গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে ভোক্তার কাছে ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক

আকিজ ডেইরির সিওও মো. মোসলেহ উদ্দীন

গুণগত মান অক্ষুণ্ন রেখে ভোক্তার কাছে ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক

ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক কীভাবে বাজারে আসে আর কীভাবে দুধের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখা হয় তা জানিয়েছেন আকিজ ডেইরির সিওও মো. মোসলেহ উদ্দীন। তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটি তার নিবন্ধিত প্রায় ১০ হাজার খামারির কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে। নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে ফার্ম ফ্রেশের নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা ৫০ হাজার করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আকিজ ডেইরির ফার্ম ফ্রেশ ইউএইচটি মিল্ক যাচ্ছে ভোক্তাদের হাতে। খামারিদের কাছ থেকে সংগৃহীত দুধ বেশ কিছু ধাপ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর মোড়কজাত হয়ে আসে বাজারে।

ফার্ম ফ্রেশ মিল্ক কীভাবে বাজারে আসে আর কীভাবে দুধের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখা হয় তা জানিয়েছেন আকিজ ডেইরির সিওও মো. মোসলেহ উদ্দীন।

তিনি জানান, ফার্ম ফ্রেশ প্রধানত পাবনা, সিরাজগঞ্জ, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট অঞ্চলসহ সারা দেশের খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব দুটি খামার রয়েছে। সেখান থেকেও দুধ সংগ্রহ করা হয়।

আকিজ ডেইরির সিওও বলেন, প্রতিষ্ঠানটি তার নিবন্ধিত প্রায় ১০ হাজার খামারির কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ করে। নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ২০২৪-২৫ সালের মধ্যে ফার্ম ফ্রেশের নিবন্ধিত খামারির সংখ্যা ৫০ হাজার করার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

তিনি জানান, খামারিদের কাছ থেকে দুধ সংগ্রহ থেকে শুরু করে ফার্ম ফ্রেশের ফ্যাক্টরিতে আনা পর্যন্ত পুরো বিষয়টি বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় করা হয়। কৃষকরা যেন স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গরু লালন-পালন করেন, সে বিষয়ে সহযোগিতা করা হয়। গরুর রোগ প্রতিরোধ, ঘর তৈরি, লালন-পালনসহ খামারসংশ্লিষ্ট যাবতীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণও দেয়া হয় খামারিদের।

তারা দুধ সংগ্রহের পর ফার্ম ফ্রেশের নিকটস্থ ক্রয়কেন্দ্রে নিয়ে আসেন। মাঠপর্যায়ে প্রতিষ্ঠানটির ল্যাব ও দক্ষ কর্মী-বাহিনী রয়েছে। সেখানে দুধের গুণগত মান পরীক্ষা করার পর তা গ্রহণ করা হয়।

আকিজ ডেইরির সিওও মোসলেহ উদ্দীন জানান, নিজস্ব চিলিং সেন্টারে অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে দুগ্ধ শীতলীকরণের পর নিজস্ব ট্যাংকারে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় পরিবহন করে ফার্ম ফ্রেশের ফ্যাক্টরিতে নিয়ে আসা হয়। দুধ ফ্যাক্টরিতে আনার পর আবারও গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়। তার পরই ফ্যাক্টরিতে দুধ গ্রহণ করা হয়।

তিনি জানান, সংগৃহীত দুধ ১৪০-১৪৩ ডিগ্রি তাপমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত করে ইউএইচটি দুধে রূপান্তর করা হয়। এ উচ্চ তাপমাত্রায় প্রক্রিয়াজাত করার ফলে দুধ সম্পূর্ণ জীবাণুমুক্ত হয়। সুইডেনের অত্যাধুনিক মেশিনে প্রসেসিং করে ছয় স্তরবিশিষ্ট অ্যাসেন্টিক ফিলিং পদ্ধতিতে প্যাকেটজাত করা হয়।

কোম্পানিটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত এ দুধের গুণগত মান অক্ষুণ্ন থাকে। ফার্ম ফ্রেশ দুধে কোনো কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয় না। দুধকে উচ্চ তাপমাত্রায় ফোটানো হয়। দুধ মূলত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণুর (ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ইস্ট ইত্যাদি) কারণে নষ্ট হয়। তাপ প্রয়োগ করে এসব মাইক্রো অর্গানিজমকে ধ্বংস করা হয়। দুধ ফুটিয়ে পান করা একটি চিরায়ত নিয়ম।

সিওও মোসলেহ উদ্দীন জানান, ভোক্তাদের চাওয়া থাকে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে ভালো সেবা। ফার্ম ফ্রেশ সে বিষয়ে গ্রাহকদের সম্পূর্ণ আস্থা অর্জন করেছে। তাই বাজারে তাদের পণ্যের চাহিদা বেড়েছে। আর তারাও বেশি পরিমাণে দুধ কৃষকদের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে পারছে। এতে খামারিদের জীবনমানের উন্নয়ন হচ্ছে।

দেশে দুগ্ধশিল্পের বিকাশে সরকারের সুনজরের পাশাপাশি বিদেশি গুঁড়া দুধ আমদানি কমানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।

মোসলেহ উদ্দীন বলেন, ‘আমাদের দেশ এখনো দুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। দুগ্ধশিল্প এখনো অবহেলিত একটি শিল্প। এ জন্য এ খাতে সহযোগিতায় সরকারকে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের প্রণোদনা দিতে হবে। অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস-সংযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

‘আর চড়া দাম দিয়ে গুঁড়া দুধ আমদানি ধীরে ধীরে কমিয়ে একপর্যায়ে তা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি গরুর জাত উন্নয়ন ও মানসম্পন্ন গাভি সরবরাহ করা অত্যন্ত জরুরি।’

শেয়ার করুন

মন্তব্য

লকডাউন: কোরবানির পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা

লকডাউন: কোরবানির পশু নিয়ে দুশ্চিন্তায় খামারিরা

‘লাভের আশার চেয়ে আমরা চিন্তিত বেশি। লকডাউনের কারণে ঠিকমতো হাটে নিতে পারব কি না। হাটে পৌঁছাতে পারব কি না। আর গ্রাহকরা খামারে আসবেন কি না, সেটা নিয়েও চিন্তায় আছি ।’

কোরবানির ঈদ সামনে রেখে ব্যস্ত সময় পার করছেন মানিকগঞ্জের খামারিরা। সকাল-সন্ধ্যা কাটছে গরু ও অন্যান্য পশু মোটাতাজা ও পরিচর্যার কাজে। ঈদের সময় যত এগিয়ে আসছে, খামারিদের ব্যস্ততা তত বাড়ছে। তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে দুশ্চিন্তা।

পশু খামারিদের কপালে চিন্তার এ ভাঁজ করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে। মহামারির কারণে এ বছর চাহিদামতো গরু মোটাতাজা করতে পারেননি অনেকে। আবার বেড়ে গেছে গোখাদ্যের দাম। এরপরও তারা গরু মোটাতাজা করেছেন। কিন্তু লকডাউনের কারণে সেই গরু বেচতে পারবেন কি না তা নিয়েই তাদের দুশ্চিন্তা।

জেলা প্রাণিসম্পদ কার্যালয় থেকে জানা যায়, কোরবানির ঈদ উপলক্ষে মানিকগঞ্জের সাত উপজেলায় এ বছর ১০ হাজার ৯২৬ খামারে পশু মোটাতাজা করা হচ্ছে। জেলায় এ বছর ২৭ হাজার ৫৫৪টি ষাঁড়, ৯২৮ বলদ, ১৩ মহিষ, ১৬ হাজার ২৮৬ ছাগল, ২ হাজার ৮৩৯ ভেড়াসহ ৫৫ হাজার ৮৮৮টি গবাদিপশু মোটাতাজা করা হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ সদরের গড়পাড়ার গ্রিন ফার্মের পরিচালক ও খামারি আবুল কালাম জানান, তার খামারে দেশি, শাহিয়াল, ক্রস, অস্ট্রেলিয়ান, দেশি বার্মা, সিন্ধি জাতের ৮৯টি গরু আছে। যার মধ্যে ৫০টি গরু কোরবানির জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘লাভের আশার চেয়ে আমরা চিন্তিত বেশি। লকডাউনের কারণে ঠিকমত হাটে নিতে পারব কি না। হাটে পৌঁছাতে পারব কি না। আর গ্রাহকরা খামারে আসবেন কি না, সেটা নিয়েও চিন্তায় আছি।

‘সাধারণ সময়ে যে গরু বেচাকেনা হয়, সেভাবে বেচাকেনা হলে লোকসান গুনতে হবে। কারণ কোরবানির ঈদ উপলক্ষে আমরা অনেক বেশি গরু লালন-পালন করে থাকি। তবে এবারের করোনা ও লকডাউনের কারণে লোকসানের আশঙ্কাই বেশি।’

সদরের চান্দর এলাকার খামারি মোসলেম উদ্দিন জানান, তার খামারে ৯টি গরু আছে। যার মধ্যে পাঁচটি কোরবানির জন্য মোটাতাজা করা হয়েছে। তবে করোনার কারণে খরচ পড়েছে অনেক বেশি। বিশেষ করে গরুর খাদ্যের দাম অনেক বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘এখন যদি ভারতের গরু না আসে, আর ঠিকমতো হাটে নেয়া যায়, তাহলেই শুধু ভালো দাম পাওয়া যাবে।’

আরেক খামারি দুলাল মিয়া জানান, গরু মোটাতাজার কাজে সকাল-সন্ধ্যা পরিশ্রম করতে হয়। সকালে গরুকে খাওয়ানো, গোসল করানো, আবার গরম বেশি পড়লে বারবার গোসল করাতে হয়। এ ছাড়া সারাক্ষণ ফ্যান চালাতে হয়। সব মিলিয়ে প্রায় সারা দিনই যায় গরুর পেছনে।

গরুর পরিচর্যা করতে করতে নিজেদের খাওয়া-দাওয়াও ঠিকমতো করতে পারেন না। এ সবকিছুই করেন একটু লাভের আশায়।

খামারের কর্মচারী শের আলী বলেন, ‘খামারের গরুগুলোকে ঘাস আর ভুসি খাওয়ানো হয়। ভুসি কিনে আনতে হয়। আর ঘাস চাষ করতে হয়েছে। প্রতিদিন ক্ষেত থেকে সেই ঘাষ কাটি, পরে খামারে এনে মেশিনে কেটে গরুকে খাওয়াই।’

মানিকগঞ্জে জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা মাহবুবুল ইসলাম বলেন, ‘মানিকগঞ্জের সাতটি উপজেলায় নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মতভাবে গবাদিপশু মোটাতাজা করা হয়। প্রতিটি খামারির সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ করা হয় ও পরামর্শ দেয়া হয়।

‘নিরাপদ পশু ও গবাদিপশুর জন্য মানিকগঞ্জ জেলার পরিচিতি আছে। পশু পালনের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন খামারিরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন, অপরদিকে দেশে কোরবানির পশুর চাহিদাও পূরণ করছেন।’

তিনি জানান, কোরবানির সময় রাজধানীর গাবতলীর পশুর হাটে যে গবাদিপশু বেচাকেনা হয়। তার ৩০ শতাংশ পশু যায় মানিকগঞ্জ থেকে। তবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির কারণে গত বছরের তুলনায় এবার জেলায় পাঁচ হাজারের মতো গবাদিপশু মোটাতাজা কম হয়েছে।

শেয়ার করুন

রাত ২টায় জেগে ওঠে চা-বাগান

রাত ২টায় জেগে ওঠে চা-বাগান

পঞ্চগড়ের শ্রমিকরা কাজ শুরুই করেন গভীর রাতে। ছবি: নিউজবাংলা

চা-বাগান সাধারণত দিনের বেলায় কর্মব্যস্ত থাকে। তবে পঞ্চগড়ের চা-বাগানগুলোতে রাতের বেলায় ব্যস্ততা বেড়েছে বছরখানেক। এখানকার শ্রমিকরা কাজ শুরুই করেন রাত ২টার দিকে।

গভীর রাত। চারপাশে ঘোর অন্ধকার। আলো চা-বাগানের ভেতর। দূর থেকে মনে হয় অসংখ্য জোনাকি পোকা দখলে নিয়েছে সবুজ চায়ের বাগান।

কাছে গেলে এ ভ্রম কাটতে শুরু করে। আরও স্পষ্ট হয় আলো; পেছনের অবয়ব। একটা পর্যায়ে বোঝা যায়, সে আলো আসলে জোনাকি পোকার নয়, শ্রমিকদের মাথায় বাঁধা সার্চ বা মোবাইল ফোনের লাইটের।

চা-বাগান সাধারণত দিনের বেলায় কর্মব্যস্ত থাকে। তবে পঞ্চগড়ের চা-বাগানগুলোয় রাতের বেলায় এমন ব্যস্ততা বেড়েছে বছরখানেক। অন্য চা-বাগানের শ্রমিকরা রাতে ঘুমালেও এখানকার শ্রমিকরা কাজ শুরুই করেন রাত ২টায়।

এভাবে রাতের অন্ধকার আর নিস্তব্ধতা ভেদ করে চা-পাতা তুলতে তুলতে সকাল হয়ে যায়। রোদ-গরম না থাকায় এ সময় বেশি পরিমাণ পাতা সংগ্রহ করতে পারেন তারা। এভাবে সকাল ১০টা পর্যন্ত চা-পাতা তুলে সেগুলো জমা দিয়ে ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা পান। দিনের বেলা অন্য কাজ করার সুযোগও পান তারা।

কেন এই ব্যতিক্রম

চা-বাগানের মালিকরা বলছেন, তীব্র গরমের কারণে দিনের বেলায় তোলা চা-পাতা শুকিয়ে যায়। শুকনো পাতা থেকে ভালো চা হয় না। শ্রমিকদেরও কাজ করতে কষ্ট হয়। তাই দুই পক্ষের সমঝোতায় রাতে পাতা তোলার ব্যতিক্রমী এই উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

রাত ২টায় জেগে ওঠে চা-বাগান

এতে খুশি শ্রমিকরাও। দিনে অন্য কাজ করে রাতে পাতা তুলতে পারেন। ফলে বেড়েছে তাদের আয়; বেড়েছে পরিবারের সচ্ছলতা।

শ্রমিকরা জানান, আগে দিনের বেলায় সূর্যের কড়া তাপ সয়ে চা-পাতা তুলতে বেশ কষ্ট হতো। তাপে পাতাও শুকিয়ে যেত। কারখানার মালিকরা শুকনা পাতা নিতে চাইতেন না। তাই সমঝোতার ভিত্তিতে বছরখানেক শ্রমিকরা রাতে চা-পাতা তোলার কাজ করছেন। শুরুর দিকে অল্প কয়েকজন শ্রমিক এ সময় কাজ করলেও দিন দিন বাড়ছে তাদের সংখ্যা।

পঞ্চগড় সদরের চা-শ্রমিক বাবুল হোসেন নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমি বছরখানেক রাতে চা-পাতা তোলার কাজ করছি। রাত ২টা থেকে সকাল ১০টা পর্যন্ত কাজ করি আমরা। এতে জনপ্রতি ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা মজুরি পাই।

‘আবার দিনের বেলায় অন্য কাজ করতে পারি। এভাবে দুই কাজ করে আমাদের সংসার আগের চেয়ে অনেক ভালো চলছে।’

সদরের আরেক চা-শ্রমিক ফারুক ইসলাম বলেন, ‘আগে দিনে চা-পাতা তোলার কাজ করতাম। কিন্তু প্রচণ্ড রোদের কারণে বেশিক্ষণ তোলা যেত না। বেশি পাতা তুলতেও পারতাম না।

‘রাতে পরিবেশ শান্ত থাকে, রোদের ভয় নাই। তাই রাতে চা-পাতা তোলা শুরু করি। মাথার মধ্যে লাইট বেঁধে নিয়ে কাজ শুরু করি। রাতে দ্রুত ও আরামে কাজ করা যায়।’

রাত ২টায় জেগে ওঠে চা-বাগান

আরেক চা-শ্রমিক মহিদুল ইসলাম জানান, চা মৌসুমে প্রতি রাতে মাত্র আট ঘণ্টা কাজ করলেই ২০০ থেকে ২৫০ কেজি পাতা তোলা যায়। এ জন্য মজুরি পাওয়া যায় ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা।

এসব চা-শ্রমিক আরও জানান, রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যেই তারা ঘুমিয়ে পড়েন। রাত ২টার আগেই উঠে পড়েন। এরপর সার্চলাইট কিংবা মোবাইল ফোনের টর্চ জ্বালিয়ে তা মাথায় বেঁধে ছোটেন চা-বাগানে। সকাল ১০টার মধ্যে পাতা তুলে তা কারখানায় দিয়ে বাড়ি ফেরেন। এরপর কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে চলে যান অন্য কাজে।

তেঁতুলিয়ার একটি চা-বাগানের মালিক কাজী আনিছুর রহমান জানান, এখানকার চা-শ্রমিকরা আগে পাথর সংগ্রহের কাজ করতেন। তাতে মজুরি বেশি ছিল। এখন তারা দিনে পাথর তোলেন আর রাতে তোলেন চা-পাতা। দুই বেলার আয়ে তাদের পরিবারে সচ্ছলতাও এসেছে।

আরেক চা-শ্রমিক রাজু ইসলাম বলেন, ‘আমি রাতের বেলা চা-পাতা তোলার কাজ করি। আর দিনের বেলা কৃষিকাজ করি। সব মিলে যা আয় হয় তা দিয়ে সুন্দরভাবে সংসার চলে যায়।’

রাত ২টায় জেগে ওঠে চা-বাগান

রাতে বাগানে কাজ করতে কোনো অসুবিধা হয় কি না, জানতে চাইলে চা-শ্রমিক মোমিনুর রহমান বলেন, ‘প্রথম দিকে ভয় ভয় লাগত। পোকামাকড় ভয় পেতাম। কিন্তু সবাই একসঙ্গে কাজ করায় ভয় কেটে গেছে।

‘এ ছাড়া আমাদের সবার সঙ্গেই টর্চলাইট থাকে। পোকামাকড় থাকলেও চলে যায়।’

বাংলাদেশ চা বোর্ডের পঞ্চগড় আঞ্চলিক কার্যালয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ শামীম আল মামুন বলেন, ‘পঞ্চগড়ের চা শিল্পে চাষিদের পাশাপাশি ২০ থেকে ২৫ হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে। তারা আগে অলস সময় কাটাত। তাদের কোনো কাজ ছিল না।

‘এখন চা বাগানে কাজ করে তারা সচ্ছলতা পেয়েছে। বিশেষ করে যারা রাতে চা-পাতা তোলার কাজ করছেন, তারা বেশি লাভবান হচ্ছেন। কারণ, তারা দিনে অন্য কাজ করে বাড়তি আয় করতে পারছেন।’

দিনের বেলায় চা-বাগানে এখন নারীশ্রমিকদেরই মূলত কাজ করতে দেখা যায় বলে জানান তিনি।

শেয়ার করুন

কোরবানির আগে বেড়েছে গোখাদ্যের দাম, দিশেহারা খামারিরা

কোরবানির আগে বেড়েছে গোখাদ্যের দাম, দিশেহারা খামারিরা

করোনাভাইরাস আর লকডাউনে দফায় দফায় গোখাদ্যের দাম বাড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের গরুর খামারিরা। ছবি: নিউজবাংলা

টানা দুই বছর করোনাভাইরাস আর লকডাউনে দফায় দফায় গোখাদ্যের দাম বাড়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সিরাজগঞ্জের গরু খামারিরা।

তারা বলছেন, সামনেই ঈদুল আজহার আগে গোখাদ্যের দাম না কমলে বড় ধরনের লোকসানে পড়তে হবে তাদের।

এদিকে বন্ধ রয়েছে উল্লাপাড়ার লাহিড়ী মোহনপুরে মিল্ক ভিটার অর্থায়নে নির্মিত গোখাদ্য উৎপাদন প্লান্টটিও।

খান ডেইরি ফার্মের মালিক শাহিন খান নিউজবাংলাকে বলেন, গমের ছাল বস্তাপ্রতি ১১০০ টাকা ছিল। বর্তমানে ১২৫০ টাকা হয়েছে। কাউফিড বস্তাপ্রতি ৯০০ টাকার জায়গায় এখন বেড়ে হয়েছে ১০৫০ টাকা।

শাহিন খান বলেন, ডালের ভুসি ৩৫ কেজির বস্তা কিনতে হচ্ছে ১২০০ টাকায়, অ্যাংকর ডালের ভূষি ৮০০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। ধানের খড়ের দামও বেশি। খড় কিনতে হচ্ছে ৬০০ টাকা মণ দরে।

শাহিন খান আরও বলেন, ‘প্রতি শতাংশ জমির জাম্বু ঘাস কিনতে হচ্ছে ৩০০ ও নেপিয়ার ঘাস ৪০০ টাকায়। গোখাদ্যের দাম কমানো না হলে কিংবা খামারিদের ভর্তুকি না দিলে আমাদের পক্ষে খামার চালানো অসম্ভব হয়ে উঠবে।’

কোরবানির আগে বেড়েছে গোখাদ্যের দাম, দিশেহারা খামারিরা

ষাঁড় গরু লালনপালন করে ঈদের আগে বিক্রি করেন শাহজাদপুর উপজেলার মশিপুর গ্রামের ভাই ভাই ডেইরি ফার্মের পরিচালক শাহান উদ্দিন।

শাহান উদ্দিন বলেন, ‘প্রতিবছর ভালো লাভ হয়। কিন্তু এ বছর খরচ বেড়েছে। এক বস্তা গমের ভুসি ছিল ৯৫০ টাকা, সেই ভুসি এখন ১৩০০ টাকা। সবগুলো ভুসির দাম বস্তাপ্রতি ৩০০-৪০০ টাকা করে বেড়েছে। এক আঁটি খড়ের দাম ৮ থেকে ১০ টাকা। খাদ্যের দাম কমলে হয়তো লাভ করতে পারব।’

প্রায় ১০০ গরু নিয়ে খামার রয়েছে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলামের।

সাইফুল বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে গরুগুলোকে দেশীয় প্রযুক্তিতে মোটাতাজা করছি। তবে গোখাদ্যের দাম এত বেশি হওয়ায় খরচ বাড়ছে। কোরবানির হাটে গরুর ভালো দাম পাব কি না, সেটি নিয়ে চিন্তায় আছি।’

শাহজাদপুর তালগাছি বাজারের গোখাদ্য বিক্রেতা সেলিম রেজা বলেন, ‘মিল্ক ভিটার গোখাদ্য উৎপাদন প্লান্টটি বন্ধ থাকায় দাম অনেকটা বেড়ে গেছে। এখানে বিভিন্ন কোম্পানির খাদ্য আসে। সবাই এই খাদ্যের দাম সিন্ডিকেট করে বাড়িয়েছে। তাই আমাদের বেশি দামে কিনে এনে বেশি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে।’

কোরবানির আগে বেড়েছে গোখাদ্যের দাম, দিশেহারা খামারিরা

মনিরামপুর বাজারের গোখাদ্য বিক্রেতা নুরুল ইসলাম বলেন, ‘কোরবানির ঈদকে ঘিরে কিছু ব্যবসায়ী গোডাউনে খাদ্য মজুত করছেন। বাজারে সংকট দেখিয়ে বেশি দামেও বিক্রি করছেন তারা। এদের জন্য প্রতিবছর এই মৌসুমে গোখাদ্যের দাম বেড়ে যায়।’

করোনাভাইরাস মহামারির অজুহাতে মিলমালিক ও মজুতদাররা তিন দফা দাম বাড়িয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন এই বিক্রেতা।

এ বিষয়ে গোখাদ্য উৎপাদন প্রতিষ্ঠান এসিআইয়ের সিরাজগঞ্জ শাখার ব্যবস্থাপকের টেলিফোন নাম্বারে ফোন করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

১৯৭৩ সালে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে সমবায়ভিত্তিক রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান মিল্ক ভিটার একটি দুগ্ধ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা গড়ে ওঠে। একে কেন্দ্র করে জেলাটিতে গড়ে ওঠে হাজার হাজার গরুর খামার।


কোরবানির আগে বেড়েছে গোখাদ্যের দাম, দিশেহারা খামারিরা

মিল্ক ভিটার পরিচালক আব্দুস সামাদ ফকির বলেন, ‘গোখাদ্যের দাম আগের চেয়ে অনেক বেশি। গোখাদ্য না খাওয়ালে তো গরু বাঁচানো যাবে না। দানাদার খাদ্য, খড়ের দাম অনেক বেশি। খামারিরা নিজে না খেয়ে গরু লালনপালন করছে। সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে অনুদান দিচ্ছে। একইভাবে যদি খামারিদের অনুদান দিত তাহলে হয়তো খামারিরা ঘুরে দাঁড়াতে পারত।’

তিনি আরও বলেন, ‘মিল্ক ভিটার গোখাদ্য উৎপাদন প্লান্টটি নানা সমস্যার কারণে বন্ধ রাখা হয়েছে। করোনার কারণে মিলের কাঁচামাল পাওয়া যাচ্ছে না ঠিকমতো। এই মিলের অধিকাংশ কাঁচামাল আসে বিদেশ থেকে। অন্যদিকে মিলের ইঞ্জিনিয়ারিং সেকশনে কিছু কারিগরি সমস্যা থাকার কারণে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। সবকিছু স্বাভাবিক হলে আবারও মিলটি চালু করা হবে।’

শাহজাদপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা বলেন, ‘লকডাউনে দেশের প্রাণিসম্পদ ও ডেইরি শিল্পের ওপরও প্রভাব পড়েছে। প্রত্যেক খামারির বড় সমস্যা দুধের দাম কম পাওয়া ও গোখাদ্যের দাম বেশি হওয়া। এ বিষয়ে আমরা সরকারিভাবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি।’

তিনি বলেন, ‘খামারিদের ভর্তুকির বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন। আশা করছি দ্রুতই আমরা তাদের আর্থিক সহায়তা দিতে পারব।’

সিরাজগঞ্জ জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আকতারুজ্জামান ভুঁইয়া বলেন, ‘খাদ্যের দাম বেড়েছে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে। ব্যবসায়ীরা এটা করে থাকে। সিন্ডিকেট ভাঙতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘খামারিরা যাতে লোকসানে না পড়ে এ জন্য সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। গরুর মালিকদের সরকারিভাবে নগদ টাকা, খাবার, ওষুধ দেয়া হয়েছে। দশ লাখ গরুকে বিনা মূল্যে টিকা দিচ্ছে সরকার।’

কোরবানির ঈদ উপলক্ষে জেলায় ৪ লাখ ১২ হাজার গবাদিপশুকে প্রাকৃতিক ও দানাদার খাবার দিয়ে মোটাতাজা করা হয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

শেয়ার করুন

আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

আউশ আবাদে ব্যাপক সাড়া

সরকারি প্রণোদনায় বিনা মূল্যে বীজ ও সার বিতরণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ ও নিবিড় মনিটরিংও কৃষকদের এই ধান আবাদে আগ্রহী করে তুলেছে। বোরো ধানের ভালো দাম পাওয়াও ভূমিকা রেখেছে কৃষকদের এই আগ্রহে।

ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করে বৃষ্টির পানি কাজে লাগিয়ে আউশ আবাদ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে সিরাজগঞ্জের কৃষকদের মাঝে।

সরকারি প্রণোদনায় বিনা মূল্যে বীজ ও সার বিতরণ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মাধ্যমে কৃষকদের উদ্বুদ্ধকরণ ও নিবিড় মনিটরিংও কৃষকদের এই ধান আবাদে আগ্রহী করে তুলেছে। বোরো ধানের ভালো দাম পাওয়াও ভূমিকা রেখেছে কৃষকদের এই আগ্রহে।

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রোস্তম আলী নিউজবাংলাকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্দেশ দিয়েছেন এক ইঞ্চি জমি ফেলে রাখা যাবে না। প্রতি ইঞ্চি জমিকে কাজে লাগাতে হবে। তার এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে যেসব জমি দুই ফসলের মাঝে পতিত থাকত, কোনো আবাদ হতো না, এবার সেসব জমি আউশের আবাদের আওতায় এসেছে।

তিনি বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে বীজ, সার ফ্রি দেয়া হচ্ছে। যেখানে সরকারি সেচ প্রকল্পের ব্যবস্থা আছে, সেখানে সেচও ভর্তুকির আওতায় আনা হয়েছে। তা ছাড়া এবার বোরো ধানের দাম ভালো পাওয়ায় কৃষক আউশ ধান চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।’

এই কৃষি কর্মকর্তা জানান, আউশ আবাদ বৃষ্টিনির্ভর হওয়ায় এ ধান উৎপাদনে সেচ খরচ সাশ্রয় হয়। এবার সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলায় ১ হাজার ৫০০ বিঘা জমিতে আউশ আবাদ করা হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্রত্যেক কৃষককে ৩০ কেজি সার, ৫ কেজি বীজ ও সেচসুবিধা দেয়া হয়েছে। এ কারণে এবার সিরাজগঞ্জের কৃষকরা আউশ চাষের দিকে ঝুঁকছেন।

সদর উপজেলার কাওয়াকোলা গ্রামের কৃষক শহীদ শেখ নিউজবাংলাকে বলেন, ‘আমার ১২ বিঘা জমিতে বছরে দুটি ফসল আবাদ করতে পারতাম। গত দুই বছর আউশসহ তিনটি ফসল আবাদ করতে পারছি।

‘এতে আর আমার জমি পতিত থাকছে না কখনোই। আউশের আবাদ গত বছরও অনেক ভালো হয়েছে। এ বছরে বৃষ্টি বেশি থাকায় অনেক ভালো হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা হামিদুল ইসলাম নিউজবাংলাকে বলেন, ‘ভূগর্ভস্থ পানির অপচয় রোধ করে বৃষ্টির পানি কাজে লাগিয়ে আউশ আবাদ বাড়াতে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সরকারি প্রণোদনায় বিনা মূল্যে আউশ ধানের বীজ ও সার কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হয়েছে।

‘সিরাজগঞ্জে যেসব জমি পতিত থাকত, কোনো আবাদ হতো না, এবার সেসব জমি আবাদের আওতায় আনা হয়েছে। ধানের উৎপাদন কীভাবে বাড়ানো যায়, আমরা সে চেষ্টা করছি। কৃষককেও নানাভাবে সুযোগ-সুবিধা দেয়া হচ্ছে।’

শেয়ার করুন

৪৩৮ কোটি টাকায় পাঁচ লাখ পুষ্টি বাগান

৪৩৮ কোটি টাকায় পাঁচ লাখ পুষ্টি বাগান

প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেকটি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বসতবাড়ির অব্যবহৃত জমিতে ১০০টি করে অর্থাৎ মোট ৪ লাখ ৮৮ হাজার সবজি, ফল ও মসলা জাতীয় ফসলের পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হবে। বসতবাড়ির স্যাঁতস্যাতে জমিতে কচুজাতীয় সবজির প্রদর্শনীও স্থাপন করা হবে।

করোনা মহামারিতে খাদ্য সংকট ও দেশের পুষ্টি চাহিদা মেটাতে অনাবাদি জমিতে ‘পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্প’ বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে সরকার। এ প্রকল্পের আওতায় ৪৩৮ কোটি ব্যয়ে পাঁচ লাখ পুষ্টি বাগান তৈরি করা হবে।

মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বিএআরসি মিলনায়তনে ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন’ প্রকল্প বিষয়ক এক কর্মশালায় কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক এ কথা জানান।

প্রকল্পের আওতায় প্রত্যেকটি ইউনিয়ন এবং পৌরসভার বসতবাড়ির অব্যবহৃত জমিতে ১০০টি করে অর্থাৎ মোট ৪ লাখ ৮৮ হাজার সবজি, ফল ও মসলা জাতীয় ফসলের পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হবে। বসতবাড়ির স্যাঁতস্যাতে জমিতে কচুজাতীয় সবজির প্রদর্শনীও স্থাপন করা হবে।

মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং স্বাস্থ্যসম্মত নিরাপদ ফসল উৎপাদনে ১০০টি কমিউনিটি বেইজড ভার্মিকম্পোস্ট উৎপাদন পিট স্থাপন করা হবে। কৃষকদের প্রশিক্ষণ ও গ্রুপ পর্যায়ে ক্ষুদ্র কৃষি যন্ত্রপাতিও দেয়া হবে। ইতিমধ্যে, এ প্রকল্পের আওতায় সবজি সংরক্ষণে ক্ষুদ্র আকারে দেশজ পদ্ধতির বিদ্যুতবিহীন ৬৪টি কুল চেম্বার স্থাপন করা হয়েছে।

কৃষিমন্ত্রী বলেন, ‘করোনায় খাদ্যসংকট মোকাবিলা এবং গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী অনাবাদি জমি চাষের আওতায় আনতে পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।’

প্রকল্পটি সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারলে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি পারিবারিক শাকসবজি ও পুষ্টি চাহিদা পূরণ সম্ভব হবে মনে করেন মন্ত্রী।

প্রকল্পটি সুষ্ঠু বাস্তবায়নে মন্ত্রণালয় ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদেরকে তদারকির নির্দেশ দেন মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার পর আমাদের মোট বাজেট ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা, সেখানে আজকে শুধু বাড়ির আঙিনায় পুষ্টিবাগান স্থাপনে ৪৩৮ কোটি টাকার প্রকল্প নেয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের প্রত্যেকটি টাকার হিসাব আমাদেরকে দিতে হবে। যে উদ্দেশ্যে এ প্রকল্প নেয়া হয়েছে তার কতটুকু অর্জন হলো তার গাণিতিক ও বাস্তবসম্মত হিসাব ও মূল্যায়ন করতে হবে।’

নির্বাচিত কৃষকেরা সবজি উৎপাদন করছেন কী-না, অন্যরা উৎসাহিত হচ্ছে কী-না ও উৎপাদিত সবজি খেয়ে তাদের পুষ্টির উন্নতি হচ্ছে কী-না তা যথাযথ মূল্যায়ন রাখতে হবে বলেও জানান মন্ত্রী।

তিনি বলেন, ‘প্রকল্প গ্রহণের আগে গত বছর দেশব্যাপী ৪ হাজার ৪৩১টি ইউনিয়নে ৩৭ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ব্যয়ে এক লাখ ৪১ হাজার পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন করা হয়েছে।’

৪৩৮ কোটি টাকার ‘অনাবাদি পতিত জমি ও বসতবাড়ির আঙ্গিনায় পারিবারিক পুষ্টি বাগান স্থাপন’ প্রকল্পটি এ বছরের মার্চে একনেকে অনুমোদিত হয়। তিন বছর মেয়াদি প্রকল্পটি বাংলাদেশের সকল উপজেলায় বাস্তবায়িত হচ্ছে।

প্রকল্পের উপস্থাপনায় বলা হয়, বাংলাদেশে প্রায় ২ কোটি ৫৩ লাখ বসতবাড়ি রয়েছে। এসকল বসতবাড়ির অধিকাংশ জায়গা অব্যবহৃত ও পতিত পড়ে থাকে। কিছু বসতবাড়িতে অপরিকল্পিতভাবে শাকসবজি আবাদ করা হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে পারিবারিক পর্যায়ে নিরাপদ মানসম্মত শাকসবজি, মসলা এবং মৌসুমী ফল উৎপাদনে সহায়ক হবে। উৎপাদিত ফসল পারিবারিক পুষ্টির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কৃষকের আয় বাড়াবে।

শেয়ার করুন

এবার চাষ হবে রানি মাছ

এবার চাষ হবে রানি মাছ

বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া রানি মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনকৌশল উদ্ভাবন করতে পেরেছেন। ফলে মাছটি চাষের আওতায় আসবে এবং সহজলভ্য হবে। সর্বোপরি শিগগিরই মাছটি সাধারণ ভোজনরসিকদের খাবার টেবিলে ফিরবে।

জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলাশয় সংকোচন, পানিদূষণ, অতি আহরণ, বিচরণ ও প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস হওয়ায় রানি মাছের প্রাপ্যতা ব্যাপকভাবে কমেছে। দীর্ঘ এক বছর এ মাছ নিয়ে গবেষণা করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদন কৌশল উদ্ভাবনে সফল হয়েছেন মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা।

বিএফআরআই সূত্রে জানা যায়, ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রে ২০২০ সালে রানি মাছের সংরক্ষণ, প্রজনন এবং পোনা উৎপাদন বিষয়ে গবেষণা কর্মসূচি নেয়া হয়। প্রজননের জন্য এই মাছটি যমুনা, ব্রহ্মপুত্র ও কংস নদ এবং নেত্রকোণার হাওর থেকে সংগ্রহ করা হয় এবং গবেষণাকেন্দ্রের পুকুরে প্রতিপালন করা হয়।

গবেষণার আওতায় জুন মাসের চলতি সপ্তাহে দেশে প্রথমবারের মতো রানি মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনকৌশল উদ্ভাবন করা হয়েছে।

গবেষক দলে ছিলেন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা সেলিনা ইয়াছমিন, বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রবিউল আওয়াল, পরিচালক এ এইচ এম কোহিনুর ও স্বাদুপানি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা শাহা আলী।

সেলিনা ইয়াছমিন নিউজবাংলাকে জানান, পুকুর থেকে পরিপক্ব মাছ নির্বাচন করে কৃত্রিম প্রজননের পাঁচ-ছয় ঘণ্টা আগে স্ত্রী ও পুরুষ মাছকে হ্যাচারিতে হরমোন ইনজেকশন দেয়া হয়। ইনজেকশন দেয়ার ১০-১২ ঘণ্টা পর স্ত্রী মাছ ডিম দেয়। ডিম দেয়ার ২২-২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিষিক্ত ডিম থেকে রেণু বের হয়ে আসে।

এবার চাষ হবে রানি মাছ


পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ডিম নিষিক্ত ও ফোটার হার যথাক্রমে ৭৫ ও ৫০ শতাংশ। রেণুর ডিম্বথলি দুই-তিন দিনের মধ্যে নিঃশেষিত হওয়ার পর প্রতিদিন তিন-চারবার সেদ্ধ ডিমের কুসুম খাবার হিসেবে হাঁপায় সরবরাহ করা হয়। হাঁপাতে রেণু পোনা ছয়-সাত দিন রাখার পর নার্সারি পুকুরে স্থানান্তরের উপযোগী হয়।

বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা রবিউল আওয়াল বলেন, রানি মাছ মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত প্রজনন করে থাকে। জুন-জুলাই এদের সর্বোচ্চ প্রজনন মৌসুম। একটি পরিপক্ব স্ত্রী মাছে প্রতি গ্রামে ৮০০-৯০০টি ডিম পাওয়া যায়। এ মাছের ডিম্বাশয় এপ্রিল মাস থেকে পরিপক্ব হতে শুরু করে।

এবার চাষ হবে রানি মাছ


রবিউল আওয়াল আরও বলেন, অক্টোবরের শেষ থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত যখন বিলের পানি কমে যেতে থাকে, তখন রানি মাছ জালে ধরা পড়ে বেশি। এ মাছ খালবিল, নদীনালা, হাওর-বাঁওড় ইত্যাদির তলদেশে পরিষ্কার পানিতে বসবাস করতে পছন্দ করে। তবে কখনও কখনও ঘোলা পানিতেও এদের উপস্থিতি লক্ষ করা যায়।

ইনস্টিটিউট সূত্রে জানা যায়, পরিপক্ব স্ত্রী মাছের জননেন্দ্রিয় গোলাকার ও হালকা লালচে রঙের হয় কিন্তু পুরুষ মাছের জননেন্দ্রিয় পেটের সঙ্গে মেশানো, কিছুটা লম্বাটে ও ছোট হয়। এ মাছের মুখ আকারে ছোট এবং চার জোড়া ক্ষুদ্রাকৃতির স্পর্শী থাকে। তবে এর দেহে ইংরেজি ‘ওয়াই’ বর্ণমালার মতো চারটি কালো দাগ থাকে এবং দুটি দাগের মধ্যবর্তী অংশে একটি কালো দাগ অবস্থিত। আঁশ অত্যন্ত ক্ষুদ্রাকৃতির, যা প্রায় সাধারণ দৃষ্টিতে বোঝাই যায় না। রানি মাছ প্রায় ৬-৭ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। তবে সর্বোচ্চ ১৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হওয়ার রেকর্ডও রয়েছে।

এবার চাষ হবে রানি মাছ


বিএফআরআই মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, এ মাছটি বউ মাছ, বেটি মাছ, পুতুল মাছ, বেতাঙ্গী মাছ প্রভৃতি আঞ্চলিক নামে পরিচিত। অনেকেই আবার ‘গাঙ্গ রানি’ বলেও ডাকে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, ভুটান ও মিয়ানমারে এ মাছ পাওয়া যায়।

বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া রানি মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনকৌশল উদ্ভাবন করতে পেরেছেন। ফলে মাছটি চাষের আওতায় আসবে এবং সহজলভ্য হবে। সর্বোপরি শিগগিরই মাছটি সাধারণ ভোজনরসিকদের খাবার টেবিলে ফিরবে। ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ বলেন, বিপন্ন মাছ পাতে ফেরাতে বিজ্ঞানীরা কাজ করছেন। গবেষণার ৩০তম সাফল্য হিসেবে রানি মাছ এসেছে।

গত ১২ বছরে চাষের মাধ্যমে দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন বেড়েছে প্রায় চার গুণ। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্রে ২০২০ সালে একটি ‘লাইভ জিন ব্যাংক’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। দেশীয় মাছ সংরক্ষণ এবং পোনা উৎপাদনে গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ২০২০ সালে ‘একুশে পদক’ লাভ করে।

শেয়ার করুন

মুজিববর্ষে দুটি ‘মৎস্য গ্রাম’ পেল দেশ

মুজিববর্ষে দুটি ‘মৎস্য গ্রাম’ পেল দেশ

মাছ চাষ করে সফল উদ্যোক্তা জয়পুরহাটের সুজাউল। ফাইল ছবি

এ কার্যক্রমের আওতায় গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, মৎস্য চাষ, কৃষিনির্ভর শিল্প, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষির বহুমুখীকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ নানা রকম সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে নেত্রকোণা সদরের দক্ষিণ বিশিউড়া ও শরীয়তপুরের নড়িয়ার হালইসার গ্রামকে ফিশার ভিলেজ বা মৎস্য গ্রাম ঘোষণা করেছে সরকার।

গ্রাম দুটিকে মৎস্য গ্রাম ঘোষণা করার কথা মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা ইফতেখার হোসেন।

সোমবার এ-সংক্রান্ত একটি পত্র জারি করেছে মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন মৎস্য অধিদপ্তর।

পত্রে বলা হয়, বর্তমান সরকারের বিশেষ কর্মসূচি ‘আমার গ্রাম, আমার শহর’ বাস্তবায়নে মৎস্য অধিদপ্তরের ‘মৎস্য গ্রাম’ কার্যক্রম মূলত সমৃদ্ধ গ্রাম গড়ে তোলার উদ্যোগ।

এ কার্যক্রমের আওতায় গ্রামাঞ্চলে অবকাঠামো উন্নয়ন, মৎস্য চাষ, কৃষিনির্ভর শিল্প, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ, কৃষির বহুমুখীকরণ, বাজার ব্যবস্থাপনাসহ নানা রকম সুবিধা সম্প্রসারণের মাধ্যমে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি ও জীবনমান উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মৎস্য অধিদপ্তর এ গ্রাম দুটিতে ব্যাপক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, গ্রামের সব পুকুর-দিঘিতে বিজ্ঞানসম্মত মাছ চাষ কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও পুষ্টির চাহিদা পূরণে ব্যবস্থা গ্রহণ, মাছচাষিদের দল গঠন, প্রশিক্ষণ ও প্যাকেজভিত্তিক পুকুরে মাছ চাষ প্রদর্শনী, জেলেদের দল গঠন, প্রশিক্ষণ, বিকল্প কর্মসংস্থান ও ঋণ সহায়তা প্রদান, উন্মুক্ত জলাশয় তথা বিল ও প্লাবনভূমিতে সমাজভিত্তিক মৎস্য ব্যবস্থাপনা দল গঠন, বিল নার্সারি স্থাপন ও পোনা অবমুক্তকরণ, জলাশয় সংস্কার ও মাছের অভয়াশ্রম স্থাপন এবং কমিউনিটি সঞ্চয় দল গঠনের মাধ্যমে নারীর ক্ষমতায়ন।

এ ছাড়া গ্রাম দুটিতে সরকারের অন্য দপ্তরের সহায়তায় যে কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে তা হলো, গভীর নলকূপ ও স্বাস্থ্যসম্মত পায়খানা স্থাপন, যানবাহন চলাচল উপযোগী রাস্তা নির্মাণ, বৃক্ষরোপণ, সুফলভোগীদের হাঁস-মুরগি ও গবাদিপশুর চিকিৎসার ব্যবস্থা গ্রহণ।

পাশাপাশি গ্রামের অধিবাসীদের সন্তানদের শতভাগ শিক্ষা কর্মসূচি নিশ্চিতকরণ ও অন্য শিক্ষা কার্যক্রম গ্রহণ করা।

শেয়ার করুন