন্ন সময়ে কোটি কোটি টাকা প্রণোদনা পেয়েছেন। যে রাষ্ট্রে বেসরকারি পরিবহন মালিকরা সরকারি প্রণোদনা পান, সেই পরিবহন মালিকরা কী করে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নিতে অস্বীকার করেন— তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া শিক্ষার্থীরা বাসে যে হাফ ভাড়া দেয়, এটা নতুন কোনো বিষয় নয়।

বস্তুত, আমাদের গণপরিবহন ও গণপরিবহন ব্যবস্থা সারা বছরই গণমাধ্যমের শিরোনামে থাকে। এত বেশি নৈরাজ্য রাষ্ট্রের আর কোনো সেক্টরে সম্ভবত হয় না। প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালানো এবং বাসের ভেতরে থাকা সব যাত্রীর জীবনকে হুমকির মুখে ফেলা; ভাড়া নিয়ে যাত্রীদের সঙ্গে অশোভন আচরণ; রাস্তার মাঝখানে কোনো নারী উঠতে চাইলে তাকে না নেয়া; নারী বা বৃদ্ধকে নামানোর জন্য গাড়ি পুরোপুরি না থামানো; ব্যস্ত রাস্তার মাঝখানে গাড়ি থামিয়ে যাত্রী তোলা; লাইসেন্সবিহীন অদক্ষ, অপ্রাপ্তবয়স্ক এবং অমানবিক লোকদের হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং তুলে দেয়া; বাসের ভেতরে একা কোনো নারী থাকলে তাকে ধর্ষণ বা গণধর্ষণ করাসহ পরিবহন শ্রমিকদের বিরুদ্ধে এরকম অভিযোগের অন্ত নেই।

বছরের পর বছর ধরে চলছে এসব নৈরাজ্য— যা বন্ধের মূল দায়িত্ব রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের। তারা তাদের দায়িত্ব কতটুকু পালন করছে? করছে না যে, তার প্রমাণ ২০১৮ সালের বিক্ষোভের সোয়া তিন বছর পরে একই দাবিতে আবারও রাজপথে শিক্ষার্থীরা— যে কাজটি তাদের করার কথা নয়। রাস্তায় পুলিশের গাড়ি থামিয়ে ছাত্ররা গাড়ির কাগজ ও লাইসেন্স পরীক্ষা করবে, এটি শোভন নয়। এই অশোভন কাজটি করার জন্য কেন তাদের রাস্তায় নামতে হলো, সেই জবাব রাষ্ট্রকেই দিতে হবে।

প্রশ্ন হলো, শিশু-কিশোররা কি রাষ্ট্রকে তার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, কেউই তার কাজটা সঠিকভাবে করছে না? যে পুলিশ গাড়ির ফিটনেস আর ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করবে, তাদেরই লাইসেন্স নেই। যে গণমাধ্যম সমাজের অসংগতি তুলে ধরবে, তাদের গাড়িই নিয়ম মেনে চলে না। যে মন্ত্রীরা রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণ করেন, তারাই উল্টো পথে চলেন। তাদের চালকেরই লাইসেন্স নেই! জনগণের পয়সায় পরিচালিত খোদ সিটি করপোরেশনের গাড়ি চালায় ভাড়াটিয়া লোকজন এবং এখানে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অনিয়ম, যে অনিয়মের বলি হচ্ছে সাধার মানুষ।

ফলে শিক্ষার্থীরা বলছে, তারা জাস্টিস চায়। তারা লাইসেন্স মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের গাড়ির চালকের বিরুদ্ধেও মামলা দিতে বাধ্য করে। এই দৃশ্য ২০১৮ সালের আগে স্বাধীন বাংলাদেশে কেউ দেখেনি। এ এক অদ্ভুত বাস্তবতা; ভুক্তভোগীদের জন্য এ এক করুণ অভিজ্ঞতা। যারা বছরের পর বছর মনে করে আসছিলেন তারা সব নিয়ম কানুন আর আইনের ঊর্ধ্বে, তাদেরকেও রাস্তায় নাজেহাল হতে হয় তাদের সন্তান এমনকি নাতিতুল্যদের কাছে। এই দৃশ্য তো কাঙ্ক্ষিত নয়।

প্রশ্ন হলো, সড়কে নৈরাজ্য কেন থামে না? এর পেছনে অনেকগুলো কারণ ও ফ্যাক্টর রয়েছে। একটি বড় কারণ পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা খুবই প্রভাবশালী এবং তাদেরকে ভোটের রাজনীতিতে ব্যবহার করা হয়। ক্ষমতায় যেতে এবং ক্ষমতায় থাকতে নানাভাবেই তাদের কাজে লাগানো হয়। সুতরাং রাষ্ট্র যাদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, তাদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া কঠিন।

তাছাড়া দেশের রাজনীতি যারা নিয়ন্ত্রণ করেন, তাদেরও অনেকে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। তাদের বিরাট ভোটব্যাংক রয়েছে। উপরন্তু গণপরিবহগুলোর পরিচালনার পদ্ধতিটিই এমন যে, এখানে চালকরা প্রতিদ্বন্দ্বী বাসের সঙ্গে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবেই।

আরেকটি বড় সমস্যা, দেশে যে পরিমাণ গণপরিবহন, সেই পরিমাণ দক্ষ চালক নেই বা তৈরি হয় না। ফলে মালিকরা তাদের ব্যবসার স্বার্থে সব সময়ই পরিবহন শ্রমিকদের তোয়াজ করে চলে। মালিকরা একটু কঠোর হলেই তারা চাকরি ছেড়ে দেয়। ফলে ব্যবসায় ক্ষতির আশঙ্কায় মালিকরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে শ্রমিকদের অন্যায় মেনে নেয়।

আবার অনেক সময় মালিকের ‍অতিলোভ, শ্রমিকদের ঠকানো ইত্যাদি কারণেও চালক ও হেলপাররা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সমস্যাটা নানামুখী। এসব সমীকরণ যতদিন থাকবে, ততদিন গণপরিবহনের নৈরাজ্য বন্ধের জন্য রাস্তায় মানববন্ধন, বিক্ষোভ, মাঝেমধ্যে গাড়ি জ্বালিয়ে দেয়া, টেলিভিশনে টকশোতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা কিংবা পত্রিকার পাতায় বড় নিবন্ধ ছাপা হবে ঠিকই— সড়ক-মহাসড়কে জীবনের অপচয় রোধ করা তো অনিশ্চিতই থেকে যায়।

কোটি কোটি টাকা খরচ করে ফ্লাইওভার বানানো হয়, বিদেশ থেকে ঝকঝকে গাড়ি আনা হয়; কিন্তু সেই ফ্লাইওভার, সেই সড়ক কিংবা সেসব সেতুতে যারা গাড়ি চালাবেন, অর্থাৎ যাদের হাতে স্টিয়ারিং, তারা কতটা দক্ষ, যোগ্য, তারা কোন প্রক্রিয়ায় স্টিয়ারিং ধরলেন এবং সর্বোপরি তারা কতটা মানবিক— সেই প্রশ্নগুলোই সবচেয়ে বেশি জরুরি। দক্ষ ও মানবিক চালক তৈরিতে রাষ্ট্রের যে দায়িত্ব পালনের কথা; যে ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার কথা এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদানের জন্য যেরকম দুর্নীতিমুক্ত একটি স্বচ্ছ ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা— তা কি স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরেও গড়ে তোলা গেছে?

লেখক: সাংবাদিক ও কলাম লেখক

শেয়ার করুন

জন্মদিনে শেখ মনিকে ঘিরে ভাবনা

জন্মদিনে শেখ মনিকে ঘিরে ভাবনা

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বৃহস্পতিবার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের প্রতি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে ৬৪ জেলায় একজন করে বাকশালের সম্পাদক এবং একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। বেইলি রোডের একটি বাড়িতে ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিন ছিল ১৪ আগস্ট। ওইদিন মূল বক্তা ছিলেন শেখ মনি। বাকশালের নীতি-আদর্শ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে মনি প্রায় দেড় ঘণ্টার এক অনবদ্য ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন- “আমার জীবনে এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।”

যুবনেতা, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ও আওয়ামী যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির ৮৩ তম জন্মদিন ৪ ডিসেম্বর। তার মতো বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী যুবনেতা তার সমসাময়িকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া ভার। তার ছিল আকাশচুম্বী গ্রহণযোগ্যতা। তার ব্যক্তিত্ব ছিল আকর্ষণীয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে হওয়ার পাশাপাশি শেখ ফজলুল হক মনির মধ্যে এমন কিছু মানবীয় গুণ ছিল, যা সচরাচর দেখা যায় না। শেখ মনি ১৯৭০-এর নির্বাচন কর্মসূচির অন্যতম প্রণেতা ছিলেন। তখন তার বয়স ত্রিশের কোঠায়। তিনি আইয়ুব খানের পান্ডা গভর্নর মোনেম খানের কাছ থেকে সনদ নিতে অস্বীকার করেন। যে কারণে তার এমএ ডিগ্রি পর্যন্ত কেড়ে নেয়া হয়।

১৫ আগস্ট যদি শেখ ফজলুল হক মনিকে হত্যা করা না হতো, তাহলে হয়ত বাংলাদেশের রাজনীতি অন্য খাতে প্রবাহিত হতো। ধারণা করা যায়, এ জন্যই খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে শেখ ফজলুল হক মনিকেও হত্যা করে। দেশ-বিদেশের খুনিরা একথা নিশ্চিতভাবেই জানত যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করতে হলে মুজিবের সঙ্গে মনিকেও হত্যা করতে হবে।

রাজনীতির ময়দানে শেখ ফজলুল হক মনি ছিলেন অলরাউন্ডার। তার এতসব গুণ ছিল, যা এক কলামে লিখে শেষ করা যাবে না। তিনি ছিলেন সাহসী-তেজস্বী, দক্ষ সংগঠক, সুবক্তা, লেখক ও অত্যন্ত ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ। ভাগ্নে বলে নয়, বঙ্গবন্ধুর মতো বিশ্বমানের নেতাকে মনি অতি অল্প বয়সেই জয় করেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, মুজিব বাহিনীর ৪ জনের অন্যতম শীর্ষ অধিনায়ক ও যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মনির হাত দিয়েই গড়ে ওঠে যুবলীগ। যে দলটির বর্তমান চেয়ারম্যান শেখ মনির বড় ছেলে শেখ ফজলে শামস পরশ। আর ছোট ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নির্বাচিত মেয়র।

বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও স্বাধিকার আন্দোলনের নক্ষত্র, বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলনের সৃজনশীল যুবনেতা ও মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স তথা মুজিব বাহিনীর অন্যতম প্রধান কমান্ডার শেখ ফজলুল হক মনি ১৯৩৯-এর ৪ ডিসেম্বর টুঙ্গিপাড়ায় শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

তার বাবা শেখ নূরুল হক জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভগ্নিপতি। মা শেখ আছিয়া বেগম বঙ্গবন্ধুর বড় বোন। ছাত্রজীবন থেকেই শেখ মনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ষাটের দশকে সামরিক-শাসনবিরোধী ছাত্র-আন্দোলনে তিনি সাহসী নেতৃত্ব দেন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৩ সালে ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি।

১৯৬২ সালে হামদুর রহমান শিক্ষা কমিশন রিপোর্টের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ায় তিনি গ্রেপ্তার হন এবং ৬ মাস কারাভোগ করেন। ১৯৬৪-এর এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সরকারের গণবিরোধী শিক্ষানীতির প্রতিবাদে সমাবর্তন বর্জন আন্দোলনেও নেতৃত্ব দেন। এছাড়াও ১৯৬৫ সালে তিনি পাকিস্তান নিরাপত্তা আইনে গ্রেপ্তার হন এবং দেড় বছর কারাভোগ করেন। তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ও কৃতিত্ব ছিল- ১৯৬৬ সালের ৭ জুন ৬ দফার পক্ষে হরতাল সফল করে তোলা।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২-এর ১১ নভেম্বর যুবকদের সংগঠিত করার লক্ষ্য নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ আওয়ামী যুবলীগ’। তিনি সংগঠনটির দায়িত্ব দেন শেখ ফজলুল হক মনিকে। কংগ্রেসে শেখ মনিই যুবলীগের প্রথম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

শেখ ফজলুল হক মনি তেজগাঁও আঞ্চলিক শ্রমিক লীগের সভাপতি হয়ে শ্রমিকদেরও সংগঠিত করেন। শেখ মুজিবসহ অন্য নেতাদের গ্রেপ্তার ও পূর্ব বাংলায় নির্যাতনের প্রতিবাদে ১৯৬৬ সালের ৭ জুন আওয়ামী লীগ আহূত হরতালে শেখ মনি, আবদুর রাজ্জাক, নূরে আলম সিদ্দিকীসহ ছাত্রলীগ, শ্রমিক লীগ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেন।

সব দলমতের লোক নিয়ে গঠিত হয়েছিল মুক্তিবাহিনী। আর পাশাপাশি গঠন করা হয় মুজিব বাহিনী (বিএলএফ বা বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রন্ট)। মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আদর্শে বিশ্বাসী ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্য থেকে বেছে বেছে মুজিব বাহিনী নামে রাজনৈতিক গেরিলা বাহিনীটি গঠন করা হয়। এই বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন শেখ ফজলুল হক মনি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ। মুজিব বাহিনীর তত্ত্বাবধানে ছিলেন জেনারেল উবান।

আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও ছাত্রলীগের প্রথম সারির নেতা ফকীর আবদুর রাজ্জাক শুরু থেকেই মনির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ থাকার পাশাপাশি যুবলীগ ও বাংলার বাণী প্রতিষ্ঠার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ফকীর আবদুর রজ্জাকের লেখা ‘শেখ ফজলুল হক মনি- অনন্য রাজনীতির প্রতিকৃতি’ নামের ৬৪ পৃষ্ঠার একটি নাতিদীর্ঘ গ্রন্থ ২০১০ সালে আগামী প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধকালে মনি মুজিব বাহিনী যেমন গড়ে তুলেছিলেন, একই সঙ্গে কলকাতা থেকে সাপ্তাহিক বাংলার বাণী বের করেন এবং মুক্তিযুদ্ধের গতিপ্রকৃতি নিয়ে নিজেও লেখালেখি করেছেন। ফকীর রাজ্জাকের গ্রন্থে উঠে এসেছে একাত্তরে ভারত সরকার এবং সেদেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীও ৩২ বছরের শেখ ফজলুল হক মনিকে সেই একাত্তরেই বাংলাদেশের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা হিসেবে সম্মান দিয়েছেন।

যুদ্ধের শেষদিকে অক্টোবর বা নভেম্বর মাসে শেখ মনি মেঘালয় থেকে একটি বিশেষ বিমানে দিল্লি যান। বিশেষ প্রটোকল দিয়ে তাকে সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রীসহ অন্যান্য নেতা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে বসা ছিলেন।

ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে শেখ মনি দেখা করে প্রয়োজনীয় কথা বলে বের হয়ে এসে মুজিবনগর সরকারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। জানা যায়, সেদিন শেখ মনি ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে বেশ জোরালো ভাষায় বলেছিলেন- “বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে বাংলাদেশের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি করার আগে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিষয়টি সবকিছুর উপরে রাখতে হবে।” দুদেশের মধ্যে ২৫ বছরের মৈত্রীচুক্তি হবে- এ কথা শুনেই তিনি সেদিন ভারতের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন।

স্বাধীনতার পর দেশ গড়ার কাজে মনোনিবেশ করেন শেখ ফজলুল হক মনি। দেশ মুক্ত হওয়ার ২ মাস ৫ দিনের মাথায় শেখ মনির সম্পাদনায় ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৭২ দৈনিক বাংলার বাণী প্রকাশিত হয়। প্রথম সংখ্যাটি বঙ্গবন্ধুকে দেয়ার সময় দুই নেতার (মামা-ভাগ্নে) ছবিটি এখনো স্মৃতি হয়েই রয়েছে। একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে মাত্র দুই মাসে একটি প্রথম শ্রেণির দৈনিক পত্রিকা প্রকাশ করা এককথায় দুরূহ।

দেশ স্বাধীন হওয়ার ১১ মাসের কম সময়ের মধ্যে ১৯৭২-এর ১১ নভেম্বর শেখ মনি আওয়ামী যুবলীগ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশ (আইইবি) মিলনায়তনে যুবলীগ গঠনের কনভেনশনে শেখ ফজলুল হক মনি সভাপতিত্ব করেন। এতে সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ উপস্থিত ছিলেন। সারা দেশ থেকে কয়েক হাজার যুবকর্মী সেদিন সেখানে এসেছিল। আহ্বায়ক কমিটি গঠনের দায়িত্ব দেয়া হয় শেখ মনিকে। দুদিন পরেই ১১ সদস্যের স্টিয়ারিং কমিটি গঠন করা হয়। কিছুদিনের মধ্যে প্রথমে ২১ ও পরে ৩৫ সদস্যের কার্যকরী কমিটি ঘোষণা করা হয়।

যুবলীগ গঠনের কনভেনশনে দেড় ঘণ্টার এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে শেখ মনি নতুন দেশের অর্থনীতি-কৃষিনীতি ও শিল্পনীতি বিষয়ে বক্তব্য প্রদান করেন। সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের মতো সমাজতান্ত্রিক দেশের অনুকরণে তিনি যুবলীগের সম্মেলনকে কংগ্রেস, সভাপতির পরিবর্তে চেয়ারম্যান ও সহসভাপতির পরিবর্তে প্রেসিডিয়াম নামকরণ করেন। কথা ছিল মনি কমিটি গঠন করে বঙ্গবন্ধুকে দেখাবেন। ফকীর রাজ্জাক তার গ্রন্থে লিখেছেন, কিছুদিনের মধ্যেই কার্যকরী কমিটির একটি খসড়া তালিকা তৈরি করে ঘনিষ্ঠ কজনকে দেখান।

১৯৭৩ সালেই শেখ মনি দৈনিক ইত্তেফাকের আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও দৈনিক সংবাদের আহমেদুল কবিরের সঙ্গে যৌথভাবে জার্মান থেকে গজ অফসেট প্রিন্টিং মেশিন আমদানি করে ৮১ মতিঝিল থেকে নতুনভাবে বাংলার বাণী পত্রিকা ছাপার ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৩ সালে শেখ মনি বের করেন চলচ্চিত্র বিষয়ক সাপ্তাহিক ‘সিনেমা’। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর প্রাক্কালে শেখ মনি সাপ্তাহিক (পরে দৈনিক) পিপলস- এর বার্তা সম্পাদক ছিলেন। ১৯৭৪ সালে বের করেন ইংরেজি দৈনিক বাংলাদেশ টাইমস।

বাকশাল গঠনের কয়েক মাস আগে হঠাৎ একদিন পত্রিকায় বিবৃতি দেন। বাকশালের কেন্দ্রীয় কমিটি এবং ১৫ সদস্যবিশিষ্ট সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী কমিটির চেয়ারম্যান হন বঙ্গবন্ধু এবং এর ৩ জন সেক্রেটারি ছিলেন- জিল্লুর রহমান, শেখ মনি ও আবদুর রাজ্জাক। জাতীয় কৃষক লীগ, জাতীয় শ্রমিক লীগ, জাতীয় যুবলীগ ও জাতীয় ছাত্রলীগ- এই চারটি অঙ্গ সংগঠন গঠিত হয়। বঙ্গবন্ধু আসলে গণতান্ত্রিক পন্থায় সমাজতন্ত্র কায়েম করতে চেয়েছিলেন।

একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, শেখ ফজলুল হক মনি যুবলীগের চেয়ারম্যান ছাড়া আর কোনো পদে ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুর প্রতি তার কী পরিমাণ প্রভাব ছিল এমন একটি ঘটনা উল্লেখ করা যেতে পারে- বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. এমএ ওয়াজেদ মিয়া বাকশাল ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন না। তিনি একথা বঙ্গবন্ধুর কাছে জানানোর জন্য বাকশাল প্রতিষ্ঠার আগের রাত ২৪ জানুয়ারি ৩২ নম্বরে যান। বাসায় গিয়ে দেখেন সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও ক্যাপ্টেন এম মনসুর আলীর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু বৈঠক করছেন।

ড. ওয়াজেদ তার ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে ঘিরে কিছু ঘটনা ও বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন- “বৈঠকখানার বাইরে এক ঘণ্টা কাটিয়ে দিলাম। এর পরেও তারা যাচ্ছেন না লক্ষ্য করে আমি স্থির করলাম যে, রাতে খাবারের পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করবো। ঐ সময় বঙ্গবন্ধু দুই নেতাকে নিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাসার বাইরে যান। রাত ১০টার দিকে বাসায় ফেরেন। এগারোটার দিকে হাসিনা ও আমি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খেতে বসি।সে সময় বঙ্গবন্ধু কারো সঙ্গে কোনো কথা না বলে খাবার শেষ করে অতিদ্রুত তার শয়নকক্ষে চলে যান। ঠিক সেই মুহূর্তে শেখ ফজলুল হক মনি বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষে ঢুকেই ছিটকিনি লাগিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয়। বঙ্গবন্ধুর শয়নকক্ষের দরজা ছিটকিনি লাগিয়ে বন্ধ করে, বিশেষ করে আমার শাশুড়িকে শয়নকক্ষের বাইরে রেখে শেখ মনিকে ইতিপূর্বে কখনো তার (বঙ্গবন্ধুর) সঙ্গে আলাপ করতে দেখিনি। রাত প্রায় পৌনে একটা পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। কিন্তু ততক্ষণেও শেখ মনির বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলাপ শেষ হলো না। অতঃপর আমরা বাসায় চলে যাই রাত ১টার দিকে।” (পৃ. ২১৫)

১৪ আগস্ট ১৯৭৫ ছিল বৃহস্পতিবার। নতুন ব্যবস্থায় দেশের প্রতি মহকুমাকে জেলা ঘোষণা করে ৬৪ জেলায় একজন করে বাকশালের সম্পাদক এবং একজন করে গভর্নর নিযুক্ত করা হয়। বেইলি রোডের একটি বাড়িতে ৬৪ জেলার সম্পাদকদের প্রশিক্ষণের শেষ দিন ছিল ১৪ আগস্ট। ওইদিন মূল বক্তা ছিলেন শেখ মনি। বাকশালের নীতি-আদর্শ ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে মনি প্রায় দেড় ঘণ্টার এক অনবদ্য ও জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা দেন। বক্তৃতা শেষে কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক কমরেড ফরহাদ মন্তব্য করেন- “আমার জীবনে এমন চমৎকার বক্তৃতা আর শুনিনি।”

বক্তৃতার পর সৈয়দ আহমদ একজন যুবককে যুবলীগ নেতা ফকীর রাজ্জাকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে বলেন- “এ ছেলেটি আমার সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধ করেছে এবং এখন পুলিশে গোয়েন্দা বিভাগে চাকরি করে।” আগন্তুক ছেলেটি একান্তে গিয়ে সৈয়দ আহমদ ও ফকীর রাজ্জাক প্রমুখকে জানায়, চাকরিসূত্রে সে সেনাসদর এলাকায় দায়িত্ব পালন করে। ছেলেটি বলল- “পরিস্থিতি ভালো নয়। দেশে যে কোনো সময় বড় ধরনের খারাপ কিছু ঘটে যাবে। এমনকি আজ রাতেই সরকারের পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। সাবেক ও সদ্য চাকরিচ্যুত ও চাকরিরত বেশকিছু সেনা কর্মকর্তা সেনানিবাসে গোপনে শলাপরামর্শ করছে। ওদের হাবভাব ভালো নয়। কানাঘুষা চলছে। দেশে বড় একটা কিছু হয়ে যাবে।”

বক্তৃতা শেষে শেখ মনি তার গাড়ির কাছে গেলেন; সৈয়দ আহমদ, সুলতান শরীফ, শফিকুল আজিজ মুকুল ও ফকীর রাজ্জাক বললেন, জরুরি কথা আছে। শেখ মনি তাদেরকে গাড়িতে উঠতে বলেন। মনির গাড়িতে ওঠেন সৈয়দ আহমদ। বাকিরা সুলতান শরীফের গাড়িতে ওঠে। রাত সাড়ে ৯টায় তারা গেলেন ৩২ নম্বর বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কথা বলে এসে মনি জানান- “মামাকে সব কিছু জানিয়েছি, তিনি এখনই খোঁজ নিবেন।” তারা চলে এলেন মনির ধানমণ্ডির ১৩ নম্বর সড়কের ভাড়া বাড়িতে।

এই মহান নেতার জীবন প্রদীপ মাত্র ৩৬ বছর বয়সে নিভে গেল। ১৫ আগস্ট জাতির পিতার সঙ্গে যদি শেখ মনি নিহত না হতেন, তাহলে বাংলার ইতিহাস অন্যভাবে লেখা হতো। মুজিব হত্যার পর স্বাধীনতাবিরোধী জিয়া-এরশাদরা মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশকে মিনি পাকিস্তানে পরিণত করতে পারত না। আজ ব্যথিত হৃদয়ে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি মনি ভাইকে!

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধ-বিষয়ক গবেষক, সিনিয়র সাংবাদিক।

শেয়ার করুন

সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক

সম্পত্তির উত্তরাধিকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হোক

শুধু হিজড়া ইস্যুতেই নয়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৯-এর আইনগত সহায়তা দিবসের অনুষ্ঠানে ’পুত্র’ বা ’কন্যা’র পরিবর্তে আইনে শুধু ‘সন্তান’ শব্দটি ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাতে করে সন্তানের লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে ভাবার দরকার হবে না। এরকম মানবিক ও নিরপেক্ষ চিন্তা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নাম ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

দেশের হিজড়া ও ট্রান্সজেন্ডার জনগোষ্ঠী বাবার সম্পত্তিতে অধিকার পেতে পারেন, এরকম একটি কথা আমরা কখনও কল্পনাও করতে পারিনি, অথচ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেটাই বলেছেন এবং করে দেখাতে চেয়েছেন। বাংলাদেশে পারিবারিক সম্পত্তি আইন মুসলিম অনুযায়ী চলে। এদেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী কখনও বাবা-মায়ের সম্পত্তি পাওয়ার কথা স্বপ্নেও দেখেনি। সবসময়, সবক্ষেত্রেই তারা অধিকারবঞ্চিত। পরিবার-সমাজ, রাষ্ট্র কোথাও তাদের স্থান ছিল না। বাবা-মা মারা গেলে, তাদের শূন্যহাতে বাসা থেকে বের করে দেয়া হয়। এবার প্রধানমন্ত্রীর নেয়া এই উদ্যোগ তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চলেছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে এমন একটি আইন প্রণয়নের কথা সরকার ভাবছে, যাতে হিজড়াদের সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব হয়। বাংলাদেশে প্রায় ১৫ লাখ হিজড়া রয়েছে। ২০১৯ সাল থেকে তারা ভোটাধিকারও পেয়েছে তৃতীয়লিঙ্গ হিসেবে।

শুধু হিজড়া ইস্যুতেই নয়, আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৯-এর আইনগত সহায়তা দিবসের অনুষ্ঠানে ’পুত্র’ বা ’কন্যা’র পরিবর্তে আইনে শুধু ‘সন্তান’ শব্দটি ব্যবহার করার জন্য পরামর্শ দিয়েছিলেন। তাতে করে সন্তানের লৈঙ্গিক পরিচয় নিয়ে ভাবার দরকার হবে না। এরকম মানবিক ও নিরপেক্ষ চিন্তা করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর নাম ইতিহাসে উজ্জ্বল হয়ে থাকবে।

এ প্রসঙ্গে মনে হলো স্বনামখ্যাত আইনজীবী এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর কথা। আবদুল মতিন খসরুর সঙ্গে আমার দু’একবার কথা হয়েছিল, একটি দৈনিকে কাজ করার সময়। সেসময়ে আমি তার একটা সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম উত্তরাধিকার আইন নিয়ে এবং সেজন্যই ওনার কথা মনে হলো। দৈনিকটিতে ওই সাক্ষাৎকার গ্রহণকালে আমি তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম- মুসলিম উত্তরাধিকার আইন সংশোধন করে কেন ছেলে-মেয়ের মধ্যে সমানভাবে সম্পত্তি ভাগ করে দেয়ার বিধান কায়েম করেন না? আপনাদের সরকার তো আইনে অনেক ধরনের প্রগতিশীল পরিবর্তন এনেছে?

তিনি আমার কথা উত্তরে বলেছিলেন- নানা কারণে আমাদের হাতপা বাঁধা। তাই চাইলেও সরকার এরকম ইতিবাচক একটি পরিবর্তন আনতে পারবে না। আমার নিজের এক ছেলে, এক মেয়ে। আমি মনেপ্রাণে চাই দুজনকে সমানভাগে সম্পত্তি ভাগ করে দিয়ে যেতে। আমি বাবা হিসেবে দুজনকে সমান ভালোবাসি। কিন্তু আমারও হাতপা বাঁধা। পারছি কই উত্তরাধিকার আইনে কোনো পরিবর্তন আনতে?” তিনি এ কথাগুলো বলেছিলেন সাক্ষাৎকারের বাইরে, অফ দ্যা রেকর্ড-এ।

নারী ও শিশু নির্যাতন আইন-২০০০ এবং সংশোধন-২০০৩ আইনটি মতিন খসরু সাহেবের তত্ত্বাবধানে হয়েছিল। তিনি নারী আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ আইভি রহমানের সঙ্গে কাজ করেছেন এবং নারীর অধিকার আদায়ে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছেন। হয়তোবা আরও বেশ কিছু সময় আইনমন্ত্রী থাকার সুযোগ পেলে মুসলিম উত্তরাধিকার আইন নিয়ে আরও কিছু করে যেতে পারতেন।

আওয়ামী লীগ সরকার যখন ১৯৯৭ থেকে ২০০১ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল, তখন নারী উন্নয়ন নীতি-১৯৯৭-এর ৭.২ অনুচ্ছেদে বাবার সম্পত্তিতে ছেলে ও মেয়ের সমান অধিকারের কথা বলা হয়। ইচ্ছে করলেই হয়তো সরকার একটি আইন পাস করতে পারত বা নীতি গ্রহণ করতে পারত। কিন্তু না, তারা তখন সেটা করতে পারেনি। বোঝা যায় নব নির্বাচিত সরকার হয়তো এত বড় ঝুঁকি নিতে চায়নি।

আর এর ফলে আমাদের পেতে হলো বিএনপি-জামায়াত সরকারের সময়কার নারী উন্নয়ন নীতির দ্বিতীয় খসড়া ২০০৪ সালে। তৎকালীন সরকার উত্তরাধিকার আইনে ও ভূমির উপর অধিকারের অংশটি কেটে দিয়েছিল। আমরা তৃতীয় খসড়াটি পেয়েছিলাম ২০০৮ সালে। সে যাক, অনেক জল ঘোলা হয়েছে এই নারী উন্নয়ন নীতি নিয়ে। এমনকি কেয়ারটেকার সরকার পর্যন্ত আলেমদের নিয়ে কমিটি করেছিলেন নীতিটি যাচাই-বাছাই করার জন্য। ফলে একদিন নীতিটি হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। সবসময়ই আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো নারী উন্নয়ন নীতিতে সম্পত্তিতে নারীর সমানাধিকার নিয়ে নীরবতা প্রদর্শন করেছে। (সূত্র: দি ডেইলি স্টার, নিবন্ধ: প্রফেসর ড. কাবেরি গায়েন)

মানবাধিকার ও নারী অধিকার সংগঠনগুলো উত্তরাধিকার আইনে যখন সম্পত্তিতে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলে আসছে। মুসলিম পরিবারে যে বাবামায়ের শুধু কন্যা সন্তান রয়েছে, তারা জানেন নিজের আত্মজাকে নিজের সম্পত্তিটুকু দিয়ে যেতে কতটা ভোগান্তির শিকার হতে হয়। হয় তাদের জীবদ্দশায় হেবা করে দিয়ে যেতে হয় বা উইল করে দিতে বাধ্য হন।

যদিও এই পদ্ধতি বাবামায়ের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাও মানুষ এই পদ্ধতির দিকেই হাঁটছেন, নয়তো কন্যা সন্তান কখনই আইনত বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তির শতভাগের মালিক হতে পারবে না। তার বাবার ভাইয়ের ছেলে সন্তানরা এর থেকে ভাগ পাবেন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন যে আমরা সবসময় বলছি, দুই সন্তানই যথেষ্ট। সেখানে কারো যদি দুটিই কন্যা সন্তান হয়, তখন সেই পরিবার কী করবে? কাজেই সবকিছুই বাস্তবতার নিরিখে ভাবতে হবে।

কোনো মাবাবাই তাদের সন্তানদের মধ্যে ফারাক করেন না বা করতে চান না। কোনো বাবা কি তার মেয়ে সন্তানকে কম ভালোবাসেন, নাকি কম যত্ন করেন? আইনে আছে বলে তারা বাধ্য হন এভাবে ভাগ করে দিতে। আজকাল মেয়েরাও বাবামায়ের প্রতি অনেক দায়িত্ব পালন করেন। অনেকে পুরো দায়িত্বই পালন করেন।

আমার জানামতে, উদাহরণ দিই। হাসনা, সে কাজ করে হংকংয়ে গৃহ সহযোগী হিসেবে। যখন থেকে মেয়েটি কাজ করতে শুরু করেছে, তখন থেকেই ওর বেতনের সব টাকা দিয়ে বাবামায়ের সংসার টানত। গত চার বছর যাবৎ হংকংয়ে কাজ করে ভাইবোনদের পড়াশোনা, বাবামায়ের চিকিৎসা, ভিটায় পাকা বাড়ি তোলার কাজ, সব করেছে। সেক্ষেত্রে এই মেয়ে কি বাবার সম্পত্তিতে সমান ভাগ দাবি করতে পারে না? কিংবা বাবার কি ইচ্ছা করতে পারে না যে, তিনি তার এই মেয়েকে নিজের সম্পত্তিতে সমান ভাগ দেবেন?

এরকম অনেক কন্যা সন্তানই আছেন, যারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে বাবামা, ভাইবোনের পাশে থাকেন। আমার এক বন্ধুকে এমনও দেখেছি যে ছেলে সন্তান নেই বলে বিছানায় শায়িত বাবাকে দীর্ঘ ১০ বছর ধরে নিজের কাছে রেখে দেখাশোনা করেছে। এই বাবার সম্পত্তিতে আর কার অধিকার থাকা উচিত? আর কেউতো এসে ওনাকে দেখা শোনা করেনি, কোনো খরচও করেনি তার চিকিৎসার জন্য। এরকম শত শত উদাহরণ আছে আমাদের সমাজে, আমাদের দেশে।

সেজন্যই প্রধানমন্ত্রী বার বার সম্পত্তিতে নারীর অধিকার সংরক্ষণের কথা বলেছেন। তিনি এ-ও বলেছেন পিতার অর্জিত সম্পত্তির অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে যেন শরিয়া আইনের অপব্যবহার করা না হয়। বিচারপতিদের উদ্দেশে তিনি বলেছেন যে, হ্যাঁ আমরা শরীয়া আইন মেনে চলব, সেই সঙ্গে এমন কোনো উপায় বের করতে হবে, যেন ইসলামি আইনের নাম ব্যবহার করে নারীকে কেউ স্বামী ও পিতার সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতে না পারে। যদিও ইসলাম নারীকে সম্পত্তিতে অধিকার দিয়েছে কিন্তু সামাজিক অবস্থার প্রেক্ষিতে অনেক ক্ষেত্রেই ভাইরা বোনকে বঞ্চিত করে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে আমরাও কণ্ঠ মিলিয়ে বলতে চাইছি যে, আমরা কাউকে শরিয়া আইন পরিবর্তন করতে বলছি না। কিন্তু সম্পত্তি আইন ধরে এই বিষয়টির নিষ্পত্তি করা সম্ভব। তিনি আশ্বাস দিয়েছেন বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। তিনি নিজেই অনেক ইসলামি চিন্তাবিদের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং তারা অনেকেই বিষয়টিতে তাদের সম্মতি জানিয়েছেন।

এবার প্রধানমন্ত্রী নিজেই বিষয়টি নিয়ে কথা বলেছেন, এর চাইতে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে! বাংলাদেশ হচ্ছে বিশ্বের ইতিহাসে সেই দেশ, যে দেশে বার বার নারী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন। কোনো দিক থেকে কোনো বাধা আসেনি। ‘আদর্শ মসজিদ’ও উদ্বোধন করেছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। যারা ‘ধর্ম গেল’ বলে শঙ্কিত থাকেন, তাদের বুঝতে হবে সময়ের আবর্তে অনেক ধর্মীয় মতবাদ ও আইনি নিয়ম-কানুন পরিবর্তন করা হয়েছে।

ইতোমধ্যে এই দেশেই ইসলামি দলগুলো বহুবার নারী নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে হাত মিলিয়েছে, শপথ নিয়েছে। ব্রিটিশ আমলে চালু হওয়া ১৯৩৭ সালের মুসলিম পারসোনাল আইন (শরিয়া আইন) পাকিস্তান আমলে এসে পরিবর্তন করা হয়েছে, সময়ের সঙ্গে সংগতি রেখে। যেমন, দাদা বা নানার সস্পত্তিতে, নাবালক সন্তানের সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার কার্যকর হয়েছে, এখন চাইলেই কোনো মুসলিম একসঙ্গে চারটি বিয়ে করতে পারে না। তাকে নিয়মের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়।

হিল্লা বিয়েও অনেক কঠিন করা হয়েছে এবং সর্বোপরি মুসলিম নারী তার স্বামীকে কারণ উল্লেখ করে এবং চার বছর নিরুদ্দেশ থাকলে তালাক দিতে পারেন। অনেকে ফতোয়া দিয়েছেন যে ছবি তোলা হারাম, সেটাও উঠে গেছে কাজের প্রয়োজনে। হজে যেতে চাইলে ছবি তুলতেই হবে। এসব নানা ধরনের উদাহরণ দেয়া যাবে।

আমরা চাই এদেশের মেয়েরা বাবার সম্পত্তির ভাগ ছেলেদের সমান পাক। বাবার অর্জিত সম্পত্তি ছেলে সন্তান না থাকলেও মেয়ে ও স্ত্রীর মধ্যে পুরোটা ভাগ হবে। এটাই এই সময়ে ন্যায্য। আমরা জানি ‘ইসলাম মানে ইনসাফ’। এই সত্যটি মানতেই হবে। শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, একটি ইউনিফর্ম আইন হওয়া দরকার, সব ধর্মের মানুষের জন্য। বিশ্বের অনেক মুসলিম দেশেই সিভিল ল আছে, আবার শরিয়া আইনও আছে। যে পরিবার, যেভাবে সুবিধা পাবেন, তারা সেভাবেই সম্পত্তি ভাগ করবেন।

প্রধানমন্ত্রী, আপনি বাংলাদেশের নারীদের সবক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে দিয়েছেন, কাজেই এই কাজটুকু আপনার হাত দিয়েই হবে বলে আমরা আশাবাদী।

লেখক: সিনিয়র কো-অর্ডিনেটর, মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন, কলাম লেখক।

শেয়ার করুন

ঢাকা সিটি করপোরেশন: নগরবাসী স্বস্তিতে নেই

ঢাকা সিটি করপোরেশন: নগরবাসী স্বস্তিতে নেই

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা শহরের নানা সমস্যার কথা বিবেচনা করে হয়তো দুটি সিটি করপোরেশনে ঢাকা মহানগরীকে বিভক্ত করে দেন। তখন এর বিরোধিতা করা হয়েছে সব মহল থেকে। তারপরও তিনি অনড় ছিলেন তার সিদ্ধান্তে। এখন মনে হয় ঢাকাকে দুটি কেন চারটি সিটি করপোরেশনে বিভক্ত করলেও বোধহয় এর নাগরিকদের জীবনে স্তূপীকৃত সমস্যার সমাধান সহজে হবার নয়। অবশ্য ২-৪ জন মেয়রই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, এমনটি ভাবলেও হবে না। সমস্যা সৃষ্টির জন্য নগরবাসীও দায় এড়াতে পারবে না। আবার জনসেবার নামে যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হন, তারাও যে সমানভাবে দক্ষ ও আন্তরিক সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে।

ঢাকার দুই মেয়র প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও ছুটে বেড়াচ্ছেন। কোথাও আবর্জনা নিয়ে একজনকে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে, অন্যজনকে হয়তো দখল করা খালের জমি উদ্ধারে তৎপরতা চালাতে দেখা যাচ্ছে। আবার পরদিনই হয়তো দেখা যাচ্ছে নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে ছাত্রদের বিক্ষোভ প্রশমিত করতে, আন্ডারপাস করার প্রতিশ্রুতি দিতে।

ঢাকার মেয়ররা কখন ঘুমান, কখন অফিসে বসেন, কখন ছোটাছুটি করেন, কখন নতুন কোনো সমস্যার সমাধানে ছুটে যান তা তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে গণমাধ্যমে তাদের সারাক্ষণই এখানে-সেখানে ছুটে বেড়াতে দেখা যাচ্ছে। ঢাকা শহরের দুই সিটি করপোরেশনের দুই মেয়রই দেখেশুনে মনে হচ্ছে ‘দৌড়ের ওপর’ আছেন। প্রায় দুই কোটি মানুষের বসবাসের এই মহানগরীতে দুটি সিটি করপোরেশন করা হয়েছে, আগে ছিল একটি। মেয়র ছিলেন একজন কিন্তু কোনো ডেপুটি মেয়র ছিল না। এখনও নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা শহরের নানা সমস্যার কথা বিবেচনা করে হয়তো দুটি সিটি করপোরেশনে ঢাকা মহানগরীকে বিভক্ত করে দেন। তখন এর বিরোধিতা করা হয়েছে সব মহল থেকে। তারপরও তিনি অনড় ছিলেন তার সিদ্ধান্তে। এখন মনে হয় ঢাকাকে দুটি কেন চারটি সিটি করপোরেশনে বিভক্ত করলেও বোধহয় এর নাগরিকদের জীবনে স্তূপীকৃত সমস্যার সমাধান সহজে হবার নয়। অবশ্য ২-৪ জন মেয়রই সব সমস্যার সমাধান করতে পারবেন, এমনটি ভাবলেও হবে না। সমস্যা সৃষ্টির জন্য নগরবাসীও দায় এড়াতে পারবে না। আবার জনসেবার নামে যারা নির্বাচিত প্রতিনিধি হন, তারাও যে সমানভাবে দক্ষ ও আন্তরিক সেটি নিয়েও নানা প্রশ্ন আছে।

তাছাড়া রাজধানী ঢাকা শহরে সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড প্রতিনিয়ত চলছেই। সেসব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমন্বিতভাবে হচ্ছে না বলে দীর্ঘদিন থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে। ওয়াসা রাস্তা কাটছে তো, ডেসকো রাস্তা ভরছে। আবার স্যুয়ারেজ নিয়ে সিটি করপোরেশন হাত দিচ্ছে তো নতুন মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষ রেল স্থাপনের উদ্যোগ নিতে আসছে। এভাবে নানা প্রতিষ্ঠানের নানা কাজ। বিষয়টি এমন- কোনটা থামাই, কোনটা রাখি, কোনটা বাদ দেই? সবই দরকার। তাই রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, ভরাভরি অবিরত চলছেই, ধুলাবালি উড়ছে, রাস্তা বন্ধ হচ্ছে, পথচারীদের চলাচল স্বাভাবিক থাকছে না। বৃষ্টি এলে সর্বত্রই কাদামাটি ও পানি থই থই করছে। মুহূর্তের বৃষ্টিতে সব কিছুই জলাবদ্ধতায় ডুবে যাচ্ছে। বর্ষাকালে ঢাকা শহরের অনেক অঞ্চলই ডুবে থাকে। গণপরিবহন স্বাভাবিক গতিতে চলছে না। জনদুর্ভোগ লেগেই আছে। এর জন্য দায় গিয়ে পড়ে কেষ্ট বেটা নগরপিতা তথা মেয়রের ওপর।

নগরপিতা তখন পিতা নয়, নানাজনের নানা গালিতে কুপোকাত হয়ে পড়েন। ঢাকা শহরের নগরপিতাদের এমন চিত্রায়িত হওয়ার করুণ অবস্থা দেখে অনেক সময় মায়া লাগলেও মুখ খুলে ভাব প্রকাশ করা যাবে না! এখন অনেকেই সাবেক মেয়র আনিসুল হকের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কিন্তু তিনি যখন জীবিত ছিলেন, একইভাবে ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের সমস্যার সমাধানে ছোটাছুটি করছিলেন, তখন রাস্তায় কিংবা পরিবহনে বসে তাকেও প্রচুর গালি উপহার দিতে নগরবাসী কার্পণ্য করেনি। এখনাকার দুই মেয়রও সেই ‘পুরস্কার’ লাভে প্রতিদিন বঞ্চিত হচ্ছেন না, এটি আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি। তবুও তাদের কাজ তাদের করতেই হবে। নগরবাসী গালমন্দ করলে খুব বেশি গায়ে মাখানো যাবে না। কেননা নগরবাসীও তো স্বস্তিতে নেই।

ছোট এই মহানগরীতে এত মানুষ, এত সমস্যা। ঘর থেকে বের হলেই কোনো না কোনো ভোগান্তিতে পড়তে হয়। ঘরে ফিরেও শান্তি খুব বেশি নেই। মশার পাল দিনের বেলাতেও মানুষ দেখে ছুটে আসে কামড়াতে। সন্ধ্যা হলে মশার উৎপাত ঠেকাতে কয়েলের ধোঁয়া জ্বালিয়েও সফল হওয়া যাচ্ছে না। হাতে ব্যাট নিয়ে তাই সবাই মশা মারতে ব্যস্ত থাকছে। এই মুহূর্তে কিউলেক্স মশা ঢাকাবাসীর রাতের ঘুম কেড়ে নিতে শুরু করেছে। ঢাকা সিটি করপোরেশন মশানিধনের ওষুধ ছিটাচ্ছে কি ছিটাচ্ছে না তাও বোঝা যাচ্ছে না। কিছুতেই মশার উপদ্রব কমানো যাচ্ছে না।

ঢাকার বর্জ্য নিয়ে মানুষ অনেক বছর থেকে সমস্যায় জর্জরিত। বাসাবাড়ি থেকে প্রতিদিন বর্জ্য বাইরে ফেলা হচ্ছে। অনেক সময় যারা ফেলছেন তারা পথচারীদের যাতায়াতের রাস্তার কথা বিবেচনা করেন না। রাস্তার ওপর বাসাবাড়ির এসব বর্জ্য পদার্থ যে যার মতো করে ছুড়ে ফেলে রেখে চলে যায়। এতে মশামাছি এবং নানা ধরনের ব্যাকটেরিয়ার জন্ম হয়ে থাকে। সে কথা জানার পরও অনেকেই বর্জ্য ফেলতে দ্বিধা করেন না।

সিটি করপোরেশনের ময়লা সংগ্রহকারীরা সময়মতো না এলে রাস্তায় দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কোথাও দুর্গন্ধ এতই বেশি ছড়িয়ে পড়ে যে, এলাকায় হাঁটা কিংবা বসবাস বেশ কষ্টের হয়ে দাঁড়ায়। অভিজাত এলাকাগুলো কিছুটা নিয়ম-শৃঙ্খলায় থাকলেও পুরাতন ঢাকা কিংবা আশপাশের অনেক এলাকায় বাসাবাড়ির বর্জ্য পদার্থ নিয়ে ছোট ছোট ময়লা আবর্জনার ভাগাড় কদিন অবস্থান করতে দেখা যায়। সিটি করপোরেশন একদিকে নিচ্ছে তো অন্যদিকে ভাগাড় তৈরি হচ্ছে।

একটি সুখবর নগরবাসীর সঙ্গে ভাগাভাগি করা যায়, আগামী দেড় বছর পর ঢাকার এসব আবাসিক ময়লা-আবর্জনা জাতির মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে। প্রতিদিন তিন হাজার টন বর্জ্য থেকে ৪২.৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হতে যাচ্ছে। গত ১ ডিসেম্বর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আমিনবাজার এলাকায় চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিএমইসি) ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছে।

স্থানীয় সরকার ও পল্লি উন্নয়নমন্ত্রী মোঃ তাজুল ইসলাম , বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, স্থানীয় সরকার বিভাগের সিনিয়র সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত চায়নার রাষ্ট্রদূত লি জিমিং চুক্তি স্বাক্ষরকালে উপস্থিত ছিলেন। ইনসিনারেশন পদ্ধতি বা বর্জ্য পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের এই প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন বিভিন্ন দেশে আগে থেকেই হয়ে আসছে।

এখন ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশন উল্লিখিত মন্ত্রণালয়গুলোর সহযোগিতা নিয়ে প্ল্যান্টটিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সহযোগিতা প্রদান করবে। এর ফলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরশনের আবাসিক বর্জ্য পদার্থ দ্রুত অপসারণের তাগিদ থেকে সিটি করপোরেশন আবর্জনা সরিয়ে নেবে। এর মাধ্যমে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অধিবাসীদের জীবনে বর্জ্য পদার্থের দুর্গন্ধ, মশা, মাছি ও রোগ-জীবাণু ছড়ানো থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। মন্ত্রী অবশ্য আশ্বাস দিয়েছেন যে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনসহ দেশের সবকটি সিটি করপোরেশনেও এ ধরনের প্ল্যান্ট তৈরির মাধ্যমে আবর্জনামুক্ত হওয়া, বিদ্যুৎ উৎপাদনে কাজে লাগার পরিকল্পনায় রয়েছে। শিগগিরই সেগুলো বাস্তবায়ন করার কাজে সরকার হাত দেবে। তবে এর জন্য সময়ের যথেষ্ট দরকার হয়, প্রচুর বিনিয়োগও করতে হয়। কিন্তু এর উপকার অনেক বেশি।

একদিকে বিদ্যুৎ পাওয়া যায়, অন্যদিকে ময়লা-আবর্জনার অস্বস্তি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ বদলে দেয়া যায়। ডিজিটাল বাংলাদেশে এটি ঘটবে এমনটি এখন আর দূরের নয়, বরং অনেক কাছেরই স্বপ্ন। ঢাকা সিটি করপোরেশনে নাগরিক সুযোগ-সুবিধার কথা অনেক আগে থেকে উচ্চারিত হলেও নানা জনের নানা স্বার্থে অনেক কিছুই বাস্তবায়িত হয়নি। অপরিকল্পিত নগরায়ণ, রাস্তাঘাট, বাড়িঘর নির্মাণ কিছুতেই যেন নিয়ম মেনে চলছে না। আবাসিক এলাকায় বড় ইমারত তৈরি হচ্ছে তাতে প্রতিবেশীদের ঘুম হারাম হয়ে যাচ্ছে। ভাবা হচ্ছে না শিশু, বৃদ্ধ ও রোগীদের কথা।

রাতদিন নির্মাণযন্ত্রের আওয়াজ মানুষের স্বস্তি কেড়ে নিচ্ছে। ধুলাবালিতে বাতাস বিষাক্ত হয়ে উঠছে। এমনিতেই ঢাকার বায়ু দূষিত হয়ে পড়েছে। ঢাকা কিছুতেই যেন মানুষের নিরাপদ স্বাস্থ্যের বসবাসের জায়গা থাকতে পারছে না। ঢাকায় আবাসিক অনাবাসিক এলাকায় নানা কেমিক্যালের গুদাম যেখানে-সেখানে বেড়ে উঠেছে। সেগুলোতে প্রায় দুর্ঘটনা ঘটছে, বড় দুর্ঘটনায় অনেক প্রাণেরও সংহার ঘটেছে। তারপরও নবনির্মিত ভবনগুলো আবাসিক কোড মেনে নির্মিত হচ্ছে না। ঢাকা শহরে ভূমিদখল, চাঁদাবাজি, মানুষের জায়গা দখল নিয়ে নানা অভিযোগ আছে।

আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী যথাযথভাবে ভূমিকা পালন করছে না। প্রভাবশালী নানা মহল নানা জায়গায় হস্তক্ষেপ করছে। সিটি করপোরেশনে হোল্ডিং ট্যাক্সসহ নানা ধরনের কর যেভাবে আদায় হচ্ছে, সেভাবে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা যাচ্ছে না। মানসম্মত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাব লেগেই আছে। বেসরকারি হাসপাতাল এখন আবাসিক এলাকার ভেতরে প্রবেশ করেছে। এটি কতটা বিজ্ঞানসম্মত সেটি ভেবে দেখার বিষয়। অদূর ভবিষ্যতে পরিকল্পিত উপশহর বলে খ্যাত পূর্বাচলে আবাসিক, অনাবাসিক ভবন তৈরি হতে যাচ্ছে সেগুলো যেন উন্নত ভবন কোড মেনে নির্মিত হয়।

সেখানে যেন কমিউনিটি স্কুল-কলেজ, লাইব্রেরি-খেলার মাঠ, পার্ক, স্বাস্থ্য চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা, বিনোদনের ব্যবস্থা যথাযথভাবে থাকে সেই ব্যবস্থা রাজউক ও উত্তর সিটি করপোরেশন সমন্বিতভাবে সম্পন্ন করে, সেটি সময়ের দাবি। ঢাকাকে সবধরনের অপরাধমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনকেও নিতে হবে। তাহলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে চিন্তা থেকে মহানগর ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন সেটি সুফল দেবে।

ঢাকার দুই মেয়র সক্রিয় আছেন এটি স্বস্তির বিষয়। তবে পর্বতসম সমস্যার নিচে তারা চাপা পড়ে হারিয়ে যাবেন সেটি কারোরই কাম্য নয়। দুই সিটি করপোরেশনই ধীরে ধীরে সফল হবে, নাগরিক জীবনেও ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরে আসবে এটিই সবার প্রত্যাশা।

লেখক: গবেষক-অধ্যাপক।

শেয়ার করুন

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে ভাবনা ও প্রত্যাশা

বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তী ঘিরে ভাবনা ও প্রত্যাশা

সরকারি টাকার সুদ ৯ টাকা। আর এনজিওর ২৫ টাকা। তারপর কৃষক টমেটো বেচে ১ টাকা কেজি। আর বাজারে আমরা পাই ৬০/৭০ টাকা দামে। মাঝের টাকা খেয়ে যায় কালো ঘোড়ায়। কৃষকের টাকায় দেশ চলে সেই কৃষক ঋণ পায় না। যদি পায় ঠিকমতো সময় দিতে না পারলে তার কোমড়ে ২৫ হাজার টাকার জন্য দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। কিন্তু যে লোক রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে পরিশোধ করে না, তার বেলায় কোনো কথা নেই।

এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ বা উন্নয়নের মহাসড়কে বাংলাদেশ, মধ্য আয়ের দেশ কথাগুলো শুনলে বেশ আপ্লুত হই। আমাদের দেশ এগিয়ে যাচ্ছে মানে কী? প্রাণজুড়ানো শব্দাবলি। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে– এসব শব্দ শুনলে বুকের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় দক্ষিণা বাতাস। যেন ঝাপটা মেরে যায়। আমাদের দেশ কত উন্নত হচ্ছে।

গোপালগঞ্জ শহর, বরিশালের আগৈলঝাড়া বা মাদারীপুরের রাজৈর না নেমে কোটালীপাড়ার লোকজন কেথাও যেতে পারত না। তাতে সবখানেই ৭/৮ ঘণ্টা সময় লাগত। আামি যখন সরকারি বঙ্গবন্ধু কলজে পড়তাম আমার বড়সড় ছুটি না হলে বাড়ি যেতাম না। এত দূর আর বাহন একমাত্র নৌকা। সেই এলাকা এখন চেনা যায় না। বাস, গাড়ি চলছে। খুলনা-বরিশাল রোড ফোর লেনের সড়কে ৮ ঘণ্টা এখন ২০ মিনিট হয়ে গেছে। আমাদের এলাকায় গরিব লোক খুঁজে পাওয়া কষ্টকর।

বিজয়ের ৫০ বছরে আমাদের অর্জন তাহলে কম নয়। উন্নয়নের পেছনেও কিছু কথা থাকে। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর দশটা দেশের মতো নয়। বাঙালির স্বাধীনতা আকাঙ্ক্ষা অনেক পুরোনো। টংক, তেভাগা, নানকার, ফকির-সন্ন্যাসী বিদ্রোহ কোনো কিছুই স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে আলাদা ছিল না।

মানুষ একের পর এক যত সংগ্রাম করে যাচ্ছিল ততই একটা ধারণায় এসে উপনীত হচ্ছিল যে, কোনো সংগ্রাম বৃথা যায় না। সংগ্রামের এই ধারাবাহিকতায় ৫২, ৬২, ৬৯-এর পথ পেরিয়ে একদিন আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। অজস্র মানুষের আত্মত্যাগ, এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আর দুই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে বাঙালি উপনীত হয় জীবনের চূড়ান্ত সংগ্রামে।

এই সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের পেছনে ছিল বহুবিধ ঘটনা, বিরূপ পরিস্থিতি, অসম আর্থিক বণ্টন ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের বঞ্চনাসহ গুরুতর বিষয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সম্পর্কের ক্রমাবনতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। ২৫ মার্চ দিবাগত মধ্যরাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে বাঙালিদের উপর অপারেশন চালানোর মধ্য দিয়ে তারা প্রতিবাদমুখর বাঙালিকে চিরতরে স্তব্ধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ‘অপারেশন সার্চ লাইট’ নামক ওই পরিকল্পনা দিয়ে নারকীয় গণহত্যা চালালেও স্তব্ধ করা যায়নি।

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। শুরু হয় প্রতিরোধ যুদ্ধ। দেশকে হানাদারমুক্ত করতে মরণপণ লড়াইয়ে অংশ নেয় সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজনৈতিককর্মী, ছাত্র-শ্রমিক, কৃষক-পেশাজীবী নির্বিশেষে সকল শ্রেণির মানুষ। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণ ও গণহত্যা মোকাবিলার জন্য গড়ে তোলে প্রতিরোধ। নয় মাস আতঙ্কিত প্রহর অতিক্রম করে আসে বিজয়ের মাহেন্দ্রক্ষণ। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভ করার বেশি দিন পার না হতেই সক্রিয় হয়ে ওঠে এদেশে ঘাপটি মেরে থাকা পরাজিত শত্রুরা।

১৯৭১ সালে সংঘটিত একটি গণবিপ্লবকে ১৯৭৫ সালের একটি প্রতিবিপ্লব দিয়ে শেষ করে দেয়া হয়। হত্যা করা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রাণপুরুষকে তার পরিবার-পরিজনসহ। রক্তাক্ত করা হয় সংবিধানকে। বিকৃত করা হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে। ঘাতকদের উম্মত্ত মঞ্চে পরিণত হয় দেশ। আর একাত্তরের যেসব মহানায়কেরা জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন তারা হয়ে যায় অপাঙক্তেয়।

মানবেতর জীবন যাপন করে বেঁচে থাকে সব বীর যোদ্ধা। বেহাত হওয়া বীরত্বগাথা ঢাকা পড়ে যায়। বিক্ষত করা হয় সংবিধানকে। মুক্তিযোদ্ধা সংসদ হয়ে ওঠে দলীয় ক্যাডারদের আড্ডাখানা। মুক্তিযুদ্ধের রক্তাক্ত ইতিহাসকে বিকৃত করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। যেসব বীরযোদ্ধা জীবনকে তুচ্ছ করে দেশমাতৃকাকে হায়েনার হাত থেকে রক্ষা করতে মরণপণ সংগ্রাম করেছিল তারা মানবেতর জীবন যাপন করতে থাকে। বিশেষ দিবসে এদের ডাকা হলেও এ বীরদের প্রশ্নে রাষ্ট্র, সরকারের যে ধরনের ভূমিকা রাখার কথা ছিল তা কোনো সরকার করেনি।

তালিকার পর তালিকা হয়েছে। অনেক মুক্তিযোদ্ধা লজ্জায় আনতচিত্তে তালিকায় নাম ওঠাতেও বিরূপ ছিলেন। বিনাযুদ্ধে যারা দেশের একমুঠো মাটিও ছাড়তে চায়নি। যারা ১০ খানা টিন দুই মণ গম বা একটা প্লটের জন্য যুদ্ধ করেনি। মুক্তিযুদ্ধের সুবর্ণজয়ন্তীতে মনে পড়ে সেই মুখগুলোর কথা?

যেসব গেরিলার যুদ্ধের বর্ণনা শরীরকে শিহরিত করে তারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নেই ভাবতে অবাক হতে হয়। যেসব আগুনমুখাদের যুদ্ধের বর্ণনা শুনলে গর্বে বুক ভরে ওঠ তারা তালিকায় নেই।

গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ার কিংবদন্তিতুল্য যোদ্ধা কমলেশ বেদজ্ঞের নাম মুক্তিযুদ্ধের তালিকায় নেই। যে লোকদের নাম আছে তা ভাবলে অবাক হতে হয়। কিন্তু বৃহত্তর ফরিদপুর-বরিশালের বড় যুদ্ধগুলোতে নেতৃত্বদানকারী কমলেশ বেদজ্ঞের নাম তালিকায় নেই। আমার স্কুলে যাওয়ার পথটার কথা মনে পড়ে। আমাদের বাড়ি থেকে কাঁচা একটা ছোট রাস্তা এসে থমকে দাঁড়িয়েছে খালপাড়ে। এটাকে আমরা বড় খাল বলতাম। এর পাশে একসময় একটা বটগাছ ছিল। আমাদের অনেক স্মৃতিবহ বটগাছটাকে ঘিরে অনেক ইতিহাস ছিল। বটগাছের ছায়ায় শীত-গ্রীষ্মে ছোট খাটো আড্ডা লেগেই থাকত। এই গাছের সঙ্গেই একটা পুল ছিল।

কখনও ভাঙা, কখনও আধভাঙা অবস্থায় থাকত এটি। এরপরই বাজারের শুরু। ডানপাশটাতে দোকানের ভিটি ছিল। দোকান ছিল না। পুরোনোর ইটের গাঁথুনির উপর ভিটি। মালিক ব্যবসায়ীরা ছিল। তারা ভারতে চলে গেছে। ওখান থেকে একটু এগোলেই আমাদের এলাকার মহাজন কাদের মিয়ার দোকান, পেছনে নারিকেল গাছ। সেখানে দাঁড়ালে যে বাড়িটা দেখা যায় ওখানে মোজাফফর ঘরামীর সুপারিবাগান ফলদবৃক্ষে ভরা বন-বনানী চোখে পড়ার মতো। ওই বাড়িটি ছিল কমলেশ বেদজ্ঞের।

তিনি কোটালীপাড়া হেমায়েত বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন। সিকির বাজারের যুদ্ধে কয়েকবার কমলেশ বেদজ্ঞসহ মুক্তিসেনারা ওই বটগাছের তলায় আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধ করেছে বলে শুনেছি। কমলেশ মুক্তিযুদ্ধ করেনি, বিষ্ণপদ কর্মকার করেনি, রামপ্রসাদ ভট্টাচার্য করেনি! কোটালীপাড়ার মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বাড়ির কোনো অবদান ছিল না! আমার বাবা মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে কোনোভাবে যুক্ত ছিলো না! ঘটনাগুলো এখন এমনটাই দাঁড়িয়েছে। সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় প্রখ্যাত সাংবাদিক নির্মল সেনের নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় নেই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য ভাতা চালু করলে এমনসব মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছেন সেটা কল্পনার বাইরে। এবারে নতুন তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম লিপিবদ্ধ করতে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে। সেখানে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার ভূমিকা বিতর্কিত হয়েছে। বিএনপির সময় মুক্তিযোদ্ধাদের যে সংখ্যা ছিল তা বেড়েছে কয়েকগুণ। এতে কি সম্মান বাড়ল?

ভাতা পাওয়ার জন্য যারা মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লেখায় তারা কোন মাপের মানুষ সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু লোভীদের দশ বছর পরে কী হবে সেটা ভাবনার ব্যাপার। এ চিত্র সারা দেশের। বিজয়ের সুবর্ণজয়ন্তীতে দাঁড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাটা করা হোক। যেটা দলিল হয়ে থাকবে হাজার বছর ধরে।

দুই.

‘বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে।’ যাদের রক্তের বিনিময়ে আমাদের এই প্রাপ্তি সেই রক্তকে কতটুকু সম্মান জানাচ্ছি বা জানিয়েছি, সেটাও আমাদের ভেবে দেখতে হবে। দেশের অর্থনীতির মূল বুনিয়াদ যাদের হাতে তারা কৃষক। তারা কৃষি ব্যাংকে গেলে ২৫ হাজার টাকা ঋণ পায় না। এ ঋণ পেতে দালারকে ৩ হাজার দিতে হয়। গণমাধ্যমে সম্প্রতি এমন খবর প্রকাশ হয়েছে। আবার টাকা দিয়েও কেউ ঋণ পায় না। তারা দাদন নেয় এনজিওর কাছ থেকে। নেত্রকোনায় এই দাদনপ্রাবল্য বেশি। সরকারি টাকার সুদ ৯ টাকা।

আর এনজিওর ২৫ টাকা। তারপর কৃষক টমেটো বেচে ১ টাকা কেজি। আর বাজারে আমরা পাই ৬০/৭০ টাকা দামে। মাঝের টাকা খেয়ে যায় কালো ঘোড়ায়। কৃষকের টাকায় দেশ চলে সেই কৃষক ঋণ পায় না। যদি পায় ঠিকমতো সময় দিতে না পারলে তার কোমড়ে ২৫ হাজার টাকার জন্য দড়ি দিয়ে বাঁধা হয়। কিন্তু যে লোক রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তি খাটিয়ে ২৫ হাজার কোটি টাকা লোন নিয়ে পরিশোধ করে না, তার বেলায় কোনো কথা নেই।

যে কৃষক-শ্রমিক মেহনতি মানুষ আর প্রবাসীদের র‌্যামিট্যান্সে অর্থনীতির বুনিয়াদ গড়া হয় সেই টাকা চলে যায় ঋণ খেলাপির হাতে। আর কৃষক থাকে না খেয়ে। দেশের ঋণখেলাপি আর অর্থপাচারের যে মচ্ছব চলছে- তা ভয়াবহ। সম্প্রতি জার্মানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ডয়েচেভেলের প্রকাশিত এক সংবাদে জানা যায়, বাংলাদেশ থেকে গত ১০ বছরে দেশের বাইরে পাচার হয়েছে সাড়ে ছয় লাখ কোটি টাকা৷ এই অর্থ বাংলাদেশের দুটি বাজেটের সমান৷ স্বল্পোন্নত (এলডিসি) দেশগুলোর মধ্যে অর্থপাচার সবচেয়ে বেশি হয়েছে বাংলাদেশ থেকেই৷

গত ২ মে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটি (জিএফআই) অর্থপাচারের যে তথ্য প্রকাশ করে, তাতে দেখা যায় ২০১৪ সালে বাংলাদেশ থেকে ৯১১ কোটি ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ ৭২ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা৷ বলা হয়েছে, আমদানি-রপ্তানিতে আন্ডার ভয়েস এবং ওভার ভয়েসের মাধ্যমেই প্রধাণত এই অর্থ পাচার করা হয়৷ এবারের প্রতিবেদনে ২০০৫ থেকে ২০১৪ সালের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে৷ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭ হাজার ৫৮৫ কোটি ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় ৬ লাখ ৬ হাজার ৮ শত ৬৮

কোটি টাকা। কিছু মানুষের অবিবেচক কার্যক্রম, দেশপ্রেমের অভাব, স্বার্থপরতা, দেশের সার্বিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সরকার এসব টাকা ফেরত এনে দেশের উন্নয়নকে আরও গতিশীল করা সম্ভব। তবে তার আগে খেলাপিঋণ আদায় জরুরি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যমতে, খেলাপি ঋণের সিংহভাগই অবশ্য রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর। জনতা ব্যাংকের ১৩ হাজার ৮ শত ৩৭ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের ১৪ শতাংশ, সোনালী ব্যাংকের ১০ হাজার ২৯৪ কোটি টাকা যা মোট খেলাপিঋণের ১০ শতাংশ, অগ্রণী ব্যাংকের ৭ হাজার ৮ শত ৭২ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের ৮ শতাংশ, বেসিক ব্যাংকের ৭ হাজার ৬ শত ১৯ কোটি টাকা যা মোট খেলাপিঋণের ৭.৫০ শতাংশ এবং বেসরকারি এবি ব্যাংকের ৫ হাজার ৩ শত ৩৩ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের ৫ শতাংশ। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, মোট খেলাপি ঋণের মধ্যে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ ৪৪ হাজার ১৬ কোটি টাকা, যা মোট খেলাপিঋণের প্রায় ৪৪ শতাংশ।

বিশেষায়িত তিন ব্যাংকের খেলাপির পরিমাণ ৩ হাজার ৬ শত ৯৯ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপির পরিমাণ ৫০ হাজার ১ শত ৫৫ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণ না কমে বরং দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়ার অন্যতম কারণ হলো- ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে সময়মতো যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়া। ব্যাংক খাতে মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্যের কারণে খেলাপিঋণ চিত্র স্ম্ফীত হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতি এ অবস্থাকে আরও নাজুক করে তুলেছে। কাউকে নতুন করে খেলাপি বলা যাচ্ছে না।

ঋণ আদায়ের জন্য কোনো জোড়ালো তাগাদা বা কঠিন আইনি ব্যবস্থাও নেয়া যাচ্ছে না। এ নিয়ে কোনোই সংশয় নেই যে, মুষ্টিমেয় কিছু অসাধু কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দুষ্টচক্রের দাপট ও আধিপত্যের কারণে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতি খেলাপিঋণের প্রসার ঘটায়। মিথ্যা তথ্য ও জালিয়াতির মাধ্যমে ঋণ নেয়ার পর তা খেলাপিতে পরিণত করার প্রবণতা শুরুতেই যদি ব্যাংকগুলো রোধ করতে পারত কিংবা এখনও পারে, তাহলে ঝুঁকি এড়ানোর পথ থাকত। এ জন্য জবাবদিহি ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

এই উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে পাচারকারী, ঋণ খেলাপিদের টাকা আদায় যেমন জরুরি তেমনি এদের আইনের আওতার আনা উচিত। তাদের দেশের সার্বিক উন্নয়ন আমাদের পাশের যেকোনো দেশকে ছাড়িয়ে যাবে। বিজয়ের এই মাসে আমাদের অঙ্গীকার হোক অর্থ পাচারকারী, ঘুষখোর, মুনাফালোভী ও খেলাপিঋণ করে যারা দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত করছে তাদের সামাজিকভাবে বয়কট করা। মুক্তিযুদ্ধে মানুষ যে স্বপ্ন দেখেছিল তার বাস্তবায়ন খুব জরুরি।

লেখক: গবেষক, প্রবন্ধকার ও সাংবাদিক।

শেয়ার করুন