গারো পাহাড়ের আদিবাসী নৃ-গোষ্ঠীর অন্যতম প্রধান উৎসব সাংস্কৃতিক ও কৃষ্টির নবান্ন বা ওয়ানগালা উৎসব। নতুন ফসল ঘরে উঠানোর পর প্রতিবছর উৎসব মুখর পরিবেশে হয়ে থাকে নৃ-গোষ্ঠীর এ উৎসব।
ময়মনসিংহ জেলার শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঐতিহ্যবাহী গারো পাহাড় এলাকায় গারোরা ওয়ানগালা উৎসবের আয়োজন করে থাকে প্রতিবছর। এবারও ২৬ নভেম্বর গারো পাহাড়ের ঝিনাইগাতী উপজেলার মরিয়মনগর ধর্ম পল্লীতে তারা সকলেই নেচে-গেয়ে মেতে উঠেন এ উৎসবে।
এ সম্প্রদায়ের লোকদের তথ্য মতে, এক সময় গারো পাহাড়ি এলাকায় জুম চাষ হতো। তখন ওই জুম বা ধান ঘরে উঠানোর সময় গারোদের শস্য দেবতা ‘মিসি সালজং’-কে উৎসর্গ করে এ উৎসবের আয়োজন করা হতো। এ সম্প্রদায় বিশ্বাস, তাদের শস্য দেবতা এক সময় পাহাড়ি এলাকার গারোদের হাতে কিছু শস্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমরা এটা রোপন করো তাতে তোমাদের আহারের সংস্থান হবে এবং তোমরা যে শস্য পাবে তা থেকে সামান্য কিছু শস্য আমার নামে উৎসর্গ করবে।’ এরপর থেকেই গারোরা তাদের শস্য দেবতাকে এই ফসল উৎসর্গ করে। কিন্তু গারো পাহাড়ের অধিকাংশ গারো ক্যাথলিক খ্রিস্টান ধর্মে দীক্ষিত হওয়ায় এখন ধর্মীয় ও সামাজিক ভাবে একত্রে করে পালন করা হয় এ উৎসব। এখন নতুন ফসল কেটে যিশু খৃস্ট বা ঈশ্বরকে উৎসর্গ করে ওয়ানগালা পালন করেন তারা। সীমান্তবর্তী শেরপুর জেলার গারো পাহাড়ের নৃ-গোষ্ঠির বা আদিবাসীরা মনে করে ইশ্বরের দয়ায় তারা ফসল উৎপাদন করে থাকে। তাই তারা প্রতি বছরের ন্যায় আয়োজন করে থাকে নবান্ন বা গারোদের ভাষায় ওয়ানগালা উৎসব।
প্রথমে সকাল ৯টার দিকে থক্কা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হয় এ উৎসব। এরপর ১০টার দিকে প্রার্থনা, ১২টার দিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, দুপর ২টার দিকে বাড়ি বাড়ি কীর্তনের সঙ্গে উৎসবে মেতে ওঠে নৃ-গোষ্ঠীর নারী-পুরুষ ও শিশুরা। সর্বশেষ বেলা ৩টা থেকে প্রীতিভোজের আয়োজন হয়ে থাকে।
মরিয়মনগরের রওনু নকরেক বলেন, ‘আমরা এ দিনটি অনেক আনন্দের সঙ্গে কাটাই। আমাদের নতুন ফসল ঘরে তোলার আগে তার কিছু অংশ প্রভুর নামে উৎসর্গ করি। আবার যেন পরের বছর এ বছরের চেয়ে ভালো ফলন পাই।’
আরেক দ্রনিতা ধারিং বলেন, ‘আমরা আসলে নতুন ফসল প্রভুকে উৎসর্গ করার জন্যই এই উৎসব পালন করে থাকি। এটা আমাদের নবান্ন উৎসব। এ উৎসবকেই আমরা ওয়ানগালা বলে থাকি। আমরা সারাদিন নেচে-গেয়ে কাটাই। আমাদের আগের লোকেরা এই কালচার করে গেছে তাই আমরাও তা পালন করে থাকি।’
তামিম চাম্বু গং বলেন, ‘নতুন ফসল হওয়ার পর আমরা প্রভুকে আগে ফসল উৎসর্গ করে থাকি। তারপর আমরা খাই। আমরা বছরের একই সময় এইটা পালন কইরা থাকি। এখানে আগের যুগের আদিকৃস্টির ব্যবহার করি। নতুন ফসল উৎসর্গ করার মাধ্যমে খৃষ্ট রাজাকে সম্মান করা হয়। এ উৎসবে অনেক বন্ধু- বান্ধব একসঙ্গে হতে পারে। বাড়িতে বাড়িতে অতিথিরা আসে।’
মরিয়মনগর ধর্মপল্লীতে ১৯৮৫ সাল থেকে ওয়ানগালা উৎসব পালন করা শুরু হয়। এ বছরও এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন তারা। প্রতিবছরই করা হবে এ উৎসবের আয়োজন। ওয়ানগালায় প্রার্থনা পরিচালনা করেন মরিয়মনগর ধর্মপল্লীর সহকারী পালপুরোহিত ও খামাল ফাদার নিকোলাস বাড়ৈ। পরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে গারোদের নিজস্ব ভাষায় গান ও নৃত্য পরিবেশিত হয়।
মরিয়মনগর ধর্মপল্লীর পালপুরোহিত ও খামাল ফাদার বিপুল ডেভিড দাস বলেন, ‘আমরা তাকে রাজা হিসেবে মানি। শান্তি রাজ হিসেবে তিনি সারা পৃথিবীতে শান্তি ছড়িয়ে দিয়েছেন। শান্তির বার্তা দিয়েছেন। ওয়ানগালা হলো আদিবাসীদের ধন্যবাদদের উৎসব। যা আমরা বাঙালিরা নবান্ন বলে পালন করি। তিনি এ সমস্ত শস্যের উৎস দান করে থাকেন। তাই আদিবাসীরা তার প্রতি খুশি হয়ে কৃতজ্ঞতা জানান এ উৎসবের মাধ্যমে। সুপ্রাচীনকাল থেকে গারো সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে নতুন প্রজন্ম ও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে তুলে ধরাই এর মূল লক্ষ্য।’
তিনি জানান, উৎসব ঘিরে ধর্মপল্লীর ও গারো পাহাড়ে আদিবাসীদের মাঝে বইছে আনন্দ।