টানা তিন দিন দরপতনের পর পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে তো পারলই না, উল্টো বড় দরপতনে বিনিয়োগকারীদের মনে আতঙ্ক আরও বড় করে তুলেছে।
গত সপ্তাহ থেকে পুঁজিবাজার টেনে তোলা ব্যাংক খাতে ঢালাও পতনের দিন এমন কোনো খাত ছিল না, যা নিয়ে কিছুটা হলেও স্বস্তিতে থাকা যায়।
বিমা, আর্থিক, প্রকৌশল, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক, ওষুধ ও রসায়ন খাতেও দেখা দিয়েছে প্রায় একই ধরনের চিত্র।
শেষের ১৫ মিনিটের লেনদেন মোট লেনদেন হাজার কোটি টাকার ঘরে নিয়ে গেছে। তবে একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল গত ২৮ এপ্রিলের ৯৪০ কোটি ৩২ লাখ টাকার স্মৃতি বুঝি ফিরে আসবে।
আগের টানা তিন দিনে সূচক যতটা পড়েছিল, চতুর্থ দিন বুধবার এক দিনেই সূচক পড়ল তার চেয়ে বেশি। ৯৫ পয়েন্ট পতনে সূচক নেমে গেলে ৭ হাজার পয়েন্টের নিচে।
দিন শেষে বেড়েছে কেবল ৭৫টি কোম্পানির দর, বিপরীতে কমেছে ২৫৯টির। দর ধরে রাখতে পেরেছে ৩১টি।
দিন শেষে সূচকের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯১৭ পয়েন্টে, যা গত ১০ নভেম্বরের পর সর্বনিম্ন অবস্থান।
লেনদেনের শুরুতে ১৫ মিনিটের মতো সূচক বাড়লেও এরপর টানা কমেছে
ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশ (বিএটিবিসি), লাফার্জ হোলসিম, রবির মতো কোম্পানিগুলোর শেয়ারের দরপতন সূচক পতন ত্বরান্বিত করেছে।
এ ছাড়া ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের শেয়ার দর ১.১৪ শতাংশ পতনের কারণে সূচকের পতন হয়েছে ৭.৬৩ শতাংশ। স্কয়ার ফার্মার শেয়ার দর ১.৭০ শতাংশ পতনের কারণে সূচক কমেছে ৬.৫২ শতাংশ।
সূচক পতনের পেছনে যে ১০টি কোম্পানির সবচেয়ে বেশি ভূমিকা ছিল, তার মধ্যে ব্যাংক খাতের ছিল ৪টি। এই চারটি ব্যাংকের শেয়ারের দর পতনে সূচক কমেছে ১১.০৫ শতাংশ।
গত কয়েক দিনে শেয়ার দর ব্যাপকভাবে বাড়লেও সূচক পতনের প্রধান ভূমিকায় ছিল এই খাতটি
পাশাপাশি যেসব কোম্পানির শেয়ার দর বেড়ে সূচক উত্থানে প্রচেষ্টায় ছিল তার মধ্যে প্রথমে ছিল গ্রামীণফোন, যার শেয়ার দর দশমিক ২৫ শতাংশ বৃদ্ধি সূচকে উত্থান হতে ২.৩৫ শতাংশ চেষ্টায় ছিল।
লেনদেনে খাতভিত্তিক বিবেচনায় দর বৃদ্ধিতে এগিয়ে ছিল বস্ত্র খাতের কোম্পানিগুলো। স্বল্প মূলধনি ও লোকসানি বা বন্ধ কিছু কোম্পানির শেয়ার দর বাড়তে দেখা গেছে।
দরপতনের দিন সূচকে কিছুটা হলেও পয়েন্ট যোগ করেছে এই ১০টি কোম্পানি
চলতি সপ্তাহের শুরুতে ব্যাংক খাত নিয়ে বিনিয়োগকারীদের যে আগ্রহ তৈরি হয়েছিল, এক দিনেই তা পরিণত হয়েছে হতাশায়। তালিকাভুক্ত ৩২টি ব্যাংকেরই শেয়ার দর এক দিনে কমার বিষয়টি সহসা দেখা যায় না, যেটি ঘটেছে আজ।
দর বৃদ্ধিতে ১০ কোম্পানি
এর মধ্যে শীর্ষ ১০ কোম্পানির মধ্যে দিনের সর্বোচ্চ দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানি ছিল চারটি। এগুলোর দাম ১০ শতাংশ বা আশপাশে বেড়েছে।
দিনের সর্বোচ্চ দর বৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির মধ্যে শীর্ষে ছিল প্রকৌশল খাতের জেড ক্যাটাগরির সুহৃদ ইন্ডাস্ট্রিজ। ৯.৯২ শতাংশ দর বৃদ্ধির মাধ্যমে সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা কোম্পানিটির মোট লেনদেন হয়েছে ১ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। হাতবদল হয়েছে ১০ লাখ ৮০ হাজার ৭৭৮টি শেয়ার।
সদ্য তালিকাভুক্ত দুটি কোম্পানি ছিল এই তালিকায়। এর মধ্যে একমি পেস্টিসাইডস ও সেনাকল্যাণ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার দর তালিকাভুক্ত হওয়ার পর থেকে প্রতিদিনই বাড়ছে সর্বোচ্চ পরিমাণে। তবে এখনও বলার মতো লেনদেন হয়নি।
কোম্পানি দুটির শেয়ার বিক্রিতে বিনিয়োগকারীদের অনাগ্রহ ছিল। একমি পেস্টিসাইডসে ১৬৩টি শেয়ার আর সেনাকল্যাণের ১ হাজার ৬১৬টি শেয়ার হাতবদল হয়েছে।
এ ছাড়া ৮ শতাংশ পর্যন্ত দর বেড়েছে একটির। আর ৬ শতাংশ পর্যন্ত দর বেড়েছে তিনটির। ৫ শতাংশের কোনো কোম্পানি না থাকলেও ৪ শতাংশের বেশি দর বেড়েছে তিনটির।
তারপর দর বৃদ্ধির তালিকায় থাকা তিনটি কোম্পানি ছিল বস্ত্র খাতের। তবে শীর্ষ দর বৃদ্ধিতে বস্ত্র খাতের ছিল আরও একটি কোম্পানি। তসরিফার দর বেড়েছে ৯.৫৭ শতাংশ। মিথুন নিটিংয়ের দর বেড়েছে ৮.৭৭ শতাংশ আর মুন্নু ফেব্রিক্সের বেড়েছে ৬.৮৭ শতাংশ। প্যারামাউন্ড টেক্সটাইলের শেয়ার দর বেড়েছে ৪.৮৮ শতাংশ।
দর বৃদ্ধিতে থাকা অপর কোম্পানিগুলোর মধ্যে ছিল সিমেন্ট খাতের এমআই সিমেন্ট, যার দর বেড়েছে ৬.৩৮ শতাংশ। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের জিলবাংলা সুগার মিলের শেয়ার দর বেড়েছে ৪.৯৮ শতাংশ।
এ তালিকায় তথ্য ও প্রযুক্তি খাতের একটি কোম্পানি ছিল। অগ্নি সিস্টেমসের শেয়ার দর বেড়েছে ৪.৩৯ শতাংশ। কোম্পানির মোট হাতবদল হয়েছে ১৫ লাখ ৯০ হাজার ৬২২টি শেয়ার।
দর পতনের ১০
দর পতনের শীর্ষে ১০ কোম্পানির মধ্যে প্রথমেই ছিল মিউচ্যুয়াল ফান্ড। এলআর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিটপ্রতি দর কমেছে ১০ শতাংশ। ইউনিটিপ্রতি দর ৯ টাকা থেকে কমে হয়েছে ৮ টাকা ১০ পয়সা।
তবে এই ফান্ডটি ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৫১ পয়সা লভ্যাংশ ঘোষণার পর রেকর্ড ডেটের পর প্রথম কর্মদিবস ছিল আজ। নগদ লভ্যাংশ সমন্বয়ের কথা না থাকলেও বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে এই প্রবণতা আবার দেখা গেল।
এক দিনে ১০ শতাংশের বেশি দর কমা সম্ভব ছিল না আর এই সর্বোচ্চ পরিমাণে দর কমার পরেও ফান্ডটির ক্রেতা ছিল খুবই কম।
ফান্ডটির ৬৬ হাজার ৫৩২টি ইউনিট হাতবদল হয়েছে, যার বাজারমূল্য ছিল ৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা।
বিষয়টি বাদ দিলে বলা যায় সবচেয় বেশি কমেছে কাট্টলি টেক্সটাইলের শেয়ার দর। ৯.০৬ শতাংশ কমে ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৮৬টি শেয়ার হাতবদলের মাধ্যমে মোট লেনদেন হয়েছে ৭ কোটি ৪২ লাখ টাকা।
ঢালাও দরপতনের পরেও ব্যাংক খাত ছিল লেনদেনে সেরা
বাংলাদেশ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ফাইন্যান্স বা বিআইএফসির দর কমেছে ৮.৬৯ শতাংশ। জেমিনি সি ফুডের শেয়ার দর কমেছে ৮.০৪ শতাংশ। কোম্পানিটির মোট ১ লাখ ১৭ হাজার ৯০৬টি শেয়ার হাতবদল হয়েছে। লেনদেন হয়েছে মোট ২ কোটি ৭০ লাখ টাকা।
২০২০ সালের ডিসেম্বরে অর্থবছর সমাপ্তের প্রায় ১০ মাস পর লভ্যাংশ না দেয়ার সিদ্ধান্ত জানানো প্রিমিয়ার লিজিং কোম্পানির শেয়ার দর কমেছে ৭.৯২ শতাংশ।
লোকসানে থাকার পরও লভ্যাংশ ঘোষণার পর লাফ দেয়া হামিদ ফেব্রিক্সের শেয়ার দর আরও কমেছে ৬.৮৪ শতাংশ।
ব্যাংক খাতের আইএফআইসির দর কমেছে ৪.৯৫ শতাংশ। ২০ টাকা ২০ পয়সার শেয়ার কমে হয়েছে ১৯ টাকা ২০ পয়সা।
ব্যাংকটির ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৬১টি শেয়ার হাতবদল হয়েছে যার বাজারমূল্য ছিল ৬৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা।
ব্যাংক খাতের আরেক প্রতিষ্ঠান এনআরবিসির শেয়ার দরও আবার ৪.৯০ শতাংশ কমেছে। হাতবদল হয়েছে ৭০ লাখ ২৮ হাজার ৩০টি শেয়ার। যার বাজারমূল্য ছিল ২২ কোটি ৪১ লাখ টাকা।
এ ছাড়া গোল্ডেনসনের শেয়ার দর ৪.৮৮ শতাংশ, সালভো কেমিক্যালের দর ৪.৮৭ শতাংশ, রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের দর কমেছে ৪.৭০ শতাংশ।
লেনদেনের শীর্ষে ১০
এদিন লেনদেনের শীর্ষে ছিল ওয়ান ব্যাংক। যার মোট ৫ কোটি ৬৩ লাখ ৪ হাজার ৮০০টি শেয়ার হাতবদলের মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে ১০৮ কোটি ৭৪ লাখ টাকা।
লেনদেনে এগিয়ে থাকলেও এদিন কোম্পানিটির শেয়ার দর কমেছে দশমিক ২ শতাংশ। শেয়ার দর ১৮ টাকা ৭০ পয়সা থেকে কমে হয়েছে ১৮ টাকা ৫০ পয়সা।
তারপরই ছিল বিবিধ খাতের বেক্সিমকো লিমিটেড, যার লেনদেন হয়েছে ১০৬ কোটি ৯১ লাখ টাকা। শেয়ার হাতবদল হয়েছে ৬১ লাখ ৭ হাজার ১১৬টি।
ব্যাংক খাতের আরেক কোম্পানি আইএফআইসি ব্যাংকের মোট লেনদেন হয়েছে ৬৭ কোটি ৮৫ লাখ টাকা, হাতবদল হয়েছে ৩ কোটি ৪৫ লাখ ৩৮ হাজার ৯৬১টি।
বেশি কিছু খাতে লেনদেন ছিল একেবারেই তলানিতে
ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের লেনদেন হয়েছে ৫৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। হাতবদল হয়েছে ৩ কোটি ৬১ লাখ ৭৩ হাজার ৯৮৫টি।
বিমা খাতের ডেল্টা লাইফ ইন্স্যুরেন্সের শেয়ার লেনদেন হয়েছে ৪২ কোটি ৭১ লাখ টাকার। হাতবদল হয়েছে ২০ লাখ ১৭ হাজার ৩৮৬টি শেয়ার।
প্যারামাউন্ড টেক্সটাইলের লেনদেন হয়েছে ৩৬ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। হাতবদল হয়েছে ৩৮ লাখ ৪১ হাজার ১৩৩টি শেয়ার।
সাইফ পাওয়ারটেকের শেয়ার দর কমেছে দশমিক ৩ শতাংশ। কোম্পানিটির লেনদেন হয়েছে ২৭ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। হাতবদল হয়েছে ৬২ লাখ ৯৬ হাজার ৮৫৩টি শেয়ার।
এদিন ব্যাংক খাতের এনআরবিসি ও ফরচুর সুজ ছিল লেনদেনে শীর্ষ ১০ কোম্পানির তালিকায়।